বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, ২০২৩

চরিত্র বোঝা দায় ?



             চরিত্র বোঝা দায়!
(সামাজিক বাস্তবতায় ছোট উপন্যাস)

  লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
দত্তপুলিয়া, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
হোয়াইট অ্যাপ নম্বর :- 8926200021

শিরোনাম :- চরিত্র বোঝা দায়!
শ্রেণী:- সামাজিক বাস্তবতায় ছোট উপন্যাস।
বিষয় :- নারী পুরুষের চরিত্র নিয়ে সাংসারিক জীবনের ঘটনা।
লেখকের নাম :- শংকর হালদার শৈলবালা।
শব্দ সংখ্যা :- 5055
শ্রেণী :- ছোট উপন্যাস।
                ----------------------------------------------------------
                  ।। প্রথম অধ্যায় ।।

সুরেন্দ্র দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নমিতার খোঁজ খবর রাখে না। নমিতা পুরনো শহর ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছে । অফিস থেকে জানাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। সুরেন্দ্র ব্যবসার জন্য একটি শহরে বসবাস শুরু করেছে। একদিন বিকালবেলা ক্লান্ত শরীর নিয়ে পার্কে ঘাসের উপর বসে আছে। হঠাৎ একটি কিশোর এসে পিছনের দিক থেকে জামা ধরে টানতে শুরু করে। 

সুরেন্দ্র বিরক্ত হয়ে বলে :- কেন বিরক্ত করছো ? মায়ের কাছে যাও ,না হয় অন্য কোন জায়গায় গিয়ে খেলা করে। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
 কিশোর পড়ে যাওয়ার অভিনয় করে কান্না শুরু করে দেয়।
সুরেন্দ্র কান্না শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখে ভাবে মনে:- আমার ছেলে নলিনী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এই শহরে আসবে কি করে! ওর মা তো চাকরি করে। কাছে ডেকে নিয়ে আদর করতে করতে পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারে এই সন্তান নমিতার ছাড়া অন্য কাহারো নয়।

কিশোর টি সুরেন্দ্রের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, এমন ভাবে দেখছে কত দিনের আপনজন হারিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ দেখা হয়েছে।

সুরেন্দ্র কিশোর টি কে কোলের উপর বসিয়ে বলে :- তোমার নাম কি ?

কিশোর টি বলে :- আমাকে সবাই দুখিরাম বলে ডাকে কিন্তু এই নামটি আমার একদম পছন্দ না।

 সুরেন্দ্র বলে :- তোমার ভালো আর নাম নেই!

 কিশোর টি বলে :- আছে, স্কুলের নাম নলিনী দত্ত।
 সুরেন্দ্রের বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। 

দুখিরাম বলে :-কাকা, আমার নাম শুনে আপনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন কেন ?

সুরেন্দ্র বলে :- তোমার মায়ের নাম কি ?

দুখিরাম বলে :- আপনি উল্টো প্রশ্ন করছেন, সবাই তো বাবার নাম জিজ্ঞাসা করে।

 সুরেন্দ্র বলে :- তোমার বাবা-মায়ের নাম বল।

দুখিরাম বলে :- বাবার নাম সুরেন্দ্র নাথ দত্ত আর মায়ের নাম নমিতা দত্ত।

সুরেন্দ্র বলে :- তোমার বাবা বাড়িতে থাকেন!
বলে ভাবনা জগতে চলে যায়। পুরনো দিনের স্ত্রী ও ছেলে হারানোর যন্ত্রণা আবার সামনে চলে আসে, বুকের মাঝে চিনচিন করে ব্যথা শুরু হয়।

দুখিরাম বলে :- কাকাবাবু মায়ের মুখে শুনেছি, আমার যখন সাত বছর বয়স- সেই সময় বাবার সাথে মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে। কেন বিবাহ বিচ্ছেদ হয়! আমাদের মতো শিশুদের কথা এইসব মা-বাবারা একদম ভাবে না। তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষা করতে, আমাদের মত শিশুদের অনাথ বানিয়ে চলে যায় । তাহলে আমাদের মতো শিশুদের কেন জন্ম দেয় ? বাবার জন্য আমার মনে অনেক কষ্ট হয়। যখন অন্য বন্ধু-বান্ধবদের স্কুল ছুটির পর বাবা মা তার সন্তানদেরকে আদর করে বাড়িতে নিয়ে আসে। আদর করে কথা কথা বলে। তখন বাবাকে কল্পনা করতে থাকি, তবুও বাবা তো আসে না। আদর করে কোলে তুলে নেয় না। আবার বাবার উপর ভীষণভাবে রাগ হয়। আমাকে ও মাকে কেন ছেড়ে চলে গেল! লোকের মুখে শুনেছি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক ঝামেলা ও অশান্তি হলে নাকি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে কিন্তু আমাদের মতো শিশুদের মুখের দিকে চেয়ে সমাধান সূত্র বের করতে পারে।

সুরেন্দ্রের, কিশোর দুখিরামের কথা শুনে পাষাণ হৃদয়ে আঘাত লাগে, ভাবে মনে মনে আমার উদ্দেশ্যে অজান্তেই কথাগুলো বলছে। চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।

 দুখিরাম তার কোমল হাত দিয়ে সুরেন্দ্রের চোখের জল মুছে দিয়ে বলে :- কাকা, আমার মত আপনার মনের মধ্যে অনেক দুঃখ আছে কি?
সুরেন্দ্র ভাবে মনে বাবা হয়ে আজ সন্তানের কাছে থেকে কাকা ডাক শুনতে হচ্ছে। এর থেকে লজ্জার আর কি আছে? নমিতার খামখেয়ালীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ হলো।
 সুরেন্দ্র আবেগের বশবর্তি হয়ে দুখিরাম
 কে জড়িয়ে ধরে বলে :- বাবা, আমিও তোমার মতো একটি সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছি। হয়তো বেঁচে থাকলে তোমার মতই বড় হয়েছে। আমিও সন্তানকে হারিয়ে তোমার মতই দুঃখের সাগরে বিরাজ করছি। তোমার বাবার মুখ মনে আছে!

দুখিরাম বলে :- কয়েকদিন আগে মায়ের আলমারিতে আমার কিছু জিনিস খুঁজতে গিয়ে, একটা ছবি দেখেছিলাম। একটি ছবিতে মায়ের সঙ্গে তিনজন আছে। তার মধ্যে বাবা-মায়ের সাথে আমার শিশুকালের ছবি আছে। তৃতীয় ছবির সঙ্গে আপনার চেহারা মিল খুঁজে পাচ্ছি। আপনি কি আমার সেই হারানো বাবা?

 সুরেন্দ্র বলে :- না বাবা, মানুষের চেহারার সাথে মানুষের মিল থাকতে পারে। তুমি আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে, প্রতিদিন আমরা এখানে গল্প করবো।

দুখিরাম বলে :- ঠিক আছে বন্ধুত্ব করলাম।

সুরেন্দ্র ভাবে মনে মনে :- নলিনীর প্রাপ্তবয়স্ক হতে এখনো ছয় বছর বাকি আছে। ছয় বছর পরে নমিতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কিন্তু সন্তানের অধিকারের দাবি করতে পারবো। এখন আমার পরিচয় গোপন রাখতে হবে।

 দুখিরাম বলে :- এত কি ভাবছেন?

সুরেন্দ্র বলে :- বাড়িতে যাও আর মন দিয়ে পড়ালেখা করবে এবং মায়ের অবাধ্য হবে না।
বাবার স্নেহ ভালোবাসা না পেলেও কিন্তু মা তো তোমার পাশে আছে।
         ------------------------------------   
        
                 ।। দ্বিতীয় অধ্যায় ।।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসের কর্মচারীদের বিশ্রাম ঘরের মধ্যে দুজন নর-নারী পাশাপাশি বসে বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে।

নরেন নামে এক সাধারণ অফিসার, নমিতার হাতে হাত রেখে বলে :- আর কতজনকে তোমার রূপের মহিমায় জড়িয়ে নাটক করে যাবে।

নমিতা হাত সরিয়ে নিয়ে বলে :- যতদিন ইচ্ছা ভালবাসা চালিয়ে যাবো। দীর্ঘদিন এককি অফিসের ছাদের নিচে বসবাস করছি কিন্তু হঠাৎ করে আজ এই প্রশ্ন করছো কেন?

 নরেন বলে :- কেন প্রশ্ন করছি, চোখের সামনে যা দেখি কিন্তু তা কখনো অস্বীকার করতে পারবোনা। আমাদের অফিসের সর্বময় কর্তা সুরেন্দ্র বড় বাবুর সঙ্গে যেভাবে চলাফেরা ঢলাঢলি করছো। তাতে সময়ের চক্করে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে নিয়ে আসবে। বড়বাবু অবিবাহিত থেকে রক্তে মাংসে নারী পিপাসু।

 নমিতা মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলে :- পিপাসার জল দান করব। আমার মত সুন্দরী, স্বাস্থ্যবান দেহ ও শিক্ষাগত মর্যাদা অনুসারে কিন্তু এই অফিসে আমার কর্ম পেয়েছি কি ?

নরেন বলে :- কি পাওনি! তুমি কয়েক বছরের মধ্যে যা সুযোগ সুবিধা পেয়েছো কিন্তু তা দীর্ঘদিন কোন কর্মচারী পায়নি। ভাগ্যচক্র কে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের অনেকের থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকা সত্ত্বেও কিন্তু সুরেন্দ্র বাবু অফিসের বড় অফিসার।

নমিতা বলে :- বড় অফিসার হতে বর্তমান শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। ছলচাতুরি আর কাজের অভিজ্ঞতার সাথে টাকার জোর। আমার চিন্তা ধারা বাস্তবায়ন করার জন্য কিন্তু আমি কোন দিন কোন মানুষের সাথে আপস করিনি। আমাকে আরো উপরে উঠতে হবে। যদি বড় বাবুর সাথে ভালোবাসার অভিনয় করতে হয়, তা কিন্তু দীর্ঘদিন চালিয়ে যাবো। নরেন; যৌবনের আবেগের বশবর্তী হয়ে তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু কখনোই অধিকারের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না। 

নরেন বলে :- না, আমি আর চেষ্টা করবোনা। তোমাকে ভালোবাসি বলেই সাবধান করে দিচ্ছি, কারণ আমি এই অফিসে দীর্ঘদিন চাকরি করছি। আমার চোখের সামনে কতনা অঘটন ঘটেছে। প্রত্যেকটি ঘটনাই তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি।

 নমিতা বলে :- জানিয়েছো বলেই কিন্তু বড় বাবুর দুর্বলতার জায়গা গুলো খুঁজে পেয়েছি। আমি থেমে থাকার জন্য জন্ম নেইনি। তোমার মিনমিনিয়ে স্বভাবের কারণে কিন্তু আমার ঠিক সবসময় পছন্দ হয় না। তবুও তোমার সঙ্গ দিয়ে চলেছি কারণ তুমি আমার বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করে।
 
সুরেন্দ্র বাবু কে আসতে দেখে দুজনেই চুপচাপ হয়ে যায়। সুরেন্দ্র বাবু ও নমিতার মধ্যে চোখাচোখি হতে থাকে। নরেন তাড়াহুড়ো করে হলঘরের চেয়ার ছেড়ে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে অফিসের নির্দিষ্ট নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। অফিসের একটা ফাইল খুলে দেখতে থাকে। 
           ------------------------------------

                ।। তৃতীয় অধ্যায় ।।

নমিতার বিবাহ বিচ্ছেদের দীর্ঘ কয়েক বছর পর, এক রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে স্মৃতির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে ভাবতে থাকে। একদিন হঠাৎ করে অফিস ছুটির মুহূর্তে সুরেন্দ্র বাবুর অফিসের নিরাপত্তা রক্ষী কে দিয়ে-আমাকে জরুরি কাজের জন্য অফিস রুমে ডেকে নিয়ে আসে। 

আমি (নমিতা) ফাইল পত্র নিয়ে হাসি হাসি মুখে বড়বাবুর অফিসের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিরাপত্তা রক্ষী না থাকায় বুকের কাপড় হালকা করে সরিয়ে, খোলা দরজা দিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ি। হাত পা নেড়ে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে শরীরের গোপন অঙ্গ দেখানোর চেষ্টা করি।
 
দুস্টুমি করে হাসি হাসি মুখ করে বলি :- বলুন স্যার, কেন ডেকেছেন ?

সুরেন্দ্র বাবু মুগ্ধ নয়নে আমার অর্ধ অনাবৃত বুকের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে :- বিশেষ কাজের জন্য ডেকেছি। দুরে দাড়িয়ে কেন! আমার পাশের চেয়ারে বসুন।

আমি (নমিতা) ফাইলগুলো টেবিলের উপর রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলি :- স্যার, নজর লেগে যাবে। মনে হচ্ছে ভিন্ন গ্রহের নারী কে দেখছেন। এভাবে দেখার কি আছে?

সুরেন্দ্র বাবু বলে :- বহু মানুষের মাঝে কাজের মাধ্যমে দেখেছি। এত কাছে থেকে একা রুমের মাঝে নিরিবিলি পরিবেশে কিন্তু তোমার দেহ পল্লবীর শাখা প্রশাখা দেখিনি। দেখার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু হয়তো তুমি বুঝতে চাওনি।

আমি (নমিতা) সুরেন্দ্র বাবুর আরো কাছে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলি :- সমুদ্রের নোনা জলে সাঁতার কাটার ইচ্ছা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের মাঝে হাবুডুবু খাবে কিন্তু তবুও সমুদ্রের নিচের মাটি খুঁজে পাবে না।

সুরেন্দ্র বাবু আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে কিন্তু প্রথমে হাত চেপে ধরে। তারপর কিছু বলছি না দেখে আমাকে (নমিতা) বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে। আমি পুরুষের পরশ পেয়ে আনন্দিত মনে চুপচাপ থাকি।

সুরেন্দ্র বলে :- চলে পাশের রুমে যায়।

আমি কলের পুতুলের মতো সুরেন্দ্রের সাথে পাশের রুমে ঢুকে দেখি, রুমের মধ্যে খাট বিছানা সব ব্যবস্থা আছে। সেদিন আমার মনের ও শরীরের মধ্যে এক রোমান্টিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। 
সুরেন্দ্র আমাকে আদর করতে করতে বিছানায় নিয়ে আসে।

আমি (নমিতা) কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে নাটক করে বলি :- ছাড়ুন, ছাড়ুন। আমি এখনো কুমারী কিন্তু আমার কুমারীত্বের সর্বনাশ করবেন না। সেই দিন বড়বাবুর কাছে মন প্রাণ দেহমন যৌবন সমাপন করে দিয়েছিলাম। মুখে বারবার বলছিলাম, আমার কুমারীত্ব সর্বনাশ করবেন না। 
 
সুরেন্দ্র বাবু আমার আদর করতে করতে বলে :- না, না করে না। একমাত্র আমার ইচ্ছায়, তুমি না বলতেই অফিসে সব রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছো। তোমাকে চাকরির আরো উঁচু জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো। শুধু তুমি আমাকে একটু ভালোবাসা দাও।

 আমার মন ও প্রাণ আদরে আদরে সারারাত ধরে ভরিয়ে দিয়েছিল। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ বড়বাবু। আমাকে কয়েক দিনের জন্য ছুটি দেয় আর টাকার বান্ডিলের সাথে সোনার অলংকার, দামী কাপড় উপহার দিয়েছিলেন। এরপর দুইজনেই কয়েক বছর ধরে যৌবনের উন্মাদনার খেলায় মেতে উঠি। হঠাৎ একদিন অনুভব করি আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছি। 

একদিন রাতে সুরেন্দ্র সাথে শয্যাশায়ী হয়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বলি :- আমার অসাবধানতার কারণে তুমি বাবা হতে চলেছে। সমাজ ব্যবস্থার হাত থেকে মান সম্মান বাঁচানোর জন্য কিন্তু আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করে‌। আমাকে ও আগত সন্তান কে সমাজের কাছে স্বীকৃতি দাও।

সুরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে আমাকে পাশে ফেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠে বলে :- তোমার সন্তানের দায়ভার নিতে পারবো না। এই সন্তান কে আমি স্বীকার করি না কারণ আমি ছাড়াও তোমার গোপনে গোপনে নরেনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। বরং বাচ্চাটি কে গর্ভের মধ্যে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

আমি (নমিতা) রাগে গজগজ করতে করতে বলি :- আমার গর্ভের শিশু কিন্তু তোমার সন্তান। তোমার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরীর আগে নরেন কে ভালবাসতাম কিন্তু দৈহিক মিলনের কোনো চাহিদা ছিল না। আমাকে বিয়ে করে অবশ্যই সন্তানের বাবার পরিচয় তোমাকেই দিতে হবে।

সুরেন্দ্র বলেছিল :- আমাকে তো টাকা আর পদমর্যাদা লাভের জন্য ব্যবহার করে চলেছ। এখন আবার অবৈধ সন্তানের স্বীকৃতি। পতিতা নারীর অবৈধ সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি কেউ কোনদিন দেয়নি আর কোন দিন দেবে না। টাকার বিনিময়ে দেহ ভোগ করতে দিয়েছো। বলো গর্ভপাত করার জন্য কত টাকা চাই!

আমি (নমিতা) অসমাপ্ত যৌনক্ষুদায় উত্তেজিত হয়ে কিন্তু উত্তেজনাবশত বলি :- তুমি; কয়েকবছর ধরে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেহ ভোগ করে চলেছে কিন্তু এখন সন্তানকে অস্বীকার করছো ! আমি তোমাকে ছাড়বো না। থানা পুলিশ করে ছাড়বো। টাকা দিয়ে আমার মুখ বন্ধ রাখতে পারবে না। তুমি অন্য সব মেয়ে পাওনি, আমি মান সম্মানের ভয় পায় না। আমার স্বার্থে আঘাত লাগলে কিন্তু বিষধর নাগিনী হয়ে ছোবল মারতে জানি। এক ছোবলে ছবি বানিয়ে ঘরে টানিয়ে দেবো।

সুরেন্দ্রের সাথে সেই রাতে তর্ক বিতর্ক করতে করতে এক সময় মারামারি শুরু হয়ে যায়। আমাকে যেমন আঘাত করে রক্তাক্ত করেছিল, কিন্তু আমি সুরেন্দ্র কে আঘাত করে নাক মুখ ফাটিয়ে দিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ছিলাম। আমার লম্বা লম্বা চুলগুলো আমার সাথে ভীষণ ভাবে শত্রুতা করেছিল। সুরেন্দ্র আমার চুল ধরে ঘরের মেঝেতে শুয়ে দিয়ে কিন্তু গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য বুকের উপর উঠে প্রচন্ড বেগে তলপেটে আঘাত করেছিল। প্রচণ্ড আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কিন্তু সুরেন্দ্রের নাকে ঘুষি মেরে পালিয়ে জীবন রক্ষা করি।
          ------------------------------------------

                 ।। চতুর্থ অধ্যায় ।।

নমিতা হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিহ্ন গুলো দেখিয়ে অত্যাচারের এবং অন্তঃসত্ত্বার রিপোর্ট তৈরি করে। তারপর সোজা থানায় গিয়ে সুরেন্দ্রের নামে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, অন্তঃসত্ত্বা সন্তানের অস্বীকার করা ও গর্ভ নষ্ট করার জন্য মারধরের অভিযোগ করে মামলা দায়ের করে।

পুলিশ নমিতার অভিযোগের ভিত্তিতে সুরেন্দ্র কে অফিস থেকে গ্রেপ্তার করে। উকিলের মাধ্যমে ছয় মাসের আগে জামিন না পায় তার ব্যবস্থা করে। অফিসের উপর মহলের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে সুরেন্দ্র কে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। মামলা আদালতে বিচারাধীন কিন্তু দেখতে দেখতে নমিতার গর্ভ দশ মাস দশ দিন পূর্ণ হয়ে যায়। কুমারী মা তার সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে কিন্তু অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একসময় নার্সিং হোমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বহু টাকার বিনিময়ে প্রসূতি নিস্তার পায়।

সুরেন্দ্র ছয় মাস পর জামিন পাওয়ার পর আবার নমিতা আদালতে উপস্থিত হয়ে সুরেন্দ্র ও শিশু নলিনী কে ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য আবেদন করে।
আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে ছেলে ও বাবার ডিএনএ পরীক্ষায় সুরেন্দ্রের সন্তান নমিতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে প্রমাণিত হয়।

সুরেন্দ্র জেল খাটার দায় থেকে মুক্তি পাবার জন্য উকিলের মাধ্যমে ভুল স্বীকার করে। নমিতাকে বিয়ে করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানায়। নমিতা এক কথায় রাজি হয়ে যায়।
 আদালতের বিচারকের সিদ্ধান্ত অনুসারে আদালত প্রাঙ্গণে নমিতা শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে সুরেন্দ্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। 

কয়েক বছর যেতে না যেতেই সংসারে আবার চরম আকারে অশান্তি শুরু হয়। সুরেন্দ্র সন্তানের কোন দায়িত্ব পালন করে না কিন্তু নমিতার সামনে সন্তানের জন্য লোক দেখানো দরদ উথলে ওঠে। 

 একদিন রাত আটটার সময় নমিতা অফিস থেকে বাসা বাড়িতে আসার পর, সুরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বলে :- চাকরি ছেড়ে দিয়ে, সন্তানের দেখাশুনার দায়িত্ব নাও; চাকর-বাকর দিয়ে সন্তান লালন পালন হয় না। আমি তো একটা কাজ করি।

 নমিতা উত্তেজিত হয়ে বলে :- তুমি যে কাজ করো, তাতে আমার পোশাক-আশাক, প্রসাধনী খরচ, এই দামি ফ্ল্যাট ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ,চাকর বাকর ও সংসারের ভালো খাবার জুটবে না-সন্তান মানুষ করা তো অনেক দূরের কথা। সন্তানের জন্য মাসে কত খরচ তা জানো। তোমার টাকা আমি ছুঁয়ে দেখি না বরং আমার টাকায় তোমার ফুটানি। 

 সুরেন্দ্র করুণ সুরে বলে :- সবই তো তোমার জন্যই হারিয়েছি। আমার চাকরি চলে গেল আর তোমার পদোন্নতি ঘটলো। আমার জাগায় তুমি বসলো। আর আমাকে জেলে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ও প্রতারনার ফাঁদে ফেলে হুমকি দিয়ে বিয়ে করলে। তাহলে এখন কেন আমার উপর মানসিক নির্যাতন করছো! রাতে স্বামী হিসেবে এক ঘরে থাকার তোমার অনুমতি নেই। তুমি বেশি টাকা আয় করে বলে কিন্তু সব সময় তোমার কথা মতো চলতে পারবে না।

নমিতা উত্তেজনা বশতঃ বলে :- আমি চাকরি ছাড়তে পারবে না বরঞ্চ প্রয়োজনবোধে তোমার মতো অপদার্থ পুরুষ মানুষ ছেড়ে দিতে পারি।

সুরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বলে :- এখন তো তুমি আর সাধারণ কর্মচারী না। অফিসের বড় অফিসার দিদি মনি আবার ইচ্ছা করলেই শত পুরুষ তোমার পায়ের কাছে গড়াগড়ি দেবে। যার শীল যার নোরা তার ভাঙ্গলো দাঁতের গোড়া। বিশ্বাসঘাতক বেমানান বড় অফিসার হয়েছে।

নমিতা উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমার চরিত্রকে নিয়ে সমালোচনা ও সন্দেহ করা হচ্ছে! তোমার নিচু মন মানসিকতার কারণে আমার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছো। নিজের চরিত্র যোনো ফুলের মতো পবিত্র। অফিসের অনেক মেয়েদের সর্বনাশ করেছে। মেয়েরা গঙ্গা জলের মতো স্বচ্ছ ও পবিত্র। তোমার মতো ঘোলা পচা দুর্গন্ধযুক্ত নয়। 

সুরেন্দ্র বলে :- অফিসের নরেন; এখনোও তোমার ভালবাসার ডালি সাজিয়ে অপেক্ষা করে আছে।
 প্রাক্তন প্রেমিকের উপর কত দরদ, রাতে একদিন ফোন না করলে ঘুম আসে না।

নমিতা আঙ্গুল উঁচু করে বলে :- সাবধান; নরেন কে নিয়ে কোন বাজে মন্তব্য করবে না। তোমার মত চরিত্রহীন লম্পট নয়-মেয়েদের দেখলেই কিন্তু লিঙ্গ থেকে লালা ঝরা শুরু করে। সাবধান; আমার সাথে শত্রুতা করলে কিন্তু তোমার পায়ের নিচেই কোন রকম দাঁড়িয়ে থাকার মাটি খুঁজে পাবে না।

নমিতা রাগে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমের দিকে চলতে থাকে।

 একদিন রাতে একলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে সুরেন্দ্র ভাবে :- আর কতদিন এভাবে একা থাকবো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে কয়েক বছরে বিশাল আকারে ফাটল ধরেছে আর এক ছাদের নিচে বসবাস করা যাবে না। আমারও তো কোন নারীর আশ্রয় চাই কিন্তু একঘেয়েমি জীবন আর ভালো লাগছে না। হয়তো যৌবনের উন্মাদনায় কিছু ভুল করে ফেলেছি আবার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার অনেক চেষ্টা করলাম। নমিতার একঘেয়েমি মনোভাব ও চলাফেরা আর ভালো লাগেনা। সংসারের সিংহভাগ ব্যয় বহন করে বলে বড় অহংকার হয়েছে কিন্তু আজকের এই পদমর্যাদা কার জন্য পেয়েছে।
 আমি এই বাড়ির এখন চাকরের যোগ্য নই কারণ নমিতা আমার থেকে বাড়ির চাকর বাকরের সঙ্গে অনেক ভালো ব্যবহার করে থাকে।
 ইদানিং দেখছি নমিতার রূপের অহংকার অনেক বেড়ে গিয়েছে কারণ বাইরে বেরোলেই দামি দামি শাড়ি গয়না প্রসাধনী ব্যবহার করেই বাড়ি থেকে বাহির হয়। হয়তো অন্য কোন পুরুষের আকর্ষণ করে দেহের আগুন নিবারণের চেষ্টা করে। 
নমিতা আগের দিন গুলোতে প্রতি রাতে দেহ সুখ ছাড়া থাকতে পারতো না কিন্তু এখন বছরের পর বছর থাকে কি করে?

প্রতিদিনের ঝগড়া অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় সুরেন্দ্র ও নমিতা উভয়ের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনাপূর্ণ কথা কাটাকাটির মাধ্যমে আদালতের বিচারকের দারস্থ হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। 
আদালতের বিচারকের রায় অনুসারে সাত বছরের শিশু সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব নমিতাকে পালন করতে হবে। আজকের শিশু সন্তান ১৮ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক হলে পিতার অধিকার থাকে কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কার কাছে থাকবে। 

সুরেন্দ্র আদালতে দাঁড়িয়ে ভাবে মনে মনে :- তাহলে ১১ বছর পরে কিন্তু নমিতার কাছ থেকে ছেলে নলিনী কে কেড়ে নিয়ে চরম অপমানের সঠিক জবাব দেবো।

নমিতা শিশু সন্তানকে নিয়ে নতুন ভাড়া বাড়িতে চলে আসে আর সুরেন্দ্র পিতৃ-মাতৃভূমি নিজের গ্রামে চলে যায়।

 নমিতা তার শিশু সন্তানকে নামিদামি একটি স্কুলে পড়াশোনার জন্য ভর্তি করে দেয়। 
      ------------------------------------------------

                ।। পঞ্চম অধ্যায় ।।

নমিতা এখন সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে কিন্তু মনের দিক থেকে কোন শান্তি লাভ করতে পারছে না।

নমিতা ভাবে মনে মনে :- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনো শান্তি আবার কখনো অশান্তির মধ্যে দিয়েই সংসার চক্র চলে কিন্তু সুরেন্দ্র কে ত্যাগ করে ভালো কাজ করিনি। ছেলে নলিনীর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার যন্ত্রণাদায়ক বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে পড়েছি। কোথায় কোথায় বলবে নিশ্চয়ই বাবার সাথে তুমি ভীষণ খারাপ ব্যবহার করেছিল, তা না হলে বাবা তোমাকে ত্যাগ করে চলে গেল কেন!
ইদানিং বলা শুরু করেছে বাবার সাথে প্রতারণা করে চাকরির পদোন্নতি ঘটিয়ে আবার বাবাকে শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করেছো । কিন্তু এসব তথ্য জানলো কি করে? আমি সুরেন্দ্র ও নরেন ছাড়া আর তো কেউ জানে না। তাহলে কি ছেলের সাথে নরেনের যোগাযোগ হয়েছে! নরেন আমাকে না পাওয়ার বেদনায় হয়তো ছেলের কাছে সব ঘটনা বলে দিয়েছে। আমার সাজানো গোছানো সংসার টা আবার ভাঙতে চলেছে। যার জন্য দেশের মায়া ত্যাগ করে বহু দূরে এসে বাড়িঘর তৈরি করলাম। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের মুখ দেখবো না বলে।
 আবার ছেলের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। সুরেন্দ্র তো হুমকি দিয়ে রেখেছে ১৮ বছর পূর্ণ হলে সন্তানকে ছিনিয়ে নেবে। হয়তো সুরেন্দ্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমাদেরকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছেলে ও বাবার দেখা হয়ে যায়নি তো! আমাকে ভুল বুঝে সন্দেহ করার জন্যই তো, সুরেন্দ্র কে ত্যাগ করলাম। নরেনের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই, এই কথা ওকে বোঝাতে পারলাম না। আমি স্বীকার করছি তোমার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগে, নরেনের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কিন্তু কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হয়নি।

 বিশ্বাস নামক শব্দটি যখন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়, তখন সংসারের এক ছাদের তলায় বাস করা যায় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। সুরেন্দ্র সবসময় আমাকে সন্দেহের চোখে দেখতো এবং আমাকে কোন পুরুষের সাথে বা অফিসের পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা পর্যন্ত পছন্দ করত না। অফিসের পুরুষ সহকর্মীদের সন্দেহ করে কিন্তু তাদের মান সম্মান নষ্ট করতে। সুরেন্দ্রের বহু জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারে কিন্তু বাধ্য হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অন্তর থেকে এখনো ভালবাসি। 

আমারও তো একজন পুরুষের সাথে থাকার মন চায় এবং সামাজিক ভাবে একজন পুরুষ অভিভাবকের বিশেষ প্রয়োজন। স্বামী হিসেবে বট গাছের মতো ছায়া দান করে তার স্ত্রী কে বাঁচিয়ে রাখবে। বিবাহিত জীবনে পুরুষ অভিভাবক বিহীন সংসারে ও সমাজের বুকে কত রকম বাজে বাজে কথা শুনতে হয়। এই সমাজ ব্যবস্থা আমাকে বারবার পিছনের কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়। স্বামী নামক পুরুষটি আমাকে বহু পুরুষের সঙ্গ করি, পতিতা অপবাদ দিয়ে কলঙ্কিত করল। সুরেন্দ্র; অসভ্যর মতো বাজে কথাবার্তা বলতে শুরু করলো। কোন পুরুষ টাকা দিলেই নাকি, আমি সেই পুরুষের শয্যাশায়ী। খোলা বাজারের পতিতা হয়ে গেছি।

হে স্বামী নামক পুরুষ সুরেন্দ্র নিজের চরিত্র খানা একবার আয়নায় দেখেছেন। অফিসের প্রতিটা নারীকে তোমার যৌন লালসার শিকার হতে হয়েছে। আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার ভালো ভাবে জীবন যাপনের কোন সৎ ইচ্ছা নেই। মান-সম্মান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে নোংরা কাজগুলো করবে।

আমার মান-সম্মান, আভিজাত্য ও চাকরি কে বজায় রাখার জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। তোমার মুখ দেখবো না বলেই, রাগ করে স্থান পরিবর্তন করেছি কিন্তু অন্তর্জগতের মাঝে বারবার তোমার স্মৃতিগুলো ভেসে আসে।  
  
 হয়তো, তুমি স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের মধ্যে দিয়ে আরও না কত নারীর সর্বনাশ করে চলেছো। 

আমার যত বয়স বৃদ্ধি হচ্ছে, ততই নানা রকম ভাবনা এসে উপস্থিত হচ্ছে । আমাকে, ছেলে নলিনী বাবা বাবা করে পাগল করে দেবে কিন্তু বাবাকে এখন কোথা থেকে এনে দেবো! 

ছেলেটা, মায়ের কথা একবারও ভাবে না। কত কষ্টের মধ্যে দিয়ে লালন পালন করে বড় করেছি। মায়ের দুঃখ টা একবার বোঝার চেষ্টা করে না।

ছেলে কে বলেছি :- তোর জন্মদাতা পিতার স্বীকৃতি লাভের জন্য আমাকে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছিল।

ছেলে বলে কিনা; সেটা তোমার ভুল। উল্টে আমাকে প্রশ্ন করে; কেন জেনেশুনে আমাকে পৃথিবীতে এনেছে, বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করার জন্য! হয়তো বাবার সাথে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অন্যায় কাজ করেছ- যা বাবার একদম অপছন্দ।
যেমন বাপ তেমন ছেলে, অন্যের কথার কোন মূল্য নেই- নিজে যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করবে। কিন্তু একটাই সান্ত্বনা বাপের মত চরিত্রহীন ছেলে হয়নি।

মা মা বলে ছেলে দুখিরাম দরজায় ধাক্কা দেয়। নমিতার চিন্তার চমক ভাঙ্গে ছেলের ডাক শুনে।

দুখিরাম মায়ের পাশে এসে বসে কপালে হাত দিয়ে বলে :- মা, এখনও শুয়ে আছো! অসুখ-বিসুখ করেনি তো?

নমিতার ভাবনার জগতে ডুবে গিয়ে ভাবে :- ছেলের বাবা, লোকটা যতই খারাপ হোক না কেন! আমার এই ভাবে শুয়ে থাকা দেখলেই, অস্থির হয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ছেলেটা ঠিক , সেই রকম বাপের মতো।

দুখিরাম মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে বলল :- মা, তোমাকে তো কোনদিন কান্না করতে দেখিনি। কথা বলছ না কেন! তোমার কি হয়েছে? 

নমিতা ছেলে কে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। অজানা কোন আতঙ্কের ভয়ে। বাবা, আমাকে ছেড়ে কোনদিন চলে যাবে না তো!

 দুখিরাম বলে :- মা তুমি কি পাগল হয়ে গেছে! তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাব বলতো?

নমিতা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে :- আজ তাড়াতাড়ি চলে আসলি।

দুখিরাম বলে :- পার্কে, বয়স্ক এক বন্ধুর সাথে প্রতিদিন কথাবার্তা বলি কিন্তু আজ উক্ত বয়স্ক ব্যক্তি শরীরটা ভাল নেই বলে দেখা করে চলে গিয়েছে।
 জানো মা পার্কের ওই ভদ্রলোকের মনে অনেক দুঃখ, আমার মতো ছেলে নাকি হারিয়ে গিয়েছে আবার দেখতে ঠিক আমার বাবার মতো ।

 নমিতা চমকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে :- তোর বাবার মত কি করে বুঝলি! তুই তো বড় হয়ে বাবার ছবি পর্যন্ত দেখিসনি?

দুখিরাম বলে :- ওই সাত বছর বয়সের সময়, বাবা আমাকে অনেক আদর করতে-বাবার স্মৃতি আমার অন্তরের অন্তর স্থলে গেঁথে রেখেছিলাম, সেই হিসাবে বললাম। এই ভবঘুরে চালচুলোহীন মানুষটি আমার বাবা হতে যাবে কেন? আমার বাবা হবে মায়ের মত আভিজাত্যপূর্ণ ও অহংকারী।

 নমিতা বলে :- ওই ব্যক্তির নাম কিরে!

 দুখিরাম বলে :- ওই কী যেন বললে ভজহরি মান্না। বিকালের থেকে রাত অবধি পার্কে বসে থাকে। সব সময় কি যেন চিন্তা করে!

 নমিতা বলে :- ওই লোকটার চেহারার বর্ণনা দো তো।

 দুখিরাম বলে:- আমার বন্ধুর চেহারার বিবরণ শুনে তোমার কি লাভ?
 বললাম তো বাবার মতো চেহারা কিন্তু বাবা নয়। 

নলিনী মুখ কালো করে বলে :- ঠিক আছে বাদ দে, একদিন না হয়-গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসবো। 

দুখিরাম মায়ের সঙ্গে ইয়ার্কি করে বলে :- সেই ভালো হবে। যদি সত্যি সত্যি বাবা হয়ে যায়। 

নলিনী বলে :- বাজে কথা রেখে চল, খেতে যাবি।
 
 নলিনী বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকে। তাহলে ছদ্দবেশী সুরেন্দ্র নয়তো! হয়তোবা বলেছে আমি তোমার বাবা, না হলে সাত বছর বয়সের স্মৃতি মনে থাকার কথা নয়। হে ঈশ্বর আমার সুখের সংসার টা আবার ভেঙে যাবে।
 হয়তো ছেলের অধিকার সূত্রে আবার আমার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, সম্পত্তির ভাগ নিতে চাইবে। কি যে করি বারবার কোর্ট-কাচারি আর ভালো লাগেনা।
          ------------------------------------------

                    ।। ষষ্ঠ অধ্যায় ।।
দুখিরাম অর্থাৎ নলিনী দত্তের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়ে দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে অর্থাৎ ২০ বছরের যুবক। নমিতার চিন্তায় চিন্তায় ঘুম খাওয়া-দাওয়া হারাম হয়ে গেছে। কোন কিছুই আর ভালো লাগছে না। কোনো রকম কোনো শব্দ শুনতে পেলেই, চমকিত হয়ে উঠে ভাবে-ছেলেকে নেওয়ার জন্য
এই বুঝি সুরেন্দ্র এলো। 

সুরেন্দ্র এক রবিবারের দুপুর বেলায় সদর দরজায় দাঁড়িয়ে নমিতা নমিতা বলে ডাকতে ডাকতে কলিংবেলে চাপ দেয়। সুরেন্দ্র এতো জোরে চিৎকার করেছে, নমিতার দোতলার রান্না ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। নমিতা রান্নার দায়িত্ব কাজের মাসিকে দিয়ে দুরুদুরু বুকে ভয়ে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করে। নিচের তলার সদর দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ভাবে সুরেন্দ্রের সামনে যাওয়ার কোন মুখ নেই কিন্তু পা আর এগিয়ে যাচ্ছে না। 

দুখিরাম সদর দরজার গেট খুলে বন্ধু কে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে বাড়ীর মধ্যে নিয়ে আসতে আসতে চিৎকার করে বলে :- মা নিচের দিকে আসবে, আমার সেই বন্ধু এসেছে। বলেছিলাম না বাবার মতো দেখতে । দেখে যাও দেখে যাও।
সুরেন্দ্র ঘরের ভিতরে ঢুকতে গিয়ে নমিতার সাথে দেখা হয়ে যায়। নমিতা ভয়ে আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে।

দুখিরাম মায়ের হাত বলে :- দেখো দেখো মা, একদম বাবার মত দেখতে।

 সুরেন্দ্র বলে :- নলিনী; বাবার মত দেখতে নয়, তোমার জন্মদাতা বাবা সুরেন্দ্রনাথ দত্ত ও মা নমিতা দত্ত আর তুমি তাদের ভালবাসার ফসল নলিনী রঞ্জন দত্ত। নমিতা তাহলে পরিচয় করে দাও।

দুখিরাম বাবাকে জড়িয়ে ধরে বাবা বাবা বলে ডাকতে ডাকতে প্রশ্ন করে। বাবা দীর্ঘ কয়েক বছর আগে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে কিন্তু পরিচয় না দিয়ে, এতদিন বাবার স্নেহ ভালোবাসা থেকে কেন বঞ্চিত করে রেখেছেন?

 সুরেন্দ্র চোখের জল মুছে পকেট থেকে আদালতের রায়ের কাগজখানা বের করে, নলিনীর হাতে দিয়ে বলে :- বাবা, এতদিন তোমার মায়ের সাথে কথা বলার বা দেখা করার কোন অধিকার ছিল না। আদালতের নির্দেশ অনুসারে তোমার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে, তোমার মায়ের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে সন্তানের অধিকারের দাবি জানাতে পারব। নমিতা আমি আমার সন্তানকে নিতে এসেছি।

নমিতা চিৎকার করে উঠে বলে :- না, আমার সন্তানকে কাউকে দেব না। আমার একার অধিকার, আমি জন্ম দিয়েছি-লালন পালন করেছি। তুমি সন্তানের বাবা হয়ে ছেলের জন্য কি করেছো ! জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না।

নমিতা, সুরেন্দ্রর কাছে থেকে নলিনী কে জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলে :- বাবা, আমাকে ছেড়ে চলে যায় না, তাহলে আমি আর বাঁচবে না। এই ব্যক্তি তোর বাবা আমি স্বীকার করছি কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক নেই।

নলিনী মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে মায়ের বুকে মাথা রেখে ভাবে মনে মনে :- মা ও বাবাকে হারাতে চাই না। হে ঈশ্বর; তুমি নাকি পতিত পাবন হরি বিপদ ভঞ্জন কারি আমার এই জটিল সমস্যা থেকে উদ্ধার করো। আমার কর্তব্য নির্ধারণ করে দাও এবং বাবা মায়ের মনে শান্তি ফিরিয়ে দাও।

নমিতা উচ্চ কন্ঠে বলে :- নলিনী, তোর উড়ে এসে জুড়ে বসা বাবাকে বল একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।

সুরেন্দ্র বলে :- আমি রাজি।

দুজনে একটি রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
নমিতা বলে :- বলো, ছেলের বিনিময়ে তোমার কত টাকা চাই কিন্তু ছেলেকে ছেড়ে যেতে হবে।

সুরেন্দ্র বলে :- জানি তুমি কোটিপতি কিন্তু তোমার সর্বোচ্চ ধন সম্পত্তি ব্যাংকের টাকা, আমাকে দিলেও- আমি সন্তানকে বিক্রি করবে না। 

নমিতা বলে :- তাহলে, ছেলের নাম করে বার বার আমাকে প্রতারণা করবে।

সুরেন্দ্র বলে :- এখানে প্রতারণার কথা আসছে কেন! আমার ছেলে কে দিয়ে দাও। নিয়ে চলে যাবে আর কোন দিন তোমার সম্মুখে আসবে না।

নমিতা বলে :- আমার বুঝতে বাকি নেই, আমি তোমার চরিত্র সম্পর্কে তো জানি। আমার কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ভাগ নিতে চাও ! মুখে বলবে সততার কথা আবার অন্তরে বিষাক্ত বিষ ঢালবে।

সুরেন্দ্র পকেট থেকে ব্যাংকের পাসবুক বের করে নমিতার সামনে রেখে বলে :- আমি; তোমার টাকা সম্পত্তি ভাগ নিতে আসিনি, একমাত্র সন্তানের ভাগ নিতে এসেছি। বিবাহ বিচ্ছেদের পর আমাকে দয়া করে প্রতি মাসে দশ হাজার করে গত মাস পর্যন্ত ব্যাংক একাউন্টে টাকা জমা করেছো, দেখে নাও তোমার একটি টাকাও হাজার বিপদের সময়েও খরচ করি নাই। আমি অর্থলোভী ছিলাম কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের পর সব পরিবর্তন করতে শুরু করেছি। 

সন্তান কে যদি না দাও তাহলে এবার আমি আদালতের মাধ্যমে ছেলেকে নিয়ে যাবে। উকিলের সাথে কথাবার্তা হয়ে গিয়েছে। আমি যেমন ১৫ টি বছর স্ত্রী ও ছেলেকে হারিয়ে যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, সেই যন্ত্রণা আমিও তোমাকে সারা জীবন দিতে চাই।

নমিতা বলে :- নিশ্চয়ই তুমি বিয়ে করে সংসার করছো, তোমার সংসারে তো আরো সন্তান আছে। হাত জোড় করে বলছি আমাকে এই সন্তানকে দান করো। নলিনী ছাড়া আমি বাঁচতে পারবে না। তোমার পায়ে ধরে বলছি, আমাকে দয়া করে।

সুরেন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বলে :- তোমার নাটক অনেক দেখেছি আর আমাকে তোমার মায়া কান্নায় ভোলাতে পারবে না। স্বামী কে ত্যাগ করে, ঘটা করে শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পড়ে আছে। যেন সতী সাবিত্রী, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। আমি দ্বিতীয় কোনো সংসার করিনি, তাহলে আদালতে যায়। 

বলে চলা শুরু করে দরজার কাছে আসতেই, নমিতা হাত ধরে জোর করে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বলে :- রাগ করেছো কেন ? তোমার সন্তানকে তুমি নিয়ে যাবে, আমি বাঁধা দেওয়ার কে ! আমি এখনো তোমার মঙ্গল কামনা করে প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তোমার আগে যোনে শাঁখা সিঁদুর নিয়ে যেতে পারি। আমার উপর রাগ করে, পাঠানো টাকা ছুঁয়ে দেখোনি-তাতে আমার কোন দুঃখ কষ্ট নেই।

নমিতা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আকাশ পাতাল ভাবনা চিন্তা করে বলে :- নলিনী বাবা, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে, আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে নিলে হয় না। আমরা আগের মতো আবার মিলিত করতে পারিনা। ভুল মানুষ মাত্রই করে কিন্তু আদালত কি সঠিক বিচার করতে পারে! আমরা দুজনেই ভুল সাজা পেয়েছি। কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে সন্তানকে কেড়ে নিয়ে নতুন করে আবার আমাকে আর সাজা দিওনা।

সুরেন্দ্র বলে :- তা কি করে সম্ভব! দুই জন দুই মন মানসিকতার মানুষ।

নমিতা বলে :- সব সম্ভব গো, শুধু মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আইন আদালত তো মানুষের জন্য কিন্তু সঠিক সমাধান নিজেদের করে নিতে হয়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া জীবনের বিগত ১৫ বছর আর কোন ফিরে আসবে না। তোমার দুর্ব্যবহার ও আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্যই কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে তোমার সঙ্গ ত্যাগ করেছি। মনের থেকে কোনদিন ত্যাগ করতে পারিনি কারণ তুমি সন্তানের বাবা। তাই আজও তোমার দেওয়া শাঁখা-সিঁদুর পরে তোমার নামেই পরিচিত হয়ে আছি। স্বামীর নামটা বাদ দিতে পারিনি। এই বাড়ি ঘর সম্পত্তি যা কিছু করেছি, সবকিছুই আমার পাশাপাশি তোমাকেও তো রেখেছি কারণ তোমার সাথে আমার সম্পর্ক না থাকলেও অন্তর থেকে আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমার উপরের উগ্র রূপ দেখেছো কিন্তু ভালোবেসে কোনদিন অন্তরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছ! আমার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গায় তুমি থাকলে- নিশ্চয়ই তুমিও আমার মত ব্যবহার করতে। আমিতো আমার নারীত্বের অস্তিত্ব বজায় রাখার লড়াই করেছিলাম। যে নারী কুমারী অবস্থায় সন্তান জন্ম দেয়, সমাজে তার স্থান কোথায়?

সুরেন্দ্র চুপচাপ থেকে ভাবতে শুরু করে।

নমিতা; সুরেন্দ্রের পায়ের কাছে বসে পড়ে আর চোখের জলে পা ধৌত করতে করতে বলে :- নলিনীর বাবা, আর যে জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিনা-আমাকে ক্ষমা করে দাও। সন্তানকে তো আর কেটে টুকরো করা যায় না। একটি সন্তানকে নিয়ে আমরা দুজন আবার মিলিত হই। তুমি যেভাবে বলবে, আমি ঠিক সেই ভাবে চলবে। আমি উপলব্ধি করেছি ,সংসারে পুরুষ অভিভাবক বিহীন ভাবে চলাফেরা করা ও স্বামী জীবিত থাকাকালীন সমাজের বুকে ভীষণভাবে বিপদজনক। পুরুষের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও, সম্পূর্ণ দোষ নারীর চরিত্রের উপর পড়ে। বাস্তবে কেউ বুঝতে চায় না। সংসারের মাঝে যত দোষ নারী কিন্তু পুরুষ মানুষের কোনো দোষ নেই।
 
সুরেন্দ্র; নমিতা কে পায়ের কাছে থেকে তুলে জড়িয়ে ধরে বলে :- তুমি; আমাকে ক্ষমা করে দাও। তোমার প্রতি ভীষণ ভাবে অন্যায় করেছি। নমিতা স্বামী কে জড়িয়ে ধরে।

হঠাৎ দরজার কাছে থেকে আওয়াজ আসে। আরো সুরেন্দ্র বাবু মান অভিমানের পালা শেষ করুন। নাটকের নতুন প্রজন্মের নতুন পালা শুরু হবে।
 
নমিতা তাড়াহুড়ো করে স্বামীর আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বলে :- আরো মহেন্দ্র বাবু আপনি ।

মহেন্দ্র বাবু রুমের মধ্যে ঢুকে সোজা সুরেন্দ্রের কাছে গিয়ে ঘাড়ে হাত রেখে বলে :- আরে মশাই, এখন ছেলেমেয়েরা মান-অভিমানের পালা করবে- তা, না আপনাদের মান-অভিমানের পালা ভাঙানোর জন্য কিন্তু ছেলে-বৌমার দরকার হয়ে পড়েছে। নমিতার উদ্দেশ্য করে বলে বিয়ান তাড়াতাড়ি বরণডালা সাজিয়ে নিয়ে আসুন। একসাথে আজ দুটো বিয়ে দিয়ে ছাড়বো। আমার নাম মহেন্দ্রনাথ শান্তি ঘটক কিন্তু অশান্তি একদম পছন্দ করি না। মা বাসন্তী এদিকে আয় তো।

 বাসন্তী তার মায়ের সাথে করে রুমের ভিতরে ঢুকে সুরেন্দ্র ও নমিতা কে প্রণাম করে।

 মহেন্দ্র বাবু; সুরেন্দ্রের উদ্দেশ্যে বলে :- মশাই, আপনার ছেলে আর আমার মেয়ে ৫ বছর ধরে ভালোবাসা করছে, অঘটন ঘটার আগেই চার হাত এক করে দিতে চাই। 

নমিতা, সুরেন্দ্রের কাছে এসে কানে কানে বলে :- কি করবে গো ?

সুরেন্দ্র কানে কানে বলে :- আমি, সব জানি কিন্তু তোমার মতো অঘটন ঘটায়নি । ছেলে কার দেখতে হবে তো । নলিনী নলিনী বলে ডাকতে থাকে।

নলিনী রুমের মধ্যে ঢুকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ে। সুরেন্দ্র; নলিনী ও বাসন্তী কে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে চার হাত এক করে দেয়। সেই মুহূর্তে শঙ্খধ্বনি ও উলুর ধ্বনি বেজে ওঠে। 

নমিতা বৌমার কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে :- তোমার শ্বশুর বাবা কে, এবার আমরা দুজন মিলে এমন ভাবে বেঁধে রাখবে-পালানোর পথ খুঁজে না পায়। 

সুরেন্দ্র বৌমার উদ্দেশ্য বলে :- বৌমা, আমিতো সংসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাই। তোমার শাশুড়ি তো কোনদিন পারিনি, তবে তোমার মেয়ে এসে যদি পারে। 

কাজের মাসি তালা ভরে মিষ্টি নিয়ে এসে বলে :- তাহলে হারানো জামাইবাবু কে দিয়ে শুরু করি।

মহেন্দ্র বাবু মিষ্টি মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলে :- আমার মেয়ের বিয়েতে ও বিয়ান নমিতা বিয়াই সুরেন্দ্রের পুনরায় মিলন উপলক্ষে সবার সপরিবারে নেমন্তন্ন রইল, আসবেন কিন্তু।
----------------------------------------------------------
রচনাকাল :- ২৮ নভেম্বর ২৯২১ সালে।  
স্থান :- দত্তপুলিয়া যুব গোষ্ঠী ক্লাবের রুমে, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
----------------------------------------------------------
                      ।। সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------


সন্তানহীনা নারীর লাঞ্ছনা। লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস।

                 সন্তানহীনা নারীর লাঞ্ছনা।
        লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
         শ্রেণী :- উপন্যাস।

                  ।। উপন্যাস প্রসঙ্গে ।।
 লেখক শংকর হালদার শৈলবালা তার দ্বিতীয় উপন্যাস "নিঃসন্তানের জ্বালা" নাম দিয়ে লেখা শুরু করেন। 14 জানুয়ারি 2018 থেকে 26 ডিসেম্বর 2018 খ্রিস্টাব্দে শেষ করেন। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় সংশোধনের সময় উপন্যাসের নাম পরিবর্তন করে "সন্তানহীনা নারীর লাঞ্ছনা" নাম রাখেন। তৃতীয় বার সংশোধনের তারিখ ২২ আগস্ট ২২ থেকে ১৩ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত।

 বধু নির্যাতনের বাস্তব সামাজিক কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাসটি তৈরি হয়েছে। একজন বেকার স্বামীর জন্য উক্ত বধুকে পরিবারের বিভিন্ন ভাবে অপমানিত লাঞ্ছিত ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। স্বামীর প্রতিষ্ঠার জন্য তার স্ত্রীর লড়াই করতে গিয়ে তার জীবন সংশয় হয়ে ওঠে।

 সমাজের অন্তরালের চার দেওয়ালের মধ্যে অনেক পারিবারিক অঘটন ঘটে থাকে কিন্তু সব সময় মানুষের সামনে প্রকাশ্যে আসে না। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের কোন মূল্যায়ন করা হয় না। একজন অসহায় নারী কিভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি করে স্বনির্ভর এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

 একজন নারীর সুখের সংসারের মাঝে অন্য আরেকজন নারী আবির্ভূত হয়ে উক্ত নারীর কাছে থেকে তার স্বামীকে কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত। স্বামী নামক পুরুষ কে ত্যাগ করে সতী নারীর মহিমা।
 
 শংকর হালদার শৈলবালার সমস্ত লেখাগুলো "প্রতিলিপি" আন্তর্জাতিক বৃহত্তম প্রকাশনা সংস্থা। বিভিন্ন ভাষায় এখানে লেখকেরা তাদের সাহিত্য চর্চা করে থাকেন। অনলাইন প্রতিলিপি অ্যাপসের মাধ্যমে তার লেখা গুলো প্রকাশিত হয়ে চলেছে। প্রতিলিপি অনলাইনে তার পাঠক সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের উপর ছাড়িয়ে গিয়েছে।

প্রতিলিপি সংস্থার বাংলা ভাষার বিভাগ থেকে বাংলা সাহিত্যের উপর শংকর হালদার শৈলবালা কে মে মাসের ২০২২ সালে "গোল্ডেন ব্যাচ" উপাধিতে ভূষিত করে সম্মানিত গোল্ডেন ব্যাচ সার্টিফিকেট ও তাদের সংস্থার লোগো স্বর্ণ পদক দিয়ে সম্মান জানিয়েছে।

                          ডাক্তার নরেন্দ্র নাথ নস্কর।
                              ২৫/১০/২০২২

----------------------------------------------------------------
        ।। সন্তানহীনা নারীর লাঞ্ছনা।।
   লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
-------------------------------------------------------------------
         ।। উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------------------
সোনালী ও ভবানন্দের দীর্ঘদিন বিবাহিত জীবনে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তির কোন আর্বিভাব না ঘটার কারণে সন্তান সুখের বদলে দুঃখের সাগরে দুজনে ভীষণ ভাবে জর্জরিত। তার উপর পারিবারিক সদস্যদের ও সামাজিক বিভিন্ন ভাবে অন্যায় এবং অত্যাচার।

সোনালী তার বেকার স্বামীর পাশে 
শুয়ে ভাবে :- এই পরিবারের শ্বশুর-শাশুড়ি সহ বিশেষ করে বড় ভাসুর আর তার বউ কোন দিন চাইনা আমার সন্তান হোক। কারণ তাদের কিশোর পঙ্গু ছেলে পৈত্রিক সব সম্পত্তির মালিক হবে।

তারপর আমরা দুজন হলাম সংসারের বাড়তি বোঝা কিন্তু আমাদের এই সংসারে কেউ দায়িত্ব নিতে চাই না। বেকার স্বামীর অনুরোধ শুনতে শুনতে দীর্ঘ কয়েক বছর চলে গিয়েছে কিন্তু স্বামী কর্মহীন হয়ে থাকার জন্য আর বাচ্চা নেওয়া হয়নি।   

বর্তমান জন্মনিয়ন্ত্রণের কোন পদ্ধতি বা ঔষধ ব্যবহার না করেও কিন্তু বাচ্চা পেটে আসার কোন লক্ষণ নেই।
   
কয়েকদিন ধরে দুজনের মধ্যে সন্তান 
জন্ম দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে। একদিন সকাল নয়টার সময় তার স্বামী শহরের এক নামকরা মহিলা ডাক্তারের নিকট নিয়ে আসে। 

সোনালী ডাক্তার দেখিয়ে দুপুর দুটো নাগাদ একাই বাড়ির উঠানে পা রাখে। সেই মুহূর্তে বাড়ির বড় বউ সুনন্দা ক্ষপা কুকুরের মতো সোনালীর সামনে ছুটে আসে। 

সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে অশ্লীল ভাষায়
 খিস্তি দিতে দিতে বলে :- আরো বাজা মাগি; ঘুম থেকে উঠে তোর মুখ দেখলে সবার অমঙ্গল হয়। এই জন্মে আর সন্তানের মুখ দেখতে হবে না। বেকার স্বামীর বউ হয়ে আবার সন্তানের মা হওয়ার ইচ্ছা। তোরা দুজনে বড় দাদার দয়ায় খেতে পড়তে পাস আবার সন্তানের দায়িত্ব কে পালন করবে। 

সোনালী বলে :- দিদি; সন্তানের মুখ 
দেখতে কোন নারীর না ইচ্ছা হয়।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- ঘটা করে আবার  
ডাক্তার দেখিয়ে অনেক গুলো টাকার শ্রাদ্ধ করে আসলি। সংসারের খরচ কি তোর বাপ ভাই দিয়ে যায়! তা রাজকুমারী আপনার বর রাজকুমার কোথায়?

সোনালী বলে :- দিদি, আমাকে যা 
বলার বলুন কিন্তু বাবা-মা ভাই-বোন কে টেনে নিয়ে আসবেন না। তাঁরা এক মুঠো খাবারের জন্য এই বাড়িতে পড়ে থাকে না। কথাবার্তা সংযতভাবে বলবেন।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- না হলে কি 
করবি! ভিখারির বাচ্চা আবার বড় বড় কথা। এই সংসারের জন্য কি করেছে তোর বাপ ভাই -----------?

সোনালী বলে :- গরীব বাবা মায়ের 
সাধ্যমত যতটুকু পারেন তাই করে চলেছেন। আমার বাপের দেওয়া জিনিস তো এই পরিবারের সদস্যদের পছন্দ হয় না।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- পছন্দের মতো 
দামি দামি জিনিসপত্র দিলে অবশ্যই সবার পছন্দ হবে।  
আমার বাবা-মা মাঝে মাঝে টাকা ও জিনিসপত্র সহ কত কিছু দিয়ে যায়। আর তোর বাবা-মা কিন্তু মেয়ে বিয়ে দিয়ে বনবাসে রেখে গিয়েছে। বছরের মধ্যে একদিন খোঁজখবর নিতে আসে না।

সোনালী বলে :- দিদি, ভালো হচ্ছে না 
কিন্তু । বাবা-মা কে বহুবার এই বাড়ি থেকে অপমানিত হয়ে চলে যেতে হয়েছে। এই পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকে নিম্নতম আত্মীয়ের সম্মান পর্যন্ত দেখানো হয় না। 
বাবা মায়ের নিয়ে আসা জিনিসপত্র তাদের সামনে ছুয়ে ফেলে দিয়ে বার বার অপমান করা হয়েছে।

সুনন্দা বলে :- তোর, খায় না পড়ি যে 
তোর ভয়ে কথা বলবো না। যার স্বামীর এক পয়সা আয় রোজগার করার মুরোদ নেই তার বউয়ের আবার বড় বড় কথা। তোদের দুজনের দাদা বৌদির ঘাড়ে বসে বসে খেতে লজ্জা করে না।

সোনালী বলে :- তা আপনার দেবর কে 
ধনী বাপ দেখে বিয়ে দিতে পারেনি। গরীব ঘরের মেয়ে নিয়ে আসার কোন দরকার ছিল না।
আমাকে তো ঝিয়ের মতো খাটিয়ে তারপর খেতে দাও। তোমার দেবর কে বলে আয় রোজগার করতে। যত গরম আমার উপর।

বড় বউ সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে বলে :- 
বাড়ির কাজের ঝি কিন্তু ঝিয়ের মতো থাকবি। অনেক কাজ পড়ে আছে তাড়াতাড়ি করে ফেল। 
আর সন্তান জন্ম দিয়ে বাড়ির ভালো বউ হওয়া চেষ্টা কখনো করিস না। আমি চাইনা তোর সন্তান হোক। আমার কথা অমান্য করে সন্তান ধারণ করলে কিন্তু পেটে এক লাথি মেরে গর্ভপাত করে দেবে। কথাগুলো মনে থাকে যেন।

সোনালী বলে :- দিদি, কথাগুলো 
অবশ্যই মনে থাকবে। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে কিন্তু কিছু খেতে দাও, কাল রাতে তো রান্নাঘরে কিছু খাবার ছিল না।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- ভিখারির মতো 
বাজারে গিয়েছে কিন্তু তোর বর কিছু কিনে খেতে দেয়নি! আর দেবে কোথা থেকে দাদা বৌদির কাছে হাত না পাতলে টাকা পাওয়া যাবে না।

সোনালী বলে :- তাড়াতাড়ি বাড়িতে 
আসবো বলে কিছু খাওয়া দাওয়া 
হয়নি।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- বেকার স্বামী 
আর আর কি খেতে দেবে! বউ সাথে করে বাজারে গেলে টাকা লাগে কিন্তু ডাক্তার দেখানোর টাকা কোথায় পেলি। সংসারের থেকে চুরি করিসনি তো?

খিদের জ্বালায় ছটফট করতে করতে 
করুণ কন্ঠে সোনালী বলে :- দিদি; খাবার দাও না।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- মেয়ে মানুষ হয়ে 
সব সময় খাওয়া খাওয়া করিস কেন! যার স্বামী বেকার তার বৌয়ের খিদে নিবারণ করে চলতে হয়। কল থেকে জল পান করে নে, তাহলে পেট ভরে যাবে।

সোনালী বলে :- কিছু খেতে দাও না 
পেট জ্বলে যাচ্ছে। 

বড় বউ সুনন্দা খিস্তি দিতে দিতে বলে :- 
বাপের বাড়িতে কি কিছু খাওনি, শ্বশুরবাড়িতে এসে বেশি খিদে পেয়ে গিয়েছে। 

সোনালী বলে :- যা বলার বলে কিন্তু 
এখন দুটো খেতে দাও।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- খেতে বসলে তো 
কম করে খাবি না, দুই থেকে তিন জনের খাবার একাই খেয়ে ফেলে। তোর পেটে কি রাক্ষস আছে! কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি কাজগুলো শেষ কর তারপর দেখা যাবে। বাড়ির ঝি চাকর গুলো নিয়ে সমস্যার অন্ত নেই।

সোনালী বলে :- আমাকে, এরকম 
খাওয়ার খোটা দিয়ে অপবাদ দেবে না। যা ভাত মেপে দাও তাতে কোন দিন পেট ভরে না। আবার বড় বড় কথা বলছে।

সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার 
চেঁচামেচি করে সোনালী কে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিতে দিতে বারান্দা দিয়ে তার থাকার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।  

সোনালী উঠানে আম গাছের নিচে 
দাঁড়িয়ে ভাবে মনে মনে :- বিধাতা আমার কপালে আর না কত দুঃখ লিখে রেখেছে কিন্তু এই যমের বাড়ি থেকে কত দিনে নিস্তার পাবে। তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন।

শ্বাশুড়ি মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পান 
চিবোতে চিবোতে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়ে বলেন :- ডাক্তার দেখাতে কত সময় লাগে। আমার তো ডাক্তার কবিরাজ কোন কিছু দরকার হয়নি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সন্তানের জন্ম দিয়েছিলাম কিন্তু মরে ধরে এখান দুই নিধি বেঁচে আছে। আসলে মাগি তুই বাজা কিন্তু আমার ছেলে একদম ঠিক আছে।  

সোনালী ভাবে মনে মনে :- এই সংসারে 
বিনা টাকায় ঝিয়ের কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়লে কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা করে না। হাজার কাজ করা সত্বেও কাহারো মন পাওয়া যায় না। যেমন শ্বশুর-শাশুড়ি তেমন বড় বউ কিন্তু ভাগ্য ভালো এই সংসারে ননদ নেই।

শ্বাশুড়ি মা বলে :- কাজে ফাঁকি 
দেওয়ার জন্য বাড়িতে দেরী করে আসা কিন্তু বাড়ির কাজের ঝি সে সুযোগ কোন দিন পাবে না।

সোনালী ভাবে মনে মনে :- ভাসুর 
ঠাকুর সব সময় নিরপেক্ষ থেকে খলনায়কের ভূমিকা পালন করে চলেছে। 

শ্বাশুড়ি মা বলে :- যতই ফাঁকি দাও না 
কেন! সব কাজ তোকেই করতে হবে। 

সোনালী বলে :- মা; কিছু খেতে দাও।

শ্বাশুড়ি মা বলে :- কাজ শেষ কর তারপর দেখছি।

সোনালী বহু কিছু ভাবতে থাকে। এই 
সংসারের মানুষগুলো আমার জন্য রেখে দেওয়া কাজগুলো শেষ না করলে কিন্তু আজ আমার কপালে খাওয়া জুটবে না। কাজ যখন করতেই হবে তখন আর দেরী না করে ঘরে গিয়ে কাপড় পরিবর্তন করে আসি। 

বাড়ির ছোট বউ হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু 
পাকা বাড়িতে বসবাসের কোন অধিকার নেই। পাশে থাকা কাঠের বেড়া দেওয়া আর উপরে টিনের চালের ঘরের মধ্যে সোনালী ঢুকে পড়ে। 

কাঠের ফার্নিচার ব্যবসাহি শ্বশুরের বৌমা হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু ঘরের মধ্যে কাপড় রাখার আলনা না থাকার কারণে দড়িতে রাখা কাপড় হাত বাড়িয়ে নিয়ে পরিবর্তন করতে থাকে। 

সোনালী কলপারে গিয়ে তার জন্য রেখে দেওয়া বাড়ির সমস্ত এঁটো থালা বাসন ও একরাশ কাপড় দেখে চমকে উঠে।

 তারপর কপালে হাত দিয়ে করাঘাত করতে ভাবে ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে এতগুলো থালা বাসন ও কাপড় গুলো পরিষ্কার করতে হবে। এই পরিবারের মানুষদের মনে একটুও দয়া মায়া বলতে কিছুই নাই।

বড় বউ সুনন্দা আবার কলপারে 
নজরদারি করতে আসে। সোনালী কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিন্তু তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে আর হাত-পা নেড়ে ঝংকার দিয়ে নাচতে নাচতে আবার সোনালী কে খিস্তি দিতে দিতে ঘরে চলে যায়।

সোনালী ভাবে মনে :- আমার আর 
বুঝতে বাকি নেই কারণ আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বড় বউ ও শাশুড়ি মিলে পরিকল্পিত ভাবে অপ্রয়োজনীয়' থালা-বাসন ও কাপড় গুলো কলপারে রেখে দিয়েছে। 

হে ঈশ্বর তুমি কি এই পরিবারের সদস্যদের অত্যাচার নির্যাতন চালানো কিছুই দেখতে পাও না। তোমাকে রাতদিন ডেকে চলেছি কিন্তু তুমি কি আমার ডাক শুনতে পাও না! চোখের জল ঝরাতে ঝরাতে অন্তরের মাঝে ভাবে হে ঈশ্বর যত দুঃখ দাও না কেন কিন্তু সহিবার শক্তি দিয়ে। 

চৈত্র মাসের দাবানলে চারিদিকে মাঠ 
ঘাট শুকিয়ে জলের জন্য হাহাকার করে চলেছে। গাছের পাতা নড়ছে না আবার হাওয়া বাতাসের কোন লক্ষণ নেই। আবার কলপারের টক আম গাছটি সাত মাস আগে কেটে দিয়েছে। এখন চৈত্র মাসের উত্তপ্ত কড়া রৌদ্র সোনালীর মাথার উপর।
    
সোনালী এক গাদা বাসনের দিকে 
তাকিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভাবে মনে :- ফেলে দেওয়া পরিত্যক্ত খাবার গুলো সংগ্রহ করে নিয়ে কিন্তু খেয়ে জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। 
হয়তো কুকুর বিড়াল খেয়েছে কিন্তু পেটের জ্বালা কিন্তু সব থেকে বড় জ্বালা।

একজন পাগলের কিন্তু খিদে তৃষ্ণা আছে। খিদের জ্বালায় ময়লা আবর্জনার মধ্যে থেকে খাবার নিয়ে খেতে শুরু করে।

পরিত্যক্ত খাবার গুলো সংগ্রহ করতে করতে সোনালী ভাবে মনে, পরিবারের বড় বৌ আমার সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে বার বার বাঁধা সৃষ্টি করছে কেন! 

তাহলে শ্বশুর মশাইয়ের সব সম্পত্তি বড় 
বউ একা ভোগ দখল করতে চায়। এই সংসারে আসার পর দেখতে পেয়েছি, বড় বউ ও ভাসুর সব কিছু দুই জনের আয়ত্তের মধ্যে রেখেছে। 

আবার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি কে যন্ত্রচালিত পুতুলের মত বানিয়ে রেখেছে। যখন যেমন ইচ্ছা সুইচ টিপে ব্যবহার করে নেয় কিন্তু শ্বশুর-শ্বাশুড়ির নিজস্ব কোন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নেই।

দেহের লজ্জা নিবারণ করার জন্য বড় বউয়ের কাছে ভিখারীর মতো হাত পেতে কাপড়চোপড় চাইতে হয় কিন্তু দেবে সেই ব্যবহার করা পুরনো কাপড় চোপড়।

হয়তো এই জীবনে কোনদিন শান্তিতে বসবাস করতে করতে পারবো না। এই সংসারে আমার নিজের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। বর্বর যুগের মতো দাসী কিনে বাড়িতে রাখার মতো অবস্থা।

দিন রাত শুধু পরিশ্রম করে যাও। শরীর পুষ্টি হীনতায় ভুগতে ভুগতে কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে রাতের দৈহিক মিলনের ইচ্ছা একদম থাকে না। 

তবুও স্বামী কে খুশি রাখার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও কষ্টদায়ক হলেও কিন্তু বাধ্য হয়ে কলের পুতুলের মত থাকতে হয়।

বিপদগ্রস্ত নারীদের যে কত রকম সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগী নারীরা জানে।

আমাকে কিন্তু বাড়ির একজন বউয়ের সম্মান কেউই দেয় না। বড় বউ আমাকে বাপের বাড়ি পর্যন্ত যেতে দেয় না কারণ আমি হলাম এই বাড়ীর কাজের ঝি কিন্তু কাজের বিনিময়ে খাওয়া দাওয়া কোন রকম ভাবে পাওয়া যাচ্ছে।

যার স্বামী কর্ম ক্ষমতা থাকা সত্বেও কর্মহীন হয়ে থাকে, তার বউয়ের কপালে সুখ থাকে। এমণ দয়া মায়া হীন নিষ্ঠুর পরিবারের সদস্যরা, প্রচন্ড খিদে জানানোর পরও কিছু খেতে দিলে না।

এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দ্রুত সংগৃহীত খাবার গুলো একটি থালায় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। দরজা আটকিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো খেতে খেতে ভাবে যদি শ্বাশুড়ি চন্দ্রা ও বড় বউ সুনন্দা দেখে ফেলে, তা হলে কিন্তু অকারনে রামায়ণের হনুমানের লেজে আগুন ধরানোর মত এই বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড শুরু করে দেবে।

প্রায় খাওয়া শেষ এমন সময়ে শ্বাশুড়ি চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে জলে কলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

শ্বাশুড়ির আসার আওয়াজ শুনে সোনালী দ্রুত খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে থালা বাসনের নিকটে এসে চলে আসে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ব্যস্ততা দেখাতে থাকে। 

বাসন মাজতে মাজতে ভাবে মনে :- 
একটু জল পান করার সময় নেই কিন্তু সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। নবাবের নাতি অকর্মার ঢেঁকি স্বামী ডাক্তারখানা থেকে আসার সময় গ্রামের মধ্যে এসে কিন্তু আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে তিনি কোথায় আড্ডা করে বেড়াচ্ছে।

হেলতে দুলতে শ্বাশুড়ি চন্দ্রা সোনালীর 
সামনে এসে দাড়িয়ে বলে :- এই সামান্য কাজগুলো করে উঠতে পারিনি! বাসন গুলো জোরে জোরে মাজতে গাঁ গতরে ব্যথা লাগছে। আরো শরীরটা কে একটু নড়াচড়া কর।

সোনালী বলে :- মা; ভীষণ ক্ষুধা 
পেয়েছে কিছু খেতে দেন।

শাশুড়ি চন্দ্রা বলে :- বড় বউ বলছে 
কাজগুলো শেষ করার পর খাবার মিলবে। তাড়াতাড়ি কাজ গুলো করে খাওয়া-দাওয়া কর তারপর রাতে তোর আবার রান্নাঘরে ঢুকতে হবে। গ্যাস ব্যবহার করবে না কিন্তু কাঠের জ্বালানি দিয়ে রান্না করতে হবে।

সোনালী ভাবে মনে :- শাশুড়ি না 
ডাইনি! সবাই মিলে দেহের রক্ত চুষে চুষে শেষ করে দেবে। বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে আসলাম সেই সময়ে কত স্বাস্থ্যবান ছিলাম। 

এখন খাটতে খাটতে রোগা পাতলা পাটকাঠির মতো হয়ে পড়েছি। শরীর দুর্বল কিন্তু ঔষধের ব্যবস্থা নেই কিন্তু যখন বিছানায় পড়ে যাবে তখন বাবা-মায়ের ডাক পড়বে। বাবা মা বাধ্য হয়ে মেয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এত কিছু করার পর আবার বদনাম শুনতে হয়।

শাশুড়ি চন্দ্রা নিজের মনেই বকতে 
বকতে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। 

সোনালী ভাবে মনে :- এই সুযোগে পেট 
ভরে জল পান করে নেওয়া যাক কিন্তু এই কাজ গুলো কখন যে শেষ হবে, তা জানে একমাত্র ঈশ্বর। ভাত খেতে খেতে সেই সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে। রাতের খাবার হয়তো আর জুটবে না।

-------------------------------------------------------------------
                       ।। দ্বিতীয় অধ্যায় ।।         
-------------------------------------------------------------------
সোনালী রাতে বিছানায় শুয়ে স্বপ্নের ভেলায় চড়ে অতীতের স্মৃতিগুলো স্মরণ করতে থাকে। 
ধনী ও গরিবের বিয়েতে কখনোই সমযোজ্যপূর্ণ হয় না।

আমার বাবা গরিব বলে এই বাড়ির 
লোকেদের কাছ থেকে কতনা লাঞ্ছনা গঞ্জনা ও অপমান নিরবে সহ্য করতে হয়। বাবা তার সাধ্য অনুসারে এই পরিবারের জন্য যথেষ্ট করেন কিন্তু এই পরিবারের সদস্যদের চাহিদার কোন শেষ নেই।

বেকার যুবক তারপর পিতা-মাতার কথায় উঠাবসা করা ছেলে আর কত ভালো হবে। স্বামীর নিজের কোন স্বাধীনতা নেই আর তার বউয়ের স্বাধীনতা থাকে কি করে!  

আমার বাল্য বান্ধবী মাধুরীর বাবা 
আমাদের থেকেও অনেক গরিব ছিল। মেয়ে কে বিয়ে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক ভালো পরিস্থিতি ছিল না। এলাকার শ্রীমা মহিলা সমিতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অনুদানের টাকায় পাকা ঘর দিয়ে ছিল কিন্তু সামনে বড় গর্ত থাকার কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই ফাটল ধরে। মাধুরীর বাবা সেই ফাটল মেরামত করার মতো টাকা কুড়ি বছর ধরে জোগাড় করতে পারেনি। কিন্তু ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে উচ্চশিক্ষিত করেছেন।

তার একমাত্র ছেলে বর্তমান একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে মাসিক দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে। আমার আগেই মাধুরীর এক ধনী পরিবারের কর্মঠ এক যুবকের সাথে বিয়ে ঠিক হয়।

ধনী হলেই হবে না তাদের মধ্যে মন মানসিকতা, মনুষ্যত্ব ও মানবতাবোধ থাকা অবশ্যই দরকার।

বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যাওয়ার পর 
মাধুরীর শশুর তার বাবা কে বলেন :- মনের মিলের মাধ্যমে আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। বিয়াই মশাই আপনি কিন্তু এখন আমার পরম আত্মীয়। আমি পণ প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে থাকি।

মাধুরীর বাবা বলে :- শুনে ভীষণ খুশি 
হলাম আবার ভীষণ ভাবে অন্তরে শান্তি অনুভব করলাম কিন্তু আমি তো মেয়ের বাবা। 
বিয়াই মশাই আমার কর্তব্য বলে কিছু কাজ করতে হবে।

মাধুরীর শ্বশুর মশাই বলেন :- আরো 
মশাই; ছেলে মেয়েদের কে গরু ছাগলের মত কেনা বেচায় কিন্তু আমি বিশ্বাসী নয়। আমাদের কোন চাহিদা নেই। ঈশ্বর আমাকে ধন সম্পত্তি টাকা পয়সা ও সামাজিক সম্মান বহু দিয়েছেন।

মাধুরীর বাবা বলেন :- মেয়েকে তো 
আর এক কাপড় পরিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে পারি না। আপনার সামাজিক মান সম্মান রক্ষা করা কিন্তু আমার অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করি।

মাধুরীর শশুর বলেন :- বিয়াই মশাই; 
 মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে এমন কোন অতিরিক্ত খরচ করবেন না, যাতে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়তে হয়।

 আপনার পরিস্থিতি অনুসারে যতটুকু সামর্থ্য কুলায় কতটুকু করবে। যদি অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রয়োজন হয় লজ্জা না করে কিন্তু অবশ্যই বলতে পারেন।

 আমার মেজ বৌমা কে আমার পরিবারের সদস্যরা কিন্তু বাড়ি থেকে শাড়ি ও গয়না যা কিছু দরকার সব কিছু নিয়ে এসে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাবে। আপনি এই সব নিয়ে কখনো চিন্তা ভাবনা করতে হবে না।

১০ জনের সাহায্য নিয়েই মাধুরীর বিয়ে 
হয়। মাধুরীর দাদার মুসলিম মালিক জামাল সাহেব এক লাখ টাকা বিয়ের খরচের জন্য দান করেন।

বিয়ের দিন সকালে কয়েক লাখ টাকা গয়না নিয়ে ছেলের বাড়ির লোকজন আসে। ছেলে পক্ষের বাড়ির বড় বউ মাধুরী কে শাড়ি গয়না দিয়ে সাজিয়ে রাজরানী করে তোলে।

আর আমার বিয়ের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম 
সোনার গয়না ও নগদ টাকা সহ বহু কিছু দেওয়ার পরও কিন্তু স্বামীর পরিবারের সদস্যদের কাছে মন পাওয়া যায় না। একেই বলে নারীর কপাল।   

সেই মাধুরী এখন স্বামী, শশুর-শাশুড়ি ও দেবর কে নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করছে এবং একটি চার বছরের কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। 

আর আমি সারাদিন পরিশ্রম করে 
যাচ্ছি তবুও কিন্তু এই পরিবারের সদস্যরা আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেয় না। আমার অসুখ বিসুখ হলে বাবার বাড়িতে টাকা এনে চিকিৎসা করতে হয়।

আর মাধুরীর সুখের সংসারের মাঝে থেকে তার স্বামী রবি তার শ্বশুরের মাঝে মধ্যে টাকা দিয়ে সাহায্য করে থাকে। 

অপরূপ সুন্দরী মাধুরীর কপালে কালো 
স্বামী বলে কতনা ব্যঙ্গ করে ছিলাম। আমার স্বামী তো পরিষ্কার রাজপুত্রের মত দেখতে কিন্তু কর্মহীন বেকার যুবক। দৈহিক সুখ লাভ করার জন্য বিয়ে করা কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের পর সেই সুখ আরো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। সংসার করার মন মানসিকতা একদম নষ্ট হয়ে গেছে। 

কলেজ জীবনে একবার পাড়ার এক 
যুবকের সাথে ভালোবাসা কিন্তু নীরবে এসেছিল। আমি তাকে মনে মনে ভালবেসে ছিলাম কিন্তু কাল হলো ভবানন্দের বাবা মা।

ছেলেটি পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে আয় রোজগার করে সংসার ও পড়াশোনা চালাতে। ভালোবাসা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠার আগেই প্রদীপের আলো ধপ করে নিভে গেল। লোকের মুখে শুনেছি ওই ছেলেটি নাকি বিবাহিত জীবনে সুখী হতে পারেনি। 

মাঝেমধ্যেই মনে হয়, গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করি কিন্তু আবার ভাবি হার মানতে রাজি নয়। হয়তো দুঃখের পরে একদিন সুখের মুখ দেখতে পারবো। আবার সন্তান জন্ম না দিয়ে কিন্তু একদিকে ভালো হয়েছে। সন্তান কে আমার মতই জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো।

প্রকৃতির নিয়মে রাতের শেষে পাখিদের 
কিচিরমিচির শব্দে করে গ্রাম বাংলার বধু জাগে জানিয়ে দেয়। দূরের কোন মুসলিম গ্রাম থেকে হালকা হালকা আওয়াজের মাধ্যমে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। সোনালী ঝটপট বিছানা থেকে উঠে পড়ে।
-------------------------------------------------------------------
                  ।। তৃতীয় অধ্যায় ।।         
-------------------------------------------------------------------
আরো কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এক রাতে সোনালী বিছানায় শুয়ে স্বামীকে বলে :- তুমি, অর্থ উপার্জন করতে পারে না বলে কিন্তু এই সংসারের সদস্যরা আমার উপর বিভিন্ন ভাবে অন্যায় অত্যাচার করে চলেছে। নিরবে চোখের জল ফেলে সহ্য করে চলেছি।

স্বামী ভবানন্দ বলে :- তোমার দুঃখ 
বুঝতে পারছি।

সোনালী বলে :- কোনদিন জানতে 
চাও না তো! আমি ভালো না খারাপ আছি। তুমি তো তোমার মতো করে খাওয়া দাওয়া করে চলে যাও কিন্তু একবার তো আমাকে জিজ্ঞাসা করো না। সারাদিন কাজ কর্মের পরে আমার খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কিনা। কত রাত না খেয়ে চলে গিয়েছে কিন্তু তার কোন হিসাব নেই।

স্বামী ভবানন্দ তার স্ত্রীকে আদর করে
 বলে :- এই ব্যাপারে আমি ভীষণ অন্যায় করেছি। স্বামী হিসেবে তোমার খোঁজ নেওয়া আমার অবশ্যই কর্তব্য ছিল।

সোনালী ঘুরে শুয়ে বলে :- তুমি বেকার
 বলে কিন্তু তোমার বৌদি দয়া করে দু'মুঠো ভাত দেয়। আর শোধ তোলে আমার উপর খোঁটা ও অত্যাচার করে কয়েক গুণ তুলে নেয়। আবার ঠিকমতো কোনদিন পেট ভরে খেতে দেয় না। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- আমাকে 
কোনদিন বলোনি তো!

সোনালী রাগ দেখিয়ে বলে :- যে 
পুরুষের একটা ব্রাউজ কেনার ক্ষমতা নেই কিন্তু সেই মানুষ কে বললে কি বাজার থেকে মাংস ভাত এনে দেবে!

প্রায় দিন আধা পেট ভাত খেয়ে কিন্তু পেট ভরে না। তবুও ভূতের মতো সারাদিন পরিশ্রম করতে হয় । 

পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকে শত অত্যাচার সহ্য করার পরেও কিন্তু একমাত্র তোমার জন্য এই সংসারে অমঙ্গল কারী ডাইনি অপবাদ শুনতে হয়। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- আজ থেকে 
আমরা ভাগাভাগি করে খাবে।

সোনালী বলে :- তুমি আমাকে সমাজের 
শত শত মানুষ সহ বৈদিক ধর্মের নিয়ম মেনে অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে করে নিয়ে এসেছো। 

স্ত্রীর নিম্নতম চাহিদাগুলো যেমন খাওয়া-দাওয়া চিকিৎসা ও লজ্জা নিবারণের বস্ত্র এগুলো ব্যবস্থা করা তোমার কর্তব্য। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- অবশ্যই।

সোনালী বলে :- তুমিও তো বাড়ির অন্য 
সকল মানুষের মত চোখ বন্ধ করে চলে কারণ শত ছিদ্র কাপড় সেলাই করে এই সংসারের সব কাজ করতে হয়। বাড়ির বউ থেকে বাড়ির ঝি চাকর ভালো কাপড় পড়ে। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- এভাবে বলে না।

সোনালী বলে :- বউয়ের ছেঁড়া কাপড় 
পড়ে থাকা, তোমার চোখে কি কখনো দেখতে পাও না! নাকি দেখার ভান করো থাকো! 

 তুমি স্বামী হয়ে বৌয়ের একটি কাপড় কিনে দিতে পারো না। বাবার কথায় বিয়ে করার কোন দরকার ছিল না।

স্বামী ভবানন্দ বলে :- বেকার অবস্থায় 
আমার বিয়ে করার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু দাদা বৌদি লোভের কারণে জোর করে বিয়ে দিয়ে কিন্তু আমাদের দু'জনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। 

সোনালী রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে :- 
মনে হচ্ছে তুমি কচি খোকা, ঝিনুকে করে দুধ খাওয়াতে হবে।

স্বামী ভবানন্দ বলে :- তোমার বাড়ির 
কাজের মেয়ে বানিয়ে কিন্তু স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক কে হাতিয়ার করে আমার সাথে দাদা বৌদি প্রতারণা করে যাচ্ছে।

সোনালী বলে :- সংসারে যা পরিস্থিতি 
তৈরি হচ্ছে তাতে এভাবে চললে কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই লজ্জা বস্ত্রের অভাবে উলঙ্গ হয়ে থাকতে হবে । 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- চাকরীর চেষ্টা 
চালিয়ে যাচ্ছি।

সোনালী বলে :- চাকরি চাকরি করে 
ঘুরে না বেরিয়ে কিন্তু হাতের কাছে যে কাজ পাও সেটাই করা শুরু করে দাও। না হলে অচিরেই কিন্তু আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- বৌদি কিছু বলছে 
তোমাকে!

সোনালী বলে :- বলে না আবার 
তোমার বৌদি দু-চার কথা না শুনিয়ে আমাকে কোনদিনই খেতে দেয় না, তাহলে বৌদির পেটের ভাত হজম হবে না।

সোনালী কে আদর করতে করতে 
ভবানন্দ বলে :- কি হয়েছে বৌদির সাথে বলে না আমাকে?

সোনালী বলে :- আদর করে অভিনয় 
করতে হবে না। কয়েক বছরের মধ্যেই তোমাদের পরিবারের সকলকে চিনতে পেরেছি। 

ভবানন্দ বলে :- কি হয়েছে বলবে তো?

সোনালী বলে :- না হওয়ার আর বাকি 
আছে কি? 

 সোনালী বিস্তারিত ঘটনা বলতে থাকে স্বামী ভবানন্দ কে ।

ভবানন্দ বলে :- ঘটনাটি ভীষণ 
মর্মান্তিক । মনে করেছিলাম যে কোন দোকানের কর্মচারী হয়ে থাকবো কিন্তু দোকানদার রহস্য মনে করে কথাগুলো উড়িয়ে দিল। এই কথা দাদার কানে যাওয়ার কারণে লোকজনের সামনে আমাকে বকাবকি করে অপমান করলো।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- এখন 
তুমি আর কি করবে! সব সময় কাপুরুষের মতো কথাবার্তা। প্রচলিত কথাটা ভুলে গেলে "একবার না পারিলে চেষ্টা করো শতবার।"

স্বামী ভবানন্দ বলে :- রাগ করে না। 
আমার সমস্যা গুলো বোঝার চেষ্টা করে।

সোনালী বলে :- যাও, বৌদির আঁচল 
ধরে থাকে। বউ তোমার কে! সে নেংটা হয়ে থাক আর না খেয়ে থাক তাতে তোমার কি আসে যায়?

স্বামী ভবানন্দ বলে :- আমরা দুজনে 
কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে আছি।

সোনালী কান্না করতে করতে বলে :- 
বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতে পারো, ব্যবসা শেখা হয়ে যাবে তা করবে না।

ভবানন্দ বলে :- এই গভীর রাতে 
কান্নাকাটি করে না সোনা। আমি তোমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসি। হনুমান হলে বুক চিরে দেখাতে পারতাম। 

মানছি অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য তোমাকে কোনো সুখ দিতে পারিনি কিন্তু তাই বলে ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করি নি কখনও ! আমরা দুজনেই এই সংসারের বোঝা হয়ে পড়েছি।

সোনালী বলে :- বাড়ি থেকে অন্য 
কোথাও চলে যায়। আমি আর পারছি না গো।

স্বামী ভবানন্দ বলে :- সোনালী; তুমি 
কান্না করে দুঃখকে হালকা করতে পারো। 
আমি দুঃখকে বুকে চেপে ধরে রেখে আরো ছটফট করে যন্ত্রণা ভোগ করছি। 

সোনালী কে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে 
ফুঁপিয়ে ভবানন্দ কান্না করতে করতে বলে :- রাগ করছ কেন! বাবার দোকানে বৌদি আমাকে কোন ভাবেই বসতে দেবে না ।

সোনালী বলে :- কেন! তোমাকে
 দোকানে বসতে দেবে না। বাবার দোকান দুই সন্তানের সমান অধিকার আছে।

ভবানন্দ বলে :- বড় দাদা তার ছোট 
ভাই কে সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। বাবার মগজ ধোলাই করে নিজের আয়ত্তের মধ্যে ব্যবসা রেখেছে। দাদা যেভাবেই বলে কিন্তু বাবা সেই ভাবেই চলে। নামেমাত্র বাবা দোকানের মালিক সেজে বসে আছে।

সোনালী বলে :- তার মানে।

ভবানন্দ বলে :- দাদা কিন্তু দোকান 
থেকে হিসাবে গরমিল করে টাকা নিয়ে এসে বৌদি হাতে দেয়। সেই টাকায় বৌদি মনের মতো সাজগোজ আর আনন্দ ফুর্তি করে। 

সোনালী বলে :- তলায় তলায় অনেক 
কিছু ঘটে চলেছে।

ভবানন্দ বলে :- মাকে বশীকরণ করে
 মায়ের চোখে আমাদের শত্রু বানিয়ে রেখেছে। দাদা হচ্ছে এক নম্বরের হারামির হারামি। খলনায়কের অভিনয় কিন্তু ভালোভাবে করতে পারে। দাদা ও বৌদি কিন্তু দুই মুখো সাপ।

সোনালী বলে :- যা হয়ে গিয়েছে তা 
আর কোন দিন ফিরে আসবে না। অধিকার কেউ সহজে দেয় না কিন্তু কাজের মাধ্যমে অধিকার তৈরি করে আদায় করে নিতে হয়।

ভবানন্দ বলে :- কিভাবে?

সোনালী বলে :- পারিবারিক 
অধিকারের লড়াই জিততে হলে কিন্তু টাকা দরকার। টাকা নামক মূল্যবান বস্তু কে কর্মদক্ষতার মাধ্যমে নিজের আয়ত্তের মধ্যে আনতে হবে। 

ভবানন্দ বলে :- তা কিন্তু ঠিক বলেছ।

সোনালী বলে :- বর্তমান ভারতবর্ষের 
টাটা কোম্পানির আসল মালিক কিন্তু মাত্র একশ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই মুহূর্তে ভীষণভাবে গরিব ছিলেন। তার কর্মদক্ষতার মাধ্যমে বর্তমানে সারা এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম টাটা কোম্পানি। 

ভবানন্দ বলে :- উচ্চ শিক্ষিত হয়ে ছোট 
কাজ করতে সম্মানে লাগে।

সোনালী বলে :- কোন কাজ ছোট নয়
 শুরু করো। মান-সম্মানের ভয়ে পিছিয়ে থাকলে জীবনে কোনদিন উন্নতি হয় না। যেকোনো কাজে কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

 শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন "বসে থাকার থেকে মানুষের বেগার (অর্থাৎ বিনামূল্যে কর্মকরা) দেওয়া ভালো।" এতে নাকি কর্মদক্ষতা বেড়ে ওঠে। 

ভবানন্দ বলে :- কিন্তু!

সোনালী বলে :- দেশের বাড়িতে ছোট
 কাজ করতে যদি লজ্জা করে তবে অন্য জায়গায় চলে যাও। মানুষ বোম্বে দিল্লি গুজরাট কত জায়গায় গিয়ে আজ আয় রোজগার করছে। 

ভবানন্দ বলে :- ঠিক বলেছো ।

সোনালী বলে :- আমি ভেবে দেখেছি, 
এই বাড়ি থেকে বের হতে পারো তাহলে কিন্তু আমাদের মুক্তির পথ খুলে যাবে।

ভবানন্দ বলে :- কিভাবে?

সোনালী বলে :- যদি অন্য কোথাও ঘর 
ভাড়া নিয়ে থাকি, তা হলো কিন্তু অনেক শান্তিতে থাকতে পারবে।

ভবানন্দ বলে :- তোমার পরিকল্পনা কি?

সোনালী বলে :- আমাদের শিক্ষাগত
 যোগ্যতা অনুসারে যতদূর জানা আছে, তা কাজে লাগিয়ে ষষ্ঠ ক্লাস থেকে দ্বাদশ ক্লাস পর্যন্ত প্রাইভেট পড়ানোর কাজ শুরু করতে পারি। 

ভবানন্দ বলে :- তারপর।

সোনালী বলে :- প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে 
দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। কারণ তখন তো আর তোমাদের এই সংসারের মতো যাবতীয় সব কাজ করতে হবে না।

ভবানন্দ বলে :- আমি কাজের জন্য
 নিশ্চিন্ত।

সোনালী বলে :- শুধু দরকার 
মন মানসিকতার পরিবর্তন আর ইচ্ছা শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে। পারবে না বলে কোন কাজকে ছোট মনে করতে নেই।

ভবানন্দ বলে :- আমার মন ও মানসিকতা ঠিক আছে।

সোনালী বলে :- আমাদের শ্রীমৎ 
ভাগবত থেকে জানা যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু অর্জুনকে ভিক্ষাবৃত্তি করার অনুমতি দেয়নি। 

তিনি বলেছেন ক্ষত্রিয়ের ধর্ম হল যুদ্ধ করা অর্থাৎ যুদ্ধ মানেই কর্ম করা। সখা অর্জুন কে বোঝানোর জন্য শ্রীমদ্ভাগবত গীতার কর্মযোগ বলে একটি অধ্যায় রচনা করা হয়েছে। সেখানে কিন্তু কর্মকেই শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। 

ভবানন্দ বলে :- ঘুম পাচ্ছে এখন শুয়ে
 পড়ো। সকালে উঠেই আবার তোমাকে বিনা বেতনের চাকরানীর কাজে যোগ দিতে হবে গো।

সোনালী বলে :- নানা রকম চিন্তা 
ভাবনা করতে করতে ঘুম পালিয়ে গেছে। যদি আমাকে বাঁচাতে চাও তাহলে এই বাড়ি কিন্তু ত্যাগ করতে হবে।

ভবানন্দ বলে :- আচ্ছা ভেবে দেখছি।
 বের হওয়ার পথের সন্ধান করতে হবে। 
তোমার কপালটা একটু টিপে দেয় তাড়াতাড়ি ঘুম এসে যাবে। বলে সোনালীর মাথার চুল গুলোর মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে ও কপাল চেপে ধরে আরাম দেওয়ার চেষ্টা করে। 

------------------------------------------------------------------ 
                   ।। চতুর্থ অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------------------
দুঃখের মাঝে অতি কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিনের শেষে রাত আসে। একই ছাদের নিচে বসবাস করে পরিবারের কোন সদস্যের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সোনালীর জীবনে অন্ধকার ময় মুহুর্ত নেমে আসে। 

সোনালী তার স্বামীর পাশে বিছানায় 
শুয়ে ঘুমানোর অভিনয় করে মনে মনে ভাবে :- ভাসুরের অসভ্য আচরণের ঘটনা স্বামীকে কি ভাবে উত্থাপন করবে! যদি বিশ্বাস না করে উল্টো আমাকে দোষারোপ করে।

ভাসুর এখন আমাদের আশ্রয়দাতা ও অন্নদাতা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি বিশ্বাস করবে না। উল্টো আমাকেই কলঙ্কিত করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। আসল ঘটনা অন্ধকারে ধামাচাপা পড়ে যাবে। 

সমাজ ব্যবস্থায় সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বলবে সোনালীর দোষ কারণ ঘরে অপ্সরার মতো বউ থাকতে ধনঞ্জয় এমন কাজ করতে পারে না। 

পুরুষ শাসিত সমাজে একজন নির্দোষ গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু স্বামী ও পরিবারের থেকে বিতাড়িত হতে হবে। স্বামীকে হারিয়ে কলঙ্কিত জীবন নিয়ে একা একা সমাজের বুকে কলঙ্কের দাগ নিয়ে বসবাস করা মুশকিল। 

পারিবারিক সমস্যার কারণে নারীগণ তার সম্মান বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়ে থাকে। সেই রাতের ঘটনার পর আতঙ্কের মধ্যে ভয়ে ভয়ে বসবাস করি। আবার ভাবি কখন যেনো বিস্ফোরণ ঘটে যায়।

স্মৃতির পাতায় ডুবে গিয়ে সেই দিনের 
ঘটনা ভাবে মনে । বড় জা সুনন্দা বাপের বাড়িতে গিয়েছিল। শাশুড়ী মা পাড়ার কীর্তন অনুষ্ঠানে এবং স্বামী বাড়িতে ছিল না হয়তো পাড়ার কোন বন্ধু মহলে আড্ডায় ব্যস্ত ছিল আর শ্বশুর দোকানে ছিল।

বাড়ির উঠানে তুলসী তলায় ঘিয়ের সন্ধ্যা প্রদীপ রেখে দিয়ে পূজা অর্চনা শেষ করে ঠাকুর ঘর থেকে বাইরে আসতেই হঠাৎ করে ভাসুর ধনঞ্জয় বাড়িতে ঢুকে পড়ে। 

ধনঞ্জয় তার ঘরের দিকে যেতে যেতে 
বলে :- সোনালী; ভালো করে এক কাপ দুধ চা বানাও আর আর মা কোথায়!

সোনালীর বলে :- মা; পাড়ার এক 
বাড়িতে কীর্তন গিয়েছে। 

ধনঞ্জয় বলে :- ঠিক আছে। চা টা 
আমার ঘরে নিয়ে এসো।

কিছু সময় পরে চায়ের প্লেট নিয়ে ভাসুরের ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর চায়ের কাপ রেখে দেয়।

ভাসুর ধনঞ্জয় বলে :- তোমার সাথে 
কিছু জরুরী কথা বার্তা বলার ছিল। 

আমি ভাসুরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে খাটের পাশে চেয়ারে বসে পড়ি।
 
ভাসুর আমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশংসা
 করতে করতে কাছে এসে হাত ধরে বলে :- যদি আমার কথা মতো চলে তবে তোমার উপর অত্যাচার বন্ধ হবে আর যখন যা টাকা পয়সার প্রয়োজন পেয়ে যাবে।

আমি ভাসুর অসভ্য আচরণের ইঙ্গিত
 বুঝতে পেরে এক প্রকার জোর করে হাত 
ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে আর সেই মুহূর্তে ভাসুর নামের অসুর আমাকে জোর করে তার বুকে টেনে নিয়ে দুহাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে :- এই বংশের প্রদীপ (অর্থাৎ সন্তান) বলে আর কেউ থাকলো না । তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমার স্বামীর দ্বারা কোনদিন সন্তান ধারণ করতে পারবে না। কারণ যে জিনিসের দ্বারা সন্তান লাভ হবে, সেই জিনিসের দারিক ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। 

আমি বাঁচার জন্য ছটফট করতে করতে বলেছিলাম :- তার কোন প্রয়োজন নেই কিন্তু আমাকে ছাড়ুন। 

ভাসুর আমাকে আরো শক্ত করে 
জড়িয়ে ধরে বলে :- তোমাকে সন্তান লাভ করতে হলে কিন্তু পুরুষ পরিবর্তন করতে হবে। আর আমি তো এই পরিবারের একজন পুরুষ। 

আমার ধন সম্পত্তি টাকা পয়সা সহ এই সাম্রাজ্য কে ভোগ করবে। বড় বৌয়ের আর দ্বিতীয় সন্তান হবে না। একটি সন্তান তাও পঙ্গু হয়ে রয়েছে কিন্তু তার দ্বারা সম্পত্তি রক্ষা করা কোনদিন সম্ভব নয়। তোমার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে বংশ রক্ষা করতে চাই। 

আমি তখন বদ্ধ খাঁচায় পাখির মতো 
ছটফট করছি আর ভাবছি মুক্তির উপায় কি। ভয়ে আতঙ্কে ঘেমে স্নান হয়ে করে উঠেছি। ভাসুরের বাহুবন্ধন থেকে বাঁচার জন্য অনেকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ আমার রোগা পাতলা শরীর ভাসুরের শক্তির সাথে লড়াই করতে পারছিলাম না । আমি যত বার পালানোর চেষ্টা করতে থাকি ভাসুর আমাকে আরো চেপে ধরে।

আমি বুঝতে পারছি বিভিন্ন বাহানা করে আমার ইজ্জত নষ্ট করার পরিকল্পনা করেছে। ভাসুর বাড়িতে মুরগি পালনের মত আমাকে কেটে কেটে খেতে চেয়েছে।

পাপিষ্ঠ ভাসুরের সাথে আলিঙ্গন বদ্ধ অবস্থায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে, তবুও মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে থাকি :- এই সংসার ধর্মের বিশ্বাসের মাঝে বিশ্বাস ভঙ্গ কারী ভাসুর নামক অসুরের কাছে থেকে বাঁচার উপায় কি?

আমি অনেক কিছু ভেবে কূলকিনারা 
না পেয়ে হাসিমুখে ভাসুরের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলি :- আপনি যখন বলছেন আমার গর্ভে সন্তান দান করবেন। আপনার প্রস্তাবে রাজি আছি কিন্তু তাড়াহুড়ো করার কোনো দরকার নেই। আপনি হলেন আমাদের অন্নদাতা ও আশ্রয়দাতা। আপনার কথা অমান্য করতে পারিনা কিন্তু সত্য কথা বলেছেন আপনার ভাইয়ের দ্বারা কিচ্ছু হবে না অকর্মের ঢেঁকি'।

ভাসুর আমাকে জোর করে বিছানার উপর শুইয়ে দেয় আর আমার দেহের কুচ যুগলে হাত রেখে ময়দা মাখাতে শুরু করে। 

আমি মা বলে চিৎকার করে লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসি আর ভাসুর আমার মুখ চেপে ধরে।

আমি সোনালী স্বামীর বড় দাদা কে 
আদর করে তার উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম :- ভারতীয় উপমহাদেশের মহাভারতের ইতিহাসে দেখা যায়। বংশ রক্ষা করার জন্য ভাসুরের সাথে ছোট ভাইয়ের বউয়ের সাথে দৈহিক মিলন ঘটিয়ে সন্তান উৎপাদন করার কাহিনী।

সন্তান উৎপাদনের জন্য নারী দেহ শুধুমাত্র একটি যন্ত্র মাত্র। সেখানে শ্বশুর, ভাসুর ও দেওরের সম্পর্ক মূল্যহীন। শুধু একজন নারী ও একজন পুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ভাসুরের দ্বারা সন্তান উৎপাদনের মহাভারতের সেই রহস্যময় কাহিনী আপনার জানা আছে।

ভাসুর ধনঞ্জয় কামে উত্তেজিত হয়ে বলে :- না, আমার জানা নেই। বলে আমার মুখমন্ডলে চুম্বন করতে থাকে।

আমি সোনালী তখন নিরুপায় হয়ে 
বলেছিলাম :- বড় দাদা; তাড়াহুড়া করছেন কেন! নারী পুরুষের মিলন আনন্দদায়ক কিন্তু জোর জুলুম করে কখনো আনন্দ লাভ করা যায় না। আর আমি তো বলেছি আপনার সাথে থাকবো তার আগে সেই রহস্যময়ী কাহিনী শুনুন। 

সত্যবতী ও রাজা শান্তনুর দুই পুত্র  
চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য । বড় ছেলে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন।
ছোট্ট ছেলে বিচিত্রবীর্য কে বিবাহ দেন অম্বিকা ও অম্বালিকা সাথে। বিচিত্রবীর্য অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

মাতা সত্যবতী বংশ রক্ষা করার জন্য আহ্বান করেন বড় পুত্র ব্যাসদেব কে। সত্যবতী কুমারী অবস্থায় পরাশর মুনির সাথে মিলিত হওয়ার কারণে ব্যাসদেবের জন্ম হয়েছিল।

মাতা সত্যবতীর অনুরোধে বংশ রক্ষা করার জন্য বড় ভাই ব্যাসদেব তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রীদের নিকট গিয়ে মিলনের আহ্বান করে সন্তান উৎপাদন করেন।
অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র , অম্বালিকা গর্ভে পান্ডু এবং অম্বিকার দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম হয়।

সেই মুহূর্তে ভাসুর আনন্দিত হয়ে আমাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

আমি সোনালী তখন ভাসুরকে বলি :- 
ছাড়ুন না ব্যাথা লাগছে, এত জোরে চেপে ধরেছেন কেন! আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আর এই মুহূর্তে মিলন সম্ভব নয় কারণ আমার শারীরিক ধর্ম দুদিন ধরে অশৌচ চলছে।

শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে আছি। ভোরের থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সংসারের যাবতীয় কাজ করতে হয় তার উপর দিদি ও মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে হয়। আপনি তো সংসারের বড় ছেলে কিন্তু আমার জন্য কিছু করতে পারেন না আবার দেহ ভোগ করার জন্য লালিত হয়ে জোর জুলুম করছেন।

ভাসুর বলে :- সোনালী তোমার জন্য 
সবকিছু করতে পারি কিন্তু আমার সাথে মিলিত হতে হবে। প্রথম যেদিন তোমার এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। সেই দিনই তোমার প্রতি আসক্তির জন্ম হয়েছে। সেই সুপ্ত কাম বাসনা পাঁচ বছর পর সুযোগ বুঝে জেগে উঠেছে। 

আমি সোনালী বলেছিলাম :- আমার 
দেহ-মন সুস্থ হতে দিন কিন্তু আমি তো পালিয়ে যাচ্ছি না। এক ছাদের তলায় আমাদের বসবাস করতে হবে ঠিক সুযোগ বুঝে মাঝে মাঝে মিলন করার ব্যবস্থা করে দেবো।

আর সেই মুহূর্তে অনুভব করি ভাসুরকে বহু জ্ঞান দেওয়ার পড়েও কিন্তু চরম ক্ষতি না করে আমাকে সহজ ভাবে নিস্তার দেবে না। ভয়ংকর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। মনে পড়ে প্রবাদ বাক্যের কথা "শয়তান না শোনে ধর্মের কোন কাহিনী"

কোন উপায় না পেয়ে ভাসুরকে বলেছিলাম। ভাসুর এখন রাতের নাগর হয়েছে কিন্তু ব্যস্ত হচ্ছেন কেন! সমাজ ব্যবস্থায় বলে ছোট ভাইয়ের বউ নাকি বোনের সমান তাতে কি হয়েছে ? ভাই বোন আজ হবে মিলন কলি যুগের মানুষ হবে ধন্য।

বৌদি আর দেবরের দৈহিক সম্পর্কের কথা শোনা যায় কিন্তু বৌমা ও ভাসুরের সাথে দৈহিক সম্পর্কের কথা শোনা যায় না। আপনি তো ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছেন।

হে নাগর এখন যদি চিৎকার-চেঁচামেচি করি তাহলে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি ভাসুরের মান সম্মান মাটির সাথে মিশে যাবে। আর লোকে বলবে ছোট ভাই ভাইয়ের বৌকে ধর্ষণকারী ভাসুর ধনঞ্জয়। সেটা কি আপনার জন্য সম্মানজনক হবে!

ভাসুর কামের উত্তেজনায় চরম 
উত্তেজিত হয়ে সব জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো আচরণ করতে শুরু করে বলে :- সমাজ ব্যবস্থায় যা হবার হবে কিন্তু আজ তোমার দেহ ভোগ না করে কোনরকম ছাড়ছি না। স্বেচ্ছায় দেহ দান করো, না হলে খুন খারাবি হয়ে যেতে পারে।

সেই চরম বিপদের মুখে পড়ে ভাবতে 
থাকি। চিৎকার চেঁচামেচি করলে পাড়া - প্রতিবেশী ছুটে আসবে কিন্তু প্রকারান্তরে সোনালী নামক নারীর বদনাম হবে। সবাই আমার চরিত্রের দোষারোপ করবে। 

ভাসুর ধনঞ্জয় অসুর হয়ে আমাকে তাড়ানোর জন্য উল্টো বলতে শুরু করবে। সোনালী আমাকে প্রেম নিবেদন করেছে --------। শাশুড়ি ও বড়জা হাতে মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। 

আমার হাজার কথায় কোন কাজ হবে না কিন্তু শয়তান ভাসুর ধনঞ্জয়ের এক কথায় সবাই বিশ্বাস করবে।

সেই মুহূর্তে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায়। হে ঈশ্বর, হে মধুসূদন, সর্ব বিপদভঞ্জন কারি এই বিপদে থেকে তুমি রক্ষা করো।
 হে হৃদয় নাথ শ্রীকৃষ্ণ তুমি দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেছিলে কিন্তু আজ এই চরম পরিস্থিতির মাঝে আমাকে তুমি রক্ষা করো।
 হে প্রভু আমার বাঁচার পথ দেখাও।

সেই মুহূর্তে আমি ভাসুরের দেহের নিচে চাপা পড়ে ছটফট করে চলেছি। ভেবে নেয় জীবনে বেঁচে থাকলে কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার বহু সময় পাওয়া যাবে।

 উপায়ন্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে ভাসুর কে জড়িয়ে ধরে দৈহিক মিলনের অভিনয় করতে শুরু করে কিন্তু শাশুড়ি মায়ের আসার অপেক্ষা করতে থাকি।

ভাসুর নামক অসুরের ভয়ংকর রূপ 
ধারণ করে আমাকে ধর্ষণ করতে যাবে আর সেই মুহূর্তে ঈশ্বরের অশেষ করুণায় শাশুড়ি মা সোনালী সোনালী বলতে বলতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে বলেন :- এই পোড়ামুখী কোথায় কি করছিস! এদিকে আয় আমাকে পা দেওয়ার জল দে। বাড়িতে না থাকলে রাজরানী হয়ে যাও। আরে কোথায় গেলি বলে সোনালী সোনালী চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।

সেই মুহূর্তে আমি ভাসুরকে বলেছিলাম
 :- বাড়িতে মা এসে গিয়েছে আর কিন্তু সম্ভব নয়। আবার অন্য কোনদিন সুযোগ বুঝে ঠিক মিলন হবে কিন্তু এখন আমাকে ছেড়ে দিন।
কিন্তু আমাকে কোন প্রকার ছাড়তে রাজি নয়।

বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ভাসুরের অন্ডকোষ জোরে চেপে ধরে আঘাত করে ছিলাম। আর মুহূর্তের মধ্যে আঘাত প্রাপ্ত ভাসুর আঘাত নিরবে সহ্য করে কিন্তু আমার বুক থেকে পাশে গড়িয়ে পড়ে। তারপর আমি দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের ঘরে চলে আসি। 

ঘরে গিয়ে নিজের মনকে সংযত করে দেহের কাপড় ঠিক করে তাড়াতাড়ি শাশুড়ি মায়ের চরণ ধৌত করার জন্য জল নিয়ে উঠানে আসি। তারপর দাঁড়িয়ে থাকা শাশুড়ি চরণ ধৌত করে দেয়।

 মাথায় কাপড় দিয়ে হাঁটু গেড়ে 
শাশুড়ি মা কে প্রণাম করে উঠে মা মা বলে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম :- আমার তো আর কীর্তনে যাওয়া হয় না, আপনার চরণের স্পর্শ করে যদি পরশ পাথরের মত যদি কিছু পূর্ণ লাভ হয়। বলুন আপনার আর কি সেবা করতে পারি।

শাশুড়ি মা আনন্দিত মনে আমাকে 
বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন :- ধর্মের প্রতি তোমার সুমতি হয়েছে। শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ তোমার মঙ্গল করুক।

সেই মুহূর্তে মনে মনে বলেছিলাম। মা আমার উপর যতই অত্যাচার ও নির্যাতন করুন কিন্তু ঠিক সময় মতো বাড়িতে আসার জন্যই আজ ভাসুরের সাথে পাপ কার্যে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে গেলাম। নারীর মহামূল্যবান সম্পদ নারীত্ব রক্ষা করতে পেরেছি।

শাশুড়ি মা বলেছিল :- বৌমা; ভালো 
করে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো।

ভাসুর কটাক্ষ চোখে আমার দিকে দৃষ্টি 
নিক্ষেপ করে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে অগ্রসর হতে হতে বলে :- মা, আমি দোকানে যাচ্ছি কিন্তু রাতে বাড়িতে আসতে দেরি হতে পারে।

আমি রান্নাঘর থেকে চা তৈরি করে 
শাশুড়ি মায়ের সামনে রেখে বলেছিলাম। মা আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কিন্তু দয়াকরে রাতের রান্না টা করে দাওনা।

শাশুড়ি মা চা পান করা বন্ধ করে 
উত্তেজিত হয়ে বলেছিল:- এখনো রান্না হয়নি তা করছিলে কি ?

আমি শান্ত গলায় আদরের সুরে বলে 
ছিলাম :- মা; শুয়ে ছিলাম কিন্তু আপনার মেয়ের যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে নিশ্চয়ই সংসারের সব কাজ করতেন।

শাশুড়ি মা শান্ত হয়ে বলেছিল :- ঠিক 
আছে মা, তোর আর ঠাকুমার মত জ্ঞান দিতে হবে না- যাও ঘরে গিয়ে আরাম করো আমি রান্নার ব্যবস্থা করছি।

সেই দিনের ঘটনার পর ভাসুরের সাথে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা হয়নি। তাও মাঝখানে অন্য কাউকে রেখে কথা বলি আর সবসময় দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভাসুর আকার-ইঙ্গিতে অনেক কিছুই বলে চলে কিন্তু সুযোগ বুঝে আমিও আকার ইঙ্গিতে অভিনয় চালিয়ে যায়। আমি সব সময় আতঙ্কে থাকি এক ছাদের নিচে বাস করে কখন যে আমার বিপদ ঘনিয়ে আসবে।

বহুবার ভেবেছি ভাসুরের কথাগুলো স্বামীকে বলবো কিন্তু পরমুহুর্তে ভয় পেয়েছি কারণ যদি আমাকে ভুল বুঝে দোষারোপ করে। যদি ঘটনা কখনো প্রকাশ্যে আসে পুরুষেরা সব সময় নারীদের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে সত্যবান হয়ে থাকে। নারীদের মিথ্যাবাদী বানিয়ে সংসার থেকে তাড়িয়ে দেয়। যত দোষ নাকি নারীদের।

আর যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীর একটু দোষ পেলেই আর নিস্তার নেই। এই সমাজ ব্যবস্থার নিয়ম অনুসারে পুরনো নারীকে বিদায় দিতে পারলে আবার নতুন করে বিয়ে করে সোনাদানা টাকা পয়সা ঘর ভরে যাবে। এই অমানবিক কাজ গুলো সমর্থন যোগায় বাড়ির বয়স্ক মহিলারা কিন্তু একজন নারী হয়েও আর একজন নারীর দুঃখ বুঝতে চাইনা।

পুরুষ জাতরা হাজার নারীর চরিত্র নষ্ট করলেও নাকি এই ঘুনে ধরা সমাজের অপবিত্র হয় না। আরো সমাজের বুকে সম্মান বাড়ে। আবার এই নারী সমাজ পুত্র সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর নিজেকে গৌরব বোধ করে।

মেয়ে সন্তানের জন্ম হলে দুঃখের সাগরে ভাসে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে হলে একমাত্র মেয়ে দরকার। আর সেই মেয়েরা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন ভাবে অবহেলিত অত্যাচারিত হয়ে আসছে। 

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার মেয়ে সন্ধ্যাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু মহাদেব সন্ধ্যাকে রক্ষা করেছিলেন। এমন ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বহু আছে। সভ্য সমাজের সভ্য নাগরিক হিসাবে কিন্তু অসভ্যের মত নারীদের উপর এখনো অত্যাচার ও নির্যাতন আবহমানকাল ধরে চলে আসছে। এর কোন প্রতিকার এখন পর্যন্ত কোনো নারী সমাজ করতে পারেনি।

নারীরা নাকি পুরুষের কাছে আশ্রিতা ও সংরক্ষিত বস্তু যেমন ইচ্ছা তেমন ভাবে ব্যবহার করার অধিকার নাকি তাদের জন্মগত ভাবে পেয়েছে।

পুরুষ সন্তান নাকি তার মায়ের কাছে হীরের থেকেও দামি। 

-----------------------------------------------------------------  
                     ।। পঞ্চম অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------------------
সোনালীর বেকার ভবঘুরে স্বামী ভবানন্দ প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক পদে চাকরির আবেদন পত্র জমা দেয়। 

রাজ্যের তৎকালীন শাসক দলের 
উচ্চপদস্থ এক স্থানীয় নেতা ও এলাকাবাসীর বিধায়কের ডান হাত অরিন্দম বিশ্বাস বলে :- চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে কিন্তু ভবানন্দ তুমি দলের লোক বলে মাত্র তিন লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি তার পাইয়ে দেবে। 

চাকরির নিয়োগের অনুদানের টাকা পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে দলের শিক্ষা মন্ত্রী সহ আরো অনেকে ভাগ পাবে। চাকরি না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আমার উপর বিশ্বাস রাখ কারণ আমি তো বিধায়কের ব্যক্তিগত সচিব।

ভবানন্দ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে 
:- কাকা বাবু ঠিক আছে; টাকার ব্যবস্থা করছি।  
             -------------------------------

সোনালী তার ভাসুরের কাছে স্বামী ভবানন্দের চাকরির বিষয় জানিয়ে তিন লাখ টাকার দাবি করে। ভাসুর টাকা দিতে রাজি আছে কিন্তু শর্ত মেনে তার কাছে রাত যাপন করতে হবে। 

একদিন দুপুর বেলা সবার খাওয়া 
দাওয়া শেষ করার পর সোনালী কাজকর্ম শেষ করে বিকেল চারটের সময় তার শ্বশুর গিরিশচন্দ্রের ঘরে ঢুকে একটি চেয়ার নিয়ে বসে বলে :- বাবা, আপনার ছোট ছেলে কে আপনার ব্যবসার সাথে যুক্ত করতে পারেন। তাহলে ওর কাজকর্ম করতে করতে মন মানসিকতা ভালো থাকবে এবং ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্য শিখতে পারবে।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- ছোট বৌমা 
তোমার ভাসুর ব্যবসার সবকিছু দেখাশোনা করে, এখনো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ভবানন্দ কে বলো অন্য কোন কাজ খুঁজে নিতে।

সোনালী বলে :- আপনার ছোট ছেলের 
প্রাইমারি স্কুলে চাকরির জন্য কথাবার্তা চলছে, হয়তো চাকরিটা হয়ে যেতে পারে। 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- একটি ভালো 
খবর শোনালে।

সোনালী বলে :- কিন্তু চাকরিটা পেতে 
হলে অফিসের তিন লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হবে। ছেলের চাকরি পাওয়ার জন্য টাকা গুলোর ব্যবস্থা আপনার করে দেওয়া কর্তব্য। 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- আমি কোন 
টাকা পয়সা দিতে পারব না আর ভবানন্দ কে বলো টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি করতে হবে না। যেমন বসে বসে খাচ্ছে তেমনি খেয়ে যাও। আমি যতদিন বেঁচে আছি কিন্তু চাকরি করার জন্য একটি টাকাও আমি দিতে পারবো না।

সোনালী বলে :- বড় ছেলের প্রতি 
আপনার যেমন কর্তব্য আছে আবার ছোট ছেলের প্রতি আপনার সেই একই কর্তব্য আছে। বড় ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কিন্তু ছোট ছেলের জন্য পিতা হিসাবে কি করেছেন?

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন 
:- ছোট বৌমা; তুমি কিন্তু তোমার অধিকারের সীমা লংঘন করে যাচ্ছো। আমি তোমার কাছে কৈফত দিতে বাধ্য নই। তোমার কথা মত চলতে হবে তা কিন্তু নয়, কারণ তুমি এই সংসারের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠো নি। বড় ছেলে ও বড় বউয়ের দয়ার উপর বেঁচে আছে।

সোনালী বলে :- এখানে দয়ার প্রশ্ন 
আসছে কেন! আপনারা কি আমাকে বিনা পরিশ্রমে খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করেছেন! বাড়ির বউ হয়ে ঝি চাকরের মতো কাজ কর্ম করি বলে দুটো ভাত দেয়।
 
আপনি পিতা হয়ে দুই ছেলের প্রতি দুই রকম আচরণ করেছেন কেন? 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- আমার 
একদম ব্যক্তিগত ব্যাপার বেশি নাক গলাবে না, কাকে কি দিতে হবে আমার তা জানা আছে।

সোনালী হালকা উত্তেজিত ভাব নিয়ে 
বলে :- আপনি তো সংসারের সর্বময় কর্তা হয়েছেন কিন্তু একতরফা বিচার করে চলেছেন। বড় ছেলে আর বড় বৌমা যেন আপনার গলার হার আবার তাদের কথা মতো চলাফেরা করেন।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- বৌমা ভাষা 
সংযত করো।

সোনালী উত্তেজিত ভাবে বলে :- তা 
ছোট ছেলে ও বৌমা বানের জলে ভেসে এসেছে! তার জন্য সব সময় আপনাদের দয়ার উপরে চলতে হবে। কেন আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন! 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- বৌমা; ছোট 
হয়ে কিন্তু বড় বড় কথা বলছো।

সোনালী বলে :- ভাসুর তো আপনাকে 
নামেমাত্র মালিক সাজিয়ে রেখে পিছন থেকে ব্যবসার হিসাবে গড়মিল করে। 
আপনি সবকিছু জানা সত্ত্বেও প্রতিবাদ করেন না কেন! কিসের আপনার দুর্বলতা?

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র রাগে উত্তেজিত হয়ে
 বলেন :- ছোট বৌমা তোমার অধিকারের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছ! চন্দ্রা (অর্থাৎ সোনালীর শ্বাশুড়ি) ছোট বউকে সাবধান করো।

সোনালী বলে :- বাবা, যে ছেলে 
আপনার সবসময় সর্বনাশ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে কিন্তু সেই ছেলেকেই আপনি আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন।
যে ছেলে আপনার সব সময় মঙ্গল চায় কিন্তু সেই ছেলেকে অবহেলা করে চলেছেন।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলে :- বৌমা ; তুমি 
বলতে চাও, আমি পক্ষপাতিত্ব করি।

সোনালী বলে :- সংসারে কোনো কথা
 হলেই আপনি বড় ছেলে ও বৌমার পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কথা বলেন কেন! বাবা হয়ে ছেলের প্রতি বৈষম্য করতে আপনার লজ্জা হওয়া উচিত।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলে :- অনেক সময় 
ধরে তোমার অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করেছি কিন্তু আর নয়।


সোনালী যখন শ্বশুরের ঘরের দিকে অগ্রসর হয়ে ছিল, সেই মুহূর্তে বড় বৌ সুনন্দা দেখতে পেয়ে চুপিচুপি শ্বশুরের ঘরে ঢোকার দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সোনালীর ও শশুরের কথাবার্তা শুনতে থাকে। 

সোনালী বলে :- কি করবেন! উচিত
 কথা বললে কিন্তু ভাসুর ও শ্বশুর সহ সবাই বেজার হয়। ন্যায্য অধিকারের কথা বললেই দোষ কিন্তু পক্ষপাতিত্ব ছাড়ুন আর সমান অধিকারের সবাইকে দেখুন।

লুকিয়ে কথা শোনার পর বড় বউ 
সুনন্দা গায়ে বাঁধিয়ে ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিয়ে আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আর দরজার আড়াল থেকে দরজার সামনে আসে।

সোনালী ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যঙ্গ করে মুখ 
ভাঙ্গিয়ে বলে :- আসুন পরিবারের মহারানী সুনন্দা দিদি।

বড় বউ সুনন্দা চিৎকার করে বলে :- 
ভবানন্দ ভবানন্দ শুনে যা, তোর বউয়ের কথা গুলো। মুখে যেন খই ফুটেছে মনে হচ্ছে কোনো বড় গাছে নৌকা বেঁধেছে, না হলে এত জোর আসে কিভাবে! বাড়ি চাকরানি হয়ে বড় বড় কথা বলছে। 

বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিদের কে সম্মান পর্যন্ত করছে না। বাড়িতে হেদা বিড়ালের মত থাকে কিন্তু দেখে মনে হয় না, ভাজা মাছটি উল্টিয়ে খেতে জানে। বউকে দারুন শিক্ষা দিয়ে কিন্তু চাকরি ঘুষ টাকা নেওয়ার জন্য বউকে পাঠিয়েছে। যে দাদা বৌদি খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করছে তাদের নামে চোর বদনাম।

শ্বাশুড়ি চন্দ্রা বলে :- ভবানন্দ বাড়িতে 
নাই।

সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করতে 
করতে বলে :- আমরা চোর আমি চোর বলতে বলতে শ্বশুরের ঘরে ঢুকে পড়ে সোনালীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। 

সুনন্দা বলে :- হে ঈশ্বর দুধ কলা দিয়ে
 বাড়িতে কি কালসাপ পুষেছি! আমাদের খেয়ে আমাদের পড়ে আবার আমাদেরই বলছে চোর। সোনালী কথাবার্তা সংযতভাবে বল। মুখে যা আসে তাই বলে দিচ্ছি। এখন তোর বরের চাকরি হয়নি কিন্তু হওয়ার আগেই এত অহংকার ভালো না।

সোনালী তার শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে
 বলে :- বাবা; আমি ছেঁড়া কাপড় পড়ে বাড়ির সকল কাজ কর্ম করি আর দিদি বাক্সভর্তি নিত্য নতুন কাপড় ব্যবহার করে। নতুন নতুন কাপড় কিভাবে আসে! 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- বড় বৌমা 
চুপ করে। ছোটলোকের বাচ্চা আর কত ভালো ব্যবহার করবে।

সোনালী বলে :- দিদি তুমি ধনী 
ব্যক্তিদের মতো চলাফেরা করে, টাকার উৎস কিন্তু বাবা।বাবা আপনি বড় বউকে টাকা দেন, তাহলে আমাকে কেন দেন না।

 আমি ছোটলোকের বাচ্চা আর আপনার বাপ মনে হয় খুব বড় মাপের মন মানসিকতার মানুষ ছিল। সেই জন্য বৌমার ছেঁড়া কাপড়ে শরীর দেখা গেলেও কিন্তু আপনার লজ্জা বোধ হয় না।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- ছোট বৌমা; 
মরা বাপের নামে কথা বলবে না।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমি 
সারাদিন সংসারের জন্য কাজকর্ম করে থাকি। আর বড় বউ আনন্দে করে নেচে বেড়ায় আবার হুকুম করবে মালিকের মতো।

 বাবা, আপনি তো আমাদের অভিভাবক এবার দুর্গা পুজোয় আমার একটা শাড়ি পর্যন্ত কিনে দেননি কেন! শ্বাশুড়ি মায়ের পুরনো কাপড় পড়ে সপ্তমী পূজা দেখতে গিয়েছিলাম।

 আর বড় বউ নতুন নতুন শাড়ি পড়ে প্রতিদিন পুজো দেখতে গিয়েছে। কেন এত বৈষম্য মূলক আচরণ করে চলেছেন।

বড় বউ সুনন্দা চিৎকার করে বলে :- 
যার স্বামী যেমন আয় করবে তার বউ তেমন কাপড় পড়বে।

সোনালী কাপড় দেখিয়ে বলে :- বাবা; 
আপনার চোখে পড়ে না, আমার শত ছিদ্র কাপড় সেলাই করে ব্যবহার করি। বড় বউ আপনার চোখের পদ্মায় কাপড় বেঁধে দিয়েছে। সব সময় অন্ধের মত দেখেও দেখেন না।

শশুর গিরিশচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়।

সোনালী পথ অবরোধ করে বলে :- 
বাবা; আপনার তো দুটি মাত্র সন্তান তাহলে দুই সন্তানকে দুই রকম চোখে দেখে চলেছেন কেন! জবাব দিন।

শাশুড়ি চন্দ্রা বলে :- ছোট বউ চুপ
 করো, বড় বউয়ের দৌলতেই তোমরা খেয়ে-পড়ে বেঁচে আছি।

সোনালী বলে :- তাহলে, বাবা আপনার 
আর কোন কর্তৃত্ব নেই। সবকিছু বড় বউ আর বড় ছেলের আয়ত্বের মধ্যে অর্থাৎ ছোট ভাই কে ফাঁকি দিয়ে ধনসম্পদ, বাড়ি ও ব্যবসা সব কিছুই নিজের করে নিয়েছে।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- এই সংসার আমি 
পরিচালনা করি।

সোনালী বলে :- বাবা; তাহলে এই
 সংসারে বসবাস করার ও দুমুঠো ভাত খাওয়ার জন্য বড় বৌয়ের নিকটে দয়া ভিক্ষা চাইতে হবে।

শাশুড়ি চন্দ্রা বলে :- তোমরা চুপ করো
 তো।

সোনালী তার শাশুড়ির সামনে গিয়ে 
বলে :- মা; তাহলে বড় বৌ আপনার মগজ ধোলাই পরিপূর্ণ ভাবে করেছে। তার জন্যই চোরের পক্ষে সমর্থন করে চলেছেন।

 আমি বলে দিচ্ছি একদিন বড় বউ আপনাকেও ছুঁড়ে ফেলে দেবে আর সেই দিন ছোট বউয়ের কথা মনে পড়বে। তখন সারা জীবন কান্না কাটি করে কোন কূলকিনারা পাবেন না।

বড় বউ সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে দ্রুত পায়ে সোনালীর নিকটে গিয়ে চর থাপ্পর মারতে শুরু করে। সোনালী বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে ওঠে। সোনালীর লম্বা লম্বা চুল মুঠো করে ধরে মেঝেতে ফেলে দেয়।

পাকা মেঝেতে আঘাত করতে করতে 
বড় বউ সুনন্দা বলে :- মাগী, তোরা দুজনে বসে বসে খাচ্ছে কিন্তু সংসারে এক টাকা দেওয়ার মুরোদ নেই তাদের আবার বড় বড় কথা। 

আমার স্বামীর রোজগারের টাকায় আমি আনন্দ ফুর্তি করি তা তোর বাপ ভাইয়ের কি! আমাদের নামে চোর বদনাম আজ তোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে যমের ঘরে পাঠিয়ে দেবো।

ছোট বউ সোনালীর নাক মুখ দিয়ে রক্ত 
বের হচ্ছে তবুও চিৎকার করে বলে :- আমাকে মেরে ফেললো বাঁচাও, আমাকে মেরে ফেললো বাঁচাও, বাবা আমাকে মেরে ফেললো বাঁচান।

বাবা গিরিশ চন্দ্র বলে :- বড় বউ থামো
 থামো। ছোট বৌয়ের আজ অনেক শিক্ষা হয়েছে।

বড় বউ সুনন্দা দুই হাত দিয়ে সোনালীর 
সুন্দর চুলগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ করে ধরে টানাহেঁচড়া করতে করতে ঘরের বাইরে বারান্দায় নিয়ে আসে।

সোনালী বাঁচার জন্য ছটফট করতে করতে উঠে দাঁড়ায় আর বড় বউ সুনন্দা রাগে উত্তেজিত হয়ে দেওয়ালের দিকে জোরে ধাক্কা মারে।
সোনালী মাথা দেয়ালে লেগে ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। বাবা বাবা বলে চিৎকার করে মাথায় হাত রাখে কিন্তু হাত বেয়ে শরীর ও মেঝের উপর রক্তের ধারা পড়তে থাকে। বড় বউ সুনন্দা আবার সোনালীর উপর আক্রমণ করে বসে।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র বলেন :- বড় বউ 
ছেড়ে দাও আর মেরো না অনেক মারামারি হয়েছে এবার থামাও।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- বাবা; আপনি 
ঝামেলার মধ্যে আসবে না। 

বাবা গিরিশচন্দ্র মারামারি মধ্যে গিয়ে মারামারি কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে থাকে। ছোট বউয়ের শরীরের উপর থাকা বড় বউয়ের শরীর কে দুই হাত দিয়ে জাপটে ধরে টানতে শুরু করে।

বড় বউ জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠতে 
যায় আর সেই মুহূর্তে বড় বউয়ের পিঠ ও মাথা তার শ্বশুরের বুকে আঘাত করে।

 বৃদ্ধ শশুর মশাই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ফুটবলের মত ছুটে গিয়ে দেয়ালে লেগে মাথা ফেটে রক্তের বন্যা বয়ে চলে। 

শ্বশুর মশাই হাতে পায়ে ও মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও কিন্তু তবুও দুই বউয়ের গন্ডগোল মেটানোর চেষ্টা করার জন্য আবার উঠে দাঁড়ায়। আর সেই মুহূর্তে সোনালী দৌড়িয়ে পালাতে গিয়ে শ্বশুরের সাথে ধাক্কা লাগে। 

শশুর মশাই চিৎ হয়ে মেঝেতে পড়ে 
গিয়ে বলেন :- বড় বউ আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, কে কোথায় আছো বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে থাকে।  

বড় বউ সুনন্দা তার শ্বাশুড়ি চন্দ্রার 
দিকে বড় বড় চোখ করে বলে :- আপনার স্বামীকে সোনালী মেরে ফেলল আর আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।

সোনালীর উপর দুই দিক থেকে দুজনে আক্রমণ করে মেঝের উপর ফেলে দিয়ে নতুন করে মারধর শুরু করে।

শ্বাশুড়ি চন্দ্রা চিৎকার করে সোনালী কে 
মারতে মারতে অশ্লীল ভাষায় খিস্তি দিতে দিতে বলে :- মাগি, আমার স্বামীকে মারলি বলে মরা কান্না করতে করতে চুলের মুঠি ধরে মেঝের উপর আঘাত করতে থাকে। 

শ্বাশুড়ি ও বড় বৌমা দুজনে মিলে সোনালীকে লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে টানাহ্যাঁচড়া করে বাড়ির উঠানে নিয়ে এসে ফেলে দেয়।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট 
করে চিৎকার করতে থাকে :- আমাকে একটু জল দিয়ে বাঁচাও। আমাকে একটু জল দিয়ে বাঁচাও। 

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র ভাবে মনে :- জলের তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায় তবুও তো কেউ একটু জল দেয় না। আমার স্ত্রী চন্দ্রা তার ছোট বৌমার মারতে শুরু করেছে কিন্তু আমার রক্ত ঝরছে সে দিকে লক্ষ্য নেই। ভীষনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পড়ে আছি কিন্তু কেউ দেখছে না সংসারে সবাই স্বার্থপর। 

সোনালী আত্মচিৎকার করে ওঠে 
আমাকে মেরে ফেলল বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও।

শ্বশুর গিরিশচন্দ্র ভাবে মনে :- আজকের এই ঘটনার জন্য আমি দায়ী কারণ দীর্ঘ দিন অবহেলার ফলে এমতাবস্থায় হয়েছে। 

আমার কিছুই করার নেই আমি বড় অসহায়। বড় বউয়ের কথা শুনে ছোট বউয়ের প্রতি ভীষণ ভাবে অন্যায় করা হয়েছে। 

ছোট বৌমা ছোট বৌমা বলে ডাকতে ডাকতে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে মাজা হয়তো ভেঙে গিয়েছে। 

তবুও বসে বসে গড়াগড়ি দিয়ে বড় বৌমার কাছাকাছি হয়ে তার পায়ের উপর হাত রেখে বলে :- ছোট বউকে আর মেরো না, মরে যাবে। 
বলে মেঝের উপর তার শরীর এলিয়ে পড়ে কিন্তু সেদিকে কারোরই লক্ষ্য নেই।

শ্বাশুড়ি চন্দ্রা অশ্লীল ভাষায় কিস্তি দিয়ে 
বলে :- আজ থেকে এই বাড়ির ভাত কাপড় সব বন্ধ, তোর সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে চাই না। এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আসলেই, তো কে খুন করে ফেলবো। চলে যা চলে যা আমি তোর মুখ দেখতে চাই না।

প্রকৃতির নিয়মে প্রতিদিনের মতো সূর্য তার নিয়ম অনুসারে আস্তে চলে গিয়েছে। সন্ধিক্ষণের সময় পুজো প্যান্ডেলের মাইকের মাধ্যমে মা দুর্গার বিসর্জনের সুরের আওয়াজ ভেসে আসছে। চারদিকে মায়ের বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে। মা দুর্গার বিসর্জনের সাথে সাথেই হয়তো সোনালীর জীবনের আজ বিসর্জনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে।

সোনালী কে বিসর্জন দেওয়ার জন্যই 
শাশুড়ি ও বৌমা মিলিত হয়ে দুজন দুহাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির উঠানে তুলসী গাছের তলায় নিয়ে আসে। 
সোনালীর আর কোন চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে না। দেহে প্রাণ আছে কিনা তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন।

ক্রোধের আগুনে শাশুড়ি ও বড় বৌমা জ্বলে উঠে, ছোট বউ সোনালীর চিতার আগুন দেওয়ার ব্যবস্থার জন্য অচৈতন্য দেহের উপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার করতে থাকে।

হিন্দু ধর্মের মঙ্গলামঙ্গল সব ভুলে গিয়ে সন্ধ্যাকালে তুলসী তলায় প্রদীপ দেওয়ার কেউ নাই। প্রদীপের বদলে অর্ধমৃত সোনালী তুলসী তলায় পড়ে আছে।

বয়স্ক শাশুড়ি চন্দ্রা তার স্বামীর প্রতি কোন লক্ষ্য না করে তিনিও বিধবা হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছেন। বারান্দায় শ্বশুর গিরিশচন্দ্র আর ছোট বৌমা তুলসী তলায় শুয়ে আছে।

নদীয়া জেলার নাকাশিপাড়া থানার অধীনে সোনাডাঙ্গা গ্রাম ভবানন্দের পিতৃপুরুষের জন্মভিটা ও সোনালীর শ্বশুর কুলে বসবাস। সোনালীর জন্মভূমি মাধব পুর গ্রাম।

সোনাডাঙ্গা গ্রামের এক যুবক ছেলে 
সুরজিৎ ভবানন্দের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বউ সুনন্দা চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পায়। এগিয়ে এসে বাড়ির সদর গেট তালাবদ্ধ দেখে বাড়ির উঠোনের দিকে চোখ পড়তেই, উঠানের মধ্যে শায়িত সোনালী বৌদির ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে রক্ত ঝরে চলেছে এই দৃশ্য দেখে চমকিত হয়ে উঠে।

সুরজিৎ সহ্য করতে না পেরে ভবানন্দের খোঁজার উদ্দেশ্যে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এলোমেলোভাবে দৌড়াতে শুরু করে।

ভবানন্দ টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে শহরে এক বাল্যবন্ধু নিকটে গিয়ে ছিলো। আংশিক আশার আলো দেখতে পেয়ে ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায়।

সারা দিন হাঁটাহাঁটি করে অতিরিক্ত পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত আসে। গ্রামের রাস্তার পাশে একটি পুকুরের ধারে বটবৃক্ষের ছায়া তলে বসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসতে যাবে আর সেই মুহূর্তে সুরজিৎ হাঁপাতে হাঁপাতে ভবানন্দের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।

সুরজিত হাঁপাতে হাঁপাতে বলে :- ভবাদা 
তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে, সোনালী বৌদি কে হয়তো তোমার মা ও বৌদি মেরে ফেলার চেষ্টা করছো। দেখে এলাম উঠানোর মাঝে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে অচৈতন্য দেহ পড়ে আছে।

ভবানন্দ সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করে উঠে।

সুরজিৎ নিঃশ্বাস নিয়ে বলে :- বৌদি কে 
দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে, তাড়াতাড়ি চলো না হলে হয়তো মারা যেতে পারে।

ভবানন্দ বলে :- ভাই সুরজিৎ একটি 
অ্যাম্বুলেন্স বা যেকোনো গাড়ির ব্যবস্থা করো সাথে যদি সম্ভব হয় কিছু টাকা। 

ভবানন্দ সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাড়ার মধ্য দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। আর চিৎকার করে পাড়া প্রতিবেশীদের কে সাহায্য করার জন্য তাদের বাড়িতে আসতে বলে।

বাড়ির গেটের সামনে এসে দেখতে পায় সোনালীকে তার বৌদি ও মা পিটিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ির গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাড়ার লোকজন কেউ ভিতরে ঢুকতে পারছে না।

ভবানন্দের সাথে সাথে আশা মানুষের উদ্দেশ্য করে বলে :- আমি গেটের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছি আর আপনারা তালা ভেঙ্গে চলে আসুন সোনালী কে বাঁচান।

ভবানন্দ গেটের উপর থেকে পড়িমড়ি করে লাফ দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে সোনালীর কাছে এসে সোনালীকে জড়িয়ে ধরে অচৈতন্য দেহ কে।

ভবানন্দ বলে :- আর মেরো না বৌদি
 সোনালী মরে যাবে।

বড় বউ সুনন্দা বলে :- বউয়ের জন্য 
দরদ দেখানো হচ্ছে, এক বউ মরলে আরেকটি বউ নিয়ে আসা যাবে বলে ভবানন্দ কেউ পেটাতে শুরু করে।

ভবানন্দ উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমার সোনালীর যদি কিছু হয়ে যায়। বৌদি ও মা তোমাদের কাউকে ছাড়বো না। বৌদির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বৌদিকে ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় অনেক দূরে।

সুনন্দা উঠানের ইটের আঘাতে মাথা এবং দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে আক্রমণ করার জন্য উঠে বসে।

ভবানন্দের দাদা ধনঞ্জয় বলে :- আমার 
বউয়ের গায়ে হাত শয়তান কোথাকার, তোকে আজ মেরে ফেলবো বলে আক্রমণ করে।

ভবানন্দ আক্রমণ প্রতিহত করে চলেছে 
কিন্তু একটি লাঠির আঘাত সোনালীর শরীরের উপর পড়ে। আর ভবানন্দ রাগে উত্তেজিত হয়ে দাদার উপর আক্রমণ করে উঠানের মাঝে ফেলে দেয়। তারপর দুই ভাইয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে।

অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরে গেট ভেঙে প্রতিবেশী মানুষেরা বাড়ির উঠানে চলে আসে। পাড়ার মহিলাগণ মিলিত হয়ে ভবানন্দের মা চন্দ্রা ও বৌদি সুনন্দাকে গণধোলাই দিতে শুরু করে। আর পুরুষগণ ধনঞ্জয় কে ধরে নিয়ে পেটাতে থাকে। 
বয়স্ক কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা ভবানন্দের বাবাকে খোঁজ করতে থাকে।

প্রতিবেশীরা বলে :- ধনঞ্জয় তোদের 
অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি আর নয়, শান্তশিষ্ট সরল সোজা সোনালীকে যখন তোরা মেরে ফেলার চক্রান্ত করে তার শরীর কে রক্তাক্ত করেছিস এবার কিন্তু জেলখানাতে থাকার ব্যবস্থা করছি বলে নাকাশিপাড়া থানায় ফোন করে এক প্রতিবেশী।

ভবানন্দ উত্তেজিত হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে দাদার ঘরে ঢুকে পড়ে। দা দিয়ে আলমারি ভেঙ্গে পাশে থাকা ব্যাগের মধ্যে টাকা সোনা গয়না হাতের কাছে যা পেয়েছে ভরে নিয়ে দ্রুত সোনালীর কাছে আসে। প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে সাহায্য করুন। সোনালীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমার সোনালী কে বাঁচান। এখনো দেহে প্রাণ আছে। সোনালী আমি তোমাকে মরতে দেবে না। বলে সোনালীর দেহ পাঁজা কোলা করে তুলে নিয়ে গেটের দিকে চলতে থাকে।

ঘটনাস্থলে সুরজিৎ অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসে। দ্রুত পর্যায়ে সোনালী কে অ্যাম্বুলেন্স তোলা হয় আর সেই মুহূর্তে পুলিশ ভ্যান ঘটনাস্থলে এসে দাঁড়ায়। পুলিশ কর্তা সোনালীর অবস্থা দেখে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। অ্যাম্বুলেন্স চলতে শুরু করে।

গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় ও 
পুলিশের তৎপরতায় শ্বশুর গিরিশ চন্দ্র কে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। পুলিশ কর্মকর্তা বধূ নির্যাতনের দায়ে সোনালী শ্বাশুড়ি চন্দ্রা, জা সুনন্দা ও ভাসুর ধনঞ্জয় কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। প্রাথমিক চিকিৎসা করার পর জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকে।

বিজয় দশমীর দুর্গা মায়ের বিদায় দেওয়ার তৎপরতা চলছে রাস্তায় রাস্তায় আনন্দ উল্লাস তার মাঝেই সোনালী অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে শুয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে ভব সংসারের মাঝে থেকে বিসর্জন নেওয়ার জন্য।

পুলিশের তৎপরতায় জরুরী বিভাগে সোনালী কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাথমিক হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা করে জেলা সদর হাসপাতালে হস্তান্তর করে।

জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক
 মহাশয় বলেন :- রোগীর প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়েছে কিন্তু এখনো রক্তের প্রয়োজন।

ভবানন্দ ডাক্তার বাবুর কাছে থেকে সোনালীর রক্তের গ্রুপ জেনে নিয়ে হাসপাতালের বাহিরে অপেক্ষারত প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্য বলে :- এই গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন কিন্তু কাহারো রক্তের গ্রুপ জানা আছে।

সোনালীর রক্তের গ্রুপের সাথে কয়েক জনের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিলে যায়।

দীর্ঘ সময় পর ডাক্তার বাবুর সাথে দেখা 
করে ভবানন্দ বলে :- ডাক্তার বাবু, সোনালীর অবস্থা কেমন! কিন্তু আমার সোনালী বাঁচবে তো?

ডাক্তার বাবু বলেন :- সোনালীর চিকিৎসা চলছে কিন্তু ৪৮ ঘন্টা পার না হলে কিছুই বলতে পারবে না। জ্ঞান এখনো ফিরে আসে নাই তবে সম্পূর্ণ বিপদ মুক্ত বলা যাবে না, হয়তো মাথায় অপারেশন করতে হতে পারে।

সোনালীর শ্বশুর কে প্রাথমিক চিকিৎসা করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয় কিন্তু থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। 

ভবানন্দের বন্ধু স্বপন শুনতে পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে এসে ভবানন্দের সাথে দেখা করে ।

স্বপন বলে :- টাকার চিন্তা করতে হবে
 না, আমি ব্যবস্থা করে দেবো কিন্তু সোনালী কে বাঁচাতে হবে। তোর শ্বশুর বাড়িতে ফোন করেছিস!

ভবানন্দ বলে :- ফোন করার সময় পেলাম কোথায়।

স্বপন বলে :- আমি ফোন করছি । স্বপন ফোন করে অপর প্রান্তে থেকে আওয়াজ আসে হ্যালো হ্যালো।

স্বপন বলে :- আপনি কে বলছেন। 

ভবানন্দ বলে :- ফোনটা আমার কাছে দে, ফোন নিয়ে কথা বলতে শুরু করে হ্যালো বৌদি, আমি ভবানন্দ বলছি। সোনালী এক দুর্ঘটনায় কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে দ্রুত তোমরা চলে এসো, বৌদি আমার সোনালী কে বাঁচাও ।

বৌদি বলে :- কিভাবে দুর্ঘটনা ঘটলো ? 

ভবানন্দ বলে :- দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে, আগে হাসপাতালে আসেন তারপর বিস্তারিত বলছি বলে ফোনটা কেটে দেয়। 

প্রতিবেশীরা বিভিন্নভাবে সান্তনা দিতে থাকে । গভীর রাতে ভবানন্দের শ্বশুর কার্তিক,শাশুড়ি অনিমা, সোনালীর দাদা অনিমেষ, বৌদি লাবণ্যময়ী , ভাইপো অখিল ,ভাইজি লবঙ্গলতা (সংক্ষেপে লতা বলে ডাকে সবাই) ও ছোট বোন জবা এসে উপস্থিত হয় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।

ভবানন্দ কে দেখতে পেয়ে উদ্বেগ পূর্ণ ভাবে সবাই দ্রুত ছুটে আসে ।

সোনালীর দাদা-বৌদি বলেন :- সোনালীর কি হয়েছে ভবানন্দ ?

ভবানন্দ তার বউয়ের দাদা অনিমেষ কে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে শুরু করে দেয়। দাদা আমার সোনালী কে বাঁচাও।

দাদা অনিমেষ বলে :- হাসপাতাল বন্ধ 
এখন তো আর সোনালীকে দেখা যাবে না, ঘটনা কি ঘটেছে বলো । 

ভবানন্দ ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিতে শুরু করে।

সোনালী বাবার বংশের ছোট কাকার ছেলে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার তিনি ফোন পাওয়া মাত্রই নাকাশীপাড়া থানা কে ফোন করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে বলেন। পুলিশ কর্তার ফোন পেয়ে লোকাল থানার অফিসার চন্দ্রা, সুনন্দা ও ধনঞ্জয় কে থানার লকআপে রেখে পুলিশ ধোলাইয়ের (অর্থাৎ পুলিশের পেটানো) ব্যবস্থা করে। পুলিশের হাতে মার খেতে খেতে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করে। পুলিশ সোনালীর উপর বধূ নির্যাতন ও খুনের চেষ্টা কেস ফাইল করে।

-----------------------------------------------------------------                     ।। ষষ্ঠ অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------------------
সোনালী কে কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতাল থেকে কৃষ্ণনগর শক্তিনগর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। 
দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকগণ ও টিভি চ্যানেল সহ বিভিন্ন মিডিয়া দ্রুত হাসপাতাল চত্বরে চলে আসে। দুঃখজনক সংবাদ সারাদেশে প্রচার করতে থাকে। দোষীদের শাস্তির জন্য বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে
নারী আন্দোলনের ঝড় ওঠে।

সোনালীর জ্ঞান ফিরে আসার পর কল্যাণী হাসপাতালে চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সোনালীর বাবা-মা দাদা বৌদি সবাই একে একে সবাই দেখতে আসে।

সোনালী তার বাবা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- আমাকে আর জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিও না কারণ শ্বাশুড়ি ও বড় জা আমাকে মেরে ফেলবে।

সোনালীর বাবা বলে :- আগে সুস্থ হয়ে ওঠো তারপর আমাদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করছি। 

সোনালীর কাকা অখিলেশ দেখা করে বলে :- মা; তুমি স্বামীর জন্য লড়াই করতে গিয়ে আজ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছো। তোমার মতো নারী যেন বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম নেয়। স্বামীর প্রতি ভালোবাসার জন্য তোমাকে স্যালুট করি। প্রতিবাদ করে ঘরের বউদের চোখ খুলে দিয়েছিস হয়তো এবার শাশুড়িরা ভয় পাবে।। আর এই পরিবারের অত্যাচারীদের আইনের মাধ্যমে সাজা হবে।

সোনালী বলে :- কাকা ; বাবাকে বলে আমার অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা কর। যা হয়ে গিয়েছে তাহা আর ফেরত আসবে না কিন্তু মামলা-মোকদ্দমার জড়াতে চাইনা। আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম ।

কাকা অখিলেশ বলে :- এখন আর কোন উপায় নেই মা, তুমি না চাইলেও পুলিশ কেস হয়ে গেছে। সারাদেশে নারীগণ সোনালীর উপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগদান করেছেন। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান না করলে আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে।

এই ধরনের অপরাধ কারী মানুষেরা ভয় পাবে না কিন্তু আইন শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। বাড়ির বউদের কে সব সময় দুর্বল ভেবে কাপুরুষের দল অত্যাচার চালিয়ে থাকে। তোমার প্রতিবাদী আন্দোলন প্রশংসনীয়। মা সোনালী ভয় পেয়ো না তোমার কাকা আইনের রক্ষক তোমার সাথে সব সময় থাকবো। বলে সোনালী কে আদর করতে থাকে।

ভবানন্দ বাড়িতে থাকার নাম করে এক রাতে নকল চাবি দিয়ে ঘরের দরজা খুলে দাদা ও বাবার ঘরে ঢুকে তাদের নগদ টাকা ও সোনার গয়না লুট করে নিয়ে তার ঘরে এসে ভাবে; এই টাকার জন্যই তোমাদের সাথে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই টাকা পয়সা কি মূল্য আছে! তোমরা তো জেলে বসে আছো। দাদা ও বৌদি তোমার পঙ্গু ছেলে কে, কে দেখাশোনা করবে। তোমাদের জমানো টাকা গয়না আমি সোনালী চিকিৎসার জন্য খরচ করবো। 

সোনালীর চিকিৎসক ডাক্তার বাবু কয়েক দিন পর চিকিৎসার বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার কাগজ পত্র নাড়াচাড়া করতে করতে ভবানন্দ কে বললেন :- আপনার স্ত্রীর আর কোন সমস্যা নেই কারণ মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে ভালো হয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে থাকলে অপারেশনের প্রয়োজন হতো। কয়েক মাসের চিকিৎসার মাধ্যমে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। 

সোনালীর শ্বশুর, শাশুড়ি , ভাসুর ও বড় জা'য়ের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মামলা সহ ভারতীয় বধূ নির্যাতন ও খুনের চেষ্টা মামলা দায়ের হয় বর্তমান মামলা কোর্টে বিচারাধীন ।

ভবানন্দের বিকলাঙ্গ ভাইপো তার বৌদির বাবা-মা নিয়ে গিয়েছে। সোনার সংসার বধূ নির্যাতনের দায়ে পুড়ে হলো ছারখার। কয়েক মাসের মধ্যেই ভবানন্দের বাড়ি এখন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। 

মানুষের অভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যা বাতি জ্বলছে না। বাড়িতে এখন জল পাতা জমে নোংরা আবর্জনার স্তুপ হয়ে পড়েছে। প্রতিবেশীরা উক্ত বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় চমকিত হয়ে ওঠে ভাবে; ঐ সোনালী আত্ম চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

সোনালী কয়েক মাস চিকিৎসাধীন থেকে হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার আগের মুহূর্তে ভবানন্দ বলে :- চলো; আমরা বাড়ি ফিরে যায়।

সোনালী বলে :- যে বাড়িতে আমার সম্মান দেওয়া হয়নি ,সেই বাড়ীতে আমি আর কোনদিন ফিরে যাবো না। আমার কারনে তোমার বাবা-মা, দাদা ও বৌদি জেলে গিয়েছে। আমি তাহাদের শত্রু আবার আমার শত্রু কিন্তু শত্রুর সংসারে আমি আর ফিরে যেতে চাই না।

ভবানন্দ বলে :- আমার পরিবারের লোকজন তোমার সাথে অন্যায় করেছে কিন্তু তাহারা অন্যায়ের প্রতিফল জেলে থেকে ভোগ করছে। শুধু শুধু তোমার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবে!

সোনালী বলে :- তোমার যদি ধন সম্পত্তির লোভের আশা থাকে, তাহলে তুমি আমাকে ত্যাগ করতে পারে। জন্মভূমি জন্মভিটে তুমি যেতে পারো কিন্তু আমি কোনদিন যাবে না। যদি আমার কথাগুলো তোমার কাছে শুনতে খারাপ লাগে তাহলে কিন্তু তোমাকে মুক্তি দিলাম। সংসার করার কি জ্বালা তা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছি! আর নয়।

ভবানন্দ বলে :- তুমি এমন অলক্ষুণে কথা কিন্তু আর কখনো বলবে না। তোমাকে ত্যাগ করার ইচ্ছা থাকলে কিন্তু অনেক আগেই করতে পারতাম। এখানে ত্যাগ করার কোন প্রশ্নই উঠে না। আমি তোমাকে কত ভালবাসি তা বোঝাবো কেমন করে!
হনুমান হলে কিন্তু বুক চিরে দেখাতে পারতাম।

সোনালী বলে :- যদি ভালোবেসে থাকো আর আমার সাথে সংসার করতে চাও, তাহলে চলো আমার বাবার বাড়িতে। না হলে অন্য কোথাও চলে যায়।

ভবানন্দ বলে :- তোমার যেমন ইচ্ছা। কিন্তু সারা জীবন তোমার সাথে থাকতে চাই।

সোনালী তার বাবার বাড়িতে স্বামী ভবানন্দ কে নিয়ে নতুন করে আবার সংসার শুরু করার স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে।

----------------------------------------------------------
                ।। সপ্তম অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সোনালী তার দাদা-বৌদির সংসারে আশ্রিত হয়ে বসবাস শুরু করেছে। সংসারের জন্য কোনো চিন্তাভাবনা নেই স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। 

মাঝে মাঝেই ভবানন্দের ভবো রোগে আক্রান্ত হয়ে শুধু ভেবে চলেছে কিন্তু কোন কুল কিনারা করতে পারছে না। কোন কাজ কর্ম তার পছন্দ হচ্ছে না। সোনালী চোখের আড়াল হলেই সুযোগ পেলেই নব যৌবনের শালিকা কুমারী জবা রানীর সাথে আড্ডা দিতে শুরু করে।

সোনালীর বৌদি একদিন নির্জন ঘরে সোনালী কে ডেকে বলে :- আর কতদিন বাপের বাড়িতে কাজকর্ম না করে বসে বসে চলবে। শ্বশুর বাড়িতে অশান্তি করে বাপের বাড়িতে এসেছো ঠিক কিন্তু দাদা বৌদিকে জ্বালাতন করতে।

সোনালী বলে :- বৌদি এমন ভাবে বলে না।

সোনালীর বৌদি বলে :- ননদী তোমার বাঁচানোর জন্য অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে। এখন তো তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ কিন্তু সংসারের জন্য কিছু কাজ কর্ম করো। 

সোনালী বলে :- কেন ; আমার মন মানসিকতা বুঝতে চাও না। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তোমাদের পরিবার এসেছি কিন্তু তাই বলে সব সময় খোটা দেবে নাকি।

সোনালীর বৌদি বলে :- আর তোমার স্বামী ভবানন্দ শ্বশুর বাড়ির জামাই আদর পেয়ে শরীরে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ননদী তুমিও কম নবাবী দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এই ভাবে আর দিন সংসার চলবে।  

সোনালী বলে :- মনে হচ্ছে তুমি সংসারে সর্বময় কর্তা। আয় রোজগার করে সবাইকে খাওয়াচ্ছে।

সোনালীর বৌদি বলে :- যত বড় মুখ না তত বড় কথা। আমার বিয়ের আগে শুনেছিলাম হাতি ঘোড়া কত কিছু আছে। এখন দেখি আমার বাপের থেকো আমার শ্বশুর অনেক ভিখারি। আমার সোনা গয়না গুলো তোমার চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দিতে হয়েছে।

সোনালী বলে :- খরচ করে তোমার কর্তব্য পালন করেছে কিন্তু আমার সুদিন এলে তোমার গয়না গুলো ফেরত দিয়ে দেবো।

সোনালীর বৌদি উত্তেজিত হয়ে বলে :- যা কাজকর্মের শ্রী তাতে কোনদিন আর আমার গয়না ফেরত দিতে পারবে না। একটা অপয়া মেয়ে সন্তানের জন্ম দিতে পারে না। সন্তানহীনতার মুখ দেখলে হয় সবার যাত্রা খারাপ হয়।

সোনালী বলে :- বৌদি তুমি আমাকে অপমান করছো।

সোনালীর বৌদি বলে :- তোদের দুই জনের আবার অপমান বোধ আছে। কান খুলে শুনে রাখ, আমি চাইনা তোমরা দুজন দীর্ঘদিন এই বাড়িতে বসবাস কর। অন্য কোথাও ঘর ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু কর, তখন বুঝতে পারবে কত ধানে কত চাল।
তোমার দাদাকে বলে এই বাড়ি থেকে বিদায় দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। বলে রাগে উত্তেজিত হয়ে অন অন করে বেরিয়ে যায়।

সোনালী রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে শুরু করে। আমার বৌদি মেয়ে মানুষ কিন্তু মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের যন্ত্রণা বুঝতে চায় না। এটা কি মেয়েদের স্বভাব!

আমি বিপদে পড়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু যন্ত্রণা সহ্য করে বাপের বাড়ি এসেছি। স্বামীকে কর্মের মধ্যে আবদ্ধ করার জন্য স্বামীর পরিবারের সবার সাথে বহু লড়াই ঝগড়া করেছি। ন্যায্য কথা কেউ মানতে রাজি না, শেষে কিনা আমি হলাম নির্যাতনের শিকার।

এই অপদার্থ স্বামীর জন্য দীর্ঘদিন চিকিৎসা অধীন থেকে যন্ত্রণা ভোগ করলাম। এই স্বামীর সাথে বসবাস করে জীবনে সুখ শান্তি পেলাম না। সন্তান জন্ম দেওয়ার দায়িত্ব শুধু কি আমার একার! স্বামীর কি কোনো দোষ নেই?

বাপের বাড়িতে এসো আমার শান্তি নাই। বৌদি আমার উপর সব সময় মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলে। দাদা এবং বাবা মায়ের আড়ালে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে মুক্তি লাভ করার উপায় কি?

স্বামীকে কাজকর্ম করার কথা বললে বলে কাজের সন্ধান করছি কিন্তু ভালো কাজ পাচ্ছি না। চেষ্টা করলে কাজ পাওয়া যায় না, এটা কিন্তু অসম্ভব ব্যাপার। আসল সমস্যা হলো নিজেকে লেখাপড়া জানা সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে বড় ভাবে।

ছোট কাজ বাবুর পছন্দ হয় না কিন্তু শশুর বাড়ি ঘর জামাই সেজে বসবাস করতে সম্মানবোধ থাকে কোথায়! ইদানিং দেখছি অনেক রাত করে বাড়িতে ফিরে আসে। কোন অসৎ সঙ্গের সাথে জড়িয়ে পড়ে নিতো! 

এইভাবে সুখ-দুঃখের মাঝে দিয়ে আরও কয়েকটি মাস অতিবাহিত হয়ে যায়। ভবানন্দ দ্রুত ঘরে ঢুকে সোনালী সোনালী বলে ডাকতে থাকে। ঘরে ঢুকে দেখতে পায় সোনালী ঘুমিয়ে আছে। ধীরে ধীরে সোনালীর কাছে গিয়ে আদর করে জাগানোর চেষ্টা করে।

ঘুম জড়ানো চোখে সোনালি বলে :- কি হয়েছে বলো! এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে। তোমার চিন্তায় চিন্তায় আমি হয়ে অসুস্থ পড়েছি।

ভবানন্দ তার দুই বাহু প্রসারিত করে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা সোনালী কে টেনে তুলে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে :- আমার নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না কারণ চিন্তা রোগ দূর করার ঔষধি গাছ পেয়ে গিয়েছি। এখন থেকে তুমি আর আমি নীল আকাশের মাঝে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে। তোমার বাবার বাড়িতে থাকার আর যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না।

সোনালী ঘুম ঘুম চোখে তার মাথা স্বামীর কাঁধে রেখে বলে :- হেঁয়ালি না করে কি হয়েছে বলে?

ভবানন্দ বলে :- খাওয়া দাওয়া করেছো।

সোনালী তার দেহ হেলিয়ে দিয়ে বলে :- না;

ভবানন্দ বলে :- তাহলে চলে চলে দুজনে একসাথে খেতে খেতে কথা হবে।

সোনালী ঘুম জড়ানো চোখে স্বামী ভবানন্দ কে বলে :- ঔষধি গাছ পেয়েছো মানে নেশা করেনি তো! রাত দুপুরে এসে উল্টো পাল্টা বলে চলেছে।

ভবানন্দ সোনালীর দেহ ধরে ঝাকি দিয়ে ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে বলে :- সোনালীর ভালবাসার নেশা করেছি। একবার তো চোখ মেলে তাকাও।
সোনালী কর্ম পেয়ে গেছি এবার কিন্তু তোমার সাথে সংসার করবো।

সোনালী বলে :- কি কাজ হয়েছে! 

ভবানন্দ বলে :- ব্যবসার হিসাব নিকাশ লেখালেখির কাজ।

সোনালী চোখে হাত বুলাতে বুলাতে বলে :- কোথায় কার কাছে?

ভবানন্দ বলে :- বড় ব্যবসায়ী আশুতোষ সাহা মহাশয়ের নিকট কাজ করতে হবে।

সোনালী বলে :- কত টাকা বেতন দেবে।

ভবানন্দ বলে :- প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা দেবেন। এক বছর কাজ করার পর আমার দক্ষতা দেখে টাকা বাড়বে।

সোনালী তার স্বামীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে :- মন প্রাণ দিয়ে সৎ ভাবে কর্ম করবে। তোমার কাজ করার মন মানসিকতা তৈরি হওয়ার কারণে আমি কিন্তু ভীষন ভাবে আনন্দিত।

ভবানন্দ বলে :- লোকে বলে ঘরের বউ নাকি লক্ষীর শ্রী,তা গৃহকর্ত্রী আপনার কথায় শিরোধার্য। আপনার পিতা শ্রী মহাশয় কৃপা করে জামাইয়ের কর্মের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। 

সোনালী আনন্দিত হয়ে বলে :- তাহলে অন্য কোথাও বাসা ভাড়ার ব্যবস্থা করে।

ভবানন্দ বলে :- মালিক আশুতোষ কাকা কে আমাদের ঘর জামাই থাকার দুরবস্থার কথা আলোচনা করি। 

ঘটনা শোনার পর কাকা আমাকে অগ্রিম এক মাসের বেতন দিয়ে বলেন :- আজকের মধ্যেই ঘর ভাড়া নেবে এবং রবিবার উক্ত ঘরে প্রবেশ করবে। আশীর্বাদ করি তোমরা সুখী হও।

সোনালী বলে :- ঘর দেখে এসেছো কি! আমার আর এখানে একদিন থাকার ইচ্ছা নেই।

ভবানন্দ বলে :- ঘরের ব্যবস্থা করে এসেছি। সকালে দুই জন মিলে গিয়ে পরিস্কার করে আসতে হবে। রবিবার ছুটির দিন নতুন সংসার শুরু করবো।

সোনালী বলে :- কোথায় ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে।

ভবানন্দ বলে :- নদীর ওপারে শৈলমারী বাজার শনিদেবের মন্দিরের সন্নিকটে মৃত শৈলেন হালদার মহাশয়ের বাড়িতে।

সোনালী বলে :- ওনার দুই ছেলে বড় ধরনের সরকারি চাকরি করে। একমাত্র মাকে দেখাশোনার নাম করে না কিন্তু টাকা পাঠিয়ে দিয়ে কর্তব্য শেষ করতে চাই। ছেলে কি সুখ শান্তি তা বৃদ্ধ বয়সে হাড়ে হাড়ে তিনি উপলব্ধি করতে পাচ্ছেন। বছরে একবার দেখা করতে আসে। সব সময় তারা নাকি কাজে ব্যস্ত।  

ভবানন্দ বলে :- প্রবাদ বাক্য বলে "নারী কিন্তু নারীর শত্রু।" আধুনিকতার শিক্ষিত বৌমা হয়ে জানিয়ে দিয়েছে, বয়স্ক শ্বাশুড়ির দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

সোনালী বলে :- দেখ; প্রকৃতির কি লীলা! আমার শাশুড়িকে আপন করে কাছে পেতে চেয়েছিলাম কিন্তু সব সময় অত্যাচার করে দূরে সরিয়ে দিতেন।

ভবানন্দ বলে :- আরো বলেছে শাশুড়ি নাকি শিক্ষিত নয় গায়ের ভূত তার গাঁও গ্রামে মানায় ভালো। শহরের আদব কায়দায় কাছে নাকি বয়স্ক মানুষ জঞ্জাল। দুই বৌমা মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের বয়স্ক শ্বাশুড়ী কে গ্রামে রেখে মাসে মাসে টাকা দিলেই হবে।

সোনালী বলে :- উক্ত বয়স্ক মহিলা তাহলে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্যে রয়েছে। 

ভবানন্দ বলে :- সোনালী ; তোমাকে কিন্তু অসহায় মায়ের দায়িত্ব নিতে হবে কারণ আমি বৃদ্ধ মায়ের কথা দিয়েছি। 

সোনালী বলে :- ঠিক আছে কিন্তু রাত অনেক হয়েছে। চলো খাবার খেতে, আমার ভীষণ খিদে পেয়ে গেছে।

ভবানন্দ বলে :- এত রাত হয়ে গেছে কেন খাওনি?

সোনালী বলে :- তোমার আগে কবে খেয়েছি বলতো! তুমি কি বোঝনা আমার জ্বালা?

খেজুরের পাতার পাটি বিছিয়ে স্বামী ও স্ত্রী পাশাপাশি খেতে বসে।

খেতে খেতে ভবানন্দ বলে :- শুধু ডাল ভাত আর কিছু নেই।

সোনালী বলে :- শশুর বাড়ি জামাই আদর একদিন দুদিন তারপর নিম পাতার মতো তেতো হয়ে ওঠে। বেকার জামাই হয়ে যা পাচ্ছো তাই খেয়ে নাও। বৌদি আমাদের জন্য আজকের রাতের জন্য এটা বরাদ্দ করেছে। অবশ্যই রাতে মুরগির মাংস হয়েছে কিন্তু তোমার ও আমার জন্য নয়।

ভবানন্দ বলে :- তোমার মা-বাবা ও দাদা আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারে জানেন।

সোনালী বলে :- না। আর আমিও তাদের কাছে এই বিষয়ে কোনো অভিযোগ করতে রাজি নয়। আমার কারনে বহু দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে আর তাদের দুঃখ দিতে চাই না। এসব প্রসঙ্গ বাদ দাও কিন্তু কত টাকা ঘরের ভাড়া দিতে হবে।

ভবানন্দ বলে :- বৃদ্ধ মা; আমার হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদে কাঁদে ভাবে বলেন, ঘর ভাড়া তোমাকে দিতেই হবে না বাবা কিন্তু আমার দেখাশোনা করার জন্য একজন লোক চাই। দুঃখের কথা কি বলবো! ঘরে টাকা আছে কিন্তু বাজার করে এনে রান্না করে খাবার দেওয়ার মত কেউ নেই। এই বয়সে তাও করতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে পাড়ার কিছু ছেলে টাকার বিনিময়ে বাজার ঘাট করে নিয়ে আসে।

সোনালী বলে :- তাহলে ভালো হলে একজন বয়স্ক মহিলার সেবা সুস্থতার সুযোগ পাবে।

সোনালী বিছানায় শুয়ে তার স্বামীর উদ্দেশ্য করে বলে :- তোমার বাবা মায়ের সাথে জেলখানায় দেখা করতে গিয়েছিলে।

ভবানন্দ বলে :- দেখা করতে গিয়েছিলাম কিন্তু দাদা বৌদি দেখা করতে আসে নাই। বাবা এসেছিলেন এবং তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। উকিল ধরে সবার জামিনের আবেদন করেছি। হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই সবাই বাইরে আসতে পারবেন।
-----------------------------------------------------------------
                    ।। অষ্টম অধ্যায় ।। 
-----------------------------------------------------------------
ভবানন্দ জীবনের প্রথম বার টাকা উপার্জন করার জন্য কর্মে নিয়োজিত হয়ে কিন্তু আনন্দের সহিত কাজ করতে থাকে। ছাত্র জীবনে অংকে ভালো থাকলেও কিন্তু সংসার ও বিবাহিত জীবনের অংকে অনেক ভুল ভ্রান্তি করার জন্য আজ গৃহহারা। নতুন করে সংসার জীবনের অংক কষতে শুরু করেছে।

সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার সকাল দশটার সময় সোনালী ও ভবানন্দ আনন্দিত মনে ভাড়া ঘরে ভবানন্দের শ্বশুর বাড়ির লোকজন ও মালিক আশুতোষ সাহা পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে গৃহ প্রবেশ করে।

সোনালীর বাবা-মা নতুন করে সংসার গড়ার জন্য হাঁড়ি, কড়াই, চৌকি , আলনা, চেয়ার, টেবিল, বাসন ও নতুন কাপড় সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়েছে। রান্না বান্না করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিকেল বেলা শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিগণ বিদায় নেয়।

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর রাতে স্বামীকে একান্ত ভাবে কাছে পেয়ে সোনালী বলে :- আজ থেকে নিজস্ব ভাবে স্বাধীনতা লাভ করলাম । স্বামীর উপর নির্ভরশীল শতকরা নব্বই জন বউ কিন্তু স্বামী যদি সামর্থ্য থাকাকালীন টাকা আয় রোজগার না করে তাহলে সেই বউয়ের সমাজের মানুষের ও সংসারের সদস্যদের কাছে কোন মূল্য থাকে না।

ভবানন্দ বলে :- গৃহকর্ত্রী মহোদয় ঠিক বলেছেন।

সোনালী বলে :- স্বামী কাজ কর্মে অসমাপ্ত হলে কিন্তু মেয়েরা আয় রোজগার করে সংসার চালিয়ে ছেলে মেয়ে প্রতিপালন করে থাকে। 

ভবানন্দ বলে :- কাজ করার কি আনন্দ তাহা এক সপ্তাহে উপলব্ধি করতে পেরেছি। এখন আর আমাদের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হবে না। স্বাধীনভাবে মুক্ত পাখির মতো বিচরণ করবো। 

ভবানন্দ দুই বাহু প্রসারিত করে আরো কাছে আসার আহ্বান জানাই। 

ভবানন্দ কে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে সোনালী বলে :- স্বাধীনতা তুমি আমাদের কাছে দিয়েছো ধরা। এই ঈশ্বর আরেকটি মনের বাসনা করো পূর্ণ।

ভবানন্দ বলে :- নারীগণ কোন দিন স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পেরেছে, না আর কোনদিন পারবে। সব সময় তাদের কে অলিখিত ভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। সামাজিক নিয়ম অনুসারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের ঘাড়ে এমন কিছু দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব থেকে কোনদিন বের হয়ে আসতে পারে না।

সোনালী বলে :- প্রথম বন্ধন স্বামীর দেওয়া শাঁখা সিঁদুর। যা প্রত্যেক নারীকে দুর্বল করে দেয় কিন্তু বলা হয় সামাজিক স্বীকৃতি। তাহলে পুরুষদের বিবাহের চিহ্ন হিসেবে কিছু থাকে না কেন!

ভবানন্দ বলে :- সেই মানব সৃষ্টির প্রারম্ভে থেকেই নারীর উপর বিভিন্নভাবে হয়ে অত্যাচার, নির্যাতন ও ধর্ষণ চলে আসছে। বুঝলে হৃদয়ের রানী হয়ে থাকো চিরকাল কিন্তু নারী হয়ে করে না বেশি অহংকার। রূপ-যৌবন সবার ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তাকে নিয়ে কেন করে বেশি অহংকার।

সোনালী বলে :- প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আনন্দের পাশাপাশি বিরহ জ্বালা যন্ত্রণা সহ উল্টোদিকে অন্ধকার থাকবে কিন্তু তুমি ও আমি কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের বাইরে নয়।

সোনালী সংসারের সচ্ছলতা বজায় রাখার ও স্বামীর উপর চাপ কমানোর জন্য কয়েক এক বছর ধরে ছেলে মেয়েদের প্রাইভেট পড়ানো চালিয়ে যাচ্ছে। মাসে গড়ে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা আয় রোজগার হয় সোনালীর। পাশাপাশি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা হওয়ার জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়ে তার পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষ করে। বয়স্ক বাড়ির মালিকের সাথে সোনালীর মা ও মেয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সোনালী বয়স্ক মালিকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

কর্মহীন ভবানন্দ এখন কাজপাগল মানুষ হয়ে উঠেছে। রবিবার ছুটির দিনে সোনালী কে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। হাসিখুশি ভরে উঠেছে তাদের সংসার জীবন কিন্তু একটি সন্তানের জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনের মনে ভীষণ দুঃখ।

আনন্দের সাগরে আরো কয়েকটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন রাতে শুয়ে ভবানন্দ ভাবে মনে :- সোনালী কে অনেক ডাক্তার ও কবিরাজ সহ যে যা বলেছেন কোন কিছুই বাদ রাখেনি কিন্তু একটি সন্তানের মুখ দেখতে পেলাম না। সোনালীর তা হলে কি সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না! কিন্তু ডাক্তার বাবু বলেছেন দু'জনের কোন সমস্যা নেই।

এই অন্তর জ্বালা বুঝবে কাকে, সোনালীর দুঃখ বুঝি কিন্তু কি করবো! বংশ রক্ষা করার জন্য তাহলে অন্য কোন নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তাহলে আবার সামাজিক ভাবে তো উক্ত নারীকে বিবাহ করতে হবে কিন্তু সোনালী কি তা মেনে নেবে! সোনালীর মনে কখনো দুঃখ দিতে চাই না কিন্তু সমাজে বসবাসকারী মানুষগুলো আমাদের শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না। আমি নাকি হাটকুড়া নিঃসন্তান বলে অপমান করে।

----------------------------------------------------------
                 ।। নবম অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সকাল বেলা ভবানন্দ দোকানে এসে খাতা নিয়ে হিসাব করার জন্য বসেছে। আর সেই মুহূর্তে নামহীন নম্বর থেকে কয়েক বার ফোন আসে।

মালিক আশুতোষ বাবু বলেন :- ভবানন্দ ফোনটা ধরে । ভবানন্দ ফোন রিসিভ করে।

অপর প্রান্ত থেকে বলে :- ভবানন্দ বলছিস।

ভবানন্দ বলে :- হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন? 

অপরপ্রান্ত থেকে বলে :- আমি ভবানন্দের বন্ধু সুজিত বলছি, তোর বাবা আজ কয়েক ঘণ্টা আগে মারা গিয়েছে খবর পেয়েছিস। 

ভবানন্দ বলে :- না।

সুজিত বলে :- মৃত্যুর আগে তোদের দুই জন কে দেখতে চেয়েছিল কিন্তু তোর দাদা বৌদি সংবাদ দেয় নাই। যাইহোক পারলে বাবার শেষ দেখা দেখে যা। আর ফোনটা হাত থেকে টেবিলে পড়ে যায়। ভবানন্দ বাবা বাবা বাবা বলে কান্না করে ওঠে। 

আশুতোষ বাবু বলে :- ভবানন্দ তোমার বাবার কি হয়েছে?

ভবানন্দ বলে :- বাবা; আমাদের মায়া ত্যাগ করে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

আশুতোষ বাবু বলেন :- তুমি দ্রুত চলে যাও বাবার মৃত্যু মুখ দেখতে।

ভবানন্দ বাড়িতে এসে সোনালী কে নিয়ে ভাড়া গাড়িতে করে রওনা দেয়। ভবানন্দের জন্মভূমি সোনাডাঙ্গা গ্রামে পৌঁছানোর পর জানতে পারে তার বাবাকে শ্মশানে নিয়ে চলে গিয়েছে। দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে শ্মশানে পৌঁছে যায়। 

ভবানন্দের দাদা ধনঞ্জয় তার ভাই কে দেখা মাত্রই মরা পোড়ানোর জ্বালানি কাঠ হাতে করে দ্রুত ছুটে 
এসে পথ অবরোধ করে বলে :- বাবার ছোঁয়ার অধিকার তোর আর নেই। আমাদের অনেক বছর ধরে জেল খাটিয়েছিল। বাবা তার ছোট ছেলে ভবানন্দ কে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। 

মরা পোড়ানোর উপস্থিত লোকজন ছুটে আসে।

ধনঞ্জয় আক্রমণাত্ম হয়ে বলে :- আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা, না হলে আজ রক্তারক্তি হয়ে যাবে। হয়তো বাবার চিতার সাথে তোর চিতার আগুন জ্বলে উঠবে। আর তোর বউকে আমার সামনে আনবি না মেরে ফেলে দেবো।

প্রতিবেশীরা ধনঞ্জয় কে ধরে নিয়ে চিতার দিকে আর ভবানন্দ কে ধরে রাস্তার দিকে
নিয়ে যায়।
  
ভবানন্দ যেতে যেতে বলে :- বাবার চিতায় আগুন আমি দেবো কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত মীমাংসা হচ্ছে না, ততক্ষণ চিতায় আগুন দেওয়া চলবে না। দাদার জেল খেটে এসেও শিক্ষা হয়নি। 
তারপর উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্য করে বলে, বাবার লাশকে পোসমাডাম করা হয়েছে।

গ্রামবাসী বলে :- না ।

ভবানন্দ বলে :- সুজিত তাহলে ফোন করে থানায়।
সুজিত ভবানন্দের ফোন নিয়ে থানার নাম্বারে ডায়াল করে।

থানা থেকে বলে :- ঠিকানা বলুন।

সুজিতের হাত থেকে ফোন নিয়ে ভবানন্দ বলে :- আমার বাবা ---- নামে মামলা চলছে কিন্তু বাবার মৃত্যু হয়েছে। দাদা ধনঞ্জয় এখনো থানা কে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। আমি অনেক দূরে বসবাস করি প্রতিবেশী বন্ধুর মারফত সংবাদ শুনে এসেছি। বাবার লাশ ডাক্তারি পরীক্ষা না করেই কিন্তু দাদা তাড়াহুড়ো করে লাশ কে জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দাদা বর্তমান বধু নির্যাতন ও খুনের মামলায় জামিনে আছেন।

থানা বলে :- এখনি পুলিশ গাড়ি নিয়ে আসছি।

ধনঞ্জয় তার বাবার মুখে আগুন দিতে যাবে, আর সেই মুহূর্তে ভবানন্দ জ্বালানি কাঠ নিয়ে দ্রুত গতিতে দাদার হাতে আঘাত করে। জলন্ত আগুনের পাটকাঠির পড়ে গিয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। 

ভবানন্দ আবার দ্রুত গতিতে রাস্তায় থাকা লোকজনের মধ্যে চলে আসে। তার দাদার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ছুটে ছুটে উভয় কিন্তু উভয়কে মারতে যায়।
লোকজন থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে যায়। 

ভবানন্দের বৌদি সুনন্দা ভবানন্দের আগমন বার্তা শুনতে পেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে শ্মশান ঘাটে
চলে আসে। গাড়ির মধ্যে সোনালীকে দেখতে পেয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে।

নাকাশিপাড়া থানার পুলিশ সোনাডাঙ্গা গ্রামের শ্মশান ঘাটে উপস্থিত হয়ে লাশকে নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসে। তারপর উপস্থিত লোকজন কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে।

উপস্থিত জনগণের এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ অফিসার বলেন :- বিচার চলাকালীন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। থানা কে না জানিয়ে লাশ পোড়ানোর ব্যবস্থা করার জন্য কিন্তু মৃত ব্যক্তির বড় ছেলে ধনঞ্জয় কে দোষী সাব্যস্ত করে গ্রেফতার করে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। লাশের পরীক্ষার নথিপত্র আসার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত থানার লকআপে রাখা হবে। শ্মশান যাত্রীদের গ্রেফতার করা হয়েছে কারণ আইন কে তারা নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্যায় করেছে।

তারপর অফিসার নির্দেশ দেন লাশকে ডাক্তারি পরীক্ষা করার জন্য মর্গে নিয়ে যেতে।

পুলিশ অফিসার ভবানন্দের কাছে গিয়ে বললেন, আপনাকেও থানায় যেতে হবে কারণ কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার আছে। লাশের অভিভাবক হিসাবে আপনাকে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে।

ভবানন্দ বলে :- চলুন স্যার। তারপর সোনালীর কাছে গিয়ে বলে তুমি বাড়িতে চলে যাও। বাবার শ্মশান যাত্রা শেষ হলে তারপর আমি বাড়িতে আছি। আর মালিক কাকাকে বলে কয়েক হাজার টাকা আমার একাউন্টে দিয়ে দেবে।

গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ও পাড়ার মেম্বার সহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাঁধা সৃষ্টি করে বলে :- বিষয়টি আমরা গ্রামের সবাই মিলিত হয়ে মিটিয়ে নিতে চাই।

পুলিশ অফিসার বলেন :- এখানে আপনারা না গলাবেন না কারণ আইনের অপরাধী। আমাকে আমার আইন মতো কাজ করতে দিন। আপনি অঞ্চল প্রধান হয়ে এরকম একটি ঘটনা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছেন কেন! প্রকারান্তরে আপনি কিন্তু অপরাধী মধ্যে পড়েন।

লাশ ও অপরাধীদের নিয়ে মাটির রাস্তার ধুলো উড়িয়ে পুলিশের গাড়ি চলতে থাকে আর তার পিছনে পিছনে সোনালির গাড়ি।

পুলিশ গিরিশ চন্দ্রের লাশ তার ছোট ছেলে ভবানন্দের নিকট হস্তান্তর করে।

ধনঞ্জয় ও ভবানন্দের বাবা গিরিশ চন্দ্রের লাশ 
পরীক্ষা করার পর ডাক্তারি নথিপত্রে খাদ্যের সাথে বিষ প্রয়োগ করে খুন করা হয়েছে তা প্রমাণিত হয়।

ভবানন্দের দাদা ধনঞ্জয় ও বৌদি সুনন্দা কে পুলিশের থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করার মাধ্যমে স্বীকার করে :- বধূ নির্যাতনের মামলার কয়েক মাস জেল হাজতে থাকার পর জামিনে বাড়ি আসার পরে তার বাবা ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সুযোগে বাবার কাছে থেকে সব সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর তাকে খাদ্যের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করে খুন করা হয়েছে। 

ভবানন্দের বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর পুলিশ ধনঞ্জয় ও সুনন্দাকে গ্রেপ্তার করে খুনের মামলা দায়ের করে কোর্টে চালান করে।

ভবানন্দ বাবার লাশ শ্মশানে না নিয়ে গিয়ে, নিজেদের আম বাগানের মধ্যে চিতা সাজিয়ে ভবানন্দ তার বাবার মুখাগ্নি করে শ্মশান যাত্রা সমাপন করে। বাবার চিতার কাঠ-কয়লা অস্থি উক্ত স্থানে সমাধি স্থাপন করে এবং সমাধির পাশে তাঁবু টানিয়ে তার বউ সোনালীর সাথে বসবাস শুরু করে। 

ভবানন্দ ও সোনালী হিন্দু শাস্ত্রের নিয়ম অনুসারে ১৩ দিন অশৌচ পালন করে। প্রতিদিন নিয়ম অনুসারে মালসা পুড়িয়ে আতপ চালের ভাত রান্না করে খাওয়া দাওয়া করে। উক্ত বাগানের কিছু আম গাছ বিক্রি করে বাবার শ্রাদ্ধ শান্তির আয়োজন করে।  
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশীর নেমন্তন্ন করে। বাবার সমাধির পাশে আম বাগানের মধ্যে বাবার আত্মার শান্তি কামনা করে শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাঠ ও লীলা কীর্তনাদি এবং শ্রাদ্ধের ভোজনের ব্যবস্থা করা হয়।

ধনঞ্জয় টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় জামিন পেয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। আলাদা ভাবে বাড়িতে বাবার ক্রিয়াকর্ম করতে থাকে। পাড়ার অধিকাংশ মানুষ উপস্থিত হয় না।

ভবানন্দের বাবার মৃত্যুর তিন মাস পর ভবানন্দ জন্মভূমি সোনাডাঙ্গা গ্রামে আবার ফিরে আসে। পাড়া প্রতিবেশী থেকে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, মেম্বার এবং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলে তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদের কারণ জানিয়ে সম্পত্তির ভাগ দাবি করে। 

পঞ্চায়েত প্রধান ও রাজনৈতিক নেতারা একটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য বলেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা এবং সম্পত্তি ভাগের সঠিক বন্টন করার জন্য ভবানন্দের বাবার সমাধি পাশে অর্থাৎ আম বাগানের মধ্যে সকলের উপস্থিতি হয়ে আলোচনা শুরু হয়।

ধনঞ্জয় বলে :- বাবার সব সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছে কিন্তু আমি কাউকে ভাগ দেবো না।

ভবানন্দ বলে :- পুলিশের রিপোর্ট অনুসারে বাবার কাছে থেকে সব সম্পত্তি জোর করে লিখে নেওয়া হয়েছে। দাদা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে এবং দাদা-বৌদি বিষ প্রয়োগ করে বাবা কে মেরে ফেলেছে। বলে রিপোর্টের কপি বিচারকের সামনে রাখে। 

আমাকে সম্পত্তির সমান ভাগ ও বাবার নামে ব্যাংকে রাখা কুড়ি লাখ টাকার ভাগ দিতে হবে। তবেই দাদা-বৌদি ও মায়ের উপর থেকে বধূ নির্যাতন কেস তুলে নেবো এবং চিরদিনের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাবে।

দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্ক বিতর্ক চরম পর্যায়ে চলে যায়। পঞ্চায়েত প্রধান পুলিশকে ডাকতে বাধ্য হয়।

সোনালীর কাকা পুলিশ অফিসার আলোচনা সভায় স্থলে উপস্থিত হয়ে, ধনঞ্জয় কে বিভিন্ন ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু ধনঞ্জয় কোন কথা শুনতে চাই না।

পুলিশ অফিসার বলেন :- বধূ নির্যাতন কেস চলছে তারপর আবার খুনের কেস তারপর প্রতারণা কেস এইরকম বিভিন্ন কেসে জড়িয়ে দিয়ে তোমাকে ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারি। তোমার ভাই যে প্রস্তাব দিয়েছে তা মেনে নাও, তাহলে বেঁচে যাবে। না হলে জেলের ঘানি টানতে টানতে সারা জীবন চলে যাবে। তোমাদের মামলা যে পর্যায়ে চলে গিয়েছে কোটি টাকা ঘুষ দিল কোন কাজ হবে না। কারণ কেসটি উচ্চ মহলের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। বর্তমান তোমার জন্য লোকাল থানার একটি রিপোর্ট যথেষ্ট। 

পুলিশের হুমকিতে ধনঞ্জয় চুপচাপ হয়ে বলে :- আপনারা যা ভালো মনে করেন করুন। পুলিশের পাহারায় মিটিং চলতে থাকে।

বিচারকগণ দুই পক্ষের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

বিচারকগণ বলে :- আগে যা ঘটনা ঘটে গিয়েছে তার বিচার কোর্ট করবে। সম্পত্তি বিবাদ মীমাংসা করার জন্য আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি। 
মৃত গিরিশ চন্দ্রের সম্প্রতি তিনটি ভাগে ভাগ হবে।
তার স্ত্রী চন্দ্রদেবী ও দুই ছেলে ধনঞ্জয় ও ভবানন্দ।

বিচারকমণ্ডলী বলেন :- মৃত গিরিশচন্দ্রের স্থাবর, অস্থাবর, ব্যাংকের টাকা, বসবাসকারী বাড়ি ও ব্যবসার দোকান এবং মূলধন সবকিছুই তিনটি ভাগে ভাগ করা হবে। বাড়ির জমির সাথে মাঠের জমি বিনিময় করে নিতে পারবেন। বর্তমান বাজার মূল্য হিসাবে ব্যবসা দোকান ও জিনিসপত্র একজন ইচ্ছা করলে কিনে নিতে পারে।

মাঠের ৪৫ বিঘা জমি ও বাড়ির দুই বিঘা জমি মৃত গিরিশ চন্দ্রের নিকট থেকে জোর করে ধনঞ্জয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে তা কিন্তু পুলিশের নিকট স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ধনঞ্জয় কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বর্তমান ধনঞ্জয় মালিক হিসাবে তিনজনের অংশ ভাগ করে দেবে এবং ব্যাংকের টাকা পাওয়ার জন্য সহযোগিতা করবে।

আর ভবানন্দ ও সোনালী কথা দিয়েছে বধূ নির্যাতন মামলা খারিজ করে দেবে। উপস্থিত থানার বড় বাবুর সাথে মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। 

ধনঞ্জয়ের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমাদের হাতে তোমার পিতার হত্যার ও জোর করে জমি লিখে নেওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। হত্যা মামলা বন্ধ করার ব্যাপারে রাজনৈতিকভাবে চেষ্টা করা হবে।

ধনঞ্জয় যদি আমাদের বিচার না মানে, তাহলে নতুন করে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হবে।
প্রতারণার প্রমাণের জন্য পুলিশের কাছে যথেষ্ট রেকর্ড আছে। সাথে সাথে হত্যা মামলা ও বধূ নির্যাতন মামলা চলতেই থাকবে।

সোনালী বলে :- মাননীয় বিচারক মন্ডলী আপনাদের বিচার ঠিকই আছে এবং সমর্থন করছি। কিন্তু আপনাদের সাক্ষীতে দুই পক্ষের লিখিতভাবে স্বাক্ষর করে নেওয়া ভালো। 

উপস্থিত ব্যক্তিগণ বলেন :- সোনালী ঠিক বলেছেন লিখিত হওয়া দরকার।

ভবানন্দ স্ট্যাম্প পেপার বের করে বিচার মন্ডলীর সামনে রাখে।

বিচারক মন্ডলী বলেন :- আজ রবিবার কিন্তু আগামী বুধবার দিনে জমি রেজিস্ট্রি করা হবে। বিচার মন্ডলের কয়েকজন সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে।

ভবানন্দ বিচার মন্ডলী উদ্দেশ্য করে বলে :- জমি বন্টন আপনাকে করে দিতে হবে। আমার বাড়ির জায়গা দরকার নেই কিন্তু বিনিময়ে মাঠের জমি দিতে হবে আর বাবার সমাধিস্থল জমি আমার চাই।

বিচারক মন্ডলী দুই ভাইয়ের জমি বন্টনের সীমারেখা তৈরি করে বলেন তোমাদের দুই ভাই মেনে নিচ্ছে তো।

ধনঞ্জয় বলে, আপনাদের বিচার আমি মেনে নিলাম।

বিচারক মন্ডলী গণের সিদ্ধান্তগুলি স্ট্যাম্প পেপারে কোর্টের দলিল লেখক অরবিন্দ বাবু লিখিত করেন। দুই ভাইয়ের স্বাক্ষর সহ বিচার মন্ডলী গণের সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

মৃত গিরিশ চন্দ্রের স্ত্রী সদ্য বিধবা চন্দ্রা দেবী বড় ছেলে ধনঞ্জয়ের পক্ষের দিক থেকে উঠে সভার মধ্যস্থলে এসে দাঁড়িয়ে বলে :- আমি বিচার সভায় উপস্থিত সকলের সামনে স্বীকার করছি। বড় বৌমার কথা মতো সোনালীর উপর অনেক অত্যাচার নির্যাতন করেছি। সোনালীর সাথে তার শ্বশুরের গন্ডগোলের দিন বড় বৌমা সুনন্দা তার শ্বশুর কে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিল। কিন্তু সব দোষ ছোট বৌমা সোনালী উপর গিয়ে পড়েছিল। কারণ বড় বৌমার বুদ্ধিতে সোনালীর দোষ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল। বড় বউ মা বলেছিল আমার কথা না শুনলে সোনালীর মতো তোমাদের দুজনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।

জেলখানা থেকে আসার পর বড় বউয়ের অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি। অসুস্থ স্বামীর জন্য কিছু করতে পারিনি। টাকা পয়সা ধন সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তার চিকিৎসা হয়নি।

সম্পত্তি নিয়ে ছেলে বাবার মধ্যে প্রায়ই বিবাদ শুনতে পেতাম। ছেলে বৌমা সম্পত্তি জন্য পিতা কে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করবে তা কখনো ভাবতে পারিনি। সম্পত্তির জন্য মাকে খুন করে ফেলবে। আপনারা এই নরপিশাচ এর হাত থেকে আমাকে বাঁচান। যে জন্মদাতা পিতা কে মারতে পারে সেই ছেলে কিন্তু মাকে একদিন জীবিত রাখবে না।

শাশুড়ি চন্দ্রা সভাস্থলের মধ্য থেকে ধীরে ধীরে অপরাধের মন মানসিকতা নিয়ে সোনালী কাছে গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

কান্না করতে করতে হঠাৎ করে নিচু হয়ে সোনালীর পা জড়িয়ে ধরে বলে :- ছোট বৌমা; আমাকে ক্ষমা করে দাও, তুমি ক্ষমা না করলে আমার নরকেও জায়গা হবে না। তোমার উপর বিভিন্নভাবে অন্যায় অত্যাচার করেছি। এমনকি তোমাকে পেট ভরে দুমুঠো খেতে দেইনি।

সোনালী নিচু হয়ে শাশুড়িকে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে :- মা, আমাকে কেন অপরাধী করছেন! মা কখনো সন্তানের কাছে ক্ষমা চাই, সন্তানের অমঙ্গল হবে। সন্তান অপরাধ করলে মা-বাবা তাকে শাসন করে। তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে না, আমাকে অপরাধী বানাবেন না। আপনার সন্তানের কাছে আপনি চিরকাল থাকবেন।

বড় বউ সুনন্দা উত্তেজিত হয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে শাশুড়ি চন্দ্রা কে টানাহেঁচড়া করতে করতে বলে :- মায়ের পেটের ভাই নয় যেন চরম শত্রু আর শত্রুর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। বলে জোরে টান দিয়ে টানা হেচড়া করে তাড়াতাড়ি তার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

শ্বাশুড়ি চন্দ্রা গাঁয়ের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে তার বড় বৌমা কে ধাক্কা দিয়ে লোকজনের মাঝে ফেলে দিয়ে বলে :- আমার স্বামীকে তোমরা স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে খুন করে তবুও শান্তি হয়নি। সম্পদের গন্ধ পেয়ে এখন আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে চেয়েছি কিন্তু সেই সুযোগ আর আমি তোমাকে দেব না। 

বাবা ভবানন্দ আমাকে বাঁচাও, নাহলে কিন্তু সম্পত্তি লাভের জন্য তোর দাদা বৌদি আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলবে।

ভবানন্দ মা বলে চিৎকার করে ওঠে দ্রুত বেগে ছুটে তার মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।

মা চন্দ্রা দেবী তার বড় বৌমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে :- তোমার বুদ্ধিতে ছোট বৌমার নিকটে বহুবার অন্যায় অত্যাচার করে অপরাধ করেছি। কিন্তু সেই অপরাধ মূলক কাজের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় এসে গেছে। আমি কিন্তু ছোট ছেলে ও বৌমার সাথেই থাকবে।  

ভবানন্দ তার মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে মায়ের হাত ধরে তার দিকে নিয়ে এসে সোনালী পাশে বসিয়ে দেয়।

ধনঞ্জয় ভাবে মনে :- তাহলে মায়ের সম্পত্তি পাবো না। মা আমার সাথে এরকম বেইমানি করল।

মা চন্দ্রা ছোট্ট ছেলে ভবানন্দের হাত ধরে বলে :- বাবা; অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছিস। আমার ভাগের অংশ তোর দাদাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। আর মামলা-মোকদ্দমা করতে যাস না বাবা। কারণ বৃদ্ধ বয়সে জেলখানাতে থেকে অনেক শিক্ষা লাভ করেছি আর কে আমার আপন আর কে আমার পর তা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি। 

ছোট বৌমা আইনের পথে গিয়ে ঠিকই করেছে। বধূ নির্যাতনের সকল শাশুড়িদের শাস্তি পাওয়া উচিত। ছোট বউমা কে বলে বধূ নির্যাতন মামলা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা কর। বাবা আমি হাতজোড় করে বলছি আর আমাকে ক্ষমা করে দে। 

ভবানন্দ বলে :- ঠিক আছে মা তোমার অংশ দাদাকে দিয়ে দিলাম কিন্তু তোমাকে আমাদের সাথে থাকতে হবে। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে মা মা বলে কান্না করতে শুরু করে।

ধনঞ্জয় ভাবে মনে মনে :- আর কোন উপায় নেই যাঁতাকলে পড়ে আছি। বিচার মেনে না নিলে যাঁতাকলে ফেলে আমাকে পিষে পিষে মেরে ফেলবে। 

বিচারক মন্ডলী বলে :- তোমার মায়ের অংশ তোমার মা স্বেচ্ছায় দান করেছে। এবার বিচার সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হয়ে ভাইয়ের অংশ তাকে বুঝে দেবে কিন্তু এই বিষয় নিয়ে আমাদের দ্বিতীয়বার আর যেন কোন মিটিং করতে না হয়।

নির্দিষ্ট দিন তারিখে জমি রেজিস্ট্রি অফিসে উভয়পক্ষ সাক্ষী গনের নিয়ে উপস্থিত হয়। বিচারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ধনঞ্জয় তার ভাইকে তার ন্যায্য পাওনা জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়। 

প্রায় এক মাস পর আবার বিচার মন্ডলীদের ডেকে বাবার গোস্তিত টাকার অংশ ধনঞ্জয় তার ভাই ভবানন্দ কে সবার সামনে দেয়। বিচারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ভবানন্দ ও সোনালী মিলিত হয়ে থানায় গিয়ে বধূ নির্যাতন কেস তুলে নেওয়ার আবেদন পত্র দাখিল করে। এরপর কিছুদিন পর আদালতে দাঁড়িয়ে সোনালী তার উপর হওয়া বধূ নির্যাতন কেস খারিজ করে দেয়।

----------------------------------------------------------
                 ।। দশম অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সোনালী রাতে স্বামী ভবানন্দের পাশে শুয়ে বিভিন্ন ধরনের ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক করে চলেছে। ভাবে :- স্বামী সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে পরম সুখে ঘুমিয়ে আছে। 

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের আগের মতো আর ভালোবাসা নেই আবার স্বামী কিন্তু আমার সাথে দৈহিক সম্পর্কের মেলামেশা করে না। এক বিছানায় থাকলেও কিন্তু দুজন দুদিকে মুখ করে শুয়ে থাকা।

স্বামী বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতে চাই না কিন্তু সব সময় উত্তেজিত মেজাজ নিয়ে থাকে। ভাব দেখে মনে হয় আমি তার কাছে বিশাল ভাবে অপরাধ করে ফেলেছি। চলাফেরা চরম ব্যস্ততা দেখিয়ে আমাকে এরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমি ভাল কথা বললেও কিন্তু রাগাম্বিত হয়ে জবাব দেয়।

সব সময় স্বামী-শাশুড়ির সাথে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু আমার অপরাধটা কোথায় আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছিনা।

শ্বাশুড়ির সাথে আমার কোন অশান্তি ঝগড়া নেই। শাশুড়ি আমার উপর যে অত্যাচার করেছিল, সে সব ভুলে গিয়ে তাকে মা বলে মেনে নিয়েছি। তবুও কেন স্বামীর মন পাচ্ছিনা। তাহলে হয়তো অন্য কোন নারীর সম্পর্কে আসক্ত হয়েছে। যার কারনে আমাকে আর ভালো লাগছে না।

নারী হয়ে সন্তান জন্ম দিতে না পারার কারণে স্বামী তাহলে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হিন্দু ধর্মে শাস্ত্রে বলেছে "জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে তিন বিধাতার লিখন কিন্তু কেউ খন্ডন করতে পারে না"। 

ঈশ্বর যদি আমার গর্ভে সন্তান না দেয়, তাহলে আমি কি করতে পারি! সন্তান না হওয়ার কারণে স্বামী তার ভালোবাসার থেকে বঞ্চিত করবে।

হয়তো তার কোন দোষের কারণে আমি মা হতে পারছি না। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় তা কখনোই মানবে না কিন্তু সব দোষ নারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে। 

সমাজ ব্যবস্থায় নারীর কোন স্বাধীনতা থাকবে না তা কিন্তু কোন ভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তার আলাপ ব্যবহারে বুঝতে পেরেছি ধীরে ধীরে স্বামী আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। 

আমি স্বামী ছাড়া কিন্তু একা একা বাঁচবে কি করে! আমি যে তোমাকে হৃদয় থেকে ভালবাসি তা কি তুমি বুঝতে পারে না?
বন্ধ্যা বলে সমাজ সংসার জীবনে নারীর কোন মূল্যায়ন থাকবে না।

হে ঈশ্বর সংসার জীবনে কোনদিন কি সুখ শান্তি পাবো না! হে করুণানিধি বিপদের বন্ধু মধুসূদন আমার প্রতি করো কৃপা। হে ঈশ্বর কত দেব দেবতার মন্দিরে গিয়ে মানত করে মাথা ঢুকেছি ও পূজারী ব্রাহ্মণদের কথা অনুসারে পূজা দিয়েছি। 

অনেক মাজারে মাজারে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেছি। সাধু-সন্ন্যাসী , পীর সাহেবের ও তান্ত্রিকের তাবিজ কবজ গাছ গাছরা অনেক কিছু ব্যবহার করেছি কিন্তু আমার কোনো সন্তান লাভ হয়নি। শাশুড়ি মায়ের দেওয়া গাছ গাছরা খেয়ে খেয়ে মনে অরুচি ধরে গিয়েছে।

ঈশ্বরের ভক্তরা তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ফলে কিন্তু আমাকে দোষারোপ করে বলেন, আমার নাকি ঠাকুর ও দেব-দেবীর উপর বিশ্বাস ভক্তি নেই তার জন্য ফল লাভ হচ্ছে না। আসলে সবকিছুই ভাঁওতাবাজি দিয়ে টাকা আয় করার একটি পন্থা। গ্রামবাংলায় প্রচলিত কথায় বলে "ঝড়ে গাছ ভাঙ্গে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে।"

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডাক্তার বলেছেন, আমার ও স্বামী নাকি কোন দোষ নেই। তবে সন্তান হচ্ছে না কেন! প্রশ্ন করতেই ডাক্তার বলেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞান চেষ্টা মাত্র কিন্তু ঈশ্বরের উপর কারও হাত নেই। তাহলে ঈশ্বরের কাছে চিকিৎসা বিজ্ঞান পাশ করতে পারেনি। 

একটি সন্তানের লাভের আশায় সেই অলৌকিক শক্তি ঈশ্বরকে দিনরাত ডেকে চলেছি। সাধু ও সন্ন্যাসীদের কথায় কত দিন না খেয়ে বিভিন্ন ব্রত পালন করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তাহলে ধর্মের কোন শক্তি নেই।

রামায়ণ ও মহাভারত গ্রন্থ ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার বিভিন্ন ধরনের কাহিনীর মাধ্যমে রাম ও কৃষ্ণ কে ঈশ্বর বা ভগবান বানিয়ে কিন্তু অলৌকিক শক্তির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আসলে সেই সব ঈশ্বর ও ভগবানের অলৌকিক শক্তির প্রকাশ কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার রূপ দেখতে পেলাম কোথায়। 

সন্তান জন্ম দিতে না পারার জন্য স্বামীর সম্পর্কে শাশুড়ি মা, সেদিন যা বললেন তা কি সত্যি!
আমার বোন জবার সাথে স্বামীর অবৈধ প্রেম কাহিনী। বোন জবার সাথে স্বামীর দেহ মিলন অবস্থায় শাশুড়ি মা নাকি তার নিজের চোখে মিলন চক্র দেখেছেন। সেদিন জবা কে এই বাড়িতে রেখে আমি বাবার বাড়িতে গিয়ে ছিলাম।

শাশুড়ি মা তার ছেলেকে নিরিবিলি সময়ে প্রশ্ন করতেই কিন্তু ভবানন্দ লজ্জা ঘেন্না ত্যাগ করে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে :- "মা; আমি বংশ রক্ষা করার প্রয়োজন অনুভব করে কিন্তু বাধ্য হয়ে তোমার বৌমার বোন জবার সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েছি। তোমার বৌমার জন্য অনেক বছর অপেক্ষা করেছি কিন্তু আর নয়। বহু ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। আবার ভবিষ্যতে কোন সন্তান হবে বলে কোন আশা ভরসা নেই।

বোন জবা আমার সাজানো সংসার ভেঙে দিয়ে জামাইবাবুর সাথে যৌবন জোয়ারে প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। একবার দিদির কথা ভাবলে না। এই কারণে স্বামী আমার প্রয়োজন অনুভব করে না।

আমার দুর্বলতার জন্য কিছু বলতে পারছি না আবার মেনে নিতে পারছি না। সংসার চক্রের নিয়মে একজন আরেকজনের আশা পূরণ করতে না পারলে কিন্তু ময়লা কাগজের মত ধুলোয় গড়াগড়ি খেতে হবে। সংসারে পুরুষ মানুষ গুলো নারীদের কে ভোগের সামগ্রী মনে করে কি! নারী সংসারের মাঝে না থাকলে কিন্তু সংসার চক্র অচল হয়ে পড়বে এবং সৃষ্টি চক্র রসাতলে যাবে। 


----------------------------------------------------------
                 ।। একাদশ অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
ভবানন্দ দোকানে বসে খাতা খুলে ভাবে মনে :- সোনালী সাথে দিন দিন দূরত্ব বেড়েই চলেছে। হয়তো মা তার বৌমাকে আমার ও জবার সম্পর্কের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। জবার ক্ষেত্রে যদি তার দিদির মত সন্তান জন্ম দিতে না পারে, তাহলে কিন্তু নতুন করে আবার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়তে হবে।

বর্তমানে জবার সাথে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আবার কিন্তু ফিরে আসা সম্ভব নয়। দুই নৌকায় পা রেখে বর্তমানে বড় সমস্যার মধ্যে আছি।

লটারি বিক্রেতা কার্তিক বিশ্বাসের আওয়াজ শুনে ভবানন্দের ভাবনার জগত থেকে ফিরে এসে বলে :- আজ লটারির টিকিট কাটবে না কারণ ভীষণভাবে চিন্তিত তারপর মন মানসিকতা ঠিক নেই।

ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য প্রতিদিন একশো করে মাসে তিন হাজার টাকার টিকিট ভবানন্দ কিনে চলেছে। কখনো কিছু টাকা আসে আবার কখনো সম্পূর্ণ চলে যায়। বড় ধরনের কোন টাকার অংক কয়েক বছরের মধ্যে এখনো তার ভাগ্যে জোটে নাই।

এই লটারির মাধ্যমে প্রায় এক লাখ টাকার ঊর্ধ্বে লটারির টিকিট কিনে নষ্ট করেছে। এই লটারি টিকিট কেনা নিয়ে সোনালীর সাথে তার মনোমালিন্য অনেকদিন ধরে চলে আসছে।

কার্তিক বলে :- বিক্রি হয়নি এমন কিছু টিকিট আছে কিন্তু রেখে দাও দাদা, ভাগ্যের কথা কিছু বলা যায় না।

ভবানন্দের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবিক্রিত টিকিটগুলো কার্তিক রেখে চলে যায় আর বলে পরে টাকা দেবে।

ভবানন্দ দুপুরে খাবারের ছুটি পেয়ে রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে কয়েকজন ব্যক্তির সাথে দাঁড়িয়ে কথা হয়। তারপর দ্রুত বেগে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে উত্তেজিত কন্ঠে সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করতে থাকে। 

সোনালী তখন ঘরের মধ্যে রান্না করছিল, ভবানন্দ রান্নাঘরে ঢুকে বলে :- তোমার জন্য আমার আর মান সম্মান বজায় থাকে না।

সোনালী রান্না বন্ধ করে বারান্দায় এসে বলে :- এই ভরদুপুর বেলা বাড়িতে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করছ কেন! বাড়িতে কি ডাকাত পড়েছে?

উত্তেজিত ভবানন্দ বলে :- তুমি প্রায় দিন কোথায় যাও আবার কোন কোন দিন রাত বাস করে তারপর বাড়িতে আসো। উত্তর দাও কোথায় কি করছো?

সোনালী বলে :- আমি কোথায় যাই, আর কি করি! সে কথা জানার অধিকার তুমি হারিয়ে ফেলেছো। আমি তোমাকে বলবো না। তুমি কোথায় যাও কি করে তা কি আমাকে কখনো বলে যাও।

ভবানন্দ বলে :- লোকে তোমাকে নিয়ে নানা ধরনের বাজে বাজে কথা শোনায়। আমার সাথে তোমার তুলনা করছো। বারো হাত কাপড়ে যার কাঁচা হয় না।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- লোকেরা তো তোমার আপন জন তাদের কথা শুনে বেড়াও। স্বামীর অধিকারে শাসন করতে এসেছে। স্ত্রীকে শুধু খেতে পড়তে দিলেই হয় না কিন্তু তাকে ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে হয়। 

দীর্ঘদিন ধরেই তো আমাদের দৈহিক সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটেছে। তাহলে অন্য কোন নারীর সাথে নিশ্চয়ই সম্পর্ক তৈরি করেছে।


ভবানন্দ প্রচন্ড রেগে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে সোনালীর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

চড় থাপ্পর মারতে মারতে বলে :- বাজা নারী আবার পর পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। আজ তোকে জ্যান্ত মেরে ফেলবো।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- তুমি যদি অন্য কোন নারীর কাছে যেতে পারো তাহলে আমি যদি অন্য কোন পুরুষের সাথে সঙ্গ করি, তাহলে দোষের কথায়।

ভবানন্দ বলে :- পুরুষেরা হাজার নারীর কাছে গেলে কিন্তু কোন দোষ নেই। নারীরা একটি পুরুষ ছেড়ে অন্য পুরুষের কাছে গেলেই ব্যভিচারিণী বলে আখ্যায়িত হয়। তুই ব্যভিচারিণী, বেশ্যা ও পতিতা।

  সোনালী উত্তেজিত হয়ে কান্না করতে করতে বলে :- তোমাদের বংশের তো পরের কথায় বউকে পেটানো ধারা আছে। যত পারো মারো, তবুও আমি বলবো না।

জেনে রেখো তোমার মত আমি কিন্তু চরিত্রহীন নয়। ঘরে বউ থাকতে আবার অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক তৈরি করা। মনের কাছে একবার প্রশ্ন করে দেখো কে ব্যভিচারিণী। বলে দ্রুত সরে গিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে ঝগড়া করতে থাকে।

সোনালীর সত্য কথা শোনার পর ভবানন্দ রাগে উত্তেজিত হয়ে সোনালী কে ধরতে যায়। আর সোনালী দৌড়াতে দৌড়াতে থাকার ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা আটকে দেয়।

সোনালীর পিছনে পিছনে ভবানন্দ দৌড়াতে দৌড়াতে দরজা কাছে আসতেই ঝপাৎ করে দরজা বন্ধ যায়। ভবানন্দ গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে দরজায় আঘাত লেগে কপাল ফেটে রক্ত পড়তে থাকে।

সোনালী ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার করে বলে :- যাদের জন্য করি চুরি তারাই বলে চোর। আমি আর এ জীবন রাখতে চাই না। আত্মহত্যা করে এই জীবনকে বিসর্জন দেবে বলেই উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করতে থাকে।

ভবানন্দ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার আঘাত করে বলে সোনালী দরজা খোলো সোনালী দরজা খোলো ।

কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ঘরের মধ্যে থেকে কোন আওয়াজ না পাওয়ার কারণে ভবানন্দ অন্তরে ভয়ে আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে দরজা ভাঙার সংকল্প করে জোরে জোরে আঘাত করতে করতে বলে :- দরজা না খুললে কিন্তু ভেঙে ফেলব।

তারপর ভাবে মনে এই সময় আবার মা বাড়িতে নেই। লোকের কথা শুনে অকারণে সোনালীর সাথে অশান্তি করে কি ঝামেলায় পড়লাম?

আবার সেই মুহূর্তে লটারি বিক্রেতা কার্তিক বিশ্বাস তার বাড়ির উঠানে উপস্থিত হয়।
   
ভবানন্দ উত্তেজিত কন্ঠে বলে :- টাকা নিতে চলে এসেছেন, আর সময় পেলেন না। আমি জানি আপনার চরিত্র। টিকিট কোন রকম হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে কিন্তু টাকার জন্য বাড়িতে চলে আসবে। এখন হবে না, রাতে দোকানে দেখা করবেন। যান যান চলে যান। 

কার্তিক বিশ্বাস বলে :- এই রোদ গরমের মধ্যে আপনার বাড়িতে থাকার জন্য আসিনি। তোমার বিশেষ প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলতে এসেছি। 

ভবানন্দ বলে :- আপনার কোন কথা আমি এখন শুনতে চাই না। আপনি আসুন।

কার্তিক বিশ্বাস বলে :- টিকিটগুলো কোথায়?

ভবানন্দ উত্তেজিত কন্ঠে বলে :- বললাম তো এখন আমাকে বিরক্ত করবেন না। টিকিট গুলো দোকানে আছে। টিকিট দিয়ে কি হবে শুনি! আমার কোটি কোটি টাকা বাঁধিয়ে দিয়েছে। আমার পারিবারিক সমস্যার সমাধান করতে না পেরে কিন্তু ভীষণভাবে বিপদের মধ্যে আছি। আপনি আর বিরক্ত করবেন না আসুন। বলে আবার দরজার কাছে গিয়ে সোনালী দরজা খোলো বলে ডাকতে থাকে।

কার্তিক বিশ্বাস রোদের মধ্যে উঠানে দাঁড়িয়ে বলে :- ভবানন্দ তোর কপাল খুলে গিয়েছে। দুপুরের লটারির টিকিটের মাধ্যমে প্রথম পুরস্কার এক কোটি টাকা তোর কেনা টিকিটে হয়েছে। এই সংবাদ দেওয়ার জন্য তোর বাড়িতে এসে চরম অপমানিত হতে হলো। তাহলে চললাম।

সেই মুহূর্তে ঘরের মধ্যে কিছু পড়ার ধপাস শব্দ শুনে ভবানন্দ ভয়ে চিৎকার করে বলে :- সোনালী তুমি আত্মহত্যা করো না, আমি তোমাকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসি। তারপর দরজায় আঘাত করতে করতে বলে :- কার্তিক দা আমার স্ত্রীকে বাঁচাও।

কার্তিক দরজার সামনে এসে বলে :- বৌমা দরজা খুলে দাও আমরা তোমার জন্য চিন্তিত।

হঠাৎ বিকট শব্দ করে ঝপাৎ করে আওয়াজ হয় আর ভবানন্দ ধৈর্য সহ্য রাখতে না পেরে দরজায় দুজন মিলে জোরে জোরে আঘাত করতে থাকে।
কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর দরজা ভেঙে ঘরের মধ্যে দুজনেই পড়ে যায়।
  
সোনালী তাড়াহুড়ো করে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে উত্তেজিতভাবে স্বামী পাশ দিয়ে দ্রুত বেগে যেতে যেতে তার স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে :- মরতে তো গেলাম কিন্তু মরণ তো হলো না। বলে রান্নাঘরের দিকে দ্রুত বেগে চলতে শুরু করে।

ভবানন্দ মেঝের উপর শুয়ে উপরের দিকে তাকাতেই তার পিলে চমকে ওঠে আর ভাবে বিদ্যুৎ চালিত পাখার সাথে ফাসের দড়ি ঝুলে রয়েছে।

তাড়াহুড়ো করে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে সোনালী গলায় হাত দিয়ে বলে :- এরকম সর্বনাশী কাজ কেউ করে।

সোনালী উত্তেজিত ভাবে বারান্দায় ফিরে এসে চিৎকার করে বলে :- এখন আর দরদ দেখাতে হবে না। আমি মরে গেলে কিন্তু তোমারি তো শান্তি লাভ হবে। দুদিন না যেতেই কিন্তু প্রেমিকাকে নতুন বউ বানিয়ে নিয়ে নতুন সংসার করতে পারবে। আমি আজ না হয় কাল একদিন তো মরবো।

ভবানন্দ শান্ত গলায় সান্তনা দিতে দিতে বলে :- শান্ত হও, বাইরের একজন লোক আছে। 

ভবানন্দ বারান্দায় এসে একটি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে কার্তিকের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলে :-
দাদা ; বসুন, আমার দুর্ব্যবহারের জন্য কিন্তু আমি ভীষনভাবে লজ্জিত। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দেবেন। আমার সমস্যা গুলো তো নিজের চোখে দেখেছেন আপনি। তারপর সোনালীর উদ্দেশ্য করে বলে দাদার জন্য জল ও খাবার নিয়ে এসো।

কার্তিক চেয়ারে বসে ভাবে :- মানুষের চরিত্র কত রকমের হয়, টাকার কথা শুনে রাগ জল হয়ে গেল। এখন আদর আপ্যায়ন করা শুরু করল। কিছুক্ষণ আগে আমার সাথে কিনা দুর্ব্যবহার করল, টাকার জন্য এটা করা কি মানুষের চরিত্র হওয়া উচিত। লটারি টিকিটের পুরস্কার না হলে, টিকিট বিক্রি করা টাকা উঠাতে ভীষন কষ্ট ভোগ করতে হতো। এ বাড়িতে এসে তাহা বুঝিতে পারিলাম।

সোনালী এক জগ জল নিয়ে এসে কার্তিকের সামনে রেখে হাত জোড় করে বলে :- দাদা; হাত পা ধুয়ে তারপর খাওয়া দাওয়া করে যাবেন।

কার্তিক বিশ্বাস খাওয়া দাওয়া করতে করতে ভবানন্দের উদ্দেশ্য করে বলে :- টিকিটগুলো দেবে আর তাড়াতাড়ি টাকার ব্যবস্থা করে দেবে কিন্তু লটারির প্রধান এজেন্ট ৫% টাকা কেটে নেবে।

ভবানন্দ বলে :- দীপাবলি বাম্পার টিকিট ব্যাংকে জমা করলে কি সুবিধা পাওয়া যাবে। 

কার্তিক বিশ্বাস বলে :- যেকোনো লটারি টিকিট ব্যাংকের মাধ্যমেই টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। ব্যাংকে জমা করলে শতকরা ২০ টাকা হিসাবে, এক কোটি টাকার থেকে কুড়ি লাখ টাকা ভারতের আয়কর দপ্তর শুল্ক কেটে নেবে তারপর বাদ বাকি আশি লাখ টাকা একাউন্টে পাঠিয়ে দেবে।

ভবানন্দ খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে ধুতে কার্তিক দাদার উদ্দেশ্য করে বলে :- লটারির টিকিট ব্যাংকে জমা দেবো না কিন্তু আপনাকে খুশি করে দেবে।

ভবানন্দ এক কোটি টাকা পাওয়ার আশায় দোকানের কাজটি ছেড়ে দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে যায়। ন্যায় দামে টিকিট কেনার কোন ব্যবসায়ীকে না পেয়ে ঘুরে ঘুরে হতাশ হয়ে মনের দিক থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। 

কয়েক সপ্তাহ ধরে চিন্তা ভাবনা করে টিকিট ব্যাংকে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আর সেই মুহূর্তে টিকিট কেনার জন্য ফোন আসে। নিজের এলাকার এক ব্যবসাদার এর সাথে দেখা করে টিকিট দিয়ে নগদ এক কোটি টাকা বুঝে নেয়।
বিশ্বস্ত কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে নিয়ে প্রাইভেট গাড়ি করে বাড়িতে আসে।

টাকা পাওয়ার পর দুজনে মিলে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, যে টাকা ব্যাংক মাসিক প্রকল্প রেখে প্রতি মাসে সুদের টাকায় সংসার চালানো হবে। ব্যবসার জন্য কয়েক লাখ টাকা হাতে রেখে বাদবাকি টাকা ব্যাংক পোস্ট অফিস গিয়ে মাসিক প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা জমা রাখে। 

৬ মাস পর আশ্রয়দাতা বয়স্ক মহিলার মৃত্যু ঘটার কারণে ভাবানন্দ সিদ্ধান্ত নেয় অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি ঘর করে বসবাস করার।
----------------------------------------------------------
                 ।। দ্বাদশ অধ্যায় ।। 
--------------------------------------------------------
আরও কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এক রাতে একলা বিছানায় শুয়ে ভাবে মনে সোনালী :- যদি বোন জবা কে সত্যিকারের ভালবেসে থাকো তবে ভবানন্দ অবৈধভাবে তার সাথে মেলামেশা করে বদনাম সৃষ্টি করছে কেন! সামাজিকভাবে বিয়ে করে নিতে পারে। তাহলে জবার সাথে সম্পর্ক তৈরি করার কারণ যৌবনের লালসা।

আমার নারী জীবনের ভালোবাসার মাধ্যমে স্বামীর প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবারের অভিভাবকদের সাথে লড়াই করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে ছিলাম কিন্তু সেই লড়াইয়ে কোন মূল্য নেই! স্বামী নামক পুরুষ কি স্বার্থপর?

কোন নারী যদি সন্তান দিতে না পারে তাহলে সেই অপুত্রক নারীকে নর্দমায় ফেলে দিতে হবে। এটা কি সংসার চক্রের নিয়ম কানুন, না পুরুষদের স্বার্থে নিয়ম চালু করা হয়েছে?

সন্তান লাভের লালসায় যদি পর পুরুষের সঙ্গ করি, তাহাতে কি পাপ হবে? 

স্বামী নামক পুরুষ যদি পরকীয়া প্রেম করতে পারে তবে নারী করলে তা পাপ হবে কেন! নারী যদি পর পুরুষের সঙ্গ করতে গিয়ে ধরা পড়ে স্বামী ও সমাজ সব দোষ নারী কে দিয়ে বলবে চরিত্রহীন কুলাটা (অর্থাৎ যে বংশের ও কুলের সম্মান রাখে না)। আর স্বামী নামক পুরুষ যখন ঘরে স্ত্রী থাকাকালীন অন্য নারীর সাথে অবৈধ প্রেম করে চলেছে সেই পুরুষ অপরাধ শূন্য কি?

পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় সমাজের নারী ও পুরুষেরা বলবে বংশ রক্ষার জন্য সন্তান লাভের আশায় প্রেম করছো। অবৈধ প্রেমে পুরুষেরা ধরা পড়লে অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বলবে এই নারী কে ভালবাসি বিয়ে করবো । যত দোষ নারীদের কিন্তু পুরুষেরা গঙ্গা জলের মত পবিত্র।

নারীগণ পুরুষের উপর অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল বলেই কিন্তু নারীগণ ভাবে পুরুষরা অধিক ক্ষমতাবান। নারীকে সব সময় সংসারের দাসীবৃত্তি করার জন্য হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। 

সংসারের সব কাজ করে যাও বিনিময়ে খাওয়া দাওয়া আর সন্তান উৎপাদন করে লালন-পালন করতে থাকে। সংসারের সদস্যদের সেবা করে , পুরুষের ইচ্ছা অনুসারে যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য তৈরি থাকতে হবে। কিন্তু নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ধার ধারে না পুরুষরা। কোন নারী যদি পুরুষ সন্তান জন্ম দিলে নাকি সমাজে মূল্যায়ন করা হয়। এই নারীরা তখন গর্ববোধ করে বলে ছেলে সন্তানের মা হয়েছি।

নারী যতই উপরে উঠুক বা চাকরি বাকরি করে টাকা নিয়ে আসুক তবুও নারীদের সংসারের মাঝে কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নেই। পুরুষের ইচ্ছায় চলাফেরা করতে হবে কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলেই বাঁধবে অশান্তি। নারী ছাড়া প্রকৃতির সংসার চক্র চলবে কিভাবে?

নারীগণ সংসার ভাঙছে না তা কিন্তু নয়। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামী নামক পুরুষের কারণেই নারী সাথে (বউয়ের) অশান্তি ঝগড়া সৃষ্টি হয়ে থাকে।

যেমন পুরুষের মদ পান করা, যৌন বিষয়ক অক্ষমতায়, অন্য নারীতে আসক্ত ও অকারনে নারীর উপর নির্যাতন ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে উক্ত নারীরা সংসার ভেঙে মনের মতো পুরুষের সাথে নতুন করে সংসারের স্বপ্ন দেখতে থাকে।

অনেকের স্বপ্ন সফল হয় আবার অনেকের স্বপ্ন বিফলে যায়। আবার কোন নারী চরম সমস্যায় জড়িয়ে শান্তির বদলে ঝুট ঝামেলা কে সঙ্গী করে অশান্তি নিয়ে সারা জীবন চলতে হয়। 

অন্য নারীর আসক্ত স্বামী ভবানন্দ কে তাহলে ত্যাগ করবো। শিশুকাল ও কিশোর কাল বাবা-মায়ের কাছে যৌবনের প্রারম্ভে স্বামীর ঘরে আবার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসে। তারপর অন্য জায়গায় বসবাস এরপর আবার কোথায় গিয়ে বসবাস করব।

প্রবাদ বাক্যে বলে "আপন থেকে পর ভালো আবার পর থেকে জঙ্গল ভালো" আমি নির্জন জঙ্গলের মাঝে চলে যাবে। 

----------------------------------------------------------
               ।। ত্রয়োদশ অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
ভবানন্দ তার পৈত্রিক সম্পত্তি লাভ করার পর দুই বছরের মধ্যে প্রাপ্ত সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে আবার কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়। নবাবী চাল দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকে। কখনো কখনো এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ পর পর সোনালীর নিকটে আসে। ভবানন্দের চালচলন, কথাবার্তা ও পোশাক-আশাক সবকিছুর মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে। 

দীর্ঘ কয়েক মাস পর একরাতে একান্তে স্বামীকে কাছে পেয়ে সোনালী বলে :- প্রায় দুই বছর ধরে কাজ কর্ম বাদ দিয়ে, কোথায় কি করে বেড়াচ্ছে?

ভবানন্দ বলে :- আমার জন্য খুব চিন্তা করে। 

সোনালী বলে :- এই সংসার জীবনে তুমি আমার একমাত্র স্বামী ।

ভবানন্দ বলে :- সতী সাবিত্রী নারীর একটি মাত্র স্বামী ভবানন্দ ।

সোনালী বলে :- পুরুষের ঘরে এক বউ থাকে আবার বাইরে আরেক উপ নারী থাকে কিন্তু এক নারীতে মন ভরে না। সতী সাবিত্রী নারী সর্বদা এক স্বামীকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে ।

ভবানন্দ ভাবে মনে মনে :- তাহলে কি জবার বিষয়ে সব ব্যাপার জেনে গিয়েছে! জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলে তা কিন্তু ঠিক বলেছো।

সোনালী বলে :- আমার কথার জবাব দিলো না তো! কোথায় কি করছো ?

জোর করে হাসি হাসি মুখে ভবানন্দ বলে :- আর কত দিন পরের বাড়িতে থাকবো। বয়স্ক বাড়ির মালিক তো পরেপারে চলে গেলেন। মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে তার ছেলের ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। বাড়ি করার জন্য জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সোনালী বলে :- জায়গা খুঁজে পেয়েছো।

ভবানন্দ বলে :- পেয়েছি ।

সোনালী বলে :- কোথায়!

ভবানন্দ বলে :- আমাদের এই এলাকা ছেড়ে দিয়ে অনেক দূরে যেতে হবে।

সোনালী বলে :- জায়গা কোথায় বলবে তো।

ভবানন্দ বলে :- হুগলি জেলার অচিন্ত্য পুর গ্রাম কিন্তু আধা শহর বলা যায়। বাসের মাধ্যমে কলকাতা সহ বিভিন্ন বড় বড় শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আছে। প্রধান সড়কের পাশে ৪০ শতক জমি ক্রয় করেছি। অচিন্ত্য পুর বাজার থেকে এক কিলোমিটার দূরে। আমাকে কয়েক সপ্তাহ থাকতে হবে অচিন্ত্য পুর গ্রামে বসবাস করার জন্য আপাতত অস্থায়ী ঘর তৈরি করতে হবে।

সোনালী বলে :- বাড়ি তৈরি হবে পরিকল্পনা কি আছে ?

ভবানন্দ বলে :- বাড়ির সামনে কয়েকটি দোকান ঘর হবে , দোকানের মাঝখান দিয়ে বাড়ীতে প্রবেশের বড় গেট থাকবে। বালি, সিমেন্ট, রড, ইট ও পাথরের দোকান করবো। আর বাড়ি হবে দোতলা পাঁচ টি রুম ,বড় হল ঘর, রান্নাঘর , ঠাকুর ঘর ,বড় বারান্দা ও আলাদা আলাদা বাথরুম পায়খানা । প্রথমে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করব তারপর ধীরে ধীরে পরিকল্পনা মতো এগিয়ে যাবে।

সোনালী বলে :- আশপাশের বাড়িঘর আছে তো ?

ভবানন্দ বলে :- যেখানে বাড়ি হবে সেখান থেকে একটু দূরে দূরে ঘর বাড়ি, পাড়া, গ্রাম, থানা, হাসপাতাল, স্কুল ও বাজার সব আছে ।

সোনালী বলে :- পাকা রাস্তা থেকে কত দূরে।

ভবানন্দ বলে :- বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসলেই যাতায়াতের জন্য রিকশা, ভ্যান ও বাস-ট্যাক্সি সব পাওয়া যাবে।

সোনালী বলে :- এই এলাকায় করলে ভালো হতো।

ভবানন্দ বলে :- শ্বশুরবাড়ি না থাকলেও কিন্তু শ্বশুর বাড়ির এলাকায় থেকে বদনাম হয়ে যাচ্ছে। আবার মাতৃভূমি জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই।

সোনালী বলে :- কেন!

ভবানন্দ বলে :- তোমাকে কেন্দ্র করে দাদা বৌদির সাথে ঝগড়া অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তারপর ন্যায্য পাওনা পৈত্রিক সম্পত্তি পাওয়ার জন্য কিন্তু গ্রামের দশজন কে ডেকে মিটিং করে জোর জুলুম ভাবে সম্পত্তি আদায় করা হয়েছে। 

সোনালী বলে :- মায়ের সেবা যত্ন সুস্থতার কাজ আমরা করলাম কিন্তু ভাগ পেলে তোমার দাদা।

ভবানন্দ বলে :- মা কিন্তু দাদাকে তার ভাগের সম্পত্তি লিখে দিয়ে দিয়েছেন। বয়স্ক মায়ের প্রতি আমাদের কর্তব্য করে যেতে হবে। বিনিময় কি পেলাম আর কি পেলাম না তা ভাবলে হবেনা।

দাদা-বৌদি বর্তমানে চরম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বহু দূরে গিয়ে বসবাস করবো। আশা করি তুমি আমার সিদ্ধান্তে খুশি হবে।

সোনালী বলে :- তোমার দাদা বৌদির খবর কি? 

ভবানন্দ বলে :- বধূ নির্যাতন কেস থেকে রেহাই পেলেও কিন্তু বাবাকে খাবারে বিষ মিশিয়ে মারার জন্য ১২ বছর জেল হয়েছে। 

----------------------------------------------------------
                ।। চতুর্দশ অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
ভবানন্দ বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে চলেছে কিন্তু চিন্তায় চিন্তায় ঘুম আসছে না।

চিন্তার জগতে ডুব দিয়ে ভাবে :- সোনালী কিন্তু চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি সোনালীর বোন শালিকার সাথে প্রেম করে মহা সমস্যায় পড়েছি। এখন মনে হচ্ছে দুই নৌকায় দুই পা রাখার জন্য সোনার তরী জলে ডুবে যাবে। কারণ দুই প্রান্তে দুজনের পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি।

সোনালী কে কোন কিছুর বিনিময়ে ছাড়তে পারবে না আবার কিন্তু শালিকার বিয়ের প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারবে না।

অবৈধ ভাবে সম্পর্ক কত দিন আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। সমস্যা হচ্ছে জবা আমাকে ছাড়বেনা আবার দিদির সম্মুখে প্রকাশ্যে বলতে পারবে না। যাকে বলে ত্রীমুখী সমস্যা অর্থাৎ আমাদের ত্রিস্পর্শা দোষ লেগেছে।

শ্বশুর-শ্বাশুড়ি সেদিন গোপনে ডেকে নিয়ে বলেন :- আমাদের দুটি মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলে। তোমার জন্য আমরা কি করি নাই বলতে পারে! 
সোনালী তোমার জন্য লড়াই করতে গিয়ে নিজের জীবন দিতে চলেছিল । মৃত্যুর ঘর থেকে ফিরে এসেছে কিন্তু তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে। 

জবা, কি দোষ করেছে তার জীবন নষ্ট করলে! তোমাকে সন্তান স্নেহে ভীষণ ভালোবাসতাম কিন্তু এখন তোমাকে ভাবি ঘেন্না করি। তোমাদের পরিবারের এক একজন এক এক অবতার। এত সাজা পেয়েও তোমার হুশ হয়নি, নেমকহারাম বদমাইশ চরিত্রহীন ---------------------।

সেদিন শ্বশুর ও শাশুড়ি নিকটে চরম অপমানিত হয়েও কিন্তু তাদের কথার কোন উত্তর দিতে পারিনি। আমি সন্তান লাভের আশায় অন্ধ হয়ে সোনালীর সাথে মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে চলেছি।

সোনালীর সাথে এক ছাদের নিচে বসবাস করলে কিন্তু আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বেজি সাথে সাপের সম্পর্কের মতো। সোনালী কখন কোন রূপ ধারণ করে তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

শ্বশুর বাড়ির এলাকা ছেড়ে অচিন্ত্য পুর গ্রামে বসবাস শুরু করলে হয়তো জবার সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ হবে না । জবা ধীরে ধীরে একদিন সব ভুলে আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করার পর ভালো কোন ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেবো। কিন্তু জবা আর আমার মধ্যে সম্পর্ক অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। জবা কি আমাকে ছাড়বে! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে ভবানন্দ।

গভীর রাতে ঘুমের ঘরে ভবানন্দ সোনালী কে খোঁজার চেষ্টা করে কিন্তু হাতে না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে লাফ দিয়ে উঠে বসে। তারপর আলো জ্বালিয়ে দেখতে পায় চৌকির অপর প্রান্তে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে।

সোনালীর কাছে এসে নাড়া দিয়ে ভবানন্দ বলে :- সোনালী, তুমি কিন্তু গড়া দিলে নিচে পড়ে যাবে আর ব্যথা পাবে। আমার দিকে সরে এসে।

সোনালী বলে :- চুপচাপ শুয়ে পড়ে আর গভীর রাতে দরদ দেখাতে হবে না। আমি তোমার কে!

ভবানন্দ বলে :- এখনো জেগে আছে ঘুমানোর চেষ্টা করে।

উত্তেজিত হয়ে সোনালী বলে :- ঘুম না আসলে কি করবো! আমি তো ঘুমাতে চাই কিন্তু আমাকে বিরক্ত করে না। সরে যাও সরে যাও।

ভবানন্দ বলে :- রাগ করলে কোন সমস্যার সমাধান হবে না।

সোনালী বলে :- একমাত্র তোমার কারণে আমার ঘুম চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। তোমাকে একটা সন্তান দিতে পারেনি বলে আমাকে সারা জীবন দুঃখ দিয়ে চলেছে।

ভবানন্দ বলে :- রাতে ঘুম না হওয়ার কারণে দিন দিন তোমার শরীর ভেঙে পড়েছে। আগামীকাল সকাল বেলায় তোমাকে নিয়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে নিয়ে আসবে। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো।

সোনালী বলে :- এখন তোমার অনেক টাকা হয়েছে। ইচ্ছা মত খরচ করে নারী সঙ্গ করে তাও আবার আমার চোখের সামনে। বেইমান অতীতের কথা গুলো ভুলে গিয়েছে।

ভবানন্দ বলে :- তোমার দুঃখ বুঝি না তা কিন্তু নয়, কি করবো বলো! আমাদের প্রতি ঈশ্বর বিমুখ হয়েছে । তুমি রাগ করে না তোমার কপালে হাত বুলিয়ে দেয় আর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

সোনালী বলে :- তোমাকে মুক্তি দিয়ে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকতে চাই।

কখনো ভালবাসার টানে দুজনে মিলন ঘটে আবার কখনো ঝগড়া অশান্তি চলতেই থাকে। একদিন ভবানন্দ তার শ্বশুর বাড়ির এলাকার মানুষদের ও পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা ঠিকানা বলে বিদায় নেয়।

সোনালী কে নিয়ে তার স্বামী অচিন্ত্য পুর গ্রামের নতুন বাড়িতে দুই রুম বিশিষ্ট ঘরে বসবাস শুরু করে। পূর্বের পরিকল্পনা অনুসারে ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাড়ির নকশা তৈরি করে। প্রধান সড়কের সমতাল থেকে কয়েক ফুট উঁচু করে দোতলা বিশিষ্ট বাড়ি, ব্যবসার জন্য দোকান, বাড়ির চারিদিকে উচু প্রাচীর এবং একটি বড় ধরনের গেট তৈরি করতে থাকে। 

বাড়ি তৈরির বিভিন্ন কাজের আনন্দের মধ্য দিয়ে কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরো কাছে আসতে শুরু করে।

----------------------------------------------------------
               ।। পঞ্চদশ অধ্যায় ।। 
--------------------------------------------------------
নতুন ঘরের দোতলা ছাদের উপর টপে টপে ফুল সহ বিভিন্ন ধরনের গাছে গাছে সুন্দর মনোমুগ্ধকর বনের পরিবেশ তৈরি করেছে। তার মাঝে পাথর কেটে কৃত্রিম পদ্মফুলের অষ্টদল পাপড়ি স্থাপন করেছে।

ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে ঝিরঝির করে বাতাস বয়ে চলেছে। দুই একটা ছোট ছোট জাতের পাখি গুন গুন করে গান ধরেছে। ভ্রমর মধু পানের আশায় ফুলের পাপড়ি উপর বসে আনন্দে লাফালাফি করে চলেছে। 

এক পড়ন্ত বিকেলে সোনালী কৃত্রিম পদ্মফুলের অষ্ট দলের এক পাপড়ি ধরে উদাস মনে মুক্ত নীল আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। বিধাতা কি আমার কপালে সুখ লেখেনি!

বাপের বাড়ি থেকে ৩৩৫ কিলোমিটার দূরে স্বামী ভবানন্দের বাড়ির করার আসল উদ্দেশ্য এখন আমার কাছে জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছে।

একটি বিল্ডার্সের দোকান হয়েছে তবুও, হঠাৎ করে একদিন তাড়াহুড়ো করে পাশের ঘরে নতুন ভাবে কাপড়ের দোকান চালু করে দিলো। পাইকারি কাপড় কিনতে ঘন ঘন কলকাতায় যাওয়া আসার মাধ্যমে কিন্তু জবার সাথে দেখা করে যৌবনের আনন্দ উপভোগ করা। 

ভেবে ছিলাম হয়তো জবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে কিন্তু ছিন্ন না হয়ে আরো বেশি গভীর সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। এখন মোবাইলের মাধ্যমে প্রেম চলছে আর প্রায় দিনই কাজের নাম করে জবা কে নিয়ে হোটেলে লজে রাত কাটায়।

আমার চোখকে ফাঁকি দিতে চাই। ভেঙ্গে যাওয়া মন নিয়ে আর কত দিন মিথ্যা প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে জোড়াতালি দিয়ে সংসার করবো। বোন জবা আমার ভবিষ্যতের কথা একবার ভাবলে না। 

নিজের উত্তাল যৌবনের ক্ষুধা মেটাতে শেষ পর্যন্ত জামাইবাবু কে ব্যবহার করে আমার সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। নারী জাতির সম্মান কলঙ্কিত করে দিয়েছে।

দেশে কি যুবক ছেলেদের আকাল পড়েছে! কেন আমার স্বামীকে নিয়ে টানাটানি করছিস?

সংসারে যে স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি মানবতাবোধ থাকে না। স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যে অবহেলা করে, সেই স্বামীর থেকে দূরত্ব বজায় রাখা অনেক নিরাপদ। 
তা হলে আমি দু'জনের পথের কাঁটা না হয়ে কিন্তু আত্মহত্যা করে দেহ বিসর্জন দেবো। 

ভবানন্দের তার ভালোবাসার জবা কে বিয়ে করার পথ তৈরি হয়ে যাবে। তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। চিন্তা ভাবনা করতে করতে ছাদের রেলিং এর ধারে আসে।

আর সেই মুহূর্তে রাস্তা দিয়ে এক বাউল একতারা হাতে নিয়ে গান গাইতে গাইতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। গানের কথা গুলো বার বার সোনালীর কানে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।

সাধের মানব জীবন আর ফিরে পাবে নারে।
বেঁচে থেকে লড়াই করে পৃথিবীর টা দেখ ঘুরে।
মরিলে জীবনে সব কিছু সমাধান হয় নারে মন।
দেখ না একবার ঘরের বাইরে বেরিয়ে,
অনন্ত সুখ আছে পথের মাঝে।

বিষয় বাসনা ত্যাগ করলে 
মনে অনন্ত শান্তি লাভ করা যায়।
মাটির দেহ মাটি হবে এ তো সবাই জানে।
দেখনারে মন একবার বাড়ির বাহির হয়ে।

ওরে মন বিপদে ঈশ্বরের বিশ্বাস ভক্তি রাখ।
পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।

সোনালী ভাবে বাউল সম্রাট ঠিক বলেছেন।
আমার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক স্বনির্ভর হতে হবে । ভবানন্দের অর্থ প্রাপ্তির পর অহংকারের পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করতে শুরু করেছে। নিজেকে জ্ঞানী, গুণী ও ধনী ব্যক্তি মনে করে। 

পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

                সংকল্প
- কাজী নজরুল ইসলাম---সংকলিত (কাজী নজরুল ইসলাম)

থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,- 
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে। 
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে 
ছুটছে তারা কেমন করে, 
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে, 
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।। 

কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে, 
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গপানে। 
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি 
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি, 
কেমন করে আঞ্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে, 
কেমন জোরে টানলে সাগর উথলে ওঠে জোয়ার বানে। 

কেমন করে মথলে পাথার লক্ষী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে, 
কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয় চুড়ে। 
তুহিন মেরু পার হয়ে যায় 
সন্ধানীরা কিসের আশায়; 
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরেঃ 
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন 'মঙ্গল' হতে আসছে উড়ে।। 

কোন বেদনার টিকিট কেটে চন্ডু-খোর এ চীনের জাতি 
এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি। 
আয়ার্ল্যান্ড আজ কেমন করে 
স্বাধীন হতে চলছে ওরেঃ 
তুরষ্ক ভাই কেমন করে কাঁটল শিকল রাতারাতি! 
কেমন করে মাঝ গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।। 

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে- 
আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে। 
আমার সীমার বাঁধন টুটে 
দশ দিকেতে পড়ব লুটেঃ 
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়েঃ 
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।
                  ---------------------------
কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতার মাধ্যমে ঠিকই বলেছেন "থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,- 
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।"

সোনালীর শাশুড়ি বৌমা বৌমা ডাকতে ডাকতে সিঁড়ির বেয়ে ছাদে উঠে এসে বলে :- কার সাথে কথা বলছিস মা তারপর গায়ে হাত দিয়ে আদর করে বলেন এখনও কি বকবক করে চলেছিস! সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে চল নিচে যায়।

সোনালী তার শ্বাশুড়ী মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে :- মা; আপনার ছেলেকে আমি শেষ রক্ষা করতে পারলাম না কিন্তু আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

শাশুড়ি মা তার বৌমার চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলেন :- মেয়েদের চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কি উপায় আছে বল! আমি আর ভেবে ভেবে কিছুই কুল কিনারা করতে পারছিনা।

সোনালী বলে :- মা ; আমি আর সহ্য করতে পারছিনা।

----------------------------------------------------------
                ।। ষোড়শ অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সোনালী ভাবে মনে :- এখনো চাকরির আবেদন করার বয়স কয়েক বছর আছে। লোকজনের মুখে শুনতে পায়,শনিদেবের কৃপায় অনেকের সন্তান লাভ হয়েছে। তাহলে শনিদেবের সাধনা করে দেখা যাক কি ফল লাভ হয়। শনিদেবের মন্দিরে গিয়েছিলাম এবং শনি ভক্ত প্রাণ বয়স্ক সাধু বাবা সত্যজিৎ বাবাজী বলেছেন, একুশ টা শনিবার উপবাস থেকে শনিদেবের সাধনা করলে অবশ্যই সাধনকারী মনের বাসনা পূর্ণ করেন। 

নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন ব্রত চালাকালিন স্বামী স্ত্রী কে সাবধানে থাকতে হবে অর্থাৎ সম্পুর্ন ব্রহ্মচর্য রক্ষা করতে হবে এবং সম্পুর্ন ভাবে নিরামিষ আহার খেতে হবে। ব্রত চলাকালীন ব্রতের বিষয়ে অন্য কে বলা যাবে না, বললে উভয় পক্ষের ক্ষতি হবে।

বৌমা কে দেখতে না পেয়ে সোনালীর শ্বাশুড়ি চন্দ্রা সন্ধ্যার সময়ে ঘি'য়ের প্রদীপ জ্বেলে তুলসী তলায় প্রদীপ দান করার পর ঠাকুর ঘরে এসে নিত্যদিনের পূজা শেষ করে চা বানিয়ে চায়ের দুটি কাপ প্লেটে করে নিয়ে সোনালীর ঘরে ঢুকে পড়ে।

সোনালী কে দেখতে না পেয়ে চা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে ভাবে মনে বৌমা ঘরে নেই তবে কোথায় গেল। প্রতিদিন বৌমা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালিয়ে থাকে। 

আজ সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গিয়েছে তবুও বৌমার দেখা নাই কোথায় যেতে পারে। অজানা আকাঙ্ক্ষায় বুক কেঁপে উঠে বলে বৌমা কিছু করেনি তো! আমার ছেলে কিন্তু নিজের সুখের জন্য বৌমার দুঃখ কষ্ট বুঝতে চাই না।

শ্বাশুড়ি মা সোনালী সোনালী বলে ডাকতে ডাকতে দ্রুত এ ঘর ও ঘর খোঁজ করতে থাকে। ছোটাছুটি করে সোনালীর দেখা না পেয়ে ক্লান্ত হয়ে দোতলার সিঁড়ির মুখে বসে পড়ে। 

কিছুক্ষন জোরে জোরে শ্বাস প্রশ্বাস টেনে নিয়ে উদ্বেগের সহিত দ্রুত পা চালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে আসে।

শ্বাশুড়ি মা হাঁপাতে হাঁপাতে সোনালীর নিকটে গিয়ে পিঠে হাত রেখে মাতৃস্নেহ দিতে দিতে শ্বাশুড়ি বলে :- সোনালী আকাশের দিকে মুখ করে ভাবান্তর হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন! পৃথিবীর কোন শব্দ তোর কানে ঢুকছে না। চল মা ঘরে যায় রাত হয়ে গিয়েছে চা পান করবি তো।

সোনালী শাশুড়ির স্পর্শ পেয়ে চমকিত হয়ে বলে চলুন মা। মনের শান্তি লাভ করার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি মা। সংসারের নিয়ম অনুসারে একজন আরেকজনের চাহিদা পূরণ করতে না পারলে কিন্তু ওই আকাশের শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না।

আরো কিছুদিন পর একদিন বিকালবেলা শাশুড়ি মায়ের কাছে বসে সোনালী বলে :- মা, আমি শনিদেবের কঠোর সাধনা করবো, আমাকে সহযোগিতা করতে হবে কিন্তু বিস্তারিত আপনাকে এখন জানাতে পারবে না।

শাশুড়ি মা বলেন :- আমি অনুমতি দিলাম এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার মনোবাসনা পূর্ণ হোক।

সোনালীর ভাবনা অনুসারে প্রতি শনিবার শনিদেবের ব্রত শুরু করে এবং রাতে স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে শয়ন করে। 

স্বামী ভবানন্দের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে।সোনালী প্রতি শনিবার বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিন্তু পরের দিন সকালে ফিরে আসে।

ভবানন্দ তার স্ত্রীর কাছে এসে উত্তেজিত হয়ে বলে :- রাতে কোথায় ছিল আর তোমাকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে কেন! সারারাত জেগে তুমি এমন কি মহান কাজ করে?

সোনালী বলে :- সময় হলে ঠিকই জানতে পারবে কিন্তু এখন আমাকে বিরক্ত করো না।

সোনালীর স্বামী সঠিক উত্তর না পেয়ে কিন্তু দুজনের মধ্যে চরম অশান্তি সৃষ্টি হতে থাকে। সোনালী আত্ম স্বনির্ভর লাভের জন্য স্বামীর সাথে বিভিন্ন ভাবে ছলচাতুরি করে গোপনে গোপনে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পদের জন্য আবেদন সহ অন্যান্য বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী চাকরীর জন্য আবেদন করতে থাকে।

সোনালী বেশিরভাগ বাবার বাড়ি যাওয়ার নাম করে চাকরির ইন্টারভিউ এর জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। সোনালীর আসা যাওয়ার কারণে তার বোন জবা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। এদিকে মোবাইলের মাধ্যমে সোনালীর আসা যাওয়ার সংবাদ ভবানন্দের কাছে পৌঁছে যায়।

একদিন অধৈর্য হয়ে ভবানন্দ তার স্ত্রী সোনালীকে বলে :- এত ঘন ঘন বাপের বাড়ি যাওয়ার কি দরকার আছে?

সোনালী হাসতে হাসতে বলে :- বাবার বাড়ি গিয়ে যদি একটু মনের শান্তি লাভ করতে পারি কিন্তু তুমিতো আর আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।

আমার বাপের বাড়িতে আসা-যাওয়া করার কারণে নিশ্চয়ই তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছো। যাকে ভালো লেগেছে চিরকাল তার কাছেই থাকে কিন্তু আমার মত তাকে কষ্ট দিও না। 

ভবানন্দ শান্ত গলায় বলে :- তুমি কি বলতে চাচ্ছ?

সোনালী বলে :- আমি তোমার পথের কাঁটা হয়ে বাধা সৃষ্টি করবো না। আমি তোমার কোন কাজে কখনো বাধা সৃষ্টি করিনি কিন্তু আমার চলার পথে বাধা সৃষ্টি করে না কারণ উভয়ের সর্বনাশ হতে পারে।

ভবানন্দ বলে :- তুমি পাগলের মতো প্রলাপ বকছে কেন ! তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। চলো কলকাতায় গিয়ে মানসিক রোগীর চিকিৎসকের সাথে কথা বলে আসি।

সোনালী বলে আমি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ আছি কিন্তু তুমি মানসিকভাবে ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তোমাকে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে।


----------------------------------------------------------
           ।। সপ্তদশ (১৭) অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সোনালী সপ্তাহে একদিন রাতে বাড়িতে না থাকার কারণে স্বামীর মনে অবিশ্বাসের ছোঁয়া লাগে। প্রতিনিয়ত সোনালীকে সন্দেহ করতে থাকে। সোনালীর হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বার্তায় ভবানন্দের সাথে মাঝে মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি হয়।

ভবানন্দ ভাবে তাহলে কি আমার মতোই সোনালী অন্য কোন পুরুষের সঙ্গ করে! ঝড় বৃষ্টির জল যাই হোক না কেন প্রতি শনিবার বিকেল গিয়ে সারারাত থেকে ভোরবেলা বাড়িতে আসে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে উগ্র মূর্তি ধারণ করে বিভিন্ন কথা শোনায় কিন্তু এমনকি রাজকার্য করতে চায়, যা তার স্বামীকে বলা যাবে না। 

আমি সোনালীর বোন জবা ভালবেসে ভুল করেছি কিন্তু ভুল শোধরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। জবা কিন্তু আমাকে ছাড়বে না। যে কারণে জবার সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছি তা কিন্তু নিশ্চিত আমার পিতা হওয়ার সব রকম ক্ষমতা আছে।

হঠাৎ একদিন ভর দুপুরবেলা ভবানন্দ বাজার থেকে বাড়ির গেটে এসে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করতে করতে বাড়ির মধ্যে আসে। সেই সময় সোনালী রান্না ঘরে দুপুরের খাবার তৈরি করার জন্য ব্যবস্তা ছিল।

ভবানন্দ ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে রান্না ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

সোনালী বলে :- কি হয়েছে! বাড়িতে আসতে না আসতেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছো!এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছি, ভর দুপুরে চিৎকার চেচামেচি করার কারণ কি ?

রাগাম্বিত ভাবে ভবানন্দ বলে :- আমাকে না জানিয়ে, না বলে প্রত্যেক শনিবার সারারাত কোথায় থাকো আজ তোমাকে জবাব দিতেই হবে।

উত্তেজিত হয়ে সোনালী বলে :- আমি কোথায় যাই কি করি! সে কথা তোমাকে আমি বলবো না। কারণ জানার অধিকার তুমি নিজে থেকেই হারিয়ে ফেলেছো। লোকের কথা শুনে এখন স্বামীত্ব ফলাতে চেয়েও না, চুপচাপ থাকো শান্তি বজায় থাকবে।

ভবানন্দ বলে :- তোমাকে কেন্দ্র করে লোকের মুখ থেকে নানা রকম বাজে বাজে অশ্লীল কথাবার্তা শুনতে হচ্ছে। তোমার মতো অসৎ চরিত্রের নারীর জন্য আমার মান-সম্মান মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। লোকে প্রকাশ্যে অপমান করে চলেছে।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- তাহলে লোকের কথায় কান দিয়ে সংসার পরিচালনা করো, তাহলে বউয়ের উপর বিশ্বাস হারিয়ে লোকের কথা শুনে বেড়াও।

ভবানন্দ প্রচন্ড ভাবে রেগে গিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সোনালীকে এলোপাতাড়িভাবে চড় থাপ্পড় পুষি মারতে মারতে বলে :- পর পুরুষের সঙ্গ করতে লজ্জা করে না চরিত্রহীনা, কুলের নাশকারি কুলাটা ও ঘরে স্বামী থাকতে পরপুরুষের কাছে যাওয়া বেশ্যা নারী ---------------।

সোনালী বলে :- আমাকে মারতে মারতে মেরে ফেললেও কিন্তু তোমাকে বলবো না কোথায় যাই এবং কি করি। নিজের দোষ ঢাকতে লোকের কথায় আমার উপর নির্যাতন করছো।

তোমাদের বংশের ধারা লোকের কথা শুনে বউকে পেটানো কিন্তু যত পারো মারো তবুও আমি বলবো না।

ভবানন্দের হাতের আঘাতে ভাতের হাঁড়ি ও তরকারি গামলা ছিটকে গিয়ে উল্টো পড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে থাকে। রান্নাঘরে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ভবানন্দের পায়ের আঘাতে নিভানো গ্যাস ওপেন ছিটকে পড়ে গ্যাসের পাইপ খুলে যায়। গ্যাস সিলিন্ডারের মুখ খোলা ছিল মুহূর্তের মধ্যে রান্না ঘরে গ্যাসে ভরে উঠে।

সোনালী তাড়াহুড়ো করে গ্যাস সিলিন্ডারের মুখের সুইচ বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে। ভবানন্দ রান্না ঘরের ব্যবহৃত হাতা খুন্তি তুলে নিয়ে সোনালীকে পেটাতে থাকে।

সোনালী তার স্বামী কে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ভবানন্দ ওরে বাবা বউ আমাকে মেরে ফেললো বলে জোরে জোরে চিৎকার করে ওঠে । 

বাড়ির পাশের প্রধান পাকা সড়কে চেনা অচেনা মানুষ জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। দোকানের কর্মচারী মালিকের ঝগড়া শুনে আগে থেকে গেট বন্ধ করে রেখেছে।

সোনালী নিজেকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে দৌড়াতে বলে :- মাগো; তোমার ছেলে আমাকে মেরে ফেললো বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও ।

ভবানন্দ সবজি কাটার বটি নিয়ে তাড়া করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে বলে :- তোকে আজ কেটে কেটে টুকরো করে কুকুর দিয়ে খাওয়াবো -------------------------------।

সোনালী পড়িমড়ি করে দৌড়াতে দৌড়াতে উঠানে পড়ে যায়। আবার মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে তাড়াহুড়া করে একটি ঘরের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

সোনালী উত্তেজিত হয়ে ঘরের মধ্যে থেকে বলে :- 'যাদের জন্য করি চুরি তারাই বলে চোর' আর বাঁচতে চাই না, আর বাঁচতে চাই না বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে।

দরজায় জোরে ধাক্কা দিতে দিতে ভবানন্দ বলে :- দরজা খোল, দরজা খোল তোর একদিন কি আমার একদিন। তোর সতীপনা আজ কিন্তু চিরতরে ঘুচিয়ে দেবো। সমাজের সামনে সতী সাবিত্রী নাটক করা।

সোনালী বলে :- তোমার মুখে আগুন দিয়ে তারপর কিন্তু আমি বিধবা হবে। মিগশের অর্থাৎ (স্বামী) আর খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই শুধু মেয়ে মানুষের শাসন করার নাম করে শুধু মারধর করতে পারে। 

ভবানন্দ বলে :- মেয়ে মানুষের এত বড় সাহস হয় কি করে! পুরুষের মুখোমুখি কথা বলার।

সোনালী বলে :- পুরুষ নামক অপদার্থ স্বামীর ঘরে বউ থাকতে অন্য মেয়ের কাছে যেতে যখন লজ্জাবোধ হয় না আবার মান সম্মান নষ্ট হয় না। 

ভবানন্দ বলে :- আশ্রিত একজন নারী হয়ে আমার মতো পুরুষের সাথে তুলনা করে চলেছে।

সোনালী বলে :- স্বামী যদি ব্যাভিচারী হতে পারে তাহলে তার বউ অন্য পুরুষের কাছে গেলে দোষ কোথায়! আমি আরো পাঁচজন পুরুষের কাছে গিয়ে তোমাকে দেখিয়ে দেবো। নারীরা সব পারে।

ভবানন্দ চিৎকার করতে করতে বলে :- তোর মুখ জুতিয়ে ভেঙে দেবো। একজন পুরুষ শত শত নারীর কাছে গেলে কিন্তু কোন দোষ হয় না আবার একজন নারী স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষের কাছে গেলেই সমাজের মানুষের কাছে নিন্দনীয় হয়ে পড়ে।

সোনালী, আরো উত্তেজিত হয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বলে :- নারী বলে কি স্বামীর অধিকারের শক্তিতে তার মাথা কিনে নিয়েছে! নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছা নিজের মতো করে চলার স্বাধীনতার কোন মূল্য নেই। নারীরা তোমাদের মত পুরুষের কাছে ধন সম্পত্তির মত সংরক্ষিত বস্তু মনে করে।

ভবানন্দ বলে :- অবশ্যই নারীর সুরক্ষা দিয়ে পুরুষেরাই যত্ন করে সংসারের মাঝে সুরক্ষিত করে রেখেছে। আর জেনে রেখো নারীদের কোন দিন স্বাধীন ছিল না আর কোনদিন তা হবে না।

সোনালী বলে :- তোমার মত কাপুরুষের এই কথাগুলো মানায়। নিজের অপরাধ ঢাকতে অন্যের উপর দোষ চাপানো।

ভবানন্দ বলে :- নারী চিরকালই শৃঙ্খল বদ্ধ অবস্থায় পুরুষের শাসনে থেকে এসেছে এবং ভবিষ্যৎ থাকবে।

সোনালী বলে :- কাপুরুষ তোমার পুরুষত্ব ও চরিত্রের ধিক্কার জানাই। খোলা জানালার গ্রিলের ভিতর দিয়ে থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু থু ফেলতে শুরু করে।

সোনালীর শাশুড়ির বয়স জনিত শরীর ভালো না থাকার কারণে পাশের রুমে ঘুমিয়ে ছিল। বৌমার কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে ধরফর করে উঠে পড়ে। ভয়ে আতঙ্কে তার বুকের মাঝে ধরপর করতে শুরু করে। মনের মাঝে আতঙ্কিত হয়ে অজানা বিপদের আকাঙ্ক্ষায় দ্রুতবেগে ঘরের থেকে বেরিয়ে সোনালী ঘরের সামনে আসে।

সোনালী জানলা দিয়ে শাশুড়িকে দেখে ঘরের মধ্যে থেকে হাও মাও করে কেঁদে উঠে বলে :- মা; আপনার ছেলে আমাকে মেরে সারা শরীরে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এই পাষণ্ড নরপশুর হাত থেকে আমাকে বাঁচান।

ভবানন্দ বলে :- ধরতে পারলে তোকে আজ খুন করে ফেলব পরকীয়া, প্রেম করা হচ্ছে -----------।

সোনালী চিৎকার করে বলে, মা ওর কথা বিশ্বাস করবেন না, আমি কোন অন্যায় কাজ করিনি।

শাশুড়ি মা তার ছেলের হাত থেকে সবজি কাটার বটি কেড়ে নিয়ে বলে :- ভবানন্দ, এতদিন ভাবতাম তুই আমার প্রকৃত ভালো ছেলে কিন্তু বৌমার অতীত ও বর্তমান অবদানের কথা গুলো ভুলে গেছিস! লক্ষ্মীছাড়া চরিত্রহীন বদমাইশ ছেলে তোর মুখ দেখতে চায় না।

  জানলার কাছে সোনালীকে দেখতে পেয়ে ভবানন্দ ছুটে চলে যায় আর সেই মুহূর্তে সোনালী চিৎকার করে দূরে সরে যায়।

ভবানন্দের মা বলেন :- লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো বউ পেয়েও কিন্তু তার উপর অত্যাচার করে ছিস কিন্তু তোর নরকে স্থান হবে না। আজ বুঝতে পারলাম তুই একটা অপদার্থ ছেলে।

ভবানন্দ চিৎকার করে বলে :- তোমার বৌমা অসতী, কুলটা ও চরিত্রহীন।

ভবানন্দের মা তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছেলে ভবানন্দের গালে চড় থাপ্পর মারতে শুরু করে। 
ভবানন্দ কোন কথা না বলে চুপচাপ হয়ে মেঝের উপর বসে পড়ে।

ভবানন্দের মা বলেন :- আমি বলছি বৌমা কোন অন্যায় কাজ করতে পারে না। তোর মত নেমকহারাম নয়। যেসব ব্যক্তিরা চরম বিপদের মুহূর্তের সময় পাশে দাঁড়িয়ে আশ্রয় দিয়ে টাকা খাদ্য প্রদান করে তোদের দুজনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাদের দুই মেয়ে কেই সর্বনাশ করলি কেন! আজ যদি তোর বোনের এই একই অবস্থা হতো তাহলে তোর মনের অবস্থা কেমন হতো।

সোনালী মা বলে চিৎকার করে ওঠে বলে :- আমি আর এই সংসারে বেঁচে থাকতে চাই না। আমি মরতে চাই আমি মরতে চাই আমি মরতে চাই। দেওয়ালে আঘাত করে শাখা পলা ভাঙতে শুরু করে।

ভবানন্দের মা চিৎকার করে উঠে বলেন :- বৌমা; স্বামী জীবিত থাকতে এমন কাজ করোনা। 

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- স্বামী অনেকদিন আগেই আমার কাছে মৃত হয়ে গিয়েছে।

সোনালীর দুই হাত দেয়ালে আঘাত করার ফলে হাত কেটে রক্ত ঝরতে শুরু করে।

ভবানন্দের মা উত্তেজিত হয়ে বলেন :- লোকের কথায় কান দিয়ে বৌমার দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেছিস কিন্তু এই প্রতিটি আঘাত একদিন প্রতিঘাত হয়ে ফিরে আসবে। সেদিন হয়তো এই পৃথিবীতে আমি থাকবো না আর বৌমাও থাকবে না কিন্তু একা একা যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।

ভবানন্দ বলে :- দোষ করলে তাকে শাসন করা যাবে না।

ভবানন্দের মা বলেন :- লোকে বলল তোমার কান চিল পাখি নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কানে হাত না দিয়ে চিল পাখির পিছনে পিছনে দৌড়াতে শুরু করা মানেই চরম বোকার পরিচয়। আমি বারবার বলছি বৌমা কোন দোষের কাজ করেনি।

ভবানন্দ উত্তেজিত হয়ে বলে :- তাহলে আমার আর সংসারে কোন প্রয়োজন নেই।

ভবানন্দের মা বলেন :- সোনালী তোর আদর্শবান বউ হতে চেয়েছিল কিন্তু তুই আদর্শবান স্বামী হতে কোনদিন চেষ্টা করিস নি আর কোনদিন করতে পারবে না। 

এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা তোর শুভাকাঙ্ক্ষী কুপরামর্শ বন্ধুদের কাছে চলে যা। টাকার অহংকারে অনেক নিচের দিকে নেমে গিয়ে ছিস কিন্তু মনে রাখিস এই টাকা শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না।

সোনালী বলে :- মা কাকে জ্ঞান দিচ্ছেন।

ভবানন্দের মা কান্না করতে করতে বলেন :- আমাদের আর দেখাশোনা করতে হবে না। তোকে মাতৃ ঋণ থেকে চিরতরে মুক্ত করে দিলাম।

ভবানন্দ উত্তেজিত হয়ে দ্রুত পা ফেলে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এসে উঠানের মধ্য দিয়ে সদর দরজার গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করে।   

সোনালী শ্বাশুড়ি দুই হাত দিয়ে জোরে বুক চেপে ধরে বসে পড়ে। সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করতে করতে বারান্দার মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে দিতে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বলে :- মা আমাকে একটু জল দে, আমার পরপারে যাবার সময় হয়ে গিয়েছে। 

সোনালী তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে এসে কোলের উপর মাথা তুলে নিয়ে কয়েক ঢোক জল পান করানোর পর চিৎকার করে বলে :- ওগো, মা ভীষনভাবে ছটফট করছে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।  

ভবানন্দ চিৎকার শুনে পিছনের দিকের তাকিয়ে মাকে মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখে মা মা বলতে বলতে দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের কাছে এসে বলে :- মা; তোমার কোথায় কষ্ট হচ্ছে।

সোনালী বলে :- তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করে, না হলে মাকে আমরা আর বাঁচাতে পারবো না।

ভবানন্দ তাড়াহুড়ো করে তার গাড়িতে মা ও সোনালী কে তুলে নিয়ে দ্রুত বেগে হাসপাতালে পৌঁছিয়ে গিয়ে মাকে ভর্তি করে। প্রাথমিক চিকিৎসা করে কলকাতা শহরের হাসপাতালে হস্তান্তর করে। কলকাতার নামকরা এক নার্সিংহোমে ভবানন্দ তার মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। কয়েকদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে এক সময় ভবানন্দ ও সোনালী কে চির বিদায় জানিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হয়ে পড়ে।

শাশুড়ি মায়ের মৃত্যুর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে শাশুড়ি মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে সোনালী বলে :- মা; তুমি তো মরে গিয়ে শান্তি লাভ করলে কিন্তু আমাকে তোমার ছেলে যমের হাতে রেখে গেলে। কিছুদিন অপেক্ষা কর আমি তোমার কাছে আসছি সংসারের সব সুখ আমার বোঝা হয়ে গিয়েছে।

পাগলের মত প্রলাপ বকতে বকতে এলোমেলো ভাবে হঠাৎ ছুটতে শুরু করে।
----------------------------------------------------------
            ।। অষ্টাদশ (১৮) অধ্যায় ।। 
----------------------------------------------------------
সোনালী ভাবে :- শ্বাশুড়ি মায়ের মৃত্যু কারণে একদম একা হয়ে পড়েছি। স্বামী এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বোন জবার সাথে আরো গভীরভাবে আন্তরিকতা সৃষ্টি করেছে।

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের আয়োজনের জবা বাড়ির গিন্নির মতো সব জায়গায় কর্তৃত্ব দেখিয়ে সব কাজ কর্ম করেছে। আমার কোন ভূমিকা পালন করতে দেয়নি।

যে ভাবে দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গভাবে মেলামেশা চলছিল তা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি কিন্তু অশান্তির ভয়ে চুপচাপ ছিলাম। আমার যখন এই সংসারের সব প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে। তখন আর সন্তানের জন্য সাধনা করে কোন লাভ হবে।

এখন আর নিজেকে খুশি হওয়ার মতো কিছু নেই আবার অন্যকে খুশি করার সময় বয়ে চলে গিয়েছে। যা হচ্ছে তা চুপচাপ মেনে নেওয়া ভালো কিন্তু চোখের সামনে যা ঘটেছে তা কিন্তু দেখে মানতে পারছি না।

দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খেতে যেতে নিরাশায় ভুগতে ভুগতে সবকিছুর আশা ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু হঠাৎ একদিন পোস্ট অফিস থেকে ফোন আসে।

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলে :- আপনার একটি রেজিস্টার চিঠি আছে। আপনার ইচ্ছা অনুসারে পোস্ট অফিস থেকে নিয়ে যান।

সোনালী চিঠি হাতে নিয়ে আনন্দিত মনে খাম খুলে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পদে নিয়োগ পত্র পড়তে শুরু করে।

প্রাইমারি স্কুলের নিয়োগের ব্যাপারে শিক্ষা দপ্তরের অফিসে উপস্থিত হয়ে অফিসারের সাথে দেখা করে, নিজের জীবনের দুঃখের ও লড়াইয়ে ঘটনা জানাই। স্বামীর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার জন্য নিজের পছন্দের স্থানে চাকরির নিয়োগ পত্র দেওয়ার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করে।

শিক্ষা দপ্তরের বয়স্ক অফিসার বলেন :- মা, তোমার অত্যাচারের করুণ কাহিনী শুনলাম কিন্তু কোন নারীর জীবনে তোমার মতো ঘটনা আর না ঘটে। তোমার লড়াই কে সম্মান করি, তোমার নিয়োগপত্র যথাসময়ে পেয়ে যাবে।

একদিন রাতে সোনালী মান অভিমান ভুলে নিজের থেকেই স্বামী ভবানন্দের নিকটে গিয়ে উপস্থিত হয়।

সোনালী বলে :- তুমি কেমন পুরুষ মানুষ। বৌয়ের মান ভাঙানোর চেষ্টা করে না। বলে জড়িয়ে ধরে আদর করতে যায় ।

ভবানন্দ বলে :- থাক আর আদর করে মায়া বাড়াতে হবে না।

সোনালী তার স্বামীর পা জড়িয়ে ধরিয়ে চোখের জলে পা ভিজিয়ে দিয়ে বলে :- আমাকে মাফ করে দাও। মায়ের মৃত্যুর পর শোকাহত হয়ে তোমার ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারিনি ঠিক। 

ভবানন্দ ভাবে মনে মনে :- রাগ করে থাকলে কিন্তু তুষের আগুনের মতো দুজনেই অন্তর দাহে জ্বলে পুড়ে মরতে হবে। আর পাগলী বউয়ের মন মানসিকতা যখন আজ ভালই আছে তাহলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করাই ভালো। না হলে আবার হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।

সোনালী বলে :- লোকে বলে স্বামীর পায়ে নাকি নারীদের স্বর্গ সমতুল্য কিন্তু সেই স্বর্গ সুখ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে বঞ্চিত করে রেখেছে। 

ভবানন্দ দুই বাহু প্রসারিত করে সোনালী কে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলে :- সোনালী তোমার স্থান আমার পায়ে নয়, এসে আমার বুকে। ভুল বুঝে তোমাকে অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছি কিন্তু আমাকে ক্ষমা করে দাও। 

রাগ অনুরাগের পালা শেষ করে মিলনের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত পার করে সোনালী বলে :- শ্রী শ্রী দূর্গা পূজার বাকি দুই মাস একুশ দিন কিন্তু এই কটা দিন অর্থাৎ প্রতিদিন আমার সাথে থাকতে হবে কথা দাও।

ভবানন্দ তার বউকে খুশি করার জন্য বলে :- তোমার প্রস্তাবে সম্মত আছি কিন্তু তুমি উল্টোপাল্টা পাগলামি করবে না, আমাকে কথা দাও। বলো আমাকে আর কি কি করতে হবে?

স্বামী কে আদর করতে করতে সোনালী বলে :- আমি তোমাকে সন্তানের মুখ দেখতে পারলাম না। কিন্তু বংশ রক্ষা করার জন্য নতুন করে বিয়ে করার অনুমতি দিলাম।

ভবানন্দ ভাবে মনে ভূতের মুখে রাম রাম সন্তান-সন্তান করে কতনা ঝগড়া অশান্তি মান অপমান।

সোনালী বলে :- সতীনের সন্তান কে নিজের সন্তান মনে করে বেঁচে থাকব। সন্তান লাভ হলে আর কেউ তোমাকে হাটকুড়া (অর্থাৎ সন্তানহীন দম্পতিরা)
বলতে পারবে না।

আনন্দিত মনে ভবানন্দ বলে :- সত্যি বলছো তো?

সোনালী বলে :- সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি। যদি মনে বিশ্বাস না হয় তবে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে আমার কোন আপত্তি নেই বলে স্বীকারোক্তি দিয়ে
কোর্ট পেপারে লিখিত করে দেবো।

ভবানন্দ ভাবি মনে :- তাও কি সম্ভব! শশুর মশাই এর পরিবার যদি মেনে না নেয়।

সোনালী বলে :- তোমার পছন্দের নারীকে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করবো। শুধু আমাকে দুঃখের বদলে একটু সুখ শান্তি দিয়ো। আমি সংসারের লড়াই করতে করতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সতীন বাড়িতে আসার পর আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই।

ভবানন্দ বলে :- ঠিকই বলেছ তোমার যা শরীরের অবস্থা দিন বিশ্রামে থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।

----------------------------------------------------------
          ।। ঊনবিংশ (১৯) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা চারিদিকে দিনের বেলায় অন্ধকার আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালের অবিরাম বৃষ্টির ধারা বয়ে চলেছে।

সোনালী বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে উদাস মনে ভাবতে শুরু করে :- আমি এই বাড়িতে থাকাকালীন বোন জবার সাথে স্বামীর কোন দিন মিলন সম্ভব নয়। আমাকে ত্যাগ স্বীকার করে চিরতরে বিদায় নিতে হবে।

আঠারো বছর বয়সে ভবানন্দের হাত ধরে বধু রূপে শ্বশুরবাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই আমার পোশাক-পরিচ্ছদ ও হাতে এবং গলায় সোনার অলংকার না দেখে শাশুড়ি ও ভাসুরের বউ জা আমার বাবা-মাকে অশ্লীল ভাষায় অপমানজনক কথা বার্তা বলে এবং আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতে থাকে। কারণ আমার পিতা স্বামীর বাবা-মায়ের চাহিদা অনুসারে জিনিসপত্র দিতে পারেনি।

সেই মুহূর্তে অনুভব করেছিলাম আমার কপাল পুড়েছে তারপর বাড়ির কাজের মেয়ের যে সম্মান ও স্বাধীনতা আছে কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বাড়ির ছোট বউয়ের সম্মান ছিলনা।

দিনরাত তাদের সংসারের কাজ করতে হয়েছে কিন্তু বিনিময়ে দুমুঠো ভাত ঠিক মত খেতে দিত না। স্বামীর বেকার অবস্থার পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে গিয়ে উক্ত পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।

ভেবেছিলাম সুখ পাবো কিন্তু মাঝে বোন জবা এসে কিন্তু সুখের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে চিরতরে পালাতে হবে।

যৌবনের বারে বছর দুঃখের সাগরে ভেসে ভেসে চলে গিয়েছে কিন্তু কোন কুল কিনারা পায়নি। ত্রিশ বছর বয়সে স্বামীর কাছে থেকে পালাতে হবে। 

বেদনার বালুর চরের মাঝে ক্ষণিকের সুখের লাগি ঘর বেঁধেছিলাম কিন্তু সামুদ্রিক ঝড়ে তা ভেঙ্গে দিয়ে গেল। প্রবাদ বাক্যে বলে আপন থেকে পর ভালো পর থেকে জঙ্গল ভালো আবার জঙ্গল থেকে নাকি মৃত্যু আরো ভালো।

কয়েক সপ্তাহ পর রাতে ভবানন্দ ঘরে ঢুকে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে বলে :- সোনালী তোমার কি হয়েছে! অন্ধকারময় ঘরের কোণে চুপচাপ বসে আছে। চলো কোথাও গিয়ে কিছুদিন ভ্রমণ করে আসি তাহলে তোমার মন মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে যাবে।

সোনালী তার স্বামী কে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে :- জীবনের আলো যখন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে কিন্তু তখন কৃত্রিম আলো জ্বালিয়ে আলোকিত হয়ে আর কতদিন জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকা যাবে। 

ভবানন্দ তার স্ত্রীকে আদর করে সান্তনা দিতে দিতে বলে :- তুমি চিন্তা ভাবনা কম করো।

সোনালী বলে :- আমার মন বলছে আমি আর বেশি দিন এই সুন্দর পৃথিবীর মাঝে থাকবে না। সোনালী নামক নারী চিরদিনের জন্য তোমার কাছে থেকে হারিয়ে যাবে।

ভবানন্দ বলে :- তুমি এইসব কথা আর বলবে না। তুমি হারিয়ে গেলে আমার দশা কি হবে একবার ভেবে দেখেছো!

সোনালী বলে :- হয়তো আনন্দের মাঝে কেউই আর কোন দিন মনে রাখবেন না। বাবা মা যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন হয়তো তাদের মনে পড়বে। স্বামী নতুন নারী কে বউ রুপে পেয়ে পুরনো বউ কে চিরে দিনের মতো ভুলে যাবে।

ভবানন্দ বলে :- তোমার হেঁয়ালি পূর্ণ কথার মানে ঠিক বুঝতে পারছি না। কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি তুমি অদ্ভুত ধরনের কথাবার্তা ও আচরণ করে চলেছ। চলে তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসি।

সোনালী বলে :- মানসিক যন্ত্রণার ঔষধ তোমার ডাক্তার বাবু দিতে পারবে না।

ভবানন্দ বলে :- তুমি, এই ভাবে ভেঙ্গে পড়লে, আমি কাকে নিয়ে বাঁচব! তুমি এ রকম আচরণ করে না। তোমার মনের দুঃখের কষ্ট কিন্তু আমি অনুভব করতে পারি। বাড়ির ঘরের কোনায় বসে না থেকে বাইরে বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করে। দশ মানুষের সাথে কথা বললে কিন্তু মন মানসিকতা ভালো থাকবে।

আরো কয়েক সপ্তাহ পর সোনালী তার স্বামী কে খাবারের টেবিলে বসিয়ে বলে :- এবার পূজায় কিন্তু বাপের বাড়িতে গিয়ে আনন্দ করবো। বাপের বাড়ির লোকজন কে নতুন কাপড় দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। আমি নিজের হাতে কেনাকাটা করবো। 

ভবানন্দ খাওয়া দাওয়া করতে করতে বলে :- ঠিক আছে। তোমার যেমন ইচ্ছা করবে।

দুর্গাপূজার মহালয়ার রাতে ভবানন্দ ঘরে ঢুকে শয়নরত সোনালীর কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে :- তোমার শরীর ঠিক আছে তো।

সোনালী ঘুরিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে তার স্বামীর হাত তার বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলে :- নবমীর দিন কিন্তু এলাকায় তোমার সাথে করে প্রতিমা দর্শন করতে যাবে। আর দশমির দিন মন্দিরে গিয়ে মনের মতো করে সিঁদুর খেলা করবো।

ভবানন্দ তার স্ত্রীর পাশে বসে ভাবে :- আর দশটা দিন ভালোভাবে কেটে গেল সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে।  

সোনালী মনে ভাবে :- মা দুর্গার বিসর্জনের সাথে সাথে ঐদিন আমি এই সংসার কে বিসর্জন দেবো।

ভবানন্দ চুপচাপ থেকে দুষ্টুমির ছলে সোনালীর বুকের উপর শুয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলে :- এবার পূজার দিন গুলো ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে কিন্তু আমার মিষ্টি বউয়ের আঁচল ধরে মুক্ত পাখির মতো ঘুরে বেড়াবো। তোমাকে কথা দিলাম তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করবো। 

সোনালী তার দুই হাত দিয়ে স্বামীর পিঠ চেপে ধরে বলে :- তোমাকে খুশি করার অবশ্যই চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

ভবানন্দ বলে :- আচ্ছা পূজার মধ্যে তো বাপের বাড়িতে যাওয়ার আয়োজন কিন্তু কেনাকাটা করেছো।

সোনালী বলে :- না। ভাবছি আমাদের দোকান থেকে কাপড় চোপড় নিয়ে নেবে।

ভবানন্দ বলে :- আজ নতুন নতুন বিভিন্ন ধরনের কাপড় এসেছে। যা দরকার সকালে গিয়ে নিয়ে আসবে। আর টাকা যা দরকার আলমারি থেকে নিয়ে নাও। কোন দিন তোমার কাছে টাকার হিসাব চেয়েছি, না তোমার কোন কাজে বাধা সৃষ্টি করেছি। 

সোনালী বিছানায় উঠে বসে বলে :- ঠিক আছে।

ভবানন্দ বলে :- চলে এক সাথে খাওয়া দাওয়া করে নেয়। 

সোনালী বলে :- রান্না করা হয়নি।

ভবানন্দের মনে মনে রাগ করে কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলে :- চলে, আজ ডিম ভাত রান্না করে তোমাকে খাওয়াবো। 

সোনালীর ইচ্ছা না থাকলেও কিন্তু স্বামীর পীড়াপীড়ি করার কারণে বাধ্য হয়ে স্বামীর সাথে রান্না ঘরে ঢুকে রান্নার আয়োজন করতে থাকে।

----------------------------------------------------------
              ।। বিংশ (২০) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
চারিদিকে দূর্গাপুজো পুজো রবে মুখরিত হয়ে কিন্তু ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ,আসাম, ত্রিপুরা সহ বিভিন্ন প্রদেশে আবার ভারতীয় উপমহাদেশ এবং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে।

শরতের আকাশে সোনালীর মনের গভীরে কালো মেঘের ঘনঘটা চলছে। যেকোনো মুহূর্তে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আবার মাঝে মাঝেই উজ্জ্বল রৌদ্রের ঝিলিক দেখা দেয়। 

সোনালী কখনো হাসে আবার কখনো গভীর হয়ে শুধু ভাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে শুধু মনের সাথে লড়াই করে চলেছে কিন্তু মায়াময় সংসারে বাস্তব কঠিন চিত্র বারবার তাকে অতীতের স্মৃতিগুলোকে
মনে করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতের জন্য বিভিন্ন জল্পনা কল্পনা করতে থাকে।

দুর্গাপূজার আয়োজন শেষ করে বিভিন্ন মন্দিরে মন্দিরে আজ মহাসপ্তমী পূজার ঢাক ঢোল কাশি বাজিয়ে কিন্তু মাইকের মাধ্যমে আওয়াজ করে চলেছে।

প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মাইকের শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে চন্ডী পাঠের মন্ত্র ধ্বনি শুনে কিন্তু সোনালী বুকে কাঁটার মতো বিঁধে চলছে আর মনের গভীরে ডুব দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পাচ্ছে না। পঞ্চ আত্মা কিন্তু পাঁচ দিক থেকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করে চলেছে। 

স্বামী ভবানন্দ কে সাথে করে সোনালী রাজরানী বেশে বাবার বাড়ি আসে। নিজস্ব গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে নিয়ে পরিবারের সকল সদস্যদের কাছে ডেকে নেয়। সোনালী এই বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রণাম করে নতুন কাপড় বিতরণ করতে থাকে। তারপর বাচ্চাদের কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে নতুন কাপড় দিতে থাকে।

বোন জবা দুরে দাড়িয়ে তার জামাই বাবুর সাথে চোখে চোখ রেখে ইশারায় কথাবার্তা চলতে থাকে। দিদির হাসি খুশি মুখ দেখে কিন্তু কাছে আসতে অপরাধীদের মতো ভয় পাচ্ছে।

সোনালী তার আদরের আট বছরের ছোট বোন জবা কে কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে করতে একটি কাপড়ের ব্যাগ হাতে দিয়ে বলে :- সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর শাড়ি সহ সব কিছু আছে। প্রতিদিন একটি করে নতুন শাড়ি পড়ে কিন্তু ঠাকুর দেখতে যাবে।

সোনালী ছোট বড় সবার সাথে প্রাণ খুলে হাসি ঠাট্টা আনন্দ করে চলেছে।

সোনালীর বৌদি সোনালীর কাছে এসে আদর করে বলে :- ঠাকুরঝি, তোমার মনে খুব আনন্দ দেখে আমারও ভীষণভাবে আনন্দিত হয়েছি। তা বাচ্চার মতো লাফালাফি করা বন্ধ করে। 

সোনালীর মা তার বৌমার দিকে তাকিয়ে বলে :- কতদিন পর মেয়েটির মুখে হাসি দেখতে পেলাম। সোনালীর মনে যা ইচ্ছা করুক বাধা দিয়েও না।

সোনালী তার বোন জবা কে ডেকে বলে :- সপ্তমী ও অষ্টমী পূজার দিনগুলো কিন্তু তোর জামাই বাবুর সাথে ঘুরে ঘুরে আনন্দ করবি।

জবা ভয়ে ভয়ে বলে :- দিদি , আমি তোমার সাথে ঘুরবো।

সোনালী ধমক দিয়ে বলে :- যা বলছি তা করবে।

সোনালী তার বাবার বাড়ির পরিবারের সদস্যদের সাথে আনন্দ করে মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা দর্শন করতে থাকে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরতে ঘুরতে সবাইকে খাওয়া-দাওয়া করায়। মেলায় নাগরদোলায় চড়া থেকে কেনাকাটা কোন কিছু বাদ দেয় না। 

যে জিনিসটা চোখে ভালো লাগে তা কিনে একজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে :- এই জিনিসটা তোমার বা আপনার।

ঘুরতে ঘুরতে সোনালী তার পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে বলে :- যার যেমন ইচ্ছা বলতে পারে আজ সবার ইচ্ছা পূরণ করবে।

নবমীর দিন সকালে সোনালী তার বোন জবার হাত ধরে টানতে টানতে তার কয়েক দিনের বসবাস রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

বিছানার উপর রাখা দামি উন্নত মানের সুটকেস দেখিয়ে সোনালী বলে :- বোন; এর মধ্যে তোর বিয়ের শাড়ি গয়না আছে। লাল বেনারসি শাড়ি ও গয়না গুলো পড়ে নব বধূর সাজে শ্বশুড় বাড়িতে যাবে। তোর জামাই বাবু নাকি তোর বিয়ে ঠিক করেছে। 

আমার বিয়েতে বাবা-মা গয়না দিতে পারিনি বলে শ্বশুর বাড়ির লোকের কাছে অপমানিত হতে হয়েছিল।

জবা তার দিদিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে :- দিদি আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিস।

সোনালী তার বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে :- হয়তো তোর বিয়েতে আমার আশা সম্ভব হবে না। আমার আশীর্বাদ সব সময় তোর মাথার উপর থাকবে। আর আমি তো স্বামীকে ভালোবাসা দিতে পারলাম না কিন্তু তুই তোর স্বামীকে ভালোবাসা থেকে কখনোই বঞ্চিত করিস না।

সোনালী দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে বাবার বাড়ির সকলের নিকট থেকে একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে বিদায় নিয়ে দ্রুত বেগে গাড়ির কাছে এসে তাড়াহুড়ো করে গাড়ির মধ্যে উঠে বসে।

বোন জবা তার দিদির পিছনে পিছনে আসতে আসতে বলে :- দিদি দিদি আমার কথা গুলো শুনে যা। 

জবা গাড়ির জানালার কাছে আসতেই সোনালী তার স্বামী কে জোরে ধমক দিয়ে বলে :- আর মায়া না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও।

ভবানন্দ সবার সামনে ধমক শুনে কিন্তু সোনালীর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে গাড়ি চালাতে শুরু করে।

----------------------------------------------------------
          ।। একবিংশ (২১) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
আজ মা দুর্গার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিজয় দশমী পালন করা হবে। সারা বছর মায়ের আগমনের আশায় আশায় পথ চেয়ে থেকে মাত্র পাঁচ দিনের আনন্দ উল্লাস শুরু হয়। নতুন নতুন কাপড় পড়ে , বিভিন্ন রকম খাবার খেয়ে ও আপনজন কে কাছে পাওয়ার আনন্দ উৎসবে মুখরিত।

আনন্দের মাঝে মায়ের বিদায়ের কারণে মানুষের মনে সকাল থেকে করুণ সুর বেজে উঠে। বিশেষ করে পূজার দায়িত্বশীল আয়োজকরা নিজের হাতে দৌড়াদৌড়ি করে চাঁদা তোলা থেকে মায়ের বিসর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজকর্ম করতে হয়। তাদের হৃদয়ে হাহাকার করে উঠে তবুও চোখের জলে মাকে বিদায় জানাতে হয়। একটি সান্তনা আসছে বছর আবার হবে।

সোনালী ভোর বেলায় উঠে স্নান করে স্বামীর জন্য জল খাবার তৈরি করে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।

তারপর একটা নক্সা যুক্ত সুন্দর থালা পছন্দ করে তার উপর সিঁদুরের কৌটা ,ধান, দুর্বা ঘাস, মিষ্টি ও জলের গ্লাস সহ কয়েক লিটার জল নিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তের দূর্গা মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হয়।

মা দুর্গার কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দান করে ভাবে আমার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যেন এই সিঁদুর পড়ে থাকতে পারি। মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে ভাবে সবার মধ্যে মিষ্টতা ভাব তৈরি হোক।

মন্ডপে উপস্থিত নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধাদের সবাই মিষ্টি মুখ করাতে থাকে। সধবা রমণীগণের সাথে মনের আনন্দ উল্লাসে আত্নহারা হয়ে সিঁদুর খেলা খেলতে থাকে। রমনীগণ সোনালী দেহে সিঁদুর দিয়ে রাঙিয়ে দেয়।

কয়েকটি মন্ডপে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সিন্দুর খেলা করার পর বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাড়ির উঠানে স্বামী ভবানন্দ কে দেখে কাছে ডেকে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম করে।

ভবানন্দ তার স্ত্রীকে তুলে দাঁড় করিয়ে বলে :- আজ মনে হচ্ছে তোমার মনে ভীষণ আনন্দিত।

সোনালী তার রাঙা হাত বাড়িয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে তার মুখে সিঁদুর রঙে রাঙিয়ে দেয়। আর ভবানন্দের আনন্দ উল্লাসের মুখ হঠাৎ করে কালো মেঘের মতো হয়ে যায়।

সোনালী বলে :- বিজয় দশমীর দিন মায়ের বিসর্জনের পরে সবাই আর একটা অনুষ্ঠানে মেতে উঠতো। পিতা-মাতা সহ বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রণাম করার প্রবণতা দিন দিন কমে এসেছে।

ভবানন্দের মনে রাগ হয় কিন্তু নিজেকে সংযত করে জোর করে মুখে হাসি নিয়ে এসে বলে :- 
ছোট্ট বেলায় ও কিশোর কালের সময় গ্রামের বাড়িতে বিজয় দশমীর দিন বয়স্কদের প্রণাম করার ধুম পড়ে যেত। আর বয়স্ক ব্যক্তিরা সবাইকে মিষ্টিমুখ করা তো। বাংলার তৈরি জিলাপি ও মিষ্টি আর লুচি খেতে খেতে শেষে বিরক্ত ধরে যেত।

সোনালী বলে :- জানো গো সেই দিনগুলো শহরের আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বিজয় দশমী মানেই মদ মাংস খেয়ে আনন্দ ফুর্তি করা। আর গভীর রাতে বাড়িতে এসে বউদের উপর দৈহিক মিলনের নামে শারীরিক ভাবে অত্যাচার করার নীতি তৈরি হয়েছে।

ভবানন্দ হাসতে হাসতে বলে :- সখি তুমি অনেক কিছুই ভাবছো কিন্তু বর্তমানে এই নীতিগুলো সমাজে বিশেষভাবে প্রচারিত হয়ে উঠেছে। এক জায়গায় যাচ্ছিলাম কিন্তু জামা কাপড় রাঙিয়ে দিলে। যাই বলো, আজ কিন্তু তোমাকে দারুন লাগছে বলে তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে।

সোনালী আনন্দে হাসতে হাসতে বলে :- লোকে জিজ্ঞেস করলে বলে আমার পাগল বউ কিন্তু পাগলামি করে সারা দেহ রাঙিয়ে দিয়েছে।

ভবানন্দ তার স্কিন টাচ মোবাইল বের করে সোনালীকে পাশে নিয়ে কয়েকটি সেলফি তোলে।

ভবানন্দ ঘরে ঢুকে পোশাক পরিবর্তন করে বেরিয়ে পড়ে। সোনালী আবার স্নান করে স্বামীর জন্য মাছ ও মাংস সহ বিভিন্ন পদে পদে রান্না করতে থাকে।

বিজয় দশমী মানেই বাঙালির বাড়ির কর্তার সকাল সকাল মাংসের দোকানে লাইন দিয়ে মাংস কেনা। মাছ বাজার থেকে বড় মাছের অংশ প্রতিযোগিতা করে নিয়ে আসা সহ আরো কত না শাকসবজি কেনাকাটার ধুম। 

তারপর রান্না ঘরের গিন্নীদের চরম ব্যবস্থা। দুপুরে যৌথ পরিবারের বাড়ির বউ গুলো বাদে পরিবারের অন্য সদস্যরা একসাথে বসে রসিয়ে রসিয়ে প্রতিটি পদের আস্বাদন নেওয়া চলতে থাকে। বাঙালি মানেই খাওয়া দাওয়া একটা প্রতিযোগিতা চলতেই থাকে।

সবার শেষে বউ গুলো একত্রে বসে অবশিষ্ট খাবার গুলো একে একে আস্বাদন করতে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের কপালে রান্না করা সব পথ গুলো জোটে না। হয়তো মাছ-মাংসের বদলে ঝোল দিয়ে ভাত খেতে হয়। 

দুই চার জনের একক পরিবারে এই সমস্যাগুলো কম হয়ে থাকে।

সোনালী তার স্বামী কে ঠিক সময় মতো কাছে পেয়ে আদর করে পাশে বসিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের হাতে খাওয়াতে থাকে। 

ভবানন্দ কখনো সোনালীর মুখে খাবার তুলে দেয় আবার কখনো সোনালী তার স্বামীর মুখে। আনন্দ উল্লাসে মেতে বিভিন্ন রকম আড্ডা করতে করতে দুজনের খাওয়া দাওয়া শেষ করে।

সোনালী তার স্বামীকে ঘরে নিয়ে গিয়ে খাটের উপর শয়ন করিয়ে দিয়ে পদসেবা করতে থাকে।

পড়ন্ত বিকেল বেলা ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ী করে পোশাক পরিচ্ছদ পড়ে নিজেকে ঠিকঠাক তৈরি করে নিয়ে ভবানন্দ বলে :- সোনালী; আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে হয়তো রাতে ফিরতে দেরি হতে পারে। তুমি রাতে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ো। আমি খাওয়া দাওয়া করে আসবো আজ বিজয় দশমী বন্ধুদের সাথে এক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে যাচ্ছি। 

সোনালী তার স্বামী কে জড়িয়ে ধরে বলে :- আজ না গেলে হতো না। আমার মনটা কেন যে আজ ভীষণভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে।

ভবানন্দ ঘর থেকে বেরোতে যাবে এমন সময়ে হাত চেপে ধরে আদর করে সোনালী বলে :- বেশি মদ পান করবে না কিন্তু আর তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করো। রাতে বাড়িতে আসার পর একটি নতুন সংবাদ তোমাকে দেবো। 

অবিশ্বাস্য কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে, তা শোনার পর আমাকে নিয়ে আনন্দে নাচতে শুরু করবে। অট্টহাসিতে ঘর মুখরিত করে তোলে এবং চার দেওয়ালের মধ্যে প্রতিধ্বনি' হতে থাকে।

সোনালী কে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ভবানন্দ বলে :- বিজয় দশমীর দিনে আনন্দ-ফুর্তি করতে যাচ্ছি কিন্তু তুমি চিন্তা বাড়িয়ে দিলে। বলোনা তোমার জীবনে সেই আশ্চর্যজনক ঘটনা কি ঘটেছে? 

সোনালী বলে :- এখন বলবো না, তাহলে রাতের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। তুমি রাতে তাড়াতাড়ি আসবে আর চরম আনন্দের মাঝে আনন্দ করতে করতে আনন্দের সংবাদ দেবে গো।

ভবানন্দের ডান হাতের পাঞ্জা ধরে বাড়ির চাবির রিং হাতে দিয়ে সোনালী বলে :- তোমার নিকটে সাবধানে রেখে দাও কারণ রাতে তুমি যখন বাড়ি ফিরবে হয়তো আমি তখন অঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ি। 

ভবানন্দ বলে :- বহু বছর ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করে রাত জেগে থাকে কিন্তু আজ পরিবর্তন কেন?

সোনালী বলে :- স্বামী দেবতার পদধ্বনি হয়তো তখন আর শুনতে পাবো না কিন্তু তোমাকে সারারাত ঘরের বাইরে থাকতে হবে। কোটিপতি ব্যবসায়ী মদের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়ে কিন্তু সারারাত ধরে মশাই কামড় খেতে হবে। যদি ম্যালেরিয়া ডেঙ্গু জ্বর এসে যায় তখন সব ঝামেলা ও ভোগান্তি আমাকে ভোগ করতে হবে। 

এই চাবি তোমার কাছে থাকা মানেই আমাদের দুজনেরই সুরক্ষা কবচ । তোমার যখন ইচ্ছা তখন এসে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে জাগিয়ে তুলবে।

ভবানন্দ বলে :- আগে বহুবার তো বাইরে গিয়েছি কিন্তু তুমি আমার জন্য সারারাত অপেক্ষা করে থাকতে। 

সোনালী হাসতে হাসতে বলে :- বত্রিশ বছর বয়স চলছে কিন্তু লোকে বলে নারী কুড়িতেই নাকি বুড়ি। বিয়ের পর ১৪ বছর ধরে এই শরীর নামক যন্ত্রের উপর অমানবিক কত না অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। অত্যাচারের কারণে ষাট বছরের বুড়ি হয়ে গেছি গো। শরীরটা আগের মতো আর পারে না গো। 

ভবানন্দ বলে :- কে বলেছে তুমি বুড়ি হয়ে গেছো? আসলে তোমার মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে গেছে।

সোনালী গলায় বস্ত্র দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে স্বামীকে প্রণাম করে।

ভবানন্দ বলে :- একি হচ্ছে প্রণাম করছো ?

সোনালী দাঁড়িয়ে বলে :- ও মা তুমি ভুলে গিয়েছো! প্রতিবছর বিজয় দশমীর দিনে বাড়ির বয়স্ক গুরুজনদের প্রণাম করার রীতি বাঙালি হিন্দু সমাজে আবহমানকাল ধরে চলে আসছে।

তুমি তো আমার স্বামী দেবতা তা আজ বিজয় দশমীর দিনে স্বামী দেবতাকে প্রণাম করবো না তা কি করে হয়! গভীর রাতে নেশাগ্রস্থ হয়ে যখন আসবে ফিরে তখন কি আর তোমার হুশ থাকবে! আমি তোমার বিবাহিত বউ। মোদের নেশায় তখন একমাত্র জবার কথাই মনে পড়বে তোমার।

ভবানন্দ আফসোস করে বলে :- সত্যিই তুমি এক আচার্য মহিলা। কখন কি মনে উদয় হয় বুঝা মুশকিল! এর মধ্যে আবার জবাকে টেনে নিয়ে আসছো কেন?

সোনালী তার স্বামীর হাত ধরে হাসি হাসি মুখে বলে :- জবা তোমার পরবর্তীতে তোমার বংশ রক্ষা করার জন্য দ্বিতীয় বউ হবে। তার সব ব্যবস্থা তো তুমি করেই ফেলেছ।

ভবানন্দ মুখ কালো করে বলে :- এসব কথা এখন থাক।

সোনালী বলে :- তোমাকে অনেক দেরী করে দিলাম। চলো চলো তোমার বন্ধুরা হয়তো তোমার জন্য অপেক্ষায় বসে আছে।

সোনালী তার স্বামীকে রঙ্গ-রসের মধ্য দিয়ে গ্যারেজে গাড়ির কাছে নিয়ে এসে গেট খুলে দিয়ে বলে :- বসুন স্বামী দেবতা দূর্গা দূর্গা দূর্গা দূর্গা।

ভবানন্দ বসতে যাবে এমন সময়ে সোনালী আবেগকে ধরে রাখতে না পেরে কিন্তু ভবানন্দ কে জড়িয়ে ধরে কালো মুখ করে চোখ থেকে জল ঝরতে শুরু করে।

ভবানন্দ চমকিত হয়ে সোনালীকে জড়িয়ে ধরে এবং সোনালীর চোখের কয়েক ফোঁটা জল ভবানন্দের হাতের উপর পড়ে।

ভবানন্দ বলে :- আমি বন্ধুদের আড্ডায় যাবো না বলে গাড়ির গেট বন্ধ করে দেয়।

সোনালী ভালোবাসার মানুষ কে ছেড়ে যাওয়ার বিরহ জ্বালা সইতে না পেরে আবার আবেগের বশবর্তী হয়ে স্বামীকে আরো জোরে বুকে চেপে ধরে ভাবছে, স্বামী বাড়ি থেকে না বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে পারব না।

মুখে জোর করে হাসি নিয়ে এসে হাসতে হাসতে সোনালী বলে :- মা দুর্গার বিদায় আনন্দের অশ্রুপাত। আমাদের মাঝে আবার একটি বছর পর মা আসবে। কতনা আনন্দ বেদনা দুঃখ সহ্য করে আবার চলে যাবেন তার বসবাস ভূমি কৈলাসে।

ভবানন্দের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সোনালী এক প্রকার জোর করে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে বলে :- দুর্গা, দুর্গা, দুর্গা, দুর্গা। তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আসবে কিন্তু না এলে ভীষণভাবে রাগ করবো। তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেবো। যাও যাও গাড়ি চালাও।
ভবানন্দ গাড়ি স্টার্ট করে চলতে শুরু করে। 

সোনালী বাড়ির সদর গেট বন্ধ করতে করতে ভাবে হাতে আর বেশি সময় নেই কিন্তু যা করার অতি দ্রুত করতে হবে। আমার আচারণের কারণে হয়তো স্বামী যে কোন মুহূর্তে বাড়িতে চলে আসতে পারে।

সোনালী বাড়ির মধ্যে বিভিন্ন ঘরে ঘরে ঘোরাঘুরি করে তার শাশুড়ি মায়ের ছবিতে প্রণাম করে বলে :- মা গো; তোমার মৃত্যুর সময় দেওয়ার কথা আমি রাখতে পারলাম না কারণ আমাদের মধ্যে অবিশ্বাস ঢুকে গিয়েছে।

এই জন্য তোমার ছেলেকে চিরদিনের জন্য মুক্ত করে দিলাম আর আমি অজানা অচেনা কোন পথে চলে যাচ্ছি। আমি তো আর স্বামীকে সুখ দিতে পারলাম না, হয়তো বোন জবা বধু রূপে এসে স্বামীর মনের অতৃপ্ত বাসনা পূর্ণ করতে পারবে।

শোয়ার ঘরে এসে স্বামীর ছবিকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলে :- আমাকে ক্ষমা করে দিও।

নিজের প্রয়োজনীয় ব্যাগ পত্র গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আবার মায়ার টানে পিছনে ফিরে আসে। মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় মন একবার বলে চলে যা আবার একবার বলে না তোর স্বামীকে দেখাশোনা করবে। জবা যদি তোর স্বামীকে তোর মত ভালবাসা না দেয়।

কিছুক্ষণ আবার ভাবে স্বামী ও সংসারের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার সময় এসে গেছে কিন্তু সকলের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। তা ভেবে মন যেতে চাইছে না নিরুদ্দেশ হতে।

সংসারে থাকলে নানা অশান্তি ঝামেলা থাকবেই। মনের সাথে লড়াই করে সিদ্ধান্তে অটল হয়ে ভাবে আমাকে সংসারের মায়া ত্যাগ করে আমার নির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে হবে।

আমি যদি আজ সংসারের মায়া ত্যাগ না করি তাহলে কিন্তু বোন জবা কোনদিন সংসার করতে পারবে না। তাহলে আমারই মত আরেকটি সুন্দর তাজা ফুল অচিরেই ঝরে পড়বে।

সেই বিখ্যাত গানের লাইন মনে পড়ে।
গীতিকার :- জহর মজুমদার
গায়ক :- মান্না দে

সবাই তো সুখী হতে চায়
তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয়না।
জানিনা বলে যা লোকে সত্যি কিনা?
কপালে সবার নাকি সুখ সয় না।।

আশায় আশায় তবু এই আমি থাকি,
যদি আসে কোনদিন সেই সুখ পাখি ।।
এই চেয়ে থাকা আর প্রাণে সয় না।।

ভালোবেসে সুখী হতে বলো কে না চায়?
রাধা সুখী হয়েছিল সেই শ্যাম রায়।

আমিও রাধার মতো ভালোবেসে যাবো,
হয় কিছু পাবো নয় সবই হারাবো
এই চেয়ে থাকা আর প্রাণে সয় না।।
     --------------------------------------------

আমি চলে গেলে স্বামীর তাতে কি আসে যায়!
কথায় বলে বউ মরে গেলে কয়েকদিন কম্বল মুড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করে। দুই দিন পর আনন্দের করে বিয়ে করবে জবা কে, বউ বানিয়ে সংসার শুরু করবে। আমি সোনালী সকলের হৃদয় থেকে দুদিন পরে হারিয়ে যাবো ।

আর বেশি চিন্তা করে মনকে চঞ্চল করে লাভ নেই। চলরে মন বৃন্দাবন ধাম দর্শন করতে।
ভালোবাসার কারণে শ্রীকৃষ্ণের প্রেমিকা শ্রীমতি রাধিকা কে একশ বছর প্রেমিক শ্রীকৃষ্ণের অদর্শনে প্রেমও জ্বালা ভোগ করতে হয়েছে। আমি তো একজন সাধারণ নারী কতদিন আর বাঁচবো।

শেষবারের মতো বাড়ির দিকে তাকিয়ে চোখের জল আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে থাকে। সকলের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে দুর্গা দুর্গা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেট বন্ধ করে দেয়। রাস্তায় অপেক্ষারত প্রাইভেট গাড়িতে উঠে বসে আর গাড়ি দ্রুত বেগে কলকাতার দিকে চলতে শুরু করে। চলতে চলতে রাস্তার চারপাশে মায়ের বিদায়ের করুণ সুর কানে ভেসে আসে।

সোনালী ভাবে :- দুর্গা মায়ের বিসর্জনের সাথে সাথে আমাকেও কিন্তু এই সংসারের ত্রিতাপ জ্বালা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করানো হয়েছে। মা প্রতি বছর আবার মা দূর্গা ফিরে আসবেন কিন্তু আমি আর কোন দিন স্বামীর সম্মুখে ফিরে আসবে না।

স্বামীর স্মৃতিগুলো বারবার আমাকে পিছু ডেকে চলেছে কিন্তু আমার লক্ষ্য হল সামনে এগিয়ে যাওয়া।

চাকরির নির্দিষ্ট জায়গায় আগে থেকেই উপস্থিত হয়ে থাকার সকল ব্যবস্থা করে এসেছি। এখন শুধু হুগলি জেলার অচিন্ত্য পুর গ্রাম থেকে পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড়ের সন্নিকটে রাজপতি গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে হবে। দেহের গয়না বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এই চাকরি পাওয়া। 

পাহাড়ে ঘেরা একটি ছোট্ট আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। পুরুলিয়া শহর থেকে রাজপতি গ্রাম প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরত্বে।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যময় অযোধ্যা পাহাড় থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভিতরে যেতে হবে। হাওড়া থেকে রাত এগারোটার সময় পুরুলিয়া ট্রেন ধরতে হবে। তারপর পুরুলিয়া থেকে অটো ধরে রাজপতি গ্রাম।

সংসারে টাকা পয়সার কোন অভাব ছিল না। আর স্বামী কোন দিন আমার কাছে টাকা পয়সার হিসাব চাইতো না। কিন্তু মনের শান্তি কোনদিন লাভ করতে পারেনি। সুখের সময়ে বোন জবা স্বামীর জীবনে এসে কিন্তু আমার সব সুখ নষ্ট করে দিয়েছে।

সোনালী তার মোবাইল হাতে নিয়ে বিজয় সরকারের বিজয় গীতি বা বিরহ গীতি গানগুলো শুনতে থাকে।

এই পৃথিবী যেমনি আছে তেমনি ঠিক রবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে
সেই নগদ তলব তাগিদ পত্র নেমে আসবে যবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে ।।

হোক না কেন যত বড় রাজা-জমিদার
পাকা-বাড়ি জুড়ি-গাড়ি- ঘড়ি -ট্রানজিস্টর
তখন থাকবে না আর কোন অধিকার বিষয়-বৈভব ভবে ।।

চন্দ্র-সূর্য গ্রহ-তারা আকাশ-বাতাস জল
যেমন আছে তেমনি সবি রইবে অবিকল
মাত্র আমি আর রইব না কেবল জনপূর্ণ ভবে ।।

শব্দ-স্পর্শ রূপ-রস গন্ধ বন্ধ হলে যেন
এই পৃথিবীর অস্তিত্ব বোধ রইবেনা আর হেন
পাগল বিজয় বলে সেই দিন যেন এসে পরবে
কবে ।।

ভবানন্দ গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবে :- আজ সোনালীর অদ্ভুত আচরণ করার কারণ গুলো খুজে পাচ্ছি না। মায়ের মৃত্যুর পরে কেমন যেন উদাসীন ভাবে চলাফেরা করে। কখনো কিশোর-কিশোরীর মত লাফালাফি ঝাপাঝাপি করে আনন্দ করতে থাকে। 

আবার কখনো নব যৌবনের উন্মাদনায় মেতে ওঠে আমাকে কখনোই তার চোখের আড়াল করতে চাইনি। তার কথার জবাব দিলে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। তার এই খামখেয়ালি মন মানসিকতার জন্য কখনোই তার বিরুদ্ধ আচরণ করিনি। যখন যা করতে বলেছে শত কাজের মধ্যে দিয়ে ঝটপট করে দিয়েছে।

আবার ছাদে উঠে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে বলেছে :- জানো, ওই তারা টা না শাশুড়ি মা, সব সময় হাতছানি দিয়ে আমাকে ডেকে চলেছে। আমি যাব মায়ের কাছে বলে পাগলামি শুরু করে।

আমাকে কখনো ভালোবেসে আদর করে আবার কখনো রেগে গিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ করে রাখে। আমাকে যেমন শাসন করে আবার রাগ ও অভিমান করে। আবার কখনও কখনও পাগলের মত একা একা প্রলাপ বকতে থাকে। 

সোনালী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আমার উদাসীনতার কারণে হয়তো আরো উদাসীনতা বেড়েছে। অনেক আগেই সোনালীকে মানসিক ডাক্তার দেখানোর দরকার ছিল কিন্তু আমার কর্তব্যে অবহেলা হয়তো আজ সোনালীকে চিরজীবনের মতো হারাতে হতে পারে।

কয়েকদিনের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে তার ইঙ্গিত গুলো হয়তো আমি বুঝতে পারিনি। বারবার একই কথা বলে আমিও মায়ের মত একদিন সবাইকে ফাঁকি দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তাহলে আমাকে তাড়াহুড়ো করে বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করিনি তো! সোনালী সোনালী বলে মনের অজান্তেই ডাকতে থাকে।

ভবানন্দ গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুতবেগে বাড়িতে এসে সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করতে করতে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে। সোনালী কে না দেখতে পেয়ে উত্তেজিত হয়ে এ ঘর ও ঘর দোতলার সব ঘর, আসবাবপত্র , রান্নাঘর ও বাথরুম সব জায়গাতেই খোঁজ করতে থাকে।

ভবানন্দ ভাবে হয়তো মন খারাপ করে ছাদে বসে থাকতে পারে, দ্রুত সিড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে পায়ে আঘাত লাগে তবুও ছুটতে ছুটতে সোনালী সোনালী বলে ডাকতে ডাকতে ছাদে উঠে খোঁজ করতে থাকে। এমনকি জলের ট্যাংকি পর্যন্ত পরীক্ষা করে, না কোথাও সোনালী কে পাওয়া যাচ্ছে না।

ভবানন্দ ভাবে হয়তো আমার সাথে মজা করার জন্য খাটের নিচে লুকিয়ে আছে। দ্রুত শোয়ার ঘরে চলে এসে খাটের নিচে ও আলমারির ভিতরে বাহিরে দেখতে থাকে। সোনালী কে কয়েক মুহূর্তের অদর্শনে ভবানন্দ স্নান করে উঠেছে।

অজানা ভয়ে আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে চিন্তায় চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে বার বার সোনালী সোনালী বলে চিৎকার করতে থাকে। সোনালী তুমি আর দুষ্টুমি করে লুকিয়ে থেকো না দেখা দাও।

কোথায় খোঁজাখুঁজি করে সোনালী কে না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে খাটের বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়ে। আর দুই হাত দিয়ে চাদর ধরে টানতে শুরু করে।

ভবানন্দের হাতে কিছু স্পর্শ অনুভব করে তাকিয়ে দেখে তার দেওয়া নীল শাড়ি বিছানার উপর আছে। সোনালী কে এই শাড়িটি পড়ে অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলাম। 

সোনালী বারবার একই কথা বলেছিল বোন জবা এই শাড়ি পড়ে অষ্টমীর অঞ্জলি দেবে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুজনের কেউ ব্যবহার করেনি।

শাড়ি তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আর তার মধ্যে থেকে একটি চিঠি মেঝের উপর পড়ে যায়। ভবানন্দ তাড়াহুড়ো করে চিঠি হাতে তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করে আর দুচোখ দিয়ে অবিরাম ভারী বর্ষণের ধারা নেমে আসে।

চিঠি পড়া শেষ করে আবার তাড়াহুড়ো করে গাড়ি নিয়ে সোনালীর খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ে। বাসস্টান্ড, কয়েক কিলোমিটার দূরে রেলস্টেশন বন্ধুবান্ধব এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক কিছু চিন্তা ভাবনা করে ভাবে হয়তো বাপের বাড়িতে যেতে পারে আবার গাড়ি চালাতে শুরু করে।

ভোরের আলো এখনো ভালো করে আলোকিত হয়ে ওঠেনি ঠিক সেই মুহূর্তে শ্বশুরবাড়ির সোনালীর বড়দা'র রুমের সামনে গিয়ে বড়দা বড়দা বলে ডাকতে থাকে।

ভোরবেলায় ভবানন্দের ডাক শুনে সোনালীর দাদা বৌদি ঘুম ঘুম চোখে বেরিয়ে এসে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বলে :- কি হয়েছে ভাই! কোন অঘটন ঘটেনি তো আর সোনালী কোথায়।

ভবানন্দ করুণ সুরে কাঁদে কাঁদে হয়ে বলে :- বৌদি সোনালী কে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাবলাম এখানে এসেছে।

জামাইয়ের আওয়াজ শুনে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ও বাড়ির সদস্যরা জেগে উঠে বারান্দায় আসে।

জবা ঘুম ঘুম চোখে তার জামাইবাবুর আতঙ্কের কালো ছায়া মুখ দেখে বুকের মাঝে এক অজানা আতঙ্কে আতঙ্কিত কেঁপে ওঠে কান্না জনিত কন্ঠে বলে :- দিদির কি হয়েছে! বেঁচে আছে তো ?

ভবানন্দ মাথা নিচু করে বলে :- কাল রাত সাতটার পর থেকে সোনালী কে বহু জায়গায় খোঁজ করেছি কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

জবা দিদি দিদি বলে জোরে জোর কান্না শুরু করে দেয়। ভোরবেলায় প্রতিবেশীরা কান্নার আওয়াজ পেয়ে বাড়ির উঠানে ভিড় করে। ভবানন্দ ও জবা বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। 

মহিলাদের মধ্যে সোনালী জীবনের ভালো মন্দ চর্চা শুরু হয় । প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, সোনালীর শুভাকাঙ্ক্ষী মায়েরা,বোনেরা ও পাড়ার বউয়েরা সোনালীর অকাল মৃত্যু ধরে নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। 

সোনালির মা মেয়ের শোকে সকালবেলা জ্ঞান হারিয়ে উঠানে পড়ে যায়। সোনালীর বৌদি তাড়াতাড়ি এসে শাশুড়ি মায়ের সেবা সুস্থতা শুরু করে। নাতি-নাতনিরা ঠাকুরমা ঠাকুরমা বলে কান্নার রোল ওঠে।

সোনালীর বাবা চিৎকার করে ওঠে কান্না করতে করতে নিজের বুকে নিজে চাপড়াতে চাপড়াতে বলে :- এই জন্যই লোকে বলে" যম জামাই ভাগ্নে তিন কোন দিন কেউ আপন হয় না কিন্তু সুযোগ পেলেই ক্ষতি করবে।"  

আমার দুটো মেয়ের জীবন সর্বনাশ করেও, তোমার শান্তি হয়নি। আমার মেয়ে সোনালী কে তুমি কোথায় রেখেছো! ফিরিয়ে দাও আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও। সোনালী মা তুই কোথায়।

উত্তেজিত হয়ে সোনালীর দাদা বলে :- আমার বোনকে তাহলে তুই খুন করেছিস! তোদের বংশ তো খুন খারাবির বংশ। সম্পত্তির জন্য যে ছেলে তার বাবা কে খুন করতে পারে সেই বংশের ছেলে হয়ে বউকে খুন করা তোর কাছে কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। আমি তোকে ছাড়বো না শয়তান বদমাইশ ----------।

ভবানন্দ কে জাপটে জড়িয়ে ধরে উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমার বোনকে কিভাবে খুন করেছিস। সোনালীর লাশ কোথায় তোকে জেল খাটিয়ে ছাড়বো।

ভবানন্দ বলে :- দাদা; আমি সোনালী কে খুন করেনি। 

কান্না করতে করতে জবা বলে :- মরে যাওয়ার জন্যই কি দিদি! তুই আমার বিয়ের বেনারসি শাড়ি ও তোর সব গয়না দিয়ে গেলি। দিদি তুই যখন পৃথিবীতে থাকবো না তখন আমি এগুলো দিয়ে কি করবো! দিদি তোর কাছে আমি ভীষণভাবে অন্যায় করেছি কিন্তু নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়ে গেলি।

সোনালীর শ্বশুরবাড়ির লড়াইয়ের বীরত্বের কাহিনী এখন লোকমুখে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর দলে দলে লোকজন বাড়ির উঠানে জমা হয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলতে থাকে।

সোনালীর বৌদি রাগে উত্তেজিত হয়ে হুঙ্কার দিয়ে জবার কাছে এসে বলে :- পোড়ামুখী ভালোবাসার আর লোক পেলে না। দিদির কষ্ট জনিত সাজানো সংসার কে ছারখার করে দিয়ে তার জীবন নিয়ে খেলা করেছিস। তোর কারণে সোনালী আত্মহত্যা করেছে। 

আমার আর কোন দিন যৌবন ছিলনা, মনে হচ্ছে তোর একারই যৌবন জোয়ার এসেছে। তার জন্যই দিদির সর্বনাশ করে জামাইবাবুর সাথে অবৈধ প্রেমে লিপ্ত হয়ে সবার সর্বনাশ করেছিস।

সোনালীর দাদা উত্তেজিত হয়ে দা বের করে ভবানন্দ কে মারার জন্য তাড়া করে বলে :- যেখানে আমার বোন নেই আর সেখানে তোর মত অপদার্থ মানুষকে পৃথিবীতে রাখবে না।

ভবানন্দ বাড়ির উঠান থেকে লাফ দিয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বলে :- সোনালী আত্মহত্যা করেনি কিন্তু অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। একটি চিঠির মাধ্যমে লিখে রেখে গিয়েছে।

প্রতিবেশীগণ সোনালী দাদার পথ অবরোধ করে তার হাত থেকে দা কেড়ে নিয়ে ধরে রাখে সান্তনা দিতে থাকে।

ভবানন্দ আবার দ্রুত বেগে ছুটে এসে সোনালীর হাতের লেখা চিঠি খানা শ্বশুরমশাইয়ের হাতে দিয়ে কান্না শুরু করে দেয়।

ভবানন্দ বলে :- সোনালী তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার বোনের সাথে বংশ রক্ষার আশায় ভালোবাসা করে জীবনে চরম ভুল করেছি কিন্তু সবাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই আমাকে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিলো কিন্তু শেষে তুমি আমাকে ভুল বুঝে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।

উপস্থিত মানুষেরা উচ্চস্বরে বলে :- সোনালীর চিঠি পড়ে শোনাও দেখি সোনালী কি লিখে গিয়েছে?

সোনালীর বাবা-মা আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। আমার সোনালী বেঁচে আছে তো, না ভবানন্দ মিথ্যা বলছো। মেয়েটা অনেক দিন ধরেই ভীষণ কষ্ট ভোগ করছিল। এবার দুর্গা পুজো এসে প্রাণ খুলে আনন্দ করে গেল। ভেবে ছিলাম সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে কিন্তু এরকম চরম দুর্ঘটনা ঘটাবে তা কে জানত।

সোনালীর দাদা শান্ত হয়ে বলে :- জবা, বাবার কাছে থেকে চিঠিটা নিয়ে সবার সামনে পর তো দেখি, সোনালী কি লিখে রেখে গিয়েছে ?

জবা দিদির হাতের লেখা দেখেই বুঝতে পারে দিদির লেখা চিঠি। চিঠি খুলে মনে মনে পড়তে পড়তে কান্নাকাটি করতে থাকে।





----------------------------------------------------------
           ।। দ্বাবিংশ (২২) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
মান্যবর শ্রীচরনেষু স্বামী ভবানন্দ।

আমার বিজয় দশমীর প্রণাম গ্রহণ করে। আমার মা-বাবা ও দাদা-বৌদিকে আমার প্রণাম পৌঁছে দেবে। বোন জবা কে আমার আন্তরিক ভালোবাসা রইলো। ছোটদের প্রতি আশীর্বাদ রইল।

আমাকে ক্ষমা করে দিও, চিরকালের জন্য তোমাকে মুক্তি দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলাম। এই চিঠি তুমি যখন দেখবে তখন হয়তো আমি তোমার কাছে থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যাব। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা কলকাতা দমদম অবস্থিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইএটিএ: সি.সি.ইউ, আইসিএও: ভি.ই.সি.সি) উপস্থিত হয়ে বিমান ধরে অজানার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।

তুমি কিন্তু ভয় পেয়ো না আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি না। তোমার পরকীয়া প্রেমের পথের কাঁটা হয়ে ছিলাম। কাঁটা কে উপড়ে ফেলতে সংসারের ভালোবাসার পাশাপাশি অনেক অত্যাচার করেছ।

হয়তো স্বামী কে নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে কিন্তু তোমার উপর বহুবার অন্যায় অত্যাচার জুলুম করেছি। টাকা ও ধন সম্পত্তির ভাগ অন্য কে দেওয়া যায় কিন্তু স্বামীর ভাগ স্বেচ্ছায় কেউ দিতে চায় না। আমি মন থেকে বোন জবা কে মেনে নিতে পারিনি।

কোন কিছু বিচার না করে বিনা দোষে আমার চরিত্র কে কলঙ্কিত করেছে। তোমার বংশ রক্ষা করার জন্য আমি কম চেষ্টা করিনি।

একজন স্ত্রী তার স্বামীকে বংশ রক্ষার জন্য একটি সন্তান দিতে পারেনি ঠিক, তার জন্য সংসারের সকল ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে নতুন নারীর হাত ধরা কখনো উচিত নয়। স্বার্থপর ভালোবাসার কোন মূল্য নেই কিন্তু আমি তোমাকে সত্যিকারের ভালোবাসি। তুমিতো আমার সাথে শুধু ভালোবাসার অভিনয় করে চলেছিল। প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসো, বোন জবা কে।

যতদিন বাঁচবো দূর থেকে ভালোবেসে যাবো। শাশুড়ি মা মারা যাওয়ার দিন আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে, চরিত্রহীন বদমাইশ ইত্যাদি বলে চরিত্রের দোষ দিয়ে আমাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করেছিল কিন্তু তবুও তোমাকে কিছু বলিনি। মাতৃ শোকে সব দুঃখ যন্ত্রণা কে ভুলে গিয়েছিলাম।

শাশুড়ি মায়ের মৃত্যুর কারণে আমার শনিদেবের সাধনায় বিঘ্ন ঘটেছিল। সেদিন যে প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি আজ তোমাকে বলছি।

তোমার বংশ রক্ষা করার জন্য শনিদেবের সাধনা শুরু করেছিলাম। প্রতি শনিবার রাতে শনি মন্দিরে বসে শনিদেবের মন্ত্র জপ করতাম আর সকাল হলে অনিদ্রা জনিত শরীরে ঘুম ঘুম চোখে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে আসতাম। আজ শাশুড়ি মা বেঁচে থাকলে অবশ্যই শনিদেবের সাধনার বিষয়ের সত্যতা যাচাই করে নিতে অবশ্যই পারতে। 

আর তুমি আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে লোকের কথা শুনে অনেক অত্যাচার করেছে। এটাই হয়তো নারীদের দুর্বলতার কারণ। নারীরা অর্থনৈতিক স্বনির্ভর নয় তার জন্য স্বামী নামক পুরুষদের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। আবার তাদের কথা মতো চলতে হয়।

শনিদেবের সাধনা অসম্পূর্ণ থাকলেও কিন্তু তার কৃপায় তোমার সাথে পাগলের অভিনয় করে জোরপূর্বক দুই মাস একুশ দিন স্বামী স্ত্রী হিসাবে দৈহিক মিলনে মিলিত হয়েছিলাম।

উক্ত মিলনের ফলে আমি দুই মাসের সন্তান কে গর্ভধারণ করে তোমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। কারণ আমার চরিত্রের উপর যখন দোষারোপ করতে দ্বিধাবোধ করেনি কিন্তু সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের উপর কলঙ্কের দাগ লাগবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়! 

সন্তান কে তোমার পিতৃত্বের পরিচয় বহন করেই সন্তানের লালন পালন করে তার মায়ের আদর্শে বড় হতে থাকবে। আমি তোমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসি কিন্তু তোমার আচার ব্যবহার ও নীতি ভ্রষ্টা কারণে ঘেন্না করি।

কলঙ্কের ভয়ে আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে তোমার কাছে থেকে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হলাম। তোমার আর জবার সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ের উপর চিন্তা ভাবনা করতে করতে মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলাম না।

বোন জবা কে ভয় দেখিয়ে ও আতঙ্কিত করে রাখার জন্যই কিন্তু পাগলের অভিনয় করেছিল।
তবুও কিন্তু দুজনের মধ্যে থাকা গভীর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। 

মন নামক কাচের ঘর যদি একবার ভেঙে যায় তাহলে হাজার চেষ্টা করলেও কিন্তু আর জোড়া লাগানো সম্ভব হয় না।

বংশরক্ষার নাম করে বোন জবার সাথে যৌবনের দৈহিক চাহিদা মিটিয়েছে। ভালোবাসার অভিনয় করে তার মান সম্মান ইজ্জত নিয়ে খেলা করে চলেছে কিন্তু তার ন্যায্য পাওনা কোনদিন দাওনি।

বোন জবার অধিকার আদায়ের জন্য কিন্তু তোমাকে ত্যাগ করলাম। তোমাকে যদি ত্যাগ না করি তাহলে কোনদিন বোন জবার বিয়ে হবে না। কারণ বুঝতে পেরেছি তুমি জবার প্রেমে নেশাগ্রস্থ হয়ে গিয়েছে। 

আর আমার ভালোবাসা মলিন হয়ে ধুলোর সাথে মিশে গিয়েছে। তবুও তোমার মঙ্গল কামনা করে শাঁখা-সিঁদুর পরে থাকি আর যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন সাথে রাখবো।

তোমাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি। তুমি বোন জবা কে বিয়ে করে সামাজিক ভাবে তার মর্যাদা দান করবে। তার গর্ভের সন্তানকে স্বীকৃতি দিয়ে সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে।

এই চিঠি আমার বাবা মাকে দেখিয়ে বলবে, তার বড় মেয়ে সোনালী তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে জবার সাথে করার অনুমতি দিয়েছে।

আমি কোনদিন তোমার মুখোমুখি হব না। আমার গর্ভের সন্তান কিন্তু অবাঞ্ছিত নয় তোমার ঔরসে আগত সন্তানের জন্ম লাভ হয়েছে। 

আমার গর্ভে সন্তান আসুক আর না আসুক আমি কিন্তু একটা সুন্দর সংসার করতে চেয়েছিলাম। তুমি কাঁচের মত মন কে বারবার আঘাত করে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তবুও বারবার কাঁচের টুকরো গুলো একত্রে করে জোড়া লাগানোর বহু চেষ্টা করেছিলাম। 

মানুষের মনে যখন সন্দেহ ঢুকে পড়ে তখন দেহমনকে বিষাক্ত করে তোলে আর ঘুন পোকার মত ধীরে ধীরে সবকিছু ধুলোয় পরিণত করো। 

আমি যখন পাগলের অভিনয় করতাম, তুমি তখন আমাকে সমাজের বুকে পাগল প্রমাণ করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে ছিল। জবাকে আরো কাছে পাওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসো। তখন কিন্তু আমার পাগলামি টা আরো বেড়ে যায়।

আমাকে অকারণে খোঁজাখুঁজি করে কোন লাভ হবে না কারণ আমি তোমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর ব্যক্তিগত পরিচয় এর কোন মূল্য নাই। তাই যতদিন বাঁচবো তোমার দেওয়া শাঁখা-সিঁদুর পড়ে সন্তানের পিতার পরিচয়ে বেঁচে থাকবো।

তোমার কোন টাকা ও ধন সম্পত্তি আমি সাথে করে নিয়ে আসি বরং তোমার দেওয়া সোনার গয়না গুলো জবার হাতে দিয়ে এসেছি। তোমার সংসারের প্রতি এতই বিরক্ত হয়েছি, যে দুটি কাপড় ও ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর কয়েক হাজার টাকা সঞ্চয় ছিল তা নিয়ে নির্দেশ হয়ে পড়েছি।

তোমার সাজানো সংসার সাজানো আছে কিন্তু একমাত্র সোনালী বাদে, এবার শূন্যস্থান পূরণ কর জবাকে বিয়ে করে।

আমার গর্ভের আগত সন্তানের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। কারণ ভারতবর্ষের কোন এক প্রদেশের মধ্যে একটি সম্মানজনক সরকারি চাকরি জোগাড় করে নিয়েছি। যোগদান করার পর প্রতি মাসে ১৮,০০০ টাকা বেতন হবে। সন্তান লালন পালন করার জন্য যথেষ্ট মনে করি।
  
আমার হৃদয়ের মাঝে শাশুড়ি মায়ের মুখখানা বারবার ভেসে উঠে। আমি তো আমার পিতা-মাতা দাদা বৌদি আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবাইকে হারিয়ে ফেললাম। তুমি তো হারিয়ে আবার সবকিছু ফিরে পেলে।

ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক, তোমার শরীরের প্রতি নজর রেখো ভালো থেকো সবাইকে ভালো রেখো।

মনে রেখো সন্তান ঈশ্বরের দান জোর করে পাওয়া যায় না। সময়ের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে 
হয় । সময়ই বলে দেবে কি করতে হবে। 

তোমার জীবনের পিছনের দিকের ইতিহাস গুলো একবার সময় করে খুঁজে দেখো। হয়তো তোমার কাছে সোনালী গুরুত্বপূর্ণ কোন অবদান নেই, তার একমাত্র কারণ সন্তান ধারণ করতে না পাড়া। তাহলে সংসার চক্রের মানুষের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক স্বার্থের ভালোবাসা।

                          ইতি 
            স্বামীহারা অভাগী সোনালী।


প্রতিবেশী থেকে শুরু করে ছোট বড় সবাই ভবানন্দ কে গালমন্দ খিস্তি খামারি দিতে থাকে। সোনালীর প্রশংসা করলেও কিন্তু দোষ গুণ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। 

ভবানন্দ অসহায়ের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুপাত করতে করতে ভাবে :- সোনালী; আমি না হয় একটি ভুল করে ফেলেছি কিন্তু তার জন্য আমাকে সারা জীবন শাস্তি দিয়ে গেলে। আমার সন্তানের থেকেও বঞ্চিত করে রাখলে।

আমি স্বীকার করছি আমার পুরুষের অহংকারে তোমার উপর অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছি কিন্তু তুমিতো নারী স্বাধীনতার অপব্যবহার কম করনি। আমি চেয়েছিলাম দুই বোন মিলেমিশে সংসারটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম।

তুমি আমাকে ভুল বুঝে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে। তুমি নিজে স্বনির্ভর হতে চেয়েছিলে আমি কিন্তু তার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি নিজস্ব স্বাধীনতা পেয়ে ছিলে, যা অন্য কোন নারীরা তাদের স্বামীর কাছে থেকে কোনদিন পায়নি। আমি টাকা আয় করেছি ঠিকই কিন্তু সবকিছু তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। কখনো কিন্তু তোমার কাছে খরচের হিসাব কোনদিন চাইনি।

জবা উঠান থেকে ছুটে গিয়ে বিছানার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে কান্না করতে করতে ভাবে :- দিদি; তোর আত্ম বলিদান বৃথা যেতে দেব না। আমি ভেবেছিলাম গর্ভপাত করে অন্য ছেলেকে বিয়ে করে জামাইবাবুকে মুক্তি দেবে কিন্তু সেই সুযোগ আমাকে আর দিলি না।

জামাইবাবু কে বিয়ে করে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব। দিদি যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস কিন্তু পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস।

সোনালীর বৌদি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে :- জবা; তোর পরকীয়া প্রেম করা এবার চিরতরে গুছিয়ে দেবে।

এক বয়স্ক প্রতিবেশী মহিলা বলে :- সব দোষ জামাই ভবানন্দের আর এই পরিবারের সদস্যরা অবৈধভাবে মেলামেশার সুযোগ করে দিয়েছে। জামাই বলে কি সাবধানে থাকতে হবে না! বাড়িতে অবিবাহিত মেয়ে থাকতে।

সোনালীর বৌদি উত্তেজিত হয়ে রাগে গজগজ করতে করতে ভবানন্দের সামনে গিয়ে তার দেহ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে :- তোমারও বলিহারি ঘরে পরীর মতো বউ থাকতে শালির সাথে প্রেম প্রেম খেলায় মেতে উঠেছে কেন! পুত্র সন্তানের আশায় কিন্তু বাংলায় কি আর যুবতী মেয়ে ছিল না?

যখন সোনালীর সন্তান আসার সময় হয়েছে তখন কিন্তু তোমার অত্যাচারের কারণে নিরুদ্দেশ হয়েছে। যে মেয়ে শত শত বার পরিবারের অত্যাচার সহ্য করে সংসার করতে পারে কিন্তু সেই মেয়ে কেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল! সম্পূর্ণ দোষ তোমার আর তোমার পরিবারের সদস্যদের।

সোনালির মা বলে :- অপদার্থ কোথাকার! 
তোমার বিবেকের একটু বাধলো না। তোমার জন্য আমরা কত কিছুই না, ত্যাগ করেছি। আশ্রয় দিয়ে, খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে ছিলাম কিন্তু হঠাৎ অর্থ প্রাপ্তি হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করেছিল।

ভবানন্দ কে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে বিভিন্ন প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে থাকে। ভবানন্দ হাঁটু গেড়ে মাটির উপর বসে পড়ে। সেই মুহূর্তে
গাড়ির আসার আওয়াজ পেয়ে সবার চোখ গাড়ীর দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাঙ্ক্ষা করে হয়তো সোনালী মনে হয় ফিরে এসেছে।  

ভবানন্দের কাকাতো দিদি ও জামাইবাবু গাড়ি থেকে নেমে ভবানন্দের পাশে দাঁড়িয়ে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে।

লোকজনের বিরক্তিকর কথা বার্তা শুনে বিরক্তবোধ হয়ে জবার মা-বাবার উদ্দেশ্যে দিদি অনুরাধা বলে :- আমার ভাই শুধু একা দোষ করেছে! আপনাদের মেয়ে জবার কারণেই তো আজ এই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মেয়েকে কখনো শাসন করেছেন। বিষয়টি তো একদিনে গড়ে ওঠেনি। 

এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনা, ঝগড়া ও অশান্তি না করে সোনালীকে খোঁজার চেষ্টা করুন। একজন তো চলে গিয়ে শান্তি লাভ করেছে কিন্তু আরো দুজন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আছে। তাদের সঠিক ব্যবস্থা করতে হবে।

আপনার মেয়ে জবাকে তো আর ঘরে রাখতে পারবেন না কারণ অবৈধ সম্পর্কের কারণে সে দুই মাসের গর্ভবতী।

উপস্থিত লোকজন তাদের হাতে মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে তাদের মধ্যে আরো জোর কদমে বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়ে যায়।

ভবানন্দের হাত ধরে দিদি অনুরাধা বলে :- চল ভাই, বাড়িতে যায়। এখানে যতক্ষন থাকবে মানুষের নানা কথায় আরও বেশি করে সমস্যার সৃষ্টি হবে। বাড়িতে গিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে সোনালীকে খোঁজ করতে হবে।

যদি মরে না যায় তাহলে ঠিক খোঁজ করতে করতে একসময় পাওয়া যাবে। চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কিছুই হবে না। চল চল তাড়াতাড়ি।

ভবানন্দ গাড়িতে উঠে দিদির পাশে বসে আর জামাইবাবু ভবানন্দের গাড়ির চালক হয়ে অচিন্ত্য পুর গ্রামের দিকে চলতে শুরু করে।  

সোনালীর বাবা-মা দাদা বৌদি বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে না পাওয়ার পর থানায় গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করে।

থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার সোনালীর রেখে যাওয়া চিঠি পড়ে সোনালীর দাদা বৌদির উদ্দেশ্যে বলেন :- সোনালী কিন্তু নিজের ইচ্ছায় চলে গিয়েছে। খুঁজে বের করতে হলে প্রাইভেট গোয়েন্দা লাগাতে হবে কিন্তু ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে। তবুও আমাদের যতটুকু সাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবো।

খোঁজাখুঁজি করতে করতে জবার পেটে বাচ্চার বয়স চার মাস অতিবাহিত হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা জবার সন্তানের গর্ভপাতের চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু দৈবক্রমে ঔষধ কোন কাজ করে না।

জবাকে জোর করে গর্ভপাতের জন্য তার মায়ের সাথে করে নার্সিংহোমের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। জবা গাড়ি থেকে নেমেই চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে সুযোগ বুঝে পাগলের ন্যায় আচারন করে সবাইকে মারধর করতে করতে রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। তারপর প্রধান সড়ক ছেড়ে দিয়ে গলিপথ ধরে চলতে শুরু করে। সন্ধ্যার সময় ভবানন্দের অচিন্তপুরের বাড়িতে চলে আসে।

ভবানন্দ তার শশুর মশাই কে ফোন করে বলে :- সোনালী নিখোঁজ হয়েছে আর জবা আমার এখানে চলে এসেছে। জবাকে কালী মন্দির থেকে সিঁদুর পরিয়ে সামাজিকভাবে স্বামী স্ত্রী হয়েছি। বিয়ে করার শুভ দিনক্ষণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের এবং নিয়ম নীতির কোন প্রয়োজন মনে করিনি। 

আমার সন্তানকে গর্ভপাতের মাধ্যমে মারতে চেয়েছিলেন। আপনারা ভ্রুণ হত্যার অপরাধে কিন্তু অপরাধী। এরপর আর আপনার সাথে আমার সম্পর্ক রাখা কোন ভাবেই উচিত নয়। 

সোনালীর বাবা-মা সহ পরিবারের সদস্যরা ও আত্মীয়-স্বজন লোকনিন্দা আরো বেশি করে নিন্দিত হতে থাকে।

জবা বধু বেশে স্বামীর পাশে থেকে সহযোগিতার মাধ্যমে তার দিদির সাজানো সংসারের অভিভাবক হয়ে সোনালীর অভাব পূরণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 


----------------------------------------------------------
          ।। ত্রয়োবিংশ (২৩) অধ্যায়।।
----------------------------------------------------------
সোনালী তার স্বামীর রাজ অট্টালিকা ও বিপুল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে মাটির তৈরি ঘরে রাজ পতি গ্রামে বসবাস শুরু করে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি এলাকার দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়িয়ে লেখাপড়া শেখার উৎসাহিত করতে থাকে।

এই স্কুলের সন্নিকটে সন্তানহীন এক বয়স্ক বিধবা সুমিতা নামক মহিলার বাড়িতে একটি মাটির ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। সোনালী কয়েক মাসের মধ্যেই আন্তরিকতা সৃষ্টি করে সুমিতা দেবী কে মা ডেকে তার সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে থাকে। 

সুমিতা দেবী তার মেয়ে সোনালীর মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার সময় পাড়ার মহিলাদের সহযোগিতায় সাত মাসে সাধভক্ষণ করায়। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে দশ মাস দশ দিন পর সোনালী পুরুলিয়া হাসপাতালে একটি ফুটফুটে সুন্দর ছেলে জন্ম দেয়।

কয়েক বছর ধরে চাকরির পাশাপাশি গ্রামের দারিদ্র শ্রেণীর মহিলাদের সংগঠিত করে তোলে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে স্বনির্ভর করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

সোনালীর নেতৃত্বে আরো কয়েক বছরের মধ্যেই সংগঠিত মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ও সহযোগিতার মাধ্যমে হস্তশিল্পের ছোট্ট মাপের কারখানা তৈরি হয়।

সকল সংগঠিত নারী ও পুরুষদের নিয়ে রবিবারের এক বিকেলে আলোচনা সভার আয়োজন করে তার নিজস্ব বসবাস স্থানের বাড়ির উঠানে।

সোনালী উপস্থিত সকলকে তার মর্যাদা অনুসারে সম্মান জানিয়ে বলে :- প্রত্যেক নারী ও পুরুষদের নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নতি না ঘটাতে পারলে কিন্তু সেই জাতি কোনদিন উন্নতি হয় না।

নারীরা চিরকালই পুরুষের কাছে শৃংখলব্ধভাবে আছে। শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে হবে। পুরুষের কাঁধে হাত রেখে একসাথে সবাইকে চলতে হবে। নারীর স্বাধীনতা মানেই পুরুষদের বাদ দিয়ে নয় কিন্তু। স্বামী স্ত্রী উভয়ের কর্ম করে অর্থ উপার্জন করলে ধীরে ধীরে উন্নয়ন অবশ্যই হবে কিন্তু মদ খেয়ে জুয়া খেলে উড়িয়ে দিলে আরো অধঃপতন হতে থাকবে।

এই সংগঠনের কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা কে হস্ত শিল্পের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বাজারজাত করানোর জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা অনুরূপ ফল লাভ করেছে, ভবিষ্যতে আরো ভালো ফল হবে বলে আশা করি।

আজকের এই ছোট্ট কারখানা কিন্তু কয়েক এক বছরের মধ্যে বড় কারখানা রূপান্তরিত হয়ে যাবে। যদি আমরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া অশান্তি না করে একসাথে কাজ করে যেতে পারি।

রাজ পতি গ্রামের বহু মহিলা ও পুরুষ সারা বছর এই কারখানায় কাজের বিনিময়ে দৈনিক মজুরি পেয়ে থাকেন। সেই অর্থ দিয়ে আপনাদের জীবন-জীবিকা সংসার পরিচালনা করেন। রাজ পতি একটি ছোট্ট গ্রাম কিন্তু বসবাসকারী ব্যক্তিগণের দারিদ্রতাই ভোগে বারো মাস। 

আমাদের কর্মের মাধ্যমে দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে যেতে হবে। আমাদের গ্রামের আশপাশের গ্রামগুলোতে সংগঠনের কর্মীদের কে এগিয়ে যেতে হবে। তাদের কে সংগঠিত করে উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। 

উপস্থিত লোকজন হাতে তালি দিয়ে দিদিমণির জয়ের ধ্বনি দিতে দিতে বলে :- দিদিমণি ; আমাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন আমরা আপনার সাথে আছি। 

সোনালী বলে :- সবাই কিন্তু মন দিয়ে কাজ করবেন আর শিশু-কিশোরদের স্কুলে পাঠাবেন। শিক্ষার আলো না থাকলে সেই জাতি কিন্তু কোনদিন আলোর পথ দেখতে পাইনা। আলোচনা সভা আজকের মত শেষ করা হলে। সবাই সুস্থ থাকুন এবং ভাল থাকুন।

সোনালীর ধর্ম মা সুমিতা দেবী এক সরকারি কর্মকর্তার প্রশ্নের উত্তরে বলেন :- সোনালী কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামের মানুষের মন জয় করে ফেলেছে। দারিদ্র শ্রেণীর মানুষের হাতে এখন টাকা-পয়সা ভালোই আছে। হঠাৎ কোনো আপদ বিপদের মোকাবিলা করতে পারে। বিপদের মুহূর্তে মহাজনের কাছে ও ধনী ব্যক্তির কাছে হাত পাততে হয় না।

গ্রামের দারিদ্রতা শ্রেণীর মানুষেরা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দুই বেলা পেট ভরে আহার করতে পারে। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সোনালী কে সম্মানিত ব্যক্তি মনে করে মাস্টার দিদিমণি বলে ডাকে। বড় ছোট সবার নিকটে সম্মানের জায়গা তৈরি করেছে।

এক এনজিও সংস্কার কর্মকর্তার প্রশ্নের উত্তরে গ্রামবাসী বলেন :- মাস্টার দিদি আমাদের গ্রামের দেবী লক্ষ্মী-সরস্বতী কারণ দিদি মণি রাজপতি গ্রামে আসার আগে সংসারের সদস্যদের এক বেলা খাবার সংগ্রহ করতে পারতাম না। এখন দুবেলা আনন্দ করে ছেলে মেয়েকে নিয়ে পেট ভরে প্রতিদিন খেতে পায়।

ছেলে-মেয়ে সহ সকল নর নারীর লেখাপড়া শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি ঘটেছে কারণ সবাই লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছে। বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতিদিন রাতে তার বাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে থাকেন।

সোনালী জীবন সংগ্রামের কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা চালিয়ে গ্রামের মানুষের দারিদ্রতা দূর করে, প্রতিটি পরিবার কে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলেছে। 

১১ বছর ধরে এই গ্রামে বসবাস করে স্বামীর মত রাজ অট্টালিকা বানাতে না পারলেও কিন্তু স্বাধীনভাবে বসবাস করার মত নিজস্ব কয়েক বিঘা জমি ক্রয় করে পাকা বাড়ি তৈরি করেছে। বাড়ির আশপাশে কয়েক বিঘা জমিতে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছপালা লাগিয়ে দিয়েছে। তার ছেলে এখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সোনালী তার আদর্শে তার সন্তানকে লালন পালন করে চলেছে। শুধু তার সন্তানের প্রতি নয় সমগ্র সন্তানের প্রতি তার মায়া মমতা স্নেহ ভালোবাসা পরিপূর্ণ। সেই ক্ষেত্রে সোনালী কে আদর্শ মা বলা যেতে পারে।


----------------------------------------------------------
          ।। চতুর্বিংশ (২৪) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
শিক্ষিকা সোনালীর একান্ন বছর বয়সে নানা চিন্তা ভাবনা করতে করতে রোগে আক্রান্ত হয়ে শরীর জরাজীর্ণ হয়েছে। 

স্কুল সরকারি ছুটি থাকার কারণে বুধবারের বিকেলে বাড়ি দোতলার ছাদের উপর পাথরের কৃত্রিমভাবে পদ্ম ফুলের ছাতা বানিয়ে পার্ক তৈরি করেছে ও প্রকৃতির গাছপালা সাজিয়ে সৌন্দর্য মন্ডিত শোভার মাঝে চেয়ারে বসে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের শূন্যতার স্মৃতিচারণ করতে থাকে।

প্রকৃতির নিয়মে শীতকাল পেরিয়ে ঠান্ডা-গরম কালের নব বসন্তের মৃদু মৃদু হাওয়া গায়ে লাগিয়ে নবযৌবনের কথাগুলো ভাবতে থাকে। মনে পড়ে কলেজ জীবনে একবার বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের নিকট অবস্থিত। একটি আশ্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র এক বসন্তের উৎসবে যোগদান করে রঙ মেখে বন্ধুদের সাথে মাতোয়ারা হয়ে ছিলাম। সেই স্মৃতিচারণ করতে করতে মলিন মুখে হাসি চলে আসে। 

সকালের শীতের হালকা রোদ্দুরের মাঝে খোলা আকাশের নিচে লাল-হলুদ-সবুজ রঙের আবিরের খেলা বন্ধুদের সাথে। গাছে গাছে কোকিলের ডাক আর মৃদু মৃদু হাওয়ায় বসন্ত এসেছে জানিয়ে দেয়।

রঙের খেলায় মত্ত হয়ে সেদিন আমারও জীবনে ক্ষণস্থায়ী ভাবে বসন্তের আগমন ঘটেছিল। আমার লাল ওড়না উড়িয়ে বন্ধুকে আহ্বান করেছিলাম। বন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরে সারা দেহে ও মনে রঙে রাঙিয়ে দিয়ে ছিলে। মনকে আকর্ষন করে রাখার মতো স্মৃতিগুলো কিন্তু প্রতি বছর বসন্ত এলেই মনে পড়ে।

প্রকৃতির এক দমকা হাওয়ায় সবকিছু উলটপালট করে দিয়ে দুঃখের সাগরে ফেলে দিল। স্নাতকোত্তর পাস করে আসার পর কয়েক মাসের মধ্যেই বাবা এক প্রকার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়।

বাবা বলেছিলেন :- ভবানন্দের মতো বর ও পরিবার দুটো আর পাওয়া যাবে না, ভীষণ ভালো বর ও ঘর। দুই বছর যেতে না যেতেই শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয়।

স্বামী ভবানন্দ এতই ভালো মানুষ, আমি দুই মাসের পেটে বাচ্চা নিয়ে পালাতে বাধ্য হলাম। জানি না, জবা কে ভবানন্দ বিয়ে করেছে কি না?

এই বার্ধক্য বয়সে এসে বার বার স্বামীর স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে কিন্তু একজন পুরুষ সঙ্গীর অভাব বোধ করছি। আমি কি তাহলে দুর্বল হয়ে পড়েছি?

চাকরি ছাড়া ব্যবসা করে প্রচুর টাকা আয় রোজগার করেছি কিন্তু টাকা আমাকে শান্তি দিতে পারেনি। সুপ্ত যৌবন মাঝে মধ্যে জেগে ওঠে কিন্তু ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যৌবনের আবেগ কে দমন করে রেখেছি।

মধ্যে যৌবনে চাকরি পাওয়ার পর নতুন করে জীবনসঙ্গীর জন্য অনেক ব্যক্তি প্রস্তাব রেখেছিলেন। তাদের প্রস্তাব ছেলের মুখের দিকে চেয়ে প্রত্যাখ্যান করে কিন্তু অনেকের কাছেই কাছে শত্রু হিসেবে পরিণত হয়েছি।

আমার একজন সহকর্মী মাস্টারমশাই তো এক তরফা ভালবাসা নিবেদন করে, আমার জন্য এখনো বিবাহ না করে পাগল হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে ফোন করে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে।

এই ভাবেই যৌবনের অতৃপ্ত তৃষ্ণা তিলে তিলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সবাইকে একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

বিয়ের পর স্বামীর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন ঝুট ঝামেলা অশান্তি ও মারামারি করতে করতে বছরের পর বছর চলে গেছে। আবার যখন একান্নবর্তী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের মতো করে সংসার সাজিয়ে সুখের মুখ দেখলাম।

ঠিক সেই মুহূর্তে বোন জবা ঢুকে পড়ে আমার ভালবাসার ব্যাঘাত ঘটাতে শুরু করে। নারীরা যা ত্যাগ করতে পারে কিন্তু পুরুষেরা তা পারে না।

পুরুষ জাতি ভীষণ স্বার্থপর লোভী কারণ মেয়ে দেখলেই নাকি লালা ঝরতে শুরু করে। বাবা মাকে ত্যাগ করে স্বামী কে একমাত্র অবলম্বন করে বাঁচতে হয়। কিন্তু আমার ভবিষ্যতের কথা না ভেবে আবার আমার বোনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভালবাসার নামে দৈহিক মিলনে লিপ্ত হয়ে সবাই কে কলঙ্কিত করলো।

স্বামী কে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কে শোনে কার কথা। পুরুষ মানেই সংসারের কর্তা অহংকারের বশীভূত হয়ে থাকা। পরনির্ভরশীল অসহায় নারী পরগাছার মতো পুরুষ কে আঁকড়িয়ে ধরে বাঁচতে চাই, সেই নারীর কথার কোন মূল্য থাকে না।

অর্থনৈতিক সুখ পেয়েছি কিন্তু কোনদিন মনের সুখ পায়নি। সন্তান কে তার পিতার ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেছি কিন্তু সন্তানকে এখনো পিতৃত্বের আসল পরিচয় দিতে পারিনি। কারণ কলঙ্কিত পিতার পরিচয় দিতে আমার সম্মানহানিকর মনে করি। ছেলে তার বাবার নাম জন্ম সার্টিফিকেট থেকে জেনেছে কিন্তু ঠিকানা জানানো হয়নি।

ছেলে হরকান্ত ২২ বছর বয়সের এখন পূর্ণ যুবক এবং কলকাতার "যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়" 
( ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স ও সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিকস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ) এর মতো অগ্রণী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পড়াশোনা করছে। 

দেখতে দেখতে আমার জীবন থেকে ২২ বছর চলে গেছে। এই পাহাড়ের পাদদেশের অজ পাড়া গাঁয়ের মানুষের ভালোবাসার মাধ্যমে মনের অজান্তেই যৌবন পেরিয়ে আজ বার্ধক্য পা রেখে ভাবনা হয় ভালোবাসা কারে কয় ----------------।
----------------------------------------------------------
              ।। পঞ্চবিংশ (২৫) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
সোনালীর ছেলে হরকান্ত তার মায়ের পাশে বসে বলে :- মা; জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তোমার মুখে একটা কথা শুনে চলেছি বাবা হারিয়ে গিয়েছে।

আমার মনে সব সময় প্রশ্ন জাগে বাবা কোথায়! কিভাবে কেন হারিয়ে গেল?

আমি আমার বাবার পরিচয় জানতে চাই এবং জীবিত থাকলে তার সাথে দেখা করতে চাই। তোমার কথা অনুসারে বাবা যদি আমাদের ছেড়ে হারিয়ে যায়। তা হলেও তার বাবা-মায়ের ও আত্মীয়স্বজনের স্থায়ী নির্দিষ্ট ঠিকানা অবশ্যই আছে। 

হয়তো বাবা তার ভুল বুঝতে পেরে বাড়িতে ফিরে এসে নিশ্চয়ই আমাদের খোঁজাখুঁজি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তবুও খোঁজ করে চলেছে।

হয়তো তোমাকে বিধবা করে ও আমাকে অনাথ বানিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বাবা পরপারে চলে গিয়েছে।

মা সোনালী হালকা উত্তেজিত হয়ে বলেন :- এমন অলক্ষুণে কথা কখনোই বলবে না। তোর বাবার আয়ু 100 বছর হোক বলে দুই হাত উঁচু শাঁখা সিঁদুর কে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে।

হরকান্ত ভাবে মনে :- তাহলে নিশ্চয়ই বাবা বেঁচে আছেন। মায়ের সাথে বাবার কোন ঝামেলার কারণে মা কিন্তু বাবাকে ত্যাগ করে চলে এসেছে। মাকে বাবার সম্পর্কে উল্টোপাল্টা কথা বলে হৃদয়ে আঘাত করে রাগিয়ে তুলতে হবে, তাহলে অবশ্যই মা রেগে গিয়ে সত্য কথা বলতে পারো।

মা সোনালী বলেন :- এসব কথা রেখে অন্য কথা বল। তা তোর পড়াশোনা কেমন চলছে বাবা।

হরকান্ত হালকা রাগ দেখিয়ে মায়ের পাশে থেকে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে :- মা, তোমার কোন দিন স্বামী ছিল কি না তা আমার মনে সন্দেহ হয়। শাঁখা-সিঁদুর ব্যবহার করে বিবাহিত সাজার নাটক করে চলেছে বহু বছর ধরে কিন্তু কেন?

মা সোনালী দুই কানে আঙ্গুল দিয়ে বলে :- তুই কি আমার চরিত্রের সন্দেহ করছিস।

হরকান্ত বলে :- আমার মনে সন্দেহের দানা বেঁধেছে, আমি তোমার গর্ভজাত সন্তান তা ঠিক কিন্তু আমি বাবার পরিচয় হীন এক জারজ সন্তান।

মা সোনালী রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে :- কথাবার্তা সংযত ভাবে বল।

হরকান্ত উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমি, তোমাদের উভয়ের পাপের ফসল হলাম। যা তুমি মায়ের কর্তব্য পালন করে ২৩ বছর ধরে লালন-পালন করে চলেছে। তোমার নামের পাশে যে বাবার নাম ব্যবহার করে সেই নাম কে নিয়ে আমার মনে সন্দেহ জাগে। সত্য করে বল মা আমার আসল পিতার নাম কি?

মা সোনালী রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন :- না না না। সন্তান হয়ে আর তোর বাবার নামে অপবাদ দিস না। তোর বাবা ভবানন্দ। তুই আমার অবৈধ সন্তান না। তোর বাবার সাথে আমার সামাজিক মর্যাদায় সকলের উপস্থিতিতে অগ্নিসাক্ষী করে ব্রাহ্মণ, নাপিত ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিতি আমাদের বিবাহ হয়েছিল।

হরকান্ত বলে :- মা, তাহলে আমাকে গর্ভধারণ করে কেন পিতার কাছে থেকে পালিয়ে এসেছে! হয়তো তোমাদের মধ্যে কোনো অশান্তি হয়েছে কিন্তু সেই অশান্তির শাস্তি কেন সন্তানকে দিয়ে চলেছে। 

মা সোনালী বলে :- সে কথা আমি তোকে বলতে পারব না।

হরকান্ত কাঁদে কাঁদে ভাব নিয়ে বলে :- কেন পিতার স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছ! লোকে আমাকে নিয়ে ও তোমাকে নিয়ে বাজে বাজে কথা বলে কিন্তু নীরবে সহ্য করতে হয় অপমান। ২৩ বছর ধরে চলা নাটকের আজ যবনিকা টানতে চাই।

মা সোনালী ভাবে :- সন্তান হয়ে তার মায়ের চরিত্রের উপর আঙুল তুলছে। তাহলে আমার ত্যাগের কোন মূল্য নেই।

হরকান্ত বলে :- ভবানন্দ আমার সঠিক বাবা কিনা তার সঠিক প্রমাণ তুমি এখন পর্যন্ত আমাকে বলোনি। আমি যখন তোমাদের পাপের ফসল তখন আমি আর এই মুখ দেখাতে চাই না।

মা সোনালী বলে :- হরকান্ত চুপ কর। তোর বাবাকে কলঙ্কিত করিস না।

হরকান্ত বলে :- তুমি যেমন পিতাকে ছেড়ে চলে এসেছ আজ আমিও তোমাকে ছেড়ে চিরদিনের মত হারিয়ে যাব বাবার মতো । মা তোমার মিথ্যা অহংকারের আভিজাত্যের সংসার নিয়ে তুমি থাকো।

মা সোনালী বলেন :- হরকান্ত আমি তোকে দশ মাস দশ দিন গর্ভধারণ করেছি। অসহায় মাকে ফেলে কোথায় যাবি।

হরকান্ত বলে :- দু চোখ যেদিকে যায়।

মা সোনালী বলেন :- শিশু থেকে লালন-পালন করার মাধ্যমে বড় হয়েছিস। গর্ভে ধারণ করে মায়ের সব কর্তব্য পালন করেছি কিন্তু তোর কাছে মায়ের কোন মূল্য নেই!

হরকান্ত বলে :- মাতৃত্বের মূল্য অবশ্যই আছে। আমি কেন জগতের সকল মানুষই স্বীকার করবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পিতার উপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর শিশুকাল থেকেই আমাকে পিতার স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছো কেন?

মা সোনালী ভাবে মনে :- আমার আত্মত্যাগ সবই তো বৃথা হয়ে গেল। যে ছেলের জন্য গৃহ ত্যাগ করলাম সেই ছেলে হরকান্ত আমাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল। 

হরকান্ত বলে :- মা উত্তর দাও।

মা সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলেন :- তোমার বাবা ভবানন্দ আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে কিন্তু আমাকে সংসার ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। সেই মুহূর্তে স্কুলের চাকরি পেয়ে তোকে পেটে নিয়ে এই গ্রামে চলে আসি। তোর বাবার পরিচয় জানাতে পারবো না কিন্তু সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

হরকান্ত বলে :- মা; আমার কিন্তু তোমার মতো ধৈর্য সহ্য নেই। আমার বাবার পরিচয় জানতে হবে।

মা সোনালী বলেন :- তোর বাবা ভবানন্দের বিষয়ে নিয়ে আমাকে বার বার বিরক্ত করবে না। 

হরকান্ত বলে :- আমার বাবার নাম যদি ঠিক থাকে তাহলে অবশ্যই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বের করবো। এছাড়াও তোমার চাকরির আবেদন পত্রে তোমার বাবার বাড়ি বা স্বামীর বাড়ির আসল ঠিকানা অবশ্যই দেওয়া আছে।

মা সোনালী তার সন্তানকে আদর করতে করতে বলেন :- সময় হলে নিশ্চয়ই তোর বাবার ঠিকানা বলে দেবে।
----------------------------------------------------------
             ।। ষষ্টবিংশ (২৬) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
সোনালীর ছেলে হরকান্ত সাহা কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অবস্থিত হোটেলের খাবারের টেবিলে বুদ্ধেশ্বর নামে একজন ছাত্রের সাথে হরকান্তের আলাপ হয়।

কলকাতা শহরের মধ্যে কোন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের গাছ পালায় ভরপুর বনের পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা প্রধান উদ্যোগ। মানুষের বিনোদন করার মতো জায়গা। কয়েক সপ্তাহ পর দুই বন্ধু বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে বনের মাঝে চলে আসে।

নিরিবিলি পরিবেশ দেখে একটা জলাশয়ের পাড়ে বসে দুই বন্ধুর মধ্যে মনের কথাবার্তা ও পরিচয় পর্ব চলতে থাকে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বন্ধু; তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?

হরকান্ত বলে :- আমি আর মা।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বাবা কোথায় থাকেন ?

হরকান্ত বলে :- জানিনা, জন্মের পর কোনদিন বাবার মুখ দেখেনি ।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- তাহলে বাবা কি মারা গিয়েছে ?

হরকান্ত বলে :- হয়তো না, মা এখনো শাঁখা-সিঁদুর পড়ে থাকে। বাবার প্রসঙ্গে মাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলেন- বাবা নাকি হারিয়ে গিয়েছে। মাকে বহুবার জিজ্ঞাসা করেছি বাবার সম্পর্কে জানার জন্য কিন্তু কোন উত্তর পাইনি।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- হয়তো তোমার মা কোনো বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তোমার মা শান্তি বজায় রাখতে হয়তো তার স্বামীর গৃহ ত্যাগ করেছিলেন।

হরকান্ত বলে :- মায়ের আত্মত্যাগের রহস্য উদঘাটন করার জন্য বহু চেষ্টা করছি কিন্তু মা বলে সময় হলে জানাবেন। বন্ধু; পিতৃত্বের পরিচয় জানতে চাইলে কিন্তু মা আড়ালে গিয়ে চোখের জল ফেলতে থাকে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বন্ধু ; তোমার বাবা ও মায়ের মধ্যে ব্যক্তিগত কোন সমস্যা রয়েছে। যা সন্তানের সামনে প্রকাশ্যে বলতে পারছেন না। মা নিজের যন্ত্রনা বুকের মাঝে রেখে, তুষের আগুনের মতো জ্বলছে। সেই কারণেই অবিরাম চোখের জল ফেলে চলেছে।

হরকান্ত বলে :- বন্ধু; হয়তো তোমার ধারণা সঠিক।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বাবা-মায়ের সমস্যা যাই হোক না কেন, স্বামীর সঙ্গ ত্যাগ করে সন্তানের কর্তব্য পালন করেছেন। মা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমাকে গর্ভধারণ করে, শিশুকাল থেকে লালন পালন করে শিক্ষিত করে তুলেছেন। 

বাবা-মায়ের সমস্যার কারণে মা যদি গর্ভপাত করে দিতেন তাহলে তোকে গর্ভে বিনষ্ট হতে হতে। তাহলে কিন্তু এই সুন্দর জীবন যৌবন ও সৌন্দর্যময় পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্যের আনন্দ উপভোগ করতে পারতে না।

বন্ধু হাতজোড় করে নিবেদন করছি কখনো মায়ের মনে কষ্ট দেবে না। নিশ্চয়ই একদিন তোমার পিতৃত্বের পরিচয় লাভ হবে। বন্ধু তোমার মা আছে কিন্তু আমার তো মা নেই, মায়ের অভাব বোধ আমি বুঝতে পারি।

হরকান্ত বলে :- তোমার মায়ের কি হয়েছিল।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বাবা বলেছেন, আমার যখন সাত বছর বয়স, সেই সময় মা কঠিন রোগে ভুগে ভুগে মারা গিয়েছে। অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে, তবুও মাকে বাঁচাতে পারেননি। মায়ের চিকিৎসা করতে করতে বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে পড়েছিল।

হরকান্ত বলে :- সর্বসুখ সবার কপালে জোটে না রে বন্ধু । তোমার মা নেই আমার বাবা নেই। প্রকৃতির কি নিয়ম কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছে। বলে পুকুরের মাঝে মাটির ঢেলা ছুটতে থাকে।

দুই জন যুবতী দুই বন্ধুর সামনে এসে বুদ্ধেশ্বর কে লক্ষ্য করে বলে :- এই বুদ্ধেশ্বর তোর নতুন বন্ধু। দেখে তো মনে হচ্ছে কোন গ্রাম থেকে এসেছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- তোদের মতো আধুনিকতার ছোঁয়া না থাকলেও কিন্তু মানবতাবাদী বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার পাওয়া যাবে। যা শহরের কোন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

হরকান্ত হাতজোড় করে নমস্কার করে আর মেয়েগুলো হাসতে শুরু করে হাত বাড়িয়ে দেয়।

বুদ্ধেশ্বর তার বন্ধু হরকান্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে :- পাহাড় ঘেরা গ্রামের সহজ সরল সাধারণ ছেলে কিন্তু লেখাপড়ায় খুবই ভালো। বর্তমান আমার অন্তরের অন্তঃস্থলের বন্ধু ভাবতে পারেন।

এক বান্ধবী হাসতে হাসতে বুদ্ধেশ্বর এর দিকে তাকিয়ে বলে :- তা তোর বন্ধু শহরের কোন মেয়ের প্রেমে পড়েনি তো!

হরকান্ত মৃদু মৃদু হেসে বলে :- এখনো পড়িনি তবে শহরের মেয়েদের সাথে প্রেম করার খুবই ইচ্ছা আছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আমার বন্ধুর সাথে প্রেম করবি নাকি। 

দুই বান্ধবী হাসাহাসি করতে করতে বলে :- তোর বন্ধুর রূপ যৌবন আমাদের মুগ্ধ করেছে কিন্তু আগের থেকেই বয়ফ্রেন্ড জোগাড় করে নিয়েছি। 

বুদ্ধেশ্বর হাসতে হাসতে বলে :- মহাভারতের কাব্য কাহিনী থেকে জানা যায়। ভারতীয় বধূ দ্রৌপদীর যদি পাঁচটা স্বামী থাকতে পারে, আর কলিযুগে নারীর দুটি স্বামী কোন ব্যাপার না।

সবাই হাসতে থাকে তারপর এক বান্ধবী বলে :- ঠিকই বলেছিস এই চলি! অন্য দিকে আবার একজন অপেক্ষা করে বসে আছে। ক্যাম্পাসে দেখা হবে।

বুদ্ধেশ্বর তার বন্ধুর হাত ধরে আড্ডা করে বলে :- কিরে বন্ধু প্রেম করছিস নাকি। দেওয়া নেওয়া দেওয়া নেওয়া তোমার সাথে।

হরকান্ত লাজুক লাজুক চোখে বলে :- তেমন ভাবে কাউকে ভালোবাসা এখনো হয়নি তবে ফেসবুকে একজন নারীর সাথে কথা হয়েছে।

বুদ্ধেশ্বর বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলে :- কই ছবি দেখা তো! দেখি কোন মহিলা পাহাড়ি যুবকের প্রেমে পড়েছে।

হরকান্ত বলে, আরে থাক না পরে দেখাবো।

বুদ্ধেশ্বর তার বন্ধুর ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক খুলে বলে :- আরো কোন মেয়েটি বল না। 

হরকান্ত মোবাইল হাতে নিয়ে তার প্রেমিকার ছবিটি বের করে তার বন্ধুর হাতে মোবাইল দেয়।

বুদ্ধেশ্বর এক নজর দেখেই আনন্দিত হয়ে বলে :- আরে তুই তো দেখছি দারুন প্রেমিক। এমন একটি ভালো জিনিস তোর আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে এসেছিস।

হরকান্ত লাজুক ভাব নিয়ে বলে :- তোর পছন্দ হয়েছে। 

বুদ্ধেশ্বর হাসতে হাসতে বলে :- বন্ধুর প্রেমিকা তা পছন্দ হবে না দেখে তো আমারও লোভ হচ্ছে প্রেম করার। তা কত দূর এগিয়েছে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে।

হরকান্ত বলে :- এখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আমাদের বাড়িতে চল ঠিক দেখা করিয়ে দেবো। 

বুদ্ধেশ্বর ফোন হাতে নিয়ে তার বোনকে কল করে বলে :- বোন; আমি আগামী মাসের ১০ তারিখে বাড়ি আসছি তুই কিন্তু চলে আসবে। আর সাথে করে তোর ননদকে নিয়ে আসবে।

বোন মালতি হাসতে হাসতে বলে :- দাদা; আমার ননদের এত দেখার ইচ্ছা কেন! প্রেমে পড়েছিস নাকি।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- তোর ননদের দেখার পরে জানতে পারবে কে কার প্রেমে পড়েছে। তোর ননদ কিন্তু ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে। ঠিক আছে বাড়ি আয় তারপর সবকিছু জানতে পারবি। এখন কাউকে কিছু বলতে হবেনা।

হরকান্ত বলে :- বন্ধু তুই তো দেখছি বহুদূর পর্যন্ত জল ঘোলা করবে তাহলে এই মেয়েটা তোর কে হয়।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আরে এই মেয়েকে আমি ভালোভাবে চিনি এবং কথাবার্তা বহুবার হয়েছে। আমার বোনের ননদ অর্থাৎ আমার বিয়ান। দেখতে কিন্তু খুবই সুন্দর আর কথাবার্তাও মার্জিত ভাবের। 

হরকান্ত বলে :- তাহলে তো আমারও বিয়ান।

বুদ্ধেশ্বর তার বন্ধু হরকান্ত এর কাঁধে হাত রেখে আড্ডা মেরে বলে :- আমার বিয়ান কে তুই ভাগিয়ে নিলি, ভেবেছিলাম তার সাথে একটু প্রেম প্রেম খেলা করব।

হরকান্ত বলে :- চল চল রাত অনেক হয়েছে। বনের কর্তৃপক্ষ হুইসেল বাজিয়ে দিয়েছে আর এখানে থাকা যাবে না।

বুদ্ধেশ্বর একটা মশা মেরে বলে :- এত আলো জ্বলছে আবার প্রতিদিন মশা মারার ঔষধ স্প্রে করে বলে, তবুও কিন্তু মশার উৎপাত কমছে না।

হরকান্ত হাসতে হাসতে বলে :- ওই মেয়েদের পুরুষের রক্তচোষার মতো।

----------------------------------------------------------
           ।। সপ্তবিংশ (২৭) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
বিশ্ব বিদ্যালয়ের বার্ষিক গরমের লম্বা ছুটি পড়েছে, ছাত্রগণ সবাই যার যার গন্তব্য স্থলে চলে যেতে শুরু করেছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বন্ধু আগে আমাদের বাড়ি পড়বে, চল বাড়িতে কয়েকদিন আনন্দ ফুর্তি করে তারপর তোদের বাড়িতে যাওয়া যাবে।

হরকান্ত বলে :- মা অপেক্ষায় রয়েছে কিন্তু ভীষণ ভাবে চিন্তা করবেন।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- মায়ের ফোন নাম্বার দে , আমি ফোন করে বলছি। আমাদের বাড়ি বেরিয়ে তারপর তোদের বাড়িতে দুই বন্ধু মিলে মায়ের স্নেহ-ভালবাসা ও আদর পাওয়ার জন্য যাবো। মায়ের ভাগ দিবি তো।

হরকান্ত বলে :- ঠিক আছে মাকে ফোন করে দিচ্ছি, তাহলে চল তোদের বাড়ি বেরিয়ে আসি। তোর বোনের ননদ আসবে তো।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আরে বন্ধু আমার কথা শুনলে তোর প্রেমিকা, সুরেশ্বরী নাচতে নাচতে চলে আসবে।

হরকান্ত বন্ধু বুদ্ধেশ্বর সাথে করে মনের অজান্তে পিতৃভূমিতে হুগলি জেলার অচিন্ত্য পুর গ্রামে বেড়াতে আসে ।

বুদ্ধেশ্বর বাড়িতে আসতে একমাত্র বিবাহিত ছোট বোন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দাদা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- দাদা ; কলকাতায় থেকে থেকে অনেক রোগা হয়ে গেছিস। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না মনে হচ্ছে। আর নতুন এই ছেলেটা নিশ্চয় তোর বন্ধু আমার হরকান্ত দাদা।

হরকান্ত কাঁধ থেকে ভারী ব্যাগ ঘরের ঢোকার বসার সিঁড়ির উপর ধপাস করে ফেলে দিয়ে বসে পড়ে বলে :- বোন; বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এক দাদা পেয়ে আরেক দাদা কে ভুলে গেলে। পানীয় জল দাও। যা প্রচন্ড গরম পড়েছে কলকাতা থেকে কয়েক ঘন্টা রাস্তা আসতেই ঘেমে স্নান করে উঠেছি।

হরকান্ত বারান্দায় উঠে চৌকির উপর বসে আর মালতি বিদ্যুৎ চালিত পাখা চালিয়ে দেয়। হরকান্ত চৌকির উপর একটি বাচ্চা ছেলেকে দেখে তার সাথে মামা মামা বলে আলাপ জমাতে থাকে। 

বুদ্ধেশ্বর বোন মালতি হরকান্ত কে জল দিয়ে বলে :- দাদা; আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। 

হরকান্ত জল পান করে বলে :- ভাগ্নে আমার আলাপে আছে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই মামার সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে।

হঠাৎ ঘর থেকে একজন যুবতী মহিলা বাইরে আসে আর বুদ্ধেশ্বরের সাথে কথা বলতে থাকে।

বুদ্ধিস্বর এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বিয়ান সুরেশ্বরী কে হাসতে হাসতে বলে :- আমার বন্ধু হরকান্ত কে চেনো নাকি।

সুরেশ্বরী আমতা আমতা করে বলে :- চেহারা দেখে তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে।

বুদ্ধেশ্বর হাসতে হাসতে বলে :- ডুবে ডুবে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রেম করছো আর বলছ চিনা চিনা লাগছে। আমার হৃদয় টা তোমার জন্য কিন্তু খালি থেকে গেল।

বোন মালতি আড়াল থেকে দুই দাদার কথা শুনে সামনে এসে হাসতে হাসতে বলে :- হরকান্ত দা তাহলে আমার ননদকে আজ থেকে বৌদি বলেই ডাকবো।

সুরেশ্বরী লজ্জা পেয়ে আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ঘরে ঢুকে পড়ে।

বুদ্ধেশ্বর তার বোনের দিকে তাকিয়ে বলে :- তাহলে দাদা বৌদির কথা বার্তা বলার ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে।

মালতি হাসতে হাসতে বলে :- ঠিক আছে দাদা।

মালতি ঘরে ঢুকে তার ননদকে টানতে টানতে রান্নাঘরে নিয়ে যায়। এবং বলে খাবার গুলো দাদার সামনে নিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি পরিবেশন করে বৌদি।

সুরেশ্বরী বলে :- বৌদি আমার লজ্জা করছে তুমি জানো না।

মালতি হাসতে হাসতে বলে :- লজ্জা ঘৃণা থাকলে ভালোবাসা জমে উঠবে না তাড়াতাড়ি যা।

খাওয়া দাওয়া করে বিকেল বেলা দুই বন্ধু মিলে গ্রামের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মাঠ ঘাট বাজার মনের আনন্দ ফুর্তি করে বেড়ায়।

কয়েক সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ সময় পুকুরে সাঁতার কাটা আর বোন মালতির কাছে মায়ের মত স্নেহ ভালোবাসা আর শাসনের ভূমিকা নিয়ে দুই বন্ধুর উপর বকাবকি করা চলতে থাকে।

পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে জলে পড়ে হাবুডুবু খাওয়া আর ভাগ্নে-ভাগ্নির হাতে তালি সহ চিৎকার চেঁচামেচি। হরকান্ত জলে ডুবে যাওয়ার সময় সুরেশ্বরী পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা আবার দুজনে দুজনের কাছাকাছি হয়ে আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে ভালোবাসা নিবেদন আরো না কত কিছু। 

জমির ধানের ভাত ও পুকুরের মাছ আর গোয়ালের গরুর দুধ কব্জি ডুবিয়ে কিন্তু বোন মালতি ও তার ননদের সাথে আড্ডা ইয়ার্কি করতে করতে খাওয়া দাওয়া। বাড়িতে দুজন কাজের মাসি আছেন, মাসিক বেতনের মাধ্যমে করে এই পরিবারের সংসার পরিচালনা করেন।

একদিন সন্ধ্যার পর এই পরিবারের সবাই হলঘরের গোলাকার টেবিলের চারদিকে জড়ো হয়ে সন্ধ্যা জলখাবার খেতে থাকে।

বুদ্ধেশ্বর বাবা ভবানন্দ বলেন :- বাবা হরকান্ত, তোমার বাড়ি কোথায়!

হরকান্ত বলে :- পুরুলিয়া জেলার রাজ পতি গ্রামের অযোধ্যা পাহাড়ের সন্নিকটে। মা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা।

বাবা ভবানন্দ বলেন :- তোমার বাবার নাম কি ?

হরকান্ত বলে :- ভবানন্দ সাহা ।

বন্ধু বুদ্ধেশ্বর বলেন :- হরকান্ত জন্মগ্রহণ করার পর পিতার সাথে কোনদিন দেখা হয়নি।

ভবানন্দের বুকের মাঝে চমকিত হয়ে উঠে, অজানা আতঙ্ক নিয়ে নিজেকে সংযত করে কিছু সময় পর বলেন :- হরকান্ত; তোমার জন্মের আগেই কি তোমার বাবার মৃত্যু হয়েছিল?

হরকান্ত বলে :- ঠিক জানি না কিন্তু মা এখনো সধবা রমণীগণের মতো শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরিধান করে। 

বুদ্ধেশ্বর বলে :- হরকান্ত মা তার বাবার আসল ঠিকানা বলেন না। কেন যে বাবা মায়েরা নিজেদের ভুলের মাশুল সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয়। নিজে তো কষ্ট ভোগ করে তার সাথে সন্তানদের কষ্ট দেয়। 

বাবা; আমার বন্ধুর মনে ভীষণ কষ্ট তার বাবার জন্য কিন্তু তার মা তার বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় না।

হরকান্ত বলে :- এই সমাজে বাবার পরিচয় থাকা কতটা জরুরি তা কিন্তু মা বোঝে না। মা লালন-পালন করতে পারবে কিন্তু উভয়ের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

জন্ম সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে সকল ভারতীয় প্রমাণাদি কাগজপত্রে বাবা ভবানন্দ সাহার নাম উল্লেখ করা আছে। কিন্তু তার আসল ঠিকানা আমার কাছে আজও অজানা। 

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বন্ধু, ঠিক বলেছিস কিন্তু দুঃখ করিস না ঠিক ঈশ্বর একদিন তোর বাবাকে পাইয়ে দেবে। ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখ।

হরকান্ত বলে :- মা বলেছেন, ভবানন্দ তোর বাবা, আর শুনেছি আমাকে দুই মাসের পেটে ধারণ করে বাবাকে পরিত্যাগ করে রাজ পতি গ্রামে চলে আসে। এর বেশি কিছু আমার আর জানা নাই।

বোন মালতি থালার উপরে কয়েকটি বাটি করে চুনো মাছের বড়া নিয়ে এসে আলোচনার টেবিলে রেখে তারপর মুড়ির গামলা নিয়ে এসে হরকান্তের দিকে তাকিয়ে বলে :- দাদা, আর মুড়ি মাখা দেবো।

হরকান্ত বলে :- দে, মুড়িতে আমার কোন সময় কিন্তু অরুচি নেই । আমাদের গ্রামে সকালে ও বিকালে মুড়ি ঘুগনি বা ছোলা সিদ্ধ বা ছোলা রান্না বা বেগুন পোড়ার সাথে বিভিন্ন রকমের চপ দিয়ে জল খাবার হিসেবে খাওয়া দাওয়া করা হয়।

বুদ্ধেশ্বরের ভাগ্নি হরকান্তের পাশে গিয়ে বসে তার থালা থেকে মাছের বড়া তুলে নিয়ে খেতে থাকে।

কাজের মাসি হল ঘরে ঢুকে বুদ্ধিস্বরের দিকে তাকিয়ে বলে :- আজ রাতে মুরগির মাংস করা হবে। যেখানেই যাস না কেন তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আসবে কিন্তু। এই ছেলে দুটো কখনোই গরম ভাত খেতে পারে না। বাড়িতে এসে কিন্তু এক দণ্ড সময় সবার সাথে বসে কথাবার্তা বলার সময় নেই। সব সময় পাড়ায় পাড়ায় বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- ঠিক আছে; দিদিমা তাড়াতাড়ি আসবো কিন্তু আমার জন্য কিন্তু মেটে রেখে দেবে।

বুদ্ধেশ্বর এর বাবা ভবানন্দ ভাবে :- সোনালীর ছেলে নয় তো! আর দেখতে তো চেহারা আমার মতো। তাহলে সোনালী এখনো জীবিত আছে। সোনালী আমাকে দুঃখের সাগরে ডুবে তুমি কোথায় আছো। আমি তোমাকে আজও ভালবাসি।

হরকান্ত তার বন্ধু কে বলে :- চল বাজার থেকে ঘুরে আসি আর ভাগ্নের জন্য বিরানী আর ভাগ্নির জন্য চাওমিন নিয়ে আসি।

মালতি তার দুই দাদার উদ্দেশ্য করে বলে :- বোনের জন্য কি আনবে?

বুদ্ধেশ্বর বলে :- তোর জন্য দুই আর রসমালাই তোর তো প্রিয় খাবার।

হরকান্ত বলে :- আমার মায়ের কিন্তু এই দুটোই প্রিয় খাবার।

বাবা ভবানন্দ আবেগকে ধরে না রাখতে পেরে দ্রুত বলেন :- হরকান্ত; তাহলে তোমার মায়ের নাম কি সোনালী সাহা! বলে বলে।

হরকান্ত আশ্চর্য হয়ে বন্ধুর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে :- আপনি তাহলে আমার মা কে চেনেন! তাহলে নিশ্চয়ই আমার বাবার পরিচয় ও বসবাসের ঠিকানা বলতে পারবেন। আমি বাবার সাথে দেখা করে বলতে চাই, আমাকে কেন বাবার স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছেন। 

বাবা ভবানন্দ তাড়াহুড়ো করে উঠে বলে :- নিশ্চয়ই তোমার বাবার পরিচয় পাবে কিন্তু কিছু সময় অপেক্ষা করে ঘর থেকে আসছি। 

হরকান্ত মনের গভীরে ঢুকে পড়ে ভাবে :- এবার তাহলে বাবা মায়ের দ্বন্দ্বের রহস্য উদঘাটন করতে পারবো। আনন্দিত মনে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে।

বাবা ভবানন্দ বারান্দা থেকে দ্রুত বেগে নিজ শয়নকক্ষে ঢুকে আলমারি খুলে দীর্ঘদিনের পুরনো দিনের সোনালীর ছবি ও সোনালী হাতের লেখা সেই চিঠি নিয়ে ধুলো ছাড়তে ছাড়তে বারান্দায় ফিরে আসে।

হরকান্ত আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনের অজান্তেই বাবা বলে ডেকে বলে :- বলুন বাবা আমার পরিচয় কি! তিনি কোথায় থাকেন? আমি তার কাছে যাবে।

বাবা ভবানন্দ ছবির অ্যালবাম খুলে বলেন :- দেখতো বাবা; এই ছবিগুলো চিনতে পারো কিনা।

হরকান্ত তাড়াহুড়ো করে অ্যালবাম হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে ছবি গুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে আনন্দিত হয়ে বলে ওঠে :- এই ছবিগুলো মায়ের যৌবন বয়সের কিন্তু মায়ের পাশে থাকা এই ছবিটি কি আপনার ?

ভবানন্দ বলে :- হ্যাঁ বাবা; আমার ।

হরকান্ত বলে :- তাহলে আমার মায়ের সাথে আপনার সম্পর্ক কি ?

বাবা ভবানন্দ ছবির উপর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন :- এই সোনালী আমার প্রথম স্ত্রী।

হরকান্ত ছবিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একটি ছবি হাতে নিয়ে বলে :- নিশ্চয়ই আপনাদের বিয়ের ছবি।

বাবা ভবানন্দ কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন :- এই ছবিটি যদি তোমার মায়ের হয়ে থাকে, তাহলে আমি তোমার জন্মদাতা হতভাগ্য বাবা ভবানন্দ সাহা।

হরকান্ত উত্তেজিত হয়ে বলে :- আপনি যদি সত্যি আমার জন্মদাতা পিতা হয়ে থাকেন, তবে মা দুই মাসের পেটের সন্তান ধারণ করে-আপনাকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন কেন! আমার মায়ের কি অপরাধ ছিল? উত্তর দিন।

বাবা ভবানন্দ বলেন :- তোমার প্রশ্নের উত্তর এই চিঠির মধ্যে পেয়ে যাবে বাবা বলে হরকান্ত এর হাতে চিঠি ধরিয়ে দেয়।

হরকান্ত চিঠি হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলে কয়েকবার চিঠি পড়ে তার সারমর্ম বোঝার চেষ্টা করতে থাকে।
পরিবারের সদস্যরা একদম নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
বোন মালতি চিঠি পড়ার জন্য উদ্বেগ হয়ে বারবার চিঠির উপর চোখ বোলাতে থাকে।

হরকান্ত চিঠিটি পড়া বন্ধ করে মালতির হাতে দিয়ে বলে :- এবার বুঝতে পারলাম। আপনার পরিচয় মা কেন গোপন করেছেন। আপনি মায়ের সাথে চরম বেইমানি করেছিলেন।

বাবা ভবানন্দ বলে :- সত্যিই তোমার মায়ের সাথে ভীষণভাবে অন্যায় করেছি তার প্রতিফল পদে পদে আমি পেয়েছি।

হরকান্ত তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে :- মাসিমা জবার সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কারণে কিন্তু আমার মা আপনাকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে ছিল। চিঠির বয়ান অনুসারে প্রশ্ন থেকে যায় আপনি মাসি কে বিবাহ করেছিলেন! তাহলে আমার মাসি কোথায়।

মালতি ও বুদ্ধেশ্বর ভাবে মনে :- আমার মায়ের নাম তো জবা। তাহলে হরকান্ত বড় মাসির ছেলে কিন্তু বাবা তাহলে দুই বোনকে বিয়ে করেছিল। আর হরকান্ত তাহলে আমাদের বড় দাদা।

বাবা ভবানন্দ তার ছেলে হরকান্ত কে বললেন :- তোমার মা চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর তোমার মাসি জবা তার বাপের বাড়ি থেকে পালিয়ে এই বাড়িতে চলে আসে। তারপর কালী মন্দির থেকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করেছিলাম। তোমার জবা মাসির গর্ভজাত সন্তান বুদ্ধেশ্বর ও মালতি।

তোমার মাসির অকালে রোগশয্যায় ভুগে ভুগে মৃত্যু ঘটেছে। শোনো তবে তোমার মায়ের চলে যাওয়ার পরে কি কি ঘটনা ঘটেছে।

মালতি নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলে :- তাহলে একটু চা ব্যবস্থা করি। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি আসার পর ঘটনা গুলো বলা শুরু করবেন।

কিছু সময় পর বাবা ভবানন্দ চায়ে চুমুক দিয়ে প্রফুল্ল মনে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে কে পাশে বসিয়ে তার স্ত্রী সোনালীর চলে যাওয়ার কারণ গুলো বলতে শুরু করে। 

হরকান্ত তার বাবার মুখ থেকে তার মায়ের ঘটনা শোনার পর বলে :- এই বিচ্ছিন্ন ঘটনা আপনাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আমার বাবাকে ফিরে পেয়েছি এটা আনন্দের ব্যাপার।

বুদ্ধেশ্বর তার বাবার উদ্দেশ্য করে বলে :- বাবা ও মায়ের পুনরায় একত্রিত করার বিষয়টি আমাদের উপর ছেড়ে দিন।

বাবা ভবানন্দ বলেন :- তোমাদের দুই মায়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া কথাগুলো সব বলেছি। আমি আমার দোষ স্বীকার করে নিচ্ছি। তোমরা সন্তান হয়ে আমাকে ক্ষমা কর বাবা। অন্তর দাহে কিন্তু দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে জ্বলে পুড়ে মরছি।

হরকান্ত তার জন্ম পরিচয় জানতে পেরে আনন্দিত হয়ে বাবা বাবা বলে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। 

বাবা ভবানন্দ তার সন্তানকে ফিরে পেয়ে দীর্ঘদিনের দুঃখ ভুলে জড়িয়ে ধরে আনন্দে চোখের জল ফেলতে থাকে।

হরকান্ত বলে :- আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ও সুখী মানুষ কারণ পিতৃত্বের পরিচয় লাভ করেছি। মায়ের মুখ থেকে হাজার চেষ্টা করেও পিতৃত্বের পরিচয় জানতে পারি নাই।

বাবা ভবানন্দ বলেন :- হরকান্ত তুমি আমার বড় সন্তান । সস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, তোমার মায়ের প্রতি অবহেলা ও বঞ্চনা করার জন্য তুমি জন্ম থেকেই পিতার স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। নিষ্ঠুর সমাজের বুকে তোমার মা কিন্তু তোমার বাবার পরিচয় দিতে পারোনি। আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা হরকান্ত।

হরকান্ত বলে :- বাবা, আপনি আমাকে সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছেন তার জন্য আমি ভীষণভাবে আনন্দিত কিন্তু সন্তানের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে সন্তানকে অপরাধী করবেন না। আমাকে আশীর্বাদ করবেন পিতা-মাতার মান সম্মান ও বংশের মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।

বাবা ভবানন্দ বলে :- আমাকে নিয়ে চলো তোমার মায়ের কাছে তার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। হয়তো তোমার মা আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবে না।

বুদ্ধেশ্বর তার বড়দাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে বলে :- প্রকৃতির কি নিয়ম! প্রথমে বন্ধুত্ব তারপর বেড়াতে আসা তারপর বংশ পরিচয় জানতে গিয়ে আমরা একই বাবার দুটি মায়ের পেটের আপন দাদা আর ভাই-বোন।

মালতি তার বড়দাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে :- বড় দাদা; আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চলো। আমি ঠিক বুঝি মাকে আবার সংসার নিয়ে আসবো।

হরকান্ত তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে :- মায়ের বাবার বাড়ি ঠিকানা দেবেন। আর এই মুহূর্তে হঠাৎ করে মায়ের সামনে যাওয়া কোন অবস্থায় ঠিক হবে না। ঘটনা যা শুনলাম তাতে মা কিন্তু বাবার উপর এখনো ভীষণভাবে রেগে আছে। সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বাবা ভবানন্দ বলেন :- তোমার মা চলে যাওয়ার পর থেকে তোমাদের মামা বাড়ির সাথে আমাদের আর কোন যোগাযোগ ও সম্পর্ক নেই।

হরকান্ত বলে :- দুই ভাই কিন্তু মামা বাড়িতে গিয়ে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করব, আপনি ঠিকানা বলুন।

বাবা ভবানন্দ সকাল হতেই পাড়ায় বেরিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে সগৌরবে ঘোষণা করে নিরুদ্দেশ সোনালীর গর্ভে সন্তান হরকান্ত তার প্রথম সন্তান। 

হরকান্ত কে দেখার জন্য পাড়া-প্রতিবেশী মানুষজন ভবানন্দের বাড়িতে আসতে শুরু করে ।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বাবা-মায়ের মিলনের পরিকল্পনা করতে হবে। বাবাকে সাথে নিয়ে গিয়ে মাকে চমকিয়ে দিতে হবে।

কয়েক দিন বাড়িতে থাকার পর হরকান্ত ও ছোট ভাই বুদ্ধেশ্বর কে সাথে করে মোটরসাইকেলে চড়ে তার মামা বাড়ির উঠানে উপস্থিত হয়। তারপর দুই ভাই একসাথে মামা মামা বলে ডাকতে থাকে। 

ঘরের থেকে একটা বউ বেড়িয়ে এসে বলে :- আপনারা কাকে খোঁজ করছেন।

হরকান্ত চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলে :- এই পরিবারের বয়স্ক লোকজন কোথায়! আরো এই বাড়িতে আমার আপন মামা বাস করে। আপনি নিশ্চয়ই এই বাড়ির বউ তাহলে আমাদের বৌদি। আচ্ছা মামী কোথায় গেল! মামি তোমার দুই ভাগ্নে এসেছে বলে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুরু করে।

একজন বয়স্ক বিধবা মহিলা লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উঠানে এসে দুই অচেনা যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন :- আরো হতচ্ছাড়া আমার কোন মেয়ে নেই আর এখানে তোদের কেউ কোন মামা মামি নেই। সোনালী ও জবা ছিল তারা তো কবেই মরে গিয়েছে।

হরকান্ত তার ভাই বুদ্ধেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বলে :- ঠিক জায়গায় এসে পড়েছি।

হরকান্ত বলে :- দিদিমা ; তুমি নিশ্চয়ই সোনালী ও জবার মা।

বয়স্ক মহিলা হাও মাও করে কেঁদে উঠে বলে :- আমার আর কেউ নেই আমার আর কেউ নেই, আমি কাউকে চিনি না। নিষ্ঠুর সোনালী ও জবার স্মৃতিগুলো মন থেকে মুছে ফেলেছি। এখন মরণ হলে বেঁচে যায়।

হরকান্ত ও বুদ্ধেশ্বর দুজনে বয়স্ক মহিলা কে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে হরকান্ত বলে :- দিদিমা; তোমার মেয়ে সোনালী আমার মা এখনো জীবিত আছে। আমি তার একমাত্র সন্তান হরকান্ত সাহা আর বাবা ভবানন্দ সাহা জীবিত আছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আমি তোমার ছোট মেয়ে জবার ছেলে বুদ্ধেশ্বর সাহা। মা কিন্তু আমার সাত বছর বয়সের সময় মারা গেছেন। বাবার কাছে থেকে ঠিকানা নিয়ে মামা বাড়িতে চলে এলাম।

দুই ভাইয়ের চেঁচামেচি শুনে পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। অচেনা দুই যুবককে দেখে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করতে থাকে আর দুই ভাই তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে।

সোনালী-জবার বয়স্ক মা তার দুই নাতি ছেলে কে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরে বলে :- সোনালী কোথায় আছে। মায়ের কথা কি তার একবার মনে পড়ে না! নিষ্ঠুর সোনালী। 

মামা সংবাদ শুনে তাড়াহুড়ো করে বাড়িতে এসে দুই ভাগ্নে কে পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করতে থাকে। 

হরকান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লাত হয়ে তার মায়ের নিরুদ্দেশের সময়ের চিঠি ও মায়ের সাথে তার তোলা কিছু ছবি মামার হাতে দিয়ে বলে :- এবার নিশ্চয়ই আপনার ভাগ্নেকে চিনতে পারবেন।

মামা তার দুই ভাগ্নেকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলেন :- তোমাদের জন্মের আগেই কিন্তু তোমাদের মা গৃহ ত্যাগ করেছে তা কি করে চিনবো বলো! আমারও তো ইচ্ছা হয় ভাগনা ভাগ্নিদের নিয়ে আনন্দ করতে।

মামী তার রাগ অভিমান ভুলে গিয়ে দুই ভাগ্নেকে আদর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে আপ্যায়ন করতে করতে ননদ সোনালীর আত্মত্যাগের গল্প বলতে থাকে। 

বাড়ির বড় বউ রুমে ঢুকে বলে :- দুই ঠাকুর পো স্নান করে খাওয়া দাওয়া করে তারপর বিশ্রাম করে। তারপর ঠাকুরমা শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি খাওয়া দাওয়া করে নাও।

হরকান্ত ও বুদ্ধেশ্বর দুই ভাই রাতের খাওয়া দাওয়ার শেষ করে দিদি মার ঘরে শোয়ার জন্য ঢুকে পড়ে। সোনালী বৃদ্ধ মা তার দুই নাতি ছেলেকে দুই পাশে রেখে তার দুই মেয়ে সোনালী ও জবার অতীত জীবনের ঘটনাবলী বলতে শুরু করে।

কথা প্রসঙ্গে তাদের ঠাকুমা চন্দ্রা দেবীর কলঙ্কিত অধ্যায় গুলো চলে আসে। মায়ের ঘটনা শুনতে শুনতে ভোরের পাখি ডাকতে শুরু করে তবু তাদের কাহিনী শোনা শেষ হয় না।

সকাল সাতটার সময় হরকান্ত-বুদ্ধেশ্বর এর মামিমা তাদের ঘরে ঢুকে তার শ্বাশুড়ীর উদ্দেশ্যে করে বলে :- মা, এখন গল্প বলা বন্ধ রাখুন। হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে সারাদিন নাতিদের নিয়ে গল্প শোনাতে থাকুন।

তারপর বিছানার কাছে গিয়ে দুই ভাগ্নেকে বিছানা থেকে টেনে উঠিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি চলে আয় তোদের মামা কিন্তু অপেক্ষা করে বসে আছে।

এক সপ্তাহ মামা বাড়িতে থাকার পর দুই ভাই আবার বাড়িতে ফিরে ফিরে আসে। বাবা-মায়ের পুনরায় মিলনের পরিকল্পনা তৈরি করে। তারপর দুই ভাই মিলিত হয়ে মায়ের উদ্দেশ্য রাজপতি গ্রামের দিকে রওনা দেয়।

-------------------------------------------------------
             ।। অষ্টাবিংশ (২৮) অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------
সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর দুই ভাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত মায়ের বাড়ির উঠানে উপস্থিত হয়।

হরকান্ত মোটরসাইকেল থেকে নেমে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্য করে বলে :- একান্ন ফুট সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে তারপর থাকার বাড়ি পাওয়া যাবে। 

দুই ভাই সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেট ঝাঁকি দিতে দিতে মা মা মা বলে ডাকতে থাকে।
মায়ের কোন সাড়া না পেয়ে চিন্তিত হয়ে আরো জোরে জোরে দরজা ঝাঁকাতে শুরু করে। 

কিছু সময় পর আশ্রিত বয়স্ক ঠাকুমা এসে দরজা খুলে দিয়ে বলে :- তোমার মা ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে কিন্তু পথে কোন সমস্যা হয়নি তো।

দুই ভাই তাড়াহুড়ো করে মায়ের ঘরে এসে দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছে। হরকান্ত তার মায়ের পায়ে হাত রেখে মা মা বলে ডাকতে থাকে।

মা সোনালী চমকিত হয়ে পাশ ফিরে বলে :- কে কে?

হরকান্ত বলে :- মা, আমি আর আমার বন্ধু বুদ্ধেশ্বর।

মা সোনালী দ্রুত বিছানায় উঠে বসে বুদ্ধেশ্বরের উদ্দেশ্যে বলে :- এসো বাবা, চেয়ার নিয়ে বসে পড়ে। 

হরকান্ত কে ইঙ্গিত করে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মা সোনালী বলেন :- বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে মাকে ভুলে গিয়েছিলি।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- না মা, নতুন কিছু প্রাপ্তি ঘটেছে তার জন্য আমাদের আসতে দেরি হয়ে গেছে।

মা সোনালী বলেন :- তোমাদের নতুন কি প্রাপ্তি ঘটেছে?

বুদ্ধেশ্বর হাসতে হাসতে বলে :- নতুন প্রাপ্তি বলতে, বাবা হারা হরকান্ত আমার বাবার মধ্যে নাকি তার বাবাকে কে খুঁজে পেয়েছে এবং আমি মাতৃহারা হয়ে হরকান্তের মায়ের মধ্যে আমার মাকে খুঁজতে এসেছি। মা আমাকে আপনার সন্তান বলে মেনে নেবে তো বলে প্রমাণ করে। 

মা সোনালী বিছানা থেকে নেমে বুদ্ধেশ্বর কে বুকে জড়িয়ে ধরে মাতৃস্নেহে আদর করতে করতে বলেন :- দুটোই; আমার পাগল ছেলে। মা সবার কাছে সমান।

বুদ্ধেশ্বর তার নতুন মাকে বলে :- সাত বছর বয়সের সময় থেকেই মাতৃহারা হয়েছি। 

মা সোনালী বলেন :- মায়ের ভালোবাসা ভাগাভাগি করা যায় না কিন্তু আজ থেকে তোমরা দুইজন আমার সন্তান। তোমার পরিচয় দাও।

হরকান্ত ভাবে মনে :- মা তার ভাইয়ের পরিচয় জানতে চেয়েছে কিন্তু পরিচয় দিতে গেলে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়া যাবেনা। তারপর মা রেগে গিয়ে অন্য রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

হরকান্ত বলে :- মা, সেই সকাল বেলা বন্ধুর বাড়ি থেকে তার বোন মালতির হাতে নাকে মুখে দুই মুট খেয়ে বের হয়েছি। পথ শ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি কিন্তু আগে দুটো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করো। বন্ধুর পরিচয় জানার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় আছে।

মা সোনালী বলে :- চল চল তোরা হাত-মুখে জল দিয়ে চলে আয় আর আমি খাবার দিচ্ছি। 

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির ছাদে গিয়ে দুই ভাই ছাতার নিচে বসে চারিদিকের প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- দাদা ; এই ছাদ থেকে পাহাড়ে যাওয়া যাবে। এই বাড়িটি কিন্তু পাহাড় সমান উঁচু।

হরকান্ত বলে :- চল ভাই পাহাড় ঘুরে আসি।
দুই ভাই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পাহাড়ের পাথরের উপর বসে বিশ্রাম করতে থাকে।

বুদ্ধেশ্বর প্রকৃতির সৌন্দর্য কে দেখে মুগ্ধ হয়ে
বলে :- দাদা; শহরের দূষণ ছেড়ে মুক্ত বাতাসে মুক্তভাবে বাস পাহাড়ি এলাকায়। প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে ভীষণ সুন্দর জায়গায় বসবাস করিস। 

প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরা এই অযোধ্যা পাহাড়ের পাহাড়ি মেয়েদের অপরূপ সৌন্দর্যের দেহ গঠন, পোশাক-আশাক ও চলার গতিকে আমাকে মুগ্ধ করেছে।

হরকান্ত হাসতে হাসতে বলে :- ভাই, কয়েকদিন আসতে না আসতেই পাহাড়ি মেয়েদের প্রেমে পড়ে গেলি! তা বৌমা ঠিক করে দেব নাকি?

মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই পাহাড়ি অঞ্চলের পাহাড়ি ছেলে ও মেয়েরা এখন শিক্ষিত হয়েছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠী মাধ্যমে এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভর করে তুলেছে। এমনকি উচ্চশিক্ষা লাভ করে বহু ছেলে মেয়েরা চাকরি-বাকরি করছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- দাদা, বাবা কবে আসবে।

হরকান্ত বলে :- কয়েক দিনের মধ্যেই বাবা সহ অনেক আত্মীয়-স্বজন চলে আসবে। আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপদান করতে হবে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- আর কিছুক্ষণ থাকো না দাদা।

হরকান্ত বলে :- না ভাই, চল সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তারপর আকাশ মেঘলা। একবার যদি বৃষ্টি শুরু হয় পথঘাট সব জলে জলাকার হয়ে যাবে। পাহাড়ি রাস্তায় চলাচল ভীষণ অসুবিধা হবে।

ডানদিকের এই রাস্তা ধরে গেলে একদম আমাদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছবে। তারপর পকেট থেকে প্লাস্টিক বের করে তার মধ্যে দুই ভাইয়ের মোবাইল ঢুকিয়ে ভালভাবে মুড়িয়ে সুতো দিয়ে প্লাস্টিক বেঁধে পকেটে রেখে চেন টেনে দেয়।

দুই ভাই দ্রুত বেগে চলতে থাকে কিন্তু মুষলধারায় বৃষ্টি এসে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পথঘাটে জল জমে ওঠে। পাহাড়ের একটি ঢালু রাস্তার কাছে এসে দুই ভাই দাঁড়িয়ে পড়ে।

হরকান্ত বলে :- এখন এই খাল পার হওয়া ভীষণভাবে বিপদজনক তারপর সাঁতার দিয়ে যাওয়ার সময় পাথরে আঘাত লাগলে কিন্তু জীবন শেষ। আশপাশে কোথাও কোন বাড়িঘর নেই। চল ওই পাহাড়ের গুহার মধ্যে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করি।

এক পাশে ছাদের মত পাহাড় ঝুলে আছে তার মধ্যে কিছু ফাঁকা জায়গা আছে। তিন পাশে পাহাড়ের পাথরের বড় বড় চাঙ দিয়ে ঘেরা আর সামনের দিকে কিছু অংশ খোলা। অসমতল রাস্তা দিয়ে দ্রুত দুই ভাই অন্ধকার আচ্ছন্ন গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ে। 

একজন নারী কন্ঠ বলে :- তোমরা নিশ্চয়ই বিপদে পড়ে এই গুহার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। বলে একটি গামছা এগিয়ে দিয়ে বলে মাথা শরীর মুছে ফেলো।

বুদ্ধেশ্বর ভয় পেয়ে তার দাদা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- এই নির্জন স্থানে একজন নারী ভূত নয়তো।

নারী কন্ঠ অট্টহাসিতে হাসতে হাসতে বলে :- আমি ভূত নয় মানুষ।

হরকান্ত বলে :- আপনি এখানে কি করছেন? বলে প্লাস্টিক থেকে মোবাইল বের করে আলো জ্বালায়।

নারী কন্ঠ আলোয় হরকান্ত কে দেখে বলে :- তুই মাস্টার দিদিমণি ছেলে নয়।

হরকান্ত বলে :- দিদিমা ; তুমি এখানে কেন?

বয়স্ক মহিলা বলে :- আমি সব জায়গাতেই থাকি।
চল চল বৃষ্টির গতি থেমে গিয়েছে তোদের কে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।

পাহাড়ের এলোমেলো পথে কখনো উঁচু আবার কখনো নিচু এই ভাবে চলতে চলতে কয়েক ঘন্টা পরিশ্রম করার পর বাড়ির ছাদের পাশে উপস্থিত হয়। তারপর মাকে ফোন করে গেটের চাবি খুলে তিনজনে ভিতরে প্রবেশ করে।

মা সোনালী হাঁটতে হাঁটতে হরকান্ত কে উদ্দেশ্য করে বলে :- বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একটা অসুখ বিসুখ বাঁধবি তোরা। বুদ্ধেশ্বর এই পাহাড় অঞ্চলের জল আবহাওয়া মানিয়ে নিতে পারবে না। তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে গরম কাপড় চোপড় পড়।

----------------------------------------------------------
                ।। ঊনত্রিংশ (২৯) অধ্যায় ।।
---------------------------------------------------------
এই বাড়িতে দুই ভাইয়ের প্রায় এক মাস হয়ে গেল কিন্তু আসল কথা বলব বলব করে আর বলা হয়ে ওঠেনি। এক রবিবার বিকালে হরকান্ত তার মাকে দোতলার ব্যালকনিতে বসার জায়গায় নিয়ে গিয়ে পাশে বসিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা শুরু করে।

মা সোনালী বলে :- তোর বন্ধু ঘুম থেকে উঠেছে! তাহলে চায়ের ব্যবস্থা করি।

হরকান্ত রাগ দেখিয়ে মাকে বলে :- চায়ের নেশা থেকে কিন্তু বাবার পরিচয় জানার নেশায় বেশি ধরেছে। মা তুমি কোনদিন বাবার পরিচয় দেবে না আমি কিন্তু তা নিশ্চিত হয়েছি।

মা সোনালী রাগ দেখিয়ে বলেন :- আমি কি তোর কোন অভাব পূরণ দেখেছি! বাবার এত কি প্রয়োজন আছে?

হরকান্ত বলে :- মা; তুমি কিন্তু বাবার পরিচয় বেশিদিন আমার কাছে লুকিয়ে রাখতে পারবেনা। পৃথিবীটা নাকি গোলাকার আর এই গোলক ধাঁধার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক কিন্তু একদিন আমার বাবার পরিচয় জানতে পারবো। আর সেই দিন তোমার অতীতে ঘটে যাওয়া সব কিছুই জানা যাবে। 

মা সোনালী বলে :- উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিস কেন! তোর বাবার নাম ভবানন্দ সাহা।

হরকান্ত রাগে গজগজ করতে করতে বলে :- আমার বাবা ভবানন্দ সাহা। হুগলি জেলার অচিন্ত্য পুর গ্রামে তার বসবাস করেন। আর ভবানন্দ সাহার প্রথম স্ত্রী সোনালী সাহা আমার মা। 

নদীয়া জেলার সোনাডাঙ্গা গ্রামে তার শশুর বাড়ি ছিল। শাশুড়ির নাম চন্দ্রদেবী আর বড় বৌমা সুনন্দা ও ছোট বৌমা সোনালী।

শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারধোর খেয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে বাপের বাড়িতে বসবাস। 

সন্তান লাভের আশায় তার স্বামী ভবানন্দ তার স্ত্রীর বোন জবার সাথে অবৈধ প্রেম জড়িয়ে পড়ে। বোনের ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে গিয়ে সোনালী দেবী দুই মাসের সন্তান কে পেটে ধারণ করে রাজ পতি গ্রামে পালিয়ে আসে। এইতো তোমার আর বাবার ইতিহাস।

মা সোনালী বলে :- কবি সাহিত্যিক মতো একটি গল্প বানিয়ে আমাকে প্রতারণার করার চেষ্টা করছিস। কোথায় পেয়েছিস এই সব উদ্ভট গল্প! কে বলেছে তোকে?

হরকান্ত বলে :- তাহলে আসল সত্য গল্পটা শোনাও এবং আমার বাবার ঠিকানা বলে দাও।

মা সোনালী ভাবে মনে :- তাহলে কি সবকিছুই জেনে গিয়েছে! ওর বাবার সাথে নিশ্চয়ই আলাপ হয়েছে, তা না হলে সত্য কথাগুলো জানলো কি করে?

সেই মুহূর্তে বুদ্ধেশ্বর চায়ের ট্রে করে তিন কাপ চা নিয়ে আলোচনার স্থলে উপস্থিত হয়ে আবার নিচের দিকে চলতে শুরু করে। 

মা সোনালী বলে :- বাইরের একটি ছেলে রয়েছে তার সামনে আলোচনা না করাই ভালো।

আবার বুদ্ধেশ্বর কিছু খাবার নিয়ে টেবিলে রেখে দাদার পাশে বসে পড়ে।

হরকান্ত চায়ে চুমুক দিয়ে বলে :- মা, তুমি যাকে বাইরের ছেলে মনে করছো সে কিন্তু তোমার বোন জবা মাসির সন্তান বুদ্ধেশ্বর। আর আমরা দুই মায়ের পেটের এক বাবার সন্তান।

মা সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- বহু সময় ধরে কিন্তু উল্টাপাল্টা বলে চলে ছিস কিন্তু আমার এই জগত সংসারে একমাত্র তুই ছাড়া আর কেউ নেই।

স্বামী, বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজন সব কিছুই আমার কাছে এখন মিথ্যা। বাবা বাবা করে তোর মাথা নিশ্চয় খারাপ হয়ে গেছে কিন্তু সেই বাবার জন্য আমি সংসার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তোর বাবাকে আমি ঘৃণা করি। তোর বাবা একজন স্বার্থপর মানুষের পর্যায়ে পড়ে না।

হরকান্ত তার মায়ের আরো কাছে গিয়ে বলে :- তাহলে সত্য ঘটনা কি? 

মা সোনালী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলেন :- আমি তোকে দশ মাস দশ দিন গর্ভ যন্ত্রণা ভোগ করে কিন্তু পৃথিবীর আলো দেখিয়ে লালন পালন করেছি। তার কি কোন মূল্য নেই! বাবা বাবা করে আমাকে আর পাগল করিস না বাপ।

হরকান্ত বলে :- মায়ের অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

মা সোনালী বলেন :- তোর বাবা আমার জন্য কি করেছে! ১৪ বছর তার সংসারে থেকে শুধু যন্ত্রনা ভোগ করেছি। কি সুখ শান্তি আমাকে দিয়েছে! তার পরিবারের সদস্যরা।

হরকান্ত বলে :- মায়ের পাশাপাশি একজন সন্তানের কাছে বাবার পরিচয় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মা সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলেন :- আমি তোর বাবার পরিচয় দিতে পারব না কিন্তু তোর বাবাকে যেমন ত্যাগ করেছি প্রয়োজন হলে মায়ের অবাধ্য সন্তানকে ত্যাগ করতে পারি।

বুদ্ধেশ্বর মা সোনালীর কাছে গিয়ে সান্তনা দিয়ে বলে :- মা তোমার যখন ইচ্ছা নয় তখন বাবার প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা বলে কোন লাভ নেই। তারপর হরকান্ত এর দিকে তাকিয়ে বলে :- দাদা এসব প্রসঙ্গ বাদ দে। সন্তান হয়ে মায়ের মনে দুঃখ দেওয়া আমাদের একদম উচিত হয়নি।

হরকান্ত তার কাছে লুকিয়ে রাখা ছবিগুলো নিয়ে মায়ের সামনে রেখে বলে :- মা, এই ছবিগুলো কিন্তু নিশ্চয় তুমি অস্বীকার করতে পারবে না। এই ছবিগুলোর সাথে তোমার জীবনের অতীতের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

মা সোনালী বলেন :- ছবিগুলো কোথায় পেয়েছিস।

হরকান্ত বলে :- ছবিগুলোর যে আসল মালিক তিনি আমাকে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমি আমার বাবাকে খুঁজে পেয়েছি। মা; তোমার বাবা-মা, দাদা-বৌদি ও তোমার ভাইপোদের সাথে দেখা করে সব কিছু জেনেছি। দিদিমা আমাদেরকে তোমার জীবনের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানিয়েছে। মা আর তোমার কাছ থেকে জানার কিছু নেই।

মা সোনালীর হাতের লেখা চিঠি খানা হরকান্ত তার মায়ের সামনে রেখে বলে :- এই চিঠি থেকে তোমার জীবনের ইতিহাস এবং আমার জন্ম ইতিহাস জানতে পেরে আনন্দিত হয়েছি।

দুই ভাই মায়ের কাছে থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে চলতে শুরু করে।


----------------------------------------------------------      
              ।। ত্রিংশ (৩০) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
পরের দিন মা সোনালী সকাল দশটার দিকে নিচের তলার নিজের রুমের বিছানায় বসে তার নিজের হাতের লেখা চিঠি পড়ে ভাবনার জগতে ডুবে যায়। 

চিন্তা করে তাহলে ছেলে ও বাপের মিলন ঘটেছে কিন্তু মাঝে আমাকে রাখার কি প্রয়োজন ছিল? আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে। এই ভবো সংসার থেকে বিদায় নিতে চাই। একা একা ২৫ বছর কাটিয়ে উঠতে যেখন পেরেছি তখন আর সংসার স্বামীর মায়া করে কোন লাভ নেই।

সোনালীর স্বামী ভবানন্দ ভয়ে ভয়ে চুপি চুপি দুই ছেলের কথা মতো তাদের মায়ের ঘরে ঢুকে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে আস্তে আস্তে বলে :- 
সোনালী আমার সব অপরাধ স্বীকার করছি। 
তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। বলে পা জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলতে থাকে।

সোনালী হঠাৎ করে তার পরিত্যাগ করা স্বামীর স্পর্শ পেয়ে চমকিত হয়ে পা সরিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে কয়েক হাত দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলে :- কেন এসেছ এখানে! ছেলের অধিকার পাওয়ার জন্য। আর আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে না।

ছেলে হরকান্ত আমার একার কিন্তু তোমার কোন অধিকার নেই। আনন্দের সাগরে ভেসে সাগরের নোনা জলে নৌকা ডুবিয়ে দিলে কিন্তু বাবা হওয়া যায় না। বাবা হতে হলে সন্তানের প্রতি ও তার মায়ের প্রতি অনেক দায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু তুমি তার মায়ের প্রতি কি দায়িত্ব পালন করেছে! আমি সন্তানের বাবা-মায়ের দুটি কর্তব্য সমানভাবে পালন করেছি। 

স্বামী ভবানন্দ বলে :- সন্তানের ও তোমার প্রতি কর্তব্য করার সময় তো কখনো তুমি আমাকে দাও নি। আমি কিন্তু এখনো তোমাকে ভালোবাসি। 

সোনালী উত্তেজিত হয়ে বলে :- তোমার নাটক বহু বছর ধরে দেখেছি কিন্তু আর নয়। আমি আর তোমার মুখ দেখতে চাই না।

সোনালীর দাদা-বৌদি ঘরের মধ্যে ঢুকে বলে :- আর মান অভিমান না করে সংসারে ফিরে আয়। 

সোনালির মা তার হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে আনন্দে জড়িয়ে ধরে কতনা আবেগপূর্ণ কথা বলতে শুরু করে।

সোনালী চুপচাপ থেকে ভাবতে থাকে এখন কি করা উচিত!

মালতি তার মায়ের কাছে গিয়ে প্রণাম করে বলে :- মা ; আমি তোমার ছোট বোন জবার ছোট মেয়ে।
বাবা তোমার প্রতি ভীষণভাবে অন্যায় করেছে ঠিক কিন্তু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসারে ফিরে আসে।

মা সোনালী বলেন :- তা আর সম্ভব নয়।

মালতি বলে :- তোমাকে হারিয়ে ও আমার মাকে হারিয়ে কম যন্ত্রণা ভোগ করেছে। তুমি তো এক জ্বালা ভোগ করেছে কিন্তু বাবা ত্রিতাপ জ্বালা ভোগ করেছে। আমার তিন বছর বয়সের সময় মা মারা যায় তার আগে দুই বছর রোগ আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিন্তু তৃতীয় বার বিয়ে করেননি।

ভবানন্দের মেয়ের ঘরের ছেলে দশ বছর বয়সের আশুতোষ ঘরে এসে দুই মামার মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুই মামা কানে কানে ভাগ্নে কে কিছু শিখিয়ে দেয়।

আশুতোষ বলে :- সবাই ঘরের বাইরে চলুন কারণ দাদু-দিদার মান-অভিমানের পালা বহুক্ষণ ধরে চলবে। ২৫ বছরের জং ধরা লোহা কিন্তু চৌম্বক কে আকর্ষণ করতে পারছে না। বহু সময় ধরে ঘষতে মাস্তে যদি চুম্বকের কৃপায় লোহার আকর্ষণ করে। 

আশুতোষ তার দিদা সোনালীর কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে, চিন্তা করো না বুড়োকে পছন্দ না হলে আমি তো আছি। 

তারপর উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্য করে বলে, চলুন সবাই বাহিরে যায়। তারপর দুই মামার দুই হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

ভবানন্দ বলে :- জবার মৃত্যুর আগে তোমাকে দেখতে চেয়েছিল কিন্তু বহু জায়গায় খুঁজেছি। এমন জঙ্গলময় জায়গাতে থাকবে তা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। এই পাহাড়ের মাঝে নিষ্ঠুর হয়ে আমার উপর রাগ করে ২৫ টি বছর কাটিয়ে দিলে। আমার জন্য কি একটু ভালোবাসা তোমার হৃদয়ের মাঝে নেই! কেন এই নিষ্ঠুরতা? 

দুই ছেলের বন্ধুত্বের কারণে তোমার সাথে আজ দেখা হলো। আমার সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে কিন্তু তোমার সন্তানদের কে আপন করে নাও।

সোনালী বলে :- এখন তা আর সম্ভব নয়। সবকিছুই পিছনে ফেলে এসেছি, এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। তোমার মতো তুমি চলো আর আমার মত আমি চলি।

২৫ বছর আগেই দুজনের একত্রে চলার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তোমার ছেলে হরকান্ত বাবার পরিচয় লাভ করেছে কিন্তু যা ২৫ বছর ধরে বলতে পারিনি। একমাত্র তোমার দুর্ব্যবহারের কারণে সেই কলঙ্কিত ইতিহাস আর ঘাটতে চাই না। তোমার সাথে নতুন করে মিলিত হওয়ার আমার কোন ইচ্ছা নেই।

ভবানন্দ বলে :- আমার সাথে সম্পর্ক রাখার কোন দরকার নেই কিন্তু ছেলে মেয়েদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন করবে! তাদের মায়ের চাহিদা পূরণ করো। 

সোনালী বলে :- আমি আর তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। 

ভবানন্দ বলে :- সোনালী; ২৫ বছর ধরে অপরাধের সাজা পেয়ে চলেছি আর পারছি না আবার নতুন করে তুমি আমাকে সাজা দিওনা। তাহলে আর এই জরাজীর্ণ দেহ সহ্য করতে পারবে না।

সোনালী বলে :- আমাকে কি কম সাজা দিয়েছে! স্বামী ও সন্তান সংসার থেকে বঞ্চিত করেছো। আমাকে গৃহত্যাগ করার জন্য বাধ্য করেছিল, সেই দিনের ঘটনা গুলো কোনদিন ভুলতে পারবো না।

ছেলে হরকান্ত এর বাবার পরিচয় দিতে না পারা কি যন্ত্রণাদায়ক বেদনা তা তুমি কোন দিন অনুভব করতে পারবে না! তুমি তো পুরুষ মানুষ যার হাজার অপরাধ করলে কিন্তু কোন দোষ নেই।

স্বামী থাকতে তার সাথে না থাকার কি জ্বালা তা সমাজ ব্যবস্থার মানুষ গুলো আমাকে পদে পদে বুঝিয়ে দিয়েছে। সমাজ ব্যবস্থার সাথে কঠিন লড়াই করে এখনো বেঁচে আছি।

ভবানন্দ বলে :- তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না কিন্তু ছেলে মেয়ে তো কোনো অপরাধ করেনি। অকারনে তাদের কেন সাজা দিচ্ছো! তোমার নাতি ছোট্ট শিশু আশুতোষ সে তো কোন দোষ করিনি?

একজনের দোষের কারণে সবাইকে কেন দোষী সাব্যস্ত করে, আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। 

আমার সাথে তোমার সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে না কিন্তু ছেলে-মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সংসার করে।

সোনালী বলে :- কোন প্রকার সম্ভব নয়। ভাঙ্গা মন আর জোড়া লাগাতে পারবো না। 

চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভবানন্দ বলে :- আমরা যখন তোমার কাছে মূল্যহীন থাকো তোমার অহংকার, আভিজাত্য ও ধন সম্পত্তি নিয়ে।

মানুষ মাত্রই দোষ যুক্ত। সংসারের বিভিন্ন সমস্যা আসবেই কিন্তু সেই সমস্যা আঁচলের গিট বেঁধে রাখলে কোন দিন সমস্যার সমাধান সম্ভব হয় না।

আমাকে নিয়ে যখন তোমার বহু সমস্যা তখন আমি তোমার কাছ থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবো। আর এই সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিনা।

হে ঈশ্বর; তুমি এই জগত সংসারে লীলাখেলা কিছুই দেখতে পাও না! আমাকে তুমি পৃথিবী থেকে তুলে নিয়ে জগত সংসারের মায়া মোহ থেকে উদ্ধার করে প্রভু।

সোনালী তার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে মনের সাথে লড়াই করতে করতে ভাবে :- স্বামীকে যখন দীর্ঘ ২৫ বছর পর কাছে পেয়েছি। তখন ফিরিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে! হয়তো স্বামীর সাথে ছেলে হরকান্ত চলে যাবে। 

তখন সবাইকে হারিয়ে আরো চরম দুঃখ যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। স্বামী জীবিত থাকাকালীন তাকে ত্যাগ করে সংসার জীবনে ও সমাজের মানুষের কাছে নিন্দিত হয়ে কিন্তু বহুবার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে।

ছেলে হরকান্ত এর কাছে পদে পদে অপমানিত হয়েছি। ছেলে আমার চরিত্রের উপর কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে বহুবার অপমান করে কিন্তু তার বাবার পরিচয় জানতে চেয়েছিল। 

স্বামীকে ত্যাগ করে চলে এসে কিন্তু স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা হয়েছে ঠিক কিন্তু মনের শান্তি কখনোই লাভ করতে পারেনি। যৌবনের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তান সুখ লাভ করেছি কিন্তু আবার সন্তানের দ্বারা অপমানিত হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। একজন নারীর ক্ষেত্রে সত্যিই চরম লজ্জাজনক ব্যাপার।

বয়স্ক ভবানন্দ তার স্ত্রীর হাত ধরে শেষ বারের মতো অনুরোধ করে। সোনালীর দিক থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে কিন্তু তার হাত ছেড়ে দিয়ে বিছানার থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে।

কিছু সময় ধরে বিবেকের সাথে মনের লড়াই চালিয়ে তারপর বলে :- তাহলে চলে গেলাম। ভবানন্দ তার ধুতির কোঁচা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হাঁটতে শুরু করে।

সোনালী তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে পড়ে।
দ্রুত বেগে স্বামীর সামনে গিয়ে দুহাত প্রসারিত করে পথ অবরোধ করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলে :- রাগ দেখিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে! এবার যদি দুষ্টুমি ও উল্টোপাল্টা বাজে কাজ করে, তাহলে কিন্তু এমন সাজা দেবে যে তোমার ঠাকুরদার নাম পর্যন্ত ভুলিয়ে দেবো।

ভবানন্দ তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে পেয়ে আবেগকে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন বদ্ধ অবস্থায় সুখ-দুঃখের কথা বলতে থাকে।

হঠাৎ দরজা খুলে যায় আর নাতি- নাতনিরা লাড্ডুর থালা নিয়ে ঘরে ঢুকে দাদু ও দিদার মুখে লাড্ডু পুরে দিয়ে দাদু কে বলে :- মান অভিমানের পালা শেষ হয়েছে। এবার বুড়ো কালে তোমাদের নতুন করে বাসরের ব্যবস্থা করতে হবে।

সোনালী তার নাতি নাতনি কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলে :- বাঁশের দোলায় চড়ে শেষবারের মতো বাসর ঘরে যেতে চাই। নাতি-নাতনী, পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন সবাই বলবে হরি হরি।

মালতি ও তার ননদ সহ আরো অনেকে আত্মীয়-স্বজন ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

হরকান্ত তার বোন মালতির কাছে গিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলে :- তোর ননদকে তো দেখতে পাচ্ছি না।

মালতি হাসতে হাসতে বলে :- চোখ থাকলে দেখে নে দাদা।

পিছনে থাকা মালতীর ননদ সুরেশ্বরী তার বৌদির শাড়ির আঁচলের মধ্যে দিয়ে সামনে থাকা হরকান্ত এর পেটে চিমটি কাটে। 

হরকান্ত ঘুরে দাঁড়াতে সুরেশ্বরী পাশে দাঁড়িয়ে হাতের আঙ্গুল গুলো চেপে ধরে চাপ দিতে দিতে আস্তে আস্তে বলে :- খুঁজে পেয়েছো বিয়াই মশাই। অমৃতের ভান্ড সাবধানে রাখবেন কিন্তু হারিয়ে না যায়।

মালতি চুপি চুপি তার ননদ কে বলে :- হবো বৌদি; যাতে তুমি দাদার কাছে থেকে হারিয়ে না যাও, বাবা-মাকে বলে সেই ব্যবস্থা করছি। 

বুদ্ধেশ্বর সবাইকে লাড্ডু বিতরণ করতে করতে বোনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটি লাড্ডু হাতে তুলে নিয়ে সুরেশ্বরীর মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে :- আজ থেকে কিন্তু আর বিয়ান নয় বৌদি বলেই ডাকবো।

----------------------------------------------------------
          ।। একত্রিংশ (৩১) অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
মাস্টার দিদিমনির পরিবারের সদস্যদের সাথে পূর্ণ মিলনের সংবাদ পেয়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। বহু মানুষের আওয়াজ শুনে সোনালী দেবী ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। সাথে সাথে তার পরিবারের লোকজন আত্মীয়-স্বজন নিচে নেমে আসে। 

সোনালী দেবী বাইরে আসতেই গ্রামবাসী কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে ওঠে :- মাস্টার দিদি মনি; আপনাকে যেতে দেবো না। আপনি আমাদের গ্রামের একদিকে অন্নদাতা রূপে লক্ষ্মী দেবী আবার অন্যদিকে শিক্ষার জ্ঞান বিস্তার লাভের সরস্বতী দেবী। আপনি আমাদের গ্রামের উন্নয়ন কর্তা, যা কোন দেশের শাসক করেননি। আপনার কঠিন লড়াইয়ের আমরা সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

সোনালী দেবী বলে :- আপনাদের ভালবাসার কারণে রাজপতি গ্রাম ছেড়ে স্বর্গে গেলেও সুখ পাবো না। আপনাদের সবার সাথে আমি এই গ্রামে থাকবো।

আপনারা যখন কৃপা করে আমার বাড়িতে এসেছেন তখন কিন্তু সবাই মিষ্টি মুখ ও খাওয়া-দাওয়া করে তারপর যাবেন।

প্রাক্তন স্কুল মাস্টার সোনালীর সামনে এসে হাসতে হাসতে বলে :- কোন উৎসব নেই পার্বণ নেই তা আপনার বাড়িতে আমরা খাওয়া-দাওয়া করব কেন?

সোনালী বলে :- আপনার তো শুধু আমার প্রতিবেশী না, আত্মার আত্মীয়-স্বজনের গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে জড়িত আছেন।

প্রাক্তন মাস্টারমশাই বলেন :- তাহলে; এই শুভক্ষণে আমার একটা প্রস্তাব আছে।

সোনালী বলে :- বলুন মাস্টারমশাই।

প্রাক্তন মাস্টারমশাই বলেন :- আমার দুটি মেয়ের মধ্যে মা মরা একটি মেয়ে এখনো অবিবাহিত আছে । আমার ছোট মেয়ে কল্যাণী কে আপনার বড় বৌমা করলে খুব আনন্দিত হতাম।

উপস্থিত জনসাধারণ একসাথে বলে ওঠে :- উত্তম প্রস্তাব সাথে সাথে মায়েরা উলুধ্বনি দিতে শুরু করে।

সুরেশ্বরী মুখ কালো করে লোকজন থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে সব কিছু উলটপালট হয়ে যাবে না তো। আমি হরকান্ত কে ভালোবাসি কিন্তু এর মাঝে আবার পাহাড়ি মেয়েটা চলে আসছে কেন! তাহলে হরকান্ত তার মাকে আমার বিষয়ে কিছু বলেনি কিন্তু বৌদি মালতি সবই জানে। বৌদির সাথে কথা বলে দেখি।

আবার মাস্টার মহাশয় মেয়ে কল্যাণী মুখ কালো করে বুদ্ধেশ্বরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। ভালোবাসা করলাম বুদ্ধেশ্বর এর সাথে আর বিয়ে করতে হবে তার দাদা ভাসুরের সাথে তা কিন্তু কখনোই সম্ভব না। দরকার হলে বিয়ে করবো না।

বুদ্ধেশ্বর তার মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলে :- দাদা কিন্তু আগে থেকেই বৌদি দেখে রেখেছে এবং এখানে উপস্থিত আছেন।

মা সোনালী বলে :- কে! পরিচয় কি?

বুদ্ধেশ্বর বলে :- বোন মালতির কাকা শ্বশুরের মেয়ে সুরেশ্বরীর সাথে কয়েক বছর ধরে ভালোবাসা চলছে।

মা সোনালী বলেন :- আচ্ছা; তা তোমার কি বৌমা পছন্দ করা আছে।

বুদ্ধেশ্বর বলে :- হ্যাঁ মা। ওই মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে কল্যাণীর সাথে এখানে এসে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়েছে। আমি কল্যাণী কে ভীষণভাবে ভালবাসি এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।

মালতি তার মায়ের কাছে এসে হাত ধরে বলে :- আমার ননদ কে তুমি মেনে নিয়ে বৌমা করে। তোমার জামাই তার বোনকে বিয়ে দিতে রাজি আছে। যদি বিয়ে দিতে রাজি থাকো তাহলে কাকা শ্বশুর কে ফোন করে এখানে আসার জন্য বলছি।

মা সোনালী বলে :- যদি তোর কাকা শশুর মেনে না নেই।

মালতি বলে :- দাদার মতো ছেলের সাথে বিয়ে দেবে না, আমি সব ব্যবস্থা করে দেবে। মা তুমি শুধু রাজি হয়ে যাও।

সোনালী দেবী ফিরে এসে মাস্টার মশাইয়ের হাত ধরে বলেন :- আপনার প্রস্তাব মেনে নিলাম কিন্তু আমার ছোট ছেলের সাথে আপনার মেয়ে কল্যাণী বিয়ের ব্যবস্থা করুন।

বাড়ির বয়স্ক মাসিমা বলেন :- সোনালী; বড় ছেলে বাদ দিয়ে ছোট ছেলের বিয়ে আগে কি করে হবে?

মালতির স্বামী তার স্ত্রীকে সাথে করে সবার সামনে এসে বলে :- তাহলে দুই দাদার বিয়ে খেয়ে তারপরে বাড়ি যাবো।

মালতি বলে :- তাহলে বড় দাদার বিয়ে কার সাথে হচ্ছে।

মালতির স্বামী অজয় তার শাশুড়ি সামনে গিয়ে হাত জোড় করে বলে :- মা; আমার বোনকে হরকান্ত এর সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখছি, আশা করি নিরাশ করবেন না। আমার কাকার সাথে ফোনের মাধ্যমে কথা বলেছি, তিনি রাজি আছেন কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান অচিন্তপুরের বাড়িতে করতে হবে।

সোনালী মাথা চুলকাতে চুলকাতে তার স্বামী ভবানন্দের সামনে দাঁড়িয়ে বলে :- তোমার বড় ছেলের বিয়ের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

ভবানন্দ বলে :- সোনালী ; তুমি কিন্তু আগে সংসারের অভিভাবক হিসেবে সকল দায়িত্ব পালন করেছিলে, বর্তমানে সংসারের প্রধান অভিভাবক। তোমার সিদ্ধান্তই আমি মাথা পেতে গ্রহণ করব। তোমার কাছে আবার নতুন করে শরণাগত হলাম।

সোনালী বলে বড় ছেলে সুরেশ্বরী ও ছোট ছেলে কল্যাণী সাথে বিয়ে হবে কিন্তু দুই বাড়িতে দুই ছেলের বিয়ে দিতে চাই।

বাবা ভবানন্দ সবার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বলেন :- সবাই কৃপা বসুন।

মালতি ও তার স্বামী আনন্দিত হয়ে সবাইকে লাড্ডু বিতরণ করতে থাকে।

পাড়ার একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তার পুঁথি পত্র বগলে করে সোনালীর সামনে এসে পঞ্জিকা খুলে দেখতে দেখতে বলেন :- মাস্টার দিদিমণি আজ গোধূলি লগ্নে বিয়ের দিন আছে।

সোনালী বলে :- এক মাস পরে বড় ছেলের বিয়ের তারিখ দেখুন। তারপর এক মাস বাদ দিয়ে পরের মাসে ছোট ছেলের বিয়ের তারিখ দেখুন।

ব্রাহ্মণ পন্ডিত মশাইয়ের সাথে আলোচনা করে দুটি বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। 

জরুরী তৎপরতায় মুদিখানা থেকে জিনিসপত্র ও কাঁচা সবজি নিয়ে এসে উঠানের এক কোণে গ্রামবাসীর কিছু মহিলা ও পুরুষ মিলিত হয়ে ডিম ভাত, সয়াবিনের তরকারি, মসুর ডাল ও ভাজা রান্নার আয়োজন শুরু করেছে।

কিশোর আশুতোষ তার দিদি মার কোলে উঠে সোনালী কে জড়িয়ে ধরে বলে :- বন্ধুগণ, ছেলে মেয়েদের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল কিন্তু আমাদের দিনক্ষণ কবে হবে গো।

সোনালী তার নাতি আশুতোষ কে জড়িয়ে ধরে বলে :- ওরে আমার দুষ্টু মিষ্টি নতুন বর, তোমার জন্য আমি সবসময় আছি। বউমা বরণ ডালা সাজিয়ে ধান দুবা দিয়ে তোমাদের নতুন শ্বশুরকে ঘরে তোলো।

বাড়ির বয়স্ক মাসিমা বলেন :- দুই নাতি বউ এদিকে আসো আর নাতি ছেলের পাশে দাঁড়াও। সবাই মিলে আজকের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ছবি তোলা হবে। এই ক্যামেরাম্যান ছবি তোল।

গ্রামবাসীরা আনন্দ উল্লাসে হেসে ওঠে । বেজে ওঠে ঢাকঢোল আর মাদল। শুরু হয় এলাকার ঐতিহ্য পূর্ণ নারী ও পুরুষের আদিবাসী নৃত্যকলার নাচ-গানের আসর।

কল্যাণী ও সুরেশ্বরী তার শাশুড়ির কাছে এসে প্রণাম করে।

সোনালী তার স্বামীকে দেখিয়ে বলে :- শশুর মশাই কে আগে প্রণাম করে এসো।

দুই ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার পর ভবানন্দ তার বড় ছেলের কাছে রাজ পতি গ্রাম থেকে যায়।

সোনালী ও ভবানন্দ দুই ছেলে ও বৌমার উদ্দেশ্য করে বলেন :- দুই ছেলে বৌমার কাছে দুই বাড়িতে কয়েক মাস করে থাকবে কিন্তু সংসারের সব দায়িত্ব তোমাদের দুজনকে বুঝে নিতে হবে।

বাবা ভবানন্দ তার দুই ছেলে ও বৌমা কে পাশে বসিয়ে বলেন :- ধন সম্পত্তি টাকা-পয়সা স্থাবর অস্থাবর সব কিছু তোমাদের তিন ভাই বোনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে। কারণ আমার দাদা বৌদির মত সম্পত্তি নিয়ে খুনাখুনি না করতে হয়। সম্পত্তির জন্য আমার দাদা বৌদি বাবাকে খুন করেছিল।

ভবানন্দের ছোট ছেলে বুদ্ধেশ্বর তার স্ত্রী কল্যানী কে নিয়ে তাদের বাড়িতে ফিরে যায়।


রচনাকাল তারিখ :- 14 জানুয়ারি 2018 থেকে 26 ডিসেম্বর 2018 সাল। লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস।
দত্তপুলিয়া বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে লেখা।

তৃতীয় বার সংশোধনের তারিখ :- ১৫/০1/২০২২ থেকে 20/06/22 পর্যন্ত। 
------------------------------------------------
                ।। উপন্যাস সমাপ্ত ।।
------------------------------------------------

অনলাইনে খোঁজ করলে লেখক শংকর হালদার শৈলবালার ছাপানো বই ও পিডিএফ ফাইল পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক বৃহত্তম সাহিত্য অ্যাপস অনলাইন "প্রতিলিপি" সাহিত্য জগতের মাধ্যমে লেখকের রচয়িত সমস্ত ধরনের গল্প , উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। 
-------------------------------------------------------------------



লেখকের রচিত ১৪টি উপন্যাস। 

 প্রথম রচিত উপন্যাস "চরিত্রহীন সদাশিবের প্রেম" ১ লাখ ২৭ হাজার শব্দ।

দ্বিতীয় রচিত উপন্যাস :- সন্তানহীন নারী লাঞ্ছিত।

তৃতীয় রচিত উপন্যাস :- আম্রপালী বারবনিতা।

চতুর্থ রচিত উপন্যাস :- পরকীয়া প্রেমের জ্বালা।

পঞ্চম রচিত উপন্যাস :- সমাজের অন্তরালে চোরাস্রোত।

ষষ্ঠ রচিত উপন্যাস :- পুরুষ পতিতালয়ের প্রেম।

সপ্তম রচিত উপন্যাস :- অবৈধ প্রেমের পরিণতি। ছোট উপন্যাস।

অষ্টম রচিত উপন্যাস :- গঙ্গাসাগর সঙ্গমে। ছোট উপন্যাস।

নবম রচিত উপন্যাস :- ধর্ষিতার লড়াই।

দশ রচিত উপন্যাস :- শনিদেব ক্রোধিত কেন?

একাদশ রচিত উপন্যাস :- জীবন চক্রের খেলা।

দ্বাদশ রচিত উপন্যাস :- চরিত্র বোঝা দায়। ছোট উপন্যাস
 
ত্রয়োদশ রচিত উপন্যাস :- কল্প বিজ্ঞানের কল্পনা। অসম্পূর্ণ।

চতুর্দশ রচিত উপন্যাস :- তৃতীয় লিঙ্গের ভালোবাসার সন্তান।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

।। লেখকের গল্পের তালিকা ।।

(১) পরকীয়ার টানে স্বামী খুন।
(২) আতঙ্কিত সমাজ।
(৩) বিদ্রোহিনী নারী।
(৪) বৌমার অত্যাচার শাশুড়ির।
(৫) চুক্তিবদ্ধ স্বামী বেস্যা।
(৬) স্বামীর খুনি লীলাবতী।
(৭) পতিতা থেকে গৃহবধূ।
(৮) ধর্মের নামে পাপ ক্ষয়।
(৯) অযাচিত প্রেম।
(১০) অধৈর্য বিপদজনক।
(১১) বিষবৃক্ষের অন্তরালে।
(১২) কোটিপতি ভিখারীর প্রেম।
(১৩) নারীর পরাধীনতা।
(১৪) সেক্ম নিয়ে ভাবনা।
(১৫) সেক্মের কারণে পতিতা।
(১৬) জাতিস্মর মালতি।
(১৭) দুঃখময় পরিস্থিতি।
(১৮) ছেলের হাতে বাবা খুন।
(১৯) বসন্তের লাল ওড়না।
(২০) বন্দিদশায়।
(২১) ধর্ষণকারী বিচারক।
(২২) পরশ্রীকাতরতা।
(২৩) সতিদাহ।
(২৪) জীবনের স্বপ্ন নিন্ম বর্ণের।
(২৫) নারীর কারণে আত্মহত্যা।
(২৬) দারিদ্র্যতার স্বপ্ন ভঙ্গ।
(২৭) হৃদয়ে ভালোবাসা নেই।
(২৮) যুবতীর আত্ননাথ।
(২৯) বৌ নয়নের মনি।
(৩০) প্রতারনার মাধ্যমে বিয়ে।
(৩১) কেন খুন করে বাবা কে?
(৩২) হৃদয়ের টানে বৃন্দাবন কাঁপে।
(৩৩) ধর্ষিতার স্বামী।
(৩৪) কিশোরী যৌনকর্মী রুবিনা।

আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক গল্প।
(৩৫-১) বজ্রাঙ্গার সাধনা । 
(৩৬-২) দ্বৈতরাজ তারকের স্বর্গ রাজা।
(৩৭-৩) কার্তিকের জন্ম রহস্য
(৩৮-৪) স্বর্গের দ্বৈত রাজা তারক বধ।
(৩৯-৫) স্তন্যের কারণে বেলের সৃষ্টি
(৪০-৬) গণেশের রোমান্টিক জন্ম।
(৪১-৭) শ্রী কৃষ্ণের ফুল দান।
(৪২-৮) বাইজি লক্ষহীরা।
(৪৩-৯) নিশি রাতে প্রেমের বাঁধা।
(৪৪-১০) পরিত্যক্ত কর্ণ।
(৪৫-১১) অহংকার চূর্ণ।
(৪৬-১২) অহংকার পতনের মূল।
(৪৭-১৩) ত্যাগেই শান্তি।
(৪৮-১৪) বঞ্চিত নারী।
(৪৯-১৫) চাওয়া-পাওয়া।
(৫০-১৬) কর্মের সাফল্য।
(৫১-১৭) জামাই ষষ্ঠীর গল্প।
(৫২-১৮) কাম ও ক্রোধ।
(৫৩-১৯) ভক্তের ভক্তি।
(৫৪-২০) বক ধার্মিক।
(৫৫-২১) দানের বদলে দান।
(৫৬-২২) স্বার্থের ব্যাঘাত।
(৫৭-২৩) স্বার্থপর মা।
(৫৮-২৪) অহেলা বঞ্চিত নারী।
(৫৯-২৫) গৃহ সন্ন্যাস।

রুপকথার গল্প।
(৬০-১) অসম্পূর্ণ নারী । 

অনুগল্প।
(৬১-১) আঠারো শব্দের গল্প। 
(৬২-২) বৌদির ঝগড়া।
(৬৩-৩) কেউ মুক্ত নয়।
(৬৪-৪) অন্তরীক্ষ।
(৬৫-৫) হাটে গুড় বিক্রি।
(৬৬-৬) কলার হিসাব।

শিক্ষা মূলক গল্প।
(৬৭-১) সাধুর চোরাবৃত্তি। 
(৬৮-২) সত্যি বলা পাপ।
(৬৯-৩) জামাই আদর।

হাসির গল্প।
(৭০-১) বাপের শাল-শ্বশুরের জুতা।
(৭১-২) গুরুদেবের ইলিশ সেবা। 
(৭২-৩) পেটুক হরিবল।

ঐতিহাসিক গল্প।
(৭৩-১) ট্রেনের টয়লেট।

ভৌতিক গল্প।
(৭৪-১) পেত্নী বৌয়ের প্রতিশোধ। বড় গল্প।
(৭৫-২) রাতের আতঙ্ক।
(৭৬-৩) ভয়ানক ভুতের নাচ।
(৭৭-৪) নীলকুঠি ভূতের বাড়ি।
(৭৮-৫) ভৌতিক দুর্বলতা ।
৭৯-৬) জ্যান্ত ভূতের অভিযান।
(৮০-৭) ভুতের দেখা।

বিভিন্ন লেখকদের জীবনী মূলক গল্প।
(৮১-১) চন্দ্রাবতীর ভালোবাসা যখন ব্যর্থ
(৮২-২) সুন্দর বনের দারিদ্র্যতা।
(৮৩-৩) রবিরামের জীবন যুদ্ধ।
(৮৪-৪) স্নেহাশীষ দত্তক সন্তান।
(৮৫-৫) খুশি কেন অবহেলিত।


ভ্রমণ কাহিনী।
( ৮৬-১) গয়া পিন্ডদান।

লেখকের জীবন সম্পর্কে জানতে হলে পড়তে হবে। লেখষকের অন্বেষণে আত্মজীবনী দ্বিতীয় খন্ড বই।

       ।। লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী ।।













কবিতা মালা, ২০২৫ (কবিতা সমগ্র)

 কবিতা মালা, ২০২৫                      লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা  সূচিপত্র   (১) নতুন বছর ২৫  (২) নতুন বছরের শুভেচ্ছা (৩) কালের গহীনে (৪) ব...