মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২

।। গয়া পিন্ডদান ।।( গল্পের মাধ্যমে ভ্রমণ কাহিনী।)

        ।। গয়া পিন্ডদান ।।
( গল্পের মাধ্যমে ভ্রমণ কাহিনী।)

লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
রচনাকাল :- ৯ জানুয়ারী  ২০২০ সালে।
-------------------------------------------------------------------
দিনে গয়ার পান্ডাদের দৌরাত্ম্যে টাকা চোষে নেওয়া আর রাতে মশার কামড়ে রক্ত চোষা দুই সমান সমান। গয়া পিন্ডদান ও ভ্রমণ করতে গিয়ে দুয়ের হাত থেকে সাবধানে থাকতে হবে। না হলে সব কিছু হারিয়ে ভিখারীর মতো বাড়িতে ফিরতে হবে। পান্ডাদের সাথে সব সময় টাকা পয়সার ব্যাপারে সত্য কথা বলা যাবে না।  ভালো পান্ডা নেই তা বলবো না কিন্তু খুবই সীমিত ।

গয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ০৫/০১/২০২০ সালে দত্তপুলিয়া থেকে সন্ধ্যা ছয়টার সময়ে আমি শংকর হালদার, নিপেন বিশ্বাস, নিপেনের  স্ত্রী কল্পনা, দশ বছর বয়স ছেলে ও নিপেনের শাশুড়ি মোট পাঁচ জন   রওনা দিলাম। ট্রেনের রিজার্ভিশন টিকিট করা ছিল। 
দত্তপুলিয়া থেকে আড়াংঘাট স্টেশন।  আড়ংঘাটা স্টেশন থেকে গেদে থেকে শিয়ালদহ গামী ট্রেনে চড়ে শিয়ালদা স্টেশন জংশন তারপর বাসে করে হাওড়া  জংশন। হাওড়া জংশন থেকে রাত্রি 11টা 45 মিনিটে গয়া যাওয়ার ট্রেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটে বসা তারপর খাওয়া দাওয়া করে ঘুম দেওয়া। পরের দিন ভোর পাঁচটার সময়ে গয়া জংশনে ট্রেন থেকে নেমে এক পাশে  দাঁড়াতেই, চারিদিক থেকে গয়ার পান্ডারা ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে থাকে।

পান্ডারা একসাথে প্রশ্ন করতে থাকে :- আপনার পান্ডা কে ?

শংকর হালদার বলে :- ভারত সেবাশ্রম সংঘ।

একজন পান্টা বলে :- পিন্ড দেওয়া কাজ করবেন  ?

নিপেন বিশ্বাস বলে :- হ্যাঁ করবো ।

টানাটানি শুরু করে তারপর একজন তো টানতে টানতে গাড়িতে উঠাই ।  পান্ডারা  এত পরিমাণ বিরক্ত করে  মনে হয়েছিল এখান থেকে পালাতে পারলে ভালো হয় । 

অটো চালক কিছুক্ষণ এ গলি সে গলি ঘুরিয়ে এক লাল রঙের বিল্ডিং এর সামনে নামিয়ে দিয়ে বলে :- আসল ভারত সেবা আশ্রম  পাঁচজন মিলে ৫০ টাকা দেবেন। গাড়ীতে সাথে এক পান্ডা আসে ।

পান্ডা বলে :- যান মহারাজের  কথা বলুন ।

শংকর হালদার এগিয়ে মহারাজের রুমে গিয়ে বলে :- হরে কৃষ্ণ , মহারাজ আমার চারজন লোক আছে। আপনাদের কমিশন পদ্ধতি কি বলুন?

লাল কাপড় ব্যবহারকারী মহারাজ বলেন :- আপনি কি লোক নিয়ে আসেন?

শংকর হালদার বলে ;- মাসে একবার করে এই গয়া ধামে আসা-যাওয়া চলতে থাকে। গঙ্গা আশ্রম থেকে সমস্ত কাজ করিয়ে থাকি।

মহারাজ বলেন :- আপনাকে শতকরা ৫০ টাকা কমিশন দেওয়া হবে। আমাদের সাথে কাজ করুন ।

শংকর হালদার বলে :- অনেক কম হয়ে যাচ্ছে।

মহারাজ বলে :- আমাদের খরচ আছে। আপনাকে আরো শতকরা ১০ টাকা বাড়িয়ে দিলাম কিন্তু পিন্ড দানকারী ব্যক্তিদের সাথে যখন কথা বলবো, আপনি কোন কথা বলবেন না । পাঁচ হাজার নিতে পারলে কিন্তু আপনার তিন হাজার টাকা পেয়ে যাবেন।
থাকার জন্য রুম দেওয়া হবে কিন্তু সন্ধো পযন্ত থাকতে পারবেন। পুরোহিতের দক্ষিণা আলাদাভাবে  দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথাকোথনের মাঝে নিপেন অফিস রুমের মধ্যে চলে আসে।

নিপেন বলে :- আপনি মহারাজ না কসাই। শংকরদা  চলে লজ ভাড়া করে থাকবে আর চুক্তিবদ্ধ হতে হবে না। আমি তোমার কমিশন দিয়ে দেবো।  

আশ্রম থেকে অন্য কোথাও যেতে দেবে না। তাদের কথা পিন্ডদান যখন করতে এসেছো তখন কাজ আমরা করবো। আমাদের কে ঘিরে ধরে রাখে। 
তর্ক-বিতর্ক করতে করতে এক প্রকার জোর করে উক্ত আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়া হয়। উক্ত পান্ডারা বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখাতে থাকে -  - - - - - - - - - -  ।

রাস্তায় বেরিয়ে সবাই কিছু দূর হেঁটে যাওয়ার পর এক গাছের তলায় চায়ের দোকানে সবাই বসে পড়ে।
চা বিস্কুট খাওয়ার পর শংকর ও নিপেন একটু আড়ালে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় ধুমা দিতে থাকে। হঠাৎ শংকর মোবাইল হাতে নিয়ে তার বন্ধু মাঝদিয়ার দেবানন্দ গোস্বামী কে ফোন করে গয়ার ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ জানাই।

দেবানন্দ গোস্বামী বলেন :- ভারত সেবাশ্রম সঙঘ আশ্রমে যা, তাহলে আর কোন বিপদ নেই। গয়া স্টেশনের পাশেই তাদের অফিস আছে। আশ্রমের এক পান্ডার ফোন নম্বর দেয়।

উক্ত নম্বরে ফোন করে কথা বলে গাড়ি ধরার জন্য আরো কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়াতেই এক ম্যাজিক গাড়ির চালক হিন্দি ভাষায় বলে :- कहां जा रहा है? (আপনি কোথায় যাবেন?)

নিপেন বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বলে :- আসল ভারত সেবাশ্রম সংঘ যেতে চাই।

গাড়ি চালক বাংলা ভাষায় বলে :- বসুন আর পাঁচ জনের ১৬০ টাকা ভাড়া লাগবে।

নিপেন বলে :- আসল আশ্রমে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু সঠিক জায়গায় না পৌঁছলে একটি টাকা দেবো না।

গাড়ি চালক বলেন :- আপনাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছিয়ে দেবো। নিশ্চিত মনে আমার গাড়িতে বসতে পারেন। আমি বিহারী হলেও কিন্তু গয়ার পান্ডাদের মত নয়। আমি বাঙ্গালীদের কে ভীষণ ভালোবাসি কারণ আমার স্ত্রী একজন খাঁটি বাঙালি।

গয়া শহরের মধ্য দিয়ে এ রাস্তা সে রাস্তা পার হয়ে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে গাড়ি চলার পর গাড়ির কমিয়ে একটি বড় প্রকাণ্ড বড় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

গাড়ি চালক বলেন :-  দাদা, আপনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গিয়েছি। বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে দেখে নিন ভারত সেবাশ্রম সঙঘ ।

শংকর বলে :- ঠিক আছে দাদা ঠিক আছে।

নিপেন গাড়ীর চালক কে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে বলে :- আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাব আপনাকে ফোন করবো।

গাড়ি থেকে ব্যাগ পত্র নিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করে অফিসের বারান্দায় ব্যাগ পত্র রেখে একটি বেঞ্চের উপর সবাই বসে পড়ে।

নিপেন ও শংকর মহারাজ কাছে যাবে ভাবছে এমণ সময়ে আশ্রমের এক জন সেবক কাছে এসে বলেন :- আজ পিন্ড দান করতে হলে প্রথমে আশ্রমের রেজিস্টেশন করতে হবে। জিনিসপত্র এখানে থাক কোন অসুবিধা নেই তাড়াতাড়ি রেজিস্ট্রেশন ও ঘর বুক করে ফেলুন।

শংকর ও নিপেন মহারাজের অফিস রুমে ঢুকে চেয়ার নিয়ে বসে পড়ে।

আশ্রমের মহারাজ বলেন :- আধার কার্ডের জেরেক্স ও ফোন নাম্বার দেবেন।

আশ্রমের মহারাজ আধার কার্ডের জেরক্সের  অপর দিকে খসড়া হিসাবে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার কয়জন সাথে আছে তাদের নাম ইত্যাদি ইত্যাদি, বিস্তারিত লিখতে থাকে।

নিপেন বলে খরচ কেমন হবে সে বিষয়ে কিছু বলুন।

মহারাজ তাদের আশ্রমের নিরাপত্তা সম্পর্কে ছোট্ট করে বক্তৃতা রাখার পর বলেন :- প্রতিদিন একটি রুম ব্যবহার করার জন্য পাঁচ শত করে দিতে হবে। পাঁচজন একসাথে থাকতে পারলে থাকবেন। পিন্ডদান কারিদের একবার দুপুরের খাবার বিনামূল্য পাবেন। রাতের খাবারের জন্য মাথাপিছু ত্রিশ টাকা করে আগে বুকিং করতে হবে। বুকিং না করলে খাবার পাওয়া যাবে না। আর যদি মনে করেন আরো কয়েকদিন থাকবেন সে ক্ষেত্রে প্রতিদিনের ঘর ভাড়া দিতে হবে কিন্তু খাবারের কোন ব্যবস্থা থাকবে না বাইরে থেকে খাবার খেয়ে আসতে হবে।

নিপেন বলে :- পিন্ডদান করতে খরচ কেমন পড়বে।

মহারাজ বলেন :- পিন্ডদান দেওয়ার জন্য একজন পুরোহিত আপনার সাথে দেওয়া হবে। গাড়ি ভাড়া সহ অন্যান্য খরচ সব আপনাকে বহন করতে হবে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে মহারাজ বলল ওই বট গাছের নিচেই টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে অস্থায়ী অফিস করেছে সেখানে গিয়ে পিণ্ডদান কারীদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। নাম রেজিস্ট্রেশন করতে মাথাপিছু ৩৫০ টাকা জমা দিতে হবে আর পুরোহিতের দক্ষিণা হিসেবে দুইশত টাকা দেবে।
এছাড়াও বিষ্ণু মন্দিরে পান্ডাদের দান দক্ষিণা করবেন আর  যেখানেই যা লাগবে তা আপনার নিজের খরচ ।

শংকর ভাবে মনে :- ভারত সেবাশ্রম সঙঘ আশ্রমের বক্তব্য অনুসারে বোঝা যাচ্ছে ঘর ভাড়ার নাম করে কায়দা করে তাদের ব্যবসা ঠিক রেখেছে। কারণ পিন্ডদান করার সময় পান্ডাদের হাত থেকে নিজেকেই নিজে বাঁচাতে হবে। পুরোহিত কোন দায়িত্ব নেবেন না শুধু পিণ্ডদানের ব্যাপারে পুরোহিতের কাজ করবেন। 

টাকা পয়সা জমা দিয়ে নির্দিষ্ট রুমে সবাই উপস্থিত হয় ‌। নাপিতির কাছে থেকে নিপেন  মাথামুণ্ডন করে । স্নানাদি করে নতুন বস্ত্র পড়ে অফিস রুমের সামনে উপস্থিত হয়ে পাশে থাকা মন্দিরে প্রণাম করে খোলা আকাশের মেঘের উপর বসে পড়ে। তখন বিভিন্ন রকম উপদেশ মূলক ও মাহাত্ম্য মহারাজের বক্তৃতা চলছে। মহারাজ তার বক্তৃতা শেষ করে পিন্ডদানকারীদের এক এক করে ডাকতে শুরু করেন। অপেক্ষা করতে করতে এক সময় নিপেনের ডাক আসে। নৃপেন মহারাজের সামনে গিয়ে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে পড়ে।

মহারাজ বলেন :- পিন্ডদান করতে দুই রকম প্যাকেজের ব্যবস্থা আছে। স্পেশাল প্যাকেজের দাম ২০০০ টাকা।  সুবিধাগুলো দুজন পুরোহিত গীতা পাঠ করবেন এবং পিণ্ড দানের সময় মন্ত্র উচ্চারণ করবেন আর সাধারণ প্যাকেজে দাম ১ হাজার টাকা। সুবিধা গুলো একজন পুরোহিত গীতা পাঠ করবেন। পিন্ডদানকারীদের সবার ক্ষেত্রে মাথাপিছু রেজিস্ট্রেশন ফি ৩৫০ টাকা সবাইকে জমা দিতে হবে।

নৃপেন বলে :- মহারাজ, আমাকে সাধারণ প্যাকেজ দিন।
১০০০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর মহারাজ বলেন সামনে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন। আবার রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয় তারপর একসময় রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেয়।

প্রায়ই আধাঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর নিপেনের পিন্ডদানকারী পান্ডা এসে বলেন আপনারা তৈরি হয়ে নিন। 
নৃপেন বলে :- কত জন পেলেন।
পান্ডা বলেন :- ৮ জন পেয়েছি।

পান্ডার সাথে কথা বলে জানা যায় ৩৫০ টাকা থেকে পুরোহিত পাবে ব্যক্তিগত ৫০ টাকা আর পূজা সামগ্রী ভাড়া নেওয়ার জন্য ৫০ টাকা। এছাড়াও পিন্ডদানকারী নদিয়া জেলার বাসিন্দা হওয়ার কারণে নদীয়া জেলার মূল পান্ডা উক্ত টাকা থেকে ভাগ পাবেন। আশ্রমের মহারাজের অনুমতি নিয়ে সবাই গেটের সম্মুখে আসে এবং ভাগাভাগি করে বড় ধরনের ম্যাজিক গাড়ি ভাড়া করা হয়। প্রত্যেকের মাথাপিছু ২৫০ টাকা করে গাড়ি ভাড়া ধরা হয়।

পিন্ডদানকারী সবাই গাড়িতে উঠে বসে, চালক গাড়ি চালিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে।

এক সময় গাড়ী বিষ্ণু মন্দির এলাকার মধ্যেই উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

পুরোহিত বলেন :- আপনারা এখানেই থাকবেন  আমি পূজার  ফুল ও ধুপকাঠি নিয়ে আসছি। 

বিভিন্ন পান্ডারা এসে বলেন :- কোন জেলার বাসিন্দা এবং আপনাদের পান্ডা কে ? বাবার নাম, ঠাকুর দাদার নাম, আপনার নাম ও ঠিকানা বলুন।  আগে কি বাংলাদেশ বাড়ি ছিল, থাকলে কোন জেলা ইত্যাদি ইত্যাদি খাতায় নোট করে নেয়।

এরকম বহু পান্ডা আসে আর নোট করে নিয়ে চলে যাই । পুরো বাংলা ভাষায় কথা বলে পান্ডারা ।

একজন পান্ডা নিপেনের সামনে এসে বলেন :- আমি নদীয়া জেলার মূল পান্ডার লোক। আপনাদের নাম ঠিকানা আমাদের খাতায় রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। কারণ আপনি গয়া ধামে এসেছেন তার প্রমাণ রেখে যেতে হবে। আপনার বংশপরম্পরায় সবাই জানতে পারবে। ১০০ বছর পরেও যদি আপনার বংশের কেউ আসে তাহলে আমাদের খাতা পরীক্ষা করলেই আপনার নাম বেরিয়ে যাবে।

নিপেন বলে :- ঠিক আছে।

পান্ডা বলেন :- কয় জন পিন্ড দানের  কাজ করবেন।

নিপেন বলে :- আমি একা।

পান্ডা বলে :- আপনার কোন জেলা।

নিপেন বলে :- নদীয়া জেলা।

পান্ডা বলে :- গ্রামের নাম, থানা বলুন।

নিপেন বলে :- গ্রাম  দত্তপুলিয়া থানা ধানতলা।

পান্ডা বলে :- পাড়ার নাম বলুন।

নিপেন বলে :-  দত্তপুলিয়া মোড়ের মাথা।

পান্ডা বলেন :- আপনার নাম কি?

নিপেন বলে :-  নিপেন বিশ্বাস।

পান্ডা বলেন :- আপনার বাবার নাম, ঠাকুর দাদার নাম বলুন।

নিপেন বলে :- ঈশ্বর  খগেন্দ্র বিশ্বাস।

পান্ডা বলে :- ঠাকুর দাদার নাম।

নিপেন বলে :-  ঈশ্বর - - - - - -বিশ্বাস।

পান্ডা বলে :- কোন পান্ডার নাম জানেন।

নিপেন বলে :-  না।

পান্ডা বলেন :-  কোন পান্ডারা  জিজ্ঞাসা করলে, বলবেন পান্ডা গুরু হল "বাংলী আশ্রম" সবাই কে একাকী কথা বলবেন কিন্তু বাংলাদেশ বাড়ি হলেও ভুল করে বলবেন না। কারণ তাহলে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপদে পড়ে যাবেন । নদীয়া জেলা বলবেন ।

কিছুক্ষণ পর পুরোহিত ফিরে আসেন  এবং সবাইকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন । হেঁটে যেতে যেতে কমপক্ষে 10 থেকে 15 জনের  কাছে  কোন জেলার  একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে হবে।
নদিয়া জেলা ও বাঙালি আশ্রমের নাম বললেই পান্ডারা ছেড়ে দেবে। পুরোহিত পান্ডার সাথে কথা বলে জানা যায় মোবাইল এর মাধ্যমে সবার কাছে খবর হয়ে যায়। কারণ পান্ডারা নিজেরাই বলে আপনি নদীয়া জেলার।  এখানে পিন্ডদান উপলক্ষে প্রতিদিনই উৎসবে পরিণত হয়েছে।

প্রথমেই বিষ্ণুর মন্দিরে পূজা করতে হবে একটি নিরিবিলি জায়গা দেখে পিন্ডদান করার একটি ঘরের মধ্যে সবাইকে বসতে বলেন পুরোহিত। ঝাকে ঝাকে পান্ডারা এসে একই প্রশ্ন করতে থাকে।

পিন্ডদান পর্বের আয়োজন চলতে চলতে বাঙালি আশ্রমের পক্ষ থেকে একটি লাল রংয়ের বড় খাতা নিয়ে একজন বয়স্ক পান্ডা নিপেনের সামনে উপস্থিত হয়ে বলেন  :-এই খাতায় আপনাদের ফাইনাল ভাবে নাম তুলতে হবে। আবার নতুন করে সব তথ্য দিতে থাকে আর পান্ডা তা হিন্দি ভাষায় লিপিবদ্ধ করতে থাকে। নিপেন এর সাথে থাকা পাঁচজনের নাম মূল খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়।  এই মূল খাতায় নাম তোলার জন্য এখানে কোন টাকা পয়সা দাবি করা হয় না। কিন্তু আপনি আপনার মূল পান্ডা হিসাবে তাদের দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করতে পারেন।

এরপর  ফুল্গু নদীর বালির উপর পিন্ডদান করার জন্য লাইন দিয়ে বসে। ধর্মীয় অভিমত অনুসারে ক্রেতা যুগে রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা দেবী এই ফল্গু নদীর তীরে শশুর দশরথের পিন্ডদান করেছিলেন।  কিন্তু রামচন্দ্র আসার পর ফুল্গু নদী পিণ্ড দানের কথা অস্বীকার করে, সেই মুহূর্তে সীতা দেবী ক্রোধিত হয়ে অভিশাপ দেয় তোর বুক শুকনো হয়ে যাবে। আর মুহূর্তের মধ্যেই ফল্গু নদীতে বালিতে পরিণত হয়ে যায়। কথিত আছে রামচন্দ্রের আশীর্বাদে বালির নিচেই জল থাকে উপরে তার শুকনো।  বালি  সরিয়ে জল সংগ্রহ করে পিন্ডদানের কার্য্য করা হয়।

জল সংগ্রহের সময়ে কয়েকজন পান্ডা দুধ জল নিয়ে আপনার জলের মধ্যে ফেলে দেবে। আর বলবে গোমাতা সেবার জন্য ১০১ টাকা দান করুন। আপনি যদি টাকা বের করে দেন ভাববে আপনি বড় দানকারী অন্যান্য পান্নারা এসে টাকা নেওয়ার জন্য আপনাকে বিরক্ত করতে শুরু করবে। শংকর দর কষাকষি করে শেষে এগারো টাকা দিয়ে মুক্তি লাভ হয়। এখানে মুখে শক্ত থাকতে হবে। আপনার পুরোহিত পান্ডা এইসব বিষয়ে কিছুই বলবে না কারণ সবারই রুটি রোজগারের ব্যাপার রয়েছে। ঝামেলা বেশি পরিমাণ হয়ে গেলে আপনার পুরোহিত পান্ডা বলবে উক্ত পান্ডাকে মীমাংসা করে নিতে। প্রতিদিন ফল্গু নদীর বিশাল চরের উপরে হাজার হাজার মানুষ পিন্ডদান করে চলেছে। তিথি নক্ষত্রে অনুসারে ও পিতৃ পক্ষ-মাতৃ পক্ষ উৎসবে পরিণত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়োজনে। বর্ষার মৌসুমে ফল্গু নদীতে জল দেখা যায়। পুরোহিত পান্ডা তার ভাগের 8 জনকে নিয়েই পিণ্ডদান কার্য শুরু করেন ।

শংকর ঘুরে ঘুরে পান্ডাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে থাকে। বাঙালি আশ্রমের এক পান্ডার সাথে শঙ্করের আলাপ জমে ওঠে।

শংকর বলে :- এই গয়া ধামে দশ থেকে বারো জন পান্ডারা ভীষণ আনন্দ করে পিন্ডদানকারী যাত্রীদের নাম লিখলেন , কারণ কি  ?

উক্ত পান্ডা বলেন :-  এটা আমাদের রুটি রোজগারের ব্যাপার । ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে প্রতিটি  জেলার কয়েক এক জন পান্ডা আছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ সহ অন্য দেশের জন্য পান্ডা আছে।  ৩৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হয় ওখান থেকে সবাই কম বেশি ভাগ পান। অনলাইন মাধ্যমেই অটোমেটিক তার একাউন্টে টাকা চলে যাবে।  তার জন্য একটা অফিস রয়েছে।

বিষ্ণু মন্দিরে পিন্ডদান কাজ শেষ হওয়ার পর মন্দিরের পুরোহিত এক পান্ডা উপস্থিত হয়ে বলেন :-
পিন্ডদান করার পর ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব সেবা, গোদান, সোনা দান ও বস্ত্রদান ইত্যাদি ইত্যাদি দান করতে হয়।
২০০০ টাকার মধ্যে কম বেশি করে সব কাজ হয়ে যাবে।

নিপেনের সাথে উক্ত পান্ডার টাকা পয়সা সংক্রান্ত দর কষাঘষি শুরু হয়। তারপর শেষে হাজার টাকা দিয়ে নিস্তার লাভ হয়।

এখানকার নিয়ম অনুসারে নির্দিষ্ট বিষ্ণু মন্দিরের গোলাকার কালো পাথরের উপর পিণ্ড রাখতে হয় তাহলে তার পিতা মাতা বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়।

নিপেন পিন্ড হাতে করে নিয়ে বিষ্ণু মন্দির মন্দিরে উপস্থিত হয়ে পিন্ডদান করতে যাবে এমন সময় একজন পান্ডা এসে হাত চেপে ধরে বলেন :- এখানে পিন্ডদানের দক্ষিণা ৫০০ টাকা দিতে হবে। না দিলে পিণ্ড দিতে দেওয়া হবে না।  আবার নিপেন ও পান্ডাদের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হয় এবং শেষে ১০১ টাকা দিয়ে পিণ্ডদান করে ফিরে আসে।

এরপর বিষ্ণু মূর্তি দর্শন করতে গিয়ে প্রণাম করে উঠতে উঠতেই মন্দিরের পাণ্ডা বলে টাকা দাও।
দর কষাকষি করে 200 টাকার বিনিময়ে মুক্তি লাভ করে বাইরে গেটের দিকে আসতেই এক পান্ডা নিপেনের ঘাড় ধরে বলেন হাজার টাকা দাও। আবার দর কষাকষি করে তিনশত টাকার বিনিময়ে উক্ত পান্ডার হাত থেকে মুক্তি লাভ করে।  সাথে মহিলারা থাকলে পান্ডারা অতিরিক্ত ঝামেলা শুরু করে কারণ স্ত্রীর সামনে মান সম্মান হানি কারো কথাবার্তা বললে পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে আসবে। এছাড়াও মানুষ বিরক্ত হয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়ে থাকে। গোয়াই পিণ্ডদান করতে গিয়ে একটু আড্ড ঝামেলা হবে না তা কোনদিন হয় না। আপনি যদি 5 লাখ টাকা পিন্ডদানের জন্য খরচ করেন তবুও পান্ডাদের মন জয় করতে পারবেন না। যদি একবার বুঝতে পারে আপনার কাছে প্রচুর টাকা আছে। ছলেবলে কৌশলে ও সেন্টিমেন্টে আঘাত করে আপনার কাছে থেকে টাকা নিয়ে নেবে। এই ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র বিষ্ণু মন্দিরের কোন পান্ডার সাথে পিণ্ডদান চুক্তি হলে ঝামেলা থেকে অনেকটাই রেহাই পাওয়া যায়।

গয়ার পান্ডা গন বাদে দোকানদার, বেশি ভাগ গাড়িচালক, অন্যান্য মানুষগুলো যাত্রীদের সব সময় সংযোগিতা সাহায্য করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছু গাইড পাওয়া যায়। আলোর পিছনে সব সময় অন্ধকার থাকে কিন্তু গয়ার সবকিছুর মধ্যেই অন্ধকার নেই।

গয়ার সাধারণ মানুষ পান্ডাদের উপর বিরক্তবোধ করে সমালোচনা করে কিন্তু পান্ডাদের সামনে কিছু বলা যাবে না, বললেই বিপদ নিজের ঘাড়ে নিয়ে আসা হবে ।

গয়ার পিন্ড দান কেন্দ্র গুলো  ও গয়া জংশন ষ্ট্রশন চত্বরে পান্ডাদের রাজত্ব। স্টেশন থেকে বাঁচতে পারলেও কিন্তু পিন্ডদান কেন্দ্রগুলো থেকে পান্ডাদের হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই, সেই জন্য পকেটে প্রচুর টাকা রাখতে হবে। আর মুখের জোর কম করলে হবে না।  নেই নেই গরিব মানুষ বলতে হবে।

এরপর গাড়ি করে অক্ষয় বট পিন্ড দান করতে যাওয়া হয় কিন্তু এখানে বিষ্ণু মন্দির বা ফল্গু নদীর ধারের মতো পাণ্ডাদের জুলুমবাজি নেই ।  বিনয়ের সঙ্গে আবেদন জানায় টাকা দেওয়ার জন্য এবং বলেন আপনাদের দেওয়া দানেই আমাদের সংসারের রুটি রোজগারের ব্যবস্থা হয়। শিশু কান্না না করলে মা কখনো দুধ দেয় না তাই আপনারা হলেন আমাদের মা বাবা।  অক্ষয় বটের ছায়া তলে দুটি জায়গাতে পিণ্ডদান করা হয় এবং দান দক্ষিণা সাধ্যমত নিপেন করতে থাকে। এরপর সাথে থাকা পুরোহিত দক্ষিণা।

পুরোহিত পিন্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন :- পুরোহিত দক্ষিণা, ভোজন জন্য টাকা, ইত্যাদি না দিলে পিন্ড আমি নেবে না । আবার দরকষাকষি শুরু হয়, শেষে তিন শত টাকা দিয়ে পুরোহিত বিদায় হয়। পিন্ড দানের  সমাপ্তি ঘটে । 
ভারত সেবাশ্রম সঙঘ ফিরে এসে খেতে যাওয়া হয়। খাওয়ার মেনু ছিল ভাত, ডাল, কাঁঠালের তরকারি, চাটনি, পায়েস ।

বিকালে ভল্গু নদীর ওপারে মা সীতা দেবীর পিন্ড দান স্থান । ভীষণ নিরিবিলি পরিবেশ সুশীতল বাতাস মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভীষণ ভালো লেগেছিলো। এখানে পান্ডা আছে তবে শান্ত ভদ্র যে যাহা প্রণামী দেয় তাহা গ্রহণ করে ।

ঘোরাঘুরি করার অনেক জায়গা আছে । বেড়িয়ে পড়ুন বৌদ্ধ গয়া, লালন্দা বিশ্ব বিদ্যালয় ।
আমার সাথে একজন পান্ডার পরিচয় হয়, মন্দিরে থাকে । আমাদের তীর্থ গুরুদেব এর বংশধর । বলেছে কোন সমস্যা হবে না ।
----------------------------------------------------------
                     ।। গল্প সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
গয়া পিন্ডদানের জন্য সরাসরি বাঙালি আশ্রমের সাথে যোগাযোগ করুন। এখানে বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। শ্রী গয়া ধামের পান্ডা শ্রী বিনোদ কুমার গুপ্ত। এই বাঙালি আশ্রমের মাধ্যমে পিন্ডদান করতে গেলে অন্যান্য ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।

মোবাইল নাম্বার 9430201046 , 9801213751,
7783802841, 8581990509 ও 8757034751
----------------------------------------------------------
লেখক শংকর হালদার।
+91 89262 000 21
----------------------------------------------------------


               
             


সোমবার, ৪ জুলাই, ২০২২

।। আদিবাসী বিদ্রোহী নারী।।

          ।। আদিবাসী বিদ্রোহী নারী।।
      লেখক শংকর হালদার শৈলবালা।

 ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি বৃহৎ জেলা ছিল মেদিনীপুর।
পরবর্তী কালে জেলাটিকে ভেঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম, এই তিনটি জেলায় ভাগ করা হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার বেশকিছু অঞ্চল বর্তমানে ‘জঙ্গলমহল’ নামে পরিচিত। এখানে, বিশেষ করে জঙ্গলমহল এলাকায় বিভিন্ন ধরণের জাতি-উপজাতি বাস করে।তারা নানা ধরণের রীতি-নিয়ম,প্রথা ও ব্রততে বিশ্বাসী। ঝাড়গ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যে শাল মহুল,আম,জাম,শিমূল ইত্যাদি গাছের সবুজ জঙ্গল রয়েছে, তার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে রয়েছে আদিবাসীদের ছোট ছোট গ্রাম। এইসমস্ত গ্রামের সাঁওতাল, শবর, লোধা, মুণ্ডা ইত্যাদি জনজাতি আদিম যুগ থেকে একটা সময় পর্যন্ত জীবনধারণের জন্য সম্পূর্ণভাবে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জঙ্গলের ফল-মুল, শাক-পাতা খেয়ে,পশুপাখি শিকার করে, জঙ্গলের কাঠ ও বনজ উপকরণ দিয়ে ঘর-গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানান জিনিস বানিয়ে বিক্রি করে দিব্যি দিন কাটাত। সারাদিন খাটুনির পর সন্ধ্যাবেলা মহুল-সিমুলের তলায় বসে হাঁড়িয়া খেত আর মাতাল হয়ে মেয়ে-মরদ একে অপরের কোমর জড়িয়ে নাচত গাইত।        

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল অতিপরিচিত এই ঘটনা। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে একজোট হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল পুরুলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী- সাঁওতাল। সিধু, কানু, চান্দ ও ভৈরবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক বছরের মাথায় বিদ্রোহ স্তিমিত হয় বটে। কিন্তু গোটা ভারতের মোহনিদ্রা ভেঙে দিয়ে গেল। জন্ম নেয় অধিকার সচেতনতা। তার দলিল ঠিক পরের বছর থেকেই এই মাটিতে একের পর এক বিদ্রোহ।

পুরনো ইতিহাস থেকে জানা যায়, উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার আইল্যান্ড অব্দি বিস্তৃত ছিল অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। আনুমানিক ত্রিশ হাজার বছর আগেই তারা ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া যায়। সেই অস্ট্রিক গোষ্ঠীরই উত্তরাধিকারী বর্তমানের সাঁওতাল উপজাতি। সাঁওত বা সামন্তভূমিতে বাস করার কারণে সাঁওতাল নামে পরিচিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠী এলাকার জামবনির গ্রামের কুঁইরি পাড়ার শিবু কুঁইরির মেয়ে সাঁঝলি শীতের সকালে উঠানে বসে ঝলমলে মিষ্টি মিষ্টি রৌদ্রের তাপে পিঠ দিয়ে দুলে দুলে ক্লাস সেভেনের পাঠ্য বই থেকে সামন্ত রাজার ইতিহাস পড়ে মুখস্ত করতে বাস্ত।

কিশোরী সাঁঝলি কিছু সময় পড়াশোনা করার পর ভাবে মনে মনে :- 'মা, বাবুপাড়ার দে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। কাজের বিনিময়ে ফেলে দেওয়া বাসি পান্তা খাদ্য ও মাসের শেষে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। যে টাকা দেয় তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ভাত খাওয়া হয় না। ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয়ে মায়ের শরীর টা একদম ভেঙে গিয়েছে। মায়ের শরীরে মাঝে মধ্যেই জ্বর আসে আর জ্বর আসলে মা তালপাতার ঘরের বারান্দায় খেজুরের পাটিতে একা একা চুপচাপ শুয়ে থাকে কিন্তু টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসা হচ্ছে না।এই এলাকার মধ্যে কোন সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। আছে শুধু রাজনীতির বড় বড় বক্তৃতা আর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোট আদায় করা। ভোট চলে গেলে আমাদের মত হতদরিদ্র মানুষের কথা কোন রাজনৈতিক নেতাদের মনে থাকেনা।

 আজ মায়ের শরীরে জ্বর এসেছে ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই দাওয়াই শুয়ে আছে। কিন্তু আজ দে বাড়ির কাজে যেতে পারেননি।
বহুবার দে বাড়ির বড় গিন্নি লোক পাঠিয়েছে। মায়ের প্রচন্ড জ্বরে শরীর পুড়ে যায় তবুও বাবুর গিন্নি সে কথা শুনতে চায় না।

আমাদের দিদিমা বুড়ি রৌদ্রের তাপে বসে
ছেঁড়া কম্বল মুড়ি দিয়ে বিড়ি ফুকছিল।

দিদিমা বুড়ি, কিশোরী সাঁঝলি কাছে এসে বই বন্ধ করে দিয়ে বলে :- এখন পড়াশোনা করতে হবে না। যা বোন দে বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাজ গুলো করে দিয়ে আয়।

কিশোরী সাঁঝলির অনিচ্ছাসত্বে বাড়ির দিদিমা একপ্রকার জোর করেই দে বাবুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, মায়ের অনুপস্থিতিতে ঝিয়ের কাজের জন্য।
 
কিশোরী সাঁঝলি দে বাড়িতে গিয়ে পুরানো ফটক ঘেরা বড় উঠান ও উঠানোর চারিদিকে বড় বড় ঘরের ও বড় বড় বারান্দা সব জায়গায় ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে সবেমাত্র পা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে দে বাড়ির গিন্নি বলেন :- সাঁঝলি কোথায় যাচ্ছি? এখনো কাজ শেষ হয়নি।

কিশোরী সাঁঝলি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

দে গিন্নি এক গাদা এঁটো বাসন নিয়ে এসে সাঁঝলির সামনে রেখে বলে :- এই বাসন গুলো পরিস্কার করার পর ভালো করে ধুয়ে রাখ।

কিশোরী সাঁঝলি প্রতিবাদী কন্ঠ বলে :- আমি আপনাদের এঁটো বাসন ধুয়ে দিতে পারবে না।

দে গিন্নি রাগে উত্তেজিত হয়ে বলেন :- কি বললি তুই? যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা,
ছোট জাত হয়ে বড় বড় কথা বলা। তোর মা, তোর দিদিমা, তোর দিদিমার মা ও তোর চৌদ্দগুষ্টি সবাই এই দে বাড়িতে বহু কাল ধরে এঁটো বাসন ধুয়ে ধুয়ে মরে গেলে। এখন তোর মা মরতে চলছে। তাদের মেয়ে হয়ে আমাদের বাড়ির এঁটো বাসন ধুয়ে দিতে পারবে না। আমাদের এঁটো খাবার খেয়ে তোরা বেঁচে থাকিস।

কিশোরী সাঁঝলি বলে :- বললাম তো, আপনাদের এঁটো বাসন ধুয়ে দিতে পারবে না।
আপনারা কাজের লোক দেখে নিন আমি চললাম।
সাঁঝলি নিজেকে অপমানিত বোধ অনুভব করে, রাগে উত্তেজিত হয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

দে বাড়ির লোকজন অপমানিত বোধ করে, কিশোরী সাঁঝলির বাবা শিবু কুইরির কে রাস্তায় পেয়ে লোকজনের মধ্যে অপমান ও বিভিন্ন ভাবে ঝামেলা করতে শুরু করে এবং জাত পাত তুলে গালিগালাজ করতে থাকে।

সন্ধ্যার সময় মাহাতোদের ধান কাটার পর বাড়িতে ফিরে আসে শিবু কুইরি।

শিবুর মা ছেলের কাছে অভিযোগ করে বলেন :- তোর মেয়ে দুই পাতা পুঁথি পড়ে বড় পন্ডিত হয়ে গেছে, ছোট মুখে বড় বড় কথা বলে। আরে আমরা হলাম ছোট জাত বাবুদের সাথে ঝামেলা অশান্তি করে আমরা কি বাঁচতে পারি? কিশোরী সাঁঝলির লেখা পড়ার বিষয় সহ প্রতিবাদী কন্ঠের প্রতিবাদী ভাষার জন্য মা তার ছেলের কাছে মহাভারতের সাতকাহন বলতে শুরু করে।

সাঁঝলির মা হাড়ির মধ্যে ধানের কুড়া দিয়ে আগুন জ্বলে মাঘ মাসের সন্ধ্যায় সময় শীতের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গা-হাত-পা সেঁক দিয়ে শরীরকে গরম রাখার চেষ্টা করছে।
 
কিশোরী সাঁঝলি ভাবে :- বাবার মাথার ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকুনি দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বুকে হাত দিয়ে চাপরাছে কারণ বাবুদের কাছে থেকে অপমানিত হয়ে হৃদয়ের মাঝে আগুন জ্বলে উঠেছে। বাবা কখনো উত্তেজিত স্বভাবের মানুষ না কিন্তু আজ ভীষণ ভাবে দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো সত্যি কথাই বলেছি কতদিন আর বাবুদের দ্বারস্থ হয়ে থাকতে হবে। আমাদের এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ গুলো কবে বুঝবে লেখাপড়া শেখার প্রয়োজনীয়তা।

শিবু কুইরি কিছু সময় ধরে চোখের জল ফেলে অপমানের দুঃখ জ্বালা ভুলে চোখ মুছতে মুছতে তার প্রতিবাদী মেয়ে কিশোরী সাঁঝলির
কাছে এসে বসে এবং মেয়ে কে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলেন :- সাঁঝলি যা করেছিস ভীষণ ভাবে ভালো করেছিস। আমিও চাই আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো সবাই প্রতিবাদী হয়ে উঠুক।
শোন তোর মা, তোর মায়ের বংশপরম্পরায় সবাই বাবুদের বাড়িতে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে আসছে। বাবুদের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করেছে কিন্তু তাতে হয়েছে কি ? তাতে হয়েছে কি ?
তবে বাবুদের কাছে আমরা ছোট জাত কিন্তু তাই বলে আমাদের কি কোন মান সম্মান থাকতে নেই?

কিশোরী সাঁঝলি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে :- ঠিকই তো আমাদের কি কোন মান সম্মান নেই। আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীদের বাবুরা কোনো মূল্যই দিতে চাই।

বাবা শিবু কুইরি উচ্চ কন্ঠে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন :- মা সাঁঝলি, মনে রাখিস তুই কিন্তু পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করার জন্য জন্ম হয়নি।যত বড় লাট সাহেব হোক না কেন; নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে কাহারোর কাছে মাথা নত করবে না। 
নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তোকে লেখাপড়া শিখাচ্ছি , তোর থেকে সবাই শিখতে পারবে।
না হলে আমাদের মতো দিন দরিদ্র মানুষের ঘরে আছে কি ?

সাঁঝলি রাতে ঘরের শত ছিদ্র দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবে :- মেয়েদের কি সমাজের বুকে কোন স্বাধীনতা নেই , না আছে অক্ষর জ্ঞান না আছে মান সম্মান।
ছোট থেকে শুনে আসছি মা, কাকিমা, দিদিমা ও বয়স্কদের মুখে মেয়ে মানেই মাটি। দুই দিন পর পরের ঘরে গিয়ে রান্নাঘরে জায়গা হবে তা লেখাপড়া শিখে কি লাভ হবে। একগাদা সন্তান লালন-পালন করতে করতে আর মাঠে-ঘাটে কাজ করতে করতেই দিন চলে যাবে। স্বামীকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া থাকে কাজ করে সংসার চালাবো। আমাদের জনগোষ্ঠীর সব দায়-দায়িত্ব নাকি মহিলাদের উপর।
গাঁয়ের কয়েকজন বাবুরা বলতো দ্যাখ সাঁঝলি, মন খারাপ করলেই তো তুমি হেরে গেলে এবং বহু দূর পর্যন্ত পিছিয়ে পড়বে। লোকে যে যা বলে বলুক না কিন্তু এক কান দিয়ে শুনবে আর অন্য কান দিয়ে বের করে দেবে। তোমার নির্দিষ্ট লক্ষ্য পথে এগিয়ে চলে।

সাঁঝলির বাবা এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থতার জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে একদিন শরীরের মায়া ত্যাগ করে মৃত্যুর কোলে শুয়ে পড়লেন চিরনিদ্রায়।
মা ও মেয়ে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তবুও সাঁঝলি বহু কষ্টের মধ্যে দিয়ে দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে লেখাপড়া চালিয়ে একসময় মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়।

 মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কয়েক মাস পর হঠাৎ একদিন ভোর বেলায় জামবনি ইস্কুলের হেডমাস্টার সাঁঝলির বাড়িতে এসে ডাকাডাকি করতে শুরু করেন। 
অনেক ডাকাডাকি করার পর সাঁঝলির মা দরজা খুলে মাস্টারমশাই সহ পাড়া প্রতিবেশী লোকজন দেখে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করে :- বাবুরা, আমরা কি কোন অন্যায় করে ফেলেছি ?

 মাস্টার মশাই আনন্দিত মনে মাথা নিচু করে কুঁড়ে ঘরে ঢুকে বলেন :- 'মা সাঁঝলি, তুমি আমাদের ইস্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে কারণ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফলাফলে তুমি সর্ব প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

হেড মাষ্টারের কথা শুনে সাঁঝলি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে ও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে :- 'মাস্টারমশাই,আমি কি স্বপ্ন দেখছি। আমার মত অভিভাবকহীন আদিবাসী কালো মেয়ে শুধুমাত্র স্কুলের ক্লাসের মাস্টারের কাছে পড়াশোনা করে প্রথম হতে পারে না হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।

মাস্টার মশাই সাঁঝলির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন :- 'মা, সত্যই তুমি প্রথম হয়েছে। এই সংবাদ দেওয়ার জন্য ভোরবেলা এসেছি। মা আমি আসছি বলে ঘরের বাইরে এসে চলতে শুরু করেন।

পরীক্ষা পাসের খবর শুনে আনন্দের অশ্রুধারা ঝরতে থাকে মা ও মেয়ের। সকাল বেলায় চাঁদের হাট বসেছে ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরের উঠানের মাঝে। 

সাঁঝলি তার অসুস্থ মাকে জড়িয়ে ধরে বলে :- আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতে ভীষণ খুশি হতো কারণ বাবার উদ্যোগের কারণে লেখাপড়া শিখতে পেরেছি। বলে দুই হাত তুলে কপালে ঠেকিয়ে স্বর্গীয় বাবার উদ্দেশ্যে কয়েক বার প্রণাম করে। 

দিনের আলো উদিত হওয়ার পর দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথেই সাঁঝলিদের মাটির কুড়ে ঘরের উঠানোর মাঝে গ্রামের প্রতিবেশী সহ, অঞ্চল প্রধান, উপ প্রধান, মেম্বার ও রাজনৈতিক দলের নেতারা হাতে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দলে দলে আসতে শুরু করে।

সাঁঝলির মা এত লোকের আনাগোনা খাবারের প্যাকেট দেখে ভাবে মনে মনে :- কতদিন যে থেকেছি অনাহারে কিন্তু তখন কেউ তো খোঁজ করেনি। মেয়ে ফার্স্ট হয়েছে তাই নেতারা বাড়ির উঠানে এসেছে হয়তো রাজনৈতিক কোনো ফায়দা লোটার জন্য। পড়াশোনার জন্য একটা বই খাতা কেউ দিয়েছে।

সাঁঝলির ছবি তোলার জন্য টিভি চ্যানেলের ও দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকগণ ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন শাসকদলের এক রাজনৈতিক নেতা বলেন :- তোমাদের মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মেয়েরা যদি উঠে আসে, তবেই ভারতবর্ষ উঠে আসবে।

সাঁঝলি ক্যামরার সামনে দাঁড়িয়ে বলে :- কথাটা ভীষণ সত্যি বলেছেন কিন্তু বাস্তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মেয়েদের উঠে আসার রাস্তা যে এখনো আপনারা তৈরি করে দেননি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক ভাবে নিচু জাত বানিয়ে রেখেছেন এবং নিচু জাত বলে আমাদেরকে সবসময় অবহেলিত করে নিচের দিকে ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু কেন? 
খাড়া পাহাড়ে ওঠা সহজ নয় উঠতে হলে ভীষণ পরিশ্রম করতে হয় শরীর ও মনের জোর আর বিশ্বাস চাই।

একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক বলে :- আপনার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
সাঁঝলি ভাবে সেই ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ের ঘটনা ছাড়া আমার আর কিছু মনে আসে না । সাঁঝলি দে বাড়ির ঘটনা উল্লেখ করে বলতে শুরু করে। ঘটনা শেষ হওয়ার পরে চারিদিকে হাততালি পড়তে থাকে।

টিভি সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে বলে :- তুমি যে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সর্বপ্রথম হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় তোমার পড়াশোনার জন্য উদ্যোক্তা সবচাইতে বেশি কে ?

সাঁঝলি বলে :- আমার বাবা আমার পড়াশোনা করার জ্ঞানের আলোর বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে ছিলেন কিন্তু আমার লেখাপড়ার জন্য বাবা কে বাবুদের কাছে বহু অপমানজনক কথা বার্তা শুনতে হয়েছে। 
প্রথম যেদিন দে বাবুদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজের এঁটো বাসন ধোয়ার প্রতিবাদ করেছিলাম কিন্তু সেই দিন আমার বাবা মাথায় হাত রেখে বলেছিল :- সাঁঝলি তুই ঠিক করেছিস আর কতকাল বাবুদের এঁটে বাসন ধুয়ে বেড়াবে আমাদের জাতির মানুষেরা, তোকে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হতে হবে। আজ বাবা বেঁচে থাকলে ভীষণ খুশি হতেন, আমাদের কুড়ে ঘরে অপ্রত্যাশিত সূর্যের আলো দেখে।

যখন আমি প্রথম লেখাপড়া শিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু ছোট জাত বলে সমাজের উচ্চ জাত নামধারী বাবুরা আমাকে সহযোগিতার বদলে করেছিল অবহেলা ও অপমানজনক কথা বার্তা। আজ মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছি বলে ছোট জাতের তালপাতার কুঁড়েঘরে লোকে-লোকারণ্য হয়েছে কিন্তু কেন ? আমাকে দেখিয়ে রাজ্যের মান বাড়ানো আর উন্নয়নের নামে নেতাদের বাড়বাড়ন্ত।
আমাদের সুখ দুঃখের খবর রাখে কয়জনে রাখে। আজ বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে বলছেন অনেক বড় বড় কথা, দুদিন পরে হারিয়ে যাবে আমাদের কঁইরি সমাজের মানুষেরা সব কথা। স্মৃতির পাতায় শুধু স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবে কঁইরি পাড়ার মানুষগুলো।

সাঁঝলি ভাবছে :- আমাদের তালপাতা দিয়ে ঘেরা কুড়ে ঘরে আসছে কত মানুষ। মন্ত্রী আসবে বলে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আবার অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে।

শীতের দুপুরে রৌদ্রের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের পাহারায় মন্ত্রীর গাড়ি বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে আসে সাঁঝলির মাটির কুড়ে ঘরের সামনে।
শিক্ষামন্ত্রী সহ আরো রাজনৈতিক নেতাগণ গাড়ি থেকে নেমে মন্ত্রী বলেন :- সাঁঝলি কুঁইরি কোথায় ?
সাঁঝলি তার অসুস্থ মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে এবং হেড মাষ্টারের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
হেডমাস্টার মশাই বলেন :- প্রণাম কর সাঁঝলি প্রণাম কর।

সাঁঝলির পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে মন্ত্রীমহোদয় বলেন :- তুমি, দিন মজুরের কাজ কর্ম করে সংসার চালিয়ে বহু কষ্টে মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। শুনি ভীষণভাবে আনন্দিত হলাম তাই তোমাকে দেখতে চলে এলাম কিন্তু তোমাদের সত্যিই ভীষণ দারিদ্র্য অবস্থা কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণের চেষ্টা আমাদের সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তোমাদের মতো মেয়েরা যাতে উঠে আসে, তার জন্যই তো আমাদের পার্টি ও তোমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য আমাদের সরকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

মন্ত্রী মহোদয় 10,000 টাকার চেক সাঁঝলির হাতে দিয়ে বলে :- সাঁঝলি, তোমাকে আমরা আরও ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানাবো মঞ্চ করে। আরো অনেক টাকা তুলে দেবো।
এই টিভির লোক গুলো ক্যামেরা এদিকে নিয়ে এসে ভিডিও করুন।

মন্ত্রী চেক প্রদান করছেন উন্নয়নের জন্য চারিদিক থেকে ছোট-বড় নানা ধরনের ক্যামেরা ঝলসে ওঠে আলোয়।

সাঁঝলি ভাবে :- বাপের সেই গাম্ভীর্য মুখ খানা অন্তর থেকে বাবা বলেন না, না সাঁঝলি টাকা নিবি না।

সাঁঝলি চিৎকার করে উঠে বলে :- না, না এই টাকা আমি নিতে পারবো না আর আপনারা আমাকে যে ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা দেবেন তাও আমার লাগবে না।

হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো সাঁঝলি মুখে কথা শুনে মন্ত্রী ঢোক গিলতে শুরু করে, নিস্তব্ধ হয়ে যায় পরিবেশ।

সাঁঝলি ভাবে মনে :- মা, যে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন, সেই দে বাড়ির গিন্নির বড় ছেলে এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের বড় নেতা। এঁটো বাসন ধুতে পারবো না বলে প্রতিবাদ করেছিলাম কিন্তু বাবা কে করেছিল মানুষের মাঝে অপমান সেই দিনের কথা গুলো এখনো ভুলিতে পারি নাই।

দে বাড়ির দে গিন্নির বড় ছেলে স্থায়ী এলাকার বড় নেতা ভিড় ঠেলে সাঁঝলির কাছে এসে বলে :- কেন রে কি হয়েছে! সাঁঝলি টাকা নিবি না? তুই তো একদিন আমাদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতিস?
বল তোর আর কি কি লাগবে ? ভালোভাবে খুলে বল সব দেবে আমাদের পার্টি।

সাঁঝলি বলে :- এই রাজ্যে আমার মতো হাজার হাজার অনেক কঁইরি মেয়ে সাঁঝলি আছে। আমি শিবু কুইরির মেয়ে বসবাস করি অজপাড়াগাঁয়ের মধ্যে। এই পাড়ার কঁইরি ছেলে মেয়েরা যতদিন অন্ধকারে পড়ে থাকবে, যতদিন লেখাপড়ার জন্য কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাবে ততদিন কোন বাবুর ও মন্ত্রীর দয়া আমার লাগবে না। শুনেছেন আপনারা আমার কোন দয়া লাগবে না।

মন্ত্রী বলে :- কেন মা তুমি রাগ করছো ?

সাঁঝলি বলে :- আমার বাবা বিনাচিকিৎসায় ধুকে ধুকে মরে গিয়েছে। আমার মায়ের মতো শত শত মা এই গ্রামে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে কিন্তু নিম্নতম প্রাথমিক ভাবে তাদের কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এই গ্রামে কোন স্কুল নেই অন্য কোন গ্রামে গিয়ে বাবুদের হাতে পায়ে ধরে তাদের ইচ্ছা মত পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু কেন আমাদের জনগোষ্ঠীকে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে?
আর লোকদেখানো চেক দিয়ে আমি কি করব? না আছে আমাদের ব্যাংকের একাউন্ট। হনুমানের মত রুটি ভাগ করতে করতে আমার ভাগে আর কিছু থাকবে না।
আপনারা রাজ্য পার্টির বড় নেতা ও মন্ত্রী। কেমন রাজ্য পরিচালনা করেন ?

আমি মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি বলেই ভোট পাওয়ার আশায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নাম করে আমাদের কে সান্তনা দিতে এসেছেন?
এতদিন কোথায় ছিলেন যখন বই খাতার জন্য পড়াশোনা করতে পার ছিলাম না এবং বিদ্যালয়ে গিয়ে বার বার অপমানিত হতে হয়েছে।

দে বাড়ির দে গিন্নির বড় ছেলে এলাকার বড় নেতা হয়ে জনসমুদ্রের মাঝে শিবু কুইরির মেয়ে সাঁঝলি কে ঝিয়ের কাজের অপবাদ দিয়ে করলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অপমান।
আমাদের কঁইরি সমাজের মানুষেরা চিরকাল হতদরিদ্র অশিক্ষিত কিন্তু আপনারা শিক্ষিত সমাজের মানুষ হয়ে আমাদের উন্নয়নের জন্য কি করেছেন ?
না করেছেন একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, না করেছেন গ্রামের কোন উন্নয়ন, না কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। সরকারের দেওয়া উন্নয়নমূলক কাজের টাকা গুলো করেছেন আত্মসাৎ। প্রতিবাদ করতে গেলে তার কন্ঠ করেছেন রোধ।

যে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গৌরব করছেন কিন্তু এখনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমাজের ছেলেমেয়েদের স্কুলে গেলে কোন মূল্যায়ন করা হয় না। শিশু কালে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছি স্কুলের বারান্দায় বসে বসে আমাদের ছোঁয়া নাকি স্নান করতে হয়।

যদি কিছু করার সৎ ইচ্ছা থাকে তাহলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমাজের উন্নয়নের জন্য কিছু করুন। শিক্ষা,স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান।
মন্ত্রী মহোদয় আমার জন্য আপনার কিছুই করতে হবে না। আমি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার হলে আরো লড়াই চালিয়ে যাবো।

 নেতা মন্ত্রীদের মুখে আর কোনো আর কথা নেই। মন্ত্রীমহোদয় গভীর চিন্তায় মুখ কালো করে ভাবতে থাকে। বাস্তবে উন্নয়ন না করে উন্নয়নের কথা বলে বেশিদিন রাজনীতি চলে না।

সাঁঝলি মায়ের হাত ধরে ভাঙ্গা কুড়ে ঘরের দিকে চলতে থাকে।

একদিন স্কুল চলাকালীন অপ্রত্যাশিতভাবে বিদ্যালয়ের বয়স্ক ইতিহাস শিক্ষক অশোক মহাশয় সাঁঝলি কে কাছে ডেকে নিয়ে "আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস" মূলক প্রবন্ধের বই হাতে দিয়ে বলেন :- এই বইটি মন দিয়ে পড়বে আরো বই সংগ্রহ করে দেবো। তোমাকে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে হবে এবং পড়াশোনা করার মাধ্যমে তোমার সমাজের মানুষদের শিক্ষিত করতে হবে।
সাঁঝলি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা ও কিছু বিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্যে গবেষণা শুরু করে।
 
প্রাচীনকাল থেকে সর্বপ্রথম এই 
ভারত ভূখণ্ডে যে জনগোষ্ঠী বসবাস করত, তাদেরই “আদিবাসী” জনগোষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। আদিবাসী শব্দ কথাটিরই অর্থ হল আদি বাসিন্দা বা সর্বপ্রথম বাসিন্দা। বর্তমানে প্রায় সমস্ত আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ভারতীয় সংবিধান অনুসারে Scheduled Tribe বা তপশীলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিছু কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠী হয়ত Scheduled Tribe বা তপশীলি উপজাতি তালিকাভুক্ত হননি, এবং তাঁরা অন্তর্ভুক্তর জন্য আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।
আদিবাসী জনগণ কে প্রাথমিক দিকে 
প্রথম জাতি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, আদিম মানুষ, উপজাতি প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হয়।
 যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে, তারাই আদিবাসী।
নিজেরাই এক একটি আলাদা জাতি।

পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশের ৪০টির 
বেশি দেশে বসবাসরত প্রায় ৫,০০০ আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ কোটি। 
নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ায় যুগে যুগে এদের অনেকে প্রান্তিকায়িত, শোষিত, বাধ্যতামূলকভাবে একীভূত হয়েছে এবং যখন এসব অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের স্বপক্ষে তারা কথা বলেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দমন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। 

এক সময়ে উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত 
মহাসাগরের ইস্টার আইল্যান্ড অব্দি বিস্তৃত ছিল অস্ট্রিক ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ। নাক চওড়া ও চেপ্টা, গায়ের রং কালো এবং মাথার চুল ঢেউ খেলানো। আনুমানিক ত্রিশ হাজার বছর আগেই তারা ভারত থেকে অস্ট্রোলিয়া যায়। সেই অস্ট্রিক গোষ্ঠীরই উত্তরাধিকারী বর্তমানের সাঁওতাল। খুব সম্ভবত সাঁওত বা সামন্তভূমিতে বাস করার কারণে সাঁওতাল নামে পরিচিত হয়ে পড়েছে।  

যুগের ব্যবধানে ভারতের ভূমিতে 
এসেছে আর্য, গ্রীক, আরব এবং ‍মোঙ্গলদের মতো অজস্র জাতি। সেই অর্থে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বিভিন্ন দেশের বহিরাগত। এদের কেউ কেউ নিজেদেরকে মহাভারতে বর্ণিত বীর একলব্যের বংশধর মনে করে। তবে তাদের উৎস এবং আদি নিবাসভূমি সম্পর্কে বলতে বহুল প্রচলিত এক লোককথাকে ‍গুরুত্ব দেয়া হয়।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস 
অনুসারে। "সাঁওতাল পুরাণ" নামক গ্রন্থে হাঁস ও হাঁসিল গল্প থেকে জন্মের ইতিহাস জানা যায়।
সেই মুহূর্তে পৃথিবী নামক গ্রহের জন্ম 
হয়নি কিন্তু শুধু জল আর জল। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুসারে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে কাহিনী।
একদিন চন্দ্রের কন্যা স্নান করতে এসে শরীরের ময়লা থেকে সৃষ্টি করলেন হাঁস এবং হাঁসিল নামে দুটি পাখি। বহু বছর জলের উপর ভেসে থাকার পর একদিন তাদের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের (ঠাকুর জিউ) নিকট প্রার্থনা জানাই খাবারের জন্য। তাদের প্রার্থনা শুনে ঈশ্বর অর্থাৎ ঠাকুর জিউ পৃথিবী সৃষ্টির মনস্থ করলেন। ভাবলেন সৃষ্টির জন্য মাটির দরকার কিন্তু মাটি রয়েছে সমুদ্রের তলদেশে।
জলচর প্রাণী বোয়াল কে ডাকা হল। সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর নির্দেশ দিলেন সমুদ্রের তলা থেকে মাটি নিয়ে আসার কিন্তু প্রথমে বোয়াল এবং তারপর কাকড়া মাটি আনতে ব্যর্থ হলে।
কেঁচো নামক এক প্রাণী এগিয়ে এলো। কচ্ছপ কে জলের উপর ভাসতে বলে কেঁচো নিজে লেজ রাখল তার পিঠে। তারপর কেঁচো মাটি খেয়ে তা লেজ দিয়ে বের করে কচ্ছপের পিঠে রাখতে শুরু করে। এইভাবে দীর্ঘ বছর ধরে চেষ্টার ফলে জন্ম নিল পৃথিবী।
সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর অর্থাৎ ঠাকুর জিউ নরম মাটিকে শুকনো করার জন্য পৃথিবীতে ঘাস শাল ও মহুয়া সহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ রোপন শুরু করলেন।

আরো কিছুদিন পর মেয়ে পাখিটা দুটি ডিম দিল এবং নয় মাস দশ দিন পর ডিম পরিপুষ্ট হয়ে উঠে। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে ডিম ফেটে যায়। জন্ম হয় একজন পুরুষ পিলচু হাড়াম ও একজন নারী পিলচু বুড়ি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি পৃথিবীর প্রথম নর নারী।
হিহিড়ি-পিহিড়ি নামক স্থানে তারা বসবাস করলে লাগলো।
 
ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাদের দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয় এবং মিলনের মাধ্যমে জন্ম নেয় সাতটি পুত্র ও আটটি কন্যা।
ঈশ্বর (ঠাকুরজিউ) এবার পিলচু হাড়ামকে পুত্রদের নিয়ে সিংবীরে এবং পিলচু বুড়িকে কন্যাদের নিয়ে মানবিরে যাবার নির্দেশ দিলেন। আদেশ পালিত হলো দ্রুতই।

দীর্ঘ কয়েক বছর পর শিকার করতে করতে ভুলক্রমে সাত পুত্র এক বিলের ধারে চলে আসে। সেখানে শাক তুলছে আট কন্যা। পরস্পরকে দেখে আকর্ষিত হলো। ধীরে ধীরে সেই আকর্ষণ গড়ালো দৈহিক মিলনের পর্যায়ে। ছোট কন্যাকে বাদ রেখে দেয়। ভাইদের মধ্যে যে বড় সে বড় বোনকে এইভাবে সাত জন পুরুষ সাত জন নারীকে গ্রহণ করে।  
 সেই সাত পুত্র থেকে জন্ম নিলো সাতটি বংশ- হাঁসদা, মূর্মূ, কিস্কু, হেমব্রোম, মারাণ্ডি, সোরেন এবং টুডু। তখন থেকেই মূলত গোত্রপ্রথা এবং বিয়ে প্রথার শুরু হয়।

তারপর তারা খোজা-কামান দেশে গিয়ে বসবাস করতে লাগলো। নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায় ও অত্যাচারে লিপ্ত হবার কারণে ঈশ্বর (ঠাকুরজিউ) তাদের উপর রুষ্ট হয়ে পড়ে। সাতদিন সাতরাত টানা অগ্নি বৃষ্টির মাধ্যমে পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ির বংশধরদের ধ্বংস করে। হারাতা পর্বতে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে গেলো পিলচু হাড়াম এবং পিলচু বুড়ি। ধ্বংসলীলার শেষে প্রথমে সাসাংবেদা এবং পরে চায়চাম্পাতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন এবং ঈশ্বর (ঠাকুরজিউ) আবার সন্তানাদি দান করলেন।
 
বর্তমান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর 
সামাজিক অবস্থান। সমাজ ও বিচারের কাঠামো।বহু যুগ যুগ ধরে হিন্দু এবং মুসলিমদের সাথে বসবাস করার পরেও সাঁওতালরা তাদের সামাজিক স্বাতন্ত্র্য হারায়নি। বস্তুত রাষ্ট্রীয় বিধানাবলির চেয়ে সামাজিক প্রথার প্রতি তাদের আনুগত্য অধিক। তার অন্যতম প্রমাণ বিচারব্যবস্থা। 

সাঁওতাল গ্রামের বিশেষ পাঁচজনকে নিয়ে গঠিত হয় গ্রাম পঞ্চায়েত।
 তারা হলেন- মাঝি হাড়াম বা গ্রামপ্রধান, পরাণিক, জগমাঝি, গোডেৎ এবং নায়েকে। আবার কয়েকটি গ্রামের প্রধানদের নিয়ে গঠিত হয় পরগণা পঞ্চায়েত। এর প্রধানকে বলা হয় পারগাণা। এর থেকেও বৃহত্তর ব্যবস্থা দেশ পঞ্চায়েত। সাঁওতাল সমাজে দেশ বলতে নির্দিষ্ট এলাকাকে বোঝানো হয়। সাধারণত দেশপ্রধানের অধীনে পাঁচ-ছয় জন পারগণা ও মাঝি হাড়াম থাকতে পারে। এই তিন স্তরের বিচারব্যবস্থার বাইরে আছে ল’বীর বা সুপ্রিম কোর্ট। জটিল বিষয়াদি নিয়ে বছরে মাত্র একবার এই আদলত বসে।     

সাঁওতালদের একটি বৈঠক। মাঝি হাড়াম বলতে গ্রামপ্রধানকেই বোঝানো হয়। শুধু বিচারিকভাবে না, সার্বিকভাবে গ্রামের সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। তার সহায়ক হিসেবে বাকি পদগুলো সৃষ্ট। পরাণিক পালন করে সহকারি গ্রাম প্রধানের দায়িত্ব। মাঝি হাড়াম অসুস্থ কিংবা অনুপস্থিত থাকলে তার দায়িত্ব বর্তায় পরাণিকের উপর। জগমাঝি পালন করে উৎসব তদারকির ভার। সেই সাথে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা তার মাধ্যমেই নিজেদের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে। সে হিসেবে তিনি যুব প্রতিনিধি। গোডেৎ এর কার্যাবলী অনেকটা চৌকিদারের অনুরূপ। আর নায়েকে বিশেষ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও পূজা উপলক্ষে বলি দেওয়ার মতো বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে।

স্থানীয় সমস্যাগুলো মীমাংসা করা হয় গ্রাম পঞ্চায়েতে। গ্রাম পঞ্চায়েতে অমীমাংসিত বিষয়গুলো পরগণা পঞ্চায়েতে উত্থাপিত হয়। দেশ পঞ্চায়েতে উঠে পরগণা পঞ্চায়েতে অমীমাংসিত সমস্যা। সবার শেষে স্থিত ল’বীরের মুঠোতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা।

গোত্র বিন্যাস।
বাংলার আবহাওয়াই গোত্রব্যবস্থার অনুকূল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রে বিভক্ত হিন্দু সমাজের দেখাদেখি এখানকার মুসলমান সমাজও বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল সৈয়দ, শেখ, পাঠান ও দেশি মুসলিম হিসেবে। তবে তাদের কারোরই প্রভাব সাঁওতাল সমাজে পড়েনি। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের মধ্যে বসবাসকারী সাঁওতাল সমাজ মূলত ১২টি ভাগে বিভক্ত। তারা হলো- কিস্কু, হাঁসদা, মূর্মূ, হেমব্রম, মারণ্ডি, সোরেন, টুডু, বাস্কি, গুয়াসোরেন, বেসরা, পাউরিয়া এবং চোঁড়ে। পৃথিবীতে
প্রায় ৫,০০০ আদিবাসী গোষ্ঠী আছে।
ভারতে প্রায় ৭০০ এরও অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। পশ্চিমবাংলায় মোট ৪০ টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে Scheduled Tribe বা তপশীলি উপজাতি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

দৈনন্দিন জীবনাচার।
সাঁওতালদের খাদ্যতালিকা বাঙালি হিন্দু কিংবা মুসলমানের খাদ্যতালিকার মতোই। ভাত, মাছ, মাংস নিরামিষ কিংবা বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক পিঠা তাদের খাবার হিসেবে বিদ্যমান। নেশা জাতীয় খাদ্যের মধ্যে হাড়িয়া বা ভাত পচানো মদ প্রধান। এছাড়া আছে ভাঙ, তাড়ি, হুকা এবং গাঁজা। অনেক মেয়ে হাড়িয়া ও ধূমপানে অভ্যস্ত থাকলেও সব সাঁওতাল ধূমপান করে না। অতি ‍উৎসাহী অনেকেই তাদের খাদ্যাভ্যাসে কাঠবিড়ালী, গুইসাপ এবং কাঁকড়ার নাম উল্লেখ করেন।
 
গরীব পুরুষদের প্রধান পরিধেয় নেংটি। পোশাকটি একসময় বাংলার অধিকাংশ মানুষই পরিধান করতো বলে এখনো পরিচিত। তবে স্বচ্ছলদের মধ্যে সাধারণ পোশাক হিসাবে ধুতি এবং পাগড়ি বেশ জনপ্রিয়। আধুনিক শিক্ষিতরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের অনুরূপ প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবি ও পাজামা প্রভৃতি পরিধান করে। মেয়েদের পোশাক মোটা শাড়ি বা ফতা কাপড়। তবে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েরা বাঙালি মেয়েদের মতোই শাড়ি, ব্লাউজ এবং পেটিকোট পরে। 

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সাঁওতাল নারী 
ও পুরুষ। সাঁওতাল রমণীরা সৌন্দর্য সচেতন। স্বর্ণালঙ্কারের প্রচলন না থাকলেও গলায় হাঁসুলি, মালা ও তাবিজের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া কানে দুল, নাকে নথ ও মাকড়ী, সিঁথিতে সিঁথিপাটি, হাতে বালা, চুড়ি এবং বটফল, বাহুতে বাজু, কোমরে বিছা, হাতের আঙুলে অঙ্গুরী, পায়ের আঙুলে বটরী প্রভৃতি অলঙ্কার বেশ জনপ্রিয়। কখনো খোঁপায় ফুল গুঁজে, কখনো কাঁটা ও রঙিন ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা হয়। দরিদ্র মেয়েরা বিশেষ প্রকার মাটি ব্যবহার করে শরীর মাজতে, যা নাড়কা হাসা নামে পরিচিত।

ক্ষুদ্রাকার ঘরগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন। নিম্নাংশ রঙিন করা ছাড়াও দেয়ালে আঁকা হয় নানা রঙের ছবি। বাসায় আসবাবপত্রের আধিক্য নেই। কাঠ, বাঁশ ও পাট ব্যবহারের প্রাচুর্য দেখা যায়। তীর ধনুক ও টোটা প্রায় সব সাঁওতাল বাড়িতেই আছে।

উৎসব-অনুষ্ঠান সাঁওতাল সমাজ 
উৎসবপ্রধান। সাধারণত দুই ধরনের উৎসব দেখা যায়। জন্ম-বিবাহ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক উৎসব এবং পার্বণিক উৎসব। সব অনুষ্ঠান ঝাঁকঝমকপূর্ণ না হলেও বিয়ে ও পার্বণিক অনুষ্ঠানগুলো ঘটা করে পালিত হয়। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মতো সাঁওতাল শিশু জন্মের পাঁচ কিংবা পনেরো দিনে অনুষ্ঠিত হয় অন্নপ্রাশন। এছাড়া নামকরণ, কানে ছিদ্র করা এবং সিকা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় উৎসব। সিকার বদলে মেয়েরা ব্যবহার করে ঈশ্বরের চিহ্ন। 

সাওতাল সমাজের বিয়ের নিয়ম। 
সাঁওতাল সমাজে চার ধরনের বিয়ে প্রচলিত আছে। অভিভাবকের পছন্দ মাফিক বিয়ে হলে তাকে বলা হয় ডাঙ্গুয়া বাপ্লা বা আনুষ্ঠানিক বিয়ে। আগে থেকে বিদ্যমান প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ালে সেই বিয়েকে বলা হয় আঙ্গির বা প্রেমঘটিত বিয়ে। এছাড়া আর দুই প্রকারের বিয়ে হলো অ-র বা বলপূর্বক বিয়ে এবং ইতুত বা কৌশলে বিয়ে। অ-র বিয়েতে কোন তরুণ তার পছন্দের তরুণীকে সিঁদুর পরিয়ে দেয় জোর করে। পরবর্তীতে বৈঠক ডেকে তরুণীর মতামত নেওয়া হয়। তরুণী হ্যাঁ বললে কিছু করার থাকে না কিন্তু না বললে তরুণকে দণ্ডিত করা হয়। ইতুত বিয়েটাও প্রায় কাছাকাছি। শুধু এক্ষেত্রে তরুণ সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে সিঁদুর পাতা গ্রামপ্রধানের কাছে জমা দেয়। গ্রামপ্রধান যুবতীর মত জানতে চান। হ্যাঁ হলে বিয়ে হয়ে গেছে বলে ধরা হয়।
সাঁওতাল সমাজে পণপ্রথা প্রচলিত
 আছে। তবে তা খুবই নগণ্য। সর্বনিম্ন ১২টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৫টাকা। বরপক্ষ কন্যাপক্ষকে তিনটা কাপড় প্রদান করে। কনের দিদিমা কে দেয়া শাড়িকে বলা হয় বোঙ্গা শাড়ি। বাকি দুটি পায় কনের পিসিমা এবং মা। বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে। বিধবাকে সেই সমাজে বলা হয় ‘রাণ্ডি’। অন্যদিকে তালাক প্রাপ্তা মেয়েদের বলা হয় ছাডউই।

সাঁওতাল সমাজের অনুষ্ঠানাদি।  

 মৃত ব্যক্তির আত্মার জন্য পালিত হয় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান। সাঁওতালর মৃতকে কবর দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।
‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ কথাটা সাঁওতাল সমাজের জন্য আরো বেশি করে সত্য। বাংলা ফাল্গুন মাসে উদযাপিত হয় নববর্ষ। চৈত্রমাসে বোঙ্গাবুঙ্গি, বৈশাখে হোম, জ্যৈষ্ঠ মাসে এরোয়া, আষাঢ়ে হাড়িয়া, ভাদ্র মাসে ছাতা, আশ্বিনে দিবি, কার্তিকে নওয়াই এবং পৌষ মাসে সোহরাই উৎসব পালিত হয়। ধর্ম-কর্ম, উৎসব-অনুষ্ঠান সবকিছু কে ঘিরে থাকে নৃত্য আর গান।

ধর্ম-কর্ম।
সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণ নেই; ধর্ম আছে, ধর্মগ্রন্থ নেই। ধর্মের আদি দেবতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। সিং বোঙ্গা হলো সূর্যদেবতা। সূর্যের এমন প্রকাশ অনেক ধর্মেই দেখা যায়। চান্দো শব্দের অর্থও সূর্য। অন্যদিকে মারাংবুরু আদিতে একটি পাহাড়ের নাম ছিল। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় মহাজাগ্রত দেবতায়। বস্তুতপক্ষে সিং বোঙ্গা, চান্দো এবং মারাংবুরুর সাথে ঈশ্বরের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। শ্রেষ্ঠদেবতা অর্থে ঠাকুরজিউ ব্যবহৃত হয়। খুব সম্ভবত তা পরবর্তীকালে সংযোজিত। অনুরূপ কথা ধর্মদেবতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষের বিশ্বাস মতে, আদি দেবতা নিরাকার। স্বর্গ-নরক কিংবা জন্মান্তরবাদের তেমন কোন ধারণা তাদের মধ্যে নেই। ধর্ম-কর্ম আবর্তিত হয় পার্থিব জীবনের মঙ্গল অমঙ্গলকে কেন্দ্র করে। বোঙ্গা মানে নৈসর্গিক আত্মা। তাদের মতে, আত্মা কখনো মরে না; সর্বদা পৃথিবীতেই বিচরণ করে। বোঙ্গারাই সুখ-দুঃখের নিয়ন্তা। সাঁওতাল ধর্মীয় জীবনের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বোঙ্গাদের অবস্থান। এমনকি প্রত্যেক বাড়ির জন্য গৃহদেবতা হিসেবে আবে বোঙ্গা থাকে। আদিতে মূর্তিপূজা না থাকলেও ইদানিং দূর্গা ও শ্যামা পূজার মতো দাঁসাই উৎসব এবং মাই বোঙ্গার পূজা চালু হয়েছে। 


লোক-সংস্কৃতি সাঁওতাল সমাজ 
একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। জীবনের নানান সত্যকে বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করার জন্য গড়ে উঠে লোকজ গল্প ও কাহিনী এবং শ্লোক। যেমন-
দারে সাকাম সাগে নেনা
ঞুরুঃলাগিৎ চান্দো পালোঃ লাগিৎ
নিংমাঞ জানা মাকান নোয়া ধারতিরে
বাংদঞ টুণ্ডোং চান্দো বাং দঞ বাং আ।।

ভাবার্থঃ গাছের পাতা আসে ঝরে যাবার জন্য। আর আমি জন্মগ্রহণ করলাম পৃথিবী থেকে সরে যাবার জন্য। 
এরকম অজস্র গল্প রয়েছে। আবার যাপিত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভেতর জন্ম নিয়েছে নানান বিশ্বাস ও সংস্কার। অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় ফসল লাগালে অমঙ্গল হয়, চুল ছেড়ে গোশালায় গেলে গৃহপালিত পশুর অকল্যাণ ঘটে, রাতে এঁটো থালা বাইরে ফেললে দারিদ্রতা আসে- প্রভৃতি কালের ব্যবধানে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া সুলক্ষণা ও কুলক্ষণা নারীর বৈশিষ্ট্য, যাত্রা শুভ কিংবা অশুভ হবার কারণ, বৈবাহিক সম্পর্কের ঠিক-ভুলের প্রতীক প্রভৃতি তাদের বিশ্বাস ও সংস্কারে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে লোক-সংস্কৃতির অফুরন্ত উপাদানে সমৃদ্ধ সাঁওতাল সমাজ। 
এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির লালন করছে হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সাথে বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হতে দেয়নি। ক্ষুন্ন হতে দেয়নি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা। প্রতিদিনের প্রকৃতি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিশ্বাস এবং নৈতিক মূল্যবোধের আদর্শকেও দেয়নি কালিমালিপ্ত হতে। আদিবাসী সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য এখানেই।

সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষেরা অনেকটা বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করছিল। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের দামিনিকোতে বসবাস নির্দিষ্ট করে। স্থানটির পরবর্তী নাম হয় সাঁওতাল পরগণা।

সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ।
ভারতীয় ইতিহাসের সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটে ১৮৫৫-৫৬ সালে। ১৯৪৫ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে তেভাগা আন্দোলনে শহিদ ৩৫ জনের অনেকেই ছিলেন সাঁওতাল কৃষক। ১৯৫০ সালে নাচোলে কৃষক বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে তারা।
 ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন। ইংরেজ শাসন, জমিদার এবং নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠে বীরভূমের মাটিতে। নেহায়েত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আধুনিক বন্দুক কামানের মুখোমুখি হয়েও কাঁপিয়ে দিল ব্রিটিশ মসনদ। সিধু, কানু, চান্দ ও ভৈরবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক বছরের মাথায় বিদ্রোহ স্তিমিত হলো বটে। কিন্তু গোটা ভারতের মোহনিদ্রা ভেঙে দিয়ে গেলো। জন্ম নিলো অধিকার সচেতনতা। তার দলিল ঠিক পরের বছর থেকেই এই মাটিতে একের পর এক বিদ্রোহ। বিপ্লব ছোঁয়াচে রোগের মতো কী না! ইতিহাসের পাতায় ঘটনাটি সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল নামে স্বীকৃত। আর এর মধ্যে দিয়ে আলোচনায় আসে একটা আদিবাসী জনগোষ্ঠী- সাঁওতাল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সাঁওতাল যুবকদের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল।
 
বিদ্রোহের পর ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পরাজয়ের ফলে আবার বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে তারা। ছড়িয়ে পড়ে বাংলা, ত্রিপুরা ও উড়িষ্যায়। দীর্ঘদিন বন জঙ্গলে কেটেছে।

জমি হারানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। 
ভারতের অন্তত ১৭টি রাজ্য থেকে ১০ লাখেরও বেশি বনবাসী উপজাতি ও অন্যান্য জনজাতি পরিবারগুলিকে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট৷ ২০০৬ সালের অরণ্য অধিকার আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কিছু অরণ্যপ্রেমী সংগঠনের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ৷
এদের উচ্ছেদ করার পেছনে আপাত কারণ হলো, খনি ও কলকারখানার জন্য আরো জমি চাই৷ জীববৈচিত্র্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিল্পোদ্যোগীদের হাতে জমি তুলে দেওয়া চাই৷ ঝাড়খন্ডে কয়েক হাজার বনভূমি এলাকা দখল করে নিয়েছে আদানি কোম্পানি৷ 

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ।
 ভারতে প্রায় চার কোটি হেক্টর বনভূমিতে বসবাস করে প্রায় ১০ কোটির বেশি আদিবাসী ও অন্যান্য জনজাতি৷
আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ কোটি। 
এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার ইনুইট বা এস্কিমোস, উত্তর ইউরোপের সামি, নিউজিল্যান্ডের মাওরি অন্যতম। মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ আদিবাসী আছে বলিভিয়ায়। পেরু ও গুয়াতেমালায় অর্ধেক লোকই আদিবাসী। চীন, মায়ানমারেও বহু আদিবাসী রয়েছে। ভারতে প্রায় ১০.৪ কোটি আদিবাসী জনগণ বসবাস করেন যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ %। পশ্চিমবাংলায় প্রায় ৬০ লক্ষ আদিবাসীর বাস যা পশ্চিমবাংলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ %। মূলধারার জনগোষ্ঠীর থেকে আদিবাসীদের পৃথক জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস আছে। পশ্চিমবাংলায় মোট ৪০ টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘Schedule Tribe (ST) বা তফশিলি উপজাতি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সরকারী সুযোগ সুবিধা প্রদান করার জন্য।

সংযুক্ত রাষ্ট্র সংঘের (United Nations Organization – UNO) 
আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়েছে এবং ১৯৯৩ সালকে “আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী বর্ষ“ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত “আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী দশক“ ঘোষণা করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের উদ্বেগের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া। এছাড়া ১৯৯৫ সালের ৯ আগস্ট কে “বিশ্ব আদিবাসী দিবস“ ঘোষণা করা হয়। সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘ (United Nations Organization – UNO) ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়।

সাঁঝলির মা ঘুম থেকে উঠে তার মেয়ে কে বলে:- ভোর হয়ে গেছে বই রেখে একটু ঘুমিয়ে নে। বলে বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো গোছগাছ করে হারিকেনের আলো নিভিয়ে দেয়।
       -----------------------------------------------------
রচনাকাল :- ৬ মার্চ ২০২২
শ্রী শ্রী মা সেবাশ্রম,খাটুয়া,দোলন ঘাটা,মাঝদিয়া, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ,ভারত।
       ----------------------------------------------------
তথ্য সূত্র :- 
দেবব্রত সিংহ রচিত কবিতা 'তেজ' ।
  মু জামবনির কুঁইরি পাড়ার শিবু 
 কঁইরির বিটি সাঁঝলি বটে। এই বিখ্যাত কবিতা অবলম্বনে।। আদিবাসী বিদ্রোহী নারী।।
 গল্প ।
(০১) বাংলাদেশের সাঁওতাল: সমাজ ও সংস্কৃতি, মুহম্মদ আবদুল জলিল, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, নভেম্বর ১৯৯১
(০২) বাংলাদেশের আদিবাসী সংস্কৃতি, ড. মাযহারুল ইসলাম তরু, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৩১-৪২ এবং ১০৭-১১৭
(০৩) বাংলাদেশের আদিবাসীদের কথা, খুরশীদ আলম সাগর, শোভা প্রকাশ, ঢাকা
(০৪) আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি: সাঁওতাল

          <><>< সমাপ্ত ><><>




।। সঙ্গম বিপর্যয় ।। উপন্যাস

                    ।। সঙ্গম বিপর্যয় ।।
লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা
                      ।। প্রথম অধ্যায় ।।

অখন্ড ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 
বাংলার অর্থাৎ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার সিউড়ি সদর মহকুমার খয়রাশোল ব্লকের কাঁকর তলা থানার অধীনে নবাসন গ্রামের এক বনেদি পরিবারের ধর্মীয় নিষ্ঠাবান বনেদি পরিবারের ব্রাহ্মণ সন্তান রাম ভট্টাচার্য। 
বংশ পরম্পরায় টাকা-পয়সা ও সম্পদে সমৃদ্ধ পরিবার। রাম ভট্টাচার্যের সহধর্মিণী বিষ্ণুপ্রিয়া কয়েক বছর আগেই পরলোকগমন করেছেন। ৬০ দশকের বৃদ্ধ রাম ভট্টাচার্য সংসারের সব দায়িত্ব ছেলে-বৌমার উপরে দিয়ে, ধর্মকর্ম ও মানুষের সাথে ধর্মীয় আলোচনা নিয়ে প্রায় কয়েক শত বছরের পুরনো অষ্টধাতুর শ্রীবিগ্রহ রাধাগোবিন্দ ও নারায়ন শিলা মন্দির প্রাঙ্গণে সব সময় ব্যস্ত থাকেন। 

      রাম ভট্টাচার্য রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে মনে :- পৃথিবীর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তো হয়ে গেছে। বহু দিন ধরে সংসার ধর্ম পালন করলাম। সংসার মায়ার বাঁধনে আর জড়াতে চাই না। বহুদিনের ইচ্ছা গঙ্গাসাগর মেলায় গঙ্গা সঙ্গমস্থলে স্নান করার কিন্তু একা তো যাওয়া যাবে না, দল বেঁধে নদীর পথে নৌকায় যেতে হবে। 
প্রচলিত প্রবাদ বাক্য বলে "সব তীর্থ 
বারবার, গঙ্গাসাগর একবার" কারণ রাস্তায় পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়, তারপর জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হতে হয়। ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী এসব জলদস্যুদের কে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। গঙ্গাসাগর মেলায় যে সব মানুষেরা দর্শন ও স্নান করতে চান, বেশির ভাগ মানুষেরা বাড়িতে ফিরে আসে না। কারণ বয়স্ক মানুষের ঠান্ডাজনিত রোগের আক্রমণ, মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া জ্বর, নদীর জল পান করার জন্য ডায়রিয়া প্রধান শত্রু, জলহাওয়ার পরিবর্তনে, বন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বন্যপ্রাণীর আক্রমণ সহ কতনা অজানা বিপদ লুকিয়ে আছে। গঙ্গাসাগর মেলা স্থল জঙ্গলময়, বসতি স্থাপন হয়নি। সেই কারণে সমাজের মাঝে প্রচলিত আছে, জীবনের শেষ বেলায় গঙ্গাসাগর যেতে হয়। মৃত্যুর পথে যাত্রীদের দিকে সতীর্থ যাত্রীরা ফিরে তাকায় না। হয়তো কোন বন জঙ্গলে বা নদীর জলে ফেলে দেয়। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েই গঙ্গাসাগর যেতে হবে। ভাগ্য যদি সহায় হয় তবেই, সংসারের পরিবারের আপন মানুষ জনের কাছে ফিরে আসা যায়।

    রাম ভট্টাচার্য জীবনের শেষ বেলায় কয়েক সপ্তাহ ধরে আকাশ পাতাল চিন্তা-ভাবনা ও বারবার খাতা কলমে হিসাব-নিকাশের অংক কষতে থাকে।

   একদিন রাতে মাটির রান্না ঘরের উঁচু বারান্দায় খেজুর পাতার নকশা যুক্ত আসনে বসে পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তি সহ পুরুষ ও ছেলেমেয়েরা এবং নাতি নাতনী একসঙ্গে খাবার খেতে থাকে। বাড়ির কয়েকজন বউ পরিবারের সদস্যদের পরিবেশন করতে থাকে।

রাম ভট্টাচার্য মহাশয় ভাত খেতে খেতে ছেলে-বৌমার উদ্দেশ্য 
বলে :- আমি গঙ্গাসাগর মেলায় যাব কারণ আমার বেলা তো চলে যাচ্ছে।
পরিবারের সদস্যরা খাওয়া বন্ধ করে স্তম্ভিত হয়ে রাম ভট্টাচার্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ছেলে বউমারা অজানা আতঙ্কে চমকিত হয়ে
 বলে :- বাবা, গঙ্গাসাগর যাবেন কেন ? জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয় বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। বাড়ির মন্দিরে বসে সাধন ভজন করলে হয় না।
রাম ভট্টাচার্য বলে :- তোমাদের কোন অভাব রাখিনি। আমার যা কিছু স্থাবর, অস্থাবর, টাকা ও বসত বাড়ি সহ সবকিছু তোমাদের সমান অংশে ভাগ করে দিয়েছি। কিন্তু আমার বৃদ্ধ বয়সের সময়ে তোমরা আমার মা-বাবা ও অভিভাবক হয়ে উঠেছে। বয়স্ক পিতার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার দায়িত্ব তোমাদের সকলের। 

আরো কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিবারের ছেলে-মেয়ে, বৌমাদের ও নাতি-নাতনির সাথে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা গঙ্গাসাগর মেলায় যাওয়ার জন্য অনুমতি দেয় এবং ছেলেরা গঙ্গাসাগর মেলায় পিতা কে পাঠানোর জন্য আয়োজনের তৎপর হয়।

রাম ভট্টাচার্যের গ্রামের বারোয়ারি কালী-শিব মন্দিরের সন্ধ্যা আরতি শেষ হওয়ার পর প্রসাদ সেবন করতে করতে উপস্থিত প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্যে বলেন :- গঙ্গাসাগর মেলায় কপিলমুনির আশ্রম দর্শন করতে যাচ্ছি। পৌষ সংক্রান্তিতে মহা অমৃত স্নান যোগের মাধ্যমে গঙ্গা সঙ্গমস্থলে স্নান করা হবে। আপনারা কেউ যেতে চাইলে, আমি রাস্তার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সহ সব খরচ বহন করবো। তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কয়েকজন লাঠিয়াল বাহিনী থাকবে। যারা তীর্থ দর্শন করতে যেতে চান, আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। 






                      
                      ।। দ্বিতীয় অধ্যায় ।।


পরের দিন দিনের আলোয় পৃথিবী 
আলোকিত হওয়ার সাথে সাথে গ্রামের বয়স্ক নর নারীগণ বিনা খরচে তীর্থ স্থানের পুণ্য লাভের আশায় দলে দলে ব্রাহ্মণের বাড়িতে আসতে শুরু করে। কয়েকদিন ধরে ব্রাহ্মণের বাড়িতে গ্রামবাসীদের সাথে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলতে থাকে।

রাম ভট্টাচার্য মহাশয় পঞ্জিকা দেখে বলেন :- তীর্থ ভ্রমণের জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হলে কার্তিক মাসের ১৪ তারিখ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ
 (৩১ অক্টোবর ১৯৩৭, রবিবার খ্রিস্টাব্দে।) আর শ্রী শ্রী দূর্গা পূজা ২৫ আশ্বিন ১৩৪৪ থেকে ২৯ আশ্বিন ১৩৪৪ পর্যন্ত। আজ আশ্বিন মাসের ২ তারিখ কিন্তু এর মধ্যে সব ব্যবস্থা করতে হবে।

রাম ভট্টাচার্য মহাশয় সবার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেয়। আলোচনার মাধ্যমে গ্রামের বয়স্ক নর-নারীদের তীর্থে যাওয়ার তালিকা তৈরি করা হয়। ব্রাহ্মণের ইচ্ছা অনুসারে বড় ধরনের দুটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। একটি নৌকায় থাকবে সতীর্থ মানুষেরা ও অন্য নৌকাটি থাকবে খাদ্য ও রান্নার সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এছাড়াও নৌকার মধ্যে রান্না করার ব্যবস্থা থাকবে। যার যেমন সাধ্য অনুসারে শুকনো খাবার নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

তীর্থ ভ্রমণের নৌকার বিবরণ। বড় ধরনের নৌকার উপর শক্ত খুটি দিয়ে,তার উপরে টিনের ছাউনি দিয়ে ঘর করা আছে। ঘরের আবার দুই দিকে অনেক গুলো জানালা আছে। অর্থাৎ বসবাসের উপযোগী সম্পুর্ন একটি ঘর। ছাদের চারদিকে শক্ত কাঠের দুই হাত উঁচু পাটাতন (রেলিং) দিয়ে ঘেরা। অর্থাৎ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য, কয়েক জন শক্ত মজবুত ছাউনীর উপর বসতে পারবে। নৌকার পিছনের ছাদের শেষের দিকে মাঝির জন্য নির্দিষ্ট জায়গা আছে অর্থাৎ ছাওনির উপর বসে নৌকার হাল ধরে রেখে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। নৌকার মধ্যে কাঠের পাটাতন দিয়ে বসবাসের জায়গা আছে। এছাড়াও একটি জলের কল আছে, কারণ নৌকার বাড়তি জল ফেলার জন্য ব্যবহৃত হয়। নৌকার অপর প্রান্তে অর্থাৎ সম্মুখে কাঠের ময়ূর লাগানো আছে। লোকে ময়ূরপঙ্খী নাও (অর্থাৎ নৌকা) বলে। একটি নৌকাতে 30 থেকে 35 জন মানুষ বসবাস করতে পারে এবং নৌকার শেষ প্রান্তে বাথরুমের ব্যবস্থা আছে কিন্তু মলমূত্র নদীর জলে পড়বে।
নৌকার সাথে একটা বালতি বাঁধা থাকে কারণ নদী থেকে বালতিতে করে জল তুলে রান্নার কাজ থেকে শুরু করে পানীয় জল ও স্নান সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। সচেতন মানুষেরা নদীর জলে ফিটকিরি মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর থেকে পানীয় জল হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন।
 
দূর্গা পূজার শেষ হওয়ার পর অতি দ্রুত পর্যায়ের আয়োজনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কয়েকজন শক্ত পক্ত যুবক লাঠিয়াল বাহিনী সহ প্রত্যেক পুরুষেরা একটি করে লাঠি সঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায়। এছাড়াও তীর্থযাত্রীদের চিকিৎসার জন্য একজন গ্রামের কবিরাজ কে নেওয়ার হয়।
রান্নার দায়িত্ব মহিলাদের উপর দেওয়া হয় কিন্তু পুরুষেরা সহযোগী হিসেবে থাকবে। 
নৌকার মধ্যে সামনের দিকে থাকবে পুরুষ যাত্রীরা এবং বাকি দশ জন মহিলা যাত্রীরা পিছনের দিকে থাকার সিদ্ধান্ত হয়। রান্না করার জন্য কয়েক মণ জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছে। রান্না কখনো নৌকার মধ্যে আবার সুযোগ সুবিধা বুঝে নদীর চরে করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন বন জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে হবে।

 রাম ভট্টাচার্য মহাশয় উঠানে বসে 
সতীর্থদের সাথে আলোচনা করছেন। ঠিক সেই মুহুর্তে গ্রামের এক ব্রাহ্মণ কুলের ২৩ বছর বয়সের বিধবা রমণী কল্যাণী গঙ্গাসাগরের সঙ্গমস্থলে গঙ্গাস্নানের পুণ্য লাভের আশায় ব্রাহ্মণ রাম ভট্টাচার্যের পায়ের উপর দৃষ্টি রেখে নতজানু অবস্থায় চোখের জলে চরণ ধৌত করতে করতে আকুতি মিনতি করে বলে :- "বাবা ঠাকুর, আপনাদের সাথে গঙ্গা স্নানে দয়া করে নিয়ে চলুন। আপনাদের সব কাজকর্ম করে দেবো। 

ব্রাহ্মণ রাম ভট্টাচার্য মহাশয় কিছু সময় ধরে চুপচাপ থাকার পর সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেন :- "মা কল্যাণী , আমাকে তো কঠিন সমস্যায় ফেলে দিলি, নৌকার মাঝে আর তো কোন জায়গায় নেই।

কল্যাণী, ব্রাহ্মণের পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে করতে বলে :- বিরাট নৌকার মাঝে একধারে না হয় কোন রকম করে জায়গা নিয়ে কষ্ট করে গঙ্গাস্নানে যাবে। বহুদিনের ইচ্ছা পুরন করুন এবং আমাকে সাথে করে নিয়ে চলুন।
গ্রামের একজন বয়স্ক ব্যক্তি বলেন :- আরো কল্যানী তোর এখনও গঙ্গাসাগর তীর্থ যাওয়ার বয়স হয়নি। গঙ্গাসাগরে বয়স্ক নারী-পুরুষেরা যায় কারণ মরে গেল কোন অসুবিধা নেই। 

কল্যাণী বলে :- আমার বলতে আর কি আছে? মরতে তো একদিন হবেই। তা গঙ্গাসাগরের মৃত্যু হলে পুণ্য লাভ করে স্বর্গে যেতে পারবো। এই নরক যন্ত্রণার হাত থেকে রক্ষা পাবো। কোন জন্মের পাপের ফলে অকালে বিধবা হয়েছি।

ব্রাহ্মণ রাম ভট্টাচার্য পা ছাড়িয়ে নিয়ে বলেন :- তোর একমাত্র আট বছরের নাবালক ছেলে কে কোথায় রেখে যাবে?    

কল্যাণী করুন স্বরে আফসোস করে বলে :- কেষ্ট (অর্থাৎ কৃষ্ণ) কে তার মাসির কাছে রেখে যাবে। কেষ্ট এর জন্মের পর বহুদিন ধরে সূতিকার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে ছিলাম। শরীর দুর্বলতার কারণে মায়ের দুধের অভাবে, কেষ্ট এর আর বাঁচার আশা ছিল না। কেষ্টের মাসি করুণাময়ী করুণা করে নিজের শিশু সন্তানের সাথে আমার ছেলেকে স্তন পান করিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে। মাসির আদর যত্নে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। সেই ছেলে মাসির আদর পেয়ে পেয়ে, মাকে ভুলে গিয়েছে। দুরন্ত ভীষণ মানে না কাহারো শাসন। মায়ের অধিকারে শাসন করতে গেলে, মাসি এসে চোখের জল ফেলে- কেষ্ট কে কোলে তুলে নেয় আর আমাকে বকাবকি করে। কেষ্ট মায়ের কাছে থেকে মাসির আদর যত্নে ভালো থাকবে।

 রাম ভট্টাচার্য মহাশয় খুশি হয়ে বলে :- চল, তবে গঙ্গাস্নানে কিন্তু ৩৫ জন মানুষের রান্নাবান্না দায়িত্ব নিতে হবে, সাথে অবশ্যই আমরা ও অন্যান্য মায়েরা থাকবে।    
                   
উপস্থিত একজন বয়স্ক ব্যক্তি কল্যাণীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে :- ঠাকুর মশায়, নাতনি আমার দারুন ভাবে কাজের মেয়ে আবার ভালো ভালো রান্না করতে পারে। মা দূর্গার মতো দশ হাত নেই কিন্তু একাই দশ জনের কাজ করে ফেলবে। 

কল্যাণী হাতজোড় করে বলে :- সবই, আপনাদের আশীর্বাদ বলে বাড়ির দিকে চলতে শুরু করে।

                       ।। তৃতীয় অধ্যায় ।।

  তীর্থযাত্রী গণ ভ্রমণে যাওয়ার জন্য
 জিনিসপত্র বাঁধাবাঁধি শুরু করে। কল্যাণী তাড়াতাড়ি করে টোপলা-টোপলি (অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কাপড়-চোপড় গুছিয়ে আরেকটি কাপড় দিয়ে বেঁধে নেওয়া।) গুছিয়ে নেয়। পরের দিন সকাল সকাল তীর্থ ভ্রমণের রওনা দেওয়ার জন্য প্রথমে প্রত্যেকে গুরুজনদের প্রণাম করে এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকে চোখের জলে বিদায় নেয়। পরিবারের মানুষেরা অজানা আতঙ্কের শোকের ছায়ার মধ্যে দিয়ে, মনের দুঃখ যন্ত্রণা কে পাষাণের মতো চাপা রেখে গুরুজনদের চোখের জলে ফেলে বিদায় জানাই। অনেক বয়স্ক মহিলারা ভাবে মনে স্বামী আর হয়তো ফিরে আসবে না, তাহলে কয়েক মাস পর বিধবার বেশ ধারণ করতে হবে। সন্তানগণ ভাবে হয়তো বাবাকে আর কোন দিন ফিরে পাবোনা।

কল্যাণী, রাম ভট্টাচার্য ও আরো কয়েক জন সতীর্থ ব্যক্তিগণ নদীর ঘাটে উপস্থিত হয়ে দেখতে পায়। কল্যাণীর একমাত্র ছেলে বালক কৃষ্ণ আগে থেকেই নৌকার উপর পাড়ের দিকে পিছন দিয়ে অজয় নদের জলের দিকে একমনে তাকিয়ে বসে আছে।
 
কল্যাণী সন্তান কে দেখে নিঃশব্দে ধীরে ধীরে নৌকার পাশে গিয়ে বলে :- তুই এখানে কেন ?

কৃষ্ণ বলে :- মা, তোমার সাথে গঙ্গাসাগর যাবে।

 কল্যাণী বলে :- কত আবদার গঙ্গাসাগরে যাবে! ওরে দস্যু ছেলে নৌকা থেকে নেমে আয় বলছি।

কৃষ্ণ মায়ের দিকে বড় বড় চোখ করে বলে :- আমি সাগরে যাবে-আমি সাগরে যাবে-আমি সাগরে যাবে।

কল্যাণী নৌকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে ছেলের দেহ ধরে টানাটানি করতে করতে অনেক কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে।
 
বালক কৃষ্ণ দুই হাত দিয়ে নৌকার পাটাতন আঁকড়িয়ে ধরে আকুতি মিনতির সাথে কান্না করতে করতে বলে :- "মা, আমি কোন কিছুর বিনিময়ে নৌকা থেকে নামবে না, আমি সাগরে যাবেই-আমি সাগরে যাবেই-আমি সাগরে যাবেই। 

 রাম ভট্টাচার্য মহাশয় নৌকার কাছে মাটিতে দাঁড়িয়ে বালকের স্নেহভাজন হয়ে হেসে বলে :- থাক থাক , কেষ্ট আমাদের সাথেই যাবে।

কল্যাণী রাগে উত্তেজিত হয়ে দাঁত 
মড়মড় করতে করতে বলে :- চল! তোর কে সাগরের জলে দিয়ে আসি। মায়ের কথাগুলো শোনা মাত্রই বালক মন হঠাৎ কালো মেঘের মতো মুখ করে চোখের কোণের থেকে নিম্নচাপের বৃষ্টির মতো জল গড়িয়ে নৌকার পাটাতনের উপর পড়ে এবং মায়ের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
 কল্যাণী উক্ত শব্দগুলো প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নিজের কানে শুনে দুঃখে অনুতাপে বুকের মধ্যে বেদনা অনুভব করে, অজানা আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠে। হৃদয় মাঝে কান্না করতে করতে চোখ বন্ধ করে নারায়ণ নারায়ণ জপের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতা কে স্মরণ করে। কিছুক্ষন পর ছেলে কে কোলে তুলে নিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে ঈশ্বরের কাছে মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করে এবং সারা দেহে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদর করতে থাকে।

রাম ভট্টাচার্য নৌকার উপর উঠে এসে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে চুপি চুপি কল্যাণী কে বলেন :- ছি-ছি- ছি, মা হয়ে ছেলেকে কখনো এমন কথা বলে। সবার দায়িত্ব যখন নিতে পেরেছি, তখন অবশ্যই এই বালকের দায়িত্ব নিতে পারবো। তারপর ভট্টাচার্য মশাই চোখ বন্ধ করে হৃদয়ের মাঝে অন্তর্যামী প্রভুর নিকট প্রার্থনা করে "হে প্রভু, বালক কৃষ্ণ কে রক্ষা করে।" এবং অবুঝ অজ্ঞানের জন্য বালক কৃষ্ণের মাকে ক্ষমা করে দিও।

 কৃষ্ণের মাসি "করুণাময়ী"' লোকের মুখে শুনতে পায় কৃষ্ণ নাকি মায়ের সাথে সাগরে যাচ্ছে। শোনা মাত্রই, সংসারে সব কাজ ফেলে পড়িমড়ি করে দৌড়াতে দৌড়াতে নদীর ঘাটে উপস্থিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে নৌকার উপর উঠতে গিয়ে পড়ে যায় কিন্তু কাহারো সহযোগিতা ছাড়াই আবার দ্রুত উঠে এসে কৃষ্ণ কে জড়িয়ে ধরে বলে :- বাছা, কোথায় যাবি রে বাপ! আমাকে একা ফেলে রেখে। ফিরে আয় বাপ, সাগরে গিয়ে দরকার নেই।

কৃষ্ণ,মাসি কে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাসি হাসি মুখ করে বলে :- সাগরে চললাম। মাসি, আবার আসিব ফিরে তোমার কোলে। আমার বহুদিনের ইচ্ছা সাগরে যাওয়ার।
 
মাসি করুণাময়ী কাদা মাখা কাপড় ও শরীরে পাগলের ন্যায় প্রলাপ বকতে বকতে ব্রাহ্মণের উদ্দেশ্য বলে :- "ঠাকুর মশায়, আমার ছেলে কেষ্ট বড় দুরন্ত- কে তারে সামলাতে পারবে?
জন্মের পর থেকে মাসিমা কে ছেড়ে কোনদিন কোথাও যায়নি। আমার ছেলে কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন! আমার ছেলেকে আমার বুকের ফিরিয়ে দিয়ে যাবেন, আমার ছেলেকে আমার বুকের ফিরিয়ে দিয়ে যাবেন।

কৃষ্ণ মাসিমার হাত ধরে বলে :- "মাসি, চিন্তা করে না, আমি আবার ফিরে আসবে তোমার কোলে।

ব্রাহ্মণ রাম ভট্টাচার্য মহাশয় করুণাময়ী কে বলেন :- আমি যতক্ষণ আছি, তোমার কৃষ্ণের কোন ভয় নেই। কৃষ্ণ যতই দুরান্ত হোক আমার কথা কিন্তু শোনে। এখন কার্তিক মাসের শুরু কিন্তু হালকা শীতের মৌসুম পড়ে গিয়েছে। সব নদ নদী শান্ত, সব জায়গাতেই, বহু লোকজন ও সাগর মেলা উপলক্ষে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে এবং পথের মাঝে কোন বিপদ নেই। যাওয়া-আসা দিয়ে প্রায় তিন মাস পর তোমার কৃষ্ণ কে ফিরিয়ে দেবো।

মাসি করুণাময়ী দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে টানা স্বরে বলে :- হে ভগবান, তিন মাস কেষ্ট কে ছেড়ে থাকতে হবে। না, আমি পারবো না। কেষ্ট সাগরে যাস না আমার বুকে ফিরে আয় বাপ ,কেষ্ট সাগরে যাস না আমার বুকে ফিরে আয় বাপ।

রাম ভট্টাচার্য মহাশয় আবার নতুন করে পঞ্জিকা খুলে শুভ তিথি নক্ষত্রের সময় দেখে নিয়ে নৌকার ও গঙ্গা দেবীর পূজা অর্চনা করার পর শুভ ক্ষণে শুভ মুহূর্তে তীর্থযাত্রা শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নবাসন গ্রামের সীমান্তের অজয় নদ থেকে দূর্গা দূর্গা বলে নৌকা ছেড়ে দেয়। সেই মুহূর্তে রমণী গণের উলুধ্বনি সহ শঙ্খের ধ্বনি সাথে সাথে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে।
 যত কুলনারী সহ আবাল বৃদ্ধ ভয়ে আতঙ্কিত মনে স্বজন হারানোর দুঃখে চোখের জল নিয়ে ঘাটে দাঁড়িয়ে তীর্থ যাত্রীদের বিদায় জানাই।  






                         ।। অধ্যায় :- চার ।।

কয়েকদিন ধরে অজয় নদের বুকের 
উপর দিয়ে চলতে চলতে এক সময় 
বৈষ্ণব তীর্থ জয়দেব কেন্দুলি গ্রামে উপস্থিত হয়ে রাম ভট্টাচার্য তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্য
বলেন :- এই মহান তীর্থভূমিতে আমরা এক রাত বাস করবো আর এই নদের চরে রান্না করে এক সাথে বালির উপর বসে খাওয়া দাওয়া করবো। গঙ্গা-অজয়ের মিলন স্থানের পবিত্র জলে স্নানাদি করে সকালের জল খাবারের আয়োজন করা হোক।

পড়ন্ত বিকেলে সবাই বালির চরে একত্রে হয়ে হরি কথা শোনার জন্য মন চঞ্চল হয়ে ওঠে।
কিছু সময় পর রাম ভট্টাচার্য মহাশয় সতীর্থদের সাথে মিলিত হয়।

কল্যাণী হাত জোড় করে বিনয়ের সঙ্গে দাতা রাম ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্যে বলে :- "বাবা ঠাকুর, আমরা বৈষ্ণব তীর্থ জয়দেব পূর্ণ ভূমিতে অবস্থান করছি। এই তীর্থের সম্পর্কে আলোচনা করুন।  

রাম ভট্টাচার্য মহাশয় তার বন্ধু লক্ষণের উদ্দেশ্যে বলেন :- আরো টোলের মাস্টার কিছু বলে।   

লক্ষণ মহাশয় মাথা নত করে সবার 
উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বলেন :- বীরভূম জেলার কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রাম কবি জয়দেবের জন্মভূমি এবং সাধনভূমি।
 ‘ধীরে সমীরে যমুনাতীরে’ কৃষ্ণ প্রেমিক যে বাঁশির সুর শোনে।
জয়দেবের পিতার নাম ভোজদেব, মাতা বামদেবী; আর তাঁর স্ত্রী হলেন পদ্মাবতী। সংস্কৃত সাহিত্য এবং সঙ্গীত শাস্ত্রে জয়দেবের অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি ছিলেন রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি। আকৈশোর ভাবুক ও উদাসীন প্রকৃতির জয়দেব দয়ানিধি নামে কাশীর এক সাধুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন। যৌবনে সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছেয় নীলাচলের পথে অগ্রসর হন। কিন্তু সন্ন্যাস নেওয়া আর হয় না। পদ্মাবতীকে বিয়ে করে সংসারে বাঁধা পড়তে হয় তাঁকে। জয়দেবের স্ত্রী-ভাগ্য ভাল। পদ্মাবতীকে সাধন-সঙ্গিনী হিসেবেই পেয়েছিলেন তিনি। সংসারে থেকেও পদ্মাবতীকে নিয়েই সাধনকর্মে রত হন জয়দেব। জয়দেবের সাধনার নাম ‘পরকীয়া সাধনা’। এ পথের অধিকার কেবল নিষ্কাম ভক্তের। জয়দেবের জীবনের মূলমন্ত্র ছিল কৃষ্ণপ্রেম। স্বকীয়া রমণী পদ্মাবতীকে পরকীয়া ভাবে সাধনায় চিরসময় পরমপুরুষের দিব্যানুভূতি লাভ করেন তিনি। জয়দেবের সাধনচিন্তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যে।

‘গীতগোবিন্দ’ রচিত হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে। এই কাব্য সম্পূর্ণ হওয়ার মূলে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কাব্যটির মানভঞ্জন পালা রচনায় কবি বেশ বিপদে পড়েছিলেন। কৃষ্ণ কী ভাবে প্রেমময়ী রাধার মান ভাঙাবেন! জয়দেব গোস্বামীর হৃদয়ে সৃষ্টি-সমস্যার এই অধ্যাত্ম-আগুন জ্বলে ওঠে। এমন অশান্ত হৃদয়ে এক দিন পুথি ছেড়ে তিনি স্নানে গিয়েছেন। কুটিরে কেবল পদ্মাবতী। তিনিও কবির এই মানসিকতার জন্য চিন্তান্বিত। এমন সময় দেখেন—অন্য দিনের তুলনায় অনেক আগেই কবি স্নান সেরে ফিরে এসেছেন। তারপর মধ্যাহ্ন-ভোজন শেষ করে আবার পুথি নিয়ে বসেন। নিত্যদিনের ন্যায় পদ্মাবতীও স্বামীর প্রসাদী থালায় অন্ন-গ্রহণে বসেছেন। এমন সময় এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। পদ্মাবতী দেখেন, স্বামী আবার স্নান সেরে ফিরছেন। ভয়ে-বিস্ময়ে পদ্মাবতী এর রহস্য জানতে চাইলেন। এ দিকে পদ্মাবতীকে আহার করতে দেখে জয়দেবও অবাক। পূর্বাপর সমস্ত ঘটনা জানালেন পদ্মাবতী। দু’জনেরই বিস্ময়ের শেষ নেই। কথিত, রহস্য জানার জন্য তাঁরা পুথির কাছে উপস্থিত হলেন। পুথিতে যা দেখলেন, তা দেখে তাঁরা অনির্বচনীয় বিস্ময়ে রোমাঞ্চিত হলেন। কবি জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের যে পাদপূরণ নিয়ে বড় চিন্তান্বিত ছিলেন, সে জায়গায় কে যেন লিখে গেছেন—‘স্মরগরলখণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনং দেহিপদপল্লবমুদারম’। কৃষ্ণপ্রেম-সাধক ও সাধিকা জয়দেব ও পদ্মাবতী দেখলেন, প্রেমময় কৃষ্ণ স্বয়ং রাধার চরণ মাথায় ধরে পরকীয়া তত্ত্বের মহিমাকে মানুষের শিরোধার্য করে গিয়েছেন।

জয়দেব গোস্বামী নিজে গীতিকার এবং গায়ক ছিলেন। নৃত্যশিল্পে পারদর্শী ছিলেন পত্নী পদ্মাবতী। ‘পদ্মাবতী সুখসমাজ’ নামে জয়দেবের একটি গীতিনাট্যের দল ছিল। এই দলে কৃষ্ণের উক্তি সহ অন্যান্য গানগুলি গাইতেন জয়দেব। আর রাধা ও তার সখীদের উক্তিগুলি নৃত্যযোগে পরিবেশন করতেন পদ্মাবতী। জয়দেব-পদ্মাবতীর সঙ্গীত-শাস্ত্রে পারদর্শিতার কথা ‘সেক শুভোদয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। সেই কাহিনি অনুসরণেই মুক্তপদ দে তাঁর ‘তীর্থময় বীরভূম’ বইয়ে বলেছেন, প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ব্যুঢ়ন মিশ্র ওড়িশা জয় করে লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় উপস্থিত হন। রাজসমীপে তিনি ‘পটমঞ্জরী’ রাগ গাইলেন। গান শেষ হলে দেখা গেল, সভার কাছে থাকা অশ্বত্থ গাছটি পত্রহীন হয়ে গিয়েছে। সকলে হতবাক। রাজা ব্যুঢ়ন মিশ্রকে জয়পত্র দিতে প্রস্তুত হয়েছেন, এমন সময় রাজসমীপে হাজির হন পদ্মাবতী। তিনি রাজসমীপে প্রস্তাব রাখেন জয়পত্র জয়ের প্রতিযোগিতা হোক—‘হয় আমার সঙ্গে না হয় জয়দেবের সঙ্গে ব্যুঢ়ন মিশ্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করুন’। প্রতিযোগিতা হয়েছিল পদ্মাবতীর সঙ্গে। পদ্মাবতী তাঁর অপূর্ব কণ্ঠে ‘গান্ধার’ রাগ পরিবেশন করেন। সে রাগ শুনে রোমাঞ্চিত সভাসদ পদ্মাবতীর জয়ধ্বনি দেন। ব্যুঢ়ন মিশ্র জানান—নারীর সঙ্গে তিনি প্রতিযোগিতা করবেন না। তখন জয়দেবকে রাজসভায় আহ্বান জানানো হয়। স্থির হয় সুরের আকর্ষণে যিনি পত্রহীন বৃক্ষ হরিৎ পত্রে সজীব করতে পারবেন তিনিই জয়পত্র পাবেন। ব্যুঢ়ন মিশ্র তাঁর অক্ষমতা জানান। তখন জয়দেব ‘বসন্তরাগ’ আলাপ শুরু করেন। জয়দেব-কণ্ঠনিঃসৃত বসন্তরাগ আলাপ-ধ্বনিতে সভাসদ বিমোহিত হন এবং পত্রহীন বৃক্ষ সজীব-কিশলয়ে পূর্ণ হয়। রাজা লক্ষ্মণ সেন সেদিন সানন্দে গীতসুধাকর জয়দেবকে জয়পত্রে সম্মানিত করেন।

জয়দেব-কেঁদুলির মেলা বহু প্রাচীন। এই মেলা প্রসঙ্গে কিছু প্রমাণ, কিছু কিংবদন্তির কথা বলতে হয়। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অজয়তীরে কেন্দুবিল্বে জয়দেব গোস্বামীর মেলার কথা রয়েছে। আমরা বলি আরও অতীতের কথা। জয়দেব গোস্বামীর ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্য রচিত হয় ১১৫৯ সালে। সেই সময়েই এক পৌষ-সংক্রান্তির দিন কবি জয়দেব মকর-বাহিনি গঙ্গার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন বলে কথিত। পৌষমাসের শেষ দিন কবি জয়দেব ভোরবেলা গঙ্গাস্নানে যেতেন। এক বার কোনও অসুবিধার জন্য স্নানে যেতে না পারার মতো পরিস্থিতি দেখা দেয়। এর জন্য মনের মধ্যে তিনি অশান্তি অনুভব করেন। সংক্রান্তির পূর্বরাত্রে চোখের জল নিয়ে শয্যা গ্রহণ করেন। সেই রাত্রেই কবি এক অলৌকিক স্বপ্ন দেখেন। মকরবাহিনী গঙ্গা হেসে বলেছেন—‘ক্ষোভ দূর কর। তুমি যেতে পারলে না যখন, তখন আমি আসব অজয়ের স্রোত বেয়ে কদমখণ্ডীর ঘাটে। তোমার স্পর্শে ধন্য হব আমি।’

ঘুম ভেঙে কবির বিস্ময়ের সীমা ছিল না। ভোরের অন্ধকারেই কদমখণ্ডীর ঘাটে গিয়ে উপনীত হন জয়দেব। দেখেন ঘাটের সম্মুখে অজয়ের জলধারা থেকে দিব্য মণিময়—কঙ্কনপরা দু’খানি অমলধবল বর্ণাভ হাত বেরিয়ে ঊর্ধ্বে উঠেছিল। মা গঙ্গা কবিরাজ গোস্বামীকে সঙ্কেতে জানিয়েছিলেন, তাঁর আগমন বার্তা। মা-গঙ্গার দর্শনধন্য উল্লসিত কবি জয়দেব সেদিন অপার আনন্দে আপ্লুত হয়ে অনেক সাধু-সন্ন্যাসীদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে এক মহোৎসবের আয়োজন করেন। অনেকে মনে করেন, তখন থেকেই ওই দিনটি স্মরণে প্রত্যেক বছর কেঁদুলিতে বহু বৈষ্ণবের সমাগম ঘটে এবং মহোৎসব হয়। আবার দ্বাদশ শতাব্দীর কোনও এক পৌষ সংক্রান্তির দিন জয়দেবের তিরোধান ঘটে। বৃন্দাবনের নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের ছেচল্লিশতম গুরু ছিলেন তিনি। গুরুর দেবতা দর্শন ও তিরোধানের তিথিতে নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের বহু সন্ন্যাসী পবিত্র কদমখণ্ডীর ঘাটে তর্পণ করতে আসতেন। তাঁদেরই এক জন ছিলেন রাধারমণ ব্রজবাসী। তাঁর উদ্যোগ ও বর্ধমান রাজবাড়ির অর্থ নিয়ে কেঁদুলিতে জয়দেবের জন্মভিটের উপরে রাধাবিনোদ মন্দির তৈরি হয়। বর্ধমানের রাজা ত্রিলোকচাঁদ বাহাদুর ১৬৯২ সালের পৌষ সংক্রান্তির দিনই নাকি ওই মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এক বিশাল উৎসবের আয়োজন করেন।

 আমাদের অনুমান জয়দেবের স্মৃতিরক্ষার্থে আয়োজিত সেই উৎসবই এক দিন জয়দেব মেলা নামে পরিচিত হয়। পরকীয়া সাধক ও গীত সুধাকর জয়দেব স্মরণে বাউল সমাবেশও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক জনমানসে ছড়িয়ে পড়া এই মেলায়—গোপীযন্ত্রের গাবগুবাগুব ধ্বনিতে অশ্বত্থবটের পত্রপল্লবে শিহরণ জাগে, বাঁয়া তবলায় দিদাম দিদাম রবে ঘা পড়ে, পায়ে নূপুর ঝঙ্কার দেয় আর তালে তালে শোনা যায় দেহতত্ত্বের গান।

পরেরদিন আবার জলপথে অজয় নদের বুকের উপর দিয়ে নৌকা চলতে শুরু করে। 
বিনোদ কুমার চক্রবর্তী বলেন :- অজয় নদের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করছি।
 অজয় নদ ভারতের বিহার রাজ্যের জামুই জেলা চাকাই ব্লকের বাটপার অঞ্চলের ৩০০ মিটার উচু পাহাড় থেকে উৎসারিত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে এটি দেবীপুরের নিকটে ঝাড়খণ্ডে প্রবেশ করে (দেওঘরের প্রস্তাবিত শিল্প অঞ্চল)। ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার চিত্তরঞ্জন এর নিকট শিম কুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। তারপর পশ্চিম বর্ধমান জেলা ঘোরাঘুরি করে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের মধ্যে দিয়ে আবার পশ্চিম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া ঘাট (অর্থাৎ বিদ্রোহী কবি ও সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমি) , বিরকুলটি ঘাট, দরবারডাঙা ঘাট ও সিদ্ধ পুর ঘাট হয়ে বীরভূম জেলার বড় কোলা, তামড়া, বিনুই গ্রাম গুলোর বেড়ানোর পর নবাসন গ্রামের সীমানায় উপস্থিত হয়। নবাসন গ্রামের তীর্থযাত্রীদের নিয়ে নবাসন গ্রামের সীমানা থেকে পূর্বে দিকে প্রবাহিত হয়ে পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম থানার নারেং গ্রামের পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় অজয়ের জন্মস্থান থেকে মোট দৈর্ঘ্য ২৮৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কাটোয়া শহরের কাছে ভাগীরথী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। স্থানটি অজয়-ভাগীরথীর সঙ্গমস্থল নামে প্রসিদ্ধ । হুগলি নদী মূলত গঙ্গা নদী ও ভাগীরথী নদী কে মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। 
আজ এখানে বিশ্রাম নেওয়া হবে। কাটোয়া শহরের আশে পাশে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনেক লীলা আছে । বৈষ্ণব তীর্থ বলা হয়, দর্শন করে তার পর আবার রওনা দেবো।

 অজয় নদের কাছে থেকে ভাগীরথী নদী তীর্থ যাত্রীগণ নিয়ে চলা শুরু করে। 
এক ভক্ত মা বলেন :- মাস্টার, পবিত্র গঙ্গা নদীর জন্ম সম্পর্কে কিছু বলুন।
 বালক কৃষ্ণ মায়ের কাছে থেকে উঠে রাম ভট্টাচার্য পাশে বসে।
রাম ভট্টাচার্য, বালক কৃষ্ণ কে এক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে :- দাদু ভাই, মন দিয়ে শুনছো তো!

 বয়স্ক এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিব প্রসাদ ব্যানার্জি বলেন :- গঙ্গা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পবিত্র নদী। এই নদীকে গঙ্গাদেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। গঙ্গার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। একাধিক পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজ্যিক রাজধামূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু সংস্কৃতিতে ভাগীরথীর গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও অলকানন্দা নদী দীর্ঘতম। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট শৃঙ্গের বরফ গলা জল। ভাগীরথীর উৎস গোমুখ গঙ্গোত্রী হিমবাহের (উচ্চতা ৩,৮৯২ মিটার (১২,৭৬৯ ফুট))।

গঙ্গার জলের উৎস অনেকগুলি ছোট নদী থেকে। এর মধ্যে ছটি দীর্ঘতম ধারা এবং গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থল গুলোকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছটি ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলি গঙ্গা, নন্দাকিনী, পিন্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী। পঞ্চ প্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থল অলকানন্দার উপর অবস্থিত। এগুলি হল বিষ্ণু প্রয়াগ (যেখানে ধৌলি গঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে), নন্দ প্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গঙ্গার দৈর্ঘ্য্য ২৫০ কিলোমিটার (১৬০ মাইল)। হৃষিকেশের কাছে গঙ্গা হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থ শহর হরিদ্বারে গাঙ্গেয় সমভূমিতে পড়েছে। হরিদ্বারে একটি বাঁধ গড়ে গঙ্গা খালের মাধ্যমে গঙ্গার জল উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে জলসেচের জন্য পাঠানো হয়ে থাকে। এদিকে গঙ্গার মূলধারা হরিদ্বারের আগে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হলেও হরিদ্বার পেরিয়ে তা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে।

এরপর গঙ্গা কনৌজ, ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে একটি অর্ধ-বৃত্তাকার পথে ৮০০-কিলোমিটার (৫০০ মাইল) পার হয়েছে। এই পথেই রামগঙ্গার সাথে গঙ্গা মিশেছে। এলাহাবাদ ত্রিবেণী সঙ্গমে যমুনা নদী গঙ্গায় মিশেছে। সঙ্গমস্থলে যমুনার আকার গঙ্গার চেয়ে বড়। যমুনা গঙ্গার জল ঢালে, যা উভয় নদীর যুগ্ম প্রবাহের জলধারায় চলতে থাকে। এখান থেকে গঙ্গা পূর্ব বাহিনী নদী। যমুনার পর গঙ্গায় মিশেছে কাইমুর পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদী তমসা। তারপর মিশেছে দক্ষিণ হিমালয়ের উৎপন্ন নদী গোমতী । তারপর গঙ্গায় মিশেছে গঙ্গার বৃহত্তম উপনদী ঘর্ঘরা, ঘর্ঘরার পর দক্ষিণ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে শোন। উত্তর থেকে মিশেছে গণ্ডকী ও কোশী। কোশী , ঘর্ঘরা ও যমুনার , পর গঙ্গার তৃতীয় বৃহত্তম উপনদী।

এলাহাবাদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ পর্যন্ত গঙ্গা বারাণসী, পাটনা, গাজীপুর, ভাগলপুর, মির্জাপুর, বালিয়া, বক্সার, সৈয়দপুর ও চুনার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভাগলপুরে নদী দক্ষিণ-দক্ষিণ পূর্ব দিকে বইতে শুরু করেছে। পাকুড়ের কাছে গঙ্গার ঘর্ষণ ক্ষয় শুরু হয়েছে। এরপর গঙ্গার প্রথম শাখা নদী ভাগীরথী-হুগলি জন্ম, যেটি দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে হয়েছে হুগলি নদী। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরোনোর কিছু আগে হুগলি নদীতে গড়ে তোলা হয়েছে ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধ ও ফিডার খালের মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হুগলি নদীকে আপেক্ষিকভাবে পপি মুক্ত রাখা হয়। ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর সঙ্গমের পর হুগলি নদীর উৎপত্তি। এই নদীর বহু উপনদী রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপনদী হল দামোদর নদ। 
হুগলি নদী সাগর দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। 

প্রসিদ্ধ নগর সমূহের উপর দিয়ে চলেছে।
উত্তরাখণ্ড রাজ্যের :- হৃষিকেশ, হরিদ্বার।
উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের :- ফতেহগড়, বিজনোর, কনৌজ, বীথুর, কাসগঞ্জ, কানপুর, এলাহাবাদ, মির্জাপুর, বারাণসী, গাজীপুর, ফররুখাবাদ, নারোরা।
বিহার রাজ্যের :- ভাগলপুর, পাটনা, হাজিপুর, কাটিহার, মুঙ্গের।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের :- মুর্শিদাবাদ, পলাশী, নবদ্বীপ-মায়াপুর,কালনা, শান্তিপুর, কলকাতা, বরাহনগর, ডায়মন্ড হারবার, হলদিয়া, বজবজ, হাওড়া, উলুবেড়িয়া, ব্যারাকপুর।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপ ধাম এসে গিয়েছে, মাস্টারদা আজ এই পর্যন্তই রাখুন। কল্যাণী চায়ের ব্যবস্থা কর।

নবদ্বীপ শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মস্থান দর্শন সহ বিভিন্ন মন্দির দর্শন করে ও রাত্রি বাস করে আবার চলা শুরু হয়। শান্তিপুর, কলকাতা, ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ এলাকার নামখানা হয়ে নৌকা গঙ্গার বুকের উপর দিয়ে মিলনের আনন্দ চলতে থাকে সাগর সঙ্গম স্থলের দিকে।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- ভাগীরথী-হুগলি অর্থাৎ গঙ্গা নদী কপিল মুনির আশ্রয়স্থলের ভক্তের মনের বাসনা পূরণ করে জগতের পাপ তাপ নিজের দেহে ধারণ করে দ্রুত বেগে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। আর এই মিলিত স্থলকে গঙ্গা সঙ্গম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। গঙ্গা মা, গোমুখ গঙ্গোত্রী হিমবাহের ভাগীরথী নদীর উৎস স্থল থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা অর্থাৎ সাগরদ্বীপ (গঙ্গাসাগর) ২,৫৫০ কিলোমিটার (১,৫৮০ মাইল)। ভাগীরথীর উৎস ধরে হুগলি-সহ গঙ্গার দৈর্ঘ্য মাপলে, মোট দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়ায় ২,৬২০ কিলোমিটার (১,৬৩০ মাইল) পথ অতিক্রম করে সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে।

 মূলত বর্তমান ২০২১ খ্রিস্টাব্দে যে স্থানে গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হয়,মূল সঙ্গমস্থল থেকে অনেক দূরে। 

আমরা বিভিন্ন নদ-নদীর জলে পথে নৌকায় ভ্রমণের মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গমস্থলে আসার আনন্দ, দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি কাটিয়ে আজ (অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন) নবাসন গ্রাম থেকে রওনা দিয়ে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে ৪৩৬ কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌছালাম।

       মাঝি সহ তীর্থ ভ্রমণের যাত্রীগণ গঙ্গাদেবীর, কপিল মুনি, সাগর মহারাজের ও ভাগীরথীর নামে জয়ের ধ্বনি ও উলুধ্বনি দিতে থাকে। নৌকা তীরে আসতেই লোকজন লাফিয়ে লাফিয়ে সমুদ্রের পাড়ের জলে নামতে শুরু করে। শান্তির দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বালুর চরে আনন্দে হাত পা নাড়াতে শুরু করে। যাত্রীগণ নৌকার সিঁড়ি লাগিয়ে দেওয়ার সময় দিচ্ছে না। 

চঞ্চল বালক কৃষ্ণের গ্রামের নদীর পাড় থেকে লাফ দিয়ে জলে ঝাঁপ দেওয়ার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তৎক্ষণাৎ মায়ের কাছে থেকে সরে এসে নৌকার উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পাড়ে নামতে গিয়ে জলের মধ্যে পড়ে যায়। সেই মুহূর্তে সাগরের ঢেউ এসে নোনা জলে জামা কাপড় ভিজিয়ে দেয়। মা কল্যাণী দ্রুত নৌকা থেকে নামার আগেই, কৃষ্ণ ভিজে জামা কাপড় খুলে ফেলে, শীতের সকালের কড়া মিটে মিটে রৌদ্রে উলঙ্গ হয়ে বালুর চরে শুয়ে পড়ে। মা এসে হাত ধরে কিন্তু লাফিয়ে উঠে মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মনের আনন্দে বালুর চরে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে।  

কল্যাণী ছুটতে ছুটতে বলে :- এই কৃষ্ণ প্যান্ট টা তো পর, লোকে কি বলবে?

কৃষ্ণ মাকে জড়িয়ে ধরে বলে :- "মা, এই সাগর এলাকা কত দিনের চেনা মনে হচ্ছে।
 
মা কল্যাণী হাসতে হাসতে বলে :- হয়তো আগের জন্মে, এই এলাকায় জন্ম নিয়েছিল। দেখ খুঁজে আগের জন্মের কোন মাকে পাস কিনা!

রাম ভট্টাচার্য বলে :- কল্যাণী, দাদুভাই কে আমার কাছে দে; আর আমার ব্যাগটা নিয়ে চল। অনেক দূর হেঁটে যেতে হবে।

     সমুদ্রের কিনারা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মেলা প্রাঙ্গণে বিশাল বালুচরে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কয়েকদিন বসবাসের জন্য, লম্বা করে হোগলা পাতার ঘর বাধা শুরু হয়। মেলা প্রাঙ্গণে ঘর বানানোর সব সরঞ্জাম কিনতে পাওয়া যায়। বর্তমান ( ২০১৯সাল) পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে রাখে।

       কল্যাণী সহ কয়েকজন মধ্যে বয়স্ক নারী-পুরুষ অস্থায়ী ঘরের পাশে ইটের তৈরি উনুন তৈরি করে রান্নার আয়োজন করে। অন্যান্য তীর্থযাত্রীরা হোগলা পাতার ঘরের মধ্যে বিছানা পেতে বসে।
সুধীর বাবু রাম ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্য করে বলেন :- গঙ্গার সঙ্গম স্থলের কপিল মুনির ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলুন।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- পবিত্র ভূমি গঙ্গা সঙ্গমস্থল মেলার সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জানা যায়।

    কর্দম মুনি নামে একজন পবিত্র বিষ্ণুদেবের সাধক। "বিষ্ণুদেব, কর্দম মুনির সাধনায় খুশি হয়ে দর্শন দিয়ে বলেন :- "মাননীয় মুনি বর, আপনার সাধনায় সন্তুষ্ট হয়েছি। বলুন আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?
কর্দম মুনি বললেন :- "হে প্রভু, আমার পুত্র রূপে মর্ত্যভূমি আসতে হবে এবং বৈবাহিক জীবনের কঠোরতা ভোগ করবো।
বিষ্ণুদেব বলেন :- তথাস্তু , তোমার ইচ্ছা পূরণ হোক। বলে অন্তর্ধান হয়ে যান।
যথাসময়ে বিষ্ণুভক্ত অসুররাজ প্রহ্লাদের পুত্র হয়ে, বিষ্ণুর অবতার হিসাবে কপিল মুনি জন্মগ্রহণ করেন। এবং এক মহান সাধক রূপে রূপান্তরিত হয়ে, গঙ্গাসাগর এলাকায় পাতাল দেশে সাধন ভজন করার মানসে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকে। 

রামের পূর্বপুরুষ ইক্ষ্বাকু রাজবংশের সগর রাজা ষাট হাজার পুত্রের জনক হয়েছিলেন। তিনি নিরাব্বাই বার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। এক শত বার পুণ্য করার মানসে যজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের সময় দেবরাজ ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে যজ্ঞের পবিত্র "বলি, নামক ঘোড়াটিকে অপহরণ করে এবং কপিল মুনির পাতাল দেশের সাধনা স্থলে ঘোড়া রেখে পালিয়ে যায়।

যজ্ঞের ঘোড়া রক্ষাকারী বাহিনী রাজার কাছে ফিরে এসে জানাই, যজ্ঞের দক্ষিণ দিকের ঘোড়া "বলি" অলৌকিকভাবে অদৃশ্য (অর্থাৎ চুরি) হয়ে গিয়েছে ।
রাজা সগর তৎক্ষণাৎ ষাট হাজার পুত্র কে অশ্বের অন্বেষণের জন্য প্রেরণ করেন। পুত্রেরা ঘোড়া খোঁজ করতে করতে পাতালের দেশে প্রবেশ করে। কপিল মুনির সাধনা স্থলের পিছনের দিকে এক মায়া গুহার মধ্যে লুকানো বন্দী অবস্থায় ঘোড়া দেখতে পায়। পুত্ররা রাজ অহংকারে ক্রোধিত হয়ে, মুনি কে খোঁজ করতে থাকে।

 পাতালে ধ্যানমগ্ন মহর্ষি কপিল মুনির সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। বিনয় শ্রদ্ধা-ভক্তি বিসর্জন দিয়ে, কোন কিছু বিচার না করেই- মুনিবর কে চোর চোর অপবাদ দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং অস্বস্তিকর বিকট আওয়াজ করে জোরে জোরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।
 মুনিবরের বহু বছরের ধ্যান ভঙ্গ করার কারণে, বিনা দোষে চোর অপবাদ দেওয়া ও রাজ অহংকার চূর্ণ করার মানসে অগ্নিকে আহ্বান করে। 
কপিল মুনি বিশেষভাবে অতিরিক্ত ক্রোধিত হয়ে, সগর রাজার সন্তানদের প্রতি দুই চোখ দিয়ে অগ্নি দৃষ্টিপাত করা মাত্রই, তাদের কে ভস্ম করে দেয়। সগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মা পারলৌকিক ক্রিয়ার অভাবে প্রেতাত্মা রূপে আবদ্ধ হয়ে থাকে।

রাজপুত্রদের মৃত্যুর ফলে রাজবংশ এক সময়ে পুরুষশূন্য হয়ে পড়ল, রাজবাড়ীতে শুধু বিধবা আর বিধবা। তখন এক মুনির পরামর্শে বংশের দুই রানীর মধ্যে সঙ্গমে মিলিত লিপ্ত হয়। ফলস্বরূপ জন্ম হয় ভগীরথ নামে এক রাজপুত্র। ভগ শব্দের অর্থ হল নারীর যোনি। পুরুষের সঙ্গম ছাড়া শুধু ভগে ভগে সংঘর্ষের মাধ্যমে জন্ম হওয়ার কারণে নামকরণ হলো "ভগীরথ"।

ভগীরথ সগর রাজবংশের রাজপুত্র হওয়ার পর তিনি তাঁর ষাট হাজার হতভাগ্য পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণাদায়ক পরিণতির কথা জানতে পারে, কপিল মুনির অভিশাপে এখনো তাদের আত্মা মর্ত্যলোকে বিচরণ করছে। "গুরুদেব ত্রিথলার, উপদেশে ভগীরথ ৬০,০০০ অভিশপ্ত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান, শ্রাদ্ধ শান্তি ও দান ধ্যান জপ তপ কার্যের মাধ্যমে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। রাজা ভগীরথ রাজত্বের দায়িত্বভার বিশ্বস্ত মন্ত্রীর কাছে অর্পণ করে। দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে, হিমালয়ের এক অন্ধকার গুহার মধ্যে উপস্থিত হয়। পূর্বপুরুষদের আত্মার মুক্তি কামনায় গঙ্গাদেবী কে মর্ত্যে নিয়ে আসার মন মানসিকতা তৈরি করে, ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করে। 
 
সাধক ভগীরথ হাজার বছর ধরে প্রার্থনা করার পরে স্বর্গের ইন্দ্রের দর্শন দিয়ে বলেন :- একমাত্র গঙ্গা নদীর জল পারবে, সমস্ত জাগতিক পাপের স্খলন করতে এবং তোমার পূর্বপুরুষদের মুক্তি দিতে। 

এরপর ব্রহ্মা ভগীরথের কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে গঙ্গাকে বলেন :- হে গঙ্গা দেবী, মর্ত্যে প্রবাহিত হয়ে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্রের আত্মার সদগতি লাভের সহায়তা করুন। 
গঙ্গাদেবী ব্রহ্মার এই নির্দেশকে অসম্মানজনক মনে করে। বিনা প্ররোচনায় পৃথিবীতে আগমনে বাধ্য করানোর জন্য কুপিত এবং প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠেন।  

"গঙ্গাদেবী ক্রোধিত অবস্থায় উত্তেজিতভাবে ব্রহ্মা ও ভগীরথ কে বলেন :- আমাকে যেতে বাধ্য করলে, মর্ত্যলোক প্লাবিত করে দেবো। আমার প্রচণ্ড গতিবেগ পৃথিবীর সহ্য করতে পারবে না।

ব্রহ্মার পরামর্শ অনুসারে ভগীরথ গঙ্গার গতিরোধ করার জন্য শিবের আরাধনা শুরু করেন।

ভাগীরথের নিঃস্বার্থ প্রার্থনায় প্রীত হয়ে শিব আবির্ভূত হন এবং জগৎসংসারকে প্রলয়িনী গঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করতে উদ্যত হন। ভগবান শিব অতঃপর মা গঙ্গাকে তাঁর কেশ জটায় ধারণ করেন। শিবের স্পর্শে গঙ্গা রাগ তেজ গতিবেগ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে পবিত্র হয়ে যায়।
 কেশজটা হতে ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়ে গঙ্গা ত্রিধারায় পড়তে শুরু করে। স্বর্গের নদী গঙ্গা পাতালে প্রবাহিত হওয়ার আগে মর্ত্যলোকে সাধারণ জীবের মুক্তির হেতু একটি পৃথক ধারা রেখে যান। এইভাবে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল – তিন লোকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা "ত্রিপথগা" নামে পরিচিতা হন।
 এই কারণেই উৎপত্তি স্থল হতে দেবপ্রয়াগ পর্যন্ত গঙ্গা নদী ভগীরথী নামেই পরিচিত।

গঙ্গা দেবীর জন্ম লাভ করেছে, ব্রহ্মা তাঁর কমণ্ডলুর মধ্যে এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তার কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুপদ ধৌত করেছেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। 
তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তার পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গার পবিত্র করে তাকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।

যেহেতু ভগীরথ গঙ্গাদেবী কে মর্ত্যাবতরণের প্রধান কারণ, সেই হেতু গঙ্গার অপর নাম ভাগীরথী। 
গঙ্গার আরেক নাম জাহ্নবী। কথিত আছে, মর্ত্যে ভগীরথ কে অনুসরণ করার সময়, গঙ্গা দেবী ঋষি জহ্নুর আশ্রম প্লাবিত করেন। উগ্রতায় জহ্নু ক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গার সমস্ত জল পান করে ফেলেন। তখন দেবগণ গঙ্গার মুক্তির জন্য ঋষির কাছে প্রার্থনা করতে থাকলে,ঋষি জহ্নু নিজের জঙ্ঘা বা জানু চিরে গঙ্গার মুক্তি দেন। এইরূপে গঙ্গা জহ্নু ঋষির কন্যা রূপে পরিচিতি লাভ করেছে এবং তার অপর নাম হয় জাহ্নবী। দেবপ্রয়াগ গঙ্গার নাম অলকানন্দা ।

ভগীরথ, ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে গঙ্গাদেবী কে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। গঙ্গা জলের স্পর্শে সগর রাজার ৬০,০০০ পুত্রের মুক্তিলাভ ( মোক্ষ ) এবং স্বর্গবাসী হয়েছে।
 ভক্ত ভগীরথের আকুল প্রার্থনা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে আরাধনায় গঙ্গা দেবী সন্তুষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য তাদের অর্জিত পাপ-তাপ কে বিনষ্ট করার জন্যই পৃথিবী থেকে যান। আজও সাধু, সন্ন্যাসী, সাধারণ মানুষের ও সৃষ্টির জীবকুলের মনের বাসনা পূরণ করে চলেছেন।  

 গঙ্গা দেবীর সংস্পর্শে রাজা সগরের বংশধরদের উদ্ধারের দিনটি ও জলরাশি সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল, ঠিক পৌষ মাসের শেষে অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির দিন। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে 14 বা 15 জানুয়ারি পড়বে। উক্ত দিনটিতে গঙ্গা দেবী কপিলমুনির পাতালের সাধনা স্থলের সাথে মিলিত হওয়ার পরবর্তী সময়ে বিশাল জলরাশি ও গতিবেগের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাগরের সাথে মিলিত হয়েছিলেন। গঙ্গা ও সাগরের মিলনস্থল কে গঙ্গা সঙ্গম বলা হয়। প্রতিবছর গঙ্গা দেবীর স্পর্শে পাপ তাপ দূর করার জন্য, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ পূর্ণতা লাভের জন্য গঙ্গা স্নান করে। বর্তমানে যে স্থানে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে থাকে, সেই জায়গাটি সঠিক সঙ্গমস্থল নয় কিন্তু সঙ্গম স্থলের এলাকার মধ্যেই অবস্থান করে। সাধু সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে জানা যায়, আদি কপিল মুনির সাধনা স্থল ও আশ্রম সমুদ্রের গর্ভে চলে গিয়েছে। 

সঠিকভাবে স্নান করতে হলে সমুদ্রের ও গঙ্গার মোহনার অনেক আগে প্রথমে গঙ্গা স্নান করে, তারপর মোহনা ধরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে এসে সমুদ্রে স্নান করতে হবে। 

একটি প্রচলিত নিয়ম রয়েছে যেহেতু গঙ্গা রাজা সগরের 60'000 পুত্রের ভস্ম নিয়ে সাগরে মিলিত হয়েছিলেন, সেই হেতু সাগরে স্নান করলেও গঙ্গা স্নানের পুণ্যফল লাভ হবে। 
আজ এই পর্যন্তই রাখলাম বলে রাম ভট্টাচার্য কল্যাণীর কাছে গিয়ে রান্নার সাহায্য করতে থাকে।


                ।। অধ্যায় :- পাঁচ ।।

রাম ভট্টাচার্য মেলা প্রাঙ্গণে বিচলীর বিছানায় শুয়ে মোটা কাঁথা গায়ে দিয়ে চোখে দেখা দৃশ্যগুলো ভাবতে থাকে। 
 মেলা প্রাঙ্গণের মধ্যে ও বাহিরের দৃশ্য গুলো দেখতে না চাইলেও দেখাতে হয় বাধ্য হয়ে। মেলা প্রাঙ্গণের পাশেই সাগরের চরে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় নারী-পুরুষ মলমূত্র ত্যাগ করে, সে এক আজব দৃশ্য। জোয়ারের জলের সাথে বালি এসে সবকিছু ঢেকে দিয়ে যায়। সাগর যেন তার চারদিকে পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে চাই কিন্তু মানুষ তা কখনোই রাখতে চাইনা।

বর্তমান (২০১৮ সাল) আধুনিক পরিষেবার ব্যবস্থা করেছে। মেলা প্রাঙ্গণে অস্থায়ী কয়েক হাজার বাথরুম পায়খানা তৈরি করা হয় এবং প্রচুর জলের ব্যবস্থা থাকে।

প্রাচীনকালের পানীয় জলের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি কুয়া তৈরি করা আছে। বালতিতে দড়ি বেঁধে জল তুলতে হয়। বিভিন্ন দেশের ও রাজ্যের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের আগমন ঘটে। বিভিন্ন আঞ্চলিক মানুষের বিভিন্ন ধরনের প্রথা মেনে আচার আচরণ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গঙ্গা সাগরের সঙ্গমে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কেউ কাঁদে কেউ গান করে কেউবা নাচ করে বিচিত্র মানুষের বিচিত্র খেলা।

 এই মেলায় উলঙ্গ সাধু ও নাগা সন্ন্যাসীদের দেখা পাওয়া যায়। মেলা প্রাঙ্গণের কপিল মুনির আশ্রমে ঢোকার রাস্তায় সাধুদের আবাসস্থল। সাধুরা বিভিন্ন রূপে সাজগোজ করে বসে আছে। কেউ সারা শরীরে অগ্নিকুন্ডের ছাই মেখে আবার কেউ উলঙ্গ হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে ও শুয়ে আছে। সবার সামনে যজ্ঞকুণ্ড আছে। কেউ বা পুরুষ লিঙ্গের তালা লাগিয়ে রেখেছে বিচিত্র সাধুদের বিচিত্র ভাবভঙ্গি। কোন কোন সাধু তাবিজ-কবজ ছাই দিয়ে টাকা-পয়সা দিচ্ছে আবার কোন কোন সাধু বিনামূল্যে দিয়ে চলেছে। একটি লক্ষনীয় বিষয় তা হচ্ছে এখানে সাধুদের মাঝে প্রচুর পরিমাণে গাঁজা সেবন চলে এবং বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া উড়তে থাকে।
বিভিন্ন সাধুগণ বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে, পূণ্যার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিভিন্ন কৌশল বাস্তবে দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়স্ক নর-নারীরা মেলায় অংশগ্রহণ করে বেশি, সাধুরা সুযোগ বুঝে মানুষের অশান্তির নিদান দেওয়ার নাম করে- তাবিজ, কবজ, গাছপালা, শিকড় বাকড়,যজ্ঞের ভস্ম প্রভৃতি জিনিসের মাধ্যমে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। মেলা প্রাঙ্গণে যেমন সাধক ,সাধু, সন্ন্যাসী, পুণ্যার্থী, ভিখারি ও ব্যবসাদার আছে। আবার চোর-ডাকাত বদমাশ বিভিন্ন ধরনের খারাপ মানুষ গুলো দেখা যায়। সুযোগ পেলেই মানুষের সর্বস্বান্ত করে দেয়।

 আবার ভালোবাসার অভিনয় করে কত নর-নারী রাতের অন্ধকারে ঝাউবনের মাঝে দেহ বিক্রি করে আয় রোজগার করে। যুবকদের থেকে বেশি বৃদ্ধ বয়সের পুরুষেরা ক্ষণিকের তরে আনন্দ লাভের আশায় টাকার বিনিময়ে ধরে কোনো নারীর হাত। এমনকি কিছু সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে প্রণয়ের বিষয়টি দেখা যায়। পুরুষ সাধুরা মহিলা সাধুদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে।  

     সেই কালে মেলা প্রাঙ্গণ সহ আশপাশের জায়গাগুলো বন জঙ্গলে ঘেরা ছিল। রাতে চোর-ডাকাত সহ বন্যপ্রাণীদের ভয় ছিল কিন্তু বর্তমানে আর নেই। 

সুদূর প্রাচীনকাল থেকে সঙ্গমস্থলের স্নানের ঘাট নিয়ে সাধুদের মধ্যে চলে লড়াই। কে আগে করবে শাহি স্নান! সাধুদের মধ্যে নাগা সন্ন্যাসীরা আগে করবে স্নান। এই স্নান করা নিয়ে বহু বার সাধুদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়েছে এবং সাধু সন্ন্যাসী মারা গিয়েছে তবুও সঠিক কোন মীমাংসা হয়নি। নাগা সন্ন্যাসীরা অন্য সম্প্রদায়ের সাধুদের সাধু বলে মানেন না। সাধারণ মানুষ তো অনেক দূরের কথা। নাগা সন্ন্যাসীদের দৌরাত্ম্য ও দুরন্তপনার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে শাহি গঙ্গাস্নান সাধারণ মানুষের থেকে শুরু করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাধুরা স্নান করতে পারে না, বিশেষ করে গঙ্গাসাগর মেলায়।

বর্তমান 2018 সালে মেলা প্রাঙ্গণে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার মিলন স্থান। তবুও হিন্দু ধর্মীয় প্রভাব সবসময় কাজ করে। লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। বর্তমানে বিরাট কয়েকদিনের ব্যবসায়িক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে ছোট-বড় ব্যবসায়ী থেকে ক্ষুদ্র মাঝারি হকার সহ সব ধরনের ব্যবসায়ীকে দেখা যায়।

 বর্তমানে কয়েক হাজার ভিখারিকে দেখা যায়। মেলা প্রাঙ্গণে ঢোকার বা বের হওয়ার জন্য বহু রাস্তা তৈরি করা হয়। কোন কোন রাস্তার দুই ধারে যাত্রীদের আবাসস্থল আবার কোন কোন রাস্তার দুই ধারে বিভিন্ন দোকানপাটের বিভিন্ন ধরনের জিনিস পত্র নিয়ে বসেছে। এইসব রাস্তার ধারে ধারে ভিখারিদের বসে থাকতে দেখা যায়।

 তীর্থযাত্রী গণের সমুদ্রের বালির চরের উপর রান্না করা দৃশ্য দেখার মতো,শত শত বিচিত্র ধরনের উনুন তৈরি করে রান্নার আয়োজন চলে। এখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ তা বলা যাবে না। কিছু জায়গা ভিত্তিক সামুদ্রিক মাছের গন্ধ পাওয়া যাবে।
বর্তমান বিনা মূল্যে খাবার পাওয়া যায় কিন্তু রেশন দোকানের মতো লম্বা লাইন দিতে হয়। কয়েক জন মাড়োয়ারী ধনী ব্যক্তিগণ বড় বড় প্যান্ডেল বানিয়ে খাবারের আয়োজন করে। কেউ লুচি-তরকারি কেউ ভাত-ডাল ও সবজি কেউ রুটি-তরকারি কেউ মিষ্টি বিতরণ করছে।  
এছাড়াও চা ও বিস্কুট অভাব নেই। খাবার পরিবেশন করার জন্য বহু লোকজন আছে।

 শীতের মৌসুমে মেলা প্রাঙ্গণে সামুদ্রিক প্রভাবের ও লক্ষ লক্ষ মানুষের আগমনে এলাকার তাপমাত্রা বহু ডিগ্রি বেড়ে যায়।
 ঠান্ডা আছে বলে মনে হয় না।

রাম ভট্টাচার্য মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরতে ঘুরতে কলকাতার বাসিন্দা ডাক্তার সুরেন্দ্র সাহা মহাশয়ের সাথে আলাপ হয়। বিভিন্ন কথাবার্তা বলতে বলতে নিজের থাকার জায়গায় নিয়ে আসে। নতুন অতিথি কে পেয়ে রাম ভট্টাচার্যের সতীর্থরা ডাক্তার বাবু কে বিভিন্ন ভাবে আপ্যায়ন করতে শুরু করে। 

চা-বিস্কুট দিয়ে শুরু করে তারপর ভাত খাওয়া দাওয়া শেষ করার পর কথা প্রসঙ্গে রাম ভট্টাচার্য বলেন :- ডাক্তারবাবু সমুদ্রের জলের উপকারিতা সম্পর্কে কিছু বলবেন।

রাম ভট্টাচার্যের সতীর্থরা বলে :- ডাক্তারবাবু বলুন, আমরা এই বিষয়ে শুনতে আগ্রহী আছি।
বয়স্ক ডাক্তার সুরেন্দ্র সাহা বেড়ায় হেলান দিয়ে বিচিলির গদিতে আরাম করে বসেন। 
রাম ভট্টাচার্য হুঁকো সাজিয়ে তার উপর আগুনের জ্বলন্ত টুকরো দিয়ে ডাক্তারবাবুর সামনে ধরে বলে মশাই চলবে নাকি।

 ডাক্তারবাবু হুঁকো হাতে নিয়ে কয়েকবার গড় গড় করে টান দিয়ে রাম ভট্টাচার্যের হাতে দিয়ে বলেন :- সমুদ্রের নোনা জল কে নিয়ে গবেষণা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন। সমুদ্রের নোনা জলে স্নান করার কারণে বহু রোগ-জীবাণুর হাত থেকে মানুষ মুক্তি লাভ করেন বিশেষ করে চর্মরোগ ও ক্ষত সেরে ওঠে অতি তাড়াতাড়ি। 
 অনেক চর্মরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। জল, মাটি ও ফেনা অনেক প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয়। বহু গবেষক স্বাস্থ্যের সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সমুদ্রের নোনা জলের মধ্যে আছে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, দস্তা, আয়োডিন, সালফার এবং পটাসিয়ামের মতো অনেকগুলো লবণ এবং খনিজ পদার্থ এবং আমাদের দেহে এই লবণ এবং খনিজ গুলোর শতাংশের পরিমাণ থাকে। অতএব, এই জল মানুষের চামড়ার এবং প্রসাধনী পণ্য উৎপাদন ব্যবহৃত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ত্বকের সমস্যা এবং অন্যান্যদের চিকিৎসায় ডেড সি সমুদ্রের লবণের সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। এটি হাই সাইনাসের চাপের সমস্যায় ভুগছেন এমন একটি রোগীর উপর ব্যবহার করেছিলেন। এটি কারণে দীর্ঘস্থায়ী মাথা ব্যথায় ভোগ করছিলেন কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার না করে রোগীকে ছয় মাস ধরে সমুদ্রের নোনা জল খাওয়ানো হয়। ডেড সাগর পুরো এক সপ্তাহ ধরে নাক ধুয়ে ফেলে এবং ফলস্বরূপ ব্যবহারের এক সপ্তাহ পর সাইনোসাইটিসের প্রদাহ এবং লক্ষণগুলি হ্রাস হয়েছিল।

সমুদ্রের জল ত্বকের উপকার করে। অনেকগুলো পণ্য প্রস্তুত করে যেমন: সাবান, ক্রিম এবং ত্বকের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বক পরিষ্কার করে, এগুলি থেকে বিষ এবং ময়লা দূর করে, যা তাদের ত্বকের সবচেয়ে সমস্যা হতে বাধা দেয়।
সামুদ্রিক জল বেশ কয়েক মিনিটের জন্য মুখ এবং শরীরের ম্যাসাজ করে ত্বককে কার্যকরভাবে ময়েশ্চারাইজ করে, ত্বক এবং ত্বকের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে এবং তাদের শুষ্কতা দূর করে, কারণ এতে অনেকগুলি খনিজ রয়েছে যা উপকার করে। এটি মানুষের মৃত ত্বক থেকে বাঁচায় এবং ক্ষতিগ্রস্থদের নতুন করে দেয়। ত্বকের ছিদ্র গুলো পরিষ্কার করে, শক্ত করে এবং তেলগুলি সরিয়ে দেয় যা ব্রণ বা অন্য কোনও অমেধ্য গঠনে বাধা দেয়। ত্বকের লালভাব দূর করে; যাতে এটির প্রদাহ বিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলি রয়েছে। এটি ক্ষতগুলির জন্য কার্যকর এবং দ্রুত ক্লিনজার যা শরীর পেতে পারে।
 ত্বককে সক্রিয় করে এবং পুষ্টি জোগায়। ত্বক সমুদ্রের জলে খনিজ এবং উপাদানগুলো শোষণ করে।
সাধারণ ত্বকের রোগ যেমন: একজিমা, ব্রণ, সোরিয়াসিস, পাশাপাশি আর্থ্রাইটিস, বাত ও মস্তিষ্কের বাধা চিকিৎসা করতে সহায়তা করে।
ব্রণ সংক্রমণ, সাইনাস সংক্রমণের চিকিৎসায় কার্যকর। দেহের বৈদ্যুতিক ভারসাম্য বাড়ায়।
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত ইনসুলিনের ব্যবহার সহজ করা যায়।
এটি দাঁত গুলির জন্য দরকারী, এবং এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এমন কোনও অপ্রীতিকর গন্ধ থেকে মুখ নির্বীজন করে। ঘুমানোর আগে ধুয়ে ফেলা; কারণ এতে রয়েছে ফ্লোরাইড যা ব্যাকটেরিয়াগুলিকে মেরে ফেলে, যা অপ্রীতিকর গন্ধের কারণ হতে পারে।
এটি নিম্নচাপ, দুর্বল রক্ত সঞ্চালনের রোগীদের জন্য সুপারিশ করা হয়; এটি দেহে রক্ত সঞ্চালন সক্রিয় করে।
স্বাস্থ্যকর চুলের বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করে, মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালনের উন্নতি করে এবং এর সাথে সংযুক্ত ময়লা পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। সমুদ্রের লবণ চোখের চারপাশে অন্ধকার বৃত্ত এবং বাল্জকে নরম করে।

রাম ভট্টাচার্য মেলা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় মেলা প্রাঙ্গণের শেষ প্রান্তের এক নির্জন স্থানে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কে বিনা চশমাই বই পড়তে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে।
 প্রায় 15 মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর বয়স্ক ভদ্রলোক চোখ তুলে বলে বসুন বলে বইয়ের পাতা বন্ধ করে।
 রাম ভট্টাচার্য বালুর উপর বসে পড়ে এবং দুজনের মধ্যে আলাপ পরিচয় হয়। 
রাম ভট্টাচার্য হাত জোড় করে বলে :- তাহলে আপনি তো আমার মিতা হয়ে গেলেন কারণ দুজনের নামই রাম, আপুনি চক্রবর্তী আর আমি ভট্টাচার্য।

রাম চক্রবর্তী বলেন :- তা দলবল নিয়ে মেলায় এসেছেন। ঠিকই করেছেন শেষ বয়সে আমাদের তীর্থ ছাড়া আর আছে কি?

রাম ভট্টাচার্য্য আগ্রহ নিয়ে বলে :- আপনি ভীষণভাবে মনোযোগ দিয়ে কি বই পড়ছিলেন?

 রাম চক্রবর্তী বইটি ভট্টাচার্য মশাই এর হাতে দিয়ে বলেন পড়ে দেখুন "সমুদ্রের সৃষ্টি রহস্য ইতিহাস"

রাম ভট্টাচার্য বই খুলে জোরে সুর করে পরতে শুরু করে।

 পাঁচটা মহাসমুদ্র আর ছেষট্টিটা সমুদ্র মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় একাত্তর ভাগ অংশই জলে ঢাকা, আর বাদ বাকীটা স্থল অর্থাৎ মহাদেশ।
 সমুদ্র যে কত বড়ো (৩৬১,০০০,০০০ বর্গ কিঃমিঃ) তা অনেকটাই বোঝা যায় সমুদ্রের পাড়ে বসে চোখ দু’টো সামনে মেলে দিলে। শুধু আকারেই বড় নয়, গভীর দারুণ। কোথাও কোথাও এতা গভীর যে সেখানে আমাদের ডাঙার সবচেয়ে উচুঁ পাহাড় হিমালয়কে ছেড়ে দিলে তার কিছুই আর দেখতে পাওয়া যাবে না।

 চার্লস ডারউইনের ছেলে জর্জ ডারউইনের মতো। আজ থেকে প্রায় একশো ত্রিশ বৎসর আগে ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে জর্জ ডারউইন সৃষ্টির ব্যাপারে এক চমকপ্রদ কথা শোনালেন।
 তিনি বললেন প্রায় চারশো কোটি বৎসর আগে পৃথিবীর বাইরের খোলস যখন পুরোপুরি শক্ত হয় নি, ভেতরে নরম গরম অবস্থা, সেই সময়ে সূর্যের টানে পৃথিবীর তরল বুক থেকে খানিকটা অংশ চিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল মহাকাশে। সেই উপড়ে চলে যাওয়া অংশই হলো চাঁদ। ফলে পৃথিবীর বুকে তৈরী হলো এক বিরাট গর্ত, যার নাম প্রশান্ত মহাসাগর।

জর্জ ডারউইনের এই মতবাদ উনিশ শতকে ও বিশ মতকের প্রথম দিকে খুব আলোড়ন তুললেও পরবর্তী কোনো বিজ্ঞানীই তার এই মতবাদে বিশ্বাস করেননি। এই মতবাদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিলেন, ভুস্তর সৃষ্টির পর, তা যত পাতলাই হোক এমনই কঠিন হয়ে পড়েছিল যে তখন তার পক্ষে আর পৃথিবী থেকে উৎক্ষিপ্ত হওয়া সম্ভব ছিল না। 

মহাসাগর সৃষ্টির ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তত্ত্বটি হলো জার্মান ভূবিজ্ঞানী ওয়গনারের (১৮৮০-১৯৩০)। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে প্রচারিত ‘চলমান মহাদেশ’ তত্ত্বটিকে তিনি মহাসাগর সৃষ্টির কথা বলেন।

ওয়েগনার বলেছেন, আজ থেকে পচিঁশ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর মহাদেশ আর মহাসমুদ্রের চেহারা এইরকম ছিল না।
 তখন পৃথিবীর সব মহাদেশগুলি মিলে একটাই মহাদেশ ছিল। সেই আদি প্রাগৈতিহাসিক মহাদেশ ঘিরে ছিল এক আদি মহাসমুদ্র প্যান্থালসা। ভূবিজ্ঞানী ওয়েগনারের মতে খুব সম্ভবত । মেসোজোয়িক (Mesozoic) যুগের প্রথম দিকে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় কুড়ি কোটি বছর আগে প্রাকৃতিক কারণে প্যানজিয়া মহাদেশটি দু’টো টুকরোয় ভেঙে গিয়ে সরে গেল একে অন্যের কাছ থেকে। তাদের একটা টুকরোর নাম গণ্ডোয়ানা মধ্যপ্রদেশের ‘গণ্ড’ আদিবাসীদের নাম অনুসারে। এতে ছিল দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারত, অষ্ট্রেলিয়া আর কুমেরু।

অন্যটার নাম ‘লরেশিয়া’। যাতে ছিল ইউরোপ, এশিয়া গ্রীণল্যান্ড, আর উত্তর আমেরিকা। এই দুই মহাদেশের মাঝখানে রইলো টথিস সাগর। পরে গণ্ডোয়ানা আর লরেশিয়া আরো কয়েকটি টুকরোয় ভেঙ্গে গিয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে, আর তাদের মাঝখানে আদি মহাসাগর প্যানথালসার রুপ বদল হয়ে জন্ম নিল আজকের মহাসাগর। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা ভেঙ্গে সরে গেল গণ্ডোয়ানা থেকে। এদের মাঝে জন্ম নিল দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর।

এ দুটি মতবাদ ছাড়াও আরও বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে মহাদেশ ও সমুদ্র সৃষ্টির ব্যাপারে। 

ম্যাণ্টলের চরিত্র বিচার করে ভূবিজ্ঞানীরা রায় দিয়েছেন, পৃথিবীর এতো জল এসেছে ম্যাণ্টলের পেট থেকে আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে। 
অগ্ন্যুৎপাতের সময়ে আগ্নেয়গিরি জ্বালামুখ থেকে যে গ্যাস বেরিয়ে আসে তার অনেকটাই জলীয় বাষ্প। এই জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়েই যে জলের জন্ম হয়।
  ভূবিজ্ঞানীদের মতে এই জল এসেছে জল (বা হাইড্রকসসিল) বাহী কিছু খনিজ পদার্থ থেকে। যা থাকে ম্যাগমার ভেতরে। যেমন অভ্র (Mica) স্যারপেনটিন (Serpentine), অ্যামফিবোল (Amphibole) ইত্যাদি খনিজগুলি যদি ২৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে পোড়ে, তবে এই খনিজের জলটুকু বাইরে বেরিয়ে আসে, জলীয় বাষ্পের আকারে। ম্যান্টলের শিলার মধ্যে এ ধরণের খনিজ যথেষ্টই রয়েছে। এই কারণে পৃথিবীর সমুদ্রগহ্বর পূর্ণ হতে বেশী সময় লাগেনি। পৃথিবীর পিঠে যতো জল রয়েছে, তার চেয়ে কয়েক হাজারগুন জল পৃথিবীর বহু খনিজ পদার্থের মধ্যে এখনো বন্দী অবস্থায় আছে।

পৃথিবীর মোট জলের শতকরা ৯৮ ভাগই সমুদ্রের নোনাজল, বাদবাকি ২ শতাংশ ছড়িয়ে আছে হ্রদ, নদী, হিমবাহ, মেঘ ও পাথরের ফাটলে সঞ্চিত ভূজলে।

সমুদ্রের জল লোনা হবার কারণ মহাসাগর গুলির সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করার প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ জাহাজ ‘চ্যালেঞ্জার’ সমুদ্রের মোট ৭৭টি বিভিন্ন জায়গা থেকে জলের যে নমুনা সংগ্রহ করেছিল, তা বিশ্লেষণ করে ব্রিটিশ রসায়নবিদ ডিটমার (১৮৮৪) দেখেছেন, প্রতি লিটার সমুদ্রের জলে নানা জাতের লবনের পরিমাণ প্রায় ৩৫ গ্রাম। অথচ প্রায় একশো বছর পরেও দেখা যাচ্ছে সমুদ্রজলে লবনের পরিমাণ প্রায় একই আছে। যদিও আটলান্টিক মহাসাগরে জলে লবনের পরিমাণ (লিটারে ৩৪.৯০ গ্রাম), ভারত (লিটারে ৩৪.৭৬ গ্রাম) ও প্রশান্ত (লিটারে ৩৪.৬২ গ্রাম) মহাসাগরের চেয়ে
প্রশান্ত (লিটারে ৩৪.৬২ গ্রাম) মহাসাগরের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে নদী গুলো যতোই লবন এনে ফেলুক না সাগরের জলে, সমুদ্রের নোনতা ভাব তাতে বাড়ছে না। ভূবিজ্ঞানীরা হিসেব করে বলেছেন, সমুদ্রের জলে মোট ৫ x ১০১৮ কিলোগ্রাম লবন মিশে আছে।

পরীক্ষা করে দেখা গেছে সমুদ্রের জলে সোডিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ নদীর জলের তুলনায় অন্তত ১৭ গুণ বেশি। 
এসব সত্ত্বেও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সমুদ্রজল তার নোনতা ভাব একই জায়গায় ধরে রাখছে। এই প্রক্রিয়ার একটা ব্যাপার হলো, মহাদেশ গুলি থেকে অসংখ্য নদী নালা মারফৎ নানা ধরনের লবন সমুদ্র যতোটা নেয় তার অনেকটাই আবার ফিরিয়ে দেয় মহাদেশকে। যেমন জোয়ারের সময়ে সাগরজলে মিশে থাকা লবন টুকু থিতিয়ে যায় মাটির শরীরে। সমুদ্রের জলকণা বাষ্প হয়ে মহাদেশগুলির দিকে ছুটে যাওয়ার সময়তেও সঙ্গে করে অনেকটা লবন নিয়ে যায়। এই লবনের কিছুটা অংশ অবশ্য করে আবার নদী জলের সঙ্গে মিশে সমুদ্রে ফিরে আসে। তবে বেশ কিছুটা পড়ে থাকে ডাঙার মাটিতে। এছাড়া সমুদ্রের জলে বিভিন্ন ধরনের লবনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অধঃক্ষেপ (Precipitate) তৈরী হয়, যা থেকে সামুদ্রিক স্তর অথবা খনিজ নুড়িও (Nodule) তৈরী হতে পারে।

সমুদ্রে লবনের পরিমাণ সব সময়ে মোটামুটি একই রকম থাকলেও মাঝে মাঝে তারতম্য হয়। যেমন বৃষ্টিপাতের অঞ্চলে প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের ফলে সমুদ্রের নোনতা ভাব সমসাময়িকভাবে যেমন কমে, তেমনি প্রচণ্ড গ্রীষ্মের সময়ে সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে গেলে, সমুদ্রের জলে নোনতা ভাব খানিকটা বেড়ে যায়। এছাড়া সমুদ্রের জল ঠান্ডায় জমে হিমশৈল তৈরী হলেও যে সমুদ্রে শতকরা মাত্র ৩০ ভাগ লবনই বরফের ভেতরে যেতে পারে, বাদবাকী ৭০ ভাগই পড়ে থাকে সমুদ্রের জলে।

রাম ভট্টাচার্য বই পড়া বন্ধ করে,
রাম চক্রবর্তীর হাতে বই দিয়ে বলেন :- চলুন আমাদের অস্থায়ী ঘরে।আর যে কয়দিন এখানে আছি আমাদের সাথে থাকবেন। একা একা অনেক অসুবিধা। খাওয়া দাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা ওখানে হবে। 
রাম চক্রবর্তী বলেন :- না, এখানে নিরিবিলি পরিবেশে বেশ ভালো আছি।
রাম ভট্টাচার্য বলেন :- আরো মশাই খাওয়া দাওয়া করে তারপর যেখানে ইচ্ছা থাকবেন। উঠান আপনার ব্যাগ পত্র বলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো গোছগাছ করতে শুরু করে। তারপর দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে এগিয়ে চলে।

রাম ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানের 
তীর্থযাত্রী দলটি এক সপ্তাহ ধরে গঙ্গা স্নান, মেলা দেখা, খাওয়া দাওয়া, সাধ্যমত কেনাকাটা ও আনন্দ করে। শীতের সকাল বেলা যাত্রীদল ঘরে ফেরার জন্য, নৌকায় ফিরে আসে। দুপুর বেলায় জোয়ার আসার অপেক্ষায় থাকে, মোহনার তীরে নৌকা বেঁধে রাখা হয়। মোহনার বালুর চরে শীতে মিঠা মিঠা রোদে বসে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে।   
  
                                      






















                         ।। ষষ্ঠ অধ্যায় ।।

বালক কৃষ্ণের কৌতূহল অবসান
হয়েছে। চঞ্চল মতির বালক এখন মনমরা হয়ে কালো মুখ করে শান্তশিষ্ট ভদ্র ছেলের মত বাড়িতে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে বালুচরে একা একা বসে ভাবে। সাগরের জল আর জল দেখতে দেখতে মন বিকল হয়েছে।
মাঝে মাঝেই মাসি অন্ত প্রাণ বার বার কেঁদে উঠে। বালকের কান্নার আওয়াজ শুনে মা কল্যাণী ছুটে এসে সন্তানের চোখের জল আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে শান্তনা দিতে থাকে।

বালক কৃষ্ণ মায়ের কাছে থেকে ছুটে গিয়ে মুখ কালো করে রাম ভট্টাচার্যের কাছে এসে দাঁড়িয়ে, চঞ্চল মন বার বার অধীন আগ্রহ নিয়ে বলে :- ঠাকুরদা, আজ জোয়ার কখন আসবে! আর কত দিন পর মাসি কে দেখতে পাবো? মাসি মাসি বলে কান্না করতে শুরু করে।

হঠাৎ শান্ত জল ধীরে ধীরে দুই কুল কিনারায় বাড়তে থাকে এবং নৌকা নড়েচড়ে উঠে। যাত্রীদের মনে আশার সঞ্চার হয়।
মাঝিরা চিৎকার করতে করতে পাল টাঙানোর দড়ি কাছি টান দিয়ে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দেয় এবং তীর্থযাত্রীদের নৌকায় উঠানোর জন্য বালির চরে সিঁড়ি নামাতে শুরু করে। কল কল শব্দের আওয়াজ করে সাগরের লোনা জল নদীর দিকে চলতে শুরু করে। জল বাড়ার সাথে সাথে নৌকা হেলেদুলে জলের উপর ভাসতে শুরু করে। রাম ভট্টাচার্য নৌকার মধ্যে ঢুকে একবার সবাইকে দেখে নিয়ে মাঝিদের নৌকা ছাড়ার অনুমতি দেয়।
 মাঝিরা জল দেবতা সহ অন্যান্য দেবদেবীর স্মরণ করে, তাড়াতাড়ি নৌকার মুখ উত্তর দিকে করে দড়ি খুলে দেয়। হাওয়ার গতিবেগের মাধ্যমে নৌকা ছুটে চলে।

বালক কৃষ্ণ মনমরা হয়ে মায়ের আঁচলের তলায় মুখ লুকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। নেই কোনো চঞ্চলতা, দৌড়াদৌড়ি আর দস্যিপনা।

নৌকার জোয়ারের জলে ও হাওয়ার গতিতে মুহুর্তের মধ্যে 10 কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলে। কিন্তু উত্তর দিক থেকে হাওয়া ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। চলতে চলতে সুন্দরবন অঞ্চলের এক সংকীর্ণ নদীর বালুচরে আটকিয়ে মহাবিপদ পড়ে। কয়েক জন শক্ত ও পোক্ত পুরুষরা নদীর চড়ে নেমে নৌকাকে জলে ভাসিয়ে দেয়। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বিভিন্ন জীব জন্তুর আওয়াজ কানে ভেসে আসে।
 মাঝিরা বলে আমরা ভীষণ ভাবে বিপদ সংকীর্ণ এলাকায় এসে পড়েছি কিন্তু সবাই সাবধানে থাকবেন। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে রাত জেগে হরি হরি কালি কালি দুর্গা দুর্গা ইত্যাদি দেব-দেবীর স্মরণ করতে থাকে। সবার ভয়ে আতঙ্কে প্রাণ যায় যায়। বালক কৃষ্ণ মাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে মাসি মাসি বলতে থাকে।

পরের দিন আনুমানিক সকাল নয়টার সময় আকাশে সূর্যের আলোর বদলে কালো মেঘে ঢেকে যায়। সারারাত কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্ত মাঝিদের চোখে ঘুমের ভাবের অসতর্কতার কারণে নৌকা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ভাটার টানে ও পালে প্রচণ্ড গতিবেগ পেয়ে হাওয়ার দাপটে মুহুর্তের মধ্যে মোহনা ছেড়ে ঝড়ের গতিতে নৌকা আবার সাগরের গভীর জলে চলে যায়। 

বিপন্ন তীর্থ যাত্রীদল বার বার উচ্চ কন্ঠে বলে :- মাঝি নৌকা তীরে ভিড়াও। আমাদের প্রাণ বাঁচাও।

মাঝি সমুদ্রের অথৈ জলে নৌকা ভাসিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে বলে :- এখানে কোথাও সমতল ভূমি নেই, মনে হচ্ছে সাগরের গভীর জলে চলে এসেছি। দিনের বেলায় অন্ধকার দেখছি।

 চারিদিকে ক্ষিপ্ত উন্মত্ত জলরাশি,শিবের দক্ষযজ্ঞ নাচের সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ হাতে করতালি দিয়ে মৃত্যু কে বার বার করছে আহ্বান। আকাশে কালো মেঘে ঢাকা প্রচন্ড আকারে বৃষ্টি হচ্ছে এবং বার বার হুংকার দিয়ে চলেছে। ক্ষিপ্ত উন্মত্ত জলরাশি বারবার নৌকায় আঘাত করে চলেছে।  

আরে কিছু দূর যাওয়ার পর একদিকে বহু দূরে ব-দ্বীপের সমতল নীল বনভূমির রেখা দেখা যায়। কিন্তু অন্য দিকে ভয়াবহ ভয়ংকর হিংস্র জলরাশি উদ্ধত বিদ্রোহ করেছে। মাঝি হাল ঠিক মতো ধরে রাখতে পারছে না। হাল ঘুরে গিয়ে নৌকা অশান্ত মাতাল টলমল করছে। মাঝি নৌকা কোন ভাবেই নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পারছে না। পৌষ মাসের বরফের মতো ঠান্ডা শীতল হাওয়ায় নর-নারী তরতর করে কাঁপছে। কেউ চুপচাপ কেউ কান্নাকাটি করে চলেছে, কেউবা উচ্চস্বরে ডাকে আত্মীয় স্বজনদের। কেউ করে হরি হরি,কালী কালী নাম জপ।

 রাম ভট্টাচার্য শুকনো মুখে চোখ বন্ধ করে, ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকে। বালক কৃষ্ণ মায়ের আঁচলের তলায় মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে। বালক ভাবে মনে আর হয়তো মাসির সাথে দেখা হবে না।

হঠাৎ ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মাঝে বিপন্ন মাঝি চিৎকার করে বলে :- সবাই মন দিয়ে কথাগুলো শোনো, হয়তো তীর্থযাত্রীর মধ্যে থেকে কেউ দেবতা কে ফাকি দিয়েছো। যে যা মানত করেছিল কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি। তাই দেবতা অসন্তুষ্টু হয়ে, আমাদের উপর অসময়ে ঝড় বৃষ্টি জল দিয়ে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। সাগরের জলে বিসর্জন দিয়ে মানত রক্ষা করে, ক্রুদ্ধ দেবতার সাথে খেলা করে না।

তীর্থযাত্রী গণে কোন কিছু বিচার না করে- টাকা, কাপড় ও খাবার সহ যার কাছে যা ছিল সাগরের জলে ফেলে দেয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে বড় ঢেউ এসে উঁচু নৌকার মধ্যে জলে উঠে পড়ে এবং নৌকা ডুবা ডুবা ভাব।

মাঝি উত্তেজিত বলে :- কোন ব্যক্তি দেবতার উদ্দেশ্যে মানত করা ধন কে! চুরি করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে?

মাঝির ইশারায়, যাত্রীদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠে :- কল্যাণী, দেবতা কে দান করে, আবার আপন ছেলেকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। সাগরের জলে ফেলে দাও।

নিষ্ঠুর তীর্থযাত্রীরা এক সাথে উচ্চ কন্ঠে বলে ওঠে :- কেষ্ট কে সাগরের জলে ফেলে দাও। একজনের পাপের জন্য, সবাই মরতে পারবো না- তাহলে আমরা পুণ্যবান মানুষগুলো বেঁচে যাব।
 
কল্যাণী, রাম ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্য হাত জোড় করে বলে :- বাবা ঠাকুর, আমার ছেলে কে রক্ষা করো, আমার ছেলেকে রক্ষা করে। বলে ছেলে কে প্রাণপণে বুকে চেপে ধরে। না, আমার এই দুধের বালক কে সাগরের জল ফেলতে দেবোনা। 

রাম ভট্টাচার্য ভৎসনা মাধ্যমে গর্জন করে বলে :- আমি তোর রক্ষাকর্তা! রাগে উত্তেজিত হয়ে মা হয়ে, আপন ছেলেকে দেবতার পায়ে বলি দিলি, আমি তোর ছেলেকে কি করে রক্ষা করবো?

 তীর্থযাত্রীদের মধ্য থেকে একজন বয়স্ক মহিলা বলে :- দেবতার ঋণ শোধ না করে, এত গুলো মানুষের সাগরের জলে ডুবাবে! দেবতার কাছে কথা দেওয়ার আগে মনে ছিলনা।

কল্যাণী কান্না করতে করতে বলে :- আমি অতি মূর্খ নারী, রাগের মাথায় কী বলেছি- হে অন্তর্যামী সেই কথা সত্যি হবে! আমি তো অন্তর থেকে বলিনি। হে দেবতা তুমি মুখের কথা শুনেছো কিন্তু একজন মায়ের অন্তরের কথা গুলো শুনতে পাওনি? 

গঙ্গা স্নান করে তীর্থের পূর্ণ অর্জনকারী মহান ব্যক্তিরা ও মাঝি হাল ছেড়ে দিয়ে তীর্থ যাত্রীদের সাথে মিলিত হয়ে, দয়া মায়া হীন ভাবে মাঝি মায়ের বুক থেকে জোর করে সন্তানকে ছিনিয়ে নেয়।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- থাম থাম,অবুঝ বালক কে সাগরের জলে ফেলিস না। বলে বাধা দান করতে গেলে, যাত্রীদের আঘাত পেয়ে নৌকার মধ্যে পড়ে যায়। 

তীর্থযাত্রীরা উচ্চকণ্ঠে বলে :- এই সামান্য বালকের জন্য দরদ হচ্ছে! আপনাকেও আজ এই সাগরের জলে বিসর্জন দিয়ে দেবো। বলে বালক কৃষ্ণ কে সমুদ্রের জলে ফেলে দেয়।

কল্যাণী ও রাম ভট্টাচার্য চিৎকার করে ওঠে :-আপনারা, কি সর্বনাশ করলেন?
হে ঈশ্বর, আমি বালকের মাসি করুণাময়ীর কাছে কি জবাব দেব? আমাকে সবাই মিথ্যাবাদী বানালো। হিংস্র জানোয়ারের স্বভাব নিয়ে আপনারা তীর্থ করতে এসেছেন। মানুষকে মেরে ফেলে কোন ধর্ম হয় না, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষ কি করতে পারে? 

তীর্থযাত্রী গণ বলে ওঠে :- আপনাকে বেশি জ্ঞান দিতে হবে না, "আপনি বাঁচলে বাপের নাম"।

রাম ভট্টাচার্য পৈতে হাতে নিয়ে বলে :- হে ঈশ্বর যদি সত্যিই থেকে থাকো আর ন্যায় বিচারক হও; তবে নিষ্পাপ শিশুর হত্যার বিচার করো।

বালক কৃষ্ণ সাগরের জলে পড়ে মাসি মাসি বলে আত্মচিৎকার করে উঠে। শেষবারের মতো আওয়াজ আসে মা আমাকে বাঁচাও। মায়ের সামনে সন্তান ধীরে ধীরে জলের ঢেউ এর তালে তালে হারিয়ে যেতে থাকে।

কল্যাণী সন্তানহারা হয়ে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে রাম ভট্টাচার্য কে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- 51 বার অন্যায় করলে পাপ হয়, আবার 52 বার অন্যায় করলেও পাপ হয়। বলে কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। 

কল্যাণী ভাবে তাহলে বাবা ঠাকুর চলে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের তাণ্ডবে নৌকা দ্রুত গতিতে নড়েচড়ে উঠে এবং একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে।

কল্যাণী ক্রোধিত ভাবে মা কালীর মত রান্নার বড় খুন্তি হাতে নিয়ে দ্রুত নৌকার ছাউনির উপরে উঠে পড়ে। নৌকার মাঝি তখন কোন দিকে খেয়াল না করে নৌকা সামলাতে ভীষণভাবে ব্যস্ত।

কল্যাণী মাঝির সামনে গিয়ে দ্রুত মাঝির মাথায় গাঁয়ের সর্ব জোর দিয়ে আঘাত করে এবং মাঝি হাল ছেড়ে দিয়ে বাবা বাবা শব্দ করতে করতে সাগরের জলে পড়ে যায়। কল্যাণী কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে ডাকতে ডাকতে সাগরের জলে ঝাঁপ দেয়।

  ঠিক সেই মুহূর্তে নৌকা নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে চলতে থাকে। আকাশের ঘন ঘন্টা ও বায়ুর বেগ বেড়ে গিয়ে সাগরের উত্তাল ঢেউ ক্ষিপ্ত পাগলের ন্যায় উত্তাল জলোচ্ছ্বাসের মাধ্যমে হাজার সাপের ফণা তুলে বড় বড় জিব্বা বের করে পাপী তীর্থযাত্রীদের বারবার দংশন করতে থাকে।
 ক্ষিপ্ত সাগর নৌকা দুটি জলে ডুবিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। নিষ্ঠুর যাত্রীরা গভীর সাগরের জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে আরো গভীর জলে চলে যায়। হঠাৎ সেই মুহূর্তে দেবতাদের পুষ্পবৃষ্টি শুরু হয়। অর্থাৎ এক ঝলক রোদ্দুরের সাথে সাথে ঝিরঝির বৃষ্টি হতে থাকে। 





















                         ।। সপ্তম অধ্যায় ।।

ধীরে ধীরে উত্তাল সমুদ্র শান্ত হতে শুরু করে।
আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরা বন্ধ হয়। দুপুরের শেষ বিকেলের শুরু এমন সময় এক ঝলক রৌদ্রের আলো দেখা যায়।

মৎস্যজীবীরা পরিষ্কার আকাশ দেখা মাত্রই, নিজের মাছ ধরার নৌকা গুলোর অবস্থা কেমন আছে তা দেখার জন্য সমুদ্রের ধারে আসে। নিশ্চিত হয় নৌকা গুলো ঠিকঠাক আছে কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কয়েকজন জেলেরা সমুদ্রের ধারে ধারে দিয়ে হাঁটতে থাকে।

সুনীল রাজবংশী তার সাথীদের বলে :- ঐ দেখ কয়েক এক জন মানুষ পড়ে আছে। নিশ্চয়ই ঝড়ের তাণ্ডবে নৌকাডুবি হয়েছে।

সুবোধ বলে :- তাড়াতাড়ি চল, মানুষেরা বেঁচে আছে তো! সাত জন জেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দেখতে পায়, বালির উপর এক জায়গায় তিনজন মানুষ জলে পা দিয়ে সাগর পাড়ে বালির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে দেহে রৌদ্রের তাপ দিচ্ছে।

জেলেরা শুয়ে থাকা মানুষের হাত ধরে নাড়ির গতি পরীক্ষা করে চিৎকার করে বলে :- এখনও জীবিত আছে। চল চল তাড়াতাড়ি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি।

বয়স্ক অনির্বাণ এক এক করে তিন জনের পেটের উপর চাপ দিয়ে দিয়ে নোনা জল বের করে। এবং সবাই মিলেমিশে বিপথগামী মানুষগুলোকে উদ্ধার করে গ্রাম বাংলার হাতুড়ে কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করে। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের পরিবারের মানুষদের তৎপরতায় সবাই কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠে। 
রাম ভট্টাচার্যের মুখ থেকে সব কথা শোনার পর হিন্দু মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষেরা বলে :- ঈশ্বরের আশীর্বাদে ও সাগর মহারাজের অশেষ কৃপায় , আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষ গুলো সমুদ্র থেকে ফিরে এসেছেন। যতদিন ইচ্ছা এখানে থাকুন। 

উপস্থিত মৎস্যজীবী নারী-পুরুষ, ছোট বড় আবাল বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কিশোর-কিশোরী ও ঘরের বউ-ঝি সবাই ব্রাহ্মণ শুনা মাত্রই প্রণাম করে সাধ্যমত দক্ষিণা স্বরূপ টাকা দান করতে থাকে। 

রাম ভট্টাচার্য এক জনের মাথায় হাত রেখে বলে :- এখন থেকে গঙ্গাসাগর কত দূর।

সুব্রত হালদার বলে :- কমপক্ষে একশো কিলোমিটার দূরে হবে। আমরা বসবাস করি সাগরের একটি বড় ধরনের ব-দ্বীপের মধ্যে, এই দ্বীপের চারিদিকে জল আর জল। এরকম ছোট-বড় ব দ্বীপ সমুদ্রের মাঝে অসংখ্য রয়েছে।

মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মায়েরা বালক কৃষ্ণ কে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আদর করতে করতে বলে :-আমাদের মাঝে সত্যিকারের কৃষ্ণ এসেছে, কৃষ্ণ ছিল কালো কিন্তু কালো রূপ ত্যাগ করে গৌর রূপ ধরেছে। আমাদের মাঝে সন্তান রূপে তুমি থাকো। নাড়ু দেবো, লাড্ডু দেব আরো কত কিছু। করলে তুমি ননী চুরি ব্রজগোপী মা যশোদা হয়ে তোমার শাসন করবে। লালন করবো, পালন করবো ও খেলার সাথী দেবো বজ্র সখা সখি গনকে।
"জেলে বধূরা, কল্যাণীর কাছে গিয়ে হাত চেপে ধরে বলে :- বোন, তোমার কৃষ্ণ কে নিয়ে নোনা জল ও মাটির দেশে থেকে যাও।

রাম ভট্টাচার্য, কল্যাণীর মাথায় হাত রেখে বলে :- "মা, ভগবান তোর ডাক ঠিক শুনতে পেয়েছে।" এই নোনা মাটির দেশের মানুষেরা ভীষনভাবে সরল সোজা, অতিথি সেবা পরায়ণ, ভক্তি ও শ্রদ্ধা অন্তরে পরিপূর্ণ কিন্তু আক্ষরিক জ্ঞান এবং আধুনিক শিক্ষার আলো এখন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। হয়তো ব্রিটিশ শাসকরা এই সব অবহেলিত মানুষের সংবাদ রাখে না বা জানে না। "মা, তুই তো আট ক্লাস লেখাপড়া শিখেছিস। আয় আমরা এদের সন্তানদের সাথে সাথে তোর কৃষ্ণ কে বড় করে তুলি। 

কল্যাণী ,রাম ভট্টাচার্য কে জড়িয়ে ধরে বলে :- "বাবা, আমি আর লাল মাটির দেশ বীরভূম নবাসন গ্রামের জন্মভূমিতে ফিরতে চায় না। বন, জঙ্গল ও পাহাড় ছাড়া আর কিছুই নেই। না হয়েছে গ্রামের উন্নয়ন ,না মানুষের মন, মানসিকতা ও চরিত্রের কোন পরিবর্তন। আমার সাগরের জলে মৃত্যু হয়ে পুনরায় আবার সাগরের নোনা জল মাটির দেশে জন্ম হয়েছে। এই সাগর পাড়ে অর্থনৈতিক প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা মানুষ গুলো নোনা জলের মতো তিক্ত না।

রাম ভট্টাচার্য কল্যাণী কে সন্তান স্নেহে বলে :- আজ থেকে তুই আমার নতুন জন্মদাত্রী মা। তোর পুণ্যফল আজ নতুন করে জন্ম পেয়েছি।

মৎস্যজীবী মানুষেরা দল বেঁধে, রাম ভট্টাচার্যের সামনে এসে বলে :- আপনাদের দেশে ফেরত যেতে দেবো না। কয়েক এক সপ্তার মধ্যে আমাদের ছেলে-মেয়ে, বুড়া-বুড়ি সহ বাড়ির বউদের ভালবাসা দিয়ে, কাছে টেনে নিয়ে নিজের পরিবারের মতো আপন করে নিয়েছে । আমাদের এলাকায় লেখাপড়া না জানা মানুষগুলো কে শিক্ষার আলো দান করুন। বই, খাতা ও কলম কেনার ব্যবস্থা করে দেবো। এই দ্বীপ এলাকার মধ্যে কোন ব্রাহ্মণ নেই, পূজা পার্বণে বিয়েতে সুদূর কাকদ্বীপ শহরের থেকে নিয়ে আসতে হয় এবং বহু মূল্য দক্ষিণা ও প্রণামীর টাকা সহ জিনিসপত্র দিতে হয়। এই সমগ্র দ্বীপের মাঝে কমপক্ষে পাঁচ হাজার হিন্দু পরিবার বসবাস করে। বাজার, শহর, বন্দর, রাস্তা ও দোকান এবং ফেরীর মাধ্যমে বিভিন্ন শহরের সাথে যোগাযোগ আছে। কিন্তু আমরা মাছ ধরার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার জন্য, এই দ্বীপের সাগর পাড়ের শেষ প্রান্তের একটি ছোট গ্রামে বংশ পরম্পরায় বসবাস করছি। এই বৃহত্তম দ্বীপের বিভিন্ন ঘরগুলোতে পূজা, পাঠ, শ্রাদ্ধশান্তি ও বিয়ের সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করবেন। সাগর মহারাজের কাছে অনেক সম্পদ আছে। যদি বুদ্ধি খাটিয়ে কাজে লাগাতে পারেন,তাহলে কোনদিন অভাব হবে না। বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় মাছ সহ দামি দামি শঙ্খ মুক্তা ইত্যাদি ইত্যাদি পাওয়া যায়। সাগর পাড়ের মানুষেরা ছোট বড় পুরুষ নারী সবাই কম বেশি টাকা আয় করে। সাগর মহারাজের অশেষ কৃপায় বেঁচে উঠেছেন। আমাদের যেমন সবকিছু ছিনিয়ে নেন, আবার প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে কয়েক একশত গুণ ফেরত দিয়ে দেন। বাবা-মেয়ে-নাতির বসবাসের জন্য, জমি ও বাড়ির এবং টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে দেবো। দয়া করে থেকে যান।

রাম ভট্টাচার্য বলে :- মা কল্যাণী ও দাদু ভাই কৃষ্ণ তাহলে নোনতা জলের দেশে থেকে গেলাম।

কৃষ্ণ বলে :- ঠাকুরদা "রাখে হরি মারে কে" আমি আর দুষ্টুমি করবে না। নোনা জল ও মাটির দেশের মানুষের ছেলে মেয়েদের সাথে মন দিয়ে লেখাপড়া করবো। এই পাড়ার মায়েরা আমাকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসে কিন্তু আমাদের দেশে একমাত্র মাসিমা ভালবাসেন। ঠাকুরদা, আমি আরো বড় হয়ে কিন্তু মাসির সাথে দেখা করতে যাবে।

রাম ভট্টাচার্য , কৃষ্ণ কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বলে :- ঠিক আছে দাদুভাই, মাসির কাছে চিঠি লিখে দেবো আসার জন্য।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণে জেলে পাড়ার ঘরে ঘরে এবং আশ্রয়দাতা বলরাম রাজবংশী এর বাড়িতে উপস্থিত মায়েরা একসাথে উল্লুর ধ্বনি ও বিভিন্ন ধরনের শঙ্খের ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কে মুখরিত করে তোলে।

                       -----------------------------------------------------
রচনাকাল :- 2 ই ডিসেম্বর 2021
স্থান :- নিজ বাসভবনে, দত্তপুলিয়া, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ। 
-----------------------------------------------------
তথ্যসূত্র ও স্বীকারোক্তি :- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "দেবতার গ্রাস" বিখ্যাত কবিতার অবলম্বনে এই গল্প লেখা।



------।। সঙ্গম বিপর্যয় উপন্যাস সমাপ্ত।। -----















       
                            



               





কবিতা মালা, ২০২৫ (কবিতা সমগ্র)

 কবিতা মালা, ২০২৫                      লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা  সূচিপত্র   (১) নতুন বছর ২৫  (২) নতুন বছরের শুভেচ্ছা (৩) কালের গহীনে (৪) ব...