( গল্পের মাধ্যমে ভ্রমণ কাহিনী।)
লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
রচনাকাল :- ৯ জানুয়ারী ২০২০ সালে।
-------------------------------------------------------------------
দিনে গয়ার পান্ডাদের দৌরাত্ম্যে টাকা চোষে নেওয়া আর রাতে মশার কামড়ে রক্ত চোষা দুই সমান সমান। গয়া পিন্ডদান ও ভ্রমণ করতে গিয়ে দুয়ের হাত থেকে সাবধানে থাকতে হবে। না হলে সব কিছু হারিয়ে ভিখারীর মতো বাড়িতে ফিরতে হবে। পান্ডাদের সাথে সব সময় টাকা পয়সার ব্যাপারে সত্য কথা বলা যাবে না। ভালো পান্ডা নেই তা বলবো না কিন্তু খুবই সীমিত ।
গয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ০৫/০১/২০২০ সালে দত্তপুলিয়া থেকে সন্ধ্যা ছয়টার সময়ে আমি শংকর হালদার, নিপেন বিশ্বাস, নিপেনের স্ত্রী কল্পনা, দশ বছর বয়স ছেলে ও নিপেনের শাশুড়ি মোট পাঁচ জন রওনা দিলাম। ট্রেনের রিজার্ভিশন টিকিট করা ছিল।
দত্তপুলিয়া থেকে আড়াংঘাট স্টেশন। আড়ংঘাটা স্টেশন থেকে গেদে থেকে শিয়ালদহ গামী ট্রেনে চড়ে শিয়ালদা স্টেশন জংশন তারপর বাসে করে হাওড়া জংশন। হাওড়া জংশন থেকে রাত্রি 11টা 45 মিনিটে গয়া যাওয়ার ট্রেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটে বসা তারপর খাওয়া দাওয়া করে ঘুম দেওয়া। পরের দিন ভোর পাঁচটার সময়ে গয়া জংশনে ট্রেন থেকে নেমে এক পাশে দাঁড়াতেই, চারিদিক থেকে গয়ার পান্ডারা ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে থাকে।
পান্ডারা একসাথে প্রশ্ন করতে থাকে :- আপনার পান্ডা কে ?
শংকর হালদার বলে :- ভারত সেবাশ্রম সংঘ।
একজন পান্টা বলে :- পিন্ড দেওয়া কাজ করবেন ?
নিপেন বিশ্বাস বলে :- হ্যাঁ করবো ।
টানাটানি শুরু করে তারপর একজন তো টানতে টানতে গাড়িতে উঠাই । পান্ডারা এত পরিমাণ বিরক্ত করে মনে হয়েছিল এখান থেকে পালাতে পারলে ভালো হয় ।
অটো চালক কিছুক্ষণ এ গলি সে গলি ঘুরিয়ে এক লাল রঙের বিল্ডিং এর সামনে নামিয়ে দিয়ে বলে :- আসল ভারত সেবা আশ্রম পাঁচজন মিলে ৫০ টাকা দেবেন। গাড়ীতে সাথে এক পান্ডা আসে ।
পান্ডা বলে :- যান মহারাজের কথা বলুন ।
শংকর হালদার এগিয়ে মহারাজের রুমে গিয়ে বলে :- হরে কৃষ্ণ , মহারাজ আমার চারজন লোক আছে। আপনাদের কমিশন পদ্ধতি কি বলুন?
লাল কাপড় ব্যবহারকারী মহারাজ বলেন :- আপনি কি লোক নিয়ে আসেন?
শংকর হালদার বলে ;- মাসে একবার করে এই গয়া ধামে আসা-যাওয়া চলতে থাকে। গঙ্গা আশ্রম থেকে সমস্ত কাজ করিয়ে থাকি।
মহারাজ বলেন :- আপনাকে শতকরা ৫০ টাকা কমিশন দেওয়া হবে। আমাদের সাথে কাজ করুন ।
শংকর হালদার বলে :- অনেক কম হয়ে যাচ্ছে।
মহারাজ বলে :- আমাদের খরচ আছে। আপনাকে আরো শতকরা ১০ টাকা বাড়িয়ে দিলাম কিন্তু পিন্ড দানকারী ব্যক্তিদের সাথে যখন কথা বলবো, আপনি কোন কথা বলবেন না । পাঁচ হাজার নিতে পারলে কিন্তু আপনার তিন হাজার টাকা পেয়ে যাবেন।
থাকার জন্য রুম দেওয়া হবে কিন্তু সন্ধো পযন্ত থাকতে পারবেন। পুরোহিতের দক্ষিণা আলাদাভাবে দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কথাকোথনের মাঝে নিপেন অফিস রুমের মধ্যে চলে আসে।
নিপেন বলে :- আপনি মহারাজ না কসাই। শংকরদা চলে লজ ভাড়া করে থাকবে আর চুক্তিবদ্ধ হতে হবে না। আমি তোমার কমিশন দিয়ে দেবো।
আশ্রম থেকে অন্য কোথাও যেতে দেবে না। তাদের কথা পিন্ডদান যখন করতে এসেছো তখন কাজ আমরা করবো। আমাদের কে ঘিরে ধরে রাখে।
তর্ক-বিতর্ক করতে করতে এক প্রকার জোর করে উক্ত আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়া হয়। উক্ত পান্ডারা বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখাতে থাকে - - - - - - - - - - - ।
রাস্তায় বেরিয়ে সবাই কিছু দূর হেঁটে যাওয়ার পর এক গাছের তলায় চায়ের দোকানে সবাই বসে পড়ে।
চা বিস্কুট খাওয়ার পর শংকর ও নিপেন একটু আড়ালে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় ধুমা দিতে থাকে। হঠাৎ শংকর মোবাইল হাতে নিয়ে তার বন্ধু মাঝদিয়ার দেবানন্দ গোস্বামী কে ফোন করে গয়ার ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ জানাই।
দেবানন্দ গোস্বামী বলেন :- ভারত সেবাশ্রম সঙঘ আশ্রমে যা, তাহলে আর কোন বিপদ নেই। গয়া স্টেশনের পাশেই তাদের অফিস আছে। আশ্রমের এক পান্ডার ফোন নম্বর দেয়।
উক্ত নম্বরে ফোন করে কথা বলে গাড়ি ধরার জন্য আরো কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়াতেই এক ম্যাজিক গাড়ির চালক হিন্দি ভাষায় বলে :- कहां जा रहा है? (আপনি কোথায় যাবেন?)
নিপেন বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বলে :- আসল ভারত সেবাশ্রম সংঘ যেতে চাই।
গাড়ি চালক বাংলা ভাষায় বলে :- বসুন আর পাঁচ জনের ১৬০ টাকা ভাড়া লাগবে।
নিপেন বলে :- আসল আশ্রমে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু সঠিক জায়গায় না পৌঁছলে একটি টাকা দেবো না।
গাড়ি চালক বলেন :- আপনাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছিয়ে দেবো। নিশ্চিত মনে আমার গাড়িতে বসতে পারেন। আমি বিহারী হলেও কিন্তু গয়ার পান্ডাদের মত নয়। আমি বাঙ্গালীদের কে ভীষণ ভালোবাসি কারণ আমার স্ত্রী একজন খাঁটি বাঙালি।
গয়া শহরের মধ্য দিয়ে এ রাস্তা সে রাস্তা পার হয়ে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে গাড়ি চলার পর গাড়ির কমিয়ে একটি বড় প্রকাণ্ড বড় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
গাড়ি চালক বলেন :- দাদা, আপনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গিয়েছি। বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে দেখে নিন ভারত সেবাশ্রম সঙঘ ।
শংকর বলে :- ঠিক আছে দাদা ঠিক আছে।
নিপেন গাড়ীর চালক কে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে বলে :- আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাব আপনাকে ফোন করবো।
গাড়ি থেকে ব্যাগ পত্র নিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করে অফিসের বারান্দায় ব্যাগ পত্র রেখে একটি বেঞ্চের উপর সবাই বসে পড়ে।
নিপেন ও শংকর মহারাজ কাছে যাবে ভাবছে এমণ সময়ে আশ্রমের এক জন সেবক কাছে এসে বলেন :- আজ পিন্ড দান করতে হলে প্রথমে আশ্রমের রেজিস্টেশন করতে হবে। জিনিসপত্র এখানে থাক কোন অসুবিধা নেই তাড়াতাড়ি রেজিস্ট্রেশন ও ঘর বুক করে ফেলুন।
শংকর ও নিপেন মহারাজের অফিস রুমে ঢুকে চেয়ার নিয়ে বসে পড়ে।
আশ্রমের মহারাজ বলেন :- আধার কার্ডের জেরেক্স ও ফোন নাম্বার দেবেন।
আশ্রমের মহারাজ আধার কার্ডের জেরক্সের অপর দিকে খসড়া হিসাবে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার কয়জন সাথে আছে তাদের নাম ইত্যাদি ইত্যাদি, বিস্তারিত লিখতে থাকে।
নিপেন বলে খরচ কেমন হবে সে বিষয়ে কিছু বলুন।
মহারাজ তাদের আশ্রমের নিরাপত্তা সম্পর্কে ছোট্ট করে বক্তৃতা রাখার পর বলেন :- প্রতিদিন একটি রুম ব্যবহার করার জন্য পাঁচ শত করে দিতে হবে। পাঁচজন একসাথে থাকতে পারলে থাকবেন। পিন্ডদান কারিদের একবার দুপুরের খাবার বিনামূল্য পাবেন। রাতের খাবারের জন্য মাথাপিছু ত্রিশ টাকা করে আগে বুকিং করতে হবে। বুকিং না করলে খাবার পাওয়া যাবে না। আর যদি মনে করেন আরো কয়েকদিন থাকবেন সে ক্ষেত্রে প্রতিদিনের ঘর ভাড়া দিতে হবে কিন্তু খাবারের কোন ব্যবস্থা থাকবে না বাইরে থেকে খাবার খেয়ে আসতে হবে।
নিপেন বলে :- পিন্ডদান করতে খরচ কেমন পড়বে।
মহারাজ বলেন :- পিন্ডদান দেওয়ার জন্য একজন পুরোহিত আপনার সাথে দেওয়া হবে। গাড়ি ভাড়া সহ অন্যান্য খরচ সব আপনাকে বহন করতে হবে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে মহারাজ বলল ওই বট গাছের নিচেই টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে অস্থায়ী অফিস করেছে সেখানে গিয়ে পিণ্ডদান কারীদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। নাম রেজিস্ট্রেশন করতে মাথাপিছু ৩৫০ টাকা জমা দিতে হবে আর পুরোহিতের দক্ষিণা হিসেবে দুইশত টাকা দেবে।
এছাড়াও বিষ্ণু মন্দিরে পান্ডাদের দান দক্ষিণা করবেন আর যেখানেই যা লাগবে তা আপনার নিজের খরচ ।
শংকর ভাবে মনে :- ভারত সেবাশ্রম সঙঘ আশ্রমের বক্তব্য অনুসারে বোঝা যাচ্ছে ঘর ভাড়ার নাম করে কায়দা করে তাদের ব্যবসা ঠিক রেখেছে। কারণ পিন্ডদান করার সময় পান্ডাদের হাত থেকে নিজেকেই নিজে বাঁচাতে হবে। পুরোহিত কোন দায়িত্ব নেবেন না শুধু পিণ্ডদানের ব্যাপারে পুরোহিতের কাজ করবেন।
টাকা পয়সা জমা দিয়ে নির্দিষ্ট রুমে সবাই উপস্থিত হয় । নাপিতির কাছে থেকে নিপেন মাথামুণ্ডন করে । স্নানাদি করে নতুন বস্ত্র পড়ে অফিস রুমের সামনে উপস্থিত হয়ে পাশে থাকা মন্দিরে প্রণাম করে খোলা আকাশের মেঘের উপর বসে পড়ে। তখন বিভিন্ন রকম উপদেশ মূলক ও মাহাত্ম্য মহারাজের বক্তৃতা চলছে। মহারাজ তার বক্তৃতা শেষ করে পিন্ডদানকারীদের এক এক করে ডাকতে শুরু করেন। অপেক্ষা করতে করতে এক সময় নিপেনের ডাক আসে। নৃপেন মহারাজের সামনে গিয়ে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মহারাজ বলেন :- পিন্ডদান করতে দুই রকম প্যাকেজের ব্যবস্থা আছে। স্পেশাল প্যাকেজের দাম ২০০০ টাকা। সুবিধাগুলো দুজন পুরোহিত গীতা পাঠ করবেন এবং পিণ্ড দানের সময় মন্ত্র উচ্চারণ করবেন আর সাধারণ প্যাকেজে দাম ১ হাজার টাকা। সুবিধা গুলো একজন পুরোহিত গীতা পাঠ করবেন। পিন্ডদানকারীদের সবার ক্ষেত্রে মাথাপিছু রেজিস্ট্রেশন ফি ৩৫০ টাকা সবাইকে জমা দিতে হবে।
নৃপেন বলে :- মহারাজ, আমাকে সাধারণ প্যাকেজ দিন।
১০০০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর মহারাজ বলেন সামনে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন। আবার রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয় তারপর একসময় রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেয়।
প্রায়ই আধাঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর নিপেনের পিন্ডদানকারী পান্ডা এসে বলেন আপনারা তৈরি হয়ে নিন।
নৃপেন বলে :- কত জন পেলেন।
পান্ডা বলেন :- ৮ জন পেয়েছি।
পান্ডার সাথে কথা বলে জানা যায় ৩৫০ টাকা থেকে পুরোহিত পাবে ব্যক্তিগত ৫০ টাকা আর পূজা সামগ্রী ভাড়া নেওয়ার জন্য ৫০ টাকা। এছাড়াও পিন্ডদানকারী নদিয়া জেলার বাসিন্দা হওয়ার কারণে নদীয়া জেলার মূল পান্ডা উক্ত টাকা থেকে ভাগ পাবেন। আশ্রমের মহারাজের অনুমতি নিয়ে সবাই গেটের সম্মুখে আসে এবং ভাগাভাগি করে বড় ধরনের ম্যাজিক গাড়ি ভাড়া করা হয়। প্রত্যেকের মাথাপিছু ২৫০ টাকা করে গাড়ি ভাড়া ধরা হয়।
পিন্ডদানকারী সবাই গাড়িতে উঠে বসে, চালক গাড়ি চালিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে।
এক সময় গাড়ী বিষ্ণু মন্দির এলাকার মধ্যেই উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
পুরোহিত বলেন :- আপনারা এখানেই থাকবেন আমি পূজার ফুল ও ধুপকাঠি নিয়ে আসছি।
বিভিন্ন পান্ডারা এসে বলেন :- কোন জেলার বাসিন্দা এবং আপনাদের পান্ডা কে ? বাবার নাম, ঠাকুর দাদার নাম, আপনার নাম ও ঠিকানা বলুন। আগে কি বাংলাদেশ বাড়ি ছিল, থাকলে কোন জেলা ইত্যাদি ইত্যাদি খাতায় নোট করে নেয়।
এরকম বহু পান্ডা আসে আর নোট করে নিয়ে চলে যাই । পুরো বাংলা ভাষায় কথা বলে পান্ডারা ।
একজন পান্ডা নিপেনের সামনে এসে বলেন :- আমি নদীয়া জেলার মূল পান্ডার লোক। আপনাদের নাম ঠিকানা আমাদের খাতায় রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। কারণ আপনি গয়া ধামে এসেছেন তার প্রমাণ রেখে যেতে হবে। আপনার বংশপরম্পরায় সবাই জানতে পারবে। ১০০ বছর পরেও যদি আপনার বংশের কেউ আসে তাহলে আমাদের খাতা পরীক্ষা করলেই আপনার নাম বেরিয়ে যাবে।
নিপেন বলে :- ঠিক আছে।
পান্ডা বলেন :- কয় জন পিন্ড দানের কাজ করবেন।
নিপেন বলে :- আমি একা।
পান্ডা বলে :- আপনার কোন জেলা।
নিপেন বলে :- নদীয়া জেলা।
পান্ডা বলে :- গ্রামের নাম, থানা বলুন।
নিপেন বলে :- গ্রাম দত্তপুলিয়া থানা ধানতলা।
পান্ডা বলে :- পাড়ার নাম বলুন।
নিপেন বলে :- দত্তপুলিয়া মোড়ের মাথা।
পান্ডা বলেন :- আপনার নাম কি?
নিপেন বলে :- নিপেন বিশ্বাস।
পান্ডা বলেন :- আপনার বাবার নাম, ঠাকুর দাদার নাম বলুন।
নিপেন বলে :- ঈশ্বর খগেন্দ্র বিশ্বাস।
পান্ডা বলে :- ঠাকুর দাদার নাম।
নিপেন বলে :- ঈশ্বর - - - - - -বিশ্বাস।
পান্ডা বলে :- কোন পান্ডার নাম জানেন।
নিপেন বলে :- না।
পান্ডা বলেন :- কোন পান্ডারা জিজ্ঞাসা করলে, বলবেন পান্ডা গুরু হল "বাংলী আশ্রম" সবাই কে একাকী কথা বলবেন কিন্তু বাংলাদেশ বাড়ি হলেও ভুল করে বলবেন না। কারণ তাহলে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপদে পড়ে যাবেন । নদীয়া জেলা বলবেন ।
কিছুক্ষণ পর পুরোহিত ফিরে আসেন এবং সবাইকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন । হেঁটে যেতে যেতে কমপক্ষে 10 থেকে 15 জনের কাছে কোন জেলার একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে হবে।
নদিয়া জেলা ও বাঙালি আশ্রমের নাম বললেই পান্ডারা ছেড়ে দেবে। পুরোহিত পান্ডার সাথে কথা বলে জানা যায় মোবাইল এর মাধ্যমে সবার কাছে খবর হয়ে যায়। কারণ পান্ডারা নিজেরাই বলে আপনি নদীয়া জেলার। এখানে পিন্ডদান উপলক্ষে প্রতিদিনই উৎসবে পরিণত হয়েছে।
প্রথমেই বিষ্ণুর মন্দিরে পূজা করতে হবে একটি নিরিবিলি জায়গা দেখে পিন্ডদান করার একটি ঘরের মধ্যে সবাইকে বসতে বলেন পুরোহিত। ঝাকে ঝাকে পান্ডারা এসে একই প্রশ্ন করতে থাকে।
পিন্ডদান পর্বের আয়োজন চলতে চলতে বাঙালি আশ্রমের পক্ষ থেকে একটি লাল রংয়ের বড় খাতা নিয়ে একজন বয়স্ক পান্ডা নিপেনের সামনে উপস্থিত হয়ে বলেন :-এই খাতায় আপনাদের ফাইনাল ভাবে নাম তুলতে হবে। আবার নতুন করে সব তথ্য দিতে থাকে আর পান্ডা তা হিন্দি ভাষায় লিপিবদ্ধ করতে থাকে। নিপেন এর সাথে থাকা পাঁচজনের নাম মূল খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এই মূল খাতায় নাম তোলার জন্য এখানে কোন টাকা পয়সা দাবি করা হয় না। কিন্তু আপনি আপনার মূল পান্ডা হিসাবে তাদের দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করতে পারেন।
এরপর ফুল্গু নদীর বালির উপর পিন্ডদান করার জন্য লাইন দিয়ে বসে। ধর্মীয় অভিমত অনুসারে ক্রেতা যুগে রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা দেবী এই ফল্গু নদীর তীরে শশুর দশরথের পিন্ডদান করেছিলেন। কিন্তু রামচন্দ্র আসার পর ফুল্গু নদী পিণ্ড দানের কথা অস্বীকার করে, সেই মুহূর্তে সীতা দেবী ক্রোধিত হয়ে অভিশাপ দেয় তোর বুক শুকনো হয়ে যাবে। আর মুহূর্তের মধ্যেই ফল্গু নদীতে বালিতে পরিণত হয়ে যায়। কথিত আছে রামচন্দ্রের আশীর্বাদে বালির নিচেই জল থাকে উপরে তার শুকনো। বালি সরিয়ে জল সংগ্রহ করে পিন্ডদানের কার্য্য করা হয়।
জল সংগ্রহের সময়ে কয়েকজন পান্ডা দুধ জল নিয়ে আপনার জলের মধ্যে ফেলে দেবে। আর বলবে গোমাতা সেবার জন্য ১০১ টাকা দান করুন। আপনি যদি টাকা বের করে দেন ভাববে আপনি বড় দানকারী অন্যান্য পান্নারা এসে টাকা নেওয়ার জন্য আপনাকে বিরক্ত করতে শুরু করবে। শংকর দর কষাকষি করে শেষে এগারো টাকা দিয়ে মুক্তি লাভ হয়। এখানে মুখে শক্ত থাকতে হবে। আপনার পুরোহিত পান্ডা এইসব বিষয়ে কিছুই বলবে না কারণ সবারই রুটি রোজগারের ব্যাপার রয়েছে। ঝামেলা বেশি পরিমাণ হয়ে গেলে আপনার পুরোহিত পান্ডা বলবে উক্ত পান্ডাকে মীমাংসা করে নিতে। প্রতিদিন ফল্গু নদীর বিশাল চরের উপরে হাজার হাজার মানুষ পিন্ডদান করে চলেছে। তিথি নক্ষত্রে অনুসারে ও পিতৃ পক্ষ-মাতৃ পক্ষ উৎসবে পরিণত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়োজনে। বর্ষার মৌসুমে ফল্গু নদীতে জল দেখা যায়। পুরোহিত পান্ডা তার ভাগের 8 জনকে নিয়েই পিণ্ডদান কার্য শুরু করেন ।
শংকর ঘুরে ঘুরে পান্ডাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে থাকে। বাঙালি আশ্রমের এক পান্ডার সাথে শঙ্করের আলাপ জমে ওঠে।
শংকর বলে :- এই গয়া ধামে দশ থেকে বারো জন পান্ডারা ভীষণ আনন্দ করে পিন্ডদানকারী যাত্রীদের নাম লিখলেন , কারণ কি ?
উক্ত পান্ডা বলেন :- এটা আমাদের রুটি রোজগারের ব্যাপার । ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে প্রতিটি জেলার কয়েক এক জন পান্ডা আছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ সহ অন্য দেশের জন্য পান্ডা আছে। ৩৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হয় ওখান থেকে সবাই কম বেশি ভাগ পান। অনলাইন মাধ্যমেই অটোমেটিক তার একাউন্টে টাকা চলে যাবে। তার জন্য একটা অফিস রয়েছে।
বিষ্ণু মন্দিরে পিন্ডদান কাজ শেষ হওয়ার পর মন্দিরের পুরোহিত এক পান্ডা উপস্থিত হয়ে বলেন :-
পিন্ডদান করার পর ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব সেবা, গোদান, সোনা দান ও বস্ত্রদান ইত্যাদি ইত্যাদি দান করতে হয়।
২০০০ টাকার মধ্যে কম বেশি করে সব কাজ হয়ে যাবে।
নিপেনের সাথে উক্ত পান্ডার টাকা পয়সা সংক্রান্ত দর কষাঘষি শুরু হয়। তারপর শেষে হাজার টাকা দিয়ে নিস্তার লাভ হয়।
এখানকার নিয়ম অনুসারে নির্দিষ্ট বিষ্ণু মন্দিরের গোলাকার কালো পাথরের উপর পিণ্ড রাখতে হয় তাহলে তার পিতা মাতা বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়।
নিপেন পিন্ড হাতে করে নিয়ে বিষ্ণু মন্দির মন্দিরে উপস্থিত হয়ে পিন্ডদান করতে যাবে এমন সময় একজন পান্ডা এসে হাত চেপে ধরে বলেন :- এখানে পিন্ডদানের দক্ষিণা ৫০০ টাকা দিতে হবে। না দিলে পিণ্ড দিতে দেওয়া হবে না। আবার নিপেন ও পান্ডাদের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হয় এবং শেষে ১০১ টাকা দিয়ে পিণ্ডদান করে ফিরে আসে।
এরপর বিষ্ণু মূর্তি দর্শন করতে গিয়ে প্রণাম করে উঠতে উঠতেই মন্দিরের পাণ্ডা বলে টাকা দাও।
দর কষাকষি করে 200 টাকার বিনিময়ে মুক্তি লাভ করে বাইরে গেটের দিকে আসতেই এক পান্ডা নিপেনের ঘাড় ধরে বলেন হাজার টাকা দাও। আবার দর কষাকষি করে তিনশত টাকার বিনিময়ে উক্ত পান্ডার হাত থেকে মুক্তি লাভ করে। সাথে মহিলারা থাকলে পান্ডারা অতিরিক্ত ঝামেলা শুরু করে কারণ স্ত্রীর সামনে মান সম্মান হানি কারো কথাবার্তা বললে পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে আসবে। এছাড়াও মানুষ বিরক্ত হয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়ে থাকে। গোয়াই পিণ্ডদান করতে গিয়ে একটু আড্ড ঝামেলা হবে না তা কোনদিন হয় না। আপনি যদি 5 লাখ টাকা পিন্ডদানের জন্য খরচ করেন তবুও পান্ডাদের মন জয় করতে পারবেন না। যদি একবার বুঝতে পারে আপনার কাছে প্রচুর টাকা আছে। ছলেবলে কৌশলে ও সেন্টিমেন্টে আঘাত করে আপনার কাছে থেকে টাকা নিয়ে নেবে। এই ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র বিষ্ণু মন্দিরের কোন পান্ডার সাথে পিণ্ডদান চুক্তি হলে ঝামেলা থেকে অনেকটাই রেহাই পাওয়া যায়।
গয়ার পান্ডা গন বাদে দোকানদার, বেশি ভাগ গাড়িচালক, অন্যান্য মানুষগুলো যাত্রীদের সব সময় সংযোগিতা সাহায্য করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছু গাইড পাওয়া যায়। আলোর পিছনে সব সময় অন্ধকার থাকে কিন্তু গয়ার সবকিছুর মধ্যেই অন্ধকার নেই।
গয়ার সাধারণ মানুষ পান্ডাদের উপর বিরক্তবোধ করে সমালোচনা করে কিন্তু পান্ডাদের সামনে কিছু বলা যাবে না, বললেই বিপদ নিজের ঘাড়ে নিয়ে আসা হবে ।
গয়ার পিন্ড দান কেন্দ্র গুলো ও গয়া জংশন ষ্ট্রশন চত্বরে পান্ডাদের রাজত্ব। স্টেশন থেকে বাঁচতে পারলেও কিন্তু পিন্ডদান কেন্দ্রগুলো থেকে পান্ডাদের হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই, সেই জন্য পকেটে প্রচুর টাকা রাখতে হবে। আর মুখের জোর কম করলে হবে না। নেই নেই গরিব মানুষ বলতে হবে।
এরপর গাড়ি করে অক্ষয় বট পিন্ড দান করতে যাওয়া হয় কিন্তু এখানে বিষ্ণু মন্দির বা ফল্গু নদীর ধারের মতো পাণ্ডাদের জুলুমবাজি নেই । বিনয়ের সঙ্গে আবেদন জানায় টাকা দেওয়ার জন্য এবং বলেন আপনাদের দেওয়া দানেই আমাদের সংসারের রুটি রোজগারের ব্যবস্থা হয়। শিশু কান্না না করলে মা কখনো দুধ দেয় না তাই আপনারা হলেন আমাদের মা বাবা। অক্ষয় বটের ছায়া তলে দুটি জায়গাতে পিণ্ডদান করা হয় এবং দান দক্ষিণা সাধ্যমত নিপেন করতে থাকে। এরপর সাথে থাকা পুরোহিত দক্ষিণা।
পুরোহিত পিন্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন :- পুরোহিত দক্ষিণা, ভোজন জন্য টাকা, ইত্যাদি না দিলে পিন্ড আমি নেবে না । আবার দরকষাকষি শুরু হয়, শেষে তিন শত টাকা দিয়ে পুরোহিত বিদায় হয়। পিন্ড দানের সমাপ্তি ঘটে ।
ভারত সেবাশ্রম সঙঘ ফিরে এসে খেতে যাওয়া হয়। খাওয়ার মেনু ছিল ভাত, ডাল, কাঁঠালের তরকারি, চাটনি, পায়েস ।
বিকালে ভল্গু নদীর ওপারে মা সীতা দেবীর পিন্ড দান স্থান । ভীষণ নিরিবিলি পরিবেশ সুশীতল বাতাস মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভীষণ ভালো লেগেছিলো। এখানে পান্ডা আছে তবে শান্ত ভদ্র যে যাহা প্রণামী দেয় তাহা গ্রহণ করে ।
ঘোরাঘুরি করার অনেক জায়গা আছে । বেড়িয়ে পড়ুন বৌদ্ধ গয়া, লালন্দা বিশ্ব বিদ্যালয় ।
আমার সাথে একজন পান্ডার পরিচয় হয়, মন্দিরে থাকে । আমাদের তীর্থ গুরুদেব এর বংশধর । বলেছে কোন সমস্যা হবে না ।
----------------------------------------------------------
।। গল্প সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
গয়া পিন্ডদানের জন্য সরাসরি বাঙালি আশ্রমের সাথে যোগাযোগ করুন। এখানে বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। শ্রী গয়া ধামের পান্ডা শ্রী বিনোদ কুমার গুপ্ত। এই বাঙালি আশ্রমের মাধ্যমে পিন্ডদান করতে গেলে অন্যান্য ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
মোবাইল নাম্বার 9430201046 , 9801213751,
7783802841, 8581990509 ও 8757034751
----------------------------------------------------------
লেখক শংকর হালদার।
+91 89262 000 21
----------------------------------------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন