সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

* চরিত্রহীন সদাশিবের প্রেম * সংশোধিত উপন্যাস

।। চরিত্রহীন সদাশিবের প্রেম ।। 
শ্রেণি :- উপন্যাস (সংশোধিত)
লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।

      উপন্যাসের অধ্যায় সংখ্যা :- 1    

  অধ্যায়ের নাম :- পরকীয়া প্রেমের আহ্বানে।  

   সদাশিব বাড়ী থেকে বেড়িয়ে কামিনী বৌদির বাড়ীর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে, বৌদির সঙ্গে দেখা হয়।
কামিনী বৌদি, নিজের বাড়ীর সদর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। সদাশিব কে দেখে  হাত নাড়তে নাড়তে ও আনন্দের সহিত হাসি হাসি মুখে-নানা অঙ্গভঙ্গি করে ডাকতে থাকে।

কামিনী বৌদি সুমধুর কোকিল কন্ঠে প্রতিবেশী সদাশিবের উদ্দেশ্য বলে :- ঠাকুরপো (অর্থাৎ দেবর) তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলার ছিল, তুমি তো আবার ব্যস্ত মানুষ। 
তোমার দেখা সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না ।

সদাশিব, কামিনী বৌদির আহ্বান কে উপেক্ষা না করে দাঁড়িয়ে পড়ে ।

সদাশিব ভাবে মনে মনে :- আকাশে ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে, এক সময় সূর্যের আলো উদয় হয়ে থাকে। কিন্তু একদিন এই কামিনী বৌদি আমার জীবনের সূর্যের আলো কে কালো মেঘের বজ্রপাতের সঙ্গে ডেকে দিয়ে ছিলো।
জীবনের অন্ধকার এখনো কাঁটিয়ে উঠতে পারেনি।

সদাশিব বলে :- বলো, বৌদি কি বলতে চাও ?

সদাশিব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে না থেকে-বাড়ীর মধ্যে ঢুকে, উঠোনে কৃষ্ণচূড়ার গাছের নিচেই বাঁধানো বেদীর উপর বসে পড়ে।

কামিনী বৌদি গেট বন্ধ করে-সদাশিবের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসে পড়ে।

সদাশিব বলে :- রূপের সৌন্দর্যের ও টাকার অহংকারে-তুমি তো এখন কাউকে পাত্তা দাও না। কিন্তু তোমার বাড়ীর সামনেই বসবাস করি।

কামিনী বৌদি হাসতে হাসতে বলে :- প্রতিদিন বাড়ির সামনে দিয়ে চলাচল করে কিন্তু কথাবার্তা না বলে ঠিক করে না। 
আমি তো তোমার বাড়ির পাশের একমাত্র  বৌদি। তোমার থাকার ঘরের জানালা খোলা রাখলেই দেখা হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না করলে, ভাল মন্দ জানাবে কেমন করে। 

সদাশিব বলে :- বলে, তোমার কি উপকার করতে পারি?

কামিনী বৌদি বলে :-আমি ভীষন বিপদের মধ্যে বসবাস করছি। বাজার করার অভাবে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে কিন্তু বাড়ীতে টাকা আছে। বাজার করে নিয়ে আসার কোন একজন মানুষ নেই।

সদাশিব বলে :- আমি, কি করতে পারি?

কামিনী বৌদি বলে :- তোমার অজানার কিছুই নেই। স্বামী থাকে না বাড়ীতে-শ্বশুর-শ্বাশুড়ি অনেক দিন আগেই পরলোক (অর্থাৎ মৃত) গমন করেছেন। অসহায় প্রতিবেশীদের ভাল-মন্দের খোঁজ খবর নিতে হয়তো ?

সদাশিব বলে :- অনেক কাজে থাকি ব্যস্ত-লোকে বলে বেকার ছেলে কিন্তু সমাজের সবার মানুষের কাজ করে দিতে হয়।
তোমার দেওয়া চরিত্রহীন-লম্পট- বদমাইশ উপাধি নিয়ে, অন্ধকারের চোরাগলিতে ঘুরে বেড়ায়।
বেকার জীবনে জনসেবা করতে গিয়ে, কোন আয় রোজগার হয় না।

কামিনী বৌদি বলে :- তোমার কাজ মানেই তো,বাপের হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে- বনের গরু-মোষ-ছাগল-ভেড়া তাড়ানো ।

সদাশিব বলে :- বাড়ির উঠানে পেয়ে আড্ডা মারার ছলে,অপমান করে চলেছে । চললাম, বলে পা বাড়িয়ে চলতে শুরু করে।

কামিনী বৌদি, সদাশিবের হাত চেপে ধরে চলার গতি রোধ করে বলে :- রাগ দেখিয়ে কোথায় যাচ্ছে ।

সদাশিব বলে :- অনেক কাজ আছে-তোমার সঙ্গে বকবক করলে চলবে না।

কামিনী বৌদি দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলে :- আমার কিছু কাজ করে দিতে হবে কিন্তু সারা বছর কাজের বিনিময়ে টাকা পাবে।
তোমার বেকারত্ব ঘুচবে আর আমার একজন মানুষের প্রয়োজন মিটবে।
তাহলে উভয়ের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সদাশিব বলে :- বৌদি, তোমার সব কাজ করে দেবো-বলো কি কাজ করে দিতে হবে?

কামিনী বৌদি বলে :- তুমি, নারীদের ভালবাসার কি বোঝে ?

সদাশিব বলে :- ছোট্ট বেলা থেকেই ভালোবাসা কেমন-তাহা সমাজের ও পরিবারের থেকে পায়নি। বাবা-মায়ের  ভালোবাসার বদলে পেয়েছি সুধু বেত্রাঘাত। সমাজের মানুষের কাছে অপমান-অবজ্ঞার লাথি ঝাঁটা খেতে খেতে, কোন দিন বুঝিতে পারি নাই _ভালবাসা কাহারে কয়।
সবার অবহেলার কারণে আমার হৃদয় পাষাণের  মতো, নিষ্ঠুরতায় ভরে গিয়েছে। 

কামিনী বৌদি বলে :- কে বলেছে তুমি পাষণ্ড! তা হলে পরের দুঃখে দুঃখিত হও কেন; কেউ বিপদে পড়লে ,সবার আগে গিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে কেন ?

দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে সদাশিব বলে :- জন্মদাতা বাবা-গর্ভধারিনী মা ভালবাসে না। তখন প্রতিবেশীদের কাছে আদর যত্ন ভালবাসা আশা করি-কি করে?

কামিনী বৌদি , সদাশিবের আরো কাছে এসে বলে :- জানি, তোমার মনে অনেক দুঃখ কষ্ট জমা হয়ে হয়েছে। যদি, আমার হাত ধরে চলতে পারে- তবে, তোমার সব দুঃখ কষ্ট দূর করে দেবো । 

সদাশিবের মনে পড়ে যায় অতীতের এই বাড়িতে অপমানিত হওয়ার ঘটনা কিন্তু বৌদির মন রাখার জন্য বলে :- ভেবে দেখবে, তাহলে চলি।

কামিনী বৌদি বলে :- এই সন্ধ্যাকালে কোথায় যাবে । চা পান ও টিফিন করে তারপর যাবে। 

সদাশিব বলে :- না,থাক-অন্য একদিন এসে, তোমার হাতের গরম গরম চা পান করবে।

কামিনী বৌদি, সদাশিবের হাত চেপে ধরে বলে :-  এই ধরলাম তোমার হাত, বন্ধুত্বের
এই বন্ধন ছিন্ন করে যেতে পারে- তাহলে যাও চলে।

সদাশিব ভাবে মনে :- কামিনী বৌদি দীর্ঘ কয়েক বছর পর, স্বেচ্ছায় দিয়েছে যখন ধরা।
সুযোগের সদ্ব্যবহার করায়,আমার পক্ষে মঙ্গল হবে ।

সদাশিব, কামিনী বৌদির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘরের মধ্যে ঢুকে, খাটের উপর বসে পড়ে।

কামিনী বৌদি,সদাশিবের পাশে বসে বলে :-  কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে- টিফিন নিয়ে আসছি। 
বলে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

কামিনী বৌদির পরিচয় হলো :- কামিনী সাহা ও স্বামী কল্যাণ সাহা। বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার কোন এক গ্রামে।

স্বামী বিদেশে অর্থাৎ আরব দেশ সমূহের মধ্যে কর্মরত গাড়ী চালক -3 বছর পর পর বাড়ীতে আসেন।

সদাশিব, কামিনী বৌদির ঘরের দামি সোফার উপর  নরম নরম গদিতে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে, ঘরের মধ্যে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে মনে মনে ভাবে :- ঘরের মধ্যে ও বাইরে শ্বেত পাথরের কারু কার্য করা।

বৌদি দামি দামি আসবাবপত্র সুন্দর ভাবে, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজয় রেখে গুছিয়ে রেখেছে । 

  এই ঘরের মধ্যেই, একদিন চরম ভাবে অপমানিত হয়ে ছিলাম। কিন্তু ‌আজ বিশেষ ভাবে সম্মানিত করে, সম্মানের সহিত ঘরের মধ্যে বসতে দিয়েছেন।
কারণ স্বামীর অবর্তমানে সাহায্যকারী অভিভাবক করতে চান।  

সদাশিব পুরানো দিনের স্মৃতিচারণ করতে থাকে-সেই সময়ের অপমানিত হওয়ার ঘটনাগুলো।  

কামিনী বৌদির বিয়ের বৌভাতের অনুষ্টানের আয়োজন চলছে। আমি (সদাশিব) সকাল দশটার সময় এক পা দুই পা করে, কামিনী বৌদির ঘরে ঢুকে পড়ি। সেই মুহূর্তে  ঘরের মধ্যে, নববধূ ছাড়া কেউ ছিল না ।

ঘরের মধ্যে যাওয়ার সাহস পেয়েছিলাম কারণ কল্যান সাহার বাবা-মা জীবিত থাকাকালীন, এই বাড়ীর পরিবারের সঙ্গে- দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও বিশেষ ভাবে যাতায়াত ছিল।

বৌদির রূপ লাবণ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে,আবেগে একতরফা ভালবাসা নিবেদন করে ছিলাম।

  সদাশিব বলে :- বৌদি, তোমাকে ভীষন ভালবাসি-আমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো বন্ধুত্ব করবে।

 কামিনী বৌদি বলে :- ছাড়, ছাড়, ভালোবাসার মানে বুঝিস ? 
কামিনী বৌদি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।  চরিত্রহীন, লম্পট, বদমাইশ বলতে বলতে চর-থাপ্পর-কুল-ঘুষি সহ শেষে চটির দিয়ে পেটাতে শুরু করে।

দ্রুত নববধূর ঘরের মধ্যে, বিয়ে বাড়ির লোকজন সহ কল্যানদা ছুটে আসে।  সেই মুহূর্তে আমি, মেঝেতে পড়ে আছি। বৌদি কান্নাকাটি করতে করতে, আমার মুখে লাথি মারতে মারতে থাকে।

কামিনী বৌদি,কল্যানদা জড়িয়ে ধরে বলে :- সদাশিব আমাকে শ্রীলতাহানি ও ধর্ষণ করতে চেয়েছিল।
শয়তানের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।

কল্যানদা, আমাকে মারতে মারতে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসে বাড়ির উঠানে ।
  প্রবল বৃষ্টির ধারার মতো, চারিদিক থেকে গণধূলাই গণধোলাই শুরু হয়ে যায়। 
কল্যানদার বাড়িতে, বাবা মা সহ প্রতিবেশী মানুষের ঢল নেমে যায়। সবাই তখন, আমার দিকে অবজ্ঞা ও ঘিন্নার চোখে তাকিয়ে বলে :- কি সাহস নতুন বউয়ের ধর্ষণের চেষ্টা? 
মায়ের উদ্দেশ্যে বলে :- তোমার ছেলে অকালে পেকে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি বিয়ে থাওয়া দাও , না হলে মানসম্মান যা আছে- সব নষ্ট হয়ে যাবে।

এক প্রতিবেশী কাকা কমলেশ্বর সাহার সহযোগিতায়, পালিয়ে জীবন রক্ষা করে ছিলাম।

আমার কারণে, গোটা পরিবারের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে গিয়েছিলে। লজ্জায় বাড়ী ছাড়া হয়ে, কুমার নদের অপর প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে পিকুল বাবুর বাড়িতে এক বছর বসবাস করে ছিলাম।

সেই দিনের অপমানিত হওয়ার স্মৃতিগুলো জীবনে কখনোই ভোলা যাবে না।

কামিনী বৌদি, তুমি যতোই ক্ষত স্থানে ঘিয়ের প্রলাপ লাগাও কিন্তু ফিরিয়ে দিতে পারবে না, অতীতের হারিয়ে যাওয়া মানে সম্মান। 

অতীতের ঘটনার পর, সমাজের কাছে  চরিত্রহীন সদাশিব নামে কলঙ্কের ছাপ্পা পড়ে যায়।

করুণাময় ঈশ্বরের  কি অদ্ভুত লীলা ।

সেই কামিনী বৌদি, চরিত্রহীন সদাশিব কে পাওয়ার জন্য- অস্থির হয়ে প্রার্থনা করছে।

সেই অতীতের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসে গিয়েছে। তিন বছর পর বৌদি স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে। 

বৌদি, তোমাকে অমৃত রস তত্ত্বের ধারায়- এমন ভালোবাসা দেবো_ মন প্রাণ পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।  সদাশিব কে জীবনে কোনদিন ভুলতে পারবে না ।

সমাজের বুকে, তোমার জন্যই হয়েছে- বদনাম। আরো বেশি করে হোক ।

গ্রাম্য প্রবাদ বাক্যে বলে "বিষে বিষ ক্ষয়"

কল্যাণদা বিদেশে কর্মস্থলে চলে যাওয়ার পরে,
কামিনী বৌদি একা হয়ে পড়েছে।
সংসারের মাঝে আর দেখা শোনা করার মতো, দ্বিতীয় কোন পুরুষ নেই।

সদাশিব মনে মনে বলে :- কামিনী বৌদি চিন্তা করে না। আমি হবো, তোমার পরকীয়া প্রেমের স্বামী ও নিয়ন্ত্রণকারী অভিভাবক।

সদাশিব কয়েক দিন পর কামিনী বৌদির বাড়িতে   আসে, দিনের আলো ও রাতের সন্ধিক্ষণে।

সদাশিব অবাধে যাতায়াত করার অভ্যাসের মতো-কোন আওয়াজ না দিয়ে, সরাসরি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে । এঘর ওঘরে খোঁজ করে, দেখা না পেয়ে- আওয়াজ করে বলে :- বৌদি, কোথায় আছে ?

কামিনী বৌদি বাথরুম থেকে আওয়াজ দিয়ে বলে :- যা গরম পড়েছে, আরেকবার স্নান করছি।
ঘরে গিয়ে বসো, কিছু সময়ের মধ্যেই আসছি। 

সদাশিব ঘরের মধ্যে গিয়ে, খাটের উপর বসে টিভি চালিয়ে দেখতে শুরু করে।

কামিনী বৌদি স্নান শেষ করে- নব বধূর সাজে, অপূর্ব রূপের ডালি নিয়ে_মাধুর্যপূর্ণ হাসি দিয়ে, সদাশিবের পাশে বসে । সদাশিবের হাতে হাত রেখে, নীরবতা পালনের মাধ্যমে-সদাশিবের বন্ধুত্ব মেনে নেয়।

সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণের মুহূর্তে পাড়ায় পাড়ায় নারীদের উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির আওয়াজ ভেসে আসে।

  কামিনী বৌদি বলে :- বন্ধু, কিছু সময়ের জন্য- অপেক্ষা করো, চা ও টিফিন নিয়ে আসছি।

আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর, কামিনী বৌদি মুড়ির থালা নিয়ে মনের আনন্দে রুমের মধ্যে হাজির হয়। সদাশিবের পাশে অন্তরঙ্গ ভাবে বসে। 
গ্রাম বাংলার নিয়ম অনুসারে সন্ধ্যার সময় হালকা জল খাবার হিসাবে, বাড়িতে তৈরি বিখ্যাত মুড়ি ও ছোলা সিদ্ধ এবং ডিম সিদ্ধ খেতে শুরু করে।

কামিনী বৌদি, সিদ্ধ ডিমের অংশ সদাশিবের মুখে তুলে দিয়ে বলে :- তোমাকে, অন্তরঙ্গ ভাবে কাছে পেয়ে- ভীষন ভাবে আনন্দিত হয়েছি। 

সদাশিব মুড়ি চিবাতে চিবাতে আড্ডা করতে করতে বলে :- তোমার রূপ ও গুণের প্রশংসা করতেই হবে। কিন্তু তোমার রূপের মাধুর্য স্বামী কল্যান বুঝতে পারলে না। টাকা টাকা করে সারা বছর বিদেশে পড়ে থাকে।

কামিনী বৌদি বলে :- থেমে গেল যে, বলে নিজের প্রশংসা শুনতে- পরপুরুষের মুখে ভালই লাগছে।

সদাশিব বলে :-অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করে  কিন্তু ভয়ে বলতে পারি না।

কামিনী বৌদি হাসতে হাসতে বলে :-  তুমি, আবার নারীদের ভয় পাও ! আমি বাঘ না ভাল্লুক-তোমাকে জ্যান্ত রক্ত মাংসসহ খেয়ে ফেলবো?

সদাশিব বলে :- তিন বছর আগে, আমার জীবনের উজ্জ্বল আলোর প্রদীপটি নিভিয়ে দিয়েছো। 
আমাকে,অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দিয়ে, চরিত্রে কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দিয়েছিল। আর তুমি, সতী সাবিত্রী পতিব্রতা নারী প্রমাণ করে ছিলে।
কিন্তু আজ তোমার, সেই সততা সতীত্ব কোথায় গেল?

কামিনী বৌদি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলে :- এখনো, মনে রেখেছো কিন্তু আজ তোমাকে-আমার দেহ মন ও  জীবন  সবকিছুই দান করেছি।

মাফ করে দাও আর কোন দিন হবে না। কলঙ্কিত ও অন্ধকারের জগতের থেকে আবার সূর্যের আলোর নিয়ে আসবে। তোমার, অতীতের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দেবো।
  
হঠাৎ করে মুড়ি খাওয়া বন্ধ রেখে, দুই জনেই চুপচাপ হয়ে পড়ে।

কামিনী বৌদি ভাবে মনে :- সদাশিবের সঙ্গে ভালবাসার  অভিনয়ের করে, নিজের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে এসেছি। 

কয়েক সপ্তাহের মেলামেশায়, আমাকে বিশ্বাস ও নির্ভর করতে শুরু করেছে। সদাশিবের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো মিটিয়ে নেওয়া যাবে।

কামিনী বৌদি ও সদাশিবের সম্পর্ক কয়েক এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর, এক দিন সকাল দশটার সময়ে- সদাশিব, কামিনী বৌদির বাড়ীর সামনে দিয়ে- আপন মনে হেঁটে চলেছে।
সদাশিব অস্থির হয়ে,বার বার চোখ ঘুরিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

কামিনী বৌদি ঘরের মধ্যে থেকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, আস্তে আস্তে সদাশিব বলে ডাক দেয় ।

সদাশিব, আওয়াজ শুনে ঘুরে জানালার পাশে এসে বলে :- ডাকছো কেন ?

কামিনী বৌদি বলে :- তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল,  বাড়ীর মধ্যে কিছুক্ষনের জন্য আসবে।


সদাশিব বলে :- আসছি, বলে চারিদিক তাকিয়ে ভালো করে দেখে নেয়। এক পা দুই পা করে গেটের সামনে এসে দাড়িয়ে-নিজেদের বাড়ীর দিকে তাকিয়ে , সাবধানে বাড়ীর মধ্যে ঢুকে পড়ে।

কামিনী বৌদি জানালার পর্দার কাপড় ঠিক করতে করতে বলে :- তোমার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না! 

সদাশিব বলে :- তুমি তো, আমার বিয়ে করা বউ না।আসতে হলে, সমাজের মানুষের ভয় আছে।

কামিনী বৌদি বলে :- সদাশিবের প্রেমে মজেছি, কলঙ্কের আর ভয় করি না । আমি হয়েছি, সদাশিব কলঙ্কিনী।

সদাশিব বলে :- প্রেমে পড়ে, কলঙ্ক হলে নাকি কবি ও সাহিত্যিক হওয়া যায়।

কামিনী বৌদি বলে :- ব্যর্থ প্রেমে পুরুষেরা দেবদাস হয়ে যায়। 

সদাশিব বলে :- নারীরা নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, ভালবাসার প্রেমিককে ছেড়ে দেয়।
নতুন পুরুষকে স্বামী রুপে বরণ করে, অন্তর জ্বালায় ভুগতে থাকে।

কামিনী বৌদি বলে :- তুমি তো কবি হয়ে গিয়েছো।

সদাশিব বলে :- একটি সমস্যার মধ্যে আছি, কিছু টাকা পাওয়া যাবে।

কামিনী বৌদি বলে :- টাকা দিয়ে করবে কি ?

সদাশিব বলে :- একটি গরীব বাবার মেয়ের বিয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। 

আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ভেবেছি- সকলের কাছে থেকে চাঁদা তুলে 25 হাজার টাকা সংগ্রহ করে,    উক্ত মেয়ের বাবার হাতে তুলে দেবো।

কামিনী বৌদি বলে :- ঠিক আছে দেবে কিন্তু সেই গরীব বাবা কে।

  সদাশিব বলে :- আমাদের গ্রামের শেষ প্রান্তে মাঠের মধ্যে বসবাস করে সচিন ভুইমালি কাকার মেয়ে চায়নার বিয়ে। কোন রকম সংসার চলে, দিন আনা দিন খাওয়া। কিন্তু মেয়ে বিয়ে দেওয়া মতো যথেষ্ট টাকা জমা করতে পারেনি।

গরীব মানুষের দুরবস্থা দেখতে হলে, যেতে হবে ভুইমালি পাড়া, তাঁতিপাড়া ও দাসপাড়ায়। এই সব পাড়ার মানুষের সঙ্গে মিলামিশা না করলে, অনুভব করা যায় না।
ঐ পাড়ার নারী ও পুরুষেরা মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য, বাড়ীতে পায়খানার কোন ব্যবস্থা নেই।
একমাত্র ভরসা মাঠ-ঘাট বন জঙ্গল।

কামিনী বৌদি বলে :-বছর বছর ছেলে মেয়ে হলে, গরীব হবে না।  এই সব অশিক্ষিত নিম্ন শ্রেণীর মানুষের দারিদ্রতা কোনদিন যাবে না।

সদাশিব বলে :- সমাজ ব্যবস্থার গণ্যমান্য সমাজ রক্ষাকারী ব্যক্তিদের ও দেশের প্রধান শাসকদের দায়িত্ব থাকে। দেশের সরকার এইসব গরিব মানুষের উন্নয়নের জন্য কিছুই করছে না।

কামিনী বৌদি বলে :- দেশের যারা রক্ষা কর্তা ও
নেতা-গতা তাদেরই পেট ভরে না। সরকারের পক্ষ থেকে গরিব মানুষদের জন্য, অনেক প্রকল্প আছে। কিন্তু সেই সব প্রকল্পগুলো আমাদের আঞ্চলিক নেতৃদ্বয় বাস্তবে রূপ দিতে চাইনা।

গরিব মানুষের উন্নয়ন হলে রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের নাকি ভীষণ অসুবিধা।

খাতা-কলমে প্রকল্পের কাজ বাস্তব রূপে দেখানো হয়। গরিব মানুষগুলো যদি সত্যিই উন্নয়ন করে, তাহলে ওইসব প্রকল্পে আর টাকা আসবেনা। আর টাকা না আসলে, উপর মহলের থেকে নিচের মহলের মানুষের  সবার পকেটে ফাঁকা হয়ে যাবে।

সদাশিব বলে :- আদার ব্যবসায়ী হয়ে জাহাজের খোঁজ নিয়ে লাভ নেই। ছোটখাটো নৌকাতেই কাজ চলে যাবে।

কামিনী বৌদি ,সদাশিব কে খুশি রাখার জন্য। আলমারি খুলে 15 হাজার টাকা বের করে, সদাশিবের হাতে দিয়ে বলে :-  গরিব বাবা কে সাহায্যের জন্য, চাঁদা 10 হাজার টাকা দিলাম আর তোমার হাত খরচের জন্য 5000 টাকা দিলাম।

সদাশিব বলে :- তোমার মধ্যে সুন্দর একটি মন আছে, তা আগে কখনো বুঝতে চেষ্টা করিনি।
চিন্তা থেকে মুক্ত করলে, অসংখ্য ধন্যবাদ। 

কামিনী বৌদি বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে :- রাস্তায় কেউই নেই, যেতে পারে।

কিন্তু রাতের দিকে একবার দেখা করে ,  তোমার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে হবে।

সদাশিব বলে :- যত কাজ থাকুক না কেন ! তোমার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারি।

========================================================================

              উপন্যাসের অধ্যায় সংখ্যা :- 2
 অধ্যায়ের নাম :- কামিনী বৌদির  বিবেকের
 দংশন ।

কয়েক এক সপ্তাহ পর সদাশিব রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে, কামিনী বৌদির বাড়ীর পিছনের দিকের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে-কামিনী বৌদির বাড়ীতে ঢোকার দেওয়াল পার হয়ে দরজার সামনে এসে দাড়িয়ে পড়ে। সংকেত অনুসারে পিছনের দরজায় টোকা দিতেই,ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে কামিনী বৌদি।

কামিনী বৌদি , সদাশিবের হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে, খাটের উপর বসতে দিয়ে বলে :- জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসতে, তোমার ভয় করে না।

সদাশিব বলে :- ভয় করলে কি আর পরের বৌয়ের সঙ্গে প্রেম করা যাবে?
প্রেমে পড়লে তখন সাপের ও বাঘের ভয় থাকে না।

বিল্লমঙ্গল ও চিন্তা মনির প্রেমের রোমান্টিক গল্প জানা আছে।

কামিনী বৌদি বলে :- কীর্তনের আসরে শুনেছি।
বলে না , আরেকবার শুনি।

সদাশিব বলে :- সংক্ষিপ্তভাবে গল্পটি তোমাকে শোনাচ্ছি। গল্প শোনার আগে , গল্পের লেখকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

বিশিষ্ট লেখক গিরিশচন্দ্র ঘোষ। সম্ভবত  ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে 'বিল্বমঙ্গল' নাটকটি রচনা করেছিলেন । গিরিশ চন্দ্র ঘোষ একজন বিশিষ্ট বাঙালি সংগীতস্রষ্টা, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যপরিচালক ও নট্ট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা।
বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণযুগ মূলত গিরিশচন্দ্র ঘোষের অবদান।

বিল্বমঙ্গল ও চিন্তামনির প্রেমের কাহিনী লেখক গিরিশ চন্দ্র ঘোষের কল্পনায় লিখিত হয়েছিল।

কামিনী বৌদি বলে :- শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের মাতাল শিষ্য নাট্যকর গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

সদাশিব বলে :- একদম ঠিক বলেছো।

সদাশিব গল্প বলতে শুরু করে। কামিনী বৌদি খাটের রেলিং পিঠ দিয়ে সদাশিবের পাশে বসে গল্প শুনতে থাকে।

সদাশিব বলে :- কৃষ্ণা নদীর তীরে এক ছোট্ট গ্রামে রামদাস নামে একজন ধার্মিক ব্রাহ্মন বাস করতেন। 
ব্রাহ্মনের একমাত্র ছেলের নাম ছিল বিল্বমঙ্গল।
তিনি তাঁর ছেলেকে ভীষন ভাবে যত্নের সহিত সমস্ত বিদ্যা, ধর্মশাস্ত্র অধ্যায়ন ও ধর্মিয় আচার এবং পালনাদি শিখিয়েছিলেন।

শিক্ষা দীক্ষা লাভের জন্য বিল্বমঙ্গল একজন দয়ালু, মৃদুভাষী, ধর্মভীরু ও নরম-মনের মানুষ হয়ে উঠেছিল কিন্তু তার এই সুকুমার প্রবৃত্তির কারণে মানবিক গুনগুলি তার জীবনে বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

যৌবনে পদার্পণ করার পর হঠাৎ করে বাবা-মায়ের বিয়োগ (অর্থাৎ মৃত্যু কে বোঝানো হয়েছে) ঘটে যাওয়ার ফলে অভিভাবক হীন হয়ে পড়ে।
  
বিল্বমঙ্গল অল্প বয়সেই বাবার রেখে যাওয়া অগাধ ধন সম্পত্তির মালিক হয়ে পড়ে এবং নিজেই অভিভাবক হয়ে যায়।

হঠাৎ করে অল্প বয়সে প্রচুর টাকা পয়সা হাতে আসার ফলে, বন্ধু বান্ধবের সংখ্যাও দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে ।

বিল্বমঙ্গল ধর্ম কর্ম আদর্শ ভুলে অসৎ সঙ্গের বন্ধুদের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে এবং অনেক কু-অভ্যাসের জন্য, সমাজের কাছে নিন্দিত হতে শুরু করে।

একদিন  বন্ধুদের পরামর্শে,সকল বন্ধুরা মিলে  মহাহুল্লোরে চিন্তামণি নামে এক বারবনিতার নাচ দেখতে গেল।

চিন্তামণির রূপ যৌবন  সম্মোহিত হয়ে ।
বিল্বমঙ্গল তার দেহ, মন, বিষয়-সম্পত্তি, পারিবারিক সম্মান, তার জাত-কুল-ধর্ম বিষর্জন দিল চিন্তামণি কে কাছে পাবার জন্য।

বিল্বমঙ্গলের, চিন্তামণি হলো একমাত্র চিন্তা, হৃদয়ের মনের মণি। 
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দিনের ও রাতের বেশিরভাগ সময়টাই বিল্বমঙ্গল, চিন্তামণির ঘরে কাটাতে লাগল।

বিল্বমঙ্গলের বাবা রামদাসের মৃত্যু-বার্ষিকের  উপলক্ষে আত্মীয় স্বজনেরা বিল্বমঙ্গলের সারাটা দিন বাড়িতে থাকতে বাধ্য করানো হয়েছিল। 

বিল্বমঙ্গলের দেহ বাড়িতে থাকলেও মন চলে গিয়েছিল, চিন্তামণির স্মৃতির জগতে। 

আত্মীয় স্বজনের চাপে পড়ে-খুবই অনিচ্ছা ও অন্যমনষ্কতার সঙ্গে বিল্বমঙ্গলের বাবার পরলোকিক ক্রিয়া-কর্মাদি পালন করলো এবং সন্ধ্যাবেলায় সব কাজ শেষ হয়।

বিল্বমঙ্গল কে উপস্থিত গুরুজন ব্যক্তিগণ বললেন – “বাবা, আজকে আর বাড়ি থেকে কোথাও যেওনা। এই দুর্যোগের বর্ষার মধ্যে।


বিল্বমঙ্গল কামের উত্তেজনায় লজ্জা ঘেন্না ত্যাগ করে- সবার কথা উপেক্ষা করে বেড়িয়ে পড়ল চিন্তামণি উদ্দেশ্যে।

বিল্বমঙ্গল দ্রুত পায়ে ছুটতে ছুটতে চিন্তা মনির বাড়ির উদ্দেশ্যে নদী তীরে পৌঁছিয়ে ভাবে মনে :- চিন্তামণির বাড়ি যেতে হলে এই নদী পার হতেই হবে।

প্রকৃতির তান্ডব লীলা শুরু হয়ে যায়- আকাশে ঘন কালো মেঘ ঘনীভূত হয়ে ঘন ঘন মেঘ গর্জন ও বজ্র পাতের সঙ্গে তুমুল অঝরে ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে যায়।

এই দুর্যোগের মধ্যে বিল্বমঙ্গল পারাপারের জন্য- নৌকার মাঝিদের  অনেক টাকা, এমনকি তার গলার চেন ও হাতের আংটি খুলে দিতে রাজি হলেও- কোন নৌকার মাঝি কিছুতেই  জীবনের ঝুঁকি নিয়ে-ওপারে যেতে রাজী হল না। 

বিল্বমঙ্গল আগে পিছে কোনো রকম কিছু চিন্তা-ভাবনা না করে- নদীর উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে ঝাঁপ মারল চিন্তা চিন্তা বলতে বলতে।

নদীতে তখন একটা পচাগলা শবদেহ ভেসে যাচ্ছিল কিন্তু বিল্বমঙ্গল শব দেহটাকে ভেলা (অর্থাৎ নদী পথে যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা) ভেবে জাপটে জড়িয়ে ধরে , জলে ভেসে থাকার জন্য। 
এভাবে যখন সে কোনো রকমে  ভাবে নদীর ওপারে পৌঁছনোর পর -বিল্বমঙ্গলের তখন অর্দ্ধ-উলঙ্গ ও দুর্গন্ধময় অবস্থায় চিন্তামণির বাড়ির সদর গেটের দরজার সামনে পৌঁছিয়ে ,দেখতে পায় বাড়ির গেট থেকে শুরু করে সব দরজা জানালা বন্ধ কিন্তু কোথায়ও কোন ঘরে আলো জ্বলছে না।

কারণ বিল্বমঙ্গল আগের থেকে জানিয়ে রেখেছিল-আজকের দিনে আসতে পারবে না। 
সেই কারণেই চিন্তামণি সব দরজা জানলা বন্ধ করে , ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে সুখনিদ্রায় মগ্ন ছিল। 

বিল্বমঙ্গল খুব জোরে জোরে চিন্তা, চিন্তা করে ডাকতে শুরু করে কিন্তু ঘরের দরজা জানলা বন্ধ থাকার জন্য এবং বাইরে প্রবল ঝড় বৃষ্টিপাতের দরুন বিল্বমঙ্গলের চিৎকার-চেঁচামেচি চিন্তামণি শুনতে পাইনি।

বিল্বমঙ্গল বিরক্ত হয়ে পাগলের মত ছটফট করতে শুরু করে। 

চিন্তামণির বাড়ির উঁচু দেওয়াল পার হবে কি করে! ভাবতে থাকো ?

হঠাৎ আকাশের ব্রজ বিদ্যুতের আলোচ্ছটায় দেখতে পায়- উচু দেওয়ালে  একটা দড়ি (সাপ) ঝুলছে। 

দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দড়ি বেয়ে উঠে যায়।

বিল্বমঙ্গল বাড়ির মধ্যে ঢুকে সোজা চিন্তামণির ঘরে গিয়ে, ঘুমন্ত চিন্তামণি কে জড়িয়ে ধরে জাগিয়ে তোলে।

চিন্তামণি ঘুম থেকে জেগে উঠে, বিল্বমঙ্গল কে দেখতে পেয়ে- হতভম্বের মত তাকিয়ে দেখতে শুরু করে।

বিল্বমঙ্গলের তখন বস্ত্রহীন উলঙ্গ দেহ থেকে টপ টপ করে জল ঝড়ছে- শরীর থেকে পচা দুর্গন্ধে ঘর ভরে উঠেছে।

চিন্তামণি বলে :- এই দুর্যোগপূর্ণ রাতে তুমি, আমার ঘরে এলে কিভাবে?

বিল্বমঙ্গল বলে :- কেন, তুমি নদীর ঘাটে ভেলা রেখে দিয়েছো-ভেলা টি জল থেকে টেনে উপরে উঠিয়ে রেখেছি এবং তোমার বাড়ীতে ঢোকার জন্য উঁচু দেওয়াল পার হওয়ার জন্য দড়ি রেখে দিয়েছো।

প্রকৃতির নিয়ম নিয়ম অনুসারে একসময় ঝড়-বৃষ্টি থেমে যায়।

চিন্তামণি বিল্বমঙ্গল কে সঙ্গে করে দেওয়ালের কাছে যেতে দেখতে পায় বিরাট এক বিষধর সাপ ঝুলে আছে এবং নদীর ধারে যেতেই দেখতে পায় পচা গলা শবদেহ।  

চিন্তামণি  সব দেখে শুনার পর বিল্বমঙ্গলকে  ভৎর্সনার সুরে বলল :- – “আজ না তোমার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী! একটা দিন বাড়িতে থাকতে পারলে না?

তুমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পাগলের মত যা কান্ড ঘটিয়েছে, তা এখন অস্বীকার করতে পারবে না কিন্তু তুমি -আমাকে ভালোবাসো না_ভালোবাসো আমার এই শরীরটাকে আর এই শরীরটা কে পাওয়ার জন্য ঝড় বৃষ্টির মধ্যে জীবনকে বাজি রেখে চলে এসেছে। তোমার চরিত্রের ধিক ধিক -শত ধিক, ঘৃণা করছে ।
আজ এই শরীরের সৌন্দর্য সকল দেখে মুগ্ধ হয়েছে কিন্তু এই সৌন্দর্য সকালের শিশিরের  মতো ক্ষণস্থায়ী- কিছুদিন পর এই শরীর তোমার-আমার ঐ শবদেহের মতই হবে।

আমি তোমার মতো পুরুষের সঙ্গে আর সঙ্গ করতে চাইনা- বেড়িয়ে যাও বেড়িয়ে যাও ।

চিন্তামণি রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে :- এই ভালোবাসা টুকু যদি ঈশ্বর শ্রী কৃষ্ণ কে ভালবাসতে- তাহলে ঈশ্বরের কৃপা লাভ করতে পারতে কিন্তু আমাকে ভালোবেসে এই পচা গলা দেহ ছাড়া আর কিছুই পাবে না।

বিল্বমঙ্গল বলে :- আমি কোন কথা শুনতে চাই না- আমি একমাত্র তোমাকেই চাই বলে জড়িয়ে ধরতে যায়।

চিন্তামণি ক্রোধিত হয়ে বিল্বমঙ্গল কে অপমানজনক কথাবার্তা বলতে শুরু করে। এবং ঘর থেকে বের করে দেয়।
 
বিল্বমঙ্গল দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তামণির বাড়ির গেটের সামনে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে অতীতের ঘটনাগুলি। 
রাতের শেষে ভোরের আলো দেখা দিতেই দেখতে পায়, একখানা কাপড় পড়ে আছো।
বিবেকের দংশন ঘটিয়ে কাপড়খানা পড়ে নিয়ে- চিন্তামণির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলতে বলতে চলতে থাকে অজানার উদ্দেশ্যে।

একদিন গঙ্গার ঘাটে উন্মনা হয়ে বসে আছে কারণ চিন্তা মণির জন্য মনটা ভীষন ভাবে খারাপ।

সেই সময় ঐ নগরের এক বনিকের সুন্দরী স্ত্রী স্নান সেরে উঠে আসছিল। 
বিল্বমঙ্গলের, উক্ত নারীর অপরূপ রূপলাবণ্য দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায় এবং মনের মধ্যে নানা রকম দেহ সুখের কল্পনা করতে শুরু করে। 

বিল্বমঙ্গল উক্ত রমণী কে অনুসরণ করে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে থাকে।

  রমণীটি কোন কিছু খেয়াল না করে, নিজের বাড়িতে পৌঁছে যায়।

  কিছুক্ষণ পর রমণীর স্বামী কোন এক কাজের জন্য, বাইরে যাবার সময় দেখতে পায় - সদর দরজার পাশে একজন অপরিচিত লোক বসে আছে। 

রমণীর স্বামী বিল্বমঙ্গল কে তার নাম ঠিকানা আগমনের কারণ কি জানতে চাইল?

বিল্বমঙ্গল সব সত্য বিবরণ দিয়ে বলল – “আপনার স্ত্রীর রূপমাধুর্যে আমি মুগ্ধ ও আকর্ষিত-আমার চোখ, আমার মনপ্রাণ তাকে দেখবার জন্য পিপাসিত,ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন – দয়া করে তাকে একবার ডেকে দেবেন? 

আমি প্রাণভরে আর একটিবার তাকে দেখতে চাই।”

রমণীর স্বামী বিল্বমঙ্গলের সত্য কথা অপকটে বলার জন্য এবং নিজের স্ত্রী রূপ মাধুর্য দেখতে চাওয়ার মধ্যে কোন অন্যায় দেখতে পেলেন না।

রমণীর স্বামী  বাড়ির ভিতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বসতে দিয়ে বলে :-  আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসছি,অপেক্ষা করুন ।

বণিক রমণীর স্বামী, তাহার স্ত্রী কে  নিয়ে এসে বিল্বমঙ্গলের  সামনে দাঁড় করিয়ে  দেয়।

বিল্বমঙ্গল দুই চোখ দিয়ে মনের ইচ্ছা মতো রমণীর রূপ মাধুর্য দর্শন করতে থাকে।

কয়েক মুহুর্ত দর্শন করার পর বিল্বমঙ্গলের বিবেক জেগে উঠল এবং স্মরণে চলে আসে, চিন্তামণি সঙ্গে শেষ বিদায়ের পরিণীতির কথাগুলো।

এই অশোভন আচরণের জন্য মনে অনুশোচনায় ভরে উঠল- রাগ, ঘৃণা ও লজ্জায় সে তার দুই চোখকে দোষী সাবস্ত করল।

দেখতে দেখতে চোখ নামিয়ে রমণীর পায়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে :- মা, তোমার চুল বাঁধার দুখানি কাঁটা দাও তো !

রমণী তাহার চুলের খোপা থেকে দুটো কাঁটা খুলে নিয়ে, বিল্বমঙ্গলের  হাতে দেয়।

বিল্বমঙ্গল নিজের দুই চোখকে দোষী সাব্যস্ত করে -দুটি কাঁটা দিয়ে- দুটি চোখ নষ্ট করে দেয় ও সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ঝরতে শুরু করে_এবং কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে, কৃষ্ণ নাম জোরে জোরে উচ্চারণ করতে করতে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলে সামনের দিকে।

বিল্লমঙ্গল জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য করে- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাধন ভজন এবং পরমারাধ্য ভগবান কে দর্শন ও সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে- ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তি ভুলে - অন্ধ বিল্বমঙ্গল কৃষ্ণ প্রেমে পাগল হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম ঘুরতে থাকে।

একদিন এক গ্রামের মধ্যে বিল্বমঙ্গল অসুস্থ হয়ে পড়লে- ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাখাল ছেলে বেশে এসে, বিল্বমঙ্গল কে খাওয়া-দাওয়া করায় ও সেবা সুস্থতা করতে শুরু করে।

বিল্বমঙ্গলের ভাবনা হয়:- আবার এক রাখাল ছেলের মায়ার বন্ধনে বাঁধা পরার জন্য, বিবেক যখন একদিন পীড়া দিচ্ছিল- সেই মুহূর্তে অন্তর্যামী সেই রাখাল বালক এসে বলল  – “বৃন্দাবন যাবে তো! আমি নিয়ে যাব তোমাকে।” 
বৃন্দাবনে পৌঁছে দেবার পর যখন সে চলে যেতে চাইল, বিল্বমঙ্গল তার দুহাত চেপে ধরল। 

বালকের স্পর্শে সঙ্গে সঙ্গে এক ঐশ্বরিক তরঙ্গ তার দেহমনে ঢেউ তুলল। 

বিল্বমঙ্গল বুঝতে পারল, ভগবান তার সামনে এসে ধরা দিয়েছেন। 

বিল্বমঙ্গল চোখের জলে ভগবানের রূপ ধারণকারী বালকের পা ধুইয়ে দেয়।

ভগবান , বিল্বমঙ্গলের চোখে হাত বুলিয়ে দিতেই,  দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল ও চিরকালের জন্য ভগবানের আশির্বাদধন্য হয়ে থাকল।

চিন্তামণি সব কিছু ত‌্যাগ করে , পাগলের ন্যায় ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বৃন্দাবন এসে যায়। বিল্লমঙ্গলের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু বিল্লমঙ্গল  সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদেশে বিল্লমঙ্গলের সঙ্গে চিন্তামণির সাধন-ভজনের রত হয়।
                        
কামিনী বৌদি বলে :- দারুন ,বিবেক কে সচেতন করার গল্প। কিন্তু আমাদের শেষ পরিনিতি কি হবে ?

সদাশিব বলে : শেষ পর্যন্ত কামিনী বৌদিকে ছেড়ে বৃন্দাবনে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে।

কামিনী বৌদি জীবন যৌবনের জোয়ার বেশি দিনের জন্য নয়।
হরে কৃষ্ণ তাহলে, চলি ভোর হতে চলেছে।

========================================================================

             উপন্যাসের অধ্যায় সংখ্যা :- 3    
অধ্যায়ের নাম :- তাল-খেজুর পাতার ইতিহাস ও ভ্রমণের গল্প।

সদাশিব গ্রামের খগেন সাহা মাস্টারের বাড়িতে,
প্রতিদিন রাতে প্রাইভেট পড়তে আসে।

মাস্টার মশাই দিন ও রাতে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পরিয়ে, আয় রোজগার করার মাধ্যমে সংসারের সদস্যদের সকল চাহিদা পূরণ করেন।

এক সময়ে স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পর , স্কুলের শিক্ষক হওয়ার। পড়ানোর অভ্যাস করার জন্য -শখ করে কয়েক জন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। 
কিন্তু ভাবতে পারেননি বিএ পাস করার পর, সরকারী স্কূলের চাকরির বদলে প্রাইভেট মাস্টার হয়ে সারাজীবন চলতে হবে।

চাকরি না পাওয়ার কারণ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকার জন্য এবং দালাল কে সময় মতো ঘুসের টাকা না দিতে পারা।

উচ্চপদস্থ কোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব ও দেশের শাসক রাজনৈতিক দলের কোন উচ্চ পদস্থ নেতা সঙ্গে পরিচয় না থাকা।

চাকরির লটারি, কোনদিনই ভাগ্যে জোটেনি।

মাস্টারমশাই, বিবাহিত জীবন সুখের বলা যায় না। কারণ বার বছরের ছেলে হঠাৎ করে বিষাক্ত বিড়ালের কামড়ে মৃত্যুবরণ করার পর একদম ভেঙে পড়ে ছিলেন।

যখন রোগ ধরা পড়ে, সেই মুহূর্তে ডাক্তার বাবু বলেন :- শেষ সময়ে নিয়ে এসেছেন, বহু দিন আগে বিড়ালে কামড়িয়ে ছিল-এখন বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিছুই করার নাই-এই রোগীর মৃত্যু অবধারিত।

বর্তমানে একটি কন্যা সন্তান সহ স্বামী স্ত্রীর সংসার।

কয়েকটি দলে বিভক্ত করে, 15 থেকে 20 জন ছাত্র ছাত্রীদের দলের মাধ্যমে, দিনে ও রাতে প্রাইভেট পড়ানোর ব্যবসা করেন।

সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দলের পড়াশোনা শুরু হয় এবং রাতের দলের মাধ্যমে শেষ করেন।

  রাতের পড়তে আসার দলের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী :- সদাশিব, নুরুল ইসলাম ও সহিদুল, সুমন ও সবিতা সাহা।
নবম শ্রেণীর :- শুভ সাহা,আমেনা, রবিউল।
অষ্টম শ্রেণীর সবিতা সাহা ,অনিমা ও জয়নুল।
সপ্তম শ্রেণির :- সুনীল হালদার ও মণি সাহা।
ষষ্ঠ শ্রেণির আরতি ও দীপিকা আরো অনেকে।
 সন্ধ্যা 6 থেকে রাত 9 টা পর্যন্ত পড়াশোনা চলে। 

রাতে প্রাইভেট পাড়ার জন্য, বাড়ি থেকে হারিকেনে কেরোসিন তেল ভরে নিয়ে যেতে হতো।

সর্বজনীনভাবে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা ছিল না।
ধনী ব্যক্তিদের বাড়ীতে আভিজাত্য বাড়ানোর ও
দেখানোর জন্য, শখের বিদ্যুৎ নেওয়া হতো। 

ব্যয়বহুল খরচের জন্য, গ্রাম বাংলার গরিব মানুষেরা বিদ্যুতের কথা ভাবতেই পারতো না।

প্রাইভেট পড়ার জন্য, আগের দিনের সময়ে-বর্তমান বিংশ শতাব্দীর মতো চেয়ার টেবিল ও বিদ্যুৎ চালিত পাখার ব্যবস্থা ছিল না।
এই গরমের দিনের একমাত্র ভরসা  তালের পাতার তৈরি করা, তালের হাত পাখা।

সদাশিব ইতিহাস বই পড়তে পড়তে ,মাস্টার মশাই কে বলে :- গ্রাম বাংলার প্রসিদ্ধি তালের পাখা সম্পর্কে কিছু বলুন।

মাস্টার মশাই বলতে শুরু করেন :- ইতিহাসবিদরা বলেন ,তালের পাতা দিয়ে তৈরি করা হতো বিভিন্ন ধরনের নক্ম যুক্ত হাত পাখা।
অনেক বাড়ীতে বড় ধরনের বিভিন্ন নকশা যুক্ত তালের পাখা রাখা হতো। এবং অতিথি আপ্যায়ন করা হতো উক্ত পাখার হাওয়া দিয়ে। এই হাওয়া দেওয়ার কাজ টি করতেন বাড়ীর নারীগণ।

প্রচলিত একটি নীতি আছে তালের পাখার শীতল হাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে কল্যান কারক।

মাস্টারমশাই বলেন :- তোমরা, এই বিষয়ে কতটুকু জানো ?
যা জানো তা আলোচনা করো।

সদাশিব বলে :- তালের পাখা শুধু গৃহস্থ জীবনে ব্যবহৃত হয়নি। অফিস , আদালতে,কাছরী ঘরে এবং রাজ রাজাদের রাজ ভবন থেকে শুরু করে রাজা রানীর অন্দর মহল পর্যন্ত যাতায়াত ছিল।

ধনী গরীব সকলের কাছেই আদরের ও সম্মানের জায়গা ছিল এবং থাকবে চিরকাল।

নুরুল বলে :- এই তাল পাখার হাওয়া দেওয়ার জন্য, পুরুষ ও মহিলাদের চাকরি দেওয়া হতো।
বিভিন্ন অফিস আদালতে ও ধনী ব্যক্তিদের বাড়ীতে।

মাষ্টার মশাই বলেন :- আজকের মতো ছুটি ঘোষণা করা হলো।

কয়েক দিন পর শহিদুলের বাড়ীতে সদাশিব যায় । সদাশিব সরাসরি শহিদুলের রুমে ঢুকে দেখতে পায়।    
শহিদুল ক্লাসের বই পড়া বাদ দিয়ে সংগৃহীত তালের পাখার উপর ইতিহাস বিষয়ক বই পড়তে শুরু করেছে।

শহিদুল বলে :- ডঃ তিলক পুরকায়স্থ গ্রামবাংলার এই পরম আদরের লোকশিল্প প্রবন্ধে  লিখেছেন । 

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প-পাখা
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে।

সদাশিব বলে :- তালের পাখাকে বলা হয় মানুষের প্রাণের সখা। 
প্রাচীন লোকগাঁথাতে প্রবাদ আছে
“আমার নাম তালের পাখা
শীতকালে দেইনা দেখা, 
গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা”।

শহিদুল বলে :- ইতিহাসবিদ গণ বলেন ,বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা এলেই-অন্যতম প্রধান একটি অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় তালপাখা।
তাই বর্ষবরণকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের  নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার হাঁপানিয়া ফকিরপাড়া গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে তালপাখা তৈরি করার ধুম লেগে যায় ।

কেউ তালের পাতা কাটছেন, কেউ সেলাই করছেন। কেউবা সুতা ও বাঁশের শলাতে রং করছেন এবং কেউ পাখার বোঝা বাঁধছেন।

কাজের ব্যস্ততায় শরীরের ঘাম মাটিতে পড়লেও। নিজেদের তৈরি-এই সব পাখার বাতাস নেওয়ার  সময় নেই। এ যেন এক অন্যরকম কর্মযজ্ঞ। 

নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের হাঁপানিয়া গ্রামটিতে তালগাছ না থাকলেও, এখন তালপাখার গ্রাম নামেই পরিচিত।

এখানকার মানুষদের শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি আর মমতার বুননে হাতে তৈরি তালপাখাই জীবন-জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে । 

বছরের ছয়টি মাসে হাতপাখা তৈরি করে। শতাধিক পরিবার বাড়তি উপার্জন করছেন ।

সদাশিব বলে :- আজ থেকে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও , বাংলার গ্রামে গঞ্জে প্রচুর তাল গাছ দেখা।

তালগাছ তখন বাঙালির মনে প্রাণে জুড়ে রয়েছে। তাল গাছ নিয়ে কত গান, কত ছড়া, কত উপমা জড়িয়ে-ছুটিয়ে হয়েছে। যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়নি।

শহিদুলের বোন লায়লা বিকালের জল খাবার দিতে ঘরের মধ্যে ঢুকে পরে। সদাশিব ও বড় ভাই শহিদুলের তাল গাছ নিয়ে, দুই বন্ধুর গবেষণা শুনে - সদাশিবের পাশে গিয়ে বসে পড়ে। দুই বন্ধু জল খাবার খেতে শুরু করে।

লায়লা আবৃত্তি করতে শুরু করে।

কানা বগীর ছা

লেখক :- খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন

ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ঐ আমাদের গাঁ।
ঐ খানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা।
ও বগী তুই খাস কি?
পানতা ভাত চাস কি?
পানতা আমি খাই না
পুঁটি মাছ পাই না
একটা যদি পাই
অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।

শহিদুল তাল গাছ নিয়ে আবৃত্তি শুনে, নিজেই আবৃতি করতে শুরু করে।

বিশ্ব কবি রবিঠাকুরের সেই অমর ছড়া ।

                     তালগাছ

    লেখক :- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।
মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়,
একেবারে উড়ে যায়;
কোথা পাবে পাখা সে?
তাই তো সে ঠিক তার মাথাতে
গোল গোল পাতাতে
ইচ্ছাটি মেলে তার, –
মনে মনে ভাবে, বুঝি ডানা এই,
উড়ে যেতে মানা নেই
বাসাখানি ফেলে তার।
সারাদিন ঝরঝর থত্থর
কাঁপে পাতা-পত্তর,
ওড়ে যেন ভাবে ও,
মনে মনে আকাশেতে বেড়িয়ে
তারাদের এড়িয়ে
যেন কোথা যাবে ও।
তার পরে হাওয়া যেই নেমে যায়,
পাতা কাঁপা থেমে যায়,
ফেরে তার মনটি
যেই ভাবে, মা যে হয় মাটি তার
ভালো লাগে আরবার
পৃথিবীর কোণটি।


সদাশিব বলে :- তালগাছের পাতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন :- তালগাছের মাথার গোল, গোল পাতা যেন ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো তালগাছ কে ভালোবেসে। তেজেশচন্দ্র সেন মহোদয় শান্তিনিকেতনে তালগাছ ঘিরে “তালধ্বজ” নামে একটি বাড়ি তৈরি করেন। 

শহিদুল বলে :- বাংলাসাহিত্যে তালগাছ নিয়ে কত রকম লেখালেখি- ” তিলকে তাল করা” 
“তালপাতার সিপাই” “তালপুকুর” “তালকানা” 
” তালগোল পাকানো” ।

সদাশিব বলে :- ঈশ্বর শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর দিন দুই বাংলায় তালের বড়া বানানো হয়ে থাকে। 
পরের দিনটি তালনবমী তিথি হিসাবে পালন করা হয়। এবং দুই বাংলার গ্রাম গঞ্জে পানের বুরুজের চাষিরা বারুই নামে বিশেষ পুজো অর্চনা করে থাকেন।

লায়লা বলে :- তালের পাতা বেশ শক্ত।  জোরে হাওয়া হলে এক ধরণের অদ্ভুত আওয়াজ হতে থাকে ।  অনেক সময় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাতের বেলায় হঠাৎ করে তাল পাতার আওয়াজে , মনে হবে কোন ভূতের কান্ড। গ্রাম বাংলায় প্রচলিত আছে, তালগাছে নাকি ভুত বাস করো।

তালগাছের পাতায় প্রচুর বাবুই পাখির বাসা ঝুলে থাকে। আবার কখনও কখনও চিল বা শকুনেও বাসা করে থাকে। তালগাছ বেয়ে বিশাল সাপের ওঠানামাও করতে দেখা যায়।

শহিদুল বলে :- ইতিহাসবিদ বলেন  এক সময়ে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল, তালের পাতার তৈরি করা তালের পাখা।

বিংশ শতাব্দির যুগেও তালের পাখা কিন্তু এখনো শিল্প হিসাবে প্রচলিত আছে।

সদাশিব বলে :- লায়লা, ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছুই জানিস। 

লায়লা বলে :- আমি তো, ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করি। 

শহিদুলের মা ডাক দেয় শহিদুল কে ।

শহিদুল বলে :- তোরা, আলোচনা চালিয়ে যা, আমি আসছি বলে বেড়িয়ে যায়।

লায়লা, সদাশিবের আরো কাজে এসে-কানে কানে চুপিচুপি বলে :- আমি তোর বোন নয়- সত্যকারের ভালবাসা কি?  তা কখনো উপলব্ধ করতে পেরেছো।
                        

             খেজুরের পাতার ইতিহাস

সদাশিব ও শহিদুল রাতে মাস্টারের বাড়ি পড়তে আসে এবং মাস্টার গিন্নি কয়েকটি খেজুর পাটির বিছিয়ে দেয় , ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জন্য।

সদাশিব পড়তে বসে মাষ্টারমশাইকে প্রশ্ন করে  :-
গ্রামবাংলায় একসময়ে খেজুরের পার্টির প্রসিদ্ধ ছিল এই সম্পর্কে কিছু বলবেন।

মাষ্টার মশাই বলেন :- আজকের এই পাটি কে এক সময়ে শিল্প হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল।
পাটি বানিয়ে গ্রামের অনেক মানুষ জীবন জীবিকা নির্বাহ করতো।
এই পাটি খেজুর গাছের পাতা দিয়ে তৈরি করা হয় ।

গ্রামের মহিলারা অবসর সময়ে পাটি তৈরি করে, বাড়তি রোজগার করতেন।
কিছু মহিলাগণ আয়ের উৎস পেশা হিসাবে  গ্রহণ করেছিলেন, সারাদিন পাটি তৈরীর কাজ করতেন।

পাটি বিক্রয়ের জন্য সপ্তাহে একদিন বা দুদিন, নির্দিষ্ট হাট থাকতো ।
ব্যবসাহিকেরা  গ্রামে ঘুরে ঘুরে পাটি কিনে নিয়ে যেতো। আবার সরাসরি হাটে গিয়েও বিক্রি করতে। 

নুরুল বলে :- ছোটবেলায় দেখেছি - গ্রাম বাংলার মায়েদের পাটি বানানোর উৎসব।  হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্র ঈদের কয়েক মাস আগে থেকেই পাটি বোনার প্রতিযোগিতা চলতো। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন কিশোরী থেকে শুরু করে বয়স্কা মহিলা পর্যন্ত ।  বাড়ির উঠানে রাস্তার ধারে পুকুর পাড়ে গাছের নিচে কয়েকজন মহিলা একত্রিত হয়ে গল্প করতে করতে পাটি বানাতেন।
উৎসবের আগে পর্যন্ত কে কয়টা পাটি বানাতে 
পারে ।

সদাশিব বলে :- সবার উদ্দেশ্য থাকতো কিন্তু উৎসবের সময়ে স্বাধীনভাবে খরচ করার জন্য।
মায়েরা, ছেলেমেয়েদের ছোটখাটো চাহিদা মেটাতে পারতেন।
গ্রামের মহিলাদের হাতে সারা বছর কম বেশি টাকা থাকতো এবং সংসারের ছোটখাটো টাকার ঝামেলা গুলো, ঘরের গৃহবধুরা মিটিয়ে ফেলতে পারতেন। 

শহিদুল বলে :- গৃহবধূগণ স্বামীর দারস্থ হতে হতো না। গ্রামের মহিলারা পাটি তৈরি করে স্বনির্ভর হয়েছিলেন ।

সদাশিব ও শহিদুল দুই বন্ধু মিলে বিভিন্ন বই পুস্তক পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে ঠিকানা সংগ্রহ করে, সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর জেলার এক গ্রামের বেড়াতে যাওয়ার।

দুই বন্ধু মিলে বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। দেখতে পায়-অভিনব কায়দায় তাল পাতা দিয়ে ঘর ছাওয়ার দৃশ্য ।

শহিদুল , সদাশিবকে বলে :- ডা. তিলক পুরকায়স্থ মহাশয় তার প্রবন্ধে বলেছেন :-তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্পের কারুকার্য, আজও গ্রাম গঞ্জে টিকে আছে। দেখ এই ঘরটি কি সুন্দর কারুকার্য করা।

সদাশিব এগিয়ে গিয়ে ঘাড় উঁচু করে বলে :- কাকাবাবু, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই ।

কাকাবাবু গরমে ঘেমে স্নান করে নিয়েছে। চালের থেকে নেমে আসে, গামছা দিয়ে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে বলে :- কোথাকার মানুষ আছে, বটে ।

সদাশিব বলে :- বাংলাদেশ যশোর থেকে বেড়াতে এসেছি ।

শহিদুল বলে :- বাস্তবে ,তালপাতার ব্যবহার সম্পর্কে স্বচক্ষে দেখার জন্য।

কাকাবাবু বাস্ত হয়ে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে :- বসো বাবা। বলে বাড়ীর মহিলাদের অতিথি আপ্যায়ন করতে বলে।

শহিদুল বলে:- কাকাবাবু, আমাদের এই তাল পাতার সম্পর্কে কিছু জানাবেন । 

কাকাবাবু বলে :- তালপাতার বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
পাড়া-গ্রামে-গঞ্জে ঘরের চাল ছাওয়া থেকে শুরু করে ঘরের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতপাখা নির্মাণ সহ  তালপাতার চাটাই তৈরি করে ঘরের বেড়া দেওয়া হয়। 
প্রাচীন কাল থেকেই তাল পাতার ব্যবহার প্রচলন ছিল এবং বর্তমানেও ব্যবহার করে চলেছে।

শহিদুল বলে :- কাকা আর কি তৈরি করা হয়।

কাকা বলে :- তালপাতা বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহার করা যায়।  যেমন তালপাতার বাঁশি, পুতুল, তালপাতার পুঁথি, পটচিত্র, জন্মকুণ্ডলী সহ ইত্যাদি ইত্যাদি। 

অতিথি আপ্যায়নের জন্য, বিবাহ উপযুক্ত একটি যুবতী মেয়ে দুই হাতে দুটি হালা নিয়ে সদাশিব ও শহিদুলের সামনে রেখে বলে :- সকালের জলখাবার টা খেয়ে নিও। 
সদাশিব দেখতে পায়,  পিয়াজ রসুন দিয়ে রান্না করা ছোলা ও ঘরে ভাজা গরম গরম মুড়ি। 
শহিদুল বলে :- বন্ধু শুরু কর।

যুবতী, সদাশিবের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে :-  কাদের বাড়ীতে এসেছেন ?

সদাশিব, যুবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে :- আমরা, এক যাযাবর; পাখির মতো ঘুরে বেড়ায় দেশ বিদেশে। ঘুরতে ঘুরতে যেখানেই রাত হয়ে যায়, সেখানেই সেই অবস্থায় থেকে যায়। 

যুবতী, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে, ঠাকুরদার অনুপস্থিতে বলে :- আরো মশাই, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কোন লাভ নেই। সামনে  মুড়ি ও ছোলা আছে, খাওয়া শুরু করুন।

সদাশিব বলে :- মন তো মানে না। কথায় বলে দর্শনে যায় মনের ময়লা আর স্পর্শে হয় প্রেম তরঙ্গ।

যুবতী বলে :- কবি কবি ভাব কিন্তু প্রেমের অভাব।
বলে ঘরের উঁচু বারান্দায় গিয়ে বসে পড়ে। সদাশিব ও যুবতীর মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হতে থাকে।

কাকাবাবু ফিরে এসে বলে :- তালপাতা থেকে ছোট-বড় হাতপাখা তৈরি করা হয়। আর তালপাতার কাণ্ড বা ডাগুর বা চটা কে জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর পচিয়ে নিয়ে ভিতর থেকে সরু , পাতলা, লম্বা আঁশ বা সুতো ছুলে তুলে নেওয়া হয় এবং সেই আঁশ রৌদ্র শুকিয়ে তালপাতার সঙ্গে বুনে তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের তাল পাতার টুপি বা টোকা, পেঁকে, সাজি, ঝুড়ি  ইত্যাদি ইত্যাদি।

শহিদুল বলে :- ইতিহাসবিদ বলেন বহু প্রাচীন ঐতিহ্য কাল থেকেই তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্পের মাধ্যমে, তালপাতার দ্বারা নির্মাণ শিল্প হিসাবে মর্যাদা লাভ করে ছিল।

কাকাবাবু বলে :- হাতপাখা হিসাবে সাধারণ মানুষের নিত্য ব্যবহারের জন্য, ছোট ছোট হাতপাখা আর ঠাকুর-দেবতা, রাজা-বাদশা, সাহেবদের এবং বাবুদের জন্য তৈরি হতো বিরাট বড় আকারের পাখা।

বাড়ীর কাকিমা যোগ দিয়ে বলে :-  ঠাকুর-দেবতার মূর্তির দুধারে দেখা যায়। দুজন অপ্সরা বড় পাখা গোলাকার নকশা যুক্ত পাখা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
এই দৃশ্য নিশ্চয়ই সবার চিত্রপটে স্মরণীয়। 

প্রতিবেশী এক বয়স্ক মানুষ আলোচনায় যোগ দিয়ে বলে :- ইতিহাস জানে তাল পাতার । আমি এক সময়ে ইতিহাসের মাষ্টার ছিলাম  ।

  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময়  সাদা চামড়ার সাহেব বাবুদের ঘর গ্রীষ্মের গরমে শরীর কে ঠান্ডা রাখার জন্য।
এক বিশেষ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ করতেন। তালের পাখার দ্বারা হাওয়া করার জন্য।

সাহেবদের কাছে পাখা চালকেরা পরিচিত  লাভ করেছিলেন পাঙ্খা পুলার আর বাবুদের ঘরে পাঙ্খা বরদার নামে ।

সদাশিব বলে :- কাকা বাবু ঘরের মধ্যে থেকেই, সাহেব কে হাওয়া দিতো ?

মাষ্টার মশাই বলে :-  ঘরের মধ্যে কড়ি (অর্থাৎ ছাদের বড় বড় বিম বা রেলিং ) কাঠে আড়াআড়ি ভাবে লাগান থাকতো এক বিশাল চৌকো তালপাতার পাখা। 
চতুর্দিকে কাপড় মুড়িয়ে দিয়ে এটিকে শক্ত-পোক্ত করে তৈরি করা হতো। 

টঙ্গি ঘরে কিম্বা ঘরের বাইরে বারান্দায় থাকত পাঙ্খা পুলার অর্থাৎ পাখা চালানো ব্যক্তির হাতে মোটা রশি বা দড়ি। (পাখার সঙ্গে বাঁধা থাকত মোটা রশি, যার শেষপ্রান্ত থাকত পাঙ্খা পুলারের মুঠিতে। )

পাঙ্খা পুলারের রশি টানার সঙ্গে ঘরের মধ্যে পাখা ঘুরছে অর্ধবৃত্তাকারে। সাহেবের দেহমন ঠান্ডা হচ্ছে।

শহিদুল বলে :- যদি, ঘুম এসে যায় ।

মাষ্টার মশাই বলে :- রশি টানতে টানতে যদি পাঙ্খা পুলারের চোখ বুজে এসেছে, তবে পিঠে জুটত বুটের লাথি। 

আমাদের দেশের বাবুরাও এব্যাপারে কিছুমাত্র পিছিয়ে ছিলেন না।
বাবু কালচারের যুগে সৎ চরিত্রের বাবুরা তো, বেশিরভাগ রাত্রিবেলা গণিকা গৃহে বসবাস করতেন।

 বাড়ির গিন্নিদের চরিত্র ঠিক রাখতে বাবুরা পাঙ্খা বরদার চাকরিতে সাধারণত দৃষ্টিহীন, শক্ত সমর্থ যুবকদের পছন্দ করতেন।

প্রথম কাকাবাবু বলে :- কাঠফাটা রোদে জ্বলে পুড়ে আসার পর মাটির ঘরের বারান্দায় বসে, স্নেহশীলা মা বা গৃহিণীর হাতে কাঁসার গ্লাসে বা ঘটিতে এক গ্লাস নির্মল, স্বচ্ছ, ঠান্ডা কুঁঁয়োর জল পান করার পর, গৃহিণীর হাতে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া খাওয়ার অসাধারণ আনন্দের যে অনুভূতি লাভ করতাম। 
সেই আনন্দের দিন আর দিন নেই।

মাষ্টার মশাই বলে :- আজকের  ভোগ বিলাসী সমাজের মানুষেরা, সেই অনুভূতির আনন্দ লাভ করতে পারবেন না।
পাখা চালাতে কষ্টবোধ হলেও তালপাখার শীতল হাওয়ার ঐতিহ্য আলাদা। 

কাকিমা বলে :- এই যে ছেলেরা, রান্না হচ্ছে খাওয়া দাওয়া করে তবেই যাবে।

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর তাল পাতার তৈরি ঘরে আরাম করার জন্য, দুই বন্ধু বিছানায় শুয়ে শুয়ে গল্প করতে থাকে।

সেই মুহূর্তে উক্ত যুবতী পান হাতে নিয়ে জোর করে কাসতে কাসতে ঘরে ঢুকে বলে :- বাবুদের পান চলবে।

সদাশিব বলে :-  অন্তর থেকে ভালোবাসা না দিয়ে কাসলে, কাসি আসে না।
আপনার নকল কাসির অভিনয় দেখে, দারুন আনন্দ অনুভব করছিলাম।

শহিদুল বলে :- পান দিয়ে শুরু হোক , মনের ভালবাসার লেন-দেন।

সদাশিব পান মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলে :- আপনার মূল্যবান ভালোবাসার হয়তো, বাস্তবে রূপ দিতে পারবে না কিন্তু মনের মাঝে তালের পাখার মতো স্মৃতিচারণ করবো। 

দুই বন্ধু মিলে খোঁজ খবর করতে করতে মেদিনীপুর জেলার তমলুক থেকে বহুদূরে পাখা গ্রামে উপস্থিত হয়।
এই গ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষেরা পাখা তৈরি করে, জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

গ্রামের অরুণ মুন্ডা নামে এক পাখা তৈরীর কারিগরের সঙ্গে পরিচয় হয়। গরমের দিনে উঠানোর এক কোনায় আম গাছের ছায়াতলে বশে পাখা তৈরি করছে।

দুই বন্ধুর পরিচয় পেয়ে আনন্দিত হয়ে ,আম গাছে উঠে কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে এসে - বাড়ীর মহিলাদের নির্দেশ দেয়_ আম গুলো ছাড়িয়ে লবণ লঙ্কা মাখিয়ে বিদেশি বাবুদের কে দেওয়ার জন্য।

সদাশিব বলে :- দাদা, ইতিহাসবিদ বলেন :-তালপাতার পাখা নির্মাণ এক সময়ে বাংলার একটি 
গুরুত্বপূর্ণ কুটিরশিল্পের মর্যাদা লাভ করে ছিল। 

অরুণ মুন্ডা বলে :- পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বহু জায়গা পাখার গ্রাম নামে পরিচিত ছিল, যেমন তমলুকের পাখাগ্রাম বা পূর্ব মেদিনীপুরের এক গণ্ডগ্রাম পাখুরা।

শহিদুল কাঁচা আমের টুকরা মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলে :- পাখা তৈরি সরঞ্জাম কোথা থেকে সংগ্রহ করেন এবং কি ভাবে ?

অরুণ মুন্ডা বলে :- তালগাছের ডাগুর সহ তালপাতা কেটে আনতে হয়। কিন্তু পাতা কাটাতে হবে তাল এবং রস হওয়ার আগে ।
তালের রস কিন্তু শীতকালে নয় , গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাঝামাঝি অবধি পাওয়া যায়। 

দুই পায়ে বাঁধা একটা আড়াআড়ি রশির সাহায্যে, তরতর করে গাছে উঠে যেতে হয়। কোমরের গোজা থাকে একটা হেঁসো, তাই এঁদের হাঁসুরে বলা হয়।

পাতা সংগ্রহ করার জন্য, গাছে চরার সময়ে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। একটা লম্বা মুলিবাঁশ, উক্ত মুলিবাঁশের ডগায় আবার একটা ধারাল কাস্তে জোড়া থাকে।
কারণ নিজের আত্মরক্ষার জন্য চিল ও সাপের ভয়ে। 

অরুণ মুন্ডা একটি যন্ত্র হাতে নিয়ে দেখিয়ে বলে এই যন্ত্রটির নাম পাতকাটা।

এই পাতকাটা যন্ত্র দিয়ে একরাশ ডাগুর সহ তালপাতা কেটে এনে উঠানে উচু করে রাখা হয়।

তালগাছের মধ্যে আবার পুরুষ ও নারী গাছ আলাদা আলাদা আছে।

সদাশিব বলে :- পুরুষ গাছ থেকে কি পাওয়া যায় ?

অরুণ মুন্ডা বলে :- গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাঝামাঝি অবধি, পুরুষ গাছের পাতা কাটার পরে বিশেষ পদ্ধতিতে আগা ঝোড়া, চা়ঁছা ছোলা এবং নলি মেরে তাল গাছের আগা কেটে ঝুলিয়ে দিতে হবে। 
রস সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি বা পাতিল বেঁধে দিতে হবে। 

সদাশিব বলে :- অর্থাৎ তালরস । যে রস পান করলে নাকি নেশা হয়ে থাকে।

অরুণ মুন্ডা বলে :- ঠিক বলেছেন। গরমের দিনে পান করলে,গরম লাগা,লু লাগা ভাল হয়। বাবুরা তালের খাঁটি রস পান করবেন নাকি।

সদাশিব, শহিদুলের দিকে তাকিয়ে বলে :- একদম খাঁটি রস হলে, দুই এক গ্লাস পান করে দেখা যাক।

শহিদুল বলে :- শুনেছি, তাল পাতা বিক্রি হয়।

অরুণ মুন্ডা বলে :- তালপাতা হাটবারের দিনে,বিভিন্ন স্থানের হাটে চলে যায় ।
বর্তমানে আর বাংলা নয়, ভালো ভালো তালপাতা আসে বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র প্রদেশ থেকে।

সদাশিব তালরস পান করে বলে :- তা পাখা তৈরি করার পদ্ধতি কি ?

অরুণ মুন্ডার বৌ এসে, এক বাটি চুনো মাছের ঝালের শুকনো তরকারি দিয়ে বলে :- বাবুরা, মাছের তরকারি দিয়ে খান ভালো লাগবে।

অরুণ মুন্ডা নিজেদের মাতৃভাষায় বলে :-  ঝুমুর, এক গ্লাস খাবি নাকি ?

সদাশিব বলে :- দাদা, বৌদি দিন।

ঝুমুর বলে :- না,থাক।

অরুণ মুন্ডা বলে :- লজ্জা পাচ্ছি কেন ?
আরো বাবুরা নিজের লোক হয়ে গেছে।

সদাশিব হাত জোড় করে বলে :- বৌদি, আপনারা কিছু সময়ের মধ্যেই- অচেনা অজানা মানুষ কে বিশ্বাস করে নিজের মতো করে আপন করে নেওয়ার মন ও মানসিকতা আছে। আসুন না, একসাথে একটু সময় আনন্দ করি।

ঝুমুর বৌদি মাটির মধ্যে বসে পড়ে,সবার জন্য তালরস গ্লাসে ঢেলে  মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে :- এক সাথে হয়ে যাক বলে পান করতে শুরু করে।

অরুণ মুন্ডা তালরস পান করে, আমের টুকরা মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলে :- উক্ত তালপাতা ৭ থেকে ১০ দিন জলে ডুবিয়ে রেখে পচানোর পর , রোদে শুকিয়ে বা জাঁক দিয়ে পাতাগুলি সোজা করা হয়। 
তারপরে পাতাগুলি থেকে ধারাল ছুরির সাহায্যে, পাখা তৈরির সাইজ করে কাটা হয়। 
এরপরে খুব সরু বাঁশের কঞ্চির ফ্রেম বানিয়ে, তালের পাতা মেলে দিয়ে বাঁধন দেওয়া হয়ে থাকে। এরপর তাল পাতার পাখার উপর রঙ তুলি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন করা হয়।  

অনেক পাখার দন্ডকে সরু করে ছুলার পর, একটি সরু বাঁশের চোঙের মধ্যে ঢোকানো হয়।
অর্থাৎ ঘূর্ণমান বা ঘোরানো পাখা। এতে পাখাটি ঘোরাতে বিশেষ সুবিধা হয়। 

শহিদুল বলে :- প্রতিদিন কয়টা পাখা তৈরি করতে পারেন ।

অরুণ মুন্ডা বলে :- এই পাখা শিল্পের সঙ্গে যেসব ব্যক্তিরা যুক্ত রয়েছেন। একজন ব্যক্তি দিনে ২৫ থেকে ৩০ টি পাখা তৈরি করতে পারেন। 
১০০ টি পাতা থেকে গড়ে ২০০ টি পাখা তৈরি হয়ে থাকে।

সদাশিব বলে :- বিভিন্ন ধরনের দামি নকশা করা পাখা, আপনারা তৈরি করেন ?

অরুণ মুন্ডা বলে :- তাল পাতার পাখার  আবার কিছু কিছু দামি হাত পাখা তৈরি করা হয়। যেমন নকশাদার পাটি পাখা, সুতোয় বোনা পাখা, কাপড়ের নকশা পাখা ইত্যাদি কিন্তু শিল্পী হিসাবে বাড়ির মেয়েরাই ধৈর্য ধরে তৈরি করে থাকে।

ঝুমুর বৌদি হঠাৎ করে উঠে দ্রুত বেগে ছুটে ঘরের মধ্যে থেকে কয়েকটি নকশা করা পাখা নিয়ে এসে বলে :- এই গুলো আমি নকশা তৈরি করেছি।

সদাশিব পাখা গুলো নেড়েচেড়ে দেখে বলে :- অসাধারণ আপনার প্রতিভা। গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে কত না অজানা বিখ্যাত শিল্পী ছড়িয়ে আছে।
ঝুমুর বৌদি নিজের প্রশংসা শুনে সদাশিবের কাছে গিয়ে ঘুরানো পাখা দিয়ে বাতাস করতে শুরু করে।

শহিদুল পাখার হাওয়া খেতে খেতে বলে :- পরিবেশবিদ গণ বলেছেন :- একমাত্র তালপাতার পাখাতেই পরিবেশ ঠান্ডা হয়।

অরুণ মুন্ডা বলে :- শহরে বা গ্রামের মহিলারা একটি সাধারণ হাতপাখা বাজার থেকে কিনে নিয়ে গিয়ে,  সাধারণত বাড়ির মেয়েরাই সেই পাখার চারদিকের বর্ডারে শাড়ির পাড় বা লাল শালুর ঝালট লাগিয়ে থাকে। 
কেউ কেউ সূঁঁচসুতো দিয়ে ঠাকুর দেবতার নাম বা দু-এক লাইন পদ্য লিখে রাখেন। 
জন্ম দিন ও বিবাহের দিন সুন্দর করে নকশা করে লিখা থাকে।

সদাশিব বলে :- দাদা , পুরানো ভালোবাসার পাখার স্থান হয় কিন্তু শেষ মুহূর্তে রান্নাঘরে।

শহিদুল বলে :- কয়লার উনুন ধরানোর জন্য, সেই বয়স্ক মাজাভাঙা পাখা দিয়েই সজোরে হাওয়া দেওয়ার ব্যবস্হা এবং সর্বশেষে উনুনের জ্বালানি ।

সদাশিব বলে :- তালের পাখা এক মানববন্ধনের, জীবনচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

দুই বন্ধু অরুণ মুন্ডা পরিবারের সঙ্গে- তাল পাতার ঘরে কয়েক দিন থাকার পর- আবার অজানার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
====================================
তাল-খেজুর পাতার ইতিহাস ও ভ্রমণের গল্প। শেষ
==================================

         উপন্যাসের অধ্যায় সংখ্যা :- 4  
অধ্যায়ের নাম :- সদাশিবের গুন্ডাগিরি।

সদাশিবের মামা প্রফুল্ল বিশ্বাসের সঙ্গে মামা ও ভাগ্নে প্রাইভেট পড়া নিয়ে কথা হয়।

সদাশিব বলে :- ছাত্র-ছাত্রীদের রাতের প্রাইভেট দলের  ছুটি হওয়ার পর, খগেন মাস্টার মহাশয়ের বাড়ি থেকে প্রধান সড়কে যেতে  সময় লাগে দশ মিনিট । 
শীতকাল হোক আর গরম কালের সময় হোক, রাত নয়টার সময় বাগানের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করতে হয়।

প্রায় 23 বিঘা জমির উপরে বড় বড় বিভিন্ন রকম ফলের গাছ হয়েছে। আম, কাঁঠাল, লিচু,জাম, লেবু, জামরুল,পেয়ারা ও কলাবাগান সহ বিভিন্ন ধরনের


জঙ্গলি গাছপালা ও লতাপাতায় ভরে গিয়েছে।
রাতে আলো ছাড়া বাগানের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করা অসম্ভব। বাগানের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে সবার গা ছমছম করে উঠে। বাগানের মধ্যে দিয়ে চলার সময় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বর্ষাকালে ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। মাঝে মধ্যে শিয়াল পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে পড়ে।
গরমের সময় বিভিন্ন ধরনের পোকা মাকড় ও সাপের সাথে দেখা হয় কিন্তু সাহসী ছেলেরা যমের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। 
প্রাইভেট দলের ছাত্রীরা ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি না করে, বিষাক্ত সাপ মেরে- বহুবার সাহসের পরিচয় দিয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা অন্য গ্রাম থেকে  মান-সম্মান রক্ষা করতে - প্রায় ঊনচল্লিশটি পরিবারের কয়েক শত মানুষেরা, মাস্টার মশাইয়ের কুমার নদের চর পাড়াতে স্বপরিবারে বসবাস শুরু করেছেন।

মামা প্রফুল্ল বলেন :- বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের একাংশের মানুষের দ্বারা, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে- জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।  বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জের পাড়া গাঁয়ের হিন্দুরা বাঁচার তাগিদে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলাকায় ও শহরের দিকে চলে যাচ্ছে।

সদাশিব বলে :- এই এলাকার মধ্যে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মধ্যে  শৈলকূপা ও কবিরপুর দুইটি গ্রাম এবং  যশোহর জেলার মধ্যে ছিয়ানব্বই গ্রাম গুলিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা গরিষ্ঠতা রয়েছে। 

মামা প্রফুল্ল বলেন :- আবার অনেকেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে সহ বিভিন্ন রাজ্যে জড়িয়ে পড়ছে কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সমস্যা ভারতের জন্য, ভীষন ভাবে উদ্বেগজনক।

সদাশিব বলে :- মাস্টার মহাশয়ের বাড়িতে যাওয়ার, প্রধান সড়কের মিলিত স্থানের আশপাশে স্থায়ী ভাবে কয়েক একটি পরিবারের সদস্যদের বসবাস করেন।

প্রধান সড়কের মিলিত স্থানে আসার পর, সকল ছাত্র-ছাত্রীরা যে যার বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
সদাশিবের মা ডাক দিয়ে বলে :- খাওয়া দাওয়া করে, সারারাত ধরে মামা ভাগ্নে গল্প করতে থাক।


ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাইভেট পড়া শেষ করে, প্রধান সড়কের দিকে আসার সময়, সদাশিব কে তাপস চুপিচুপি বলে :-  হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রেম ঘটিত সমস্যা গুলো দীর্ঘদিন ধরেই চাপা উত্তেজনা চলছে। তুই থাকতে সবিতা কে নুরুল ভোগ করবে। তোর দ্বারা কিছু হবে না, আবার বড় বড় ভাব দেখাস- এলাকার নাকি বড় দাদা। হিন্দুর মেয়ে কে মুসলিম নিয়ে যাচ্ছে আর তুই চুপচাপ থেকে দেখছিস ।

প্রধান সড়কে আসার পর সদাশিব সমস্যা সমাধানের জন্য, নুরুলের জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করে।  সদাশিব ও নুরুল তর্ক বিতর্ক চলতে থাকে।
অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা গোল করে ঘিরে আনন্দ উপভোগ করতে থাকে।

তাপস ভাবে মনে :- আমি যখন সবিতা পাবে না,অন্য কে ভোগ করতে দেবো না। জানি নুরুল কে সবিতা প্রশ্রয় দেয় না। 

সদাশিব নিজেকে এলাকার একজন গণ্যমান্য রাজনৈতিক নেতা ভেবে, উত্তেজিত হয়ে শাসন করার ভঙ্গিতে বলে :- নুরুল, তুই মুসলিম হয়ে, হিন্দুর 
মেয়ে কে প্রেমপত্র নিবেদন করেছিস ? 

হিন্দুরা এই এলাকায় দাপট দেখাবে । হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উপরে কোন কথা বলা চলবে না। 
হিন্দু ধর্মের মেয়ে কে ভুলিয়ে ভালিয়ে মুসলিম বানানোর পরিকল্পনা করেছিস। আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দেবো না।

নুরুল বলে :- সবিতার কে  ভালো লেগেছে এবং ভালোবাসার কথা জানিয়েছি। আমার অপরাধ কোথায় ?
ভালোবাসার কাছে হিন্দু-মুসলিম ধর্ম দিয়ে বিচার হয় না।
ভালোবাসাই হলো নারী-পুরুষের একক ধর্ম।
আমার ভালবাসায় কেউ বাঁধা সৃষ্টি করলে, পরিস্থিতি ভীষন খারাপ হয়ে যাবে। আমি সবিতা কে ভালবাসি। আই লাভ ইউ সবিতা।  অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা হাততালি দিয়ে আনন্দ উল্লাস শুরু করে।

সদাশিব, সবিতার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে :-  নুরুল কে  ভালবাসিস ? 

সবিতা বলে :-  নুরুল কে ভালবাসি না কিন্তু বিভিন্ন ভাবে বিরক্ত করে। বই ও খাতার মধ্যে প্রেম পত্র দেয়।  প্রাইভেট পড়ার সময় বিভিন্ন ছলনা করে, আমাকে স্পর্শ করতে চাই কিন্তু সব সময় নুরুলের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করি।

নুরুল বলে :- সবিতা, এমন কথা বলোনা- আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।

সবিতা বলে :- মুসলিম ছেলেদের সাথে ভালোবাসা করতে চাইনা।  বাংলাদেশের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের ভালোবাসার শেষ পরিনিতি, অনেক দেখেছি এবং শুনেছি।

নুরুল বলে :- তুমি ভালোবাসার মর্যাদা দিতে জানে না । ভালোবাসার মধ্যে ধর্মের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে  আসছে কেন ?

সবিতা বলে :- দেশে  হিন্দু ছেলেদের আকাল পড়েছে! জাত, কুল, মান, বংশমর্যাদা ও ধর্মীয় মর্যাদা হারিয়ে তোমার সঙ্গে প্রেম করতে পারবোনা।
বাবা-মায়ের ও পূর্ব পুরুষের মুখে চুনকালি দিয়ে নরকে যেতে চাই না।

সদাশিব বলে :- নুরুল, স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে- একতরফা প্রেম কখনো জমে ওঠে না।
তুই আমার সহপাঠী বন্ধু কিন্তু সবিতা আমাদের থেকে অনেক ছোট।
সবিতার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা কর। 

নুরুল বলে :-  ক্ষমা,  চাইতে পারবো না ।
সবিতা কে ভালবেসে, অন্যায় কিছুই করিনি।  

শহিদুল বলে :- আরো, একবার বললেই তো- সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

নুরুল উত্তেজিত হয়ে বলে :- আমাকে তুই কি করবি?
বাড়ির কাছে পেয়ে দাদাগিরি করছিস ?
তোকে  শৈলকুপা  বাজারে যেতেই হবে। নাহলে পেটের ভাত হজম হবে না।
বাজারের মধ্যে দেখা হলে, দাদাগিরি করা জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেবো।

সদাশিব উত্তেজিত হয়ে, নুরুল কে চড় মারে।

নুরুল দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে :- কাজটি ভাল করলি না। মুসলিম সম্প্রদায় কে দুর্বল ভাবিস না ?
এলাকায় তোরা যতই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়ে থাকিস। সবসময় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের পায়ের নিচেই থাকতে হবে। এই দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিন্তু হিন্দুরা কয়েকটি এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা , তোরা কি করবি ?
হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভারতে আছে কিন্তু বাংলাদেশের মধ্যে ক্ষমতা দেখিয়ে - নিজেদের বিপদ নিজের ডেকে আনছিস।

সদাশিব বলে :- ভয় দেখাচ্ছিস ?
  
নুরুল জোরে জোরে দম নিয়ে বলে :- ইতিহাস জানিস তো ?
1947 সালে হিন্দু-মুসলিম  দ্বিজাতি তত্ত্ব ভিত্তিতে, অখন্ড ভারতবর্ষকে ভাগ করা হয়েছিল।
হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান।

মুসলিম গণ আন্দোলন করে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত করে। 1971 সালের  স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় হিন্দুরা তো সব ভারতে পালিয়ে ছিল।

গন্ডগোলের সূত্র ধরে হিন্দু-মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তর্ক বিতর্ক  চরম পর্যায়ে পৌঁছিয়ে যায়। দুই দলের মধ্যে হাতাহাতি-মারামারি শুরু হয়ে যায়।

সদাশিব অপমানিত বোধ মনে করে। চরম উত্তেজিত অবস্থায় হারিকেন তুলে নিয়ে, নুরুলের মাথায় বার বার আঘাত করতে থাকে।
হারিকেনের তেলের ট্যাংকির আঘাতে নুরুলের মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। রাস্তার ওপরে বই খাতায় ছড়াছড়ি।

নুরুলের শরীরে এবং বই খাতা ব্যাগ কাঁচ ও কেরোসিন তেলে ভরে যায় ।

সদাশিবের বৈশিষ্ট্য হলো -যেখানেই গন্ডগোল বেধে যাবে, তর্ক বিতর্ক করতে করতে বিপক্ষকে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া। 

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে আসে।
কয়েকজন ছাত্ররা ছুটতে ছুটতে মাস্টারের বাড়িতে খবর দেয়।

মাস্টার মশাই বিরক্ত হয়ে বলে :- গন্ডগোল করার আর সময় পেল না। শয়তানগুলোর জন্য, সারাদিন পরিশ্রম করার পর খাওয়া-দাওয়া করে ক্লান্ত শরীরে একটু ঘুমানোর উপায় নেই।

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে :- চল দেখি কি হয়েছে ?

মাস্টার মশাই প্রধান সড়কের মিলিত স্থানের ঘটনাস্থলে এসে, পরিস্থিতি বোঝার জন্য অপেক্ষা না করে- নুরুল কে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। 

চিকিৎসক নুরুলের মাথায় ব্যান্ডেজ করে ঔষধ পত্র দিয়ে ছুটি দিয়ে দেয় ।

মাস্টার মশাই, কয়েক জন ছাত্রদের নিয়ে নদীর ওপারে দুই কিলোমিটার দূরে নুরুলের বাড়িতে পৌছিয়ে দিয়ে আসে। 

সদাশিব মারামারি করে, পালিয়ে দুপুর রাতে কামিনী বৌদির বাড়ীতে আসে।

কামিনী বৌদি বলে :- বাবার ভয়ে, কামিনী বৌদির ঘরে আশ্রয়।

সদাশিব বলে :- এক মাত্র তুমি আপদে-বিপদে রক্ষাকারি ও আশ্রয়দাতা ।

কামিনী বৌদি বলে :-  মাস্টার  তোমার বাবার কাছে অভিযোগ জানিয়ে গিয়েছে এবং বলেছেন আর কোন দিন প্রাইভেট পড়াবো না।
তুমি সমাজের মানুষের কাছে  মস্তান হয়ে গিয়েছো।  হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের  রক্ষাকর্তা হয়ে পড়েছে ?
হিন্দু সমাজের মধ্যে আর কোনপুরুষ নেই ?
তোমার গন্ডগোল করার কোন দরকার ছিল।

সদাশিব বলে :- নুরুল, অনেক দিন ধরেই সবিতা কে  বিরক্ত করছিল।

কামিনী বৌদি রাগে গজগজ করতে করতে বলে :- তোমার স্বভাব পরিবর্তন করতে হবে। আগ বাড়িয়ে মাথায় সিন্দুর পড়তে যাবে না, তাহলে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। সিঁথির সিঁদুর তুলে ফেলতে পারবে কিন্তু সিন্দুরের কলঙ্কের দাগ, সারা জীবনেও মুছতে পারবে না

সদাশিব কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে :- এই গভীর রাতে, তোমার জ্ঞানের বানী শুনতে ভালো লাগছে না। আমাকে নিয়ে যখন তোমার সমস্যা , তাহলে চললাম- জঙ্গলের মধ্যে পিকিল বাবুর বাগান বাড়িতে।

কামিনী বৌদি হাত চেপে ধরে বলে :- রাগ দেখিয়ে  যাচ্ছে কোথায় ?

তোমাকে, আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে তোমার বাবা-মা সহ পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া অশান্তি করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও করতে হবে।

কিন্তু তোমার জন্য, মানুষের সঙ্গে কেন অশান্তি করবো ?

সদাশিব বলে :- আমাকে ভালোবাসো বলেই ।

কামিনী বৌদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে :- আমার যত  জ্বালা- এই ধরনের জ্বালা যন্ত্রণা থেকে মরণ ভালো। 

সদাশিব অপরাধীর মতো চুপচাপ হয়ে যায়।

কামিনী বৌদি উত্তেজিত হয়ে বলে :- নিজের বাপের  খেয়ে, পরের ছাগল গরু তাড়িয়ে কোন লাভ নেই।ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে -নিজের চরকায় তেল লাগাও।

গ্রাম্য প্রবাদ বাক্যে বলে :- "পরের ছেলে পরমানন্দ, যত উচ্ছন্নে যাবে -ততই হবে আনন্দ।" 

একবার মনের আয়নায় নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে । তুমি শত অপরাধের-অপরাধী হয়ে, পরের শাসন করতো গিয়েছো।

অনেক রাত হয়েছে, খাওয়া দাওয়া করে উদ্ধার করে।

কামিনী বৌদি, সদাশিব কে খাবার দেওয়ার পর, পাশের চেয়ারে বসে ভাবতে থাকে :- সদাশিব, তুমি যত করবে মানুষের সাথে মারামারি, অশান্তি, 
ঝুট-ঝামেলা ও অপরাধ এবং যত পড়বে বিপদে-আমার হবে বেশি লাভ।

আমি ছাড়া তোমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবো না। অতীতে বহুবার, তোমার জন্য সমাজের মানুষের সাথে করতে হয়েছে লড়াই ও ঝগড়া।
বহু অপবাদ শুনতে হয়েছে  এবং কলঙ্কিনি ঝগড়াটে মহিলা উপাধি পেয়েছি ।

আমার সাথে কোনো নারী পুরুষ ঝগড়া করতে আসে না, কারণ মান সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে।

সদাশিব খাওয়া দাওয়া শেষ করে, বিছানায় শুয়ে  ভাবতে থাকে।  যা কিছু করেছি, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। আজকের এই লড়াইয়ে মধ্যে, অন্যায় কিছু দেখতে পারছি না।  কিন্তু আমাকে লোকে ভুল বোঝে।

হিন্দুরা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু বিপরীত ধর্মের মানুষ কে সাপের মতো ছোবল মেরে, বিষ প্রয়োগ না করে-নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য, সাপের মতো অবশ্যই ফোঁস ফাঁস করা দরকার। সুযোগ পেলেই আমাদের মতো নিরীহ হিন্দু ধর্ম প্রাণ মানুষদের পিষে মেরে ফেলবে।

হিন্দু ধর্মের বিপরীত (অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম) ধর্মের মানুষের মধ্যে, প্রায় হাজার বছরের বেশি সময় ধরে একটি ধ্যান ধারণা রয়েছে।
  হিন্দু ধর্মের নারীদের কে  ছলে-বলে-কৌশলে, ইসলাম ধর্মের ছায়াতলে নিয়ে আসতে পারলে।
কোটি কোটি পুণ্য লাভ হয় এবং মৃত্যুর পরে কয়েক কোটি বছর স্বর্গবাস। এই কারণেই হিন্দু নারীরা, মুসলিম ধর্মের মানুষের কাছে আকর্ষণীয়।

পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে।
মুসলিম ধর্মের নারীদের সাথে দৈহিক সম্পর্কে - শনির দোষ কেটে যায় অর্থাৎ বিপদ থেকে মুক্তি লাভ হয়ে থাকে। কিন্তু মুসলিম নারীদের কে হিন্দু ধর্মের মানুষেরা- সমাজ ব্যবস্থায় স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেয় না।
নর-নারীর ভালবাসার টানে, পুরুষ হয়তো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে- নয়তো শেষ পথ আত্মহত্যা।

এই কারণেই মুসলিম ধর্মের নারীরা কখনোই , হিন্দু ধর্মের ছায়াতলে আসতে চায় না। কিন্তু হিন্দু ধর্মের নারীরা মুসলিম হতে চাই কারণ ভালবাসার টানে ভালবাসার মানুষের কাছে সম্মান বজায় থাকে বলে। 

বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মের মানুষেরা যদি একতাবদ্ধ ও    ধর্মের নিয়ম কানুন পরিবর্তন না করে-তাহলে হিন্দুদের অস্তিত্ব নিয়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হবে ।

==================================

                    অধ্যায় সংখ্যা :- 5 
অধ্যায়ের নাম :- সদাশিবের বাবা-মায়ের দুঃখ।

সদাশিবের বাবা আশুতোষ হালদার। 
সন্ধ্যার সময়ে- বড় ছেলে সদাশিব কে কাছে পেয়ে বলে :-  একটু শান্তিতে বসবাস করতে দে। তোর অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য, পথে ঘাটে বাজারে ও সমাজের বুকে মান সম্মান আর থাকলে না।

ছেলে-মেয়েদের গৌরবে, সমাজের মানুষের কাছে- পিতা-মাতার মুখ উজ্জ্বল হয় । কিন্তু সেই ছেলের কারণেই, মানুষের সামনে মুখ দেখাতে লজ্জাবোধ করছে।

মাঝে মধ্যেই মনে হয়- ব্রীজ থেকে লাফিয়ে কুমার নদের জলে দেহ বিসর্জন দিয়ে দেয়। 

সদাশিব  চমকিত হয়ে উঠে বলে :- বাবা, এমন কাজ কখনোই করবেন না।

বাবা আশুতোষ কান্না করতে করতে বলেন :-  বহু বার আত্মহত্যা করতে গিয়েও, ফিরে এসেছি। কারণ সংসারের বাকি মুখ গুলো, সেই মুহূর্তে ভেসে ওঠে।   

সদাশিব বাবার কাছে গিয়ে, পকেট থেকে রুমাল বের করে-বাবার চোখের জল মুছে দেয়।

বাবা আশুতোষ দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে :- সদাশিব, অসামাজিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করে, সমাজের বুকে ভাল কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দে।

আমাদের ধর্মীয় বই পুস্তকে বলে " জন্ম হোক যথা তথা-কর্ম হোক শ্রেষ্ঠ" । তুই যেমন কর্ম করে বেড়াচ্ছিস-নিশ্চয়ই কর্মের ফল উপলব্ধি করতে পেরেছিস।

সৎ ভাবে চলাফেরার করতে গিয়ে, হয়তো বিভিন্ন বাঁধা বিঘ্ন আসবে কিন্তু মনের দিক থেকে শান্তি পাওয়া যাবে। আর "সৎ ব্যক্তির কখনো বিনষ্ট হয় না- ঈশ্বর রক্ষা করেন।"

সদাশিব বলে :- আপনার মূল্যবান মতামত অবশ্যই সত্য কিন্তু --------------।

বাবা আশুতোষ, সদাশিবের হাত ধরে বলে :- দুঃখের কথা কি বলবো ?
এক সময়ে সমাজের মানুষেরা হালদার বাবু বলে- সম্মান করতে কিন্তু এখন অপমান জনক কথাবার্তা বলতে ছাড়ে না। 

আমার কাছে সমাজের মানুষেরা বিভিন্ন রকম সমস্যার সমাধানের জন্য, পরামর্শ নিতে আসতো। এবং ছোটখাটো বিচার সভায় বিচারকের আসনে বসাতো।

মাথায় রাখতে হবে, কয়েক হাজার সাহা পরিবারের মধ্যে-আমরা এক ঘর হালদার বসবাস করি ।

এখানে, আমাদের আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই।
সাহাদের পরিবারের মানুষেরা-আমাদের বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন।

এই সংসারের সদস্যদের সুখ, শান্তি ও আর্থিক সচ্ছলতা দেওয়ার জন্য,কম পরিশ্রম করেনি।

মনে পড়ে তোর ছোট বেলার দিন গুলোর কথা।

এক সময় বাঁকে (অর্থাৎ বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র বহন করার জন্য।) করে দুই দিকে দুই টি বড় ঘোলের হাড়ি  ঝুলিয়ে, 10 থেকে 15 কিলোমিটার রৌদ্রের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঘোল বিক্রি করতাম। 

ঘাড় দেখিয়ে বলে :- ঘাড়ের কড়া পড়া দাগ গুলো এখনো মিশে যাইনি ।

এই এলাকার মধ্যে দুই বাপ বেটা কাতলাগাড়ী ,  গাড়াগঞ্জ, শৈলকুপা সহ বিভিন্ন হাটে যেতাম।

স্কুল ছুটির পরে-নাকে মুখে কোন রকম ভাত খেয়ে হাটে চলে যেতিস। তুই হাড়িতে করে দূর থেকে জল বয়ে নিয়ে আসতিস। সেই কষ্টের দিন গুলোর কথা ভুলে গিয়েছিস। 

এই সংসারের সুখের জন্য, ধীরে ধীরে কাঠের ব্যবসা শুরু করলাম। তারপর ঈশ্বরের কৃপায় সব কিছু বৃদ্ধি হতে শুরু করে। 
বর্তমান তিন টি কাঠের দোকান তিন ভাইয়ের জন্য করেছি। কিন্তু তুই, একটি দোকান পরিচালনা করতে পারিস।

লজ্জাবোধ হওয়া উচিত-নেশাগ্রস্ত হয়ে বাড়ীতে আসতে। বাড়িতে বিয়ের উপযুক্ত ছোট বোন আছে।
বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিস  কখনো?
মাস্তান ও চরিত্রহীন দাদার বোন কে, কোন ছেলে  বিয়ে করতে চাইবে ?

তোর গুনের খারাপ কথাগুলো লোকের মুখ থেকে শুনতে , বাবা-মায়ের ভাল লাগে ?

  যুবক ছেলের গাঁয়ে আঘাত করতে, নিজের লজ্জাবোধ করে। কিন্তু লোকজনের বিরক্তিকর ও সম্মান হানিকর কথাবার্তা শুনতে শুনতে-অধৈর্য হয়ে পড়ি আর সেই মুহূর্তে রাগের মাথায় আঘাত করে থাকি। কিন্তু পরে অনুতপ্ত হয়ে, নীরবে হৃদয়ের মাঝে বোবা কান্নায় বুক ফেটে যায়।

সদাশিব মাথা নিচু করে, বাবার পায়ের কাছে চুপচাপ বসে, ভাবে :- বাবা-মায়ের মনে অনেক দুঃখ কষ্ট দিয়েছি।

বাবা আশুতোষ বলে :- নারী ঘটিত সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিস। কিন্তু বিয়ে করে সমস্যার সমাধান কর। সংসারের মধ্যে থাকলে,ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সদাশিব বলে :- এই মুহূর্তে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
ভাল হওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু কারণ গুলো আপনাকে বলতে পারবে না।
সময়ের জন্য অপেক্ষা করুন- অবশ্যই, একদিন জানতে পারবেন।

আমি ভাল হতো চায় কিন্তু কে করবে ভালো। 
সমাজের কিছু মুখোশধারী ভালো মানুষেরা ও রাজনৈতিক নেতারা ভাল হতে দেবে না।

আমি ভাল হতো গেলে-আকালে মৃত্যু হবে ।

বাবা আশুতোষ বলে :- চেষ্টা করতে দোষ কোথায় ?

সদাশিব, বাবার পা জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে :- আমি আপনার চরণ ছুঁয়ে শপথ করছি। আপনার সম্মান নষ্ট হয়, এমণ কাজ আর করবো না।
যদি সমাজের মানুষদের কাছে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতো হয়, তবুও প্রতিবাদ করবে না।

আবেগের বশে-অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বিভিন্ন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ি। এবং আমাকে জড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকে।

সমাজের বুকে যতদোষ করে নাকি সদাশিব- অন্যেরা আড়ালে থেকে ধোয়া তুলসী পাতা।

বাবা,আমার নারী ঘটিত বিষয়ে দুর্বলতা আছে কিন্তু আমার চরিত্রটি কে করেছে নষ্ট ?

যে নারী, আমার চরিত্র নষ্ট করেছেন, তার নাম শুনলে- আপনার মাথায় রক্ত গরম হয়ে উঠবে। 
উক্ত নারী-আপনার বিশেষভাবে পরিচিত।

মায়ের অসাবধানতার কারণেই, উক্ত নারী- মায়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে_ আমার চরিত্র নষ্ট করে দিয়েছেন।

বাবা আশুতোষ বলে :- বুঝতে পারলাম। কে সেই সর্বনাশী নারী।

সদাশিব বলে :- আমার অপকর্মের বেশি প্রচার হয়েছে কিন্তু সমাজের মানুষের জন্য, অনেক ভাল কাজ করেছি। 
আপদ বিপদে বহু পরিবার কে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছি কিন্তু মনে রেখেছে কয় জন।

সমাজের মানুষেরা , মানবতা হীনেতার পরিচয় দিয়ে- আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে।
আমার চরিত্রের উপর লাগিয়ে দিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের কলঙ্কের দাগ।

হাজার ভাল কাজ করলেও- কলঙ্কের দাগ মুছে ফেলতে পারবে না।
বাবা , আমাকে ক্ষমা করবেন।

বাবা আশুতোষ বলে :- খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করিস না ,যা ভাত খেয়ে বিশ্রাম কর। রাত অনেক হয়েছে।

                ।। পরবর্তী অংশ 14  দেখুন ।।


              









                 


কোন মন্তব্য নেই:

কবিতা মালা, ২০২৫ (কবিতা সমগ্র)

 কবিতা মালা, ২০২৫                      লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা  সূচিপত্র   (১) নতুন বছর ২৫  (২) নতুন বছরের শুভেচ্ছা (৩) কালের গহীনে (৪) ব...