◆ লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
◆ শ্রেণী :- উপন্যাস।
◆ বিষয় :- সমাজের অন্তরালে উচ্চ শিক্ষিত নারী ও পুরুষ পতিতা জীবনের কাহিনী।
◆ সতর্কতা :- এই উপন্যাসটি ১৮ + প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য লিখিত হয়েছে। নারী-পুরুষের ভালোবাসা ও পতিতা নারীদের ব্যবসায়িক কথাবার্তা আলোচনা করতে গিয়ে হয়তো যৌন বিষয়ক কিছু শব্দ ও বাক্য এসে গিয়েছে। তার জন্য পাঠক মহলের কাছে আমি হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
◆ উপন্যাস প্রসঙ্গে :- আধুনিক সভ্যতার সভ্য সমাজের উচ্চ শিক্ষিত ও ধনবান নর নারীর জীবনের কাহিনী।
◆ পুরুষ শাসিত সমাজে নারী স্বাধীনতা লাভ করে অপব্যবহারের কারণে উচ্ছৃংখল জীবনযাপন করতে করতে একসময় পতিতা হয়ে যাওয়ার কাহিনী।
◆ নারী কেন পতিতা হয়! পুরুষ দায়ী না নারী। সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
◆ শিক্ষিত বিনোদ উচ্ছৃংখল জীবনের একজন পুরুষ পতিতা ।
◆ বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক সম্পর্ক থেকে স্বামী বিরত থাকলে একজন নারীর যৌবন জ্বালা যন্তণা কথা তুলে ধরা হয়েছে।
◆ জয়ন্তী সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে স্বামী হারা হয়ে বিপদগামী হয়ে যায়।
◆ সুভাষিনী (লক্ষী) শিক্ষিত পতিতা কেন? গৃহ শিক্ষক মহেন্দ্রর প্রেমে পড়ে বিনোদের সাথে পালিয়ে জীবন কে বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। শেষ পরিণতি কি?
◆ সমাজের বুকে যাদের কে শিক্ষিত বলি, উকিল, ব্যাবসাহিক, স্কুল মাস্টার সহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন প্রনয়ের ঘটনা আলোচনা করা হয়েছে।
◆ বর্তমান যুব-যুবা সমাজের অন্তরালে কলেজ জীবনের ভালবাসার কাহিনী সহ স্বাধীন জীবন যাপন করতে করতে উচ্ছৃংখল হয়ে উঠা।
◆ একজন বাবার সমস্যা কিন্তু সন্তান হয়ে বুঝতে চাই না। কলকাতায় পড়াশোনার জন্য শুধু টাকা দাও কিন্তু বিনিময়ে বাবা কি পায়?
◆ সকল নারী পুরুষের যৌবনের উন্মাদনায় ভাসতে ভাসতে ভয়ংকর পরিণতি দিকে এগিয়ে যাওয়া।
◆ এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায় করে এগিয়ে যেতে হবে, না হলে কাহিনী বোঝা যাবে না আর ভালো লাগবে না।
◆ প্রচার ও পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রথম অধ্যায়ে রসলা কাহিনী দিয়ে শুরু করা হয়নি।
আশা করি , নিয়মিত ভাবে সাথে থাকলে উপন্যাসের শিরোনাম "যৌবনের উন্মাদনায় ভয়ংকর পরিণতি" এর রস আস্বাদন করতে পারবেন।
----------------------------------------------------------
।। প্রথম অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ কলকাতার একজন নামকরা ব্যবসায়ী সঙ্গতিপন্ন শৈলেন মহাশয় তার কলকাতার বুকে পাঁচ খানা বাড়ি ও দুটি বাগান বাড়ি আর গাড়ি ঘোড়া ও লোকজনের কোন অভাব নেই।
◆ তার ছেলে শশীকান্ত হাইকোর্টের একজন নামকরা উকিল।
◆ একদিন রাতে বাবা শৈলেন মহাশয় খাবার টেবিলে বসে রাতের খাবার খেতে খেতে বলেন :- শশীকান্ত; তোমার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। আমার ইচ্ছা তুমি বিবাহ করে সংসারে মন দাও কারণ বাড়িতে কিন্তু একজন মহিলার বিশেষ প্রয়োজন। কতদিন আর চাকর বাকরের হাতে খাওয়া-দাওয়া করব। তোমার মা বেঁচে থাকলে অবশ্যই আমাকে তোমার বিয়ের জন্য চিন্তা করতে হতো না। জীবিত থাকাকালীন দশভূজার মতো একাই ১০ জনের কাজ করে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে।
◆ ছেলে শশীকান্ত বলে :- বাবা; তুমি ঠিকই বলেছেন, তাহলে দেখাশোনা শুরু করেন।
◆ বাবা শৈলেন মহাশয় বলেন :- তোমার পছন্দের যদি কোন নারী থাকে তাহলে আমাকে বলতে পারো।
◆ ছেলে শশীকান্ত বলে :- না বাবা, আমার কোন পছন্দের নারী নেই আর তুমি দেখে শুনে যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই আমি মেনে নেবো। বাবা তোমার সুখেই আমার সর্বসুখ। ১২ বছর বয়স থেকে মায়ের ও বাবার স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আসছেন। আমার মুখের দিকে চেয়ে তুমি আমার দ্বিতীয় মা আনেনি।
◆ কলকাতা মহানগরের মধ্যে খোঁজ করতে করতে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে স্বগোত্রে সাথে যোগাযোগ হয়। মেয়ের বাবা বর্তমান অর্থশালী না হলেও কিন্তু বংশ মর্যাদা ও আভিজাত্য বজায় রেখেছে। তার কন্যা রূপে গুণে অতুলনীয় আবার লেখাপড়ায় উচ্চশিক্ষিত। উক্ত মেয়ের হাতের রান্না খাবার খেয়ে ও মাতৃহীন মেয়ে ললিতার ঘরের কাজের নিপুণতা দেখে মুগ্ধ হয়ে শৈলেন মহাশয় তার একমাত্র ছেলের জন্য বিয়ের দিন তারিখ নির্ধারণ করেন।
◆ ললিতার সুখের সংসারের মাঝে আবার অতীতের আগমন বার্তা তার স্বামী কে জানাই। যথা নিয়মে বৈদিক ব্রাহ্মণ ডেকে পূজা অর্চনা ও দশবিধ সংস্কার করানো হয়।
শৈলেন মহাশয় তার প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন মিলিত হয়ে সাত মাসে বৌমা ললিতার সাধ ভক্ষণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
◆ শশীকান্ত আইনের ব্যবসা রম রমরমিয়ে চলতে শুরু করে। আইনের লোক হওয়ার কারণে আবার বিশেষ সুযোগ এসে যায়। ঋণের দায়ে এক মালিক তার একটি লাভজনক ব্যবসার প্রতিষ্ঠান জলের দামে শশীকান্ত বাবুর কাছে বিক্রি করে দেয়।
প্রকৃতির নিয়মে চারদিকে ফুলে ফলে ভরে উঠেছে। গাছে গাছে পাখির কলরব আর মৃদু মৃদু হাওয়ায় ঋতুরাজ জানিয়ে দিচ্ছে বসন্তের আগমনের বার্তা।
◆ এক বসন্তের আগমনের প্রাক্কালে প্রকৃতির নিয়মে দশ মাস দশ দিন পরে ললিতা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।
◆ শশীকান্তের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব বলেন, প্রথম কন্যা সন্তান হওয়া মানেই সৌভাগ্যের লক্ষণ আর সেই লক্ষণগুলো জন্মের আগে থেকেই শুরু হয়েছে।
◆ শৈলেন মহাশয়ের প্রথম নাতনি পৃথিবীতে আবির্ভাবের পূর্বে শুভ লক্ষণ অনুসারে হঠাৎ বহু কিছুর প্রাপ্তি ঘটে। ধনসম্পত্তি ঘরে আসার কারণে জন্মের পর ঠাকুরদাদা "সৌভাগ্যশালী সুভাষিনী" নাম রাখেন।
◆ বাড়িতে একমাত্র শিশু জন্ম নেওয়ার কারণে বিশেষ আদরের সাথে প্রতিপালিত হতে থাকে। বাড়িতে বৌমা আসার পর বয়স্ক শৈলেন মহাশয় সংসার জীবন থেকে অবসর নেন। আর নাতনি জন্মগ্রহণ করার পর সারাক্ষণ তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন আর বলেন শশীকান্ত তোর মা এসেছে। সুভাষিনী তার ঠাকুরদার সাথে হাত-পা নাড়িয়ে মনের আনন্দে খেলা করতে থাকে। ঠাকুরদা শৈলেন মহাশয় যেন নাতনি সুভাষিনী গত প্রাণ হয়ে উঠেছে। চোখের আড়াল করতে চাই না।
◆ সংসারের সুখের মাঝেও আবার দুঃখের বাসা বাঁধে নাতনি সুভাষিনীর রুগ্ন শরীর নিয়ে। পরিবারের তিনজন সদস্য ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ললিতা সংসারের কাজকর্ম ফেলে সবসময় মেয়ে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অবশ্যই বাড়ির কাজের সহযোগিতার জন্য মাসিক বেতনভুক্ত দুজন মহিলা রাখা আছে। একজন বাজার করা, বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদে কয়েকজন পুরুষ ও মহিলাদের কে নিয়োগ করা হয়েছে।
◆ সুভাষিনী একদিন ভালো থাকে তো দুদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। শৈলেন মহাশয় তার নাতনীর জন্য কলকাতা শহরের বড় বড় ডাক্তারদের চিকিৎসার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। নাতনির চিকিৎসার আশা অনুরূপ ফল লাভ হয় না। মনের দুঃখ কষ্ট মনের মাঝে চেপে রাখে।
◆ শৈলেন মহাশয় তার নাতনির জন্মের পঞ্চম বসন্তের আগমনের প্রাক্কালে সাত দিন অসুস্থতায় ভুগে কিন্তু সংসারের সর্ব সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে কয়েক একবার সুভাষিনীর দিকে তাকিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান। বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে পড়ে।
◆ শশীকান্তের পিতার এক বছরের বাৎসরিক ক্রিয়া কর্ম শেষ করে। তার একমাস পরে সুভাষিনী কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। নিস্তব্ধ পাথরের মতো ইন্দ্রিয় শক্তি বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
কলকাতার বড় বড় ডাক্তার কবিরাজ সুভাষিনীর জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল। চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ডাক্তারের হাত বদল হতে হতে একসময় কলকাতার একজন ডাক্তার স্বর্গীয় দ্বারকা নাথ সেন মহাশয় এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। ধীরে ধীরে চিকিৎসার উন্নতি হতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনীর চিকিৎসা চলাকালীন একদিন তার মা শিব পূজা করতে করতে হঠাৎ শুয়ে পড়ে আর অজ্ঞান হয়ে যায়। শিশু মায়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ মা মা বলে ডেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে, হাত পা নেড়ে নেড়ে কান্না করতে থাকে।
মা ললিতা কিছু সময় অজ্ঞান অবস্থায় থাকার পর পুনরায় জ্ঞান ফিরে আসে। তার মেয়ের চোখের জল আচল দিয়ে মুছে আদর করতে করতে বলে, মা মনি তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে। আমার সোনা মা তোমার কিচ্ছু হয়নি। তোমার আরোগ্যের জন্য শিব ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি। মা তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে আবার সবার সাথে খেলাধুলা করে বেড়াবে।
ললিতার আকুল আবেদন হয়তো হর হর মহাদেব শুনেছেন কারণ তারপর ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
◆ দীর্ঘদিন চিকিৎসার কারণে ওষুধের প্রতিক্রিয়া অনুসারে সুভাষিনীর দেহ কান্তি মেঘহীন পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল সৌন্দর্য বৃদ্ধি হতে শুরু করে।
পরিপুষ্ট অবয়ব, উজ্জ্বল মুখশ্রী, দীর্ঘ নিবিড়, কুন্তলে শোভা ও আনন্দ উৎফুল্ল চলন ভঙ্গি দেখে কিন্তু আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশী গণ সকলেই আশ্চর্যান্বিত হয়।
যে কিশোরী পূর্বে ধীরে ও শান্ত প্রকৃতির ছিল। রোগাক্রান্ত আরোগ্য লাভের পর সে চঞ্চল স্বভাবের হয়ে ওঠে। কখনো মায়ের কাছে টাকা নিয়ে মুদিখানা দোকানের দিকে ছুটে চলে আবার ঘুড়ি কেনার জন্য বায়না করে ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করে। যে মুহূর্তে যা বায়না করবে তৎক্ষণাৎ তার সামনে হাজির করতে হবে। না হলে চিৎকার চেঁচামেচি সহ কান্নাকাটি শুরু করে বাড়িতে অশান্তি করতে থাকবে।
বাবার বৈঠক ঘরে গিয়ে কাগজপত্র উল্টোপাল্টা করে রাখবে। তার জন্য বৈঠক ঘরে সব সময় তালা দিয়ে রাখা হয়।
সুভাষিনীর শারীরিক সমস্যার কারণে তাকে সাত বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়।
◆ কিশোরী সুভাষিনী নয় বছর বয়সের সময় একদিন দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়া না করে বায়না ধরল, আমাকে বাড়িতে স্নান করার পুকুর বানিয়ে দিতে হবে আর উপর থেকে ঝরনার মত জল পড়বে। ললিতা, তার মেয়েকে কোনভাবেই সন্তুষ্ট করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে তার স্বামীকে ফোন করে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসে। তারপর অনেক বোঝানোর পর খাওয়া দাওয়া করে। পরের দিন থেকেই বাড়ির উঠানে মিনি পুকুর ও ঝর্ণার তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়।
স্নানের পুকুর তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সাঁতার শেখানোর জন্য একজন সাঁতারু মাস্টার রাখা হয়। লক্ষী সাঁতার শিখে গেলে পাড়ার ছেলেদের ডেকে নিয়ে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা জলের মধ্যে থাকবে।
◆ মামাতো ভাই পরেশ পড়াশোনার জন্য এই বাড়িতে বসবাস করে তার সাথে যেমন ভাবের সম্পর্ক আবার তেমনই আড়ি। দুজনে মারামারি হুড়োহুড়ি অশান্তি করবে আবার দুজনে গলায় গলায় মিল, কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারেনা।
-----------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। দ্বিতীয় অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
মনীষী রোর্মী রোলী বলিয়াছেন- “সাধারণত যারা সচ্চরিত্র পুরুষ অথবা স্ত্রীলোক বলিয়া জগতে পরিচিত, তাদের মনের গোপন কোণে যে সকল চিন্তা জাগে এবং তাদের দেহে যে সকল লালসা লোক চক্ষুর অন্তরালে রাজত্ব করে, তাদের শতাংশ এক অংশ যদি প্রকাশ করিয়া বলা যায় তাহা হইলে সমাজে একটা বিষম হৈ চৈ উপস্থিত হইবে ।”
বিনোদন ঘোষাল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অখন্ড বর্ধমান জেলার বনেদি নামক গ্রামে তার জন্ম হয়। তার পিতা অর্থনৈতিক সম্পন্ন না হলেও অবস্থা একদম খারাপ নয়। জমি জমা সহ ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। জমির ধানের ভাত, পুকুরের মাছ, জমির টাটকা সবজি ও গোয়ালে দুধে ভরা আর কি চাই। প্রতিবছর ধান, পাট, আলু, ডাল ও শস্য ইত্যাদি ফসল বিক্রি করে টাকা ঘরে আসে।
বাড়িতে পূজা পর্ব নিয়ে ১২ মাসে ১৩ পর্ব চলতেই থাকে। শুধু ঘোষাল বাড়িতেই নয়, পল্লীগ্রামের প্রত্যেক পরিবারে বারো মাস উৎসব লেগে থাকে । আনন্দ উল্লাস মানবতাবোধ পরের দুঃখে সামিল হওয়া নীতি ছিল। শহরের চাকচিক্য কলহ মুক্ত পরিবেশ।
বিনোদ ঘোষালের সংসারে তার পিতামাতা বয়স্ক পিসিমা ছোট ভাই ও বোন এবং কাকাতো এক ভাই এই নিয়ে ছোট্ট একটি স্বাচ্ছন্দ্য পরিবার।
বিনোদের অনেকগুলো ভাই বোনের অকাল মৃত্যু হওয়ার কারণে সব থেকে ছোট ছিল। ছোট হওয়ার কারণে সবার আদরের নীলমণি হয়ে উঠে। বিশেষ করে পিসিমার কাছে তার কোন অপরাধ কিন্তু অন্যায় বলে গণ্য হতো না।
তার পিতা মাতা সন্তানকে শাসন করতে গেলে পিসিমা দ্রুত বেগে ছুটে এসে বিনোদকে কোলে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে চলে যায়। উল্টো বিনোদ এর পিতা-মাতা কে শাসন করতে থাকে।
বিনোদের পিসিমার বয়স থেকে তার বাবা ১০ বছরের ছোট ছিল। দিদির উপর কোনদিন বিনোদের পিতা-মাতা কথা বলার সাহস পেত না।
পিসিমার প্রশ্রয় পেয়ে আবদার থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে অত্যাচার দিন দিন বেড়ে ওঠে। যা একবার বলবে সেই কাজ না করা পর্যন্ত তার স্বস্তি হতো না। পরিবারের লোকজন তেমন কোন মাথা ঘামাতো না।
বিনোদ বাল্যকাল থেকেই প্রবৃত্তির উদ্যম গতিতে বাধা না পেয়ে দুর্বার প্রবৃত্তির আকর্ষণ লাভ করে।
তার পিতা বিনোদের ছয় বছর বয়সের সময়ে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেয় এবং বাড়িতে একজন ইংরেজি জানা ব্যক্তিগত মাস্টার রেখে পড়াশোনা চলতে থাকে। লেখাপড়ায় মনোযোগী হলেও কিন্তু অন্য ১০ জন ছেলে মেয়ের মত বিনোদ দৌড়াদৌড়ি, মারামারি, জলে সাঁতার কাটা, আম বাগানে ঘুরে ঘুরে আম চুরি ও লিচু চুরি কোন কিছুই বাদ থাকেনা।
বিনোদের মনে ধারণা জন্ম নিয়েছিল, সর্বশক্তি মহি পিসিমা থাকতে তার কোন বিপদ আসবে না।
বিনোদ পরীক্ষায় ফেল করে করে ১৩ বছর বয়সের সময়ে হাই স্কুলে ভর্তি হয়। নতুন স্কুলে এসে বিভিন্ন ধরনের বন্ধুদের সাথে আলাপ ও পরিচয় হয়।
বিনোদ নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনে আনন্দ অনুভব করে আর মুক্ত পাখির মতো উড়ে উড়ে বিচরণ করতে থাকে। গ্রামের কপাটি খেলা বাদ দিয়ে ক্রিকেট ফুটবল সহ প্রভৃতি খেলায় মেতে ওঠে। গ্রামের পাঠশালার সামান্য কয়েকটি সময় বয়স্ক খেলার সাথীর পরিবর্তে অসংখ্য খেলার সাথী সহ নানা প্রকার পরিবর্তন কিশোর প্রাণে একটা আনন্দের চাঞ্চল্য নিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরে থেকে ঘোরাঘুরি ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং খেলাধুলা করে তারপর বাড়িতে আসে।
বিনোদের বাবা একজন গোড়া হিন্দু ছিলেন, তিনি দোকানের খাবার-খাওয়ার ঘোর বিরোধী করতেন।
বিনোদের বাবা বাড়িতে নিষেধাজ্ঞা জারি বলেন :-
বিনোদের স্কুলের দুপুরের খাবার বাড়ি থেকে তৈরি করে দিতে হবে। স্কুলে গিয়ে দোকানের কোন খাবার খাওয়া একদম চলবে না। মুনি ঋষি গণ বলেছেন, নারিকেল আর মুড়ি খেতে। শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী।
বিনোদ তার বাবার কথা শুনে ভাবে, শহরের লোকেরা নারকেল মুড়ি গ্রামের চাষাদের খাবার মনে করে। আভিজাত্য সম্পন্ন বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করতে হয়। মুড়ি নারকেল খাওয়া দেখলে আমাকে ব্যঙ্গ করতে থাকবে। বাড়ি থেকে যা বানিয়ে দেয় তা নিয়ে যাবো, কিন্তু দরকার হলে পথে ভিখারিদের বা কুকুর কে দিয়ে দেবো।
বিনোদ তার পিসিমা ও মায়ের কাছে কান্নাকাটি করে ঠিক টাকা আদায় করে নেয়। বাজারে গিয়ে সিঙাড়া, নিমকি, কচুরি, রসগোল্লা টিফিনের সময় কিনে মনের আনন্দে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া-দাওয়া করে।
নারায়ন নামের এক ছাত্র মাতৃহীন হয়ে ছোট বেলা থেকেই মামা বাড়িতে আদরের ভাগ্নে হয়ে বসবাস করে। বিনোদের সাথে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বাবা কলকাতার মধ্যে একজন বড় অবস্থাপন্ন ব্যক্তি। তার পোষাক আষাক চালচলন সবই আধুনিক ও সব সময় আভিজাত্য বজায় রেখে চলে। নতুন নতুন কৌশল দিয়ে সবাইকে চমকিয়ে দেয়। অন্যান্য ছেলেরা নারায়ণের নকল করার চেষ্টা করতো। আবার গ্রামের ছেলেরা নারায়নকে খুব আপ্যায়ন করে আলাপ পরিচয়ের মাধ্যমে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দারুন ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা করতে পারে তার জন্যই তার ভক্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি হয়ে চলেছে। বন্ধুদের জন্য প্রচুর টাকা খরচ করে।
বিনোদ সরাসরি নারায়ণের সাথে কথা না হলেও কিন্তু দূর থেকে নারায়ণকে সবসময় অনুসরণ করে চলে। তার চলার ভঙ্গি কথা বলা ফুটবল ক্রিকেট খেলার বিভিন্ন কৌশল গুলো লক্ষ্য করে নিজে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিনোদের ধনী বন্ধুর মতো আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য কোন অসুবিধা ছিল না কারণ তার বাবা ও পিসিমা সব সময় লক্ষ্য রাখেন। যখন যা চাই তাই তাদের কাছ থেকে পেয়ে যায়। কিন্তু তার কিছু গরিব বন্ধু বাবা মায়ের পকেট কেটে তাদের আভিজাত্য পোশাক আশাক খাওয়া দাওয়া নতুন নতুন কৌশল বজায় রাখার চেষ্টা করে।
একদিন স্কুল চলাকালীন সময়ে বিনোদ খেলাধুলা না করে মাঠের এক প্রান্তে বসে লাল নীল সবুজ বিভিন্ন কাগজ কেটে কেটে লতা ও ফুল তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণ পরের দিন উক্ত স্কুলের প্রাঙ্গণে শিক্ষা দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শন করতে আসবে। তার জন্য স্কুল গৃহ সজ্জিত করার দায়িত্ব কয়েকটি ছাত্র-ছাত্রীদের উপর পড়েছে। বিনোদের লতা ও ফুল তৈরি করা অভিজ্ঞতা থাকার কারণে কয়েকটি ছেলেকে সাথে নিয়ে মাঠে বসে।
সহপাঠী নারায়ণের সাথে এখনো বিনোদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। নারায়ণ দূর থেকে বিনোদের কাজকর্ম লক্ষ্য করছিল তারপর দুজনের চোখে চোখে চোখ পড়ে যায়।
নারায়ন দ্রুত পায়ে বিনোদের কাছে এসে ঘাসের মধ্যে বসে পড়ে। বিনোদ তাকে অভিনন্দন জানাই।
নারায়ণ একটি কাগজের ফুল নাড়াচাড়া করতে করতে বলে :- ফুলটা তো খুব সুন্দর কিন্তু কে বানিয়েছে।
বিনোদ বলে :- আমি বানিয়েছি।
নারায়ন বলে :- তোমার বাড়ি কোথায় নাম কি?
বিনোদ তার নাম থেকে বাবার নাম, গ্রামের নাম , কোন শ্রেণী পড়াশোনা ও বাড়িতে কে কে আছে সবকিছু একে একে বলা শুরু করে।
নারায়ন বলে :- আমাকে ফুল বানানো শিখিয়ে দেবে।
বিনোদ বলে :- কয়েকবার চেষ্টা করলেই কিন্তু শিখে যাবে।
নারায়ণ কয়েকবার চেষ্টা করেও ফুল তৈরি করতে পারে না। বিনোদ হাসতে শুরু করে।
নারায়ন বলে :- তোমার অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু আমার তো নেই, তাই একটু সময় লাগবে।
বিনোদ হাতে কাগজ নিয়ে ভাজ করে করে কয়েক বার নারায়ন কে দেখিয়ে দেখিয়ে ফুল বানানো শিখিয়ে দেয়। তারপর বলে চেষ্টা করলে সব কিছু করা সম্ভব।
নারায়ণ বলে :- ঠিক আছে বন্ধু। পরে এক সময় নিরিবিলি কথাবার্তা হবে। এখন আমি কাজে ব্যস্ত আবার তুমি কাজে ব্যস্ত।
এরপর থেকেই নারায়ণের সাথে বিনোদের গভীর বন্ধুত্ব স্থাপন হয়ে পড়ে। স্কুল ছুটির পর গল্প করতে করতে নারায়ন তার বন্ধু বিনোদকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যেত।
বিনোদের কিশোর কাল চেহারাটা খুব সুন্দর গৌরবর্ণ দেহ তার, সামান্য পরিশ্রম বা রোদে গেলেই তার মুখখানা লাল হয়ে উঠে আর হাসি দিলে তার গাল দুটি টোল খেয়ে যায়। মহিলা মহলে বলাবলি করে বিনোদ প্রেমিক আছে। তার হাসিতে সবাই পাগল হয়ে যায়।
------------------------------------------------
-----------------------------------------------------------------
।। তৃতীয় অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী প্রতিদিন বিকেলে বাইরে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি হতে থাকে। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার জন্য জেদ করতে থাকে। আর বাধ্য হয়ে তার মায়ের সাথে, কখনো বাবার সাথে আবার কখনো পরেশের সাথে করে বেরিয়ে পড়তো। আলিপুর চিড়িয়াখানা, চৌরঙ্গী জাদুঘর, হাবড়ার পুল, পরেশনাথ বাগান, কালীঘাট মন্দির সহ কলকাতা ও তার আশপাশের জায়গাগুলো বালিকা বয়সে ঘুরেছে।
◆ সুভাষিনী পুতুল খেলা অপেক্ষা পাখি লালন পালন করা ভীষণভাবে পছন্দ করে।
◆ একদিন তার বাবার কাছে গিয়ে বলে : আমার জন্য বিভিন্ন রকম পাখি এনে দিতে হবে।
◆ বাবা শশীকান্ত উপায় আন্ত না পেয়ে লোক মারফত বাজার থেকে পায়রা, ময়না, টিয়া পাখি, কাকাতুয়া, হীরামন ও শালিক সহ নানা ধরনের পাখি সংগ্রহ করে দিয়ে মেয়ে কে সন্তুষ্ট করে।
মেয়ে কে খুশি রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের পাখি সংগ্রহ করতে করতে একদিন বড় একটি সংগ্রহশালা রূপান্তরিত হয়। পাখিদের জন্য ঘর বানানো হয়েছে। খাদ্য দেওয়ার ও দেখাশোনা করার জন্য তার বাবা একজন কর্মচারী নিয়োগ করেছে।
◆ সুভাষিনী ছোট্টবেলায় ভীষণ সাহসী ও দূরান্ত থাকলেও কিন্তু কুকুর আর বিড়াল দেখলে ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি আর কান্নাকাটি করতে থাকে।
তার জন্য বাড়িতে কুকুর ও বিড়াল ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুকুরের আটকানো গেলেও কিন্তু বিড়াল কে কিন্তু আটকানো যায় না। আর এই বিড়াল নিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
◆ সুভাষিনীর মা ললিতা দেবী হঠাৎ করে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এক বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে হাসপাতালের বিছানায় মেয়ের হাতের জল পান করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
চঞ্চল কিশোরী সুভাষিনীর মায়ের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়ে। হাত পা ছুড়ে কান্না করতে করতে বারবার মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকে।
শ্মশান যাত্রার জন্য সবাই যখন নিতে যাবে, এমন সময় সুভাষিনী গিয়ে বাধা সৃষ্টি করে বলে, আমার মাকে কোথাও নিয়ে যেতে দেব না। মা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।
◆ ললিতার মৃত্যুর পরে তার একটি বড় ছবি শশীকান্ত মহাশয় ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়। উন্নত মানের আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত ছবিটি কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বানিয়ে নিয়ে আসে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বেশিরভাগ সময়ই তার মেয়ের সাথে সঙ্গ দিতে থাকে। মায়ের শোক তাপ ভুলে সুভাষিনী নিয়মিত ভাবেই বাড়িতে পড়াশোনা ও স্কুলে যাওয়ার মনোযোগী হয়। গান বাজনা আট বছর বয়স থেকেই চর্চা শুরু করে। পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে বহুবার গান করেছে।
◆ সুভাষিনী তার বাবার সঙ্গে কয়েকবার যাত্রা, থিয়েটার ও সিনেমা দেখতে যায়।
থিয়েটারের অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সঙ্গীত ও অভিনয় দেখে সুভাষিনীর অতিশয় মুগ্ধ হয়ে যায়।
সুভাষিনীর জীবনে প্রথম নাটকে অভিনয় দেখে "দেবী চৌধুরী রানী" ও "আলিবাবা"।
শ্রুতিধর সুভাষিনী দেবী চৌধুরানী গান ‘বীণা - বাজে না কেন’ এবং আলিবাবার ‘ছি ছি এত্তা জঞ্জাল’
এই দুটি গান মুখস্ত করে বাড়িতে এসে নিজেই কন্ঠে গাইতে শুরু করে। তার পিতা কে এই গানগুলো অনেকবার শুনিয়েছে।
প্রতি রবিবার সুভাষিনীর সিনেমা দেখার নেশায় পরিণত হয়েছে। কখনো পরেশের সাথে আবার কখনো তার বাবার সাথে দেখতে যায়।
◆ সুভাষিনী একদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে মায়ের মৃত্যুর পর বাবা প্রতিদিন মায়ের ছবিতে ফুলের মালা দিতো কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই আর কেউ মায়ের ছবিতে মালা দেয় না।
◆ বাবা শশীকান্ত তার মেয়েকে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করতে করতে বলেন :- দুষ্টু মেয়ে, বড় হয়েছিস এখন ছুরি চাকু নিয়ে খেলা করা তোর কোনরকম মানায় না। ছুরি চাকু নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে ডান হাতে বড় ক্ষত বানিয়েছিস। এই ক্ষতচিহ্ন তোকে সারা জীবন বহন করে বেড়াতে হবে। আমার একটি অনুরোধ রাখ মা এসব নিয়ে আর খেলা করিস না।
সুভাষিনী তার বাবার কথা মতো ছুরি চাকু নিয়ে খেলা করা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির মাস্টারের কাছে নিয়মিত পড়াশুনোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে শুরু করে।
◆ গৃহ শিক্ষক তপন মহাশয় একদিন পড়ার বইয়ের কথা প্রসঙ্গে সুভাষিনীর বলেন :- বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের বই না পড়লে কিন্তু সাহিত্যের রস ও সৌন্দর্য অনুভব করা যায় না।
শশীকান্ত মহাশয়ের বংশ পরম্পরায় একটি পুরনো লাইব্রেরী এই বাড়ির মধ্যে আছে। তাতে বড় বড় তিনটি আলমারির তাকে কয়েক হাজার বই সাজানো আছে।
গৃহশিক্ষক তপন মহাশয় পড়ানো শেষ করে আলমারি থেকে বঙ্কিম রচনাবলী তাক থেকে বের করে সুভাষিনীর হাতে দেয়।
মনের আনন্দে রচনাবলী পড়তে শুরু করে।
সুভাষিনীর কে দেখাশোনা করার জন্য শশীকান্ত মহাশয়ের বিধবা বড় দিদি উপস্থিত হয়। সুভাষিনীর কোন কিছুর অসুবিধা না ঘটে, তার জন্য পিসিমা সর্বদা দৃষ্টি রেখে চলেন।
একদিন দুই ভাই বোনের মধ্যে বিশেষ আলোচনা চলছে আর সুভাষিনী আড়াল থেকে তাদের কথাবার্তা শুনছে।
◆ শশীকান্তের বড়দি মিনাক্ষী বলেন :- ভাই; ললিতার মৃত্যুর এক বছরের বেশি হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আর দেরি করা কখনোই ঠিক হবে না। তোর তো শাস্ত্র জ্ঞান আছে। তোর মেয়ে তো আর বংশ রক্ষা করতে, পিতৃ কুলের জল দান ও পিণ্ডদান কিছুই করতে পারবে না। বংশ রক্ষার জন্য আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে পুরুষ সন্তানের জন্ম দিতে হবে।
◆ একদিন সুভাষিনী তার বাবাকে বলে :- আমাদের গাড়ি থাকতে স্কুলের গাড়িতে কেন যাব?
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- গাড়িতে করে আমাকে প্রায়ই এখন বাইরে যেতে হয় সুতরাং ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছিয়ে দিতে বা স্কুল থেকে নিয়ে আসা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদর করে বলে তুমি একটু কষ্ট করে যাতায়াত করো মা।
◆সুভাষিনীর পিসিমা মিনাক্ষী উকিল বাড়িতে আসার পর থেকে সুভাষিনী তার সাথে শয়ন করে।
আরো কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন রাতে পিসিমার ঘরে শোয়ার জন্য উপস্থিত হয়।
◆পিসিমা মিনাক্ষী বলেন :- সুভাষিনী; তোমার জন্য দোতালায় একটি ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, পালঙ্কে বিছানা ও টেবিল দিয়ে রাখা হয়েছে। আজ থেকে তুমি ওই দোতলার ঘরে থাকবে। তুমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। আর সেই জন্যই তোমার ব্যক্তিগত রুমের প্রয়োজন আছে। আর নিচের তলায় পড়াশোনা করার রুম।
◆সুভাষিনী পিসিমা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- আমার জন্য তোমার অনেক ভাবনা, তোমার কাছে কিন্তু অনেক ভালো ছিলাম। একা একা থাকতে হবে, না পিসি আমি তোমার কাছেই থাকবো।
◆পিসিমা মিনাক্ষী বলেন :- বাবা যখন ব্যবস্থা করেছে, তখন কিন্তু তোমাকে দোতলার রুমে থাকতে হবে। চল, আমি সাথে যাচ্ছি।
◆সুভাষিনী ভাবে, আমি অনুভব করেছি, পিসিমা আসার পর বাবা কিন্তু ধীরে ধীরে আমার থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করে চলেছে।
আগের মতো আদর করে না আবার প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতে চাই না। কিছু বলতে গেলে ধৈর্য হারা হয়ে কাজের অজুহাত দেখিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। আমি তো বাবার মেয়ে কিন্তু মা জীবিত নেই বলে কি মেয়ের কোন অস্তিত্ব থাকবে না।
সুধু কি খাওয়া পড়া দিয়ে আশ্রিত ভাব নিয়ে বাবার কর্তব্য শেষ করতে চাই।
◆ একদিন দুপুর বেলা শশীকান্ত মহাশয় এক চাকরকে বলে, আমার ঘর থেকে সুভাষিনীর মায়ের ছবি নিয়ে সুভাষিনীর পড়ার ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে দেবে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, মায়ের ছবি এখন বাবার কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে তার কারণেই তার মেয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে।
হঠাৎ রবিবারের দুপুর বেলায় আমার পড়াশোনা ও থাকার রুমের জন্য দুটি বই রাখার আলমারি ও একখানা বড় মেহগনি কাঠের সুন্দর টেবিল সহ মেঝেতে সুন্দর কার্পেট পেতে দেয়। বাড়ির ভিতরে বাইরে রংচং করে ঝকঝকে করে তোলা হচ্ছে।
◆ ঘরের পুরনো বিদ্যুৎ চালিত পাখা রং করা হলো। আর চার খানা সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ ছবির সঙ্গে মায়ের ছবিখানা পড়াশোনার ঘরে শোভা পেয়েছে।
◆ গৃহ শিক্ষক মহাশয় পরের দিন পড়ার ঘরে ঢুকে সাজসজ্জা দেখে অতিশয় মুগ্ধ হয়ে বলেন তোমার বাবার সত্যিই রুচিবোধ আছে। কিন্তু হঠাৎ করে এত কিছু করার পিছনে নিশ্চয়ই কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।
◆ সুভাষিনী সরল সোজা ভাবে বলে :- অতসব আমি জানিনা। তবে এটা অনুভব করেছি নতুন কিছু ঘটনা ঘটতে চলেছে।
সুভাষিনীর স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস পড়া থেকে শুরু করে সিনেমা দেখে আমোদ প্রমোদে নিমগ্ন হয়ে পড়ে।
-------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। চতুর্থ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
নারায়ন বিভিন্ন জায়গার ভ্রমণের গল্প সহ কলকাতায় তাদের বাড়ির সৌন্দর্য এবং কলকাতার বিভিন্ন জায়গার দর্শনের মহিমা বলে বিনোদকে আকর্ষণ করে। নারায়ণের কাছ থেকে দামি দামি উপহার পেয়ে বিনোদ আনন্দে আত্মহারা হয়ে অন্তরের বন্ধু ভাবতে শুরু করে। স্কুল ছুটির পর দুই বন্ধু মিলে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। নারায়ণের টাকায় দামি দামি খাবার থেকে শুরু করে মনের ইচ্ছা মত আনন্দ ফুর্তি করতে থাকে।
একদিন ইস্কুল ছুটির পর নারায়ণ তার বন্ধু বিনোদকে সাথে করে তার মামাবাড়ির আম বাগানে বেড়াতে যায়। পুরনো দিনের জমিদার বাড়ির বাগানের মধ্যের সৌন্দর্য অনুভব করে বিনোদ আনন্দিত হয়ে ওঠে।
বিনোদ বলে :- বাগানের মধ্যে জমিদারির আভিজাত্য এখনো অনেক কিছু নিদর্শন রয়েছে। শান বাঁধানো পুকুর পাথরের হেলান দেওয়া বেঞ্চ এছাড়াও বিভিন্ন গাছের গোড়ায় পাকা করে বেদি দেওয়া।
নারায়ণ একটি বেঞ্চে বসে বলে :- বন্ধু; এখানে বসে একটু বিশ্রাম নেয়া যাক তারপর দুই বন্ধু বাজার থেকে নিয়ে আসা খাবারগুলো খেতে থাকে।
নারায়ণ বলে :- বিনোদ; তোকে দেখতে তো একদম মহিলাদের মত। তুই মহিলা হলে কিন্তু তাহলে দারুন আনন্দ ফুর্তি করা যেত বলে বিনোদকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করে।
এরপর দুই বন্ধুর মধ্যে সকাম হোমো সেক্স শুরু হয়ে যায়।
একদিন রুমের মধ্যে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে নারায়ণ বলে :- বর্তমান যুগের মোবাইলের মাধ্যমে যৌন মিলন দেখে দেখে ছেলে মেয়েগুলো তাড়াতাড়ি যৌন উত্তেজনায় ভুগতে শুরু করেছে। স্কুলের মেয়েগুলো আমার জন্য পাগল কেন! বুঝতে পারছিস তো।
তাদের জন্য আমি টাকা খরচ করি, তার বিনিময়ে ওরা আমাকে দৈহিক মিলনে সুখ দিয়ে থাকে।
বিনোদ বলে :- তুই একাই কি নারীদের ভোগ করে যাবি, এই বন্ধুর জন্য দুই একটা ছেড়ে দে।
নারায়ণ বলে :- ঠিক আছে, তুই যখন আমার বন্ধু, তখন তোকে তো ভাগ দিতেই হবে।
বিনোদ বলে :- বালিকা বিদ্যালয় এর একজন মাস্টার কিন্তু ছাত্রীর সাথে লটরপটর করে চলেছে। আমরা ইয়ং ছেলে করলে দোষ কোথায়।
বিনোদ মেধাবী ছাত্র হিসাবে প্রতি বছরই প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তার সুনাম স্কুলে বজায় রেখেছে। প্রতিবছর স্কুল থেকে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী নিয়ে পিতা-মাতা ও পিসি মাকে সন্তুষ্ট করে।
দিন দিন বিনোদের বিলাসিতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নিত্য নতুন জামা কাপড় জুতা প্রসাধনী বায়না নিত্যদিন হতে থাকে। পিসিমা বিনোদের আবদার মেটাতে গিয়ে তার সঞ্চিত টাকা এক সময় শেষ হয়ে যায়। পিসিমা তার ভাইয়ের কাছে গিয়ে বিনোদের বাইনার কথাগুলো বলে।
বিনোদের বাবা চাপা স্বভাবের মানুষ হলেও তার দুঃখ কষ্ট কোনদিনই কাউকে বুঝতে দেয় না। ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিনোদের আবদারের মেটানোর জন্য পিসিমার হাত দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দেয়।
বিনোদের চাহিদার শেষ নেই তার বাবা বিরক্ত হয়ে মাঝেমধ্যেই তার বোনের সাথে ঝগড়া অশান্তি করে।
বিনোদের বাবা তার বোনকে বলে :- তোর প্রশ্রয় পেয়ে ছেলেটা একদম গোল্লায় যাচ্ছে। দিন দিন বিলাসিতা এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যা মেটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
পিসিমা, ঝাঁজালো গলায় তখন বলে :- পাঁচটা নয় দশটা নয়, একটাই মাত্র ছেলে তার জন্য আমাদের খরচ করতে হবে। পড়াশুনায় যদি খারাপই হবে তাহলে প্রতি বছর ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে কি করে?
প্রতিবছর খেলাধুলো ও স্কুল থেকে প্রচুর উপহার সামগ্রী নিয়ে এসে ঘর ভর্তি করে কিন্তু আমাদের পরিবারের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। বিনোদের মতো একটা ছেলে পাড়ার মধ্যে দেখাতে পারবি। স্কুলের ১০ জন ছেলেরা ভালো জামা কাপড় পড়ে থাকবে আর আমার বিনোদ গ্রাম্য ভাবে চলাফেরা করে মাথা নত করে থাকবে। ওরতো আর কোন ভাই বোন নেই একা ভালো-মন্দ খাবে পড়বে তা কি এই সংসারের মানুষদের সহ্য হচ্ছে না। তোর যদি অসুবিধা হয় তাহলে আমার জমি গুলো বিক্রি করে আমি বিনোদকে দেবো।
বিনোদের বাবা বলে :- দিদি; তোমার যা ইচ্ছা তাই করে। যদি কখনো বিপথগামী হয়ে পড়ে তাহলে কিন্তু আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না।
বিনোদ তার বন্ধু নারায়ণের সাথে বিড়ি সিগারেট থেকে মদ পান করা শুরু করে।
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিনোদকে নিয়ে নারায়ন তার কলকাতার বাড়িতে যায়।
রাতে মদের আসরে দুই বন্ধুর মধ্যে কথা চলতে থাকে।
বিনোদ বলে :- তোদের বাড়ির কাজের মেয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি কিভাবে হয়েছিল।
নারায়ণ বলে :- পাড়ার ক্লাবে খেলতে গিয়ে পায়ে এবং হাতে আঘাত লাগে। বাড়িতে আসার পর জানতে পারলাম বাবা তার বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়েছে। আসতে অনেক রাত হতে পারে।
বাড়ির কাজের মেয়ে সমবয়সী ঝর্নাকে বললাম আমার হাতে পায়ে একটু মালিশ করে দেবে। খেলা করতে গিয়ে ভীষণ ব্যথা পেয়েছি। বলে আমি হাফপ্যান্ট পড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। আমার পায়ে ঔষধ মালিশ করে তারপর ডান হাত মালিশ করতে করতে ব্যথা জায়গায় হাত লাগার কারণে মা বলে হাত টান দিতেই ঝরনার বুকে হাত লেগে যায়।
ঝরনা বলে :- দাদাবাবু কি করলেন?
আমি বললাম , ভ্রমর মধু আহরণ করার জন্য গুনগুন করছে তুমি কি তা বোঝনা।
ঝর্ণা বলে :- তা সম্ভব নয়।
আমি তখন ঝর্ণাকে দুই হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরি। আর আমার শরীরের মধ্যে কাম উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে পড়ি। কিছু সময় ধরে কথাবার্তা বলার পর টাকা লোভ দেখিয়ে তার সাথে মিলিত হই।
বিনোদ বলে :- বাহ; রোমান্টিক প্রেম।
নারান বলে :- তোর কথা বল।
দরজায় খটখট আওয়াজ করে ঝরনা বলে :- দাদাবাবু আপনার খাবার এখানে দিয়ে যাবো।
নারান বলে :- বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঝর্ণা বলে :- কাকাবাবু অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
নারায়ণ দরজা কাছে যেতে যেতে বলে :- বিনোদ প্যাক করে খেতে থাক আমি একটু আসছি। বলে দরজা খুলে ঝর্নার সাথে হাটতে শুরু করে।
বিনোদ একটি প্যাক বানিয়ে পান করতে করতে ভাবে, বন্ধু এখন আবার ঝর্ণার সাথে খেলা করতে গেল।
আমার জীবনে বাড়ির কাজের বয়স্ক বিধবা মহিলা ময়নামতির কাছ থেকে ভালোবাসার প্রস্তাব এসেছিল। একপ্রকার আমাকে জোর করেই তার দেহ সঙ্গী করেছিল। আমার একদম ইচ্ছা ছিল না তা কিন্তু নয়। বাবা-মার এবং সমাজের ভয় পাচ্ছিলাম। আমাকে যখন জড়িয়ে ধরেছিল ময়নার স্পর্শে আমার শরীরে বিদ্যুতের মত তরঙ্গ দিয়ে কাম উত্তেজনা বেড়ে উঠেছিল। তারপর আমার ইচ্ছামতো তার সাথে চাহিদা মেটাতে থাকি।
ঝরনা ও নারান মিনিট চল্লিশ পরে খাবার নিয়ে বিনোদের কাছে আসে।
নারায়ণ বলে :- বন্ধু একটু ফুর্তি করে এলাম।
ঝরনা দুই বন্ধুর খাবার পরিবেশন করতে করতে বলে :- দাদাবাবু; আপনার মুখে কিছুই আটকায় না। আপনার বন্ধু বিনোদ বাবুর কি অবস্থা হচ্ছে! কামের উত্তেজনায় চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
নারান মদের নেশায় বলে :- তাহলে যাও, তোমার শরীরের গরম জল পান করিয়ে দাও।
নারায়ণ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নেশায় টলতে টলতে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ঝরনা ধীরে ধীরে বিনোদের কাছে এসে বলে :- আপনার সাথে আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে। দয়া করে পাশের রুমে যাবেন।
বিনোদ ঝর্ণার কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে থাকে।
ঝরনা সকালে চা নিয়ে এসে বিনোদকে একলা ঘরে পেয়ে বলে :- তুমি আমাকে ভীষণ খুশি করেছো।
তোমার বন্ধুর এখনই এই অবস্থা কিন্তু বিয়ে করলে বউ তো অন্য পর পুরুষের সাথে পালিয়ে যাবে।
বিনোদ হাসতে হাসতে বলে :- বন্ধুর বয়স অনুসারে বেশি দেহের শক্তি অপচয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছে, তার জন্য চিকিৎসা করতে হবে।
ঝরনা বলে :- নিয়মিত মদ পান করলে তার যৌন শক্তি কমতে শুরু করে।
বিনোদ বলে :- তুমি জন্মনিয়ন্ত্রণ কোন পদ্ধতি ব্যবহার করো।
ঝরনা বলে :- জানি; নারায়ণ বাবু কখনোই আমাকে বিয়ে করবে না, দেহ মিলনের মাধ্যমে শুধু টাকা ও উপহার সামগ্রী পাবো। নারান বাবু তো আমাকে কখনো সুখ দিতে পারেনা। আমার যখন যৌবনের জ্বালা শুরু হয়, সেই মুহূর্তে নারান বাবুর সব শেষ। উভয়ের নিরাপত্তার জন্য ৭২ ঘন্টা ঔষধ ব্যবহার করি।
বিনোদ বলে :- তুমি সত্যিই বুদ্ধিমান।
নারায়ণ ঘরে ঢুকে ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে :- সকালের জলখাবার তৈরি হয়েছে, আমরা এখন বেরোবো।
ঝরনা বলে :- কিছু সময় অপেক্ষা করুন খাবার নিয়ে আসছি।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। পঞ্চম অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ উকিল বাড়িতে বসন্তের প্রভাতে গৃহদ্বারে নহবত সুমধুর বিয়ের সানাই বেজে উঠে। আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশী আনন্দে উল্লাসে মত্ত হয়ে পড়ে।
পিসিমা এখন উকিল বাড়ির সর্বময় কর্তা হয়ে বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করে তিনি ভীষণ ভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। শশীকান্ত মহাশয় নব বরের বেশে সজ্জিত ও বাড়ির উঠানে পুষ্পপত্রে শোভিত চতুর্দ্দোল আসিয়াছে।
সন্ধ্যায় শোভাযাত্রার আলোকমালা জ্বলিয়া উঠিল।
সুভাষিনী তার বাবার বিয়ের উৎসবে মাতিয়ে উঠে।
পড়ার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুভাষিনী তার মায়ের ছবির দিকে চোখ পড়ে। মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তার চোখে জল ঝরতে থাকে।
◆ তার মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়িয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তরে ভাবে, মা বলছে বাবার বিয়ে দেখতে তোর লজ্জা করে না।
তারপর কিছু সময় ভেবে নিয়ে বাবার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদান না করে নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে চোখের জলে বালিশ ভিজাতে থাকে। বাড়িতে যে একটি মেয়ে আছে কিন্তু সারারাত কেউ আর খোঁজ খবর নেয় না।
◆ পরের দিন সকাল বেলা বিমাতা বিমলা দেবী ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে বসে সুভাষিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন :- লক্ষ্মী; মামনি ওঠো। অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে।
◆ সুভাষিনী অর্থাৎ আদরের ডাকনাম লক্ষ্মী ঘুম ঘুম চোখে অলসতা ত্যাগ করে তাকাতেই বিমাতা কে দেখে মুখ কালো করে অন্তরে রাগান্বিত হয়ে বলে :- তুমি; আমার মায়ের জায়গা নিতে এসেছো।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী হাসি হাসি মুখে মাতৃস্নেহে আদর করতে করতে বলেন :- মামণি; তোমার সম্পর্কে তোমার বাবা সবকিছুই আমাকে বলেছেন। জানি তুমি আমার উপর রেগে আছো। রাগ হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি তোমার থেকে ছোট হলেও কিন্তু সামাজিক নিয়ম অনুসারে আমি তোমার মা কিন্তু আমি তোমার থেকে তিন বছরের বড় অর্থাৎ উনিশ বছর বয়স ।
◆ সুভাষিনী বলে :- আমি; তোমাকে কখনোই মা বলবো না।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী বলেন :- মামনি, রাগ করোনা। তুমি আমাকে মা বলে মেনে না নিলেও কিন্তু আমি তোমাকে আমার মেয়ে হিসাবে মেনে নিয়েছি। চলো তোমার বাবা তোমার জন্য জলখাবার নিয়ে খাবারের টেবিলে বসে আছেন।
সুভাষিনী বিছানা থেকে লম্প ঝম্প দিয়ে মেঝের উপর তারপর দ্রুত গতিতে ঘরের বাইরে চলে যায়।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী বলেন :- এই বয়সে ছেলে মেয়েরা একটু দুষ্টুমি করবেই কিন্তু মা হয়ে অবশ্যই মেনে নিতে হবে। আমি সৎ মা হলেও একজন নারী তো।
বৌভাতের অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার পরও তিন দিন বাড়িতে উৎসবের মেজাজ চলতে থাকে। আত্মীয়-স্বজন এক এক করে বিদায় নিতে থাকে।
◆ বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার একমাস পর সন্ধ্যার চা চক্রের জন্য হলঘরে সবাই উপস্থিত হয়।
◆ পিসিমা মিনাক্ষী একদিন নববধূ বিমলা কে কাছে ডেকে বলেন :- বিমলা; সংসারের সবকিছু দায়িত্বভার তুমি বুঝে নাও। আর আমাকে আমার ছেলে ও বৌমার সংসারে ফিরে যেতে দাও।
◆ বিমলা দেবী বলেন :- বড়দি; আপনি এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?
◆ শশীকান্ত বলে :- বড়দি; বিমলা এখনো ছেলে মানুষ আর সংসারে কিছুই বোঝেনা, আরো কিছুদিন থেকে সংসারকে ভালোভাবে ওকে বুঝিয়ে দিয়ে তারপর যাবে।
◆ বিমলা দেবী বলেন :- ঠিকই তো, আপনি অভিভাবক হয়ে মাথার উপর থেকে সবকিছু আমাকে শেখাবেন।
◆ শশীকান্ত বলে :- বড়দি; লক্ষ্মীর কথা একবার চিন্তা করো, সে তোমাকে ছাড়া থাকবে কি করে! আরো কিছুদিন থেকে লক্ষ্মী কে ভালো করে বোঝাও। এত দুরন্ত হয়েছে কারোরই কোন কথা শুনতে চাই না কিন্তু একমাত্র তোমার কথা শুনে চলে।
◆ হঠাৎ সুভাষিনী ছুটে এসে পিসিমা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- তোমার যাওয়া হবে না। তুমি চলে গেলে বিমাতা যদি আমার উপর অত্যাচার করে।
◆ কথাগুলো শোনার সাথে সাথে উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হয়ে সুভাষিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
◆ শশীকান্ত বলে :- এসব কি বলছিস! তা কখনো হয়।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী দ্রুত মেয়ের কাছে এসে তার হাত ধরে বলে :- মামনি; তোকে এসব কে শিখিয়েছে।
◆ সুভাষিনী হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
◆ পিসিমা মিনাক্ষী বলেন :- কে আর বলবে, ঐ গল্পের বই আর টিভি সিরিয়াল। ছেলে মেয়েদের ছোটবেলায় থেকে ভূত-পেত ও অবাস্তব গল্প কাহিনী কখনোই পড়তে দেওয়া উচিত নয়। গল্পের কাহিনী কে সত্য মনে করে মর্যাগত করে রেখেছে। সেই ভাবনাই ওর মাথার মধ্যে কাজ করছে।
◆ সুভাষিনীর কথা শুনে বিমলা মনে দুঃখ হয় কিন্তু হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলেন :- আরে পাগলি মেয়ে; ওটা তো গল্প বলা হয়েছে, কিন্তু সব মায়েরা কি খারাপ হয়। তোর উপর অত্যাচার করলে, তোর বাবা কি আমাকে ধুপ ধুনো সাজিয়ে পূজা দেবে। এই বাড়ি থেকে আমাকে একদম তাড়িয়ে দেবে। বই পড়ে পড়ে এই শিক্ষা লাভ হয়েছে।
◆ সুভাষিনী কে আদর করতে করতে পিসিমা মিনাক্ষী বলেন :- বিমলা চুপ কর। মেয়েটা দেহ গঠনে পরিপুষ্ট ও বলিষ্ঠ হওয়ার কারণে কিন্তু বিমলার থেকে বড় দেখায়। বিমলা তুমি কিন্তু সুভাষিনী কে মা বলে ডাকবে।
◆ বিমলা হাসতে হাসতে বলেন :- শাশুড়ি মা বলুন আপনার জন্য কি করতে পারি।
◆ শশীকান্ত মেয়ে কে কাছে নিয়ে আদর করে বলেন :- এইসব উদ্ভট চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। তারপর বিমলার উদ্দেশ্য বলে, মা-মেয়ের মনের দ্বন্দ্ব আশা করি মিটে গিয়েছে। রাত অনেক হয়েছে খাবারের আয়োজন করে। বলে সুভাষিনীর হাত ধরে রান্না ঘরের খাবারের টেবিলের দিকে চলতে থাকে।
◆ সুভাষিনী রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে, সৎ মা সুন্দরী, গৃহ কার্য নিপুন ও লেখাপড়া সামান্য জানে। বুদ্ধি তার ভালো আছে। আমি যেমন কথা বলেছি তাতে বিমাতার রেগে যাওয়ার স্বাভাবিক ব্যাপার।
সুভাষিনী অধিকাংশ সময় পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু সৎ মায়ের কোন কাজেই বাধা সৃষ্টি করে না। সৎমা বুদ্ধিমান তা প্রমাণ হয় সুভাষিনীর বাবা বাড়িতে থাকাকালীন প্রায় সময় কোন কাজের অজুহাতে সতীনের মেয়ের কাছে থেকে গল্প গুজব করতে থাকে। স্বামীর সামনে এমন ভাব করে সতীনের মেয়ে লক্ষ্মী অন্ত প্রাণ যেন তার।
◆ একদিন সুভাষিনীর বাবা তার নবাগত স্ত্রীর সাথে করে সিনেমা হলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে।
◆ হঠাৎ করে দরজায় দাঁড়িয়ে সুভাষিনী বলে:- বাবা; আমি তোমার সাথে সিনেমা দেখতে যাবো।
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- আজকে আমাদের সাথে তোমার যাওয়া হবে না।
◆ সুভাষিনী জেদ করে বলে- আমি তোমার সাথে যাবো।
◆ শশীকান্ত তার বড় দিদি কে ডাক দেয়। তারপর সুভাষিনীর আদর করতে করতে বলেন :- মামনি; তোমাকে আমরা বুদ্ধিমান মনে করি। তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে তুমি কিন্তু এখন আর শিশু নয়। তোমাকে সাথে করে কোনরকম সিনেমা দেখতে যাওয়া সম্ভব নয় কারণ লোকে কিন্তু মন্দ কথা বলতে পারে। তোমাকেই হয়তো তোমার মা ভেবে আমাকে দুটো কথা বলল কিন্তু তখন তোমার ও আমার সম্মান কোথায় থাকবে।
তোমার যদি সিনেমা দেখার খুবই ইচ্ছা হয়ে থাকে তাহলে তুমি পরেশের সাথে যাবে।
◆ সুভাষিনীর হাত ধরে বিমাতা বিমলা দেবী বলেন :- মামনি; এমন করে না, বাবা-মা যখন একসাথে কোথাও যায়, তখন কিন্তু ছেলে মেয়েদের বাধা দিতে নেই। যদি বেড়াতে যেতাম, তাহলে অবশ্যই তোমাকে নিয়ে যেতাম। সিনেমার মধ্যে থাকা অশ্লীল দৃশ্যগুলো কিন্তু তোমার পাশে বসে দেখা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।
◆ সুভাষিনী রাগে গজগজ করতে করতে তার বীমাতার কাছে থেকে হাত ছড়িয়ে নিয়ে দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করে।
◆ শশীকান্ত বলে :- মেয়েটার ভীষণ রাগ কিন্তু ওর মার তো এত রাগ ছিল না। বিমালা চলো চলো অনেক দেরি হয়ে গেল।
◆ বিমলা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে :- আজ সিনেমায় না গেলে হতো না। মেয়েটা মনে বহু কষ্ট পেয়েছে।
◆ শশীকান্ত বলে :- না, তুমি চলে।
◆ পিসিমা মিনাক্ষী বলেন :- আমাদের ঠাকুমার ধারা পেয়েছে। ঠাকুমা নাকি ভীষণ রাগী আর জেদি ছিলেন।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- বাবা-মা ঠিকই বলেছে। বয়সের একটা ব্যাপার আছে। অগত্য মধুসূদন মামাতো ভাই পরেশদা বর্তমানে আমার বন্ধুর মতো আর তাকে সাথে করে সিনেমা ও ঘুরতে যাওয়া।
◆ বিমলা আসার কিছু দিন পর থেকে উকিল বাড়িতে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। যেমন সুভাষিনীর পুরাতন গৃহ শিক্ষক কে বাদ দেওয়া হয়। পুরনো কিছু চাকর বাকর কে বাদ দিয়ে নতুন লোক নিয়োগ করা হয়। লক্ষীর মায়ের মৃত্যুর পর থেকে এই বাড়িতে রান্না করার জন্য একজন ব্রাহ্মণ রাধুনী ও দুইজন কাজের মহিলা ছিল। তাদের কে পরিবর্তন করা হয়েছে কিন্তু সুভাষিনীর অনুরোধে একজন বয়স্ক মহিলা কে রাখা হয়েছে।
◆ সুভাষিনীর পড়ার ঘরে ঢুকে তার বাবা বলেন :- তুমি; এখন দশম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছো। সামনের বছরেই তোমাকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে হবে। বর্তমান সময়ের স্কুল-কলেজের শিক্ষা প্রণালী সহিত জানাশোনা মাস্টার না হলে চলে না। কয়েকদিন অপেক্ষা করো তোমার জন্য নতুন মাস্টারমশাই ঠিক করেছি।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ষষ্ঠ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
পিসিমার আদরের উশৃংখল জীবন যাপনের যুবক ছাত্র বিনোদ দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে। পিসিমার শাসনে কিছু সময় বিশ্রাম করতে থাকে।
বৈশাখের তপ্ত রৌদ্রের দুপুর বেলার দেড়টার সময়ে, কাঁধের উপর গামছা ফেলে হাতে মাছ ধরার ছিপ নিয়ে চুপি চুপি পিসিমা কে ফাঁকি দিয়ে বাবুদের পুকুরে মাছ ধরিতে চলে যায়।
বিনোদ বাবুদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভাবে বিরাট রাজবাড়ির মত অট্টালিকা বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থা। চারিদিক থেকে বন জঙ্গলে ঘিরে ধরেছে। বাবুরা কেউই এখানে থাকেন না।
বাড়ির বড় কর্তা চাকরির সূত্র ধরে সারা বছর বিভিন্ন জেলার গ্রাম গঞ্জের ঘুরে বেড়াতে হয়। তার পরিবারবর্গ তাদের সাথেই বসবাস করে।
এই অট্টালিকার অন্তপুরে বাবুর বয়স্ক মায়ের দেখাশোনা করার জন্য বাবুর এক ভাগ্নে থাকেন। বসবাসের লোকজন না থাকার কারণে ঘরগুলোতে তালা দেওয়া থাকে। বাড়ির মধ্যে আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা রয়েছে। মেঝেতে কার্পেট পাতা ফ্রিজ টিভি সবই আছে। এই বাড়িতে আলাদাভাবে বৈঠকখানা, অতিথিশালা, কর্মচারী থাকার ঘর সহ বিভিন্ন মানুষের থাকার জন্য রুমের ব্যবস্থা আছে। কালের চক্রে পড়ে সবই এখন ধ্বংসের মুখে।
বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটি রুম আর এই রুমে বাবুর ভাগ্নে ২৭ বছরের যুবক অনিমেষ বসবাস করে। ছোটবেলায় তার পিতা-মাতার মৃত্যুর কারণে মামা বাড়িতে দিদিমার কাছে লালিত-পালিত হয়ে আসছে।
মামা তার ভাগ্নেকে লেখাপড়া শেখানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল। সপ্তম শ্রেণীতে তিনবার ফেল করে পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়।
সপ্তম শ্রেণি ফেল ছাত্র হলে কি হবে তার মুখে ইংরেজি শব্দ শুনলে মনে হবে বিএ পাস বা এমএ পাস ছেলে। অনিমেষ অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারে।
একটি লাঠি হাতে আর দামি চাদর কাধের উপর দিয়ে জমিদারের ভাবে চলাফেরা করে থাকে।
আর ঠোটে সবসময় সিগারেট লেগেই থাকে।
তার গান বাজনার দিকে বিশেষভাবে নজর আছে। গ্রামের যাত্রা দলের একজন উদ্যোক্তা। হারমোনিয়াম বাজানো সহ মেয়েলি গলায় গান করা তিনি ভীষণ ভাবে দক্ষতার সাথে পরিবেশন করে। কলকাতা নামকরা নৃত্য শিল্পী নিকট থেকে নাচ শিখেছে। আশপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েদের তিনি নাচ শেখাতে সবসময় ব্যস্ত থাকে। বছরে এক মাস তার স্বাধীনতা হরণ হয়ে থাকে কারণ সেই মুহূর্তে তার বড় মামা বাড়িতে থাকেন। আর ১১ মাস তার ধনী ব্যক্তির ন্যায় চলাফেরা আধুনিক পোশাক পরিচ্ছদ সহ বিলাসিতা ইত্যাদি ইত্যাদি চলতে থাকে।
বিনোদ ভাবতে ভাবতে বাবু বাড়ির নির্জন স্থানের মধ্য দিয়ে পুকুর ঘাটে উপস্থিত হয়। শান বাঁধানো পুকুর ঘাটের কয়েকটি ধাপ নামার পর তার চোখে পড়ে, এই নির্জন স্থানে জলের কলসি, একটি লাল পাড় শাড়ি ও একটা গামছা সিঁড়ির ধাপে রাখা আছে।
বিনোদ চারিদিকে তাকিয়ে কোন মহিলাকে দেখতে না পেয়ে ভাবে, বাবুর বাড়িতে কোন সধবা মহিলা নেই, তাহলে নিশ্চয়ই পাড়ার কোন মহিলা এখানে স্নান করতে এসেছে কিন্তু আশপাশে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে পুকুরের পিছলে ঘাটে পড়ে গিয়ে জলে ডুবে যায়নি তো।
তাড়াহুড়ো করে গামছা পড়ে জলের মধ্যে খোঁজ করতে থাকে কিন্তু কোন সন্ধান না পেয়ে ভাবে বাবুদের বাড়িতে হয়তো কোন আত্মীয়-স্বজন এসেছে। ঘাটে এই জিনিসগুলো রেখে গিয়ে আবার অন্য কোন জিনিস আনতে গিয়েছে। তাহলে একবার বাবুর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করে দেখলে হয়।
পুকুরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে তারপর প্যান্ট পড়ে ভাবে, অনিমেষদা এই সময়ে বৈঠকখানার ঘরে থাকে কিন্তু তাকে জিজ্ঞাসা করলেই বিষয়টি জানা যাবে।
বিনোদ সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে গিয়ে তলাবন্ধ দরজা দেখে পাশে থাকা একটি রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে, এই সময় অনিমেষদা তো বৈঠকখানায় থাকে তাহলে গেল কোথায়।
পাশের দরজায় হালকা চাপ দিতেই কুড়মড় করে কিছু পড়ার শব্দ হয় আর দরজা খুলে যায়। ঘরের ভিতরে চোখ রাখতেই প্রকৃতির নর-নারীর মিলনের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পায়।
মুহূর্তের মধ্যে বিনোদ লজ্জা পেয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় আর পুকুরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে। তাহলে পাড়ার নীলিমা স্নান ও জল নেওয়ার ছল করে অনিমেষের সাথে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত।
বিনোদ মাছ ধরার প্রস্তুতি নিয়ে জলের কাছে সিড়িতে বসে বড়শিতে মাছের আধার লাগিয়ে ছিপ জলে ফেলে। তার পর কামে জর্জরিত হয়ে নীলিমার রূপ মাধুর্য কল্পনা করতে থাকে।
দেহের তাপ চোখে মরুভূমি সারা শরীর কাঁপছে কামের তৃষ্ণায়। ষোড়শী যুবতী নীলিমার রমণক্রিয়া দৃশ্য দেখে কামের উত্তেজনা বৃদ্ধি হয়েছে। শরীরের শিরায় শিরায় যেন বিদ্যুৎ প্রবাহের মত ছুটে চলেছে। মন ও শরীরকে শান্ত করব কি করে।
হঠাৎ পিছন দিক থেকে কোন নারীর কোমল হাতের স্পর্শে বিনোদন ধ্যান ভাঙ্গার মত চমকে উঠে তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ তুলে নীলিমাকে দর্শন করে অন্তরে আনন্দে পুলকিত হয়ে নাচতে শুরু করে।
◆ বিনোদের সামনে এসে নীলিমা কান্না করতে থাকে।
◆ বিনোদ বলে :- এই ভরদুপুর বেলা কান্নাকাটি করছিস কেন! অনিমেষদার সাথে কোন সমস্যা হয়েছে।
◆ বিনোদের হাত চেপে ধরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে নীলিমা বলে :- বিনোদ দা; কাউকে কিন্তু কিছু বলিস না। আমি অনিমেষদা কে ভালবাসি।
◆ বিনোদ হেসে বলে :- অনিমেষের ভালোবাসা তো শুধু টাকার বিনিময়ে কারণ তোর মত আরও কতজন যে ওর সাথে থাকে তার কোন হিসাব নেই।
◆ নীলিমা বলে :- অনিমেষদা আমাকে বিয়ে করবে কথা দিয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- কামের উত্তেজনায় অনেক কিছু কথা দেওয়া হয় কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়া বড় কঠিন।
◆ নীলিমা বলে :- দয়া করে কাউকে বলিস না।
◆ বিনোদ বলে :- তোর বাবার সমাজের বুকে যথেষ্ট সুনাম আছে আবার ধনসম্পত্তির কোন অভাব নেই। উচ্চ বংশীয় বনেদি ঘরের মেয়ে হয়ে কিন্তু বাবা ও বংশের মান সম্মান নষ্ট করে চলেছিস। তুই; অবৈধভাবে পুরুষের সাথে মেলামেশা করে বেড়াচ্ছিস। কাকাবাবুকে তো অবশ্যই বলতে হবে।
◆ বিনোদের পা জড়িয়ে ধরে লিলিমা বলে :- আমাকে দয়া কর বাবার কাছে বলিস না, তাহলে আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলবে।
◆ বিনোদ কিছু সময় চিন্তা করে বলে :- ঠিক আছে, বলবো না। বিনিময়ে আমাকে কি দিবি?
◆ লিলিমা বলে :- বল; আমার কাছে
কি চাস?
◆ বিনোদ বলে :- তোর রূপ যৌবন অনাবৃত শরীর দেখে কিন্তু আমি খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। আমার মনের ও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘটেছে। যদি তুই আমার সাথে মেলামেশা করে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করিস, তাহলে কিন্তু আমি আর কাউকে বলবো না।
◆ নীলিমা মুখে হাসি নিয়ে এসে বলে :- এই হলো তোর নাটক। এমন ভাব দেখালি, যেন তুই একজন মহান সাধু পুরুষ ব্যক্তি।
◆ বিনোদ একবার এদিক-ওদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে নীলিমা বুকে হাত রেখে বলে :- তোকে অনেকদিন থেকেই অন্তরে ভালবাসি কিন্তু মাঝখানে অনিমেষদা ঢুকে গিয়েছে, তা কিন্তু আমার জানা ছিল না।
◆ নীলিমা হাসতে হাসতে বিনোদের মুখে চুমা দিয়ে বলে :- পুরুষের ভালোবাসা মানেই তো বিছানায় নিয়ে শোয়ার তাল কিন্তু এই মুহূর্তে তোর চঞ্চল মন কে ঠান্ডা করতে পারবে না।
◆ নীলিমাকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে বলে :-
ধার-বাকিতে যৌন ক্ষুধা মিটবে না। আমার শরীরের কোন কাজ হবে না। এখনই যদি আমার সাথে না থাকিস, তাহলে ঠিক কাকাবাবুকে বলে দেবো।
নীলিমা ভাবে মনে, একি বিপদে পড়লাম রে। বিনোদকে খুশি না করলে তো আবার মহা বিপদে পড়তে হবে। জানি বিনোদের স্বভাব চরিত্র তেমন ভালো নয়।
আগেকার দিনে মহিলারা স্নান করে কাপড় পরিবর্তন করার জন্য কিন্তু পুকুর পাড়ে একটি ঘর তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
নীলিমাকে টানতে টানতে বিনোদ স্নান ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়। প্রেম সাগরে সাঁতার দিয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে।
দেশের অসংখ্য ছেলে মেয়েরা এই ভাবেই তাদের যৌন তৃষ্ণা মিটিয়ে থাকে। আর বেশিরভাগ মেয়েরাই প্রতারণার শিকার হয়ে থাকে। সামাজিক মান সম্মানের ভয়ে ভালোবাসার মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়ে প্রতারকের সাথে থাকতে বাধ্য হয়।
এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায়, ছেলেমেয়েরা প্রাপ্ত বয়স হলেই কিন্তু পিতা-মাতার একান্ত কর্তব্য তাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা। উচ্চশিক্ষা লাভ করতে গিয়ে ছেলে মেয়েরা যৌন তৃষ্ণায় ভুগতে থাকে।
তারপর ছেলে মেয়েদের অবাধে স্বাধীনতা চরম ক্ষতিকারক। ধর্ম কর্ম ও সংযম বিহীন শিক্ষা প্রণালী ছেলেমেয়েদেরকে আরও বিপথগামী করে তোলে। অভাবে যৌন স্বাধীনতা দেশের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক নয়।
প্রাচীন সনাতন হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় নীতিগুলো যদি আমরা মেনে চলি তাহলে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। নির্দিষ্ট ব্রহ্মচর্য পালন করার একটা বয়স আছে। প্রাচীনকালে গুরুগৃহে ধর্মীয় প্রভাবের মাধ্যমে শিক্ষা প্রণালী প্রসারিত ছিল। সব সময় মেয়েদের থেকে ছেলেদের কে আলাদা এবং শাসনে রাখা হতো। গুরুগৃহের লেখাপড়া শেষ করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করা হতো। দীর্ঘদিন সংসার করার পর তাকে সংসারে থেকেই সবকিছু ত্যাগ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হতো।
দেশের এক সমীক্ষা জানা যায়, পুরুষের থেকে নারীরা বেশি বিপথগামী হয়ে থাকে। এইসব বিভিন্ন কারণের জন্যই, প্রাচীন কালের সময়ে সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের কে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হতো। উচ্ছৃঙ্খল জীবন কখনোই তারা পছন্দ করতেন না। আধুনিক সভ্যতার আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী স্বাধীনতার ফলে বিভিন্ন ধরনের পতিতা নারীদের আবির্ভাব ঘটেছে।
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যৌন বিষয় মিলন দৃশ্য গুলো খোলামেলা হয়েছে। মোবাইল খুললেই সব কিছুই চোখের সামনে দেখা যায়। তার কারণে ছেলে মেয়েরা অধঃপতনে পা বাড়িয়েছে।
-------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। সপ্তম অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ মহেন্দ্র মাস্টারের সাথে উকিল শশীকান্ত মহাশয়ের আলাপ আদালতের তার অফিস রুমে। মহেন্দ্রর এক আত্মীয়ের মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে উকিল শশীকান্ত মহাশয়ের কাছে আসে। আসা যাওয়া করতে করতে শশীকান্ত মহাশয়ের মন জয় করে।
◆ একদিন শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- মহেন্দ্র; তুমি উচ্চ শিক্ষিত এবং তোমার ব্যবহারে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। দয়া করে যদি তোমার স্কুলের চাকরি অবসরে আমার মেয়েকে গৃহ শিক্ষক হিসেবে পড়াশোনা করাতে পারো।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলে :- ঠিক আছে কাকাবাবু, বোনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিলাম।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- প্রয়োজনে কিন্তু আমাদের বাড়িতে থাকতে পারো। ছোট্ট সংসার কিন্তু ঘরবাড়ি অনেকগুলো।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলে :- আমার জন্ম ও বসবাসের বাড়ি পার্ক স্ট্রিট অর্থাৎ আপনার বাড়ি থেকে হয়তো বেশি দূরে নয়।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- আচ্ছা, বাসে গেলে মিনিট পয়ত্রিশ সময় লাগবে।
◆ মহেন্দ্র মাস্টার বলে :- আমার মোটরসাইকেল আছে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- তোমাকে মাসে কত টাকা দিতে হবে।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলে :- কাকাবাবু ; আপনার বিশেষ অনুরোধে কিন্তু আপনার মেয়েকে পড়াতে যাচ্ছি। চাকরি থেকে যা বেতন পায় তা কিন্তু ভালোভাবে চলে যায়। টাকার প্রসঙ্গ আনলে কিন্তু আমি আপনার বাড়িতে যাবো না।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। টাকার মধ্যে থেকে থেকে শুধু টাকার চিন্তা হয়। আর এই টাকার জন্যই কিন্তু একসময় আন্তরিক ভালোবাসা হারিয়ে যায়।
শিক্ষক মহেন্দ্র এক রবিবারের সকাল দশটার সময় উকিল বাড়ির গেট পেরিয়ে অন্দরমহলের সদর দরজায় উপস্থিত হয়।
◆ কলিং বেল চাপ দিতে এক বয়স্ক মহিলা দরজা খুলে বলে :- কি দরকার বলুন?
◆ মহেন্দ্র মাস্টার বলেন :- আমি সুভাষিনী এর নতুন মাস্টার।
◆ মাস্টারমশাইয়ের পরিচয় দিতেই মধ্যে বয়স্ক পরিচালিকা পড়ার রুমে বসতে দিয়ে বলেন :- সুভাষিনী কে ডেকে দিচ্ছি।
সুভাষিনী সাজগোজ করে পরিপাটি ভাবে শাড়ি পরিধান করে লেখাপড়ার রুমে উপস্থিত হয়ে হাত জোড় করে নমস্কার করে। শিক্ষক মহেন্দ্র কে দেখামাত্রই সুভাষিনী অন্তরে ফাগুনের বসন্তের হওয়ার দোল দিতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী কিছু সময় কথাবার্তা বলার পর বলে :- আপনার পরিচয়।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :- মহেন্দ্র সূত্রধর বাড়ি কলকাতার মধ্যে পাক স্টিট। এম এ পাশ করার পর সম্প্রতি কলকাতার মধ্যে এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করছি। বাড়িতে বাবা-মা, দুই দাদা-বৌদি আর আমি।
একজন বাড়ির পরিচালিকা জলখাবার নিয়ে এসে শিক্ষকের সামনে টেবিলে রাখে।
◆ সুভাষিনী বলে :- শিক্ষক মশাই গরম গরম খেতে শুরু করুন।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :- তোমার জলখাবার।
◆ সুভাষিনী বলে :- আপনি আসবেন জেনেই কিন্তু আগে খাওয়া দাওয়া করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
শিক্ষক মহেন্দ্র খাবার খেতে খেতে সুভাষিনী এর সাথে পড়াশোনার বিষয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে।
◆ কথা প্রসঙ্গে সুভাষিনী বলে :- আপনি বিয়ে করেছেন।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :- সবেমাত্র চাকরি পেয়েছি কিন্তু এখনো বিয়ের কথা ভাবিনি। তুমি পড়াশোনা করবে না আমার জীবন কাহিনী শুনবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- না, স্যার; নতুন শিক্ষক তার জন্য একটু কৌতূহল। চা পান করবেন।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :- ঠান্ডার মৌসুমে তাহলে মন্দ হয় না।
◆ সুভাষিনী চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে দু কাপ চা বানিয়ে মাস্টারমশাইয়ের সামনে রাখে।
◆ সুভাষিনী পড়তে বসে মনের গভীরে মাস্টারের রূপ গুণে মুগ্ধ হয়ে ভাবতে থাকে। তার মাথায় লম্বা লম্বা চুল, চুল গুলো কপাল থেকে উল্টো দিকে আঁচড়ানো এবং ঘাড়ের কাছে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া কোকড়ানো পাকানো চুল। দাড়ি ও গোঁফ কামানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তেলতেলে তার মুখ খানা। গায়ে তার একটি পরিষ্কার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী।
তাঁহার সূক্ষ্মাগ্র উন্নত নাসিকা, চোখ দুটো টানা টানা অতি সুন্দর। একজোড়া সোনার ফ্রেমে বাঁধানো চশমা সেই সৌন্দর্য্যকে আরো অন্য রূপ দিয়েছে। পায়ে নকল জরীর কাজ করা নাগরা জুতা। তাঁহার উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ দেহ অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ। তার কথায় যেন কৃষ্ণের বাঁশির সুর বাজে।
◆ কয়েকদিনের মধ্যেই সুভাষিনী পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে। মাস্টারমশাই কে তার খুব পছন্দ হয়েছে। মাস্টার মশাই গণিত শাস্ত্র থেকে সাহিত্যের, ইতিহাস ও কাব্য অতি চমৎকার ভাবে বুঝিয়ে দিতেন।
◆ শশীকান্ত মহাশয় সকাল নয়টার দিকে আদালতের উদ্দেশ্য রওনা দেওয়ার সময় তার মেয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়।
◆ শশীকান্ত মহাশয় তার মেয়ে কে কাছে ডেকে সোফায় পাশে বসিয়ে বলেন:- খুকি; তোমার মাস্টারমশাইয়ের চা পান করার অভ্যাস আছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবা; তোমার সে চিন্তা করতে হবে না। প্রথম দিন থেকে চা-বিস্কুট দেওয়া শুরু করেছি।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- এই বাড়িতে ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি, দুবেলায় চায়ের ব্যবস্থা চলছে। সেই সময়ে পরিবারের সদস্যরা একসাথে বসে সকাল ও সন্ধ্যায় সুখ দুঃখের সমস্যার কথা আলোচনা করতে করতে চা ও জলখাবার খাওয়ার প্রথা প্রচলন ছিল। আমি ঠাকুমার কোলে বসে মুড়ি ও আলুর চপ মনের আনন্দে খেতাম। বাচ্চা ছেলে মেয়েদের কখনোই চা পান করতে দেওয়া হতো না। আমি তো ১৪ বছর বয়সের সময় চা পান করা শুরু করি।
◆ বিমলা দেবী উপস্থিত হয়ে বলে :- পারিবারিক ইতিহাস শোনার অনেক সময় আছে। তোমার আদালতে যাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন :- আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা আছে। মামনি; চললাম পরে আবার কথা হবে। তারপর গাড়ির চালককে উদ্দেশ্য করে বলে, তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করতে।
বিমলা দেবী তার স্বামীর মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ ব্যাগ পত্র নিয়ে গাড়িতে তুলে দেয়।
◆ দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন একটি কবিতার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে করতে শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :-
শিউলি ফুলের সুগন্ধে চারিদিকে ভরে উঠছে।
ভ্রমরা মধু আহরণের জন্য গুনগুন করে চলেছে।
ফুলের পাপড়ি উন্মুক্ত করে মেলে ধরেনি।
ভোমরা বিফল মন রথে গুন গুন করে চলে।
◆ সুভাষিনী বলে :- মাস্টারমশাইয়ের মধ্যে তো দেখছি আবার কবিতার কবিত্ব আছে। প্রকৃতির নিয়মে মধু আহরণের জন্য ভ্রমরেরা তো গুনগুন করবেই।
◆ শিক্ষক মহেন্দ্র বলেন :- সব সময় আমাকে মাস্টারমশাই মাস্টারমশাই বলে সংবর্ধনা করার আর কোন দরকার নেই। আমাকে বন্ধুর মতো নাম ধরে ডাকতে পারো।
◆ সুভাষিনী কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া বলে :- আপনি যেমন মশাই শব্দ ব্যবহার পছন্দ করেন না, ঠিক আমি বাবু শব্দ পছন্দ করি না।
◆ মাস্টার মশাই হাসতে হাসতে বলেন :- তাহলে তুমি আমাকে মহেন্দ্র দাদা বলে ডাকতে পারো।
◆ সুভাষিনী সেই দিন থেকেই মাষ্টার মহেন্দ্র কে দাদা বলে ডাকতে শুরু করে আর দু'জনের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ সৃষ্টি হতে থাকে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- আজকাল বাবার চায়ের পেয়ালা বিমাতার তার হাত ধরে তার ঘরে যায়। দুঃখের বিষয় হল নতুন মা আসার পর থেকে বাবা আমাকে আর চায়ের টেবিলে ডাকে না। বাবা তার রুমের মধ্যেই নতুন মায়ের সাথে চা পান করেন।
আমি ইচ্ছা করেই বাবার ঘরে যাই না। মাস্টার মশাই আসার আগেই পড়ার রুমে বসে চা পান করে নেই।
◆ বিমলা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে :- সুভাষিনী কে নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই কিন্তু তুমি বাবা হিসাবে তাকে স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করো না। মেয়ে, আমাকে মা বলে ডাকে না তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। আমি কিন্তু সুভাষিনী কে মেয়ে বলে মনে করি।
◆ শশীকান্ত বলেন :- মেয়েকে কতবার ও কত দিন সকালবেলা চায়ের টেবিলে ডেকেছি কিন্তু খামখেয়ালি করে আসে না। সেজন্য এখন আর ডাকাডাকি করি না।
◆ বিমলা বলে :- মেয়েটা বড্ড জেদি। কখন কি যে মনে উদয় হয় ও নিজেই জানে না। তাই বলে আমাদের রাগ করলে চলবে না। সব সময় আমার মনে ভয় হয়, কখন যেনো সৎ মা বলে আমাকে দোষারোপ করে বসে।
◆ শশীকান্ত বলেন :- একবার রুমে গিয়ে দেখো, হয়তো; এখনো নবাবের নাতনি ঘুমিয়ে আছে।
◆ ঘরে ঢুকে বিমলা দেবী বলেন :- তোমার বাবা ডাকছে, তারপর হাত ধরে বলে চলে চলে।
◆ সুভাষিনী দ্রুত পায়ে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচেই নেমে সোজা বাবার ঘরে ঢুকে সোফার উপর বসে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় এক কাপ চা ও কিছু বিস্কুট প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে :- মা; নতুন মাস্টার মশায়ের কাছে পড়াশোনা কেমন হচ্ছে।
◆ মাখন রুটি চিবাতে চিবাতে সুভাষিনী বলে :- মাস্টার মশাই কে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কোন বিষয়ের পড়া বোঝানোর কায়দা একদম আলাদা।
◆ শশীকান্ত তাড়াতাড়ি করে উঠে বিমলার উদ্দেশ্য করে বলেন :- বাজার থেকে ঘুরে আসি। পরেশ কে ডেকে দাও।
◆ সুভাষিনী দ্রুত উঠে পরেশদা পরেশদা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
◆ বিমলা দেবী বলে :- এই মেয়ে, খাবার গুলো তো খেয়ে যা । বলে জল খাবারের থালা নিয়ে মেয়ের পিছন পিছন চলতে শুরু করে।
◆ বাবা শশীকান্ত তার মেয়ে কে সাথে করে
দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বসে আর বিমাতা বিমলা দেবী খাবার পরিবেশন করে।
◆ বাবা শশীকান্ত তার বাটি থেকে ইলিশ মাছের মাথা তুলে নিয়ে মেয়ের থালায় তুলে দিয়ে বলেন :- মাছের মাথা খেলে তার বুদ্ধি বাড়ে।
◆ পরেশ বড় চোখ করে সুভাষিনীর দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করতে থাকে।
বাবা শশীকান্ত মহাশয় মাছের মাথার অন্য খন্ড পরেশের থালায় দেওয়ার জন্য বিমলা কে ইশারা করে।
◆ পরেশের থালায় মাছের মাথার খন্ড দিয়ে বিমলা দেবী বলে :- সবার জন্যই রাখা হয়েছে, আমি ভেবেছিলাম মাছ ভাজা দিয়ে খাওয়া হয়ে গেলে তারপর দেবো।
◆ সুভাষিনী ও পরেশ দুষ্টুমি করতে করতে মাছের মাথা চেটেচুটে খেতে থাকে।
◆ বিকেলে মাস্টারমশাই এর সঙ্গে সুভাষিনী চা পান করতে করতে তাদের মধ্যে সামাজিক ও দেশের সম্পর্কে নানা কথাবার্তা চলতে থাকে। একদিন কথা প্রসঙ্গে চায়ের টেবিলে দুজনের মধ্যে দেশ ও নেতাদের মহলে "আত্মশক্তির কথা" আলোচনা প্রসঙ্গে চলে আসে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র বলে :- আমাদের দেশের শাস্ত্রের গুনি জ্ঞানী পন্ডিত গণ সুখ দুঃখের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন ‘সর্ব্বং আত্মবশং সুখং সর্ব্বং পরবশং দুঃখং।’ অন্নবস্ত্র তো দূরের কথা, সামান্য বিষয়ের জন্য আমাদের কিন্তু পরের উপর নির্ভর করতে হয়। এই দেখনা কেন, চাকর চা তৈয়ারী করিয়া না দিলে আমাদের চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া হয় না। অথচ চা বানাতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগতে পারে।
আমাদের সমাজের মানুষের ও পরিবারের সদস্যদের বিলাসিতা এত বেড়ে উঠেছে, তা কল্পনা করতে পারবে না। লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবে টাকার জোরে সবাই কিন্তু পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। আত্মনির্ভরশীল হওয়া সব থেকে বুদ্ধিমানের কাজ।
◆ সুভাষিনী পরের দিন পরেশের মাধ্যমে বাজার থেকে পাঁচ লিটার গ্যাস ওভেন কিনে নিয়ে আসে। পরের দিন মাস্টারমশাই আসার পর পড়ার রুমের মধ্যে চা তৈরি করে মাস্টার মশায়ের সামনে বিস্কুট সহ কাপ রাখে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র আনন্দিত মনে চায়ের চুমুক দিয়ে বলে :- বাহ; উপযুক্ত ক্ষেত্রে উপদেশের বীজ পড়লে কিন্তু এমনই ভাবে ফলপ্রদ বৃক্ষে পরিণত হয়।
---------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। অষ্টম অধ্যায় ।।
--------------------------------------------------------
◆ বিনোদ উশৃংখল জীবন যাপন ও অসৎ সঙ্গে মিশে কয়েক বছর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। পিসিমা ও তার বাবা-মায়ের চাপে পড়ে আবার কলেজে ভর্তি হয়।
পিসিমা মৃত্যু শয্যায় শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। পিসিমার মৃত্যুর আগের দিন বিনোদ ছল ছল চোখে পিসিমার পায়ে হাত রাখে।
◆ পিসিমা তার আদরের ভাইপো বিনোদ কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন :- আমার পরপারে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। তোমার বাবা-মায়ের কত আশা ভরসা তোমার উপর, খারাপ সঙ্গে না মিশে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। মৃত্যুর পথযাত্রী পিসি মাকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর পড়াশোনা চালিয়ে যাবি।
◆ বিনোদ তার পিসিমা কে জড়িয়ে ধরে বলে :- তোমার শেষ ইচ্ছা আমি অবশ্যই পূরণ করবো।
◆ পিসিমা বলেন :- ঘরের দরজা বন্ধ করে দে আর আমার বিছানার নিচে থেকে লাল রঙের কাঁথা বের কর। তারপর খুলে দেখ।
বিনোদ পিসিমার বিছানার নিচে থেকে কাঁথা বের করে । তারপর সামনে নিয়ে কাঁথার মুখ খুলতেই সাজিয়ে রাখা টাকা দেখতে পায়।
◆ পিসিমা বলেন :- এখানে এক লাখ দশ হাজার সাত টাকা আছে। তোর পড়াশোনার জন্য দিয়ে গেলাম কিন্তু কাউকে জানাবে না। তোর বাবা কিন্তু ভীষণ ভাবে তোর উপর রেগে আছে। পড়াশোনার টাকা যদি না দেয় তাহলে এই টাকা দিয়ে বুঝেশুনে খরচ করবি।
◆ বিনোদ ভাবে পিসিমা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে তার বাবার কাছে চলে আসে। তার স্বামীর জমি জমা প্রচুর ছিল, সেই জমির ফসল বিক্রি টাকা জমা করে করে এত টাকা হয়েছে। এছাড়াও সারা বছরই তো আমার চাহিদা মতো টাকা দিয়েছে। টাকাগুলো সংরক্ষিত ভাবে গোপনে রেখে দিতে হবে।
◆ পরের দিন পিসিমা মারা যায় যথা নিয়মে তার শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে যাওয়ার পর একদিন বিনোদ তার বাবা কাছে গিয়ে বলে :- আমি কলকাতায় থেকে পড়াশোনা করতে চাই।
◆ বিনোদের বাবা বলেন :- ঠিকমতো পড়াশোনা করলে আমার কোন আপত্তি নেই।
বিনোদ একদিন কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এবং একটি ছাত্র আবাসে থাকার ব্যবস্থা হয়।
বিনোদের কলেজ জীবন ছাত্রাবাসে বসবাস তার কাছে ভীষণভাবে আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। সহপাঠী ও সম বয়সী ছাত্রের সাথে তার বসবাস। আর অভিভাবকের কঠিন শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাখির মত ডানা মেলে ঘুরে বেড়ানো। স্কুলের মাস্টার মশাইয়ের পড়া না পারলে কিন্তু তাকে বিভিন্ন ভাবে শাস্তি পেতে হতো। বর্তমান কলেজ জীবনে অধ্যাপকের কোন শাসন নেই। অধ্যাপক তিনি বই খুলে তার বক্তৃতা করে চলেছে। আর কিছু ছাত্র-ছাত্রীরা পিছনের বেঞ্চে বসে বসে বেশ জমিয়ে গল্প করতে থাকে। অবাধে স্বাধীনতা ও শাসন হতে অব্যাহতি পেয়ে বিনোদ খুব আনন্দিত হয়ে উঠে।
একটি রুমে দুজন করে থাকার ব্যবস্থা হয়। বিনোদের সাথে একজন মেডিকেল কলেজের ছাত্র রবিনের সাথে বসবাস করে।
বিনোদের বাবা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রতি মাসে বিনোদের একাউন্টে পাঠিয়ে দেয় এবং খরচের হিসাব প্রতি মাসে তার বাবার কাছে পাঠাতে নির্দেশ দেয়। কারণ বিনোদ কলকাতার অসৎ সঙ্গে মিশে আরো খারাপ না হয়ে যায়।
রবিনের সাথে বিনোদের বন্ধুত্ব গভীরে পৌঁছিয়ে যায়। রবিনের বাবা বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর এলাকার একজন বড় ব্যবসায়ী। ছেলে রবিনের চাহিদা মত টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়। চাহিদা অনুসারে টাকা আশায় রবিনের বিলাসিতা বেড়ে যায়। বন্ধুর দেখাদেখি বিনোদ বিলাসিতা করার জন্য বিভিন্ন ছলচাতুরি করে তার বাবার উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। বিনোদের মার অনুরোধে তার বাবা প্রতি মাসে তার চাহিদা মতো টাকা পাঠাতে থাকে।
বিনোদ রাতে রুমে এসে দরজা খুলে দেখতে পায়, রবিন গভীর মনোযোগ দিয়ে একটি ফটোগ্রাফি ধ্যানমগ্ন হয়ে দেখতে ব্যস্ত কিন্তু অন্য কোন দিকে তার লক্ষ্য নেই । বিনোদ চুপচাপ তার বন্ধুর পিছনে এসে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফি দেখতে থাকে।
◆ বিনোদ বাজপাখির মত ছোঁ মেরে তার বন্ধুর বিছানা থেকে ফটোগ্রাফি নিয়ে বলে :- বন্ধু; তাহলে প্রেমে পড়েছিস।
◆ রবিন বলে :- ফটোগ্রাফি দে। বলে দুই বন্ধু ফটোগ্রাফি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে।
◆ বিনোদ বলে :- বন্ধু, আমাকে কখনো ভুলে যাবে না। বল কত দিন ধরে প্রেম চলছে।
◆ রবিন বলে :- ফটোগ্রাফি টা তো আগে দে, তারপর দুঃখের ভালবাসার কাহিনী বলছি।
দুই বন্ধু রাতের খাবার খাওয়া দাওয়া করে নেয়। তারপর রবিনের বিছানায় বসে প্রেম কাহিনীর করুণ পরিণতির নাটকের দৃশ্য শুরু হয়।
◆ রবিন বলে :- মুসলিম পরিবারের পিতা হারা এক দারিদ্র্য মায়ের মেয়ে। নাম তার তনিমা চৌধুরী। হাসপাতালের একজন চুক্তিবদ্ধ সেবিকা। মাঝে মাঝে মেডিকেল ছাত্রদের হাসপাতালে হাজিরা দিতে হয়। আসা-যাওয়া করতে করতে তনিমার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তনিমার মা ও তার একটি ছোট ভাইকে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার। তার মা একটি অঙ্গনারী স্কুলের রান্নার কাজ করে।
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে বলে :- তারপর মন দেওয়া নেওয়া ও বিভিন্ন পার্কে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরা।
◆ রবিন বলে :- তোর মত কি সবাই! মেয়ে পেলেই তাকে আগেই আলিঙ্গন করে ভোগ করতে হবে।
◆ বিনোদ দুটো সিগারেট ধরিয়ে একটা রবিনের আঙ্গুলের ফাকে ঢুকিয়ে দিয়ে সিগারেট ধোয়া পান করে বলে :- তারপর কি হলো?
◆ রবিন বলে :- তনিমার বাড়িতে গিয়ে তার মার সাথে দেখা করেছি এবং মাঝে মধ্যে তাদের টাকা ও বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করি। তার মা আমাকে ভীষণভাবে আদর আপ্যায়ন করে। আবার আমাদের কে বাড়িতে রেখে মাঝে মাঝে তার মা ছোট ছেলেকে নিয়ে পাড়ায় বেরিয়ে যায়। আর সুযোগ বুঝে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তনিমা জোর করে দৈহিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করায়।
আমি ভেবেছিলাম বিয়ের আগে প্রেমিকার সাথে দৈহিক মিলন করবো না কিন্তু তনিমা বলে তুমি ধরে নাও আমি তোমার বউ হয়ে গিয়েছে।
দুটো হৃদয়ের মনের মিল হচ্ছে সবথেকে বড়।
সামাজিকভাবে বিয়ে করলাম কিন্তু মনের মিল হলো না, তাহলে বিয়ে করার কোন মানেই হলো না। আর তুমি তো আমাকে জোর জুলুম করে কিছু করছো না। হে স্বামী দেবতা, স্বেচ্ছায় তোমার কাছে ধরা দিয়েছি।
জাতপাত ধর্ম ভুলে ও সমাজ ব্যবস্থার শাসন না মেনে এবং বংশের মর্যাদা লঙ্ঘন করে তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা আছে। ডাক্তারি পাশ করে কলকাতায় ঘর ভাড়া নিয়ে তনিমা সাথে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি।
◆ বিনোদ বলে :- মুসলিম মেয়ে কে বিয়ে করা জন্য কিন্তু তোর বাবা, তোকে ত্যাজ্যপুত্র করে সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবে।
◆ রবিন বলে :- ভাবছি, মেডিকেল পাস করে চাকরি নিশ্চয়ই পেয়ে যাবো, তা দিয়ে আমাদের দুজনের ছোট সংসার ভালোভাবে চলে যাবে। চাকরি না হলে দরকার হলে ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালাবো তবুও তনিমা কে আমি কোন প্রকার ত্যাগ করতে পারবো না। তনিমা আমার প্রাণের শক্তি সঞ্চালন করেছে। আমি তনিমা ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারব না।
◆ বিনোদ বলে :- তোর ভালোবাসা তো অত্যান্ত গভীরে চলে গিয়েছে। বন্ধু সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে।
◆ পাঁচ মাস পর একদিন হাঁপাতে হাঁপাতে রবিন রুমে ঢুকে বিনোদ কে বলে :- নারীর ভালোবাসা মানেই পুরুষকে একদম মনে প্রানে মেরে ফেলার চেষ্টা। আমি তনিমার জন্য কি করিনি? দুই সপ্তাহ আগেও আমার কাছ থেকে ৫০০০ টাকা তার মায়ের চিকিৎসার নাম করে নিয়েছে। ভালোবাসার নাম করে আমার হৃদয়ের ছুরি মেরেছে, ভালোবাসার নামে বিশ্বাসঘাতক নারী।
◆ বিনোদ বলে :- উত্তেজিত হচ্ছিস কেন! কি হয়েছে বল আমাকে?
◆ রবিন বলে :- যাকে হৃদয় দিয়ে ভালবেসেছিলাম সে কিন্তু আমাকে হৃদয় থেকে ভালোবাসিনি।
◆ বিনোদ বলে :- ব্যাপারটা কি হয়েছে খুলে বলবি তো।
◆ রবিন বলে :- তনিমা মেডিকেল কলেজের আরো চারজন ছাত্রের সাথে তার সম্পর্ক। মা-মেয়ে টাকা আয় করার একটা পদ্ধতি অবলম্বন করে ছাত্রদের কে ঠকিয়ে হৃদয় নিয়ে খেলা করে চলেছে।
◆ বিনোদ বলে :- বিষয়টি কিভাবে বুঝতে পারলি?
◆ রবিন বলে :- একদিন পার্কে ঘুরতে গিয়ে তনিমার সাথে একটা বন্ধুকে অন্তরঙ্গভাবে মেলামেশা করতে দেখে চুপচাপ চলে আসি। তারপর সেই বন্ধুর সাথে কথা বলে জানতে পারি, সে তনিমার বয়ফ্রেন্ড কিন্তু বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকেও বহু টাকা নিয়েছে। উক্ত বন্ধুকে আমার ঘটনা খুলে বললাম। তারপর দুই বন্ধু মিলে আরো খোঁজ খবর করতে করতে আরো তিনজন বন্ধুর কাছে থেকে জানতে পারলাম, সবাই তনিমার বয়ফ্রেন্ড ও টাকার বিনিময়ে রাতের শয্যাশায়ী।
◆ বিনোদ বিজ্ঞ ব্যক্তির মত আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বলে :- ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ দে। কারণ একজন পতিতার হাত থেকে তুই রক্ষা পেয়েছিস। একজন মুসলিম পতিতা কে বিয়ে করার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিস।
এই ধরনের মহিলাদের প্রতারণা করার কোন শেষ নেই। হয়তো চাপে পড়ে অন্যের সন্তান পেটে ধারণ করে বিয়ে করতে বাধ্য করবে। ভদ্র সমাজে বসবাস করে ভদ্রভাবে সমাজের অন্তরালে চোরাস্রোতের মতো বেশ্যাবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে।
◆ রবিন বলে :- এই প্রতারণার সঠিক জবাব দেবো।
◆ বিনোদ বলে :- এই ধরনের মহিলাদের সাথে লড়াই করতে যাওয়া কোন বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ তোকে প্রতারণার জালে জড়িয়ে মান সম্মানহানি করবে আবার অর্থনৈতিক ক্ষতি করে দেবে। তোদের বংশ মর্যাদার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ।
যখন তোর কাছে টাকা আছে, তখন আরো কত রকম মেয়েকে প্রেম নিবেদন করতে পারবে। সব থেকে ভালো উপায় হল দেখে শুনে তাড়াতাড়ি একটা বিয়ে করে ফেল।
◆ রবিন রাগ দেখিয়ে বলে :- আমার জ্বালায় আমি বাঁচি না, আর তুই আবার কাটা ঘায়ে নুন ছিটিয়ে দিচ্ছিস তারপর আবার লঙ্কার গুঁড়ো।
◆ বিনোদ বলে :- তাহলে, দেবদাস না হয়ে লিঙ্গে কাপড় বেঁধে সন্ন্যাসী হয়ে যা। আমার কথা শুনলে কিন্তু তুই বিপদে পড়বি না। চল আর চিন্তা ভাবনা করে কোন লাভ নেই, রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তনিমার স্মৃতিগুলো চিন্তা করতে থাক।
◆ বিনোদ বিছানায় শুয়ে ভাবে, দৈহিক লালসায় উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে লিলিমার কাম সাগরে ডুব দিয়েছিলাম। আমার নিকটে লিলিমার শরীর ভোগ করা ছাড়া আর কিছু না। তার ব্যক্তিত্ব আমাকে কিন্তু আকর্ষণ করেনি কিন্তু তার নারীত্বের শরীর সেই মুহূর্তে আমার কাছে বিশেষ প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল। নীলিমার প্রতি আমার ভালোবাসা মানেই প্রতারণার ভালোবাসা।
রবিন কিন্তু তনিমা কে সত্যিকারের ভালোবেসে ছিল। তার জন্যই সহধর্মিনী বানানোর জন্য স্বপ্নের জাল বুনছে। রবিন আমার মতো চরিত্র কে বিসর্জন দিতে রাজি নয়।
---------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। নমম অধ্যায় ।।
--------------------------------------------------------
◆ শশীকান্ত মহাশয়ের শ্রী শ্রী দূর্গা পূজা উপলক্ষে উচ্চ আদালত দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ থাকার ছুটি পেয়ে যায়।
◆ শশীকান্ত ও বিমলা দুজনে একত্রে সিঁড়ির ধাপগুলো অতিক্রম করে দোতালায় সুভাষিনীর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মী লক্ষী বলে ডাকতে থাকে।
সুভাষিনী দরজা খুলে দেয় আর তার বাবা-মা ঘরে ঢুকে সোফায় বসে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবা কি ব্যাপার দুজনে একসাথে।
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- তোমার মাকে সাথে করে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ঘুরতে যাচ্ছি। পুরীর জগন্নাথ থেকে শুরু করে মথুরা বৃন্দাবন হরিদ্বার কুরুক্ষেত্র অযোধ্যা সহ বিভিন্ন স্থান ঘোরার ইচ্ছা আছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবা; আমাকে সাথে করে নিয়ে চলো।
◆ বাবা শশীকান্ত মেয়ে আদরে করে বলেন :- মামনি; আমাদের সাথে তোমার না যাওয়াই ভালো। কারণ তোমার মাকে নিয়ে এই প্রথম কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি। পরবর্তী বছরে আবার কোথাও একসাথে পরিবারের সকল সদস্যদের কে নিয়ে যাওয়া হবে।
◆ সুভাষিনী রাগ দেখিয়ে বলে :- ঠিক আছে, তুমি মাকে নিয়ে যাও আমি যাচ্ছি না। আমার আপন মা হলে নিশ্চয়ই আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতো।
◆ বিমলা দেবী তার মেয়ে কে আদর করে ডেকে ঘরের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সমস্যাগুলো বোঝাতে থাকে।
◆ সুভাষিনী বলে :- ঠিক আছে তোমরা যাও।
◆ বিমলা দেবী বলেন :- তোমার বাবা সারা বছর আইনের লড়াই নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। তার মন-মানসিকতার পরিবর্তনের দরকার আছে।
তুমি সাথে থাকলে আমি তাকে আনন্দ দিতে কখনোই পারব না। সব সময় তোমাকে নিয়ে আমাদের চিন্তা থাকবে তারপর দুজনেই কিন্তু প্রায় সমবয়সী লোকে খারাপ বলবে।
আনন্দিত হয়ে তার স্ত্রী বিমলা আর দুজন বাড়ির বিশ্বস্ত কর্মচারী কে সাথে করে নিয়ে দেশের মধ্যে ভারত ভ্রমনে বেরিয়ে পড়ে।
◆ দুর্গা পুজোর সময় সুভাষিনী তার পিসিমার অনুমতি নিয়ে মাস্টার মহেন্দ্রর সাথে করে সিনেমা দেখতে যায়।
◆ সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে এক দামি আভিজাত্য সম্পন্ন হোটেলে প্রবেশ করে। দুজনে একটি কেবিনে ঢুকে টেবিলে রাখা তালিকা দেখে কিন্তু সুভাষিনী দামি দামি খাবারের অর্ডার দেয়।
◆ সুভাষিনী চামচ দিয়ে খাবার খেতে খেতে মাস্টার মশাইয়ের উদ্দেশ্য করে বলে :- অভিনয় দেখে কিন্তু আমি ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে নিত্য গীত আমাকে অতিশয় আনন্দ দান করেছে। আর তোমাকে ভালো লেগেছে এই কারণে, প্রতিটি দৃশ্যের ঘটনাবলী ও চরিত্রের বিশ্লেষণ করে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো। ফরহাদের অপূর্ব প্রেম ও শিরিনের আত্মবিসর্জন আমার হৃদয়ে উল্লসিত করে তুলেছে।
◆ মহেন্দ্র হাসতে হাসতে বলে :- তাহলে ফুলের সুগন্ধি দিগবিদিক সুগন্ধিত হয়েছে। তোমার হৃদয়ের কুটিরে আঘাত করেছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তোমার সংস্পর্শে আনন্দিত হয়ে অনেকদিন আগেই মনের দরজা খুলে রেখেছি কিন্তু মনের মানুষ কাছে থেকেও আবার দূরে সরে যাচ্ছে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, মহেন্দ্র আমার বুকের মধ্যে যেন কোন সুষুপ্ত পশুর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়েছে। সেই উন্মাদ পাগল করা যৌবনের পশু রূপ ইন্দ্র গুলো ধীরে ধীরে আমার মধ্যে জাগ্রত হয়ে উঠছে।
◆ মহেন্দ্র মাস্টার বলেন :- পুজোর কটা দিন আমি তোমাকে সময় দিতে পারবো।
◆ খাওয়া দাওয়া শেষ হলে হোটেল বয় তাৎক্ষণিক টেবিল পরিষ্কার করে দেয় তারপর অভিবাদন জানিয়ে সাজানো থালার মধ্যে খাবারের বিল টেবিলে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ সুভাষিনী তার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে বিল পরিশোধ করে তারপর হোটেল বয়ের হাতে ৫০০ টাকার একটি নোট দেয়।
◆ মাস্টারের সাথে সুভাষিনী প্রায় দিন সিনেমার নাম করে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতে শুরু করে। অভিভাবকহীন ভাবে মুক্ত পাখির মতো আনন্দ-ফূর্তি করে বেড়াতে থাকে আর দুহাতে টাকা খরচ করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, মহেন্দ্র মাস্টার সাথে না থাকলে কিন্তু আমদ প্রমোদ উপভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইচ্ছা করেই পিসিমা কে সন্তুষ্ট রাখার জন্য মাঝে মধ্যে ধর্মীয় মূলক নাটক ও সিনেমা হলে পিসিমার সাথে যায়। পিসিমার উপর বাবা কখনোই কথা বলবেনা। পিসিমার ছাত্র ছায়ায় থেকেই আমার দুরন্তপনা চলতে থাকে।
◆ সুভাষিনী তার পিসিমার ঘরে ঢুকে তার বিছানায় শুয়ে পড়ে বলে :- আজ তোমার সাথে থাকবো।
পিসিমার সাথে বাবা-মায়ের মাঝে মাঝে কথা হয়। বাবার ব্যক্তিগত সচিবের সাথে মাঝেমধ্যে টাকা পয়সা পাঠানোর কথাবার্তা হয়।
◆ হঠাৎ করে সুভাষিনী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাগত হয়ে পড়ে। পিসিমা অস্থির চিত্রে শুধু চিন্তা করতে থাকে।
◆ মহেন্দ্র কে হাতের কাছে পেয়ে পিসিমা বলেন :- সুভাষিনী পাশে থেকে তাকে একটু দেখাশোনা করো। আমি একা একা পেরে উঠছি না।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র বলে :- পিসিমা; আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমি তো আছি।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র উকিল বাড়ির পরিবারের আপনজন হয়ে সুভাষিনী কে দিবারাত্রি তার শয্যার পাশে থেকে সেবা সুস্থতা করতে থাকে। ডাক্তার ডাকা থেকে ঔষধ নিয়ে আসা । আবার ঠিক সময়ে খাদ্য ও ওষুধ সেবন করানো। কাছে বসে সান্তনা প্রদান সহ প্রায় সমস্ত কাজই করতে থাকে।
সুভাষিনী সেবা সুস্থতা করতে গিয়ে মহেন্দ্রের প্রায় দিন স্কুল কামাই হয়ে যাচ্ছে।
◆ সুভাষিনী বেদনায় অস্থির হয়ে বলে :- মহেন্দ্র আমাকে বাঁচাও।
◆ মহেন্দ্র, লক্ষ্মীর গা হাত পা টিপে আরাম দিতে থাকে। আবার কখনো তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে। সুভাষিনী যন্ত্রণায় ছটফট করে মা মা বলে চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে। সেই মুহূর্তে মহেন্দ্র তার চোখের জল মুছে দিয়ে সান্তনা দিতে থাকে।
আঙুর বেদানা আপেল সহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য একটু একটু করে শিশুর মতো আদর করে করে খাওয়াতে থাকে।
◆ পিসিমা ঘরে ঢুকে মহেন্দ্রের উদ্দেশ্য করে বলেন :- তুমি ছিলে বলে কিন্তু আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছি।
◆ সুভাষিনী একমাস রোগে ভোগার পরে আরোগ্য লাভ করে মাস্টার মুকুলের হাত ধরে নতজানু হয়ে বলে :- মাস্টার, তুমি এবারের মতো আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছো কিন্তু তোমার ভালোবাসার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না।
◆ মহেন্দ্র বলে :- আমি তো উপলক্ষ মাত্র ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করেছেন ।
দুজন দুজনার আরো হৃদয়ের কাছাকাছি চলে আসে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র তার লিখনির মাধ্যমে সুভাষিনীর স্মৃতি কে আঁকড়িয়ে ধরে তাকে নিয়ে নিয়ে "অমৃতের সুধা"নামে একটি গীতিকাব্য রচনা করেন। ছাপাখানার গিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার একটি বোড বান্ডিং সুন্দর প্রচ্ছদ যুক্ত করে বই প্রকাশ করেন।
◆ কাব্যগ্রন্থটি সুন্দর মোড়কে তার উপর গোলাপ ফুল দিয়ে জরি যুক্ত বিভিন্ন রং এর ফিতে দিয়ে বাধে। বইয়ের প্যাকেট হাতে করে আনন্দের সাথে উকিল বাড়ির লেখাপড়ার ঘরে উপস্থিত হয়।
◆ বইটি সুভাষিনী হাতে দিয়ে মহেন্দ্র বলে :- সুভাষিনী ও মহেন্দ্র আত্মচরিত কাব্যগ্রন্থ "অমৃতের সুধা" প্রকাশিত হয়েছে।
◆ হাত বাড়িয়ে কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে গোলাপ কে বের করে তার ঘ্রাণ নেবার পর মাথায় খোপার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।
◆ সুভাষিনী বইয়ের বিভিন্ন পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে বলে :- শেষে কিনা ভালোবাসার গোলাপ বাকি ছিল। তা বই প্রকাশ করলে কিন্তু আমাকে তো একবারও বলার প্রয়োজনীয়তা মনে করোনি।
◆ মহেন্দ্র বলে :- এই বইয়ের প্রধান ভূমিকায় তোমার স্মৃতি কথায় বিরাজমান। তোমাকে একটি হঠাৎ প্রাপ্তি উপহার দিয়ে চমকিয়ে দেওয়ার প্রয়াস। আগে বললে হয়তো বইয়ের প্রতি যে ভালোবাসার টান তা উপলব্ধি করতে পারতাম না।
প্রাণের বন্ধু সুভাষিনী কে না বলে কিন্তু অবশ্যই সত্যিই অপরাধ করে ফেলেছি, দয়া করে ক্ষমা করে দেবে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, এই কাব্য মাধ্যমে মহেন্দ্রের কবিতার বহিঃপ্রকাশ ও সুভাষিনীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আমাকে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানোর সময় মাস্টার মহাশয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা সমূহ বাংলা পদ্যে অনুবাদ করিয়া দিতেন। তিনি যে কবি ও ভাবুক তাহার পরিচয় পূর্ব্বেই পেয়েছি। অনেক কবিতা আমার সম্মুখেই লেখা হয়েছে। আজ পুস্তক আকারে গ্রথিত হওয়াতে উহার মধ্যে যেন নূতন ভাব দেখিতে পাইলাম।
◆ সুভাষিনী দ্রুত বই রেখে উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। কিছু সময় পর ফিরে এসে মিষ্টির প্লেট মাষ্টারের হাতে দিয়ে বলে :- তোমার নিয়ে আসা মিষ্টি দিয়েই, তোমাকে অতিথি আপ্যায়ন করলাম।
---------------------------------------
---------------------------------------------------------
।। দশম অধ্যায় ।।
---------------------------------------------------------
◆ জয়ন্তী কলকাতা মহানগরের পাথরঘাটা অঞ্চলের কোন এক মহল্লায় পিতা বিরেন্দ্রনাথ ও মাতা মমতাময়ীর কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতার বংশ পরম্পরায় একসময় বনেদি পরিবার ছিল। তার পিতা সমাজের বুকে বিভিন্ন বিষয়ে বহু সুনাম অর্জন করে কৃতিত্বের সাথে বসবাস করে থাকে।
◆ জয়ন্তী যৌবনের প্রারম্ভে এলাকার ছেলেদের কাছে সুন্দরী নামে পরিচিতি লাভ করে। হাই স্কুল পড়াশোনার সময়ে সুভাষিনি এর সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জয়ন্তী তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বিশেষভাবে কঠিন পরিশ্রম করে চলেছে।
◆ জয়ন্তীর রূপের সৌন্দর্য থেকেও তার ভালোবাসা ও সহানুভূতি গুণে সবার চিত্তকে মুগ্ধ করে।
◆ পড়াশোনার পাশাপাশি আমোদ-প্রমোদ, গান-বাজনা, হাস্য-পরিহাস, খেলাধুলা সহ লেখাপড়ায় সকল বিষয়ে তাহার সমান অধিকার ছিল। স্কুলের পুরস্কার বিতরণ অথবা অন্য কোন উৎসবের আয়োজন জয়ন্তীর সাহায্য না হলে চলবে না।
◆ জয়ন্তী না চাইলেও শিক্ষকরা তাকে জোর করে তার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। জয়ন্তী গুরুদায়িত্ব পালন করে সবাইকে চমকিয়ে দেয়। তার বিনয় ধৈর্য সহ্য ও ভালোবাসার টানে সকল ছাত্রীগণ ও মাস্টার গণ ভালবাসে । সে মেয়েদের গান ও অভিনয় শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে সফলতা অর্জন করে ।
◆ জয়ন্তীর তত্ত্বাবধানে বালিকা বিদ্যালয়ের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে নাটক মঞ্চস্থ হয়। বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা মিলিতভাবে নবীন সেনের ‘কুরুক্ষেত্র’ কাব্য থেকে নির্বাচিত দৃশ্যের অভিনয় করে। তাহাতে ‘শৈলজার’ ভূমিকায় সুভাষিনী আর ‘জরৎকার’ ভূমিকায় জয়ন্তী অভিনয় করে।
অভিনয় দেখে দর্শকগণ চমৎকৃত হয়ে, হাতে তালি দিয়ে সংবর্ধনা ও বহু প্রশংসা করে । শৈলজার অভিনয়ের দুটি গান কিন্তু সুভাষিনীর বাড়িতে ব্যক্তিগত পড়ানোর মাস্টার মহেন্দ্র মহাশয় রচনা করে দিয়ে ছিলেন।
◆ সেই গান জয়ন্তী সুর যোজনা করে সুভাষিনি কে শেখায়। অর্জুনের প্রেমলাভের নিরাশ শৈলজার অন্তরের ব্যথা এই গানে ফুটিয়া উঠেছে।
◆ দুই বান্ধবী মিলে ঘুরতে বেরিয়ে রাস্তার দিয়ে একজন অর্ধ বয়স্ক মহিলাকে যেতে দেখে সুভাষিনি তার বান্ধবী জয়ন্তী কে বলে :- এই মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছে যৌবনে খুব সুন্দরী ছিল কিন্তু বয়স হলেও তার দেহের সৌন্দর্য লাবণ্য নষ্ট হতে দেয়নি।
◆ জয়ন্তী বলে :- সমাজের পুরুষেরা নারীর সৌন্দর্য সম্বন্ধে বলে থাকে "স্ত্রীলোক কুড়ি পার হলেই নাকি বুড়ি" এই প্রবাদ বাক্যের কথাগুলো কিন্তু সকলের ক্ষেত্রে ঠিক নয়।
◆ সুভাষিনী বলে :- প্রাচীন যুগে বাল্যকাল অর্থাৎ ৯ থেকে ১০ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হত। ১৩-১৪ বছর বয়সের সময়ে সন্তান জন্ম দিত।
◆ জয়ন্তী বলে :- আর বয়স্ক স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের জমিতে ফসল ফলানোর মত প্রত্যেক বছরই একটা করে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করত। সেই ক্ষেত্রে কুড়ি বছর বয়স হলে বহু সন্তানের জননী হয়ে যেত।
◆ সুভাষিনী বলে :- বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীগণ পুষ্টিহীনতা ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তো তারপর প্রতিবছর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অনেক সন্তান মারা যেত। সেই শোকে তার দেহ আরো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
◆ জয়ন্তী বলে :- আর অপুষ্টিহীনতা, রোগে আক্রান্ত, শোকাহত ও কঠোর পরিশ্রমে শরীর ভেঙে পড়ে। প্রতিদিন ঢেঁকিতে ধান বেনে তারপর ভাত রান্না করতে হতো। আর একপাল গরু ছাগল ভেড়া পালন করতে হতো। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়া তারা কখনো কল্পনা করতে পারেনি।
◆ সুভাষিনী বলে :- সেই সময়ের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের ব্যঙ্গ করে কথাগুলো বলতো।
◆ জয়ন্তী বলে :- আর একটা দিক লক্ষ্য করলে দেখা যায়। সেই সময়ে কিশোরীর যৌবনের জোয়ারের প্রথম ঋতুমতী হলেই কিন্তু তাকে জোর করে তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বয়স্ক স্বামী তার যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য উক্ত কিশোরীর উপর নির্যাতন করতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী বলে :- সেই সময়ে বাড়ির মা কাকিমা ও বয়স্ক মহিলারা এই বিষয়টি কে সমর্থন করত। যদি কোন কিশোরী তার স্বামীর কাছে যেতে না চাইলে কিন্তু তাহলে পারিবারিক অত্যাচার তার উপর নেমে আসে। যৌন বিষয়ে কিশোরীর জ্ঞান না থাকার কারণে বহু ক্ষেত্রে তার অঙ্গ থেকে রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে।
◆ জয়ন্তী বলে :- বয়স্ক স্বামী তার নবীন স্ত্রীকে কুড়ি বছরের বয়সের মধ্যে যৌন জীবনের আনন্দ উপভোগ করে নিতে চাই কারণ তার তো পরপারে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে।
◆ সুভাষিনী বলে :-নারীরা সেই সময় ভাবতো আমার স্বামীর অল্প আয়ু কিন্তু কখন যে তিনি আমাকে বিধবা করে চলে যাবেন। যৌবনের সুখ-শান্তি দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়েই তাড়াতাড়ি উপভোগ করে নিতে হবে। বিধবা হলে তো সমাজব্যবস্থার নিয়ম অনুসারে কোন পুরুষের সাথে সঙ্গ করা যাবে না। সেই প্রাচীনকালে রাজা রামমোহন বা বিদ্যাসাগর ছিলেন না। যুবতী বিধবাদের নতুন করে বিয়ের ব্যবস্থা করবে।
◆ জয়ন্তী বলে :- পুরুষেরা ভাবতো বউ যত তাড়াতাড়ি মরবে আবার নতুন বউ নিয়ে এসে তার যৌবন জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়া যাবে। আবার বিয়ে করা মানেই টাকা-পয়সা ধন সম্পত্তি ঘরে আসা। এই নোংরা ছোট মনের মন-মানসিকতা জন্য পুরুষেরা তার স্ত্রীদের শরীরের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে বিশেষভাবে অবহেলা করতেন। যৌবনের ক্ষুধা মেটানোর কিন্তু তাদের কাছে প্রধান বিষয় ছিল।
◆ সুভাষিনী বলে :- সমাজের বুকে এমনও নারী আছে, যার সৌন্দর্য ভাদ্রের ভরা নদীর অথৈ জলের মত যৌবনের জোয়ার গতি কে বেঁধে রেখেছে। শরতের জোসনার ন্যায় অনাবিল তার দেহের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। অমাবস্যার অন্ধকারের মত তাদের দেহের সৌন্দর্য মলিন হতে দেয়নি। এসব নারীদের দেখে যেকোনো পুরুষ কিন্তু আকর্ষিত হবেই। পুরুষেরা প্রকাশ্যে না বললেও কিন্তু অন্তরে অন্তরে স্বীকার করতেই হবে।
◆ জয়ন্তী বলে :- এই নারীর সৌন্দর্যের মহিমায় কত যোগী-ঋষি ও মুনিদের ধ্যান ভঙ্গ হয়েছে। সাধন ভজন ও তপস্যা বন্ধ করে নারীর পিছনে পিছনে ছুটে চলেছে।
◆ দুই বান্ধবী কথাবার্তা বলতে বলতে জয়ন্তীর বাড়িতে চলে আসে। জয়ন্তী মা মা বলে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে সোফায় বসে।
◆ জয়ন্তীর মা মমতাময়ী অতি শান্ত স্বভাব ও স্নেহশীল মহিলা।
◆ জয়ন্তীর মায়ের ধনসম্পদ না থাকলেও কিন্তু অতিথি আপ্যায়নে কোন প্রকার ত্রুটি রাখেন না। নিজের হাতে বিভিন্ন পদে রান্না করে অতিথিদেরকে নিজের হাতে পরিবেশন করেন। খেতে না চাইলেও কিন্তু স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে জোর করেই খাওয়াবে।
◆ জয়ন্তীর মা রুমে ঢুকে সুভাষিনী কে আদর করে বলে :- তোমার বাবা-মা ভালো আছে তো।
তোমার পিসিমার শরীর কেমন আছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- হ্যাঁ, মাসিমা সবাই বর্তমানে সুস্থ সবল আছে।
জয়ন্তীর মা ব্যস্ত হয়ে দুই জনের জন্য জল খাবারের ব্যবস্থা করতে চলে যায় । জয়ন্তীর তার বান্ধবী কে ঘরে নিয়ে আসে।
◆ সুভাষিনী খাবার খেতে খেতে বলে :- মাসিমা; আপনার রান্না করা খাবারের স্বাদ আলাদা। তারপর হাসতে হাসতে বলে, আপনার মা কি ভাল রাঁধুনি ছিল।
◆ জয়ন্তির মা মমতাময়ী দেবী মাতৃ স্নেহ আদর করে বলেন :- আমার মা ভালো রান্না করতে পারতেন। ছোটবেলায় কত রকম শাক-সবজি, পিঠা-পায়েস ও আচার বানিয়ে আমাদের ভাই বোনের খাওয়াত। কত রকমের কুল ও আমের আচার সহ কুলের ছাতু দুধের সাথে আখের ঝোলা গুড় দিয়ে মাখিয়ে পিঠে খাওয়ার মজাই আলাদা। সুভাষিণী সে সব এখন স্মৃতি হয়ে আছে।
◆ পৌষ পাবনের দিন উঠানে চুলো বানিয়ে পিঠে বানানো হতো। আমরা সকল ভাই-বোন মাকে গোল করে ধরে বসে যেতাম। মা সবাইকে পিঠে বানিয়ে এক এক করে পরিবেশন করত। খেজুরের গুড় মাখিয়ে আনন্দ করে পিঠে খেতাম আর ভাই বোনের খুনসুটি জড়াজড়ি ছিলই।
◆ সুভাষিনী মাতৃস্নেহে বঞ্চিত ছিল বলে সহজেই জয়ন্তীর মায়ের বিশেষ অনুগত হয়ে পড়ে।
◆ তিনি সর্বদা সুভাষিনী কে বলিতেন “তুমি আমার জয়ন্তীর ছোট বোন।” জয়ন্তী থেকে সুভাষিনী ছয় মাসের ছোট ছিল।
◆ হঠাৎ করে জাহাজে কর্মরত এক যুবকের সাথে জয়ন্তীর বিয়ে হয়ে যায়। তিন মাস স্বামীর আদর সোহাগ ভালোবাসা পাওয়ার পর তার স্বামী জাহাজের কর্মে ফিরে যায়। জয়ন্তী বেশির ভাগ সময় বাবার বাড়িতে বসবাস করে। স্বামী বাড়িতে থাকাকালীন শ্বশুরবাড়িতে থাকে।
◆ তার স্বামী ভবতোষ চিঠিপত্রের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সুখ দুঃখের মনের কথা বলতে পছন্দ করেন। সমুদ্রের জলের মাঝে সব সময় নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই মোবাইলে বেশি সময় ধরে কথা বলা বিরক্ত বোধ করে।
◆ চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত জলের আশায় স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ দিন অপেক্ষায় থাকা। বিশেষ করে বিবাহিত জীবনে নারীদের চিঠি পাওয়ার উদ্বেগ বেশি থাকতো। পিয়নের সাইকেলের বেলের আওয়াজ শুনে প্রাণ চমকে ওঠে তারপর যদি স্বামীর চিঠি না আসে।
◆ স্বামী বাইরে থাকা নারীদের বান্ধবীরাও কিন্তু বান্ধবীর স্বামীর চিঠি কথা কথন পড়ার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ আবেগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। আর তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে আনন্দ অনুভব করে।
◆ একদিন রাতে সুভাষিনী কে বিছানায় একান্ত ভাবে পেয়ে জয়ন্তী বলে :- কুমারীর সময় এক প্রকার ভালই ছিলাম। কয়েক মাসের ভালোবাসার মাধ্যমে আমার যৌবনে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই যৌবন জ্বালার আগুন নেভাবো কেমন করে। বলে সুভাষিনী কে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী বলে :- এই জয়ন্তী পাগল হয়ে গেলি নাকি, ছায়া ব্লাউজ খুলে একি হচ্ছে।
জয়ন্তী কামে উত্তেজিত হয়ে বান্ধবী কে বিবস্ত্র করে বলে :- তুইতো, মহেন্দ্র মাস্টারের বিয়ে না করেই কিন্তু তোর যৌবন জ্বালা ঠিক মিটিয়ে চলেছিস।
◆ সুভাষিনী হাসতে হাসতে জয়ন্তীর বুকের উপর শুয়ে বলে :- আমার প্রতি যদি তোর এতই হিংসা হয়, তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখ।
◆ জয়ন্তী বলে :- মাস্টারকে তুই বিয়ে করবি না।
◆ সুভাষিনী বলে :- খোড়া মাস্টার কে কখনোই বিয়ে করবো না। সময়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার সাথে যৌবনের আলিঙ্গন চলতে থাকবে।
◆ জয়ন্তী বলে :- মামাতো ভাই পরেশের ভালোবাসা তাহলে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তুই তো সবই জানিস। ১২ বছর বয়সের সময় মাসিক ধর্ম শুরু হয়, তখন থেকেই আমার দেহে অস্বাভাবিকভাবে যৌন তৃষ্ণা বৃদ্ধি ঘটেছে। বিকৃত যৌন তৃষ্ণার কারণেই আমি সব সময় ছেলেদের সঙ্গ পছন্দ করি কিন্তু বাবা-মা তা কখনোই বোঝেনা। সৎ মায়ের তো বোঝা উচিত ছিল।
◆ জয়ন্তী বলে :- আমি বিয়ে করে আর তুই বিয়ে না করেই, কিন্তু একই জ্বালা যন্ত্রণায় দুজনেই ভোগ করছি।
◆ বান্ধবী জয়ন্তী প্রায় দিন সুভাষিনীর বাড়িতে আসে। আর দুই বান্ধবী মিলে জমিয়ে আড্ডা দিতে থাকে।
সুভাষিনী তার বান্ধবী জয়ন্তীর নিয়ে কবিতা লেখা।
কাদার মুলে পদ্মফুল থাকে।
সূর্য্যদেব তাহার খোঁজ রাখে না।
জলের উপর পদ্ম ফুলটি
প্রস্ফুটিত হয়ে আনন্দিত হয়।
বাতাস তাকে দোল দেয়,
ভ্রমর তার মধু পান করে।
জয়ন্তীর দোষ কোথায়।
আভিজাত্যের অহংকারে মানুষের
মন মানসিকতা নিম্ন স্তর হয়েছে।
◆ সুভাষিনীর পিতা শশীকান্ত বাবু কিন্তু জয়ন্তী কে বিশেষভাবে স্নেহ ভালোবাসা করে। মাঝেমধ্যে মোটর গাড়ি করে সুভাষিনী, জয়ন্তী ও মাস্টার মহেন্দ্র বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে চলে যায়।
বান্ধবী জয়ন্তীর বাড়িতে মাঝে মধ্যে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে সবাই মিলে হাজির হয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে।
-------------------------------------------------
-------------------------------------------------------
।। একাদশ অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------
◆ বিনোদ তার বন্ধু রবিন কে বলে :- ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি চিন্তা করতে করতে তুই তো একদিন পাগল হয়ে যাবি, জীবনের দুর্ঘটনা মনে করে জীবন থেকে পরিত্যাগ কর।
◆ রবিন বলে :- আমার আর কোন কিছু ভাল লাগেনা, মনে হচ্ছে আমার ডাক্তারি পড়া আর হবে না।
◆ বিনোদ বলে :- প্রেমে ব্যর্থ হলে সবাই পাগলের প্রলাপ বকতে থাকে। চিন্তা মুক্ত হতে হলে কিন্তু মদ পান করতে হবে।
◆ রবিন পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে বলে :- ভালো ব্র্যান্ডের মদটা নিয়ে আসবি আর সাথে খাবার।
◆ রুমে থাকা আরও দুজন বন্ধু বলে, আমাদের সাথে রাখিস বলে আরো কিছু টাকা বিনোদের হাতে দেয়।
ছাত্রাবাসে একত্রে বসবাসকারী ছাত্র গণ দরজা আটকে দিয়ে চার বন্ধু মদ্যপান শুরু করে।
◆ বিনোদ আনন্দে বলে উঠে,
মানব জীবন দুর্লভ ও মধুর জীবন।
মদ্যপানে আনন্দ বজায় রেখো।
মনের উৎফুল্ল ভাব সৃষ্টিকারী,
সবাইকে চিন্তা মুক্ত রাখে।
◆ রবিন তার বন্ধু অনির্বাণকে বলে :- তুই তো ইতিহাসের ছাত্র। মদের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বল।
◆ বিনোদ বলে :- আরে অনির্বাণ কি বলবে? মদের ইতিহাস আমার কাছ থেকে শোন। ছোট ছোট করে প্যাক বানা আর পান করবো ও মদ পানের ইতিহাস বলবো।
◆ রবিন মদের গ্লাস ও খাবার এগিয়ে দিয়ে বলে তাহলে শুরু কর।
◆ বিনোদ কয়েক প্যাক পান করে খাবার মুখে দিয়ে বলে :- লেখক অর্নিবাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
"মদ্যের মদালসা" নামক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মদের ইতিহাস কিন্তু মানবসভ্যতার কৃষি-শিল্পের মতোই কয়েক হাজার বছরের পুরানো ইতিহাস। ইতিহাসবিদগণ বলেছেন, প্রাচীন জর্জিয়া, ইরান, আর্মেনিয়া অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ সাল থেকে ৬০০০ সাল সময়ের মধ্যে প্রথম মদ উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
আদি গ্রিসের ম্যাসিডোনিয়া, মিশর এবং চিন দেশেও মদের বেশ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। তখন মদ ছিল মূলত দ্রাক্ষারস বা প্রক্রিয়াজাত আঙ্গুর ফলের নির্যাস।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ভারতবর্ষে প্রথম আফিম চাষ ও আফিম ব্যবসা শুরু করেছিল। একটি ফরমান জারী ও কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে আফিম উৎপাদন করে চিনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকে এবং এদেশে আফিমের দোকান চালু করে ।
১৮৫৭ সালে আফিম ব্যাবসাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এনে প্রথম আফিম আইন প্রবর্তন করে। ১৮৭৮ সনে আফিম আইন সংশোধন করে আফিম ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতঃপর গাঁজা ও মদ থেকেও রাজস্ব আদায় শুরু হয়।
১৯০৯ সালে বেঙ্গল এক্সাইজ অ্যাক্ট ও বেঙ্গল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। আফিম, মদ ও গাঁজা ছাড়াও আফিম ও কোকেন দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রসার ঘটলে ১৯৩০ সালে সরকার ‘The Dangerous Drugs Act-1930’ প্রণয়ন করে। একইভাবে সরকার আফিম সেবন নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৩২ সালে ‘The Opium Smoking Act-1932’ প্রণয়ন এবং ১৯৩৯ সালে ‘The Dangerous Drugs Rules-1939’ প্রণয়ন করে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদের জন্য মদ পান নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৫০ সনে ‘TheProhibtion Rules-1950’ তৈরি হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সনে ‘The Opium sales Rules-1957’ প্রণীত হয়। এরপর ষাটের দশকে বেঙ্গল এক্সাইজ ডিপার্টমেন্টকে ‘এক্সাইজ এন্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্ট’ হিসাবে নামকরণ করে অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যস্ত করা হয়।
◆ রবিন হাসতে হাসতে বলে :- হাস্যকর এই যে, যাঁরা বিয়ার পান করেন, তাঁরা এটা মদ নয় বলে আত্মতৃপ্তি বোধ করেন।
বিয়ার পৃথিবীর প্রাচীনতম ও জনপ্রিয়তম মদের অন্যতম। সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৩৫ বিলিয়ন গ্যালন (১৩৩ বিলিয়ন লিটার) বিয়ার বিক্রি হয়। মার্কিন ঘরে বানানো বিয়ার প্রতিযোগিতার উদ্যোক্তাদের মতে ৭০ থেকে ৮০ ধরনের আলাদা আলাদা বিয়ার আছে। প্রতি বছরই বিয়ারের নতুন নতুন ক্লেভার যোগ করা হয়।
◆ নরেন বলে :- মদের ধর্ম তথা গুণাগুণের উপর ভিত্তি করে পণ্ডিতেরা মূল শ্রেণিবিন্যাস করে থাকেন। সেটি তিনভাগে বিভক্ত – (১) Fermented Liquors (গাঁজানো মদ) : যেমন -- আপেল মদ (Cider Wine), দ্রাক্ষা মদ (Grape Wine), বিয়ার (Beer), তাড়ি মদ, পান্তা মদ (Rice Wine) ইত্যাদি।
(২) পাতিত মদ (Spirituous Liquors/Distilled Liquors) : যেমন -- হুইস্কি (Whisky), রাম (Rum), ব্রান্ডি (Brandy), টাকিলা (Tequila), ভদকা (Vodka), চিনা সাদা মদ (White Wine) ইত্যাদি।
৩) পরিশোধিত মিশ্র মদ (Refined & comprehensive drinks) : যেমন -- জিন (Gin), ভেরমাউথ ( Vermouth), লিকার (liqueur), বিটার (Bitter) ইত্যাদি।
◆ অনির্বাণ বলে :- মদের মধ্যে সবার উপরে বিয়ার রয়েছে । মদ্যপান শুরু করার সময় বিয়ারের মাধ্যমেই প্রায় বেশিরভাগ মানুষের হাতেখড়ি হয়ে থাকে। বিয়ার খুব কম দামে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত স্থানেই পাওয়া যায়। তাই মদের মধ্যে বিয়ারের জুড়ি মেলা ভার।
◆ মদ হিসাবে ওয়াইন (Wine) দ্বিতীয় নম্বরে আছে ।
◆ মদ হিসাবে ভদকা (Vodka) তৃতীয় নম্বরে আছে। ‘ভদকা’ শব্দটি এসেছে রুশ শব্দ ‘ভোদা’ থেকে, যার অর্থ ‘জল’,। এটি তখন ভদকা হিসেবে পরিচিত ছিলো না, এটিকে তখন ‘ব্রেড ওয়াইন’ নামে ডাকা হত। কড়া মদের মধ্যে ভদকা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয়। জল ও ইথাইল অ্যালকোহলের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার ফ্লেভার মিশ্রিত করে ভদকা তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের দানাশস্য, যেমন - রাই, গম এবং আলু, মিষ্টি আলু, চিটাগুড়, প্রভৃতির যে-কোনো একটির গাঁজনকৃত তরল থেকে ভদকা তৈরি করা সম্ভব। ভদকায় অ্যালকোহলের উপস্থিতি সাধারণত শতকরা ৩৫ থেকে ৫০ ভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। রাশিয়ান, লিথুনিয়ান, পোলীয় ভদকার ক্ষেত্রে এর আদর্শ পরিমাণ মোট আয়তনের শতকরা ৪০ ভাগ (৮০% প্রুফ)।
কিংবদন্তী অনুসারে ১৪৩০ সালে একজন সাধু, মস্কোর ক্রেমলিনের ভেতরে চুদোভ মনাস্ট্রিতে সর্বপ্রথম রুশ ভদকার প্রস্তুত প্রণালী তৈরি করেন। পাতনের যন্ত্র এবং বিশেষ জ্ঞান থাকায় তিনি নতুন ধরনের, উচ্চ মানসম্পন্ন একটি অ্যালকোহলিক পানীয়র আবিষ্কারক হয়ে ওঠেন। এই ‘ব্রেড ওয়াইন’ (সেসময় যে নামে পরিচিত ছিল) একটি বড়ো সময় ধরে শুধু মস্কোতেই পাওয়া যেত। এই মদ শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত তা বাইরে পৌঁছোয়নি। এই কারণে এই পানীয়ের সঙ্গে মস্কোর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে ভদকার জন্ম চোদ্দো শতকের দিকে, রাশিয়ায়। কিন্তু ভদকার উৎপত্তির সুনির্দিষ্ট স্থানটি জানা যায় না। বিশ্বাস করা হয় এটির উৎপত্তি হয়েছে দানাশস্য উৎপাদনকারী দেশগুলোতে, যার মধ্যে আছে বর্তমানের পোল্যান্ড, পশ্চিম রাশিয়া, বেলারুশ, লিথুনিয়া, এবং ইউক্রেইন। এছাড়া এটি স্ক্যানডিনেভিয়ার একটি অনেক দিনের পুরোনো ঐতিহ্য। ১৭৫১ সালে, ৮ জুন রুশ অফিসিয়াল কাগজপত্রে ‘ভদকা’ শব্দটির প্রথম লিখিত ব্যবহার হয় রুশ সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথের এক আদেশপত্রে।
ভদকা ডিসটিলারিসের মালিকানাস্বত্ব দাবি করে এই আদেশপত্র জারি করা হয়েছিল। ভদকা থেকে প্রাপ্ত শুল্ক ছিল জার শাসনামলের রাশিয়ার অর্থাগমের একটি বড়ো উৎস। তখন সরকারি রাজস্বের প্রায় ৪০% আসত শুধু ভদকা সংক্রান্ত বাণিজ্য থেকে।
ভদকা পুরুষদের তুলনায় নারীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। যাঁরা চড়া মদ পান করতে অভ্যস্ত, তাঁদের পক্ষে খুবই উপকারী ভদকা। ভদকার সঙ্গে কমলালেবুর রস মিশিয়ে খেলে সব থেকে বেশি ভালো লাগে। এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলের রস দিয়েই বানানো হয়ে থাকে এই পানীয়টিকে।
ভদকা জাদুঘরের প্রতিবেদন অনুযায়ী রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্দেলিয়েফ আদর্শ অ্যালকোহলের পরিমাণ ৩৮% নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেসময় পাতিত স্পিরিটের শুল্ক নির্ধারণ করা হত অ্যালকোহলিক শক্তিক্ষমতা অনুযায়ী, আর এই শুল্ক নির্ধারণী হিসাব সহজ করতে এই হার কিছুটা বাড়িয়ে ৪০% করা হয়। এ ধরনের কড়া মদের ক্ষেত্রে ভদকা হিসাবে পরিচিত হওয়ার জন্য সরকার একটি সর্বনিম্ন অ্যালকোহলিক প্রুফ নির্ধারণ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্ধারিত, ইউরোপীয় ভদকার ক্ষেত্রে এই অ্যালকোহলের পরিমাণের হার হচ্ছে ৩৭.৫%। বিশ্বে কড়া মদের মধ্যে ভদকা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয়। জল ও ইথাইল অ্যালকোহলের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার ফ্লেভার মিশ্রিত করে ভদকা তৈরি হয়। কিন্তু ভদকার শুধু মদালসাতেই কাজ শেষ হয় না। ভদকার অনেক কার্যকারিতা আছে।
◆ অখিলেশ বলে :- ভোদকা বিষয়ে কার্যকারী তথ্য – (১) ভদকায় চিনি মিশিয়ে ছিটিয়ে ফুল সতেজ থাকে। (২) জলের সঙ্গে ভদকা মিশিয়ে লাগালে চশমার কাচ খুব তাড়াতাড়ি দারুণ পরিষ্কার করা যায়। (৩) গদি, তোশক বা ম্যাটট্রেসের জীবাণুমুক্ত হয়। (৪) রুপোর গয়না পালিশ করে ঔজ্বল্য বাড়াতে ভদকা ব্যবহার করা হয়। (৫) ব্যান্ড-এইড চামড়ার সঙ্গে এমনভাবে আটকে গিয়েছে যা তোলা বেশ কষ্টকর মনে হলে তুলোয় করে ভদকা লাগিয়ে দিলে তা সহজেই উঠে যায়। (৬) জামা-কাপড়ের দুর্গন্ধমুক্ত করতে দারুণ সাহায্য করে ভদকা। (৭) চুল পরিষ্কারে ভদকার কোনো তুলনা হয় না। (৮) ঘরে মাউথওয়াশ তৈরি করতে ভদকার কোনো জুড়ি নেই। (৯) ঘরে খুব পোকামাকড় হলে ভদকা স্প্রে করলে কাজ হবে। (১০) কালো কাপড়ের রং ঠিক রাখতে জলের সঙ্গে ভদকা মিশিয়ে লাগালে খুব কাজে লাগে।
◆ বিনোদ বলে :- অ্যাবসিনতে পানীয়টিকে বেশ কয়েকটি দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঝাঁঝের দিক থেকে সবার উপরে অ্যাবসিনতে নামক পানীয়টি। তবে উনিশ শতকে মধ্য ইউরোপে এই পানীয়টি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বেশিরভাগ দেশে বন্ধ করে দেওয়া হলেও, এখনও ভালো চাহিদা আছে এই সবুজ রঙা পানীয়টির।
◆ রবিন বলে :- শ্যাম্পেনের কথা না-বললে আলোচনা অসমাপ্ত হয়ে থাকবে। শ্যাম্পেন এই পানীয় সাধারণত আঙুরের রস পচিয়ে তৈরি করা হয়। অবশ্য এই পানীয় যতবেশি পুরনো হয় তত বেড়ে যায় এটির দাম। শ্যাম্পেন মূলত ফ্রান্সেই তৈরি করা হয়। ফ্রান্সে তৈরি করা শ্যাম্পেন দীর্ঘদিন ধরেই পানীয়ের জগতের শিরোমনি হয়ে আছে। সম্প্রতি একদল গবেষক ১৭০ বছরের পুরনো শ্যাম্পেন পরীক্ষা করে দেখছেন এর প্রাচীন প্রস্তুত প্রণালী বের করার চেষ্টা করেছেন।
২০১০ সালে বাল্টিক সাগরের তলদেশ থেকে একদল ডুবুরি ১৭০ বছরের পুরনো ১৬৮ বোতল শ্যাম্পেন উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত বোতলগুলোর মধ্যে বেশকিছু বোতলে সাগরের নোনা জল ঢুকে নষ্ট হয়ে গেলেও, কিছু বোতল অক্ষতই ছিল। সেই অক্ষত শ্যাম্পেনের বোতলগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ফ্রান্সের আদি ওয়াইন প্রস্তুতকারকরা শ্যাম্পেন তৈরিতে আধুনিক সময়ের তুলনায় অধিক চিনি ব্যবহার করত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই শ্যাম্পেনে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আর্সেনিকও পাওয়া গেছে। কিন্তু শ্যাম্পেন তৈরিতে তৎকালীন ওয়াইন প্রস্তুতকারকরা কেন আর্সেনিকের মতো বিষ ব্যবহার করত তা জানা যায়নি। ১৭০ বছরের পুরনো শ্যাম্পেন চেখে দেখেছিলেন ফরাসি অধ্যাপক ও ওয়াইন বিশেষজ্ঞ ফিলিপ জেনদার্ত। অবশ্য ফিলিপের পক্ষে মাত্র একশো মাইক্রোলিটার শ্যাম্পেন চেখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই অল্প একটু পানীয় চেখে দেখার পর ফিলিপ যা বলেছিলেন তা হল – “এর ঘ্রাণ নেওয়া এককথায় অসম্ভব। কিন্তু এটা সত্যিই দুর্দান্ত। এর স্বাদ অনেকটা তামাক এবং চামড়ার সঙ্গে মিলে যায়। তবে অতটুকু পানীয় পান করার পরবর্তী তিন ঘণ্টা পর্যন্ত এর স্বাদ আমার মুখে ছিল।”
শ্যাম্পেন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শিল্পকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। শ্যাম্পেন উৎপাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঙুরের বাগান, ওয়াইনের সেলার এবং বিক্রয় কেন্দ্রগুলোকে সাংস্কৃতিকভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করে ইউনেস্কো। এক বৈঠকে বিশ্বের ১১টি সাইটের সঙ্গে এটিকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয় ইউনেস্কো। এ মর্যাদা পাওয়ার কারণে এখন থেকে শ্যাম্পেন উৎপাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো বিশেষ সুরক্ষা পাবে।
ইউনেস্কো বলছে, শ্যাম্পেন উৎপাদন এমন এক শৈল্পিক প্রক্রিয়া, যা কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোগের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
◆ অনির্বাণ বলে :- বাংলা মদ তাড়ি। দুধ-সাদা রঙের তাড়ি তালগাছের রস গেঁজিয়ে তৈরি দেশি মদ। তাড়ি ‘পচানি’ নামেও পরিচিত। এই তাড়ি বা বাংলা মদ বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। ভদকা যেমন রাশিয়ার। তেমনই তাড়ি বাংলার একটি ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতির একটি উপাদান। সেই প্রাচীন আমল থেকেই বাংলার প্রাচীন আদিবাসীরা এর প্রাচীন তৈরি পদ্ধতি এখনও ধরে রেখেছে।
◆ উৎপাদন পদ্ধতি : বাংলায় তৈরির প্রাচীনকালের সেই পদ্ধতি এখনও তাড়ির উৎপাদকরা মেনে চলে। এর জন্য প্রয়োজন তাল গাছ। তবে সে তাল গাছ মর্দা (পুরুষ) হলে ভালো হয়, যে গাছে ফল বা তাল হয় না। পুরুষ তালগাছের রস ভালো পাওয়া যায়। মাদি (স্ত্রী) গাছ অর্থাৎ তাল হয় এমন গাছেও রস পাওয়া যায়, তবে তা কম। এই পুরুষ গাছের এক প্রকার জটা বের হয়। দেখতে লম্বা ও চিকন ঠিক জলের পাইপের মতো দেখতে। এই জটাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কেটে এবং মন্থন করে এই জটার নীচে মাটির ঠিলে (হাড়ি) পাতা হয়। এই রস দুই তিন দিন পর সংগ্রহ করা হয়। দুই-তিনদিন পর রস সংগ্রহ করার ফলে রস যেমন বেশি পাওয়া যায়, তেমনই রোদের তাপে রসগুলি বেশ জাগ (পচে যায়) হয়। এই রস সংগ্রহ করে আনার পর তা বড়ো একটা পাতিলে (হাড়ি) সংরক্ষণ করা হয়। তবে প্রতিদিন সংগ্রহ করা রস খুব সুস্বাদু ও মিষ্টি। দিন কয়েক আগে বিহারে বিষমদ খেয়ে মৃত্যু হয় ১৬ জনের। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিহারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব এইসব বিষমদের পরিবর্তে তাড়ি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তাড়ি পান করলে নেশা নেশা ভাব, মনে জাগে আনন্দ হয়। গ্রীষ্মের সকালে গ্রাম বাংলায় ঠান্ডা, মিষ্টি, উত্তেজক এই পানীয়টির সন্ধান মেলে। কিন্তু বেলা গড়িয়ে ওই রস যখন ‘ফ্রাগমেন্টেড’ হয়ে নেশার সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয়, তখন তার কদর বাড়ে নেশারুদের মধ্যে। সে তখন তাড়ি।
আদিবাসীদের প্রিয় নেশার দ্রব্য তো বটেই, দেশজ মদের স্বাদ নিতে ভিড় জমান আসক্তেরাও। চৈত্র মাসের শুরু থেকে জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি এমন তাড়িতেই বুঁদ হয়ে থাকেন মদ্যপায়ী মানুষেরা। অনেকে বলেন, তাড়ি পান করলে পেটের কসা-খিঁচাও নাকি দূর হয়ে যায়। কোষ্টকাঠিন্য দূর হয়। সকালে আশ্চর্যজনকভাবে পেট পরিষ্কার হয়ে যায়।
◆ অখিলেশ বলে :- মহুয়া হল এক প্রকার দেশি মদ, যা মহুয়া গাছ (Madhuca longfolia) এর ফুল থেকে তৈরি করা হয়। ভারতের মহারাষ্ট্র, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং ছত্রিশগড়ের সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতীয় সম্প্রদায় এই মদ
তৈরি করে। দেশি মদের ভিতর এই মদ একটু দামি। এই মদে মিষ্টি একটা গন্ধ পাওয়া যায়। এর রস ক্ষুধাবৃদ্ধিকারক, বলকারক। এই মদ পশ্চিমবাংলার সাঁওতাল পরগণা এবং বাঁকুড়া জেলায় প্রচুর তৈরি হয়। এর ফুলের রস চিনির সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে গাত্রদাহ, কাশি নিরাময় হয়।
◆ বিনোদ বলে :- হাঁড়িয়া হল ভাত থেকে তৈরি এক প্রকার বিয়ার জাতীয় মদ, যা ভারতের বিহার,
ঝাড়খন্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্রিশগড়ে প্রস্তত করা হয়। সিদ্ধ ভাত এবং হরীতকী একসঙ্গে গাঁজিয়ে এটি তৈরি করা হয়। হাঁড়িয়া সম্পুর্ণ তৈরি হতে প্রায় সাতদিন সময় লাগে। হাঁড়িয়া ঠান্ডা করে পরিবেশন করা হয়। এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ অন্যান্য দেশি মদের থেকে কম। এটিকে কেউ কেউ বাংলা মদও বলে থাকে। এই মদে একটা উৎকট গন্ধযুক্ত। অ্যালকোহলের মাত্রা ঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয় বলে, এটি পান করা নিরাপদ নয়।
◆ রবিন বলে :- লাখ লাখ টাকা দামি দামি মদের কথা শোন।
◆ (১) গ্লেনফিডিচ স্পেশাল সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি (৫০ বছরের স্পেশাল এডিশন) : এটি একটি হুইস্কি। হুইস্কিটি বছরে মাত্র ৫০ টি বোতল বাজারে আসে। এই হুইস্কিটি ৫০ বছরের পুরোনো এই সেইরকম দামি। এক একটি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১ লক্ষ টাকা।
◆ (২) হাইল্যান্ড পার্ক (৫০ বছরের পুরোনো স্পেশাল সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি) : এটিও হুইস্কি। সারা বিশ্বে মাত্র ২৭৫ টি বোতল বাজারে আনা হয়। হুইস্কিটি বানানো হয় ১৯৬০ সালে। দাম প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা। এই হুইস্কির বোতলটি তৈরি করেছে বিশ্বখ্যাত ‘জিলিস’ নামক কোম্পানি।
◆ (৩) ম্যাকালান (৬০ বছরের পুরোনো স্পেশাল সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি) : শুধু দামে নয়, স্বাদে-গন্ধেও এই হুইস্কির সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া। বোতলের ঢাকনাটি ক্রিস্টালে তৈরি করা এবং প্রত্যেকটা বোতলই ৬০ বছরের পুরোনো। ভারতীয় মুদ্রায় এই মদের প্রতি বোতলের দাম প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা।
◆ (৪) ম্যাকালান ১৯২৬ স্পেশাল হুইস্কি : সারা বিশ্বে মাত্র ৫০ টি বোতল আছে এই মদটির। প্রতি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ৪৭ লক্ষ টাকার একটু বেশি। পৃথিবীর ধনী ব্যক্তিদের সেলারে শোভা পায় এই মদ।
◆ (৫) ডেলিমোর ৬৪ ট্রিনিটাস সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি : সারা বিশ্বে মাত্র তিনখানি বোতল আছে। এটি ৬৪ বছরের পুরোনো মদ। বলা হয় এই হুইস্কিটি তৈরি করার জন্য সবচেয়ে সেরা উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এই জিনিয়াসটির দাম ভারতীয় মুদ্রায় এক কোটি টাকার একটু বেশি।
◆ (৬) ডেলিমোর স্কচ হুইস্কি : ইনিও জিনিয়াস। ১৮৬৮ সালে এই বিশেষ হুইস্কিটি বানানো হয়েছিল। এই জিনিয়াস মদটিকে অনেকে ‘লিকুইড গোল্ড’ নামে জানেন। প্রতিটি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় মাত্র ১ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা।
◆ (৭) ম্যাকালান স্কচ হুইস্কি : ইনিও জিনিয়াস। ৬৪ বছরের পুরোনো এই স্কচ হুইস্কিটি। প্রতিটি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় মাত্র ২ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা।
◆ (৮) মাস্টার অফ মল্ট : জিনিয়াসের জিনিয়াস এই হুইস্কিটি ২০১১ সালে হঠাৎ করেই একটি বাড়ির বেসমেন্টে খুঁজে পাওয়া যায়। এই হুইস্কির বোতলটি তখনই ছিল ১০৫ বছরের পুরোনো। প্রতিটি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় মাত্র ৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা।
◆ (৯) টাকিলা লেঃ ৯২৫ : এই হুইস্কির বিশেষত্ব এর বোতলটি। এই বোতলের অর্ধেক খাঁটি প্লাটিনামে তৈরি, আর বাকি অর্ধেক সাদা সোনা দিয়ে তৈরি। এর সামনের এমব্লেমটিও প্লাটিনামে তৈরি। প্রতিটি বোতলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় মাত্র ৯ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা।
◆ (১০) হেনরি IV হেরিটেজ কোনিয়াক : এটি কোনিয়াকটি আজ পর্যন্ত তৈরি হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে দামি। প্রখ্যাত ডিজাইনার জোস ডাভালোস এই বোতলটির ডিজাইন করেছেন। বোতলটি সোনা এবং প্ল্যাটিনাম দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। বোতলটির সমস্ত শরীর ৬৫০০ টি হিরের টুকরো দিয়ে সাজানো। তবে শুধু বোতল নয়, এই কোনিয়াকটি বানানো হয়েছিল ১৭৭৬ সালে। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাঠের পিপেতে রাখা ছিল বোতলবন্দি করার আগে।
◆ অখিলেশ বলে :- বাবায় তাড়ানো মায়ে খেদানো মানুষের জন্য বাংলা মদ সব চেয়ে ভাল।
----------------------------------------------------------
---------------------------------------------------------- একাদশ অধ্যায়ের সমাপ্ত।
----------------------------------------------------------
-------------------------------------------------------
।। দ্বাদশ অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------
বিনোদ তার বাবার কাছে থেকে নানা ছল চাতুরী করে টাকা নিতে থাকে। তার বাবা ভাবে, বিনোদ শিক্ষিত হয়ে চাকরি করে আমার মুখ নিশ্চয়ই উজ্জ্বল করবে। সেই কারণে বিনোদের অস্বাভাবিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে থাকে।
বিনোদ কলেজ জীবনে অনেকগুলো কলেজ পরিবর্তন করতে হয়েছে কারণ যে কলেজে যায়, সেই কলেজেই আপত্তিকর কিছু ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। কলেজ বদল করতে করতে এক সময় বিএ পাস করে। ছোটবেলার গানের গলা কলকাতায় আসার পর কাজে লাগিয়ে সুগায়ক নামে পরিচিত লাভ করে। কয়েকজন ছাত্রীর গানের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করেছিল কিন্তু তার স্বভাব অনুসারে উক্ত ছাত্রীর প্রেম নিবেদন করার কারণে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
◆ প্রকৃতির রোষানলে পড়ে প্রায় চার বছর চাষবাস সারাদেশের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে ওঠে। বিনোদ এর বাবা সংসারের খরচ কমাতে শুরু করে কিন্তু বাড়িতে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ লেগেই থাকে। বিনোদনের বাবা নিষ্ঠাবান আস্তিক হৃদয় দেব পূজা সম্বন্ধে কোন প্রকার ব্যয় সংক্ষেপে করে না। তার কারণে বহু টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
আবার তার দুটি কন্যার বিবাহ দিতে গিয়ে নতুন করে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিনোদের কাকাতো দাদা অখিলেশ বাড়ির একমাত্র অভিভাবক হয়ে উঠেছে।
দুর্ভাগ্য ক্রমে এক বছর অতিক্রম করতে না করতেই বড় মেয়ে বিধবা হয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসে। আবার এক বছর পর তার ছোট মেয়ে বিধবা হয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করতে থাকে।
মেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলেছে, তার মেয়ে নাকি অপয়া তার জন্যই তাদের স্বামী মারা গিয়েছে। সেই কারণ দেখিয়ে শশুর বাড়ি থেকে দুটি মেয়ে কে বিতাড়িত করেছে।
সুদে নেওয়া টাকা পরিশোধ করতে না পারার কারণে দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে সুদ আসলে বাড়তে থাকে।
বিনোদ তার বাবার করুণ পরিস্থিতি কথা জানা সত্ত্বেও কিন্তু তার বিলাসিতা কোন প্রকার কম করেনি, বরং আরো বৃদ্ধি ঘটেছে।
আরো কিছুদিন পর তার বাবা ছেলেকে সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য তাদের পছন্দমত একটি মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়। বিনোদের বাবা যৌতুক নেওয়া এবং দেওয়া দুটোকেই ভীষণভাবে অপছন্দ করতেন। তার কারণে ছেলের শশুরের কাছে থেকে কোন যৌতুক নেননি। ছেলের বিয়ে দিতে গিয়ে আবার বেশি পরিমাণে টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
বিনোদের কাকাতো দাদা অখিলেশ বাড়িতে একটি ধর্মীয় শিক্ষা দান স্কুল স্থাপন করেন। ধর্মীয় স্কুলে সাত জন ছেলে ভর্তি হয় তাদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করে। এই সংসারে অখিলেশের দুটি ছেলে। বিনোদের বাবা অখিলেশের উপরেই তার আত্মবিশ্বাস ও ভরসা সব থেকে বেশি।
অখিলেশের সাধারণ সাদাসিধে চালচলনের কারণে বিনোদ কখনোই তাকে পছন্দ করে না কিন্তু প্রকাশ্যে কোনদিন তার বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে সাহস পেত না। বিনোদ জানে তার বাবার কানে দাদার বিরুদ্ধে কোন নালিশ গেলে তার বাবা তাকে কিন্তু কোনদিন ক্ষমা করবে না। কারণ তার উশৃংখল জীবনের ঘটনাগুলো তার বাবা জেনে গিয়েছে।
বিনোদের বিয়ের ঠিক পাঁচ মাস পর তার বাবা অতিরিক্ত চিন্তা ভাবনা করার কারণে হঠাৎ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরিবারের আর কেউ বিপদে পড়ুক আর না পড়ুক বিনোদ কিন্তু চারিদিকে অন্ধকার দেখতে শুরু করে। তার বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি করতে গিয়ে কিন্তু আবার তার দাদা অখিলের ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে ।
সংসারের ব্যয় কমানো নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
◆ বিনোদ বলে :- দাদা, তোমার ওই ধর্মীয় স্কুল বন্ধ করে দাও।
◆ অখিলেশ বলে :- তা কোন প্রকারের সম্ভব নয় কাকাবাবুর ইচ্ছা অনুসারে স্কুল হয়েছে। তার আত্মার শান্তি কামনার জন্য অবশ্যই স্কুলটি আমি চালিয়ে যাবো।
ধর্মীয় স্কুল প্রসঙ্গ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে চরম পর্যায়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। বিনোদ তার দাদাকে অতীত, বর্তমানের ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিভিন্নভাবে অপমানজনক কথা বার্তা বলতে থাকে।
◆ দাদা অখিলেশ শান্তভাবে তার ভাই কে বলেন :- বিনোদ; আমি বুঝতে পারছি, তুমি খুব উত্তেজিত হয়ে আছে। যে কথাগুলো আমাকে বললে ভবিষ্যতে এই কথাগুলোর জন্য তোমার মনে অবশ্যই অনুতাপ করতে হবে। আমি তোমার কখনোই অমঙ্গল চাইনি আর কোনদিন চাইবোও না।
◆ বিনোদ ক্রোধিত হয়ে বলে :- আমি আর তোমাদের সাথে থাকতে রাজি নই, তোমার ধর্মীয় স্কুল যদি চালাতে হয় তাহলে নিজের আয় রোজগারের মাধ্যমে চালাও।
◆ অখিলেশ বলেন :- একথা তুমি অবশ্যই বলতে পারো, আমি আমার জীবনের ব্রত হিসাবে বেছে নিয়েছি। আজ ধর্মীয় প্রভাবের শিক্ষা না থাকার জন্য ছেলেমেয়েরা অধঃপতনে চলে যাচ্ছে। তোমার জীবন দিয়েই উপলব্ধি করো। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় কোন অনুশাসন নেই। ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে থাকলে কিন্তু মানুষ পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। বেশি স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা মানুষকে পতনের দিকেই নিয়ে যায়। আধুনিক প্রযুক্তি কখনোই খারাপ নয় কিন্তু তাকে অপব্যবহার সবচাইতে বেশি করা হয়ে থাকে।
তোমাকে ধর্মীয় স্কুলের ব্যয় বহন করার কোন সংযত কারণ নেই। আমার চোখে মানুষের কল্যাণের জন্য যে বিষয়টি চিন্তা ভাবনা করেছি এবং জগত সংসারের মাঝে যা অরাজকতা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু সেই চিন্তাভাবনা বা দেখার মধ্যে আমাদের দুজনের অনেক পার্থক্য আছে।
তুমি যদি এই সংসার থেকে পৃথক হয়ে বসবাস করতে চাও তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।
তারপর গ্রামের প্রধান ও মেম্বার সহ আরো দশজনকে ডেকে নিয়ে সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র ভাগাভাগি হয়ে যায়। চাষের জমি ও বাড়ির জমি পাঁচ ভাগে ভাগ হয়। অখিলেশ, বিনোদ, বিনোদের মা ও তার দুই ছোট বোন।
বিনোদের আলাদা হওয়ার এক সপ্তাহ পর বাবার কাছে টাকা পাওনাদার বিনোদের আপন জেঠা মশাই আবির রঞ্জন মহাশয় পত্রের মাধ্যমে তার বাবার টাকা কে টাকার সুদ আসলে পরিশোধ করার জন্য বলা হয়েছে।
বিনোদ মহাজনের সাথে বসে কথা বলে জানতে পারে তার ভাগের জমি গুলোর দলিল কিন্তু তার বাবা মহাজনের কাছে জমা রেখে টাকা নিয়েছে।
বিনোদ ভাবে, এইটা দাদার সবচাইতে বড় চালাকি কারণ যে দলিলগুলো মহাজনের কাছে জমা দিয়ে বাবা টাকা নিয়েছিল ঠিক বেছে বেছে সেই জমিগুলোই আমাকে দেওয়া হয়েছে। যৌথ পরিবারে বসবাস করাকালীন বাবা যে টাকা ঋণ করেছে তা তো দুই ভাইকেই শোধ করার কথা। বাবার নিবুদ্ধিতা ও দাদার চালাকির জন্যই সবকিছু হাতের মুঠোয় পেয়ে ভিখারি হতে হবে। দুই বোন তো দাদার সঙ্গে যোগ দিয়েছে। একমাত্র মা আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমাকে পথের ভিখারী বানানোর জন্যই দাদা কিন্তু এক কথায় সংসার থেকে আলাদা হওয়ার প্রস্তাব কে মেনে নিয়েছেন।
বৌদি কোন দিকে সমর্থন করছে তা কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
বিনোদ এলাকার আদালতে গিয়ে কয়েকজন উকিলের সাথে বিস্তারিত বিবরণ বলে তাদের পরামর্শ জানতে চাই।
◆ উকিল মহাশয় বলেন :- একান্নবর্তী পরিবারের থাকাকালীন অভিভাবক ঋণগ্রস্ত হলে কিন্তু পরবর্তী পরিবারের সদস্যরা দায়ী থাকে। উক্ত ঋণ পরিবারের সকল সদস্যদের কে শোধ করতে হবে। ঋণ শোধ না করে সংসার থেকে আলাদা হয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মেরেছো।
বিনোদ আবার তার মহাজন জ্যাঠামশাই এর কাছে গিয়ে দাদার বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করার জন্য আবেদন করে।
◆ জ্যাঠামশাই রাজি না হয়ে বলেন :- আমি এতসব ঝামেলার মধ্যে যেতে চাই না তোমার বাবা জমি বন্ধক রেখে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে সেই জমিগুলো আমাকে হস্তান্তর করে দাও সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
◆ বিনোদ বলে, তাহলে তো আমার বসবাসের আর কোন জায়গা থাকবে না। আমার প্রতি দয়া করুন।
জ্যাঠামশাই বলেন :- কেন থাকবে না, তোমার মায়ের ভাগের জায়গায় থাকবে। বাড়ির জমির সাথে মাঠের জমি বিনিময় করে নেওয়া হবে।
বিনোদ আলাদা হওয়ার পর থেকে তার দাদার সাথে কথাবার্তা একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দুজন কিন্তু দুজনার শত্রু রূপে গণ্য হয়েছে।
একদিন বিনোদ গ্রামের কয়েকজন মান্যগণ্য ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে আদালতে না গিয়ে নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে নেওয়ার জন্য তাদেরকে নিয়ে মহাজন জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়।
উপস্থিত লোকজনের সাথে তার জ্যাঠামশাইয়ের আলোচনা করার পর জ্যাঠামশাই বলেন বসবাসের জন্য বাড়ির চার বিঘা জমি আমি ছেড়ে দিলাম কিন্তু মাঠের ২৫ বিঘা জমি আমার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
◆ বিনোদ বলে :- জ্যাঠামশাই আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি।
এই প্রস্তাব অনুসারে কয়েকদিন পর আদালতের ইস্টাম পেপার ও একজন মুহুরী ডেকে লিখিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সেই মুহূর্তে বিনোদের বরদা অখিলেশ মহাশয় উপস্থিত।
◆ তারপর অখিলেশ মহাজনের কাছে থেকে তার হিসাব নিকাশ পরীক্ষা করে বলেন :- কাকাবাবু একান্নবর্তী পরিবার থেকে যখন ঋণগ্রস্ত হয়েছে। তাহলে তার দায়ভার আমাদের দুই ভাইয়ের উপর পড়ে কিন্তু বিনোদ একা সেই ঋণ শোধ করবে কেন! আমার অংশ থেকে আর বিনোদের অংশ থেকে জমি নিয়ে কাকাবাবু কে ঋণ মুক্ত করে তার আত্মাকে শান্তি দিন। আর বিনোদের বসতবাড়ির জন্য যে দয়া দেখিয়েছেন সেটাও আমাদের লাগবে না। বিনোদের দাদা মানবতাহীন হয়ে পড়েনিএখনো জীবিত আছে।
◆ বিনোদ দ্রুত উঠে তার দাদার পা জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে:- দাদা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও দেবতুল্য দাদাকে অবুঝের মত শুধু অপমান করেছি দাদা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাকে অধঃপতন বানিয়েছে। দাদা আমি আর আলাদাভাবে সংসারে বসবাস করতে চাই না। আমাকে তুমি গ্রহণ করো।
দাদা অখিলেশ তার ভাই বিনোদকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বিনোদের চোখের জল মুছে দিতে থাকে।
◆ অখিলেশ বলে :- কাকাবাবু তো তোর দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে গিয়েছেন কিন্তু সম্পত্তির লোভে স্বার্থপর হয়ে তোকে ত্যাগ করতে পারি না।
আবার খাতা-কলমে বর্তমান বাজারদর অনুসারে জমির মূল্য নির্ধারণ করে সুদ আসলে দিনের ঋণের টাকা মিটিয়ে আরো কিছু টাকা দুই ভাই নিয়ে পৈতিক সম্পত্তি হারিয়ে বাড়িতে আসে।
◆ বিনোদের বৌদি সুনন্দা বলেন :- ভাই বিনোদ; তোর দুরবস্থার সময় তোর বউ চামেলি বাবার বাড়িতে চলে যায়। চামিলিকে এই সংসারে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য তোর দাদা ও আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু চামেলী বারবার আমাদের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে বলে তোর সাথে আর সংসার করবে না।
বিনোদ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে মায়ের দায়িত্ব দাদার উপর দিয়ে ও বড়দার অনুমতি নিয়ে কাজের সন্ধানে কলকাতা রওনা দেয়।
-------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
ত্রয়োদশ অধ্যায়। মদ পান ইসলাম ধর্মে হারাম ।
----------------------------------------------------------
বিনোদ কলকাতায় আশ্রয় হীন ভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে কাঁচরাপাড়া স্টেশন নেমে ২৮ কিলোমিটার বাসে চড়ে যাওয়ার পর গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে রৌদ্রের তাপে ক্লাত হয়ে এক মসজিদের পাশে আম বাগানের মধ্যে মাথা নিচু করে চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়ে।
মসজিদের দায়িত্ব থাকা এক বয়স্ক ব্যক্তি বিনোদ কে দেখে তার পরিচয় জানতে চাই। বিনোদ তার পরিচয় দিতে গিয়ে বাংলা মদের গন্ধ মুখ থেকে বের হতে থাকে।
বয়স্ক ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন বলেন :- বাবা; তুমি মদ পান করেছে কিন্তু মদ পানের বিষয়ে প্রায় সব ধর্মেই নিষিদ্ধ হয়েছে।
ইসলাম ধর্মে মদ্যপান সম্পর্কে বলেছেন : ‘মদ ইসলামের হারাম’। ইতিহাস থেকে জানা যায়।
মদ নামক নেশা দ্রব্য মদিনার মানুষের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় ছিল । মদ ছাড়া একটি দিন অতিবাহিত হবে, এটি মদিনার লোকেরা মানতেই পারত না। আর মদ এমন একটি নেশাদ্রব্য, যা এর আসক্ত হলে তার থেকে ফিরে থাকা খুবই কঠিন। এহেন স্পর্শকাতর একটি নেশাদ্রব্যকে আল্লাহ একবারে হারাম ঘোষণা না-করে, তিনটি পর্যায়ে হারাম ঘোষণা করেন। মদ ইসলামে কেন হারাম হল ?
ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর (সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলাম প্রচার পরিষদ) স্পষ্ট করেই বলেছেন –
◆ (১) প্রথম পর্যায় -- হিজরত করে মদিনায় পৌছোনোর কিছুদিন পর রসুল সহ কতিপয় সাহাবি মদের অকল্যাণকর বিষয়গুলো অনুভব করতে থাকেন।
◆ একদা হজরত মা’আয ইবনে জাবাল এবং কিছুসংখ্যক আনসার সাহাবি রসুলে করিমের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন – “হে আল্লাহর রাসুল মদ ও জুয়া মানুষের বুদ্ধি-বিবেককে বিলুপ্ত করে ফেলে এবং ধনসম্পদও ধ্বংস করে দেয়।
এ সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কি?”
◆ এ প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ সুরা বাকারার এই আয়াতটি অবতীর্ণ করে বলেন – “(হে নবি) তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে – মদ ও জুয়ার ব্যাপারে নির্দেশ কী? বলে দাও -- ওই দুটির মধ্যে মানুষের বিরাট ক্ষতিকর বিষয় রয়েছে যদিও লোকদের জন্য তাতে সামান্য কিছুটা উপকারিতাও আছে, কিন্তু তাদের উপকারিতার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।” (সুরা বাকারা -- ২১৯) এখানে শুধুমাত্র মদকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বস্তু হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে মদে সাময়িক কিছু লাভের কথা বলা হলেও ক্ষতির দিকটা যে তার চেয়ে অনেক বহুগুণ তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটি যে আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয় বস্তু তা ব্যক্ত করা হয়েছে, যেন মানুষের মন ও মস্তিস্কে মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়৷
◆ (২) দ্বিতীয় পর্যায় -- একদিন হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ সাহাবিগণের মধ্যে থেকে তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেন। আহারাদির পর যথারীতি মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হল এবং সবাই মদ্যপান করলেন। এমতাবস্থায় মাগরিবের নামাজের সময় হলে সবাই নামাজে দাঁড়ালেন এবং একজনকে ইমামতি করতে এগিয়ে দিলেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যখন তিনি সুরা আল কাফিরুন ভুল পড়তে লাগলেন, তখনই নামাজে মদ্যপান থেকে পুরোপুরি বিরত রাখার জন্যে দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল।
◆ আল্লাহ সুরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে বলেন -- “হে ঈমানদারগণ ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না৷ নামাজ সেই সময় পড়া উচিত, যখন তোমরা যা বলছ তা জানতে পারো৷ অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থায়ও (নামাজের কাছে যেও না)।” এখানে শুধু মদ পানই নয়, বরং যে-কোনো নেশা দ্রব্য পান করে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়৷ কারণ এটি মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতি করে দেয় ও মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটায়। যে জিনিস মানুষের মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটিয়ে দেয় এবং মানুষের আচরণগুলো অস্বাভাবিক করে দেয়। এ জাতীয় জিনিস পান করে আল্লাহর পবিত্রতম ফরজ হুকুমগুলির মতো ইবাদত পালন করা খুবই বেমানান। তাই আল্লাহ এটি পান করে বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ পড়তে বা এর ধারের কাছে যেতেও নিষেধ করে দেন।
◆ (৩) তৃতীয় পর্যায় -- একদা হজরত আতবান ইবনে মালেক কয়েকজন সাহাবিকে নিমন্ত্রণ করেন, যাদের মধ্যে সাদ ইবনে আবি অক্কাসও উপস্থিত ছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর মদ্যপান করার প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের বংশ ও পূর্বপুরুষদের অহংকারমূলক বর্ণনা আরম্ভ হয়। সাদ ইবনে আবি অক্কাস একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন যাতে আনসারদের দোষারোপ করে নিজেদের প্রশংসা-কীর্তন করা হয়। ফলে একজন আনসার যুবক মদ্যপ অবস্থায় রাগাম্বিত হয়ে উটের গণ্ডদেশের একটি হাড় সাদের মাথায় ছুঁড়ে মারেন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। পরে সাদ রসুলের দরবারে উপস্থিত হয়ে উক্ত আনসার যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
◆ এমতাবস্থায় হুজুর দোয়া করলেন – “হে আল্লাহ ! শরাব সম্পর্কে আমাদের একটি পরিষ্কার বর্ণনা ও বিধান দান করুন।” তখনই সুরা মায়েদার উদ্ধৃত মদ ও মদ্যপানের বিধান সম্পর্কিত বিস্তারিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ মদ ও জুয়া এবং এই পর্যায়ের সমস্ত বস্তুকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করে দেন৷
◆ আর তৃতীয় নির্দেশটি আসার আগে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক ভাষণে লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন -- মহান আল্লাহ মদ অত্যন্ত অপছন্দ করেন৷ তাই মদ চিরতরে হারাম হয়ে যাওয়ার নির্দেশ জারি হওয়া মোটেই বিচিত্র নয়৷ কাজেই যাদের কাছে মদ আছে তাদের তা বিক্রি করে দেওয়া উচিত ৷ এর কিছুদিন পরেই পূর্বের ঘটনাটি ঘটে যার পরিপেক্ষিতে এ আয়াত নাজিল হয় – “হে ঈমানদারগণ ! এ মদ, জুয়া, মূর্তি পুজোর বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ এ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানী কার্যকালাপ৷ এগুলো থেকে দূরে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে।” (সুরা মায়েদা -- ৯০) এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবি করিম ঘোষণা করেন, এখন যাদের কাছে মদ আছে তারা তা পান করতে পারবে না এবং বিক্রিও করতে পারবে না বরং তা নষ্ট করে দিতে হবে৷ কাজেই তখনই মদিনার সমস্ত গলিতে মদ ঢেলে দেওয়া হয়৷
◆ অনেকে জিজ্ঞেস করেন -- হে আল্লাহর রাসুল, এগুলো ফেলে না-দিয়ে আমরা ইহুদিদেরকে তোফা হিসাবে দিই-না কেন ?
◆ জবাবে নবি করিম বলেন – “যিনি একে হারাম করেছেন তিনি একে তোফা হিসাবে দিতেও নিষেধ করেছেন।”
◆ কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন – “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা মদকে সিক্কায় পরিবর্তিত করে দিই ?” তিনি এটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নির্দেশ দেন – “না ওগুলোও ঢেলে দাও”।
◆ এক ব্যক্তি অত্যন্ত জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করেন -- ওষুধ হিসাবে ব্যবহারের নিশ্চয়ই অনুমতি আছে ?
◆ জবাব দেন – “না এটা ওষুধ নয়, বরং রোগ”৷
◆ আর একজন আর্জি করেন – “হে আল্লাহর রসুল ! আমরা এমন এক এলাকার অধিবাসী যেখানে শীত অত্যন্ত বেশি এবং আমাদের পরিশ্রমও অনেক বেশি করতে হয়৷ তাই আমরা মদের সাহায্যে ক্লান্তি ও শীতের মোকাবিলা করি।”
◆ তিনি জিজ্ঞেস করেন – “তোমরা যা পান করো, তা কি নেশা সৃষ্টি করে ?”
◆ লোকটি জবাব দেন – “হ্যাঁ”৷
◆ তখন তিনি বলেন – “তাহলে তা থেকে দূরে থাকো।”
◆ লোকটি তবুও বলেন, “কিন্তু এটা তো আমাদের এলাকার লোকেরা মানবে না।”
◆ তখন রাসুল জবাব দেন – “তারা না-মানলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো”৷
নির্দিষ্ট করে বললে, কোরানে হারাম জিনিসকে ‘হারাম’-ই বলা হয়েছে। এখানে ‘হারাম’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যে সকল জিনিসকে হারাম বলা হয়েছে, তার জন্য কোনো কারণ আল্লাহ দেননি। এটা আল্লাহর নির্দেশ এবং অনেক জায়গায় কোনো কিছুকে হারাম করার জন্য দোজখের (নরক) ভয়ও দেখানো হয়েছে।
◆ কোরানে পাঁচটি আয়াত পাওয়া যায়, যেখানে মদ বা নেশা নিয়ে বলা হয়েছে।
◆ (১) “হে ঈমানদারগণ ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাকো, তখন নামাজের ধারে-কাছেও যেও না, যতক্ষণ-না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ,.....।.” (৪ : ৪৩) এই আয়াতে হারাম বা নিষিদ্ধ শব্দটি নেই বা দোজখের ভয়ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও দেখানো হয়নি। কেন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে ? কারণ নামাজে কি বলা হচ্ছে, সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। না-বুঝলে সে নামাজ পড়ার কোনো মানে নেই। যেহেতু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের বোধবুদ্ধি এমনি লোপ পায় যে, সে কী বলছে তা বোঝে না। সেই কারণেই নামাজের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। নেশাগ্রস্ত হতে কিন্তু নিষেধ করা হয়নি। এখন কেউ যদি অল্প নেশা করে এবং তার বোধ বুদ্ধিও লোপ না পায়, তাহলে কি তাকে কোরানের এই আয়াত অনুসারে মদ্যপায়ীকে দোষী বলা যাবে ?
◆ (২) “হে মুমিনগণ ! মদ, জুয়া, মূর্তিপুজোর বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্যবস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা(কে) বর্জন করো। তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ, জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না।”(৫ : ৯০-৯১) এই আয়াতেও ‘হারাম’ বা ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি নেই বা দোজখের ভয়ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও দেখানো হয়নি। সুতরাং মদকে হারাম বলা যায় না। শব্দের শেষে যে ‘হু’ আছে, তা একবচন। যদি মদ, জুয়া, মূর্তিপুজোর বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর সবগুলোকেই বর্জন করতে বলা হত তাহলে ‘হুম’ বহুবচন থাকত। আয়াতটি ভালো করে পড়লে যা বোঝা যায়, এগুলো শয়তানের হাতিয়ার, যা দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। এই কারণেই শয়তানকে বর্জন করতে বলা হয়েছে, যাতে মুসলমানরা সফলকাম হতে পারে।
◆ (৩) “যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তারা যা ভক্ষণ করেছে, সে জন্য তাদের কোন গোনাহ নেই....” (“Those who have attained to faith and do righteous deeds incur no sin by partaking of whatever they may, so long as they are conscious of God and [truly] believe and do righteous deeds, and continue to be conscious of God and to believe, and grow ever more conscious of God, and persevere in doing good: for God loves the doers of good.” (Rashad Khalifa 5 : 93)
“Those who believe and lead a righteous life bear no guilt by eating any food, so long as they observe the commandments, believe and lead a righteous life, then maintain their piety and faith, and continue to observe piety and righteousness. GOD loves the righteous.” (Muhammad Asad
5 : 93)
◆ বাংলা অনুবাদ :- যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারা যা কিছু হতে পারে তাতে অংশ গ্রহণ করে কোন পাপ নেই। যতক্ষণ না তারা ঈশ্বরকে সচেতন করে এবং [সত্যিকার] বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, ঈশ্বরের প্রতি সচেতন থাকুন। বিশ্বাস করতে থাকুন, এবং ঈশ্বরের প্রতি আরও বেশি সচেতন হোন, এবং ভাল কাজ করার জন্য অধ্যবসায় করুন, কারণ ঈশ্বর সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন।" (রাশাদ খলিফা ৫ : ৯৩)
যারা বিশ্বাস করে এবং ধার্মিক জীবনযাপন করে তারা কোন খাবার খেয়ে কোন দোষ বহন করে না
যতক্ষণ তারা আদেশ পালন করে, বিশ্বাস করুন এবং সৎ জীবনযাপন করুন, অতঃপর তাদের তাকওয়া ও ঈমান বজায় রাখবে। তাকওয়া এবং ধার্মিকতা পালন অব্যাহত. ঈশ্বর ধার্মিকদের ভালবাসেন।” ( মুহাম্মদ আসাদ ৫ : ৯৩)
◆ (৪) “ খেজুর বৃক্ষ ও আঙ্গুর ফল থেকে তোমরা নেশা ও উত্তম খাদ্য তৈরী করে থাক, এতে অবশ্যই বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।”(১৬ : ৬৭) এখানেও নেশা বা মদকে হারাম বলা হয়নি। বরং নেশা ও উত্তম খাদ্য একই পংক্তিতে রেখেছেন।
◆ (৫) “তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়ো।” (২ : ২১৯) অতএব মদের ভালো ও মন্দ দুটো দিক আছে, যা আগের আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট। এই আয়াতেও দেখুন মদের উপকরিতা ও অপকারিতা নিয়ে বলা হয়েছে। উপকারিতার বিপরীত অপকারিতা বা অপব্যবহার হয়, পাপ হয় না। কিন্তু কেন জানি আমাদের আলেমরা মহাপাপ বলছেন, যা বোধগম্য নয়। আরবিতে জুনাহুন শব্দের অর্থ পাপ। মহাপাপ আর মহা-অপকারিতা এক কথা নয়। কোরানের কোথাও মদ বা নেশাকে সরাসরি হারাম বলা হয়নি। মদের ভালো বা মন্দের উল্লেখই কোরানে করা হয়েছে। মদকে মুসলমানদের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তুর্কি সেলজুক খলিফারাই তাঁদের সৈন্যদের মদ খাওয়া থেকে নিবৃত্ত করার জন্য হাদিসের মাধ্যমে মদকে ‘হারাম’ করে।
----------------------------------------------------------
ত্রয়োদশ অধ্যায়। মদ পান ইসলাম ধর্মে হারাম সমাপ্ত।
------------------------------------------------------
।। চতুর্দশ অধ্যায় ।।
-------------------------------------------------------
◆ শশীকান্ত ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী বিমলা কয়েক মাস ধরে তীর্থ পর্যটন সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। দিল্লী, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, বোম্বাই, লাহোর, প্রয়াগ, কাশী, গয়া প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করে দীর্ঘ কয়েক মাস পর কলকাতার বাড়িতে ফিরে আসে।
◆ বিনোদ পড়ন্ত বিকেলে কাকাবাবু কাকাবাবু বলে ডাকতে ডাকতে উকিল বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে বাড়ির ভিতরের বৈঠক খানার ঘরে ঢুকে পড়ে।
◆ চিৎকার শুনে সুভাষিণী এগিয়ে এসে বলে :- ব্যাপার কি! একদম বাড়ির ভিতরের।
◆ বিনোদ বলে :- আরো সুভাষিণী; কেমন আছিস! কোন ক্লাসে পড়াশোনা করছিস।
◆ সুভাষিণী ভাবে :- আপন পরিচিত ব্যক্তির মতো নাম ধরে ডেকে প্রশ্ন করছে কিন্তু এই ভদ্রলোককে পূর্বে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছে না তো।
◆ বিনোদ বলে :- ভাবছো আমি কে কিন্তু তুমি আমাকে চিনতে পারবে কেমন করে। তোমার বয়স যখন পাঁচ বছর সেই সময় এই বাড়িতে এসেছিলাম। এখন তো তোমার বয়স ১৮ বছর হয়ে গেছে।
◆ সুভাষিণী বলে :- আচ্ছা বসুন, আপনার পরিচয় জানতে পারি কি?
◆ বিনোদ বলে :- পরিচয় দেয়ার মতো তেমন কিছু নেই। এমএ পাস করে বেকার অবস্থায় ভবঘুরে। আমার নাম বিনোদ আর বর্ধমান জেলায় আমার বাড়ি। আমার বাবার সাথে তোমার বাবার এক সময় গভীর বন্ধুত্ব ছিল কিন্তু কালের চক্রে পড়ে বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছে।
শশীকান্ত মহাশয় ঘর থেকে বলেন:- সুভাষিণী; কে এসেছে!
◆ সুভাষিণী বলে :- বর্ধমানের তোমার বন্ধুর ছেলে বিনোদ।
শশীকান্ত মহাশয় ঘর থেকে বেরিয়ে বিনোদের কাছে এসে বলেন :- তোমার মায়ের শরীর ঠিক আছে তো আর জমি জমার সমস্যা মিটেছে।
◆ বিনোদ বলে :- মা; আপাতত ঠিক আছে। আর দিনার দায়ে ২৫ বিঘা মাঠের জমি মহাজনকে দিয়ে দিতে হয়েছে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- তোমার বাবা মানসিক চিন্তায় চিন্তায় অকালে চলে গেলেন। তোমার মায়ের দেওয়া চিঠি পেয়েছি। তোমার একটা চাকরি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
তারপর সুভাষিণীর দিকে তাকিয়ে বলে, বিনোদ তোর দাদা হয়। থাকার রুম দেখিয়ে দে আর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কর।
◆ সন্ধ্যার পর সুভাষিণী পড়ার ঘরে বসে বিনোদ একটি রাজনৈতিক বই পড়তে থাকে। আর গৃহ শিক্ষক মহেন্দ্র মহাশয় পড়ার ঘরে এসে চেয়ারে বসে।
◆ বিনোদ বই থেকে চোখ তুলে মহেন্দ্র দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে বলে :- আরো; আমাদের সেই "পাহাড়ের ঝর্ণা" কাব্যগ্রন্থের কবি মহেন্দ্র বাবু। কলেজে একসাথে পড়াশোনা করতাম।
◆ বিনোদের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে মহেন্দ্রের মুখ কালো হয়ে যায়। তবুও নিজেকে সংযত করে নিয়ে হাসতে হাসতে বলে :- আরে তুই সেই গানের শিক্ষক বিনোদ। আরে বন্ধু কতদিন পর তোর সাথে দেখা হলো। তা বল কেমন আছিস।
◆ বিনোদ বলে :- গরিবের আর ভালো থাকা। বাবার মৃত্যুর পরে সব কিছুই উল্টো পালট হয়ে গিয়েছে। তাই কাজের সন্ধানে কাকাবাবুর কাছে এসেছি, যদি কোন কাজে লাগিয়ে দিতে পারে।
তোর খবর কী বল?
◆ মহেন্দ্র বলে :- প্রাইমারি স্কুলে একটা চাকরি পেয়েছি আর এই বাড়িতে গৃহ শিক্ষক হিসেবে পড়াতে আসি।
◆ বিনোদ বলে :- তা তোর কাব্য চর্চা কেমন চলছে বন্ধু।
◆ মহেন্দ্র বলে :- কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলছে। তা তোর সংগীত চর্চার খবর কি?
◆ বিনোদ বলে :- না; আপাতত বন্ধ আছে।
◆ সুভাষিণী চা ও জলখাবার নিয়ে এসে টেবিলে রেখে বলে :- দীর্ঘদিন পর তাহলে দুই বন্ধুর দেখা-সাক্ষাৎ হলো। ভালোই হলো একজন গানের মাস্টার পাওয়া গেল। তাহলে বিনোদ দা একটা গান শোনাও।
◆ বিনোদ এই বাড়ির একজন সদস্য হয়ে বসবাস করতে থাকে। আর গানের মাস্টার হিসাবে সুভাষিনীর গান শেখায়। এক মাস থাকার পর শশীকান্ত মহাশয় বিনোদ কে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে মাসিক দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়।
◆ বিনোদ কে ডেকে শশীকান্ত মহাশয় বলেন:- আমাদের বাড়িতে থেকে যাও। তোমার গানে আমরা সবাই কিন্তু মুগ্ধ ও আনন্দিত। তোমার ঠাকুর দাদার ভীষণ গানের গলা ছিল। লক্ষী তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চ মুখ।
◆ সুভাষিণীর জন্ম তিথির কয়েকদিন আগে তার শশীকান্ত মহাশয় আদালতে যাওয়ার সময় পড়াশোনার ঘরে ঢুকে সুভাষিণী সুভাষিণী বলে ডাক দেয়।
◆ সুভাষিণী দ্রুত বাবার কাছে এসে বলে :- বাবা আমাকে ডাকছিলেন।
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- কয়েকদিন পর তোমার জন্মদিন। প্রতি বছরের ন্যায় জাঁকজমকভাবে পালন করা হবে। মহেন্দ্র ও বিনোদকে বলে রাখবে আর তোমার পছন্দের বন্ধু বান্ধবীদের বলতে পারো।
সুভাষিণীর নির্দিষ্ট জন্মদিন ধুমধাম করে বিশাল বড় আকারে না হলেও কিন্তু কিছু সংখ্যক লোকজন নিয়ে উৎসব পালিত হয়।
◆ সুভাষিণীর বিমাতা বিমলা দেবী উপস্থিত লোকজনের সামনে মেয়ে কে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করে নিজের হাতে কয়েক ভরির ওজনের নতুন নকশা যুক্ত সোনার হার গলায় পরিয়ে দেয়।
◆ বাবা শশীকান্ত ও বিমাতা বিমলা দেবী একসাথে বলে উঠে, মামনি; হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
◆ বিমলা দেবী উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্য করে বলেন, জন্মদিনে সবাই আশীর্বাদ করবেন। আসছে বছর আবার হবে।
◆ বিনোদ একটি রুপোর তৈরি পাউডার কৌটা ও মাস্টার মহেন্দ্র একখানা রবীন্দ্রনাথের কাব্য উপহার দিয়ে উচ্চারণ করে শুভ হোক তোমার জন্মদিন।
◆ সুভাষিণীর এক পাশে তার বাবা আর অন্য পাশে বিমাতা বিমলা দাঁড়িয়ে কেক কাঁটার পর্ব শেষ করে। তারপর সুভাষিণী তার বাবা ও মায়ের মুখে কেক তুলে দেয় আর দুষ্টুমি করে বিমাতা বিমলের মুখে ক্রিম লাগিয়ে দেয়।
বিমলা দেবী তার মেয়ের মুখে ক্রিম লাগিয়ে দেয়। সুভাষিণী বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। বিমাতা বিমলা দেবী ভীষণ লজ্জিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে তার আঁচল দিয়ে লক্ষ্মীর মুখ মুছে দেয়।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বিনোদের কাছে গিয়ে বলেন :- লক্ষ্মীর জন্ম দিনে একখানা দারুন গান শোনাও তো।
সুভাষিনী বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করে আর বিনোদ হারমনিয়ম বাজিয়ে গান শুরু করে তারপর সুভাষিনী কন্ঠ মিলায়। উপস্থিত শ্রোতাদের হাততালি ও প্রশংসা লাভ করে।
◆ জন্মদিনের এক সপ্তাহ পর বিনোদ কে সুভাষিণী একান্তে থাকার ঘরে ডেকে নেয়। তারপর
তার সাহিত্যের খাতা খুলে রচিত কিছু কবিতা ও গল্প পড়ার জন্য অনুরোধ করে।
◆ বিনোদ কিছু সময় ধরে পড়ার পরে সুভাষিণীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ করে বলে :- অসাধারণ তোমার প্রতিভা। মাস্টার মহেন্দ্র কে লেখাগুলো দিয়ে দাও, সে কোন মাসিক পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেবে। তোমার কবিতা গল্প খুব সুন্দর হয়েছে। বর্তমানে নারীরা যে কি লেখালেখি করে মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় না।
◆ সুভাষিণী একদিন দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে মামাতো দাদা পরেশের ঘরে গিয়ে বলে :- পরেশদা; চলো সিনেমা দেখে আসি।
◆ পরেশ বলে :- নারে বোন; আমার যাওয়া হবে না।
◆ সুভাষিণী বলে :- কেন দাদা?
◆ পরেশ বলে :- আমার ফুটবল আর ক্রিকেট খুবই পছন্দের খেলা ও ভীষণভাবে আনন্দ উপভোগ করি। হার-জিতের ফুটবল খেলা আছে। সেখানে আমাকে যেতে হবে।
◆ সুভাষিণী বলে :- পরেশদা চলনা। তোকে ভালো ভালো খাবার কিনে দেবো।
◆ পরেশ বলে :- সাহিত্যের নাটক থিয়েটার আমার তেমন একটা ভালো লাগে না কিন্তু মঞ্চের উপর যুদ্ধ-বিগ্রহ, নাচ-গান ও সাজ পোশাক এসব জমকালো রকমের হলে আনন্দ হয়।
◆ সুভাষিণী বলে :- অভিনয় যে একটি দেশের শিল্প আর অভিনয়ের মধ্যে মানুষের জীবনের মূল্যবোধের বাস্তবতা আছে তার কখনো উপলব্ধি করতে চাসনা।
◆ পরেশ বলে :- আমার মাথার মধ্যে এখন ফুটবল আর ফুটবল। তুই বরঞ্চ বিনোদকে বলে তার সাথে সিনেমা ও থিয়েটার দেখতে চলে যা।
◆ সুভাষিণী আবার হাঁটতে হাঁটতে বিনোদের রুমে উপস্থিত হয়ে বলে :- বিনোদ দা; চলো সিনেমা দেখে আসি।
◆ বিনোদ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে :- আমাকে যেতেই হবে।
◆ সুভাষিণী হাসতে হাসতে বলে :- তোমার সাথে কোথাও গেলে আমার ভীষণ আনন্দ হয় কারণ তুমি সাহিত্য প্রেমিক মানুষ বলে সাহিত্য রস রূপ প্রেম আলোচনায় আমাকে মুগ্ধ করে।
◆ বিনোদ বলে :- চল, তবে ঘুরে আসি।
◆ সুভাষিণী বলে :- চলে চলে দেরি হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় যেতে যেতে কথা হবে।
◆ বিনোদ কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে দুজনেই বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় যেতে যেতে বিভিন্ন অভিনেতা অভিনেত্রী বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
◆ সুভাষিণী বলে :- এসব অভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবন কাহিনী সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন।
◆ সুভাষিণী বলে :- তুমি ও মহেন্দ্রদা দুজনেই শিল্পীদের আত্মমর্যাদা বুঝতে পারো আর মাথা মোটা পরেশদা একদম বুঝতে চায় না।
--------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------পঞ্চদশ অধ্যায়। হিন্দু ধর্মে মদ্যপান। প্রথম অংশ।
----------------------------------------------------------
বিনোদ, মহেন্দ্র, পরেশ, সুভাষিনি, জয়ন্তী আর পিসিমা ব্যত্তিগত গাড়ি করে তারাপিঠ মায়ের দর্শন রওনা দেয়। তারাপীঠ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাট শহরের কাছে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র মন্দির নগরী। এই শহর তান্ত্রিক দেবী তারার মন্দির ও মন্দির-সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত। হিন্দুদের বিশ্বাসে, এই মন্দির ও শ্মশান একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এই স্থানটির নামও এখানকার ঐতিহ্যবাহী তারা আরাধনার সঙ্গে যুক্ত।
দর্শনার্থী ছয় জন তারাপীঠ শ্মশানক্ষেত্রের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন জায়গায় তান্ত্রিক সাধুদের মদ পান ও গাঁজা সেবন করতে দেখা যায়।
◆ বিনোদ ছলনা করে সতীর্থদের উদ্দেশ্য বলে :- সবাই এগিয়ে চলে আমি আসছি। বলে পিছনে ফিরে হাঁটতে শুরু করে। কিছু সময় ঘোরাঘুরি করে চার জন সাধুদের আসরে প্রণাম করে হর হর মহাদেব জয় মা তারা বলতে বলতে বসে পড়ে।
◆ ৫৫ বছর বয়সের এক সাধুবাবা তার হাতের মুঠোয় কলকে দেখিয়ে বলেন :- শিবের প্রসাস চলবে।
◆ বিনোদ বলে :- জল ফল শুকনো সব চলে।
বিনোদ গাঁজার কলকে হাতে নিয়ে কয়েক বার টান দিয়ে ধুঁয়া গিলে ফেলে আর সাধুরা হর হর মহাদেব বলে জয়ের ধ্বনি দিতে থাকে। কিছু সময় পর কয়েক বোতল বিলাতি মদ আর মাংস সহ বিভিন্ন খাদ্য আসে। বিনোদ কে এক সাধুবাবা প্যাক তৈরি করার আদেশ দেন।
◆ বিনোদ উপস্থিত সাধুদের উদ্দেশ্য করে বলে :- হিন্দু ধর্মে মদ্যপান সম্পর্কে কিছু আলোচনা করার অনুরোধ করছি।
◆ তারাপীঠ শ্মশানের তান্ত্রিক বাবা চিত্তরঞ্জন গিরি বলেন :- বিভিন্ন ইতিহাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে জানা যায়। হিন্দুধর্মে মদ্যপান : খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ সাল থেকে ভারতবর্ষে মদের ব্যবহারের কথা জানতে পারা যায়৷ অবশ্য তারও আগে মদ্যপানের ব্যবহার ছিল না, এ কথা বুক ঠুকে করে বলা যায় না৷ তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভারতে মদ্যপানের ইতিহাস ৬০০০ বছরের বেশি৷ মদের সন্ধানে প্রথমে কিঞ্চিৎ পুরাণ ঘুরে আসা যাক।
◆ পুরাণে যে সমুদ্রমন্থনের উপাখ্যান পাই, তাতে আমরা দেখতে পাই সমুদ্রমন্থনকালে সমুদ্র থেকে একে একে উঠেছে দুগ্ধ, ঘৃত, চন্দ্রদেব, দেবী লক্ষ্মী, ঐরাবত (হস্তি), উচ্চৈঃশ্রবা (অশ্ব), কৌস্তভমণি, অমৃতভাণ্ড হাতে ধন্বন্তরি, কালকূট বিষ আর সবশেষে উঠল বারুণী সুরা বা মদ৷ সুরার ভাণ্ডটি দেবতারাই গ্রহণ করলেন আর দানবরা প্রত্যাখ্যান করলেন। তাই দেবতারা ‘সুর’ এবং দানবরা ‘অসুর’ (সুরাবিহীন ) নামে পরিচিত হল৷
◆ দেবরাজ ইন্দ্র প্রায় সর্বক্ষণ সোমরস নামক সুরা পান করে থাকেন ৷
◆ জলের দেবতা বরুণ 'বারুণী’ নামে সুরা মদ্যপান পছন্দ করেন। যা সমুদ্র থেকে উঠেছিল৷
◆ বিষ্ণু, যিনি জীবকে রক্ষা করেন তিনিও সুরা পান করেন৷
◆ দেবী চণ্ডী যিনি মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, ওই যুদ্ধের সময় তিনি অল্প অল্প মদ্যপান করছেন, এ রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
◆ শিব শুধু মদ বা সিদ্ধি নয়, সব রকম নেশাই করতেন৷
◆ পদ্মপুরাণে সাবধান বাণী করেছেন। মদ পান করা তো দূরের কথা, কেউ যদি মদিরা আঘ্রাণ বা স্পর্শ করে, তা হলে মৃত্যুর পরে তার স্থান হবে ‘রৌরব’ নামক নরকে ( হিন্দুপুরাণগুলিতে মোট ২৮ টি নরকের উল্লেখ আছে, তার মধ্যে রৌরব একটি। রৌরব শব্দটি এসেছে রুরু নামক হিংস্র জন্তু থেকে, যার নামে এই নরকের নাম।
হিংসাপরায়ণ হয়ে শুধুমাত্র নিজেকে ও পরিবারকে ভালো রেখে অন্যের ক্ষতি করলে রুরু নামক সর্পসম জন্তুরা পাপীর শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।)।
◆ ঋকবেদে সোমরস সম্পর্কে স্তোত্র আছে৷ এই সোমরসই কী মদ ? দ্বিমত আছে।
কেউ বলেন :- ঋকবেদে উল্লিখিত সোমরস মদ নয়, আবার কেউ বলেন সোমরসই মদ। লতা জাতীয় এই সোমরস জিনিসটা আসলে ঠিক কী ?
সম্ভবত হিন্দুকুশ অঞ্চলে ‘এফিড্রা সিনিকা’ নামক এক লতা। তবে পণ্ডিতেরা নিশ্চিত নন। পূর্ণিমা আলোয় পাহাড়ি ছাগলে টানা গাড়িতে ঋষিদের যজ্ঞস্থানে এই লতাটাকে মূলসুদ্ধ তুলে নিয়ে আসা হত। সেখানে আনয়ন করা সোমলতাগুলিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে লতাগুল্মসহ পাথরে পেষাই করা হত। পিষানো লতাগুল্মকে পশমের ছাঁকনিতে রেখে দশ আঙুলে চটকানো হত।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৯৪ নম্বর সূক্তে সোমলতা পেষাই করার পাথরগুলির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন – “এই অবিনাশী প্রস্তরদিগের গুণকীর্তন করো। দশ আঙুল যখন সোমরস নিষ্পীড়ন করার সময় এদের স্পর্শ করে, পাথরটাকে মনে হয় দ্রুতগামী ঘোড়া। দশটি রজ্জু তাদের টেনে নিয়ে চলেছে।” পাথরে পেষাই করার পর ঈষৎ হলুদ রঙের ওই রস দুধে মিশিয়ে টানা ৯ দিন ধরে গাঁজানোর জন্য অপেক্ষা করা হত। এরপর যা পাওয়া যেত, তাইই হল সোমরস।
এটাকে সযত্নে রাখা হত নিরাপদ স্থানে। যে কাঠের পাত্রে রাখা হত, সেই পাত্রকে ‘গ্রহ’ বলা হত। মাটির পাত্রে রাখা হলে, ‘স্থালী’ বলা হত।
সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা -- তিনবার সোম থেকে রস নিষ্কাশন করা হত।
কে, কতবার পান করবেন, তারও বিধিসম্মত নিয়ম ছিল। যজ্ঞের পুরোহিত বা ঋত্বিকদের দিনে তিনবার সোমরস পান করার অধিকার থাকলেও, যজমানদের অধিকার কিন্তু একবার, সন্ধ্যাবেলায়।
ঋকবেদে ১০০০ টি স্তোত্রে মানুষ ও দেবতার পানীয় বলে সোমরসের উল্লেখ আছে৷ ঋকবেদের নবম মণ্ডলে শুধু সোমরস নিয়েই ১৪৪ টি স্তোত্র আছে। যেগুলি সোমমণ্ডল নামে পরিচিত। বলা হয়েছে, এই রসের নৈবেদ্য দেবতাদের প্রলুব্ধ করে স্বর্গের বাইরে নিয়ে আসত৷ ঋক ও অথর্ববেদের ফুল ও ফল থেকে তৈরি বহুরকম মদের উল্লেখ আছে৷
তার মধ্যে প্রধান তিনটি হল :- (১) কিলালা (কলা থেকে তৈরি মদ ), (২) মাসারা (চাল থেকে তৈরি মদ ) আর (৩) মদিরা ( মধু থেকে তৈরি মদ )।
সোমরস পান করা হত মাখন, দই, দুধ এবং ভাজা বা শুকনো শস্য দানার সঙ্গে৷ ঋকবেদে এই সোমরসের গুণ ও আনন্দদায়িনী শক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাস করা হয়েছে৷ এমনকী সোমরসের সম্মানার্থে একটি বলিদান যজ্ঞ হত৷
অভিধানে সোমরসের অর্থে বলা হয়েছে ‘সোম লতা হতে তৈরি মদ’। “বলবান্ ইন্দ্রদেব সোমরস পান করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন এবং উপর্য্যুপরি যজ্ঞত্রয়ে সোমরস পান করিয়াছিলেন”
(‘দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম্ম’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। ‘সোম’ নামক প্রবন্ধে বৈদিক সোমরস যে সুরা অর্থেই ব্যবহৃত হইত না লেখক তাহাই প্রমাণ করিতে প্রস্তুত হইয়াছেন – (সাময়িক সাহিত্য সমালোচনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
দেহ ও মনের উপর সোমরসের প্রতিক্রিয়ার কথা ঋগবেদে আছে। ‘সোম ঘোটকের ন্যায় দ্রুতগামী’, ‘সে আপন তেজ বিকীর্ণ করে’, ‘যে মাদকরস বর্ষণ করে’, ‘সোম স্তবের যোগ্য’, ‘সোমপায়ী ব্যক্তি লুণ্ঠনকার্যে পটু’, ‘সোম অন্ন, গাভী ও উত্তম গৃহ উপার্জন করিয়ে দেয়’ ‘কবিরা তাকে স্তব করে’ [রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদ]
◆ এক শ্রেণির পণ্ডিতগণ অবশ্য বেদে উল্লিখিত সোমরসকে মদ বলতে নারাজ। তাঁরা বলেন :- মনুষ্য দেহের বীর্যকণাই বাস্তবিক সোম। এ বিষয়ে শক্তশালী বেদ প্রমাণ আছে। বীর্য বাদে অন্যান্য ঔষধি আদিকেও সোম বলা হয়। সুরার কথা সমগ্র বেদে কোথাও নেই।
“সোমং মন্যনে পপিবান্যস্তংপিংষন্তোষধিম্।/সোমং যং ব্রহ্মানো বিদুর্নো তস্যশনাতি কশ্চন।।”
(ঋক ১০/৮৫/৩) পদার্থঃ ( যত) যে ( ঔষধিম্) ঔষধকে ( সংপিংষন্তি) সম্বায়ক রূপে পিষে তার রস বের করে নিতে হয়। কিন্তু (মান্যতে) মানতে হয় যে ( সোমং পপিবান্) আমরা যে ঔষধি সোম পান করে থাকি এ ধারণা ঠিক নয় ( যং সোমং) যে সোমকে ( ব্রক্ষ্মনঃ) জ্ঞানী পুরুষই( বিদুঃ) জানে ( তস্য) ওই সোমকে ( কশ্চনঃ) এই ঔষধী রস পানকারী কেউই ( অশ্চতি) গ্রহণ করে না। সোম তো শরীরে উৎপন্ন হওয়া বীর্যই। তার রক্ষণ জ্ঞানীরাই করে থাকে এবং বীর্যধারণই বাস্তবিক সোমপান। জ্ঞান সঞ্চয়ে প্রবৃত্ত পুরুষ এই সোমকে নিজের জ্ঞানাগ্নির ইন্ধন বানিয়ে থাকে এবং বীর্য রূপ সোমের উর্ধ্বগতি দ্বারা ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের যোগ্য বানায়।
ভাবার্থ -- সোমলতার রস পান সোমপান নয়। বীর্যের রক্ষণই সোমপান। এই সোমপানকে ভৌতিক প্রবৃত্তকারী পুরুষ করতে পারে না। বাস্তবিক সোমরসপান ব্যতীত আরও অনেক ভৌতিক ঔষধীরূপী সোমরস আছে যে গুলো রোগ নিবারণ এবং যজ্ঞাদি কর্মে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এগুলো ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের জন্য পরোক্ষ উপাদান মাত্র। আখের সমার্থক শব্দ সোম। আজকের আখই হয়তো বেদের সোম জাতীয় উদ্ভিদ।
◆ বেদে চার প্রকারের সোমের উল্লেখ পাওয়া যায় –
◆ (১) ‘সোমঔষধিনামধিরাজ’ (১/১৩/২)
◆ (২) ‘সোমবীরুধাপতে’ (৩/১১/৪/১)
◆ (৩) ‘গিরিষু হি সোমঃ-শতঃ’ (৩/৩/৪/৭)
◆ (৪) ‘রেতঃ সোমঃ’ (১৩/৭)।
সোম নামের একজন দেবতার কথাও জানা যায়। সম্ভবত এই সোমদেবতা সোমরসের সমস্ত রকমের অধিকর্তা ছিলেন। তাঁর অনুগ্রহ ছাড়া সোমরসের স্বাদ পাওয়া যেত না।
◆ সোম মদ হোক না হোক, একটা পর্যায়ে হিন্দুধর্মে মদ বা যে-কোনো নেশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যদিও ঋগবেদে (১/১৯১/১০) চামড়ার পাত্রে রাখা মদ্যপানের কথা আছে।
◆ তদুপরি ঋগবেদের অষ্টম মণ্ডলে দুটি জায়গায় আমরা কিন্তু (২/১২, ২১/১৪) সুরাপ্রমত্ত ব্যক্তিদের ব্যাপক নিন্দা করা হয়েছে।
মন্ত্র, সংহিতা, উপনিষদের যুগ শেষ হয়ে শুরু হল স্মৃতির শাসন। এ সময় সমাজের মাথারা মাদকদ্রব্যের উপর রক্তচক্ষু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
◆ মনু এক জায়গায় (৫/৫৬) মদ্যপানকে বৈধতা দিয়ে বলেছেন ‘স্বাভাবিক জীব বৃত্তি’। আবার বেশ কয়েক জায়গায় মদ্যপানকে চরমতম অপরাধ বলেছেন। ব্রাহ্মণ হত্যা, গুরুপত্নীগমন আর সুরাপানকে একই মাপের অপরাধ বলেছেন (৯/২৩৫)। মদ্যপানকে নিষিদ্ধও করা হয়েছে।
◆ মনু ছাড়াও প্রাচীন ভারতে উনিশজন ঋষি বিধি-নিষেধের উপর স্মৃতিসংহিতা লিখে গেছেন। সবাই সমসাময়িক না-হলেও, আপস্তম্ব, গৌতম আর বশিষ্ঠ এঁরা একই যুগের। বাকি ষোলোজন বিষ্ণু, পরাশর, ভৃগু ইত্যাদি পরবর্তীকালে। এরা মদ্যপানের উপর খড়্গহস্ত।
◆ বিশেষত ব্রাহ্মণদের তো মদ্যপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। ব্রাহ্মণরা মদ্যপান করতেই পারবেন না। মদ্যপান করলে ফুটন্ত মদ্যপানে বাধ্য করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। গরম শিসা বা রুপো গলায় ঢেলে প্রায়শ্চিত্তও করতে হবে। এছাড়া আরও ভয়ংকর ভয়ংকর সব শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে, যা শুনলে শরীর কেঁপে উঠবে।
◆ ঋগবেদে বলা হয়েছে -- “নকী রেবন্তঃ সখ্যায়া বিন্দসে পীয়ন্তি তে সুরস্বঃ।/য়দা কুয়োসি নদানু সমূহস্যাদিত পিতেব হূয়সে।।” (ঋগবেদ, ৮/২১/১৪) অর্থাৎ, তোমার নেশাকারী সঙ্গী অথবা বন্ধু যদি সবচেয়ে বিদ্বান বা ধনীও হয় তারপরও বজ্রপাততূল্য এবং অবশ্য পরিত্যজ্য।
◆ মনুসংহিতা বলছে -- “সুরা বৈ মলমন্নানাং পাপ্মা চ মলমুচ্যতে।/তস্মাদ্ ব্রাহ্মণরাজন্যৌ বৈশ্যশ্চ ন সুরাং পিবেৎ।।” (মনুসংহিতা, ১১/৯৪) অর্থাৎ, সুরা হল অন্নের মলস্বরূপ, পাপরূপ তাই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় নির্বিশেষে সকলের জন্যই অবশ্য বর্জনীয়।
◆ বেদ ও মনুসংহিতার যুগে মদ সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও পুরাণ ও রামায়ণ-মহাভারতের যুগে এসে এই নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা এসেছিল । রামায়ণ, মহাভারত বা পুরাণ যুগে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা-রানি, দেবদেবতারাও ভালোই মদ খেতেন।
◆ বাল্মীকি বিরচিত রামায়ণে দেখতে পাই -- রাম বিয়ের পর তার স্ত্রী সীতাকে রাজকীয় পানীয় হাতে তুলে দিচ্ছেন৷
◆ চোদ্দো বছর বনবাস পর্বে যাওয়ার সময় সীতা গঙ্গার উদ্দেশ্যে বলেছেন, “হে দেবী, আমরা যদি এই বনবাস শেষে বেঁচে ফিরতে পারি তা হলে এক হাজার কলস সুরা আমি তোমায় উৎসর্গ করব।”
◆ রাম যেদিন রাবণকে হত্যাকর্ম সেরে সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফেরে, সেদিন অযোধ্যার মানুষ রামকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বেশ কয়েকদিন ধরে পান উৎসব করেছিল৷
◆ রামায়ণে চার প্রকারের সুরার উল্লেখ পাওয়া যায়৷
◆ শুধু রাম-সীতা নয়, বানরদের মধ্যেও মদ্যপানের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ রাক্ষসদের মধ্যেও মদ্যপানের অভ্যাস ছিল। রামায়ণের বীর হনুমান ছোট্টো আকার ধারণ করে রাবণের অন্তঃপুরে গিয়ে দেখেন মদ্যপান বেহুঁশ হয়ে রাবণের রানিরা পরস্পর পরস্পরকেকে আলিঙ্গন করে শুয়ে আছেন।
◆ রাম তো সীতাকে উদ্ধার করে অযোধ্যায় নিয়ে গিয়ে দিব্যি ‘স্বহস্তে মৌরেয় মদ্য’ দিচ্ছেন সীতাকে। বালকাণ্ডে ঋষি বিশ্বামিত্র আর বশিষ্ঠ অতিথি আপ্যায়ন করছেন সুরাভাণ্ড দিয়েই।
◆ বানরেরাও প্রচুর মদ্যপান করতেন। শর্তানুসারে সীতা উদ্ধারের কথা ভুলে গিয়ে সুগ্রীব যে সময় নারীসঙ্গ আর সুরাপানে মত্ত ছিলেন, সে সময় লক্ষ্মণ সুগ্রীবে রাজদরবারে এসে চড়াও হয়। সে সময় বেহেড মাতাল কিষ্কিন্ধ্যারাজ সুগ্রীব লক্ষণের সামনে টলমল করতে করতে হাজির হয় এবং লক্ষ্মণের কাছে বিস্তর তিরস্কৃত হন।
◆ ব্যাসদেব বিরচিত মহাভারতেও আমরা যথেষ্ট মদ্যপানের উল্লেখ পাই। যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞে মদিরার সমুদ্র হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে৷
শুধু অশ্বমেধই নয়, যে-কোনও বড়ো ধরনের যজ্ঞে মদ্যপানের রেওয়াজ ছিল৷ এমনকি মহাভারতের সময়ে মহিলারাও পর্যন্ত মধ্য পান করতেন৷
◆ বিরাট রাজার স্ত্রী সুদেষ্ণা তাঁর দাসীকে হুকুম করছেন মদ আনার জন্য৷ বিরাট রাজার পত্নী সুদেষ্ণা জলের বদলে মদ্যপান করতেই ভালোবাসতেন।
◆ যদুবংশেও মদ্যপানে ভারতজোড়া খ্যাতি ছিল৷ কৃষ্ণ মদ্য পান করতেন আর বলরাম তো প্রচুর মদ খেতেন, বলরামের প্রিয় মদের নাম ‘আসব’৷ বনভোজনে গিয়ে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর বেহেড মাতাল হয়ে যাদবরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ধ্বংস হয়ে যায়। কত ঘটনা আর উল্লেখ করব !
◆ মহাভারতে মদ খাওয়ার কথার ছড়াছড়ি। মহাভারতে আদিপর্বের শেষ দিকে কৃষ্ণ, অর্জুন, দ্রৌপদী, সুভদ্রা তাঁদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে এক বার যমুনার ধারে বনভোজনে গিয়েছিলেন।
মহাভারতে বর্ণিত, দ্রৌপদী মদ্যপান করতেন।
কখনও কৃষ্ণ, অর্জুন, সুভদ্রার সঙ্গে
আবার কখনও সুভদ্রার সঙ্গে, শুধু দু’জনে।
এমনকি অসুর বধের আগে দুর্গাও সুরাপান করেছিলেন।
বেহেড মাতাল দ্রৌপদী আর সুভদ্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন ব্যাসদেব।
◆ মহাভারতের বীরেরা শরীর আর মনকে চাঙা রাখার জন্য যুদ্ধের সময় নিয়মিতই মদ্যপান করতেন। সে যুগে ‘কিরাত দেশীয় মদ্য’ বোধহয় সবচেয়ে সেরা ছিল। রথী-মহারথীরা তো খেতেনই, তাদের ঘোড়াদেরও খাওয়ানো হত। মহাভারতে সকলেই মদ খেতেন। মহিলারাও পান করতেন। এ ব্যাপারে ব্যাসদেব কোনো রাখঢাক করেননি।
◆ বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ প্রমুখ মুনিঋষিদের আশ্রমেও মদের ভালো জোগান ছিল। তাই তাঁদের আশ্রমে অতিথিরা এলে এইসব পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। ভরদ্বাজের মুখে শুনুন -- “আমি ইন্দ্রাদি তিন লোকপালকে আহ্বান করিতেছি, তাঁহারা আমার অতিথি সৎকারের ইচ্ছাপূরণ করুন। মৈরেয় মদ্য এবং সুসংস্কৃত সুরা প্রবাহিত করিতে থাকুন।”
◆ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ছাড়ুন :- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও বারো রকমের মদ বা সুরার উল্লেখ পাই৷ কোটিল্যের অর্থশাস্ত্রে দেখি সুরাধ্যক্ষ নামে একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পদও ছিল। মদ কেনাবেচার উপর নজরদারিও থাকত। ছিল নানা আইন এবং তা কঠোরভাবে মানতে হত। মদ্যপানের আসরে শুধু ‘সচ্চরিত্র’ লোকেদেরই পরিমিত মদ দেওয়া হত। তবে শুধুমাত্র সমাজের উঁচুতলার মানুষরাই কেবল মদের আসর থেকে মদ বাইরেও নিয়ে যেতে পারতেন। সাধারণ পাবলিকদের মদ্যপান শুধু বার বা পানশালার মধ্যেই প্রবেশাধিকার দেওয়া করা হত।
◆ অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত কয়েকটির মদের নাম জেনে নিই :- চাল থেকে তৈরি হত মোদক, ময়দা থেকে প্রসন্ন, চিনি থেকে আসব, অরিষ্ট, গুড় থেকে মৈরেয় ও মাধ্বী ৷
◆ মদের দোকান বা পানশালা সম্পর্কে কৌটিল্য বলছেন :- পানশালায় অনেক ঘর থাকবে, সেই ঘরে বিছানা ও বসার চেয়ার থাকবে৷ ঘরগুলি গন্ধদ্রব্য, ফুলের মালা, জল ও অন্যান্য স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাও থাকবে৷ ধনী এবং গরিব-গুর্বোদের পৃথক পানশালা ছিল। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই নয়, কৌটিল্য বলেছেন বিশেষ উৎসব উপলক্ষে সাধারণ মানুষ বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মদ উৎপাদন করতে পারবেন৷ মল্লনাগ বাৎস্যায়ন ছিলেন বেদজ্ঞ ভারতীয় দার্শনিক। অর্থশাস্ত্র প্রণেতা কৌটিল্য ও কামসূত্রের প্রণেতা বাৎসায়ন একই ব্যক্তি। ধারণা করা হয়, তিনি গুপ্তযুগে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী ভারতে বর্তমান ছিলেন। কামসূত্র প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত মল্লনাগ বাৎস্যায়ন রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের একটি প্রামাণ্য মানব যৌনাচার সংক্রান্ত গ্রন্থ। বাৎস্যায়নের কামশাস্ত্রে চৌষট্টি কলার মধ্যে একটি পান ও ভোজনের উল্লেখ আছে৷ সেখানে ‘আসব’ নামে পানীয়ের কথা বলা হয়েছে৷
◆ বাৎস্যায়নের কামসূত্রের দশম অধ্যায়ে বলা হয়েছে – “পুরুষ নারীকে আহ্বান করে মদ দেবেন। তার পর তার চুলে বিলি কেটে দেবেন, আলিঙ্গন করবেন।” এছাড়া নানা মদের কথা বলা আছে৷ সেই সব মদ, ফল, ফুল, সবজি, নুন, তেতো, ঝাল, টক ইত্যাদি নানা ধরনের মশলা বা চাটনির (চাট ?) সঙ্গে মিশিয়ে পান করতে বলা হয়েছে৷
◆ আয়ুর্বেদশাস্ত্রে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক চরক তার লেখা চরকসংহিতায় চুরাশি রকমের মদের উল্লেখ করেছেন৷ চরক লিখছেন – “মদ স্বাভাবিক পানীয়, রোজ পরিমিত পান করলে এ অমৃতের মতো, কিন্তু যথেচ্ছ পান করলে রোগের জন্ম দেয়।”
◆ প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও সমান তালে মদ্যপান করতেন। কোন বিধিনিষেধ ছিল না, কোনো জড়তাও ছিল না।
◆ কালিদাসের লেখা ‘শকুন্তলা’ নাটকে দেখা যাচ্ছে, সে যুগে মদের দোকান থেকে মদ বিক্রি করা হত। এমনকি রাজসভার পারিষদদের মধ্যেও মদ্যপানের রেওয়াজ ছিল৷ কালিদাসের লেখায় প্রায়ই ঠোঁটে মদিরার সুগন্ধ মাখানো মহিলাদের উল্লেখ পাওয়া যায় – “ভাসাং মুখৈরাসব গন্ধ-গর্ভৈব্যাপ্তান্তরাঃ”৷ ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকে মদ্যপানের কথা আছে৷
‘মেঘদূত’ কাব্যে মদকে বলা হয়েছে ‘উপভোগ করার ফল’৷ ‘কথাসরিৎসাগর ’-এও রাজার মদ্যপানের বর্ণনা আছে৷ ‘রত্নাবলী’ কাব্যে দেখা যায় নারী-পুরুষনির্বিশেষে মদ্য পান করে নাচ গানে অংশ নিচ্ছে৷
◆ বিনোদ পরের দিন তাদের রুমে ফিরে আসে।
◆ পিসিমার এক প্রশ্নের জবাবে বিনোদ বলে :- আমি সাধুসঙ্গ করছিলাম।
◆ বিনোদ কে মহেন্দ্র আড়ালে ডেকে নিয়ে বলে :- তোর সাধুসঙ্গ মানেই তো মদ পান করা।
তিন দিন তারাপীঠ বসবাস করে পূজা পার্বণ শেষ করে । পিসিমা ঘর বন্ধী হয়ে থাকে আর সবাই আনন্দ ফুর্তি করে দিন কাটিয়ে দেয়।
সুভাষিনীর পদ্ম ফুলের মধু আহরণ করার জন্য দুই টি ভ্রমর গুন গুন করে চলেছে। বিনোদ ও সুভাষিনীর মেলামেশা দেখে মহেন্দ্র হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে।
◆ মহেন্দ্র ভাবে :- খাঁচা থেকে এবার তাহলে সোনার পাখিটি বিনোদের কাছে উড়ে যাবে । ভালবাসা নয় যোনে নরক যন্ত্রণা। কলকাতার বাইরে এসে মুক্ত জীবনের স্বাধীন সুভাষিনীর উচ্ছৃংখলতা ঠিক মেনে নেওয়া যায় না। বাবার টাকা ও উদ্যম যৌবনের রুপের অহংকারে আমাকে কোন রূপেই পাত্তা দিচ্ছে না।
পরেশের এই বিষয়ে কোন শোক তাপ দুঃখ কষ্ট নেই। হাসি খুশি ভাব নিয়ে মনের আনন্দে সবার সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলেছে ।
----------------------------------------------------------
পঞ্চদশ অধ্যায় সমাপ্ত। হিন্দু ধর্মে মদ্যপান।
----------------------------------------------------------
---------------------------------------------------------
।। ষষ্ঠাদশ অধ্যায় ।।
---------------------------------------------------------
◆ সকালের জলখাবার খেতে খেতে বাড়ির সর্বময় কর্তা শশীকান্ত মহাশয় বিনোদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- বাড়িতে টাকা পয়সা পাঠাচ্ছে তো?
◆ বিনোদ বলে :- কিছু টাকা হাতে রেখে বাদ বাকি টাকা মাকে প্রতি মাসে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- তোমার সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। বৌমা তার বাবার বাড়িতে থেকে আর আসবে না।
◆ বিনোদ বলে :- দাদা বৌদি বহু চেষ্টা করেছিলো কিন্তু চামেলি বলেছে আমার সাথে আর সংসার করবে না। আমার নামে বিভিন্ন ভাবে উল্টো পাল্টা বদনাম দিয়েছে। মানুষের জীবনে দারিদ্রতা আসতেই পারে তার জন্য স্বামীকে চিরতরে ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি। যে নারী স্বামীর সংসারের সদস্যদের ভালবাসতে জানে না তাকে নিয়ে বারবার চিন্তা করে সময় নষ্ট করার বোকার কাজ।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- ভারতের সংবিধান অনুসারে তোদের এখনও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি কিন্তু ভবিষ্যতে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
◆ বিনোদ বলে :- এই বিষয় নিয়ে বর্তমানে কিছু ভাবছি না।
◆ শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- বিবাহ বিচ্ছেদ মামলা দায়ের করে সমস্যা সমাধান করে নাও। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবে।
◆ বিনোদ বলে :- বাবার মৃত্যুর পরে বর্তমানে আপনি আমার অভিভাবক, যা ভালো মনে করেন করুন।
তারপর বিনোদ হাত মুখ ধুয়ে রুমে গিয়ে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে কাকিমার ( বিমলা দেবী) উদ্দেশ্য করে বলে, অফিসে যাচ্ছি কিন্তু রাতে আসতে দেরি হতে পারে। অফিসে অনেক কাজ জমা আছে।
◆ সুভাষিনী রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে :-
দেহ সুখের নিত্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের কিন্তু অভাব আমার হয় নাই। সুস্বাদু খাদ্য পানীয়, বিচিত্র বসন-ভূষণ প্রচুর পরিমাণে আছে। আমার পড়ার ঘর ও শয়ন ঘরের সজ্জা অতুলনীয়, আরামের ব্যবস্থা একেবারে নিখুঁত। টাকা পয়সা অবাধে খরচ করার স্বাধীনতা পেয়েছি। বাবা-মায়ের কাছে কখনো টাকা চাইতে হয় না বরং বাবা-মা আমার ঘরে রেখে যায়।
◆ তথাপি আমার দেহের ভিতরের দৈহিক যৌবনের ক্ষুধা মেটে না। পিতার অবজ্ঞায় ও অবহেলার কারণে এই ক্ষুধাকে নিত্য সতেজ রাখে। আমার যৌবনের জোয়ার শুরু হয়েছে কিন্তু আমার হৃদয়ের জ্বালার কথা কেউ অনুভব করছে না।
◆ সৎ মায়ের তো আমার এ বিষয়ে বোঝা উচিত ছিল। আমি কি বিয়ের জন্য বাবা-মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলবো, বাবা-মা আমি বিয়ে করতে চাই। আমি আর যৌবন জ্বালা আর সহ্য করতে পারছি না। মা তোমার তো বোঝা উচিত কারণ তোমারও একদিন এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
◆ নারীর মাধ্যমে নারীর অঙ্গে হাত বুলিয়ে ও কৃত্রিম উপায়ে বেগুন ব্যবহার করে আর কতকাল থাকা যায়। যেদিন অঘটন ঘটে যাবে সেদিন সবার টনক নড়বে কিন্তু সেই মুহূর্তে সবাই আমাকে দোষী সাব্যস্ত করবে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র একজন ভীতু পুরুষ সব সময় ভয়ে ভয়ে চলে। সেই দিক থেকে বিনোদ কিন্তু অনেক চালাক চতুর। সিনেমা হলের সুরক্ষিত বক্সর রুমে তার অঙ্গ স্পর্শে আমাকে আনন্দিত করে তোলে।
◆ বাবা তার মেয়েকে স্নেহ ভালোবাসা আদর থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় যখন দেখতে পায়, পথের ধারে কুলী-মজুরা তাদের ছেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে কত না ভালবাসা প্রকাশ করছে। সেই মুহূর্তে বাবার সকল ঐশ্বর্যকে মনে মনে ধিক্কার দেয়।
অন্নবস্ত্র, বাসস্থান ও টাকা পয়সা প্রদানই আদর নহে, আদর প্রাণের জিনিস। প্রত্যেক প্রাণীকেই স্পর্শ করে আর ভাবেই উহার প্রকাশ।
◆ উকিল শশীকান্ত দ্বিতীয় বার বিয়ের পর দীর্ঘ কয়েক বছর বাদে তার স্ত্রী বিমলা দেবী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। লক্ষ্মীর (সুভাষিনী) বাবা তাহাকে নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়ে। বড় বড় ডাক্তার-কবিরাজ নিত্য আসিতে থাকে।
উকিল বাড়িতে নতুন অতিথি কে দেখাশোনা জন্য একজন আয়া ও একজন কাজের মহিলা কে নিয়োগ করা হয়। আর বিমলা দেবীর দেখা শোনা সেবা যত্ন করার জন্য আলাদা নার্স রাখা হয়।
শিশুর মা দশ মাস রোগ যন্তনা ভোগ করে তারপর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে কিন্তু শারীরিকভাবে দুর্বল অনুভব করতে থাকে।
◆ লক্ষ্মী তার ছোট ভাইকে স্নেহ ভালোবাসা দিতে চাই কিন্তু সব সময় তার কাছে পায় না। ভাইয়ের ভালোবাসার টানে টানে তার সৎ মায়ের কাছে গিয়ে বসে। ভালো-মন্দ ও সুখ দুঃখের কথাবার্তা দুজনের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। লক্ষী তার মাকে সব সময় আনন্দ হাসি খুশি রাখার চেষ্টা করে।
◆ শশীকান্ত মহাশয় একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে তার স্ত্রী বিমলাকে বলেন :- উকালতি ব্যবসা আর ভালো লাগছে না, তাই ভাবছি ছেড়ে দেবে। নিজের ব্যবসা বাণিজ্য ও জমিজমা দেখাশোনা করলেই কিন্তু বাকি জীবন কেটে যাবে।
◆ বিমলা দেবী বলে :- বড়দি (মিনাক্ষী) কিন্তু লক্ষীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কয়েকবার এসেছে, আমার মনে হয় ওকে বিয়ে দেওয়া আমাদের একান্ত কর্তব্য ।
◆ শশীকান্ত বলেন :- বড়দি সহ কয়েকজন হিতাকাঙ্খী বন্ধুরা কিন্তু লক্ষ্মীর বিয়ের ব্যাপারে অনেক আগেই প্রস্তাব দিয়েছে। লক্ষ্মীর এত কি বয়স হয়েছে! পড়াশোনা করছে করুক।
◆ বিমলা দেবী বলে :- লক্ষ্মীর দেহ গঠন অস্বাভাবিক কিন্তু দেখে মনে হয় প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে গিয়েছে। লক্ষীর আচার-আচরণ ভাব ভাব আমার কাছে মোটেই কিন্তু ভালো লাগছে না। কিছু অঘটন ঘটার আগে ওকে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই আমার মনে হয় উত্তম কাজ। ১৮ বছরের প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে ঘরে রাখা একদম ঠিক নয়।
◆ শশীকান্ত বলে :- তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছে। আমার বিশ্বাস আছে লক্ষী এমন কোন খারাপ কাজ করবে না।
◆ বিমলা দেবী রাগ দেখিয়ে বলে :- আমিতো তো একজন নারী আর সেই জন্যই, উত্তাল যৌবনের মেয়ের দুঃখ যন্ত্রনার কথা বুঝতে পারি। তুমি পুরুষ হয়ে তা কখনোই বুঝতে পারবে না।
◆ শশীকান্ত হাই তুলে বলে :- অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমাও। সকালে আমাকে আবার তাড়াতাড়ি আদালতে যেতে হবে। তোমার কথা পরে ভেবে দেখবো।
◆ শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা ও পিসিমা ভীষণভাবে মনঃক্ষুণ্ন হয়ে পড়ে। তবুও পিসিমা বারবার সুভাষিনীর বিয়ের ব্যাপারে ভাই কে বোঝাতে থাকে।
লক্ষী (সুভাষিনী) সকলের সঙ্গে খোলা মনে অবাধ ভাবে মেলামেশা করে তার জন্য তার পিতার দিক থেকে কোন আপত্তি ছিল না, কারণ লক্ষ্মীর বাবা সামাজিক ব্যাপারে উদার মনের মানুষ।
◆ একদিন বিকেল বেলা লক্ষ্মী তার বাবার কাছে গিয়ে আবদার করে বলে :- বাবা; আমাদের বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত মাঠ পড়ে আছে। সেই মাঠে টেনিস বল খেলতে চাই।
◆ বাবা শশীকান্ত হাসতে হাসতে বলেন:- এ তো ভালো কথা, এতে আমাকে বলার কি আছে।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী জলখাবার নিয়ে এসে বাবা ও মেয়ের সামনের টেবিলে রেখে লক্ষীর উদ্দেশ্য করে বলেন :- তোর ভাই কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আয়। দিদি দিদি করে করে কান্না করছে, দিদির কিন্তু ভাইয়ের দিকে কোন নজর নেই।
লক্ষী উঠে গিয়ে মায়ের ঘর থেকে ভাইকে কোলে করে নিয়ে আবার বাবার পাশে এসে বসে খেলা করতে থাকে।
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- টেনিস খেলা করলে মন-মানসিকতা ভালো থাকে এবং শরীরের দারুণ পরিশ্রম হয়। এই বয়সে ফুটবল খেলা সহ বিভিন্ন খেলা ও দৌড়াদৌড়ি করার সময়।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী বলেন :- বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা তো দৌড়াদৌড়ি খেলাধুলা একদম করতে চায়না। সব সময় মোবাইল আর মোবাইল।
◆ বাবা শশীকান্ত বলেন :- আমি ছোটবেলায় ফুটবল খেলার খুব নেশা ছিল। তার জন্য তোর ঠাকুরদার কাছে কত যে বকাবকি শুনতে হয়েছে কারণ তিনি ফুটবল খেলা একদম পছন্দ করতেন না। খেলা করতে গিয়ে বহুবার হাত-পা ভেঙেছি।
◆ বিমাতা বিমলা দেবী হাসতে হাসতে লক্ষীর উদ্দেশ্য করে বলেন :- লক্ষ্মী; তোদের সাথে আমাকেও খেলতে নিবি তো।
◆ লক্ষী বলে :- খেলতে ইচ্ছে হলে অবশ্যই খেলতে পারবে কিন্তু শাড়ি ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পড়তে হবে। বলে ভাইকে কোলে করে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে।
◆ পরেশের বিশেষ তৎপরতায় জায়গা পরিষ্কার করে টেনিস খেলার কোট তৈরি হয়ে যায়।
তারপর লক্ষী, মাস্টার মহেন্দ্র, বিনোদ ও পাড়ার কিছু ছেলে মেয়ে নিয়ে প্রতিদিন বিকালে টেনিস খেলা শুরু হয়।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র এই খেলার কিছুই জানেনা কিন্তু লক্ষ্মী তার হাতে হাত রেখে শিখিয়ে দেয়।
বিনোদ এই বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
বান্ধবী জয়ন্তী মাঝে মাঝে এসে নিপুনভাবে খেলা করতে থাকে। কখনো মাস্টার মহেন্দ্র কে আবার কখনো বিনোদ কে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খেলা করে।
-----------------------------------
---------------------------------------------------------
সপ্তদশ অধ্যায়।
---------------------------------------------------------
◆ লক্ষী (সুভাষিনী) পড়ার টেবিলে বই খুলে রেখে ভাবতে থাকে। বিমাতা বিমলা দেবী আমাদের সংসারে আসার সময় বাবার বাড়ি থেকে একটি কাজের মহিলা কে নিয়ে এসেছিল।
তাহার নাম হরিমতি বয়স ৪৫ বছরের উর্ধ্বে হবে। বিধবার বেশে সাদা থান কাপড় পরিধান করে।
তাহার গলায় একছড়া সরু সোনার বিছা হার ও দুই হাতে চার গাছি সোনার চুড়ি পড়ে। সে একাদশীর উপবাস করে আবার মাথায় সুগন্ধি তেল ব্যবহার করে। চব্বিশ ঘণ্টা দোক্তা যুক্ত পান চিবাইতে থাকে। আমাদের বাড়ির সকল চাকরের উপর তার কটাক্ষ দৃষ্টিপাত সবসময় চলতে থাকে।
শশুর বাড়ির আত্মীয় মনে করে বাবা হরিমতি কে বাড়ির ঝিয়ের কাজকর্ম করতে দেয় না। বর্তমানে বিমাতা কে দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।
বাড়িতে বসবাসের অনেক গুলো ঘর থাকা সত্ত্বেও এক নিভৃত কোণে হরিমতি দিদিমার শোবার ঘর।
ঘর থেকে কোথাও বাইরে বেরোলেই মোটা মোটা দুটো তালা দরজায় লাগিয়ে দেয়। এই বন্ধ রাখার কোন রহস্য এখন পর্যন্ত বুঝতে পারিনি। আবার কাউকে ঘরে ঢুকতে দেয় না।
তার নিজের কোন নির্দিষ্ট কাজকর্ম না থাকার কারণে তিনি সকলের কাজের উপর উস্তাদি করিয়া বাড়ায় আর খামাকা দোষ ত্রুটি ধরে ঝগড়া অশান্তি সৃষ্টি করে।
আমার চালচলন ও ব্যবহার দিদিমা হরিমতি দুই চোখে সহ্য করতে পারে না। আমি মাঝে মধ্যে দিদিমার সাথে দুষ্টুমি করি আর দিদিমা ভীষণ রেগে ওঠে। আর সেই মুহূর্তে চিৎকার চেঁচামেচি করে বিমলা বিমলা বলে ডাকতে শুরু করে। আর আমি আনন্দ অনুভব করে হাতে তালি দিতে থাকি। তাতে দিদিমা আরো ভীষণ রেগে ওঠে।
◆ এই দিদিমা হরিমতি আমার বিরুদ্ধে বিমাতার কাছে বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অভিযোগ করে। বিমাতার আমার মায়ের মত গাম্ভীর্য ও শাসন করার ক্ষমতা তার ছিল না। তিনি রুক্ষ ও কোপন স্বভাবের মেয়ে না হওয়ার কারণে শাসন বা কোন কথাই বলে না।
◆ একদিন হাসতে হাসতে বিমাতা বলেন :- লক্ষ্মী; আমার মাসি কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন। মাসি কে সব সময় রাগিয়ে তোলে কেন! একটু ভালো ব্যবহার করো। আমার কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আমি মাসির কথা শুনে তোমার সৎ মা হতে চাই না।
◆ বিমাতার কাছে হরিমতি পাত্তা না পেয়ে বাবার কাছে গিয়ে নালিশ করতে থাকে। বাবা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো প্রত্যাখ্যান করে দেয়। আর বিভিন্নভাবে মাসি শাশুড়ি হরিমতি কে বোঝানোর চেষ্টা করে।
◆ একদিন বাবা বিরক্ত হয়ে হরিমতি কে বলেন :- আপনি কি আমাদের মেয়ে ও বাবার মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য, এই বাড়িতে অবস্থান করছেন।
আপনি শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় আর সেই হিসাবে আত্মীয়র মত থাকার চেষ্টা করুন। এই বিষয়টি নিয়ে বিমাতার উপর বাবা চাপ সৃষ্টি করে ও উভয়ের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি হয়।
◆ একদিন হরিমতি লক্ষ্মীর পড়ার ঘরে হঠাৎ করে ঢুকে শাসনের ভঙ্গিতে বলেন :- খুকুমণি; এসব কি হচ্ছে! আমাকে খুলে বলোতো। পাড়ার লোকজন তোমাকে নিয়ে বাজে বাজে মন্তব্য ও বিভিন্ন আলোচনা করছে।
◆ লক্ষ্মী বলে :- তাতে আমার কি আসে যায়! মুখ ব্যথা হয়ে গেলে আর আলোচনা করবে না।
◆ হরিমতি রাগাম্বিত হয়ে বলে :- জ্ঞাতি ভাই মাস্টার মহেন্দ্র আছে তার সাথে যত পারো ভাব ভালোবাসা চালিয়ে যাও।
◆ লক্ষ্মী বলে :- দিদিমা; তোমার মন মানসিকতায় খারাপ হয়ে গেছে। সব সময় আমাকে সন্দেহের চোখে দেখো কেন?
◆ হরিমতি বলে :- কি অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। হাসতে হাসতে পর পুরুষের গায়ে ঢলে পড়া আবার গলা জড়িয়ে ধরে বেড়ানো। আমাদের মনে হয় কোনদিন যৌবন ছিল না, তোমার একারই যৌবন জোয়ার এসেছে। বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আর ছেলেদের সাথে ঢলাঢলি করোনা। এতদিন বিয়ে হলে কয়েকটি বাচ্চার মা হয়ে যেতে।
◆ লক্ষ্মী উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে বলে :- দিদিমা; তোমাকে কিন্তু আমার জ্ঞান দিতে হবে না। আমার জ্ঞান দেয়ার জন্য বাবা-মা এখনো জীবিত আছেন।
◆ লক্ষ্মীর চিৎকার শুনে বিমাতা বিমলা সহ বাড়ির লোকজন তাড়াহুড়ো পড়ার ঘরে ছুটে আসে।
◆ বিমাতা বিমালা তার মাসি হাত ধরে বলে :- মাসি; তুমি একটা অশান্তি না করে ছাড়বে না। আমার সুখের সংসারে আগুন লাগাতে চাও।
কেন লক্ষ্মীর ঘরে এসে মেয়েটা কে বিরক্ত করছো। তোমাকে বারবার বলেছি, লক্ষ্মী সম্পর্কে কোন কথা বলবে না, তার বাবা যা ভালো বোঝো তাই তিনি করবেন।
মাসি তুমি কিন্তু লক্ষ্মীর ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব নিয়ে বসোনি, তার অভিভাবক হিসাবে আমরা এখনো বেঁচে আছি। এইভাবে অশান্তি সৃষ্টি করলে আমি বাবাকে বলতে বাধ্য হবে।
বিমলা দেবী তার মাসি কে টানতে টানতে ঘর থেকে বের করে দেয়। তারপর লক্ষ্মীর কাছে এসে মাতৃস্নেহে আদর করে সান্তনা দিতে থাকে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র একদিন লক্ষ্মীকে কথা প্রসঙ্গে বলে :- ভালবাসার পথে যতই বাধা বিঘ্ন আসে, প্রেম আরো প্রবল হয়ে উভয়ের কাছাকাছি এসে যায়।
◆ লক্ষী ভাবে, বাস্তবে ভালোবাসার হৃদয়ের মধ্যে সংকেত অনুভব করছি। আমার প্রথম যৌবনের উদ্দাম আকাঙ্খা প্রাণের মধ্যে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মামাতো দাদা পরেশ কে পেয়ে যায়। তারপর মহেন্দ্র আর দিনেশের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে চলেছি।
প্রকৃতির নিয়মে মনের প্রবৃত্তির প্রবাহ প্রবল বেগে ছুটতে থাকে। আমাকে টানিয়া রাখিবার জন্য শাসন, মাতৃস্নেহ, আদর-যত্ন ছিল না।
মহেন্দ্র ভীরু স্বভাবের কারণে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়ে পড়ে । দীনেশ যেমন সাহসী আবার বেপরোয়া, কোন কিছুকে ভয় না করে সামনে এগিয়ে যাওয়া তার কাজ।
◆ সুভাষিনী এক রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসছে না। বিভিন্ন চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করে। সেই দিনের মিলনের স্মৃতিগুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
বিকাল বেলা বিনোদ সোজা আমার শোয়ার ঘরের দরজায় উপস্থিত হয়ে কোন শব্দ না করে রুমের মধ্যে ঢুকে আমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে।
আমি শাড়ি পরিধান করে হাঁটুর উপরে ও বুকের কাপড় অনাবৃত করে অর্দ্ধ শায়িত অবস্থায় একটা কবিতা পড়ছিলাম।
◆ বিনোদ চোখের দৃষ্টির দ্বারা আমার রূপ যৌবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকে কিন্তু আমি টের পায়নি।
◆ বিনোদ আমার খোলা পিঠে হাত বুলিয়ে বলে :- মনে হচ্ছে যোগী ঋষিদের মত ধ্যানে বসেছেন।
◆ সুভাষিনী তাড়াহুড়ো করে নিজের কাপড় ঠিক করে বলে :- আওয়াজ দিয়ে আসবে তো।
◆ বিনোদ বলে :- লক্ষী; আজ দুপুরে কলেজের নাম করে সিনেমা হলে 'জঙ্গল কি লাভ? চলচ্চিত্র দেখার জন্য যাওয়ার কথা ছিল। তোমার জন্য আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে অপেক্ষা করে করে বাড়িতে ফিরে এলাম।
◆ লক্ষী বলে :- আজ আমার মন মানসিকতা ও শরীর ভালো নেই সেজন্য যাওয়া হয়নি।
◆ বিনোদ দ্রুত লক্ষ্মীর কপালে হাত দিয়ে বলে :- কই কিছুই তো হয়নি, তবে হাত দেখাও। বলে বাম হাত টেনে নিয়ে চেপে ধরে নাড়ির গতি পরীক্ষা করতে থাকে।
◆ লক্ষ্মী বলে :- তা ডাক্তারবাবু রোগীর অবস্থা কি বুঝলেন?
◆ বিনোদ বলে :- তোমার কিছুই হয়নি শুধু আমার সাথে চালাকি করছো। বলে লক্ষীর আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে তার আঙ্গুলগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে পাঞ্জা ধরার মতো চাপ দিতে থাকে।
◆ লক্ষীর মুহূর্তের মধ্যে দেহের বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অপূর্ব পুলকের অনুভূতি সঞ্চারিত হতে থাকে।
◆ বিনোদ বলে :- এই চলচ্চিত্রের মধ্যে পাঁচ জায়গায় সরাসরি জোর করে ধর্ষণের দৃশ্য আছে।
◆ লক্ষ্মী মুচকি হাসি দিয়ে বলে :- তাহলে আমাকে কি ধর্ষণ করতে এলে?
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে লক্ষীর আরো কাছে গিয়ে বলে :- স্বেচ্ছায় যদি হয়ে যায় তাহলে ধর্ষণ করার কোন দরকার নেই। মনের রোগ দূর করতে ডাক্তারি টেডিস্কোপ এর মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করতে হবে।
◆ লক্ষ্মী দুই বাহু প্রসারিত করে বিনোদ কে জড়িয়ে ধরে বলে :- ডাক্তার তোমার ঔষধ সেবন না করলে আমার রোগ ভালো হবে না।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার ভয় করছে না। বাড়ির নিচের তলায় অনেক লোকজন আছে। তারপর হরিমতি দিদিমা তোমার উপর সব সময় নজরদারি করে চলেছে।
◆ লক্ষ্মী বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে :- এই বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র ভয় বা অনুতাপ নেই। কারণ একজন নারী পুরুষের দৈহিক চাহিদা কিন্তু উভয়ের ইচ্ছায় পূরণ হচ্ছে।
◆ আর এই ইচ্ছা পূরণের জন্য বাবা-মায়ের উচিত ছিল, ঠিক সময়ে আমাকে বিয়ে দেওয়ার। এই সময়ে কেউই উপরে আসবে না। মা এখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে । বাবা আসতে আসতে রাত আটটা বাজবে। চাকর বাকর কোনদিনই আমার ঘরে সম্মুখে আসে না। প্রয়োজন হলে কলিং বেল টিপে আওয়াজ করব।
◆ বিনোদ বলে :- ইচ্ছা থাকলে সুযোগের অভাব হবে না।
◆ লক্ষ্মী বলে :- এখন, যেখানে যেতে বলবো ঠিক সেখানেই তোমার সাথে যাব। মন মানসিকতা একদম ঠিক হয়ে গিয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- তাহলে তৈরি হয়ে নাও।
একই ছাদের নিচেই বসবাস করে লক্ষ্মী ও বিনোদের মধ্যে বিভিন্ন বাহানায় আসা যাওয়া চলতে থাকে।
◆ লক্ষী একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে :- দিদিমা হরিমতি যা বলেছে তা একদম মিথ্যা নয়। একটা মেয়ে হয়ে এত উশৃংখল জীবন যাপন কখনোই ভালো নয়। আর পাড়ার লোকজনের খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই, সেজন্য লক্ষ্মীর দশ গুন সমালোচনা আর বদনাম নিয়ে পড়ে আছে।
◆ এই দিদিমার কারণে বিনোদ এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে কিন্তু নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছে।
◆ হরিমতি সব সময় কোন সূত্র পেলেই তাকে তাল থেকে তিল বানিয়ে মানুষের কাছে প্রচার করতে শুরু করে, এতে নাকি তিনি প্রচণ্ড আনন্দ অনুভব করে থাকে।
◆ হরিমতি উকিল বাড়ির মধ্যে তার ষড়যন্ত্রের সাথী কাউকে না পেয়ে পাড়ায় গিয়ে লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে তালকে তিল বানিয়ে বিভিন্ন বিভিন্ন রকম গল্প প্রচার করতে শুরু করে। উকিল বাড়ির দুর্বলতার রসদ হিসাবে মানুষজন আনন্দ অনুভব করতে থাকে।
◆ কিছুদিন পর লক্ষ্মীর বিষয়টি তার বাবা প্রতিবেশীদের মাধ্যমে কানে শুনতে পায়।
◆ শশীকান্ত সমালোচকদের বললেন :- আমার মেয়ের সম্পর্কে যেসব ঘটনা হয়েছে , আমি তা বিশ্বাস করিনা।
◆ আমাদের দেশের মেয়েরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হয় না। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে গেলে মিথ্যা কলঙ্কের কথা সমাজের মানুষেরা রটিয়ে বেড়ায়। এদেশে নারীদের স্বাধীনতার কোন চলিত নেই।
---------------------------------------------------------
--------------------------------------------------------
অষ্টাদশ অধ্যায়।
--------------------------------------------------------
◆ বিনোদ রাতে মদ পান করে বিছানায় শুইয়ে ভাবে কলেজ জীবনের স্মৃতি গুলো। প্রতিটি কলেজে কিছু না কিছু সমস্যা সৃষ্টি করেছিলাম তার কারণে এক এক করে চারটি কলেজ পরিবর্তন করার পর বিএ পাস করি। শনিবার ও রবিবার দুইদিন বাঁধা ধরা ছিল কলকাতার থিয়েটার দেখার। নাচ ও গান আমার ভীষণ ভাবে পছন্দ ছিল।
◆ বাল্যকাল থেকেই আমার কণ্ঠস্বর খুব মধুর ছিল কিন্তু রীতিমতো গান শেখার সুযোগ হয়নি।
কলকাতা আসার পর গান আরম্ভ করলাম ও অল্প দিনেই সুগায়ক বলে একটা খ্যাতি অর্জন করলাম।
◆ কলেজের কিছু সহপাঠীদের পাল্লায় পড়ে কিন্তু উচ্চ কুলে জন্ম লাভ করেও কিন্তু কলকাতার মুসলিম এলাকার হোটেল থেকে হিন্দু ধর্মের নিষিদ্ধ মাংস খাওয়া অভ্যস্ত হয়ে ছিলাম।
◆ ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনালয়ে প্রতি রবিবার নিয়মিত উপস্থিত হয়ে ব্রাহ্ম মহিলাদের দেখে আসার পর নিজের কুৎসিত প্রবৃত্তির উত্তেজনার পক্ষে সাহায্য করতে।
◆ একদিন ব্রাহ্ম উপাসনা শেষ করে বাইরে আসতে কলেজের এক প্রফেসরের সাথে দেখা হয়ে যায়।
বিনোদ হাত জোড় করে অধ্যাপক কে সম্মান জানায়।
◆ প্রফেসর মহাশয় বলেন :- বিনোদ; তুমি এখানে কি করছো?
◆ বিনোদ বলে :- স্যার; এই উপাসনালয়ে আচার্য ব্রাহ্ম নারায়ন শাস্ত্রীর উপদেশ শুনতে এসেছিলাম।
◆ প্রফেসর মহাশয় বলেন :- তা কেমন শুনলে!
◆ বিনোদ বলে :- বেদি থেকে সেই দেব চরিত্র বৃদ্ধ আমাকে বিশেষ ভাবে মুগ্ধ করেছে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বিনোদের উৎসাহ দেখে হাসলেন। অধ্যাপক এর বিশেষত্ব ছিল, তিনি ক্লাসের প্রায় ছেলেকে চেনেন ও নাম ধরে ডাকে। তার নিকট কোন ছেলের ফাঁকি দেওয়ার উপায় ছিল না।
◆ প্রত্যেক কথাতেই নানারকম জেরা করা তার অভ্যাস ছিল।
◆ ক্লাসে পড়াতে পড়াতে তিনি মাঝে মাঝে বলেন :- আমার কথাগুলো বুঝতে পাচ্ছে তো! যদি কোন ছাত্র ও ছাত্রী কেউ কিছু না বলে, তাহলে কোন বিপদের আকাঙ্ক্ষা ছিল না। আপন মনে পড়িয়ে যান কিন্তু কোন ছাত্র-ছাত্রী বিষয় বুঝতে পেরেছি বলে, সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে পড়ে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলতে হবে। আবার ঠিক মতো বুঝিয়ে বলতে না পারলে কিন্তু তাহার তীব্র বিদ্রুপের মাধ্যমে অস্তির করে তুলবে।
◆ তিনি একটু শ্লেষের হাসি হাসিয়া বলেন- “আমি বুঝতে পাচ্ছি যে তুমি কিছুই বুঝতে পারো নাই । পড়াশোনার সময় মন স্থির রেখে মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে।
◆ বিনোদ ভাবে :- ক্লাসের বাহিরেও যে ছাত্র দেখলে অধ্যাপক মহাশয়ের কলেজের ক্লাসের মতো জেরা করার প্রবৃত্তি জাগিয়া উঠে তা কিন্তু আমার ধারণা ছিল না ; থাকলে হয়তো পাশ কাটিয়ে পালানোর ব্যবস্থা করতাম। এখন আর কোন উপায় নেই।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- “কোন কথা গুলো চমৎকার লাগল ?”
◆ বিনোদ কিছু সময় ভেবে নিয়ে ধীরে ধীরে গুছিয়ে গুছিয়ে বলতে থাকে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বিনোদের কাঁধে হাত রেখে আনন্দিত মনে মুখে হাসি খুশি ভাব নিয়ে বলেন :-
“বেশ, বেশ, এই সব কথাগুলো যে তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনেছো, এতে আমি খুব খুশি হলাম।
◆ বিনোদ বলে :- স্যার, সব আপনার প্রচেষ্টা।
◆ অধ্যাপক মহাশয় তার ১৬ বছরের মেয়ে দেখিয়ে বলেন :- আমার মেয়ে লীলাবতী।
◆ বিনোদ হাত জোড় করে সামান্য মাথা নিচু করে লীলাবতীর উদ্দেশ্য নমস্কার জানাই। লীলাবতী হাত জোড় করে প্রতি উত্তর নমস্কার জানাই। তারপর বাবার আহ্বানে গাড়িতে গিয়ে বসে।
◆ বিনোদ ছাত্রাবাসের রুমে ফিরিয়া আসে। এই রুমে দুই জন বসবাস করে।
◆ বিনোদের সহপাঠী ধনঞ্জয় বর্ধমান জেলার জমিদার বংশের ছেলে। তার মা করুণাময়ী অকালে বিধবা হয়ে সংসারের অভিভাবক হয়ে উঠে। ধনঞ্জয় তার মায়ের নিকট থেকে ইচ্ছা মত টাকা প্রতি মাসে ব্যাংক একাউন্টে চলে আসে।
◆ ছাত্রাবাসে প্রত্যেক ছাত্রকে টাকা পয়সার অভাব হলে ধনঞ্জয় টাকা ধার দেয় কিন্তু টাকার জন্য বিশেষ তাগাদা করে না। বিনোদ বহুবার ধনঞ্জয়ের কাছে টাকা ধার নিয়ে কিন্তু সব টাকা শোধ করতে পারেনি। তা নিয়ে ধনঞ্জয়ের কোন দুঃখ বা অভিযোগ নেই। সব সময় বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলে।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয়ের মুখে লীলাবতীর রূপ মাধুর্য বর্ণনা শুনে বিনোদ উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
◆ বিনোদ বলে :- লীলাবতীর চিন্তা করতে করতে রাতে ঘুম আসে না। ধ্যান জ্ঞান সব সময় লীলাবতী।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয় বলে :- অধ্যাপকের কাছে ব্যক্তিগত ভাবে পড়াশোনা শুরু কর কিন্তু মাসে মাসে অধ্যাপকের বেতন দিতে হবে। তাহলে অধ্যাপকের বাড়িতে এক ঘন্টা করে থাকার সুযোগ পেয়ে যাবি আর লীলাবতীর দর্শন লাভ হবে।
◆ বিনোদ বলে :- অধ্যাপকের বেতন দেওয়ার মতো টাকা আমার পরিবার থেকে আসে না।
◆ ধনঞ্জয় হাসতে হাসতে বলে :- তাহলে বিরহ জ্বালায় ভুগতে থাক।
◆ বিনোদ এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা করে পিসিমার দেওয়া টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা তুলে নিয়ে ভাবে, কয়েক মাস অধ্যাপক মহাশয়ের বেতন দেওয়া যাবে। কিছু দিন বাদে বিনোদ অনুনয় বিনয় করে বাবার কাছে পড়াশোনার জন্য আরেক জন গৃহ শিক্ষকের আবেদন জানায়।
◆ বিনোদের বাবা এক সপ্তাহ পর অধ্যাপক মহাশয়ের বেতনের টাকা ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দেয়।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয় কে অধ্যাপকের নিকট পাঠিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে অধ্যাপকের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনার প্রস্তাব করে।
◆ অধ্যাপক অজয় স্যানাল মহাশয় বিনোদের সম্পর্কে ধনঞ্জয় কে বিভিন্ন ভাবে জেরা করে, তার কাছে থেকে বিস্তারিত জানার পর অনুমতি প্রদান করেন। মাসিক বেতন সহ প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এক ঘন্টা করে বাড়িতে পড়াশোনা করার স্থির হয়।
◆ বিনোদ মনের আনন্দে প্রথম দিন বই ও খাতা নিয়ে রুম থেকে বেরনোর সময় বন্ধু ধনঞ্জয় আড্ডার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ভাবে একচোট ঠাট্টা করে ও জ্ঞান দিতে থাকে। তারপর দরজা বন্ধ করে অনুচ্চস্বরে কয়েক বার হুলুধ্বনি করে। তোমার শুভ হোক বলে বিদায় জানায়।
◆ বিনোদ সন্ধ্যার পর অধ্যাপকের বাড়ির নিচতলায় উপস্থিত হয়। ঘরের মধ্যে একটি টেবিল, তার চারিপাশ দিয়ে কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে।
অন্যদিকে দেয়ালের পাশে দুটি বড় ধরনের আলমারির তাকে তাকে ধর্মীয় থেকে রাজনৈতিক ও সাহিত্যের গল্প উপন্যাস সহ বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার বই এবং ম্যাগাজিন হয়েছে।
◆ দশ বছর বয়সের একটি কিশোর বিনোদের সামনে এসে বলে :- বলুন।
◆ বিনোদ বলে :- অধ্যাপক মহাশয়ের কাছে আমি পড়াশোনা করতে এসেছি। আমাকে বাড়িতে আসতে বলেছেন।
◆ উক্ত কিশোর বলে :- আমি অবিনশ্বর সান্যাল। বাবা উপর তলার রুমে আছেন, গিয়ে বলছি।
◆ কিছু সময় পর অবিনশ্বর নিচের ঘরে এসে বলে :- বাবা; আপনাকে উপরে যেতে বলেছেন।
◆ বিনোদ দুরু দুরু বুকে সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অধ্যাপক এর দরজার সামনে উপস্থিত হয়। আওয়াজ দিতেই অধ্যাপক ভিতরে আসার অনুমতি দেন।
◆ অধ্যাপক মহাশয় ও তার সহধর্মিনী সোফায় বসে আলোচনা করছিল আর তার মেয়ে লীলাবতী মিউজিক যন্ত্রের টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে গানের সুর তোলার চেষ্টা করছে।
◆ বিনোদ ঘরের মধ্যে আসতেই অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- বিনোদ; এসো এসো বলে একটি টুল এগিয়ে দেয়। তারপর সোফায় বসে থাকা রমণীর দিকে তাকিয়ে বলে, আমার সহধর্মিনী যশোদা।
◆ বিনোদ অধ্যাপক গৃহিণীর পায়ে হাঁটু গেড়ে প্রণাম করে।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বিনোদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন :- থাক থাক, বসে বসে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় আফসোস করে তার সহধর্মিণীর উদ্দেশ্য করে বলেন :- বহুদিন ধরে ছাত্রদের পড়াশোনা করাচ্ছি কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ছাত্রের কাছে তোমার মতো করে প্রণাম পাইনি। কেউ মুষ্ঠিবদ্ধ হাত মাথার ঠেকিয়েই আবার কেউ মুষ্টিবদ্ধ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, আর তুমি প্রথম দিনই একেবারে প্রণাম পেয়ে গেলে।”
◆ অধ্যাপক মহাশয়ের কথা শুনিয়া অধ্যাপক গিন্নি ও তার মেয়ে হেসে উঠে।
◆ অধ্যাপক গিন্নি বিনোদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- অধ্যাপক মহাশয় তোমার গুরু কিন্তু গুরু কে বাদ দিয়ে গুরু মা'কে আগে প্রণাম করে ভীষণ ভাবে অন্যায় করেছো। বড় করে একটা প্রণাম করে দাও।
◆ আর সাথে সাথে বিনোদ অধ্যাপক মহাশয় এর পায়ে দুহাত রেখে প্রণাম করে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় আশীর্বাদ করে বলেন :- তোমার ব্যবহার আচরণে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।
◆ বিনোদ অধ্যাপক এর মেয়ে লীলাবতীর উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে নমস্কার করে।
◆ লীলাবতী প্রতি উত্তরে নমস্কার জানিয়ে তার বাবার উদ্দেশ্য করে বলে :- বাবা; কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রহ্ম উপাসনা থেকে আসার সময় এই ছেলেটির সাথে দেখা হয়েছিল।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- ঠিক বলেছিস, ছেলেটি আমাদের ব্রাহ্ম সমাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।
◆ বিনোদ চেয়ারে বসে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। ঘরের মধ্যে দেওয়ালে বিভিন্ন
মুনি-ঋষিদের ছবি সহ বিখ্যাত সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের ছবি টানানো রয়েছে। মেঝেতে কার্পেট পাতা আছে। এছাড়াও গানের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সেতার, হারমোনিয়াম ও তবলা সহ বিভিন্ন জিনিস সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একটি লম্বা সোফা কাম বেড, তার সামনে একটি কাঁচের টেবিলে জগ ও গ্লাস রয়েছে।
◆ বিনোদ ভাবে :- এই ঘরটি অধ্যাপক মহাশয়ের শোয়ার ঘর নয় কিন্তু ব্যক্তিগত ঘর বলা চলে। ঘরের আধুনিক সাজসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে অধ্যাপকের ভালোই মার্জিত রুচি বোধ আছে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বিনোদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- আজ প্রথম দিনে আর পড়াশোনার দরকার নেই, বরং তার চেয়ে লীলাবতীর একটা গান শোনা যাক।
◆ লীলাবতী অরগানের ডালা খুলে গান ধরে :-
কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি
বাঁশির তানে গুঞ্জরে
বকুলগুলি আকুল হয়ে
বাঁশির তানে মুজরে
-----------------------
◆ লীলাবতীর কণ্ঠস্বরের মাধুর্য বিনোদ একেবারে অভিভূত করে ফেলে। তার দিক থেকে বিনোদ চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছেনা।
◆ গান শেষ হলে অজ্ঞাতসারে বিনোদের কণ্ঠ থেকে “চমৎকার” শব্দ উচ্চারিত হয়। তারপর অজানা আকাঙ্ক্ষায় ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কালো মুখ করে।
◆ বিনোদের অবস্থা দেখে অধ্যাপক দম্পতি দুজনেই হেসে ওঠে আর লীলাবতী লজ্জিত হয়ে পাশের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
◆ এমন সময় একটি ট্রেতে জল খাবারের সরঞ্জাম নিয়ে একজন কাজের মহিলা প্রবেশ করে।
অধ্যাপক পত্নী লীলাবতী কে চা করতে বলেন।
◆ অধ্যাপক মহাশয় হাসিয়া বলেন :- “কি বিনোদ! চা পান করবে তো ? শুনেছি তুমি গৌড়া-হিন্দুর ছেলে, ব্রাহ্ম সমাজের মানুষের বাড়িতে চা পান করলে কিন্তু তোমার সমাজ একঘরে করবে না তো?”
◆ বিনোদ একটু হাসিয়া মাথা নত করে বলে :- স্যার; আমার কোন ধর্মের গোঁড়ামি নেই । চা কেন গুরু মা যদি ভাত খেতে দেন, খেতে আমার আপত্তি নেই।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- “বেশ! বেশ! এই তো চাই। তোমরা মতোই ছেলেরা দেশের ভবিষ্যতের আশা ভরসা। তোমরা যদি সংকীর্ণতার গন্ডিতে, নিজেকে বেঁধে রাখবে তাহলে দেশটা জাগবে কি করে?
◆ সবাই জল খাবার খাওয়া শেষ করে চায়ে চুমুক দেয়।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- বিনোদ; ব্রাহ্মসমাজ সম্পর্কে কোন ধারণা আছে।
◆ বিনোদ বলে :- তেমন কিছু তথ্য জানা নেই।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- "ব্রাহ্ম আন্দোলন - বিবর্তন, বিভাজন, বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা"। তেজস্বিনী, দুর্গেশ । "প্রথম ব্রাহ্মসমাজ মন্দির ও একটি বাড়ি"। বঙ্গদেশ (ইংরেজি ভাষায়) । উইকিপিডিয়া ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবন্ধ থেকে তথ্য সংগ্রহ তোমাকে বলছি।
◆ ব্রাহ্মসমাজ বা ব্রাহ্মসভা ১৯ শতকে স্থাপিত এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন যা বাংলার পূনর্জাগরণের পুরোধা হিসেবে পরিচিত।
◆ কলকাতায় ২০ আগস্ট, ১৮২৮ সালে (৬ ভাদ্র ১২৩৫ বঙ্গাব্দ) হিন্দু ধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ও তার বন্ধুবর্গ মিলে এক সার্বজনীন উপাসনার মাধ্যমে ব্রাহ্মসমাজ শুরু করেন।
◆ তাদের উপাস্য ছিল "নিরাকার ব্রহ্ম", তাই থেকেই নিজেদের ধর্মের নাম রাখেন ব্রাহ্ম।
◆ ব্রাহ্মসভা নামের অর্থ বিশ্লেষণ :- ব্রাহ্মসমাজের মূলমন্ত্র 'ওঁ ব্রহ্ম কৃপাহি কেবলম্'।
◆ রামমোহনের ধর্মীয় সত্য অনুসন্ধানের তৃষ্ণা তাকে উদার মন নিয়ে সকল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মের শাস্ত্র সমূহ অধ্যয়নে প্রণোদিত করে। এভাবে তিনি শুধু সংস্কৃত ভাষায় হিন্দু ধর্ম শাস্ত্র সমূহ, যেমন বেদ , অধ্যয়ন করেই ক্ষান্ত হন নি; তিনি আরবি ভাষায় কুরআন এবং হিব্রু ভাষা ও গ্রিক ভাষায় বাইবেল পাঠ করেন।
বিভিন্ন ধর্ম অধ্যয়ন তার মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায় যে, যেহেতু প্রত্যেক ধর্মের উদ্দেশ্য অভিন্ন, যথা, মানব জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণ, তাই পরিবর্তিত সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক ধর্মের পুনর্ব্যাখ্যা ও পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন। সুতরাং তিনি চিন্তা করে দেখলেন যে, তার পক্ষে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে অন্য কোন ধর্ম গ্রহণের পেছনে কোন যুক্তি নেই।
তিনি প্রত্যেক ধর্মের গোঁড়ামি, শাস্ত্রীয় আচার পালন ও কুসংস্কার বাদ দিয়ে সর্বজনীন নৈতিক উপদেশাবলি গ্রহণ করবেন। কিছুদিন যাবৎ অনেকটা অন্ধের মতো অবসন্ধানের পর ১৮২৮ সাল নাগাদ তার ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা কিছুটা স্পষ্ট রূপ লাভ করে। ঐ বছরের আগস্ট মাসে তিনি ব্রাহ্ম সভা (পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্ম সমাজ) অর্থাৎ ঈশ্বরের সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
যদিও এ নব প্রতিষ্ঠিত সমাজের তাত্ত্বিক দাবি ছিল যে, এটাকে সর্বজনীন ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, তবুও এটা হিন্দু ধর্মের একটি শাখায় পরিণত হয় এবং সেভাবেই বিরাজমান। এ নতুন ধর্মবিশ্বাসের ধর্মীয় মতবাদসমূহ ব্রাহ্ম সমাজের ট্রাস্টের দলিলে লিপিবদ্ধ আছে।
◆ ব্রাহ্ম সভা :- ১৮৩৩ সালে ইংল্যান্ডে রামমোহন রায় মারা যাওয়ার পর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের বাধার সম্মুখীন হয়। রামমোহনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী দ্বারকানাথ ঠাকুরের (১৭৯৪-১৮৪৬) পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) কাজটি হাতে নেন। তার নেতৃত্বে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনটি নতুন মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য পরিগ্রহ করে।
◆ ১৮৩৯ সালে তত্ত্ববোধিনী সভা নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন যা এই নতুন ধর্মমত প্রচারে ভীষণভাবে সচেষ্ট হয়। তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা নামে একটি সংবাদপত্রও প্রকাশ করেন যেটি এ নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সংস্কার সাধনের পক্ষেও জনমত গড়ে তোলে। এ সময়ে হিন্দুধর্মের বিপক্ষে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকদের অত্যধিক আক্রমণাত্মক প্রচারণা চলছিল।
◆ ব্রাহ্ম সমাজের মধ্য থেকে আমূল সংস্কারের সমর্থক শ্রেণীটি বেদ যে অভ্রান্ত এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)। ঐ সময় পর্যন্ত বেদ যে অভ্রান্ত সেটা ব্রাহ্ম ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বিবেচিত হতো।
◆ ১৮৪৭ সালের দিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষার পর ব্রাহ্ম নেতৃবৃন্দের মনে দৃঢপ্রত্যয় জন্মে যে, বেদের অভ্রান্ততার মতবাদ আর গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একেশ্বরবাদী ধারণা সংবলিত উপনিষদের নির্বাচিত অংশসমূহের ওপর ভিত্তি করে ব্রাহ্ম ধর্মবিশ্বাস পুনর্নিমাণের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।
◆ ব্রাহ্ম সমাজের সংশোধিত মতবাদটি ১৮৫০ সালে ‘ব্রাহ্ম ধর্ম’ অথবা ‘এক সত্য ঈশ্বরের পূজারীদের ধর্ম’ নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এটা উল্লেখ করতে হয় যে, যদিও বেদকে অস্বীকার করা হয়, তবুও ব্রাহ্ম আন্দোলনের অপরিহার্য হিন্দু চরিত্র ধরে রাখা হয়।
◆ রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর অনেকটা মৃতপ্রায় ব্রাহ্ম সমাজে দেবেন্দ্রনাথ নতুন জীবনের সূচনা করেন। কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৩৮-১৮৮৪) প্রগতিশীল নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও ব্যাপক ভিত্তি লাভ করে। তিনি ১৮৫৭ সালে ব্রাহ্ম সমাজে যোগদান করেন এবং এক বছরের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথের ডান হাতে পরিণত হন। কিন্তু প্রধানত বর্ণপ্রথা পালন ও সামাজিক সংস্কার সমূহ কে কেন্দ্র করে তাদের দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।
◆ যেখানে দেবেন্দ্রনাথের পদ্ধতি ছিল কিছুটা রক্ষণশীল, সেখানে কেশবচন্দ্র সেন জাতিভেদ প্রথা পুরোপুরি বিলোপ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং সমাজ সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে যান, বিশেষত স্ত্রী শিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলনে।
◆ ১৮৬৮ সালে কেশবচন্দ্র সেন ভারতের ব্রাহ্ম সমাজ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে অন্য সংগঠনটি আদি ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিতি লাভ করে। বোম্বাই, মাদ্রাজ ও অন্যান্য স্থানে বক্তৃতা-সফরের মাধ্যমে কেশবচন্দ্র সেন ভারতের বৃহৎ অংশ ব্যাপী ব্রাহ্ম সমাজের বাণী ছড়িয়ে দেন।
প্রধানত তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে ১৮৭২ সালে সিভিল বিবাহ আইন পাস হয়। এটি ধর্মীয় আচারাদি পালন ব্যতিরেকে অযাজকীয় বিবাহ অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন করে। আইনটি এক বিবাহ কে বাধ্যতামূলক করে এবং কনে ও বরের বয়সের নিম্নসীমা ও যথাক্রমে ১৪ ও ১৮ বছর নির্ধারণ করে দেয়।
◆ ব্রাহ্ম সমাজের বিভাজন :- কিভাবে আদি ব্রাহ্ম সমাজের উদ্ভব? ১৮৫৮ সালে তরুণ কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজের যোগ দিলে এই একেশ্বরবাদী আন্দোলন বৃহত্তর আকার লাভ করে। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রশ্নে একমত না হলে নিজে ' ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ' (১৮৬৬) গঠন করেন এবং তখন থেকে দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন ব্রাহ্মসমাজ 'আদি ব্রাহ্মসমাজ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
◆ তত্ত্ববোধিনী প্রকাশ :- কেশব সেন ব্রাহ্ম ধর্মবিশ্বাসে নির্দিষ্ট কিছু নতুন উপাদান প্রবর্তন করে সেটাকে পুনর্নির্ধারণ করেন। তিনি চাইছিলেন হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম , খ্রিস্টান ধর্ম ও ইসলাম ধর্মের সারাংশ আহরণ করে একটি মহান সমন্বয় সৃষ্টি করতে। তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ‘সকল ধর্ম সত্য।’ তিনি তার ধর্মীয় আচারে প্রচলিত হিন্দু-ধারণা ভক্তি অথবা আরাধনার উৎসাহ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং ‘ঈশ্বরের নৈতিক চেতনা’র মতবাদের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
পরিশেষে, ১৮৮০ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা কিছুটা নির্দিষ্ট আকার ধারণ করে যখন তিনি ‘নববিধান’ অথবা ‘নতুন নিয়ম’ নামে তার ধর্মীয় বিশ্বাস জনসমক্ষে ঘোষণা করেন। এতে প্রাণবন্ত ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস এবং বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের ব্যাখ্যা গত দিক দিয়ে বৈচিত্র্য ও অপরিপূর্ণতা থাকা সত্ত্বেও এরা স্বতন্ত্র নয় বরং পরস্পরের পরিপূরক এ বিশ্বাস স্থাপনের পক্ষে আহবান জানানো হয়।
কিন্তু কেশব সেনের নির্দিষ্ট কিছু ধারণা ও কার্যকলাপ তার অনুসারিবৃন্দ, বিশেষত যুবা ও চরমপন্থীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। তারা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তার অত্যুৎসাহী আনুগত্য প্রকাশ কে অপছন্দ করত এবং কোচবিহারের রাজার সাথে তার কন্যার বিবাহের ব্যাপারে তার আচরণ নিয়েও ক্ষুব্ধ ছিল। কনে ও বর উভয়ই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল এবং সনাতন হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুযায়ী ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা এ বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পাদন করে। এতে ঘটেছিল ব্রাহ্ম সমাজের ধর্ম বিশ্বাস ও প্রথার নিদারুণ লঙ্ঘন। কেশবের কর্তৃত্বপরায়ণতা ও অযৌক্তিক আচরণও তার অনুসারীদের অনেকের উত্তেজিত হওয়ার কারণ ঘটিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৪) ও আনন্দমোহন বসুর (১৮৪৭-১৯০৬) নেতৃত্বে আমূল সংস্কারের পক্ষপাতী শ্রেণীর লোকজন কেশবচন্দ্র সেনের সমাজ থেকে বের হয়ে আসে এবং ১৮৭৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ গঠন করে। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি গঠনতন্ত্র তৈরি করে এবং একটি সর্বজনীন ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নিতে এর আকাঙ্ক্ষা জনসমক্ষে ঘোষণা করে। এ মহিমাম্বিত দাবি সত্ত্বেও ব্রাহ্ম আন্দোলন আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে নি, বরং দিনে দিনে শক্তি হারাতে থাকে। উনিশ শতকের শেষের দিকে ‘নবজাগ্রত’ হিন্দুধর্ম ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের অধিকাংশ ধর্মীয় ও সামাজিক ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করতে শুরু করে।
◆ ধর্মমত :- একেশ্বরবাদী হলেও দেবেন্দ্রনাথ মনে করতেন যে, ব্রাহ্মধর্ম হিন্দু ধর্মই , বরং হিন্দু ধর্মের বিশুদ্ধতম রূপ । তিনি মূর্তিপূজা ব্যতীত হিন্দু ধর্মের জাতিভেদ বা অপর কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজি ছিলেন না। রামমোহন রায়ের আদর্শেই তিনি ও তার অনুগামীরা ধর্মীয় সংস্কারে ব্রতী হন।[৩]
বিনোদ বলে :- সমাজের মানুষের সাথে ভীষণভাবে কঠোর লড়াই করে ব্রাহ্ম সমাজ কে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হয়েছে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- রাত অনেক হয়েছে। ইচ্ছা করলে রাতে থেকে যেতে পারো।
◆ বিনোদ বলে :- না স্যার; ছাত্রাবাসে চলে যায়।
◆ অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে আসা যাওয়া করতে করতে বিনোদের সপ্তাহ পার হয়ে যায়। প্রতি শনিবার অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে নতুন ও পুরাতন কন্ঠশিল্পী নিয়ে গানের আসর বসে। গানের সাথে সাথে সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
◆ আজ শনিবার গানের আসরে প্রথমে লীলাবতী একটি গান শোনায়।
◆ তারপর লীলাবতী তার মাকে বলে :- বিনোদ বাবু ; নিশ্চয় গান গাইতে জানেন। ওকে একখানা গান গাইতে বলে না।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বিনোদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- লীলাবতীর কথা শুনেছ, গান জানা থাকলে গাইতে শুরু করে।
◆ বিনোদ আমতা আমতা করতে করতে ভাবে:- গান গাইতে জানি না, এই জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা অধ্যাপক মহাশয় কে বলবো। অধ্যাপক মহাশয়ের সামনে গান গাইতে লজ্জা করছে।
◆ বিনোদের ইতস্তত ভাব দেখে অধ্যাপক গৃহিণী হাসতে হাসতে বলেন :- বিনোদ; তোমার ভাব দেখে মনে হচ্ছে গান গাইতে জানো। তোমার শিক্ষকের সামনে সত্য কথা স্বীকার করতে চাচ্ছো না।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- গুরু মশায়ের ভয় আজকাল আর নেই। আমরা ছাত্র কে বন্ধু বলে মনে করি এবং আশা করি তারাও আমাদের বন্ধু বলে মনে করবে ।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বলেন :- বিনোদ; তবে আর কি! এইতো হুকুম পেলে, এখন গাও।
◆ লীলাবতী হাত জোড় করে অনুরোধ করে বলে :- বিনোদ বাবু; একটা গান শুরু করুন না।
◆ বিনোদ বিনয় করে লীলাবতীর উদ্দেশ্যে করে বলে :- তেমন কিন্তু ভালো গান গাইতে পারি না। আপনার অসাধারণ সুন্দর গানের পর কিন্তু আমার গান আর ভালো লাগবে না।
◆ লীলাবতী বলে :- অপরিচিত স্থানে গান গাইবার পূর্বে যেটুকু ভদ্রতা করা প্রয়োজন ছিল, তা কিন্তু আপনি করেছেন। এখন উঠুনতো-একটা গান শোনান।”
◆ বিনোদের আকুতি মিনতি ও বিনয় দেখে অধ্যাপক মহাশয় ও তাহার গৃহিণী হেসে উঠলেন।
◆ অনেক অনুরোধের পর বিনোদ উঠে অরগ্যানের কাছে গিয়ে বসে পড়ে আর একটা হিন্দি গান গাইতে শুরু করে।
◆ লীলাবতীর কণ্ঠস্বর মধুর হইলেও কিন্তু উচ্চ সংগীতে তার কোন শিক্ষা ছিল না। বিনোদ কলকাতা আসার পর গানের গুরু ধরে তার নিকটে রীতিমত বিশুদ্ধ তাল লয়ে সংগীত শিখেছে। লীলার চিত্ত আকর্ষণ করার জন্য সেই মুহূর্তে সমুদয় প্রাণ ঢেলে দিয়ে গান করতে থাকে।
বিনোদের গান শেষ হলে সবাই চুপচাপ হয়ে যায়।
◆ অধ্যাপক মহাশয় প্রথম নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলেন :- বিনোদ; তুমি তো অবাক করে দিলে, এমন সুন্দর গাইতে পারো ,তা কিন্তু আগে ভাবিনি।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বলেন :- ভেবেছিলাম, সাধারণ স্কুল কলেজের ছেলেরা যেমন গায়-তুমি তেমনি
গাইবে ; কিন্তু বিশুদ্ধ তাল লয়ে এমন সুন্দর ভাবে গান গাইবে, তা কিন্তু কেহই আশা করি নাই।
◆ লীলাবতী বলে :- আমার গান শুনে নিশ্চয়ই বিনোদ বাবু মনে মনে হেসে ছিলেন। আগে
জানলে আপনার সামনে গান গাইতাম না।
◆ বিনোদ বলে :- আপনি যে সুন্দর গান শুনিয়েছেন, তার কথা আমি জীবনে কোন দিন ভুলতে পারব না। এমন মিষ্টি গলার স্বর আমি জীবনে কোনদিন শুনিনি।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বলেন :- লীলাবতীর সুর মিষ্টি হলেও কিন্তু সে গান কিছুই শেখেনি। তুমি
তো রীতিমত গানের ওস্তাদ দেখছি।
◆ বিনোদ বলে :- না না। আমি এখনও ওস্তাদ হতে পারিনি, তবে গান শেখার চেষ্টা করছি মাত্র।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- থাক; তর্ক করে সময় নষ্ট করে কাজ নেই, তার চেয়ে বিনোদ আরেকটা গান গাও ।
◆ বিনোদের অনুরোধ লীলাবতী আর একটা গান গাইতে থাকে। শেষে অধ্যাপক গৃহিণী গান গাইতে শুরু করে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় রাত নয়টার সময় গানের আসর শেষ করে। অধ্যাপক গৃহিণীর অনুরোধে বিনোদ খাওয়া দাওয়া শেষ করে ছাত্রাবাসের দিকে রওনা দেয়।
◆ বিনোদ প্রতিদিন নিয়মিতভাবে অধ্যাপক মহাশয়ের নিকট পড়তে যায়। শনিবার গানের আসরে আরো বিভিন্ন গায়কের সাথে আলাপ পরিচয় ঘটে। বিনোদের সুকষ্ঠ ও সংগীত শাস্ত্রের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে বিভিন্ন জায়গায় গানের জন্য আহ্বান জানায়। কিছু মহিলা কন্ঠ শিল্পীর সাথে আলাপ পরিচয় ঘটে।
◆ বিনোদের জীবনের প্রথম অধ্যাপকের পরিবারের মাধ্যমে ব্রাহ্ম সমাজের অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ হয়।
◆ নারীদের সাথে খোলামেলা স্বাধীনভাবে মেলামেশার সুযোগ এই সমাজের মানুষের কাছে আছে। বিনোদ প্রথমে তাদের সাথে মেলামেশা করতে সংকোচ বোধ করতে কিন্তু ধীরে ধীরে তা কেটে যায়।
◆ প্রায় দুই মাস পর একদিন অধ্যাপক গৃহিণী বিনোদ কে কাছে ডেকে বলেন :- তোমার পড়াশুনার যদি বিশেষ কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে তুমি লীলাবতী কে গান শেখালে আমরা খুব খুশি হব।
◆ বিনোদ বলে :- অধ্যাপক মহাশয় যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- গান শেখানোর অনুমতি দিলাম।
◆ বিনোদ প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় অধ্যাপক মহাশয়ের কাছে ঘণ্টাখানেক নিজের পড়াশোনা করার পর লীলাবতীর গানের রুমে গিয়ে এক ঘণ্টা করে গান শেখাতে শুরু করে।
◆ মাসের শেষের দিকে বিনোদ পড়তে এসে অধ্যাপক মহাশয় কে তার মাসিক বেতনের টাকা হাতে দেয়।
◆ অধ্যাপক মহাশয় টাকা গুলো হাতে নিয়ে নড়াচড়া করার পর বিনোদের হাতে দিয়ে বলেন :- আমাকে আর কোন দিন বেতনের টাকা দেবে না।
◆ আমি তোমার শিক্ষক আর তুমি আমার মেয়ে লীলাবতীর গানের শিক্ষক বা গুরু। যদি তোমার পড়াশোনার জন্য টাকা সহ কিছু প্রয়োজন হয় তবে আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারো।
◆ লীলাবতী কে গান শেখাতে বিনোদের বেশি বেগ পেতে হয় নাই। যে কোন কঠিন সুর আয়ত্ত
করার ক্ষমতা তার ছিল ; কিন্তু বিপদ হলে “তাল” নিয়ে ; সুর কে তালের গন্ডিতে বেঁধে গান গাইতে হয়।
◆ সুর ও তাল নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু কিছু দিন কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে লীলাবতী, তার আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসে।
◆ বিনোদ ভাবে :- লীলাবতী কে গান শেখানোর উপলক্ষে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে চলেছে। প্রথম প্রথম তার বাবা-মা উপস্থিত থাকতেন কিন্তু বর্তমানে থাকেন না। আমি ভালো ভালো গান শেখানোর চেষ্টা করি।
◆ বিনোদ কিন্তু লীলাবতীর মাধ্যমে তার বন্ধুদের ও আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গানের জন্য নেমন্তন্ন পেয়ে থাকে। ছোট-বড় অনেক মজলিসে গান করার সুযোগ পেয়েছে। বহু আভিজাত্য পরিবারের মহিলাদের সাথে আলাপ পরিচয় ঘটেছে।
◆ বিনোদ প্রতি রবিবার বিকেলে অধ্যাপক
মহাশয়ের সাথে ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনালয়ে যেতে শুরু করে। উপাসনার শেষে অধ্যাপক মহাশয়ের
সাথে সেই দিনের বক্তৃতা সম্বন্ধে গভীরভাবে আলোচনা চলতে থাকে।
◆ বিনোদ ভাব দেখিয়ে অধ্যাপক মহাশয়ের পরিবারের সদস্যদের ও ব্রাহ্ম সমাজের মানুষকে বোঝাতে, প্রচলিত হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারাছন্ন আচার ব্যবহারের প্রতি ক্রমশ বিতৃষ্ণ এবং ব্রাহ্ম সমাজের আচার ব্যবহারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে।
◆ আকর্ষণীয় ভালো ভালো ব্রহ্মা সংগীত গুলো
যতন করে গোপনে শিখিতে থাকে। কতকগুলি সংগীতে প্রচলিত সুর পরিবর্তন করে তাহাতে নূতন শ্রুতিমধুর ঢং লাগিয়ে নিজে গাইতে শুরু করে।
◆ ফলস্বরূপ যাহারা এসব গানে অভ্যস্ত ছিলেন, তাহারাও বিনোদের নিকট একটি নতুন কিছু
শেখার আগ্রহ নিয়ে বিনোদের সাথে আলাপ পরিচয় তারপর ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতে থাকে। এই ভাবে দিন দিন বিনোদের যশ প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি হতে থাকে।
◆ বিনোদ রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে :- লীলাবতী কে কাছে পাওয়ার জন্য জীবনে কত কিছু করলাম কিন্তু তার দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই।
লীলাবতীর সরল সহজ নিঃসংকোচ ব্যবহারই যেন, আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আমি তার মধ্যে এমন কিছু দেখতে পাইনি, তার নিকট কোন প্রকার অসৎ প্রস্তাব করতে পারি।
◆ দিন দিন লীলাবতীর সান্নিধ্য ও তার রূপ মাধুর্য দর্শন করতে করতে কিন্তু আমার কাম উত্তেজনা ও বাসনার অনলে ইন্ধনের কারণে পাগল করে তুলেছে।
◆ কেবল লীলাবতী নয়, যে সকল মহিলাদের সাথে মেলামেশা করে থাকি-তাহাদের অনেকেই সৌন্দর্যই আমার প্রাণে এক প্রকার লালসা সৃষ্টি করেছে। “বাঁশ বনে ডোম কানা" যাহাকে বলে আমার দশা অনেকটা তা হয়েছে।
------------------------------------------------------
অষ্টাদশ অধ্যায় সমাপ্ত।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
উনবিংশ অধ্যায়।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী কে না জানিয়ে কিন্তু জয়ন্তী তার বাড়িতে মাস্টার মহেন্দ্র কে নেমন্তন্ন করে আর যথাসময়ে মহেন্দ্র উপস্থিত হয়।
◆ মহেন্দ্র চা পান করতে করতে জয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বলে :- জয়ন্তী; তোমার মতো অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডিত দেহ কান্তি সুন্দরী মহিলার সাথে মেলামেশার সুযোগ পেয়ে কিন্তু নিজেকে গর্ব অনুভব করছি।
তোমাকে ভীষণভাবে ভালোবেসে ফেলেছি, তোমার সম্মতি থাকলে ব্রাহ্মসমাজের মতে দুজনে বিয়ে করতে পারি।
◆ জয়ন্তী বলে :- মহেন্দ্র বাবু ; আমার স্বামী এখনো জীবিত আছেন।
◆ মহেন্দ্র বলে :- তোমার স্বামী জীবিত থাকাকালীন কিন্তু মৃত্যুর সমান। তিনি যৌবনের কি সুখ শান্তি দিয়েছে?
◆ জয়ন্তী বলে :- সুভাষিনীর ভালোবাসা কি হারিয়ে গিয়েছে?
◆ মহেন্দ্র বলে :- বিনোদের প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে আর বলেছে আমার নাকি সাহস নেই। সামনে রসালো ফল থাকতেও নাকি ছুঁয়ে দেখিনি।
◆ জয়ন্তী বলে :- সুভাষিনী কিন্তু বর্তমানে আমাকে সবসময় এরিয়ে চলার চেষ্টা করে। বিনোদের তো বউ আছে। আর ভালোবাসা করার জায়গা পেল না।
◆ মহেন্দ্র বলে :- সুভাষিনী কে অন্তর থেকে ভালবাসতাম কিন্তু ওর দেহের চাহিদার কোন দিন সাড়া দেয়নি।
◆ জয়ন্তী হাসতে হাসতে বলে :- আমাকে আর মিথ্যা কথা বলতে হবে না। কে সাধু পুরুষ আর কে চোর বদমাশ ও চরিত্রহীন তা আমার ভালো করে জানা আছে।
◆ মহেন্দ্রর মুহূর্তের মধ্যে মুখ কালো চুপচাপ হয়ে যায়।
◆ জয়ন্তী বলে :- সুভাষিনী; তোমাকে ব্যবহার করেছে ঠিক কিন্তু তার দেহের অতিরিক্ত কামের জ্বালা যন্ত্রণা মেটাতে পারেনি, বিনোদ কে ব্যবহার করে ভীষণ ভাবে খুশি হয়েছে।
◆ মহেন্দ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে :- আসছি।
◆ জয়ন্তী তাড়াহুড়ো করে মহেন্দ্রর হাত চেপে ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে বলে :- আজ বাড়িতে কেউ নেই, সেই কারণেই তোমাকে আমার ঘরে আহ্বান জানিয়েছি কিন্তু আমাকে ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে চলে যেতে দেবে না।
◆ মহেন্দ্র বলে :- আজ আমার মন মানসিকতা ঠিক নেই।
◆ জয়ন্তী বুকের কাপড় সরিয়ে মহেন্দ্রর আরো কাছাকাছি হয়ে তার কাঁধে দুই হাত রেখে বলে :- আমার ভালবাসার কোন মূল্য নেই। স্বামীর অবর্তমানে যৌবনের উন্মাদনায় পাগল হয়ে আছি।
আমার দেহ ও মনের শান্তি দাও।
◆ মহেন্দ্র ভাবে এই তো আমি চেয়েছিলাম কিন্তু আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না।
◆ জয়ন্তী কামের উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে মহেন্দ্র কে জড়িয়ে ধরে বলে :- তুমি,আজ থেকে আমার পরকীয়া প্রেমের স্বামী।
◆ বাবার বাড়িতে কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর স্বামীর নির্দেশে তার শ্বশুর বাড়িতে বসবাস করতে থাকে।
◆ জয়ন্তীর স্বামীর ঠাকুর দাদা ভবেশ একজন উচ্চশিক্ষিত বয়স্ক ব্যক্তি। ধন সম্পদ ও বিশাল অট্টালিকার মালিক। যৌবনের সময়ে আনন্দ ফুর্তি করার জন্য কিন্তু বিরাট বাংলো বাড়ি ও বাগান বাড়ি তৈরি করে।
◆ দুই ছেলে ও বৌমা তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার জন্য কেউ দিল্লি আবার কেউ গুজরাট স্থায়ীভাবে জায়গা জমি কিনে ঘর বাড়ি করে বসবাস করছে।
◆ ভবেশ দাদা মশাইয়ের ৪০ বছর বয়সের সময় গৃহিণী হারা হয়ে দুঃখ কষ্ট সহ্য করেই, একা একা সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। নিরোগ দেহে সুস্থ-সবল ও যুবকের মত বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে।
◆ দাদা মশাইয়ের দেখা শোনার জন্য জয়ন্তী কে তার স্বামী গ্রামের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেন।
অবশ্যই বাড়িতে কাজের দুই জন মহিলা সহ কয়েকজন পুরুষ কর্মচারী আছে, কিন্তু দিনের কাজ শেষ করে রাতে তাদের বাড়িতে চলে যায়।
◆ সুখোদা (সুখো) নামে একজন বয়স্ক মহিলা এই বাড়িতে দীর্ঘদিন আশ্রিত হয়ে আছেন। তিনি সংসারের ভালো মন্দ সহ সব কিছুর দায়িত্ব নিয়ে নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছে। দাদা মশাই উক্ত মহিলা কে দিদি বলে সংবর্ধনা করে কিন্তু উভয়ের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ।
◆ দাদা মশাইয়ের, নাতি বৌ জয়ন্তী কে পেয়ে আনন্দিত হয়ে, মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন সোনার গয়না, টাকা সহ দামি দামি শাড়ি আবার বিশেষ উপহার সামগ্রী জয়ন্তী কে দিতে থাকে। জয়ন্তী আনন্দিত হয়ে উপহার সামগ্রী গ্রহণ করে।
◆ জয়ন্তীর স্বামী পাঁচ থেকে ছয় মাস পর পর বাড়িতে আসে, এক মাস থাকার পর আবার চাকরির কর্মস্থলে চলে যায়।
◆ জয়ন্তীর স্বামী চলে যাওয়ার এক মাস পর একদিন রাতে দাদা মশাই তার নাতি বৌ জয়ন্তী কে তার ঘরে ডেকে নিয়ে পাশে বসিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা বলতে বলতে জয়ন্তীর হাত চেপে ধরে বলে :- নাত বৌ; দীর্ঘ কয়েক বছর তোমার দিদিমা শাশুড়ি মারা গিয়েছে কিন্তু কাম উত্তেজনায় ভীষণ ভাবে জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছি। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসা দিয়ে সঙ্গ করে, তাহলে তোমার জন্য বহু কিছু করে দেবে।
◆ জয়ন্তী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে :- আমি, আপনার নাত বৌ কিন্তু এই রকম জঘন্য প্রস্তাব দিতে আপনার বিবেককে বাদলে না। আপনার বয়সের কথা একবার চিন্তা করুন।
◆ দাদা মশাই বলে :- আমার নাতি তো তোমাকে যৌবনের কোন সুখ শান্তি দিতে পারেনা। ভাইয়ের কাজটি না হয় আমি করে দিলাম। তোমার হাতের মুঠোয় রাজ ঐশ্বর্য পেয়ে যাবে আর তোমার পায়ে সারাজীবন সেবক হয়ে সেবা করে যাবে।
◆ জয়ন্তী উঠে দাঁড়িয়ে বলে :- চাই না, আমার রাজ ঐশ্বর্য । স্বামী ও সন্তান নিয়ে সুখে ও শান্তিতে থাকতে দেন। বলে চলতে শুরু করে।
◆ দাদা মশাই ভবেশ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে জয়ন্তীর পথ অবরোধ করে জড়িয়ে ধরে।
◆ জয়ন্তী ঝটপট করে পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু সেই মুহূর্তে বাড়ির আশ্রিত সুখোদা উপস্থিত হয়ে দুই জনে টানতে টানতে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে।
তারপর সুখোদা দরজা বন্ধ করে দিয়ে জয়ন্তীর কাপড় ধরে টানতে শুরু করে। জড়াজড়ি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয় কিন্তু দুই জনের শক্তির সাথে জয়ন্তী হার মানতে বাধ্য হয়।
◆ দুজনে মিলে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো জয়ন্তী কে উলঙ্গ করে দেয়। তারপর সুখোদা এর সহযোগিতায় জয়ন্তী কে দাদা মশাই ভবেশ ধর্ষণ চালাতে থাকে।
◆ সুখোদা বলে :- আরো মাগি; আমার যতদিন যৌবনের জোয়ার ছিল, ততদিন ভবেশ কে আনন্দ ফুর্তি করতে দিয়েছি। তোর স্বামী থাকে না ঘরে তাহলে দাদা মশাই তোর ঘরে থাকলে দোষ কোথায়!
◆ দাদা মশাই বিভিন্ন অজুহাতে নানা ধরনের প্রলোভন, প্রতারনা ও ভয় দেখিয়ে নিয়মিত ভাবে জয়ন্তীর উপর কাম চরিতার্থ করে চলেছে। মাঝে মাঝে বাগান বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মনের আনন্দে ফুর্তি করে থাকে।
◆ জয়ন্তী রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে :- এই তো নারীর অসহায় জীবন, একদিকে স্বামী আবার অন্য দিকে স্বামীর ঠাকুর দাদা মশাইয়ের মন জয় করতে হচ্ছে।
◆ দাদা মশাইয়ের বৃদ্ধ বয়সেও কিন্তু অতিরিক্ত কাম শক্তি আছে। নাতির (স্বামীর) থেকে দাদা মশাইয়ের সাথে মিলিত হয়ে কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দেহ সুখের আনন্দ লাভ হয়ে থাকে।
◆ দাদা মশাইয়ের সাথে বাইরে যাওয়ার কারণে কিন্তু লোকনিন্দা হচ্ছে, কারণ তার চরিত্র দোষের কথা কিন্তু গ্রামের মানুষেরা জেনে গিয়েছে।
◆ শুনেছি, দাদা মশাই রক্ষিতা রাখার কারণে তার ছেলে ও বউ মা তাদের জন্মভূমি ত্যাগ করেছে।
◆ স্বামী সব কিছু জানা সত্ত্বেও কিন্তু চরিত্রহীন দাদা মশাইয়ের কাছে রেখে গেছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না।
◆ দাদা মশাইয়ের সাথে আমাকে নিয়ে কোন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি তো?
◆ দাদা মশাই কে নিয়ে কোন কথা বলতে গেলে কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অনেক বার বিষয়টি জানতে চেষ্টা করেছি কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে শুনতে চাই না। বলে পরে এক সময় শোনা যাবে।
◆ কয়েক বছর পর জয়ন্তীর স্বামীর আত্মীয় স্বজন ও কিছু গ্রামের বন্ধুরা ফোন করে তার বউয়ের পরকিয়া প্রেমের ঘটনা জানিয়ে অপমান জনক কথাবার্তা বলতে থাকে।
◆ জাহাজে কর্মরত জয়ন্তীর স্বামী আমেরিকা থেকে ভারতের কোন, জাহাজ বন্দরে নেমে দ্রুত ভাবে বাড়িতে আসে।
◆ জয়ন্তী কে না দেখতে পেয়ে আশ্রিত সুখোদা কে জিজ্ঞাসা করে, দাদা মশাই ও জয়ন্তী কোথায়!
◆ সুখোদা চরম বিপদের সংকেত বুঝতে পেরে কিন্তু জয়ন্তীর ঘায়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে বলে :- বয়স্ক দাদা মশাই কে জয়ন্তী জোর করে বাগান বাড়িতে নিয়ে গেছে, কারণ এখানে নাকি তার যৌবনের উন্মাদনায় দাদা মশাই কে ভাসাতে আমি নাকি বাধা দেয় । ভরা যৌবনের বউকে সব সময় কাছে কাছে রাখতে হয়।
◆ জয়ন্তীর স্বামী আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ি নিয়ে দ্রুত বেগে ছুটতে থাকে।
◆ বাগান বাড়ির বাগানের মধ্যে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে দু'জনের মিলনরত অবস্থায় দেখতে পায়।
◆ হুংকার দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে।
◆ জয়ন্তী তার বুক থেকে দাদা মশাই কে নামিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বেশ ভূষা ঠিক করতে থাকে।
◆ জয়ন্তীর স্বামী ভীষণ ভাবে ক্রেদিত হয়ে জয়ন্তী কে চড় থাপ্পর মারতে মারতে বলে :- ঘরের খেয়ে আবার ঘরের লোকের সর্বনাশ । পতিতা বেশ্য দাদা মশাইয়ের সাথে ফসটিনসটি ।
◆ দাদা মশাই বলে :- জয়ন্তীর কোন দোষ নেই। আমি জোর করে বাধ্য করেছি।
◆ জয়ন্তীর স্বামী বলে :- চোরে চোরে মাসতুতো ভাই-বোন ।
◆ জয়ন্তী কে, অবাধ্য গরু ছাগলের মত করে টানা হেচড়া করতে করতে গাড়িতে তুলে নিয়ে সোজা বাড়িতে আসে।
◆ জয়ন্তীর স্বামী পাড়া প্রতিবেশীদের কথা শুনে কয়েক জন পুরুষ জোর করে ধরে জয়ন্তীর মাথার লম্বা লম্বা চুল কেটে ন্যাড়া করে দেয়।
◆ দাদা মশাই মান সম্মান বাঁচাতে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অসহায় জয়ন্তী কে সাহায্য করার কেউ নেই।
◆ জয়ন্তীর স্বামী উত্তেজিত বলে :- তোর মতো পতিতা বেশ্যর সাথে সংসার করতে পারবোনা। আজ থেকে তোকে ত্যাগ করলাম। বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
◆ জয়ন্তী চরম অপমানিত হয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়িতে থাকা গাড়িতে তিন মেয়ে যথাক্রমে সাবিত্রী, সুকৃতি ও সুপ্রভা কে নিয়ে চালকের আসনে বসে কলকাতার উদ্দেশ্য রওনা দেয়।
◆ জয়ন্তীর বিধবা মায়ের অনেক দিন আগে মৃত্যু হয়েছে। দুই দাদার সংসারে আশ্রিত হয়ে বাস করতে থাকে।
◆ জয়ন্তী আসার কয়েক মাস পর বড়দা লোকজনের অপমান জনক কথা বার্তা সহ্য করতে না পেরে পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন বাড়ি করে।
◆ ছোট ভাই পৈতৃক বাড়িতে মান সম্মান নষ্ট করে সবার সাথে লড়াই ঝগড়া করে বসবাস করতে থাকে।
◆ জয়ন্তীর ছোট ভাইয়ের বউয়ের কাছে থেকে তিরস্কার,গঞ্জনা ও অত্যাচারে জয়ন্তীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে।
◆ জয়ন্তী বাগান বাড়িতে গিয়ে দাদা মশাইয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়।
◆ দাদা মশাই বলে :- তুমি এতদিন কোথায় ছিল! তোমার জন্য আমি ভীষন ভাবে চিন্তিত।
◆ জয়ন্তী বলে :- তোমার নাতি কিন্তু আমাকে চিরতরে ত্যাগ করেছে, আমার মাথা ন্যাড়া করে চরম অপমান করেছে। তিন মেয়ে কে নিয়ে কোথায় থাকবো।
◆ দাদা মশাই বলে :- আরো; আমি তো আছি, তোমার মেয়ে কে নিয়ে বাগান বাড়িতে চলে আসো।
◆ এক বছর বাগান বাড়িতে বসবাস করার পর হঠাৎ একদিন দাদা মশাই মৃত্যুর কোলে শুয়ে পড়ে। দাদা মশাইয়ের আত্মীয় স্বজন কয়েক দিন পর জয়ন্তী কে জোর করে বাগান বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
◆ মেয়েদের কে নিয়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসে, কয়েক দিন জোর করে ছোট ভাইয়ের বাড়িতে থেকে তারপর বাসা ভাড়া নেয়।
◆ অপরূপ অনন্ত যৌবনের ডালি যার দেহে তাকে কোন পুরুষই শান্তিতে থাকতে দেয় না। কয়েকজন পুরুষ জয়ন্তী রূপের আগুনে আসক্ত হয়ে সরাসরি প্রস্তাব করে।
◆ তাদের মধ্যে থেকে একজন পুরুষ জয়ন্তী ও তার মেয়েদের দায়িত্ব পালন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
উক্ত পুরুষের রক্ষিতা হিসেবে কলকাতা মহানগরীর বাইরে তার মনোনীত স্থানে থাকতে হবে।
◆ জয়ন্তীর মনোনীত পুরুষকে বিশ্বাস করে ভাগ্যের লিখন মনে করে, একদিন তার সাথে রওনা দেয়।
-------------------------------------------
--------------------------------------------------------
।। বিংশ অধ্যায় ।।
--------------------------------------------------------
◆ অধ্যাপক মহাশয়ের এক বন্ধু হিরেন বাবু বিনোদ কে একদম পছন্দ করতেন না। একদিন বাড়িতে এসে অধ্যাপক মহাশয় কে বলেন :- আমাদের সমাজ বাইরের এক যুবককে এমন ঘনিষ্ঠভাবে সমাজের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে দেওয়া মঙ্গল হবে না।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- বিনোদ; কয়েক মাস ধরে আমাদের পরিবারের সাথে জড়িয়ে আছে, কিন্তু খারাপ কোন লক্ষণ আমার চোখে পড়েনি।
বিনোদের অজানা সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও পড়াশোনায় ভীষণ মনোযোগী আবার ভালো গান বাজনা করতে পারে। তার বিরুদ্ধে নালিশ করার কারণ কি?
যে কেউ যদি এগিয়ে যেতে চাই কিন্তু আমি তাকে সহযোগিতা করবো।
◆ কয়েক সপ্তাহ পর একদিন রাতে বিনোদ গানের আসর শেষ করে,ঘর থেকে হল ঘরে আসতেই অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- বিনোদ; আগামী তিন দিন পর অর্থাৎ শুক্রবার রাতে লীলাবতীর ১৮ তম জন্মদিন পালন করা হবে। তোমাকে আগে থেকেই নেমন্তন্ন করে রাখলাম।
◆ আত্মীয় স্বজন সহ কিছু বন্ধু বান্ধব অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন করা হবে। উক্ত দিনে আগত অতিথিদের তোমার কন্ঠ গান শুনিয়ে আনন্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গানের আসরের দায়িত্ব পালন করবো।
◆ বিনোদ মাথা নিচু করে বলে :- অনুষ্ঠানের জন্য যা যা করতে হবে তা শুধু আপনি বলবেন, তা আমি করে দেবে। বোনের জন্মদিন বলে কথা।
◆ জন্মদিনের উপহারের কথা বন্ধু ধনঞ্জয় কে জানাতেই, আনন্দে হইচই করে বলে :- প্রেমিকাকে সোনার হার দিয়ে দে, ভীষণ ভাবে খুশি হবে।
অধ্যাপক মহাশয় তো, পড়িয়ে কোন টাকা নেয় না।
এক বছরে অনেক টাকা জমা হয়েছে কিন্তু সেই টাকায় একটি হার হয়ে যাবে।
◆ লীলাবতীর জন্মদিনে সারাদিন অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে থেকে বিভিন্ন কাজকর্ম দেখাশোনা করে যাচ্ছে। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে ছাত্রাবাসে ফিরে এসে আবার বিকেল বেলা ভালো জামা প্যান্ট পরে অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে আসে।
◆ লীলাবতী কে সামনে পেয়ে তার জন্মদিনের উপহারের বাক্স হাতে দিয়ে বলে :- হ্যাপি বার্থডে টু লীলাবতী।
◆ লীলাবতী বাক্সের মধ্যে থেকে হার বের করে তার বাবা-মাকে দেখিয়ে, মায়ের হাতে দিয়ে হাঁটতে থাকে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বিনোদের দিকে বড় বড় চোখ করে বলেন :- বিনোদ ; তুমি কিন্তু ভারি অন্যায়
করেছো, এতগুলো টাকা খরচ করে সোনার গয়না কেন?
◆ বিনোদ আমতা আমতা করে কিছু বলতে চাই কিন্তু অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- তোমার কোন অজুহাত মানতে রাজি নয়।
◆ অধ্যাপক গৃহিণী বলেন :- “পাগল ছেলে কি? এখনোও সংসারে ঢোকেনি ,তা টাকার মর্ম বুঝবে কেমন করে।
◆ বিনোদ ভাবে :- অধ্যাপক মহাশয়ের পরিবারের সদস্যদের খুশি করতে গিয়ে মহা বিপদে পড়লাম।
◆ বিনোদ মাথা নিচু করে চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে দ্রুত চলতে শুরু করে।
◆ অনুষ্ঠান বাড়ির এক পাশে লীলাবতী আর তার বান্ধবী আশালতা সোফায় বসে আলোচনা করছে। বিনোদ তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পূর্ব পরিচিত আশালতার উদ্দেশ্য করে হাতজোড় করে নমস্কার করে। আশালতা প্রতিউত্তর নমস্কার করে।
◆ আশালতা পিতা ব্যারিস্টারি করতে। বর্তমান বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান আশালতা। কলকাতার
◆ পার্কস্ট্রিট অঞ্চলের মধ্যে বাড়ি ছিল। আশালতার বাবার মৃত্যুর পর তার মা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বসত বাড়ি ভাড়া দেয়। তারপর সারদা পল্লীতে অল্প ভাড়ায় একখানা বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।
◆ আশালতা দুধে আলতা রঙের সুন্দর চেহারা ও সুরসিকা। চালচলন ও কথাবার্তা সহ সব কিছুতেই চপলতা আর আত্মপ্রকাশ করে।
◆ বিনোদ কে দেখে আশালতা হাসতে হাসতে লীলাবতীর পাশ থেকে উঠে গিয়ে পাশের চেয়ারে বসে, হাতের ইশারায় লীলাবতীর পাশে বসার আহ্বান করে বলে :- বিনোদ বাবু; সোফায় বসুন বসুন। আজকের অনুষ্ঠানের সম্মানের আসন কিন্তু আপনার প্রাপ্য।
◆ লীলাবতী মুখ কালো করে বিনোদের দিকে তাকায়।
◆ বিনোদ পরিস্থিতি জটিল মনে করে তাড়াহুড়ো করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে।
◆ আশালতা হাসতে হাসতে বলে :- আরো বিনোদ বাবু ; লীলাবতীর পাশে বসুন। তার জন্মদিনে সব থেকে দামি উপহার আপনি দিয়েছেন।
◆ বিনোদ হালকা হাসি দিয়ে বলে :- এখানে ভালো আছি।
◆ আশালতা মিষ্টি হাসি দিয়ে লীলাবতী কে খোঁচা দিয়ে বলে :- বিনোদ বাবুর; মুখের কথা কিন্তু আসলে মনের কথা নয়। সুযোগের অপেক্ষায় আছে।
◆ লীলাবতী বলে :- আরো বিনোদ বাবু, এখানে বসুন না। ও কি এক জায়গায় পাঁচ মিনিট বসে
থাকতে পারে?”
◆ আশালতা হাসতে হাসতে বিনোদের হাত ধরে টেনে চেয়ার থেকে উঠিয়ে নিয়ে কিন্তু লীলাবতীর পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজের মোবাইল থেকে ছবি তোলার পর কিছু সময় ধরে রংগরস করে পাশের ঘরের দিকে চলে যায়।
◆ লীলাবতী বলে :- বিনোদ বাবু; অনেক গুলো টাকা খরচ করে সোনার হার নিয়ে আসার কোন দরকার ছিল না।
◆ বিনোদ বলে :- তুমি কি! দামি উপহার নিয়ে আসার জন্য খুশি না?
◆ লীলাবতী মাথা নিচু করে রেখে কিন্তু কোন উত্তর দেয়না।
◆ বিনোদ বলে :- লীলাবতী ; তুমি ও তোমার পরিবারের সদস্যরা আমাকে পর মনে করো! তোমার জন্মদিন উপলক্ষে একটি উপহার দেওয়ার কি কোন অধিকার নেই?
◆ লীলাবতী বলে :- না, বিনোদ বাবু; আমি তা কখনোও বলেনি। সবাই তো উপহার সামগ্রী নিয়ে এসেছে কিন্তু বহু মূল্যবান উপহার আপনি দিয়েছেন।
◆ বিনোদ বলে :- তবুও কিন্তু আমার মনের মতো হয়নি। দশ গুণ দামের মোটা হার দিতে পারলে কিন্তু মনের আত্মতৃপ্তি লাভ করতে পারতাম।
◆ বিনোদের কথা শুনে লীলাবতীর চিন্তা করতে থাকে, বিনোদ আসলে কি বলতে চাই।
◆ বিনোদ চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে হঠাৎ করে লীলাবতীর হাত চেপে ধরে বলে :- লীলাবতী; তুমি আমার উপর রাগ করোনি তো।
◆ লীলা চমকিত হয়ে হাত সরিয়ে দিয়ে বিনোদের দিকে হালকা ভাবে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলে :- নারে পাগল নারে। তোমার; শ্রেষ্ঠ উপহারে ভীষণ ভাবে খুশি।
◆ অধ্যাপক মহাশয় ঘর থেকে বিনোদ বিনোদ বলে ডাকতে থাকে। বিনোদ তাড়াহুড়ো করে উঠে অধ্যাপক মহাশয়ের দেখা করে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- বিনোদ; আমন্ত্রিত অতিথিরা চলে এসেছে । লীলাবতী কে নিয়ে গানের আসর শুরু করে।
◆ বিনোদ গান শুরু করে আর লীলাবতী ও আশালতা এগিয়ে এসে বিনোদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ বিনোদ লীলাবতীর দিকে তাকিয়ে গান গাইতে থাকে। লীলাবতী কয়েকবার বিনোদের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা হয়। বিনোদের গান শেষ হতে আরো অন্য শিল্পীগণ গান শুরু করে।সবার শেষে লীলাবতী গান ধরে। বিনোদ ফাঁকা সোফায় গিয়ে বসে গানের কলি গুলো মন প্রাণ দিয়ে শুনতে থাকে আর ভাবে আমার উদ্দেশ্য করে করছে না তো!
◆ আশালতা হাসতে হাসতে বিনোদের পাশে বসে রসিকতা করে বলে :- আমি, সব কিছু লক্ষ্য করেছি কিন্তু গভীর প্রেম ভালোবাসা তবে, কবে বিবাহ বন্ধনে পরিণত হবে।
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে বলে :- এখনো তেমন কিছু হয়নি, নদীর জলে আধার (খাদ্য) দিয়ে বরশি ডুবিয়ে রেখেছি কিন্তু মাছ ধরা দিচ্ছে না।
◆ আশালতা রহস্যের হাসি দিয়ে বলে :- শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছো, অন্তরের ভালোবাসা না থাকলে কিন্তু দামি সোনার গয়না কেউ দেয় না। গান গাইতে গাইতে দৃষ্টি বিনিময় আর পাশাপাশি বসে রসিকতা।
◆ বিনোদ বলে :- আশালতা দেবী; নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ রচিত "বিল্বমঙ্গল" নাটকের নায়িকা রজকিনী প্রেমে পড়ে নায়ক বিল্বমঙ্গল সাপকে দড়ি ভেবে উঁচু দেয়াল পার হয়ে রজকিনী কে দর্শন করে।
◆ আশালতা বলে :- তোমার কথা আমি মানতে পারছি না, তুমি লীলাবতীর প্রেমে বিল্বমঙ্গল হয়ে গেছো।
◆ বিনোদ বলে :- লীলাবতীর জন্মদিনে একটি দামি উপহার দেওয়া মানেই কিন্তু তার প্রেমে পড়া নয়। তার বাবা অধ্যাপক মহাশয় আমাকে প্রায় এক বছরের বেশি ধরে বিনা মাসিক বেতনে পড়াশোনা করিয়ে যাচ্ছে। মাসিক বেতনের জমানো টাকা দিয়ে তার মেয়েকে একটি দামি উপহার দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু কিছু ঋণমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি।
বিনোদের কথা গুলো হয়তো আশালতা বিশ্বাস করে চুপচাপ ভাবতে থাকে। আমার দেখা দৃশ্যগুলো তাহলে কি ভুল?
◆ আশালতা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে করতে বলে :- “তুমি আমারি তুমি আমারি' গানটি প্রাণ ঢেলে গাওয়া আর লুকিয়ে লুকিয়ে লীলাবতীর লীলা ও তার রূপের মাধুরী দর্শন করা, তাহলে এটা কি অধ্যাপক মহাশয়ের মেয়ের প্রতিদান দেওয়া?
◆ আবার বিনা বেতনে কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিদিন লীলাবতীর গানের ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষক হয়ে, গান শেখানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা আরেকটি প্রতিদান নিশ্চয়।
◆ বিনোদ মহা বিপদে পড়ে ভাবতে থাকে, কিছু সময় চুপচাপ থাকার পর বলে :- আশালতা দেবী; সত্যিই কি আমার মনের কথা জানতে চাও?
◆ আশালতা গম্ভীর হয়ে বলে :- যদি অনুগ্রহ করে বলে।
◆ বিনোদ বলে :- তা হলে কিন্তু প্রথমেই প্রতিশ্রুত দিতে হবে ও তারপর যা বলবো তা বিশ্বাস করতে হবে । বিশ্বাস না করলে কিন্তু আমার উপর রাগ ও অসন্তুষ্ট হওয়া চলবে না আর উভয়ের মধ্যে সরল সহজ বন্ধুসুলভ ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করবে না।
◆ বিনোদের কথা শুনে আশালতা চমকিত হয়ে ভাবে মনে এমন কি কথা বলতে চাই?
◆ বিনোদ বলে :- কি হলো! কথার কোন উত্তর দিলে না তো।
◆ আশালতা বলে :- না, না, না, আমাদের বন্ধুত্ব কোন দিন নষ্ট হবে না। বলো, তোমার মনের কথাগুলো মন দিয়ে শুনবো।
◆ আশালতার কাছাকাছি হয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বিনোদ বলে :- মনে করেছো, আমি লীলাবতীর উদ্দেশ্যে করে গান করেছি এবং গান করার সময় তার দিকে কয়েক বার তাকিয়ে ছিলাম।
◆ আসল সত্য হলো, লীলাবতীর পাশে একান্তে তার বন্ধু বসে কথাবার্তা চলছিল কিন্তু আমি তাকিয়ে তাদের আচার আচরণ লক্ষ্য করছিলাম। হয়তো ভবিষ্যতে উক্ত যুবক অধ্যাপক বাড়ির জামাই হবে।
◆ আশালতার মুখ লাল হয়ে উঠে আর নিচের দিকে তাকিয়ে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কামড়াতে থাকে। দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চপ্পল খোঁচাতে শুরু করে।
◆ আশালতার বাম হাত বিনোদের পাশে ছিল। বিনোদ তার হাত ধরে হালকা চাপ দিতে দিতে বলে :- আশালতা ; কথাগুলো বলে ভীষণ ভাবে অন্যায় করেছি। আমার স্বপ্ন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানের ভাষা পেয়েছে, তবে সেই স্বপ্ন কি কোন দিন সফল হবে না ?
◆ আশালতা চুপচাপ হয়ে ভাবনার জগতে বিরাজ করতে থাকে।
◆ বিনোদ ভাবে :- কোন নারীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ছলনা করা কি অপরাধ! দুজনেই কিন্তু প্রাপ্ত বয়স হয়েছে।
◆ অনুষ্ঠান বাড়িতে আগত অতিথিদের মধ্যে বিশেষ করে বিবাহিত ও অবিবাহিত সকল নারীরা কিন্তু কোন পুরুষকে আকর্ষণ করার জন্য তার সাজগোজ ও হাসি হাসি মুখ আর অর্দ্ধ অনাবৃত শরীর দেখানোর জন্য বাস্ত। এদের আচার-আচরণ দেখে যে কোন পুরুষের কাম উত্তেজনা বৃদ্ধি হবে।
◆ বিনোদ কিছু সময় চুপচাপ থেকে করুণ সুরে বলে, “তুমি আমারি তুমি আমারি' গানের সত্য কথা বলার অধিকার তুমি কি আমাকে কখনো দেবে।
আমি কিন্তু তোমার গানের একজন পরম ভক্ত।
গানটা কিন্তু তোমার উদ্দেশ্য করে গাওয়া। ভুল বুঝে কিন্তু দূরে সরে যেওনা।
◆ আশালতা মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলে :- এখানে, বড্ড গরম লাগছে- চলে ছাদে যায়। গান শেষ হতে, এখনো অনেক দেরি আছে।
◆ বিনোদ সিঁড়ি বেয়ে চলতে চলতে ভাবে, আমার মিথ্যা কথাগুলো কিন্তু আশালতা বিশ্বাস করে নিয়েছি। আশালতা আমাকে অবাক করে দিলো।
◆ ছাদের উপর চারদিকে রেলিং দিয়ে ঘেরা তার মাঝে কৃত্রিম উদ্যানের ছাতার তলায় পাশাপাশি দুজনে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতে থাকে।
◆ পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় বিনোদের মুখোমুখি হয়ে আশালতা বলে :- বিনোদ বাবু; তুমি যে কথাগুলো বলল ,তাকি; তোমার মনের কথা। না, আমি ঠাট্টা করেছি বলে তার পাল্টা জবাব দিলো।
◆ বিনোদ অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে বলে :- তোমার উপর আমার বিশ্বাস ছিল ও ভবিষ্যতে থাকবে। মনের কথাগুলো আর মুখের কথাগুলোর মধ্যে পার্থক্য নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পেরেছো।
◆ আশালতা কিছু না বলে মাথা নিচু করে আর বিনোদ তার কোমরের উপর অনাবৃত থলথলে পেট জড়িয়ে ধরে চাপ দিতে থাকে।
◆ আশালতা এক ঝলক হাসি দিয়ে বিনোদের বুকে মাথা রেখে দুই বাহু প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরে।
◆ আশালতার মুখ তুলে নিয়ে বিনোদ চুম্বনে চুম্বনে উত্তেজিত করতে থাকে, আশালতার দেহের মাঝে মুহূর্তের মধ্যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয় আর আনন্দে পুলকিত হয়ে বিনোদ কে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে চুম্বনে প্রতিউত্তর দিতে থাকে।
◆ কিছু সময় আলিঙ্গন বন্ধ থাকার পর দুজনেই খোলামেলা উদ্যানের সমতল ছাদের উপর বসে পড়ে।
◆ বিনোদ বলে :- অনুষ্ঠান বাড়িতে লোকজনে ভরা তার মধ্যে আমরা দুজন ছাদে কিন্তু তোমার ভয় করছে না।
◆ আশালতা বলে :- সমাজের ভয় করলে কিন্তু দৈহিক ভালোবাসা করা যায় না। কোথায় বলে পায়খানার বেগ হলে বাঘের ভয় থাকে না ঠিক, যৌবনের উন্মাদনায় উত্তেজনা শুরু হলে কিন্তু সেই মুহূর্তে আর সমাজের এবং নিজের মান-সম্মান নষ্ট হওয়ার কোন ভয় থাকে না। যদি থাকতো তাহলে কিন্তু পুরুষের মাধ্যমে নারীরা ধর্ষিত হতে না।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার কথা সমর্থ করছি। তুমি এত সহজে আমার কাছে দেহ সমর্পণ করবে তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।
◆ দুজনেই মনের ও দেহের তাপমাত্রা শীতল করার পর চোখে মুখে ভালো করে জলের ছিটা দিয়ে, নিজেরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে আবার নিচের তলায় ফিরে আসে।
◆ আশালতা গানের আসরে আসতেই কিন্তু কয়েকজন নর-নারী গান করার জন্য অনুরোধ করে। আশালতা গান গাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে আর সেই মুহূর্তে আনন্দিত মনে হাসি হাসি মুখে আশালতার সামনে দূরত্ব বজায় রেখে বিনোদ একটি চেয়ারে বসে পড়ে।
◆ আশালতা গান শুরু করে। গানের শেষ “কলি”
তোমার প্রণয় যুগে যুগে মোর লাগিয়া
জগতে জগতে ফিরিতেছে কি জাগিয়া
বন্ধু এই প্রণয় একি সত্য?
আমার বরণে, নয়নে অধরে আলোকে
চিরজনমের বিরাম লভিলে পলকে-
বন্ধু এই প্রণয় একি সত্য?
মোর সুকুমার ললাট ফলকে লেখা অসীমের তত্ত্ব
হে আমার চির ভক্ত… বন্ধু এই প্রণয় একি সত্য?
◆ বিনোদ ভাব ; আশালতা কিন্তু গানের কলি গুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথেই আমার দিকে তাকিয়েছে। ওর কণ্ঠস্বর সব সময় মধুর কিন্তু সুরের মূর্ছনা যেন শ্রোতাদের কানের ভিতর দিয়ে মর্মে মর্মে পৌঁছিয়েছে।
◆ লীলাবতী উঠে বিনোদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে :- গানের গুরু মশাই আর একটা গান করুন।
◆ বিনোদের গান শেষ হলে, বিনোদের অনুরোধ লীলাবতী গান ধরে।
◆ বিনোদ চেয়ারে বসে ভাবে, লীলাবতী আমার মতো ভালোবাসার হৃদয়ের গান শিখে নিয়েছে। তাহলে কি গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসা জানিয়ে দিলো।
◆ অজস্র প্রশংসা ধ্বনির মাধ্যমে গান শেষ হয়। অতিথিদের আগেই চা ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। গানের শেষে ভুরিভোজের আয়োজন শুরু হয়েছে।
◆ কিছু সময় পর থেকে একে একে সবাই বিদায় জানিয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা দেয়।
আশালতা বিদায়ের সাথে সাথেই বিনোদ বিদায় নিয়ে বাড়ির গেটের কাছে আসতে কিন্তু আশালতার সাথে দেখা হয়।
◆ বিনোদ কাছে গিয়ে বলে :- একলা যাবেন!যদি অনুমতি দেন, তবে আপনার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।
◆ আশালতা বলে :- সাথে গাড়ি আছে কিন্তু এই রাতে আর কষ্ট করে যেতে হবে না। তারপর মুখে এক ঝলক দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলে, সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন।
◆ অধ্যাপক মহাশয় তার বন্ধুদের বিদায় দিয়ে গেট দিয়ে যাওয়ার সময় কিন্তু দুজনেই কথা শুনে দাঁড়িয়ে বলেন :- বিনোদ; সাথে গিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসো। একজন সাথে থাকা দরকার কারণ রাত অনেক হয়েছে। বলে ঘরের দিকে চলতে শুরু করে।
◆ আশালতা আর আপত্তি না করে আস্তে আস্তে বলে :- চলুন, আমার নিরাপত্তা রক্ষাকারী বিনোদ বাবু।
◆ বিনোদ আনন্দ আত্মহারা হয়ে তাড়াহুড়ো করে গাড়ির সামনের সিটে উঠে বসে আর আশালতা হাসতে হাসতে গাড়ি চালাতে থাকে।
◆ বিনোদের হাতে হাত রেখে আশালতা বলে :- প্রথম যেদিন ব্রাহ্ম সমাজে তোমার গান শুনেছিলাম, সেই মুহূর্ত থেকেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। মাঝখানে লীলাবতি এসে আমার ঈর্ধায় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ তুমি আমার ভালোবাসার মর্যাদা দিয়ে কিন্তু আনন্দের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছো। তোমার ভালোবাসা কখনোই ভুলতে পারবো না।
◆ বিনোদ আড্ডা করে বলে :- তুমি যদি মা হয়ে যাও।
◆ আশালতা বলে :- তুমি আমাকে বিয়ে করে নেবে।
◆ বিনোদ বলে :- আমি তো এখনো বেকার বাবার টাকায় জমিদারি।
◆ আশালতা বলে :- সে চিন্তা তোমাকে করতে হবে না, আমিতো তোমার পাশে আছি।
◆ বিনোদ বলে :- আমার বাবা একজন হিন্দু ধর্মীয় গোঁড়া মন মানসিকতার মানুষ। আচার আচরণ আর নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজের মানুষের একদম সহ্য করতে পারে না। বাবা যদি জানতে পারে তাহলে আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করবে। আমি ধর্মের গোঁড়ামির কারণে তোমাকে হারাতে চাইনা।
◆ আশালতা কিছু বলার আগেই গাড়ি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।
◆ আশালতার মা তার মেয়েকে পৌঁছে দেওয়ার কথা শোনার পর উল্টে বিনোদকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মা-মেয়ে দুজনে গাড়িতে উঠে বসে। বিনোদকে পৌঁছিয়ে দিয়ে মা-মেয়ে বাড়িতে আসে।
--------------------------------------------------------
।। বিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
------------------------------------------------------
।। একুশ অধ্যায় ।। লীলাবতী কর্তৃক বিনোদের ভৎসনা।
--------------------------------------------------------
◆ বিনোদনের বন্ধু ধনঞ্জয় এক সুন্দরী অভিনেত্রীর সাথে রাত কাটিয়ে ছাত্রাবাসে ফিরে আসে।
◆ অভিনেত্রী ও অভিনেতা বেশিরভাগ চরিত্রহীন তা কিন্তু বিনোদ এবং ধনঞ্জয় ভালোই জানে। বিনোদ বহুবার বহু অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে।
◆ আশালতার বাড়ি সন্ধ্যাকালীন উপাসনালয়ে মাঝে মাঝে বিনোদ যোগদান করে। নির্জনে কিছু সময়ের জন্য দুটি হৃদয়ের কাছাকাছি হয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে।
◆ হঠাৎ আশালতার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, আর ডাক্তার বাবু বলেন :- আবহাওয়া পরিবর্তন করতে যেতে হবে। শিমুলতলা, দেওঘর অথবা মধুপুর এলাকায় যেতে পারেন।
◆ আশালতা একদিন বিনোদ কে তার ঘরে ডেকে নিয়ে বলে :- মা; ছাড়া বর্তমান আমার আপন কেউ নেই কিন্তু টাকার অভাবে মাকে আবহাওয়া পরিবর্তন করতে নিয়ে যেতে পারছিনা।
◆ কলকাতার এই বাড়ি পাঁচ বছরের চুক্তিতে নেওয়া হয়েছে। বাসা ভাড়া ও সংসার চালিয়ে কিন্তু নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন বাসা ভাড়া করে থাকার মতো টাকা নেই। তুমি কি আমাদের কোন প্রকার সাহায্য করতে পারো?
◆ বিনোদ চুপচাপ থেকে ভাবতে থাকে, তারপর মোবাইল হাতে নিয়ে বন্ধু ধনঞ্জয় কে ফোন করে।
◆ অপর প্রান্তে থেকে ধনঞ্জয় বলে :- বল।
◆ বিনোদ বলে :- তোদের মধুপুরের বাড়িতে কিছু দিনের জন্য আশালতা ও তার মাকে থাকতে দিতে হবে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- তাহলে কি! আশালতার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। ঠিক আছে মায়ের সাথে কথা বলে জানাছি।
◆ আশালতার হাত ধরে বিনোদ বলে :- চিন্তা করে না, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
◆ বিনোদ কয়েক দিন পর বন্ধু ধনঞ্জয় কে সাথে করে আশালতার বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার অসুস্থ মাকে প্রণাম করে।
◆ আশালতা মা বলেন :- আশা; ছেলেদের জন্য জল খাবার আর চায়ের ব্যবস্থা কর।
◆ বিনোদ বলে :- মাসিমা; আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ধনঞ্জয়।
◆ ধনঞ্জয় হাতজোড় করে নমস্কার করে বলে :- আপনার আবহাওয়া পরিবর্তনের বিষয়ে বিনোদের সাথে আলোচনা হয়েছে। মধুপুর আমার বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে আরেকটা বাড়ি আছে, আমরা বাগান বাড়ি বলে থাকি।
◆ বিনোদ বলে :- আবহাওয়া পরিবর্তন করতে বহু মানুষ উক্ত বাড়িতে বসবাস করে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- আপনি ঐ বাড়িতে যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারবেন। বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য কয়েকজন কাজের মানুষ আছে , তাদের সহযোগিতা অবশ্যই পাবেন।
◆ আশালতা মা বলেন :- মাসে কত টাকা দিতে হবে।
◆ বিনোদ বলে :- আপনার কোন টাকা দিতে হবে না।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- মাসিমা; টাকার কথা বলে লজ্জা দেবেন না। নিজের বাড়ির মতো বসবাস করবেন।
◆ আশালতা মা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন :- বর্তমান যুগে এমন ও দয়ালু মানুষ আছে। আমার জন্য তোমরা এত কিছু করছ কেন?
◆ ধনঞ্জয় বলে :- মানুষ হয়ে মানুষের বিপদে যদি সহযোগিতা না করতে পারি তাহলে কিন্তু মানুষ জনম বৃথা। মাকে ফোনে সব কিছু জানিয়ে দিয়েছে। মা আপনাদের অপেক্ষায় আছেন।
◆ বিনোদ বলে :- মাসিমা; আর কোন কথা নয় আপনি যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকুন।
◆ বিনোদের দিকে তাকিয়ে আশালতা মা বলেন :- বাবা ; বললেই তো আর যাওয়া যায় না, এই বাড়িতে আশা একা থাকবে আবার আমি অসুস্থ বয়স্ক মহিলা-আমাকে কে দেখাশোনা করবে।
◆ আশালতা জল খাবার নিয়ে এসে সবাই কে পরিবেশন করতে করতে বলে :- মা; তোমার সাথে মধুপুর গিয়ে এক মাস থেকে আসবো।
◆ আশালতা মা বলেন :- তুই তো বলেই খালাস কিন্তু তোর কলেজের পড়াশোনার কি হবে?
আশালতা বলে :- আমি তোমার সাথে যাবো।
◆ আশালতা মা বলেন :- তো কে এই বাসায় একলা রেখে মধুপুরে গিয়ে আমি শান্তিতে থাকতে পারবো না।
◆ আশালতা বলে :- পাড়ার যুবকদের উৎপাতের কারণে কিন্তু এই বাড়িতে একা একা বসবাস করতে পারবো না।
◆ আশালতা মা বলেন :- কিছুদিন বাদে তোর বাৎসরিক পরীক্ষা।
◆ বিনোদ ফুলকা লুচি আর সেমাই খেতে খেতে বন্ধু ধনঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবে জামাই আদর হচ্ছে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- বইপত্র সাথে করে নিয়ে যাবে আবার পরীক্ষার আগে মা-মেয়ে আবার বাড়িতে চলে আসবে।
◆ মা-মেয়ের মধ্যে মধুপুর যাওয়া কে কেন্দ্র করে কিছু সময় ধরে তর্ক বিতর্ক চলার পর সিদ্ধান্ত হয় এক মাস থাকার পর ফিরে আসব।
◆ বিনোদের হাত ধরে আশালতা মা বলেন :- বাবা; আমাদের জন্য তো অনেক কিছুই করলে কিন্তু তোমাকে আর একটা উপকার করতে হবে, মধুপুর পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয়ের মুখের দিকে তাকায় আর ধনঞ্জয় ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানায়।
◆ বিনোদ বলে :- এত করে যখন বলছেন তখন অবশ্যই যাবো।
◆ বিনোদ কয়েক দিন পর অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে গিয়ে উক্ত পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত জানিয়ে, মধুপুর যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে।
◆ অধ্যাপক মহাশয় বলেন :- আনন্দের কথা সমাজ সেবা করছো, ভালোই ভালো ফিরে এসে।
◆ শুভ দিন দেখে কলকাতা থেকে মধুপুর তিন জন ট্রেনে রওনা দেয়। কলকাতা থেকে মধুপুর দূরত্ব ৩০০ কিমি। যথাসময়ে মধুপুরের ধনঞ্জয়ের বাগান বাড়ির যাত্রী আবাসিকে উপস্থিত হয়।
◆ আশালতা মায়ের নিরিবিলি পরিবেশ ও সব রকম ব্যবস্থা দেখে ভীষণ ভাবে আনন্দিত হয়ে বিনোদ কে বলে :- তোমার বন্ধুর যথাযথ ব্যবস্থা করার জন্য খুশি।
◆ বিনোদ বুদ্ধি করে তিনটি ঘর ব্যবহার করতে শুরু করে। আশালতার মায়ের আলাদা একটা ঘরে বাস করতে থাকে।
◆ আশালতা আলাদা রুমে গান বাজনা করার বাহানা করে বিনোদের সাথে রাত কাটায়।
◆ কয়েক মাস মধুপুর থেকে আশালতার মা সুস্থ হয়ে উঠে,আর কলকাতার বাড়িতে ফিরে আসে।
আশালতার পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর তার বিয়ে হয়ে যায়।
◆ বিনোদ কয়েক বার দেখা করার চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।
◆ বিনোদ ভাবে :- আশালতা এখন সমাজের বিশিষ্ট সম্মানের অধিকারী ও সতীসাধ্বী নারী। আমার মতো বেকার যুবকের কোন মূল্য নেই। যৌবনের উন্মাদনায় আমাকে কয়েক মাস ব্যবহার করে নিয়েছে।
আধুনিক প্রগতি প্রাপ্তা পর্দা-বিরোধী সমাজের মহিলাগণের সহিত মেলামেশা করে কিন্তু আমার লাম্পট্য প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার কতগুলো সুযোগ ঘটিয়াছিল।
◆ বিনোদ প্রতিদিনের অভ্যাস মতো অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়িতে আসে। অধ্যাপক মহাশয় নিচের তালায় কাজে ব্যস্ত ছিলেন, অধ্যাপক গৃহিণী অসুস্থতার কারণে শয়ন ঘরে ছিলেন।
◆ লীলাবতীর ঘরে গিয়ে নতুন গানের সুর শেখাতে শেখাতে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে বিনোদ বলে :- লীলাবতী; আমি তোমাকে ভালোবাসি।
◆ লীলাবতী চুপচাপ বিনোদের কথা গুলো শোনার পর বলে :- বিনোদ বাবু; আপনি আমাকে ভালোবাসেন এ তো আমার পরম সৌভাগ্য। এই কথাগুলো আপনি আমাকে না বললেই ভালো করতেন।
◆ বিনোদ বলে :- কেন?
◆ লীলাবতী বলে :- কারণ আপনি হিন্দু, আমি ব্রাহ্ম সমাজের মেয়ে-আপনার সাথে আমার বিবাহ হওয়া তো সম্ভব নয়।
◆ বিনোদ বলে :- হিন্দু ধর্মের বা ব্রাহ্ম ধর্মের লৌকিকতার কয়েকটি তুচ্ছ আচারের কারণে আমাদের এই মিলনের মাঝখানে এসে দাড়াবে?
◆ লীলাবতী বলে :- বিবাহের চিন্তা এক মুহূর্তের জন্যও কিন্তু আমার প্রাণে জাগে নাই।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার কোন কথা শুনতে চাই না, শুধু একবার জানতে চাই তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা।
◆ লীলাবতী নত মুখে বলে :- সে কথা শুনে তোমার লাভ হবে কি?”
◆ বিনোদ বলে :- তোমাকে বলতেই হবে।
◆ লীলাবতী বলে :- যদি শুনতে চান তাহলে বলছি ; আমি আপনাকে ভালোবাসি। আজ নয় অনেক দিন থেকেই বাসছি কিন্তু ----------
◆ বিনোদ ধৈর্য হারা হয়ে লীলাবতীর দুই হাত চেপে ধরে বলে :- তবে আর কিন্তু কেন?
◆ লীলাবতী নতমুখ করে কিছু সময় থাকার পর বড় বড় চোখে বিনোদের দিকে তাকিয়ে বলে :- তাহলে আপনি কি করতে বলেন?
◆ বিনোদ হাসি হাসি মুখ করে বলে :- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভাষায় বলি।
“বীণা ফেলে দিয়ে এস মানসসুন্দরী,
দু'টি রিক্ত হস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি
চুম্বন মাগিব যবে ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়োনা শ্রীবাখানি ফিরায়োনা মুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে ব্যগ্র ভূঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক।”
মানস-সুন্দরী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বীণা ফেলে দিয়ে এস, মানস সুন্দরী,
দুটি রিক্তহস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি’
কণ্ঠে জড়াইয়া দাও,—মৃণাল-পরশে
রোমাঞ্চ অঙ্কুরি উঠে মর্ম্মান্ত হরষে,—
কম্পিত চঞ্চল বক্ষ, চক্ষু ছলছল,
মুগ্ধ তনু মরি যায়, অন্তর কেবল
অঙ্গের সীমান্ত প্রান্তে উদ্ভাসিয়া উঠে,
এখনি ইন্দ্রিয়বন্ধ বুঝি টুটে টুটে!
অর্দ্ধেক অঞ্চল পাতি’ বসাও যতনে
পার্শ্বে তব; সুমধুর প্রিয় সম্বোধনে
ডাক মোরে, বল, প্রিয়, বল, প্রিয়তম;—
কুন্তল-আকুল মুখ বক্ষে রাখি মম
হৃদয়ের কানে কানে অতি মৃদু ভাষে
সঙ্গোপনে বলে’ যাও যাহা মুখে আসে
অর্থহারা ভাবে-ভরা ভাষা! অয়ি প্রিয়া,
চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিয়ো না মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক, হাসি স্তরে স্তরে
সরস সুন্দর;—নবস্ফুট পুষ্পসম
হেলায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বৃন্ত নিরুপম
মুখখানি তুলে’ ধোরো; আনন্দ আভায়
বড় বড় দুটি চক্ষু পল্লব-প্রচ্ছায়
রেখো মোর মুখপানে প্রশান্ত বিশ্বাসে,
নিতান্ত নির্ভরে! যদি চোখে জল আসে।
◆ লীলাবতী জ্বলন্ত আগুনের ফুলকির মতো অন্তরে জ্বলতে জ্বলতে রাগান্বিত হয়ে বলে :- আপনার চরিত্র কত নোংরা তা আজ বুঝতে পারলাম ভালো মানুষের মুখোশ পরে নারীর সর্বনাশকারী। এই মুহূর্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
◆ বিনোদ বলে :- আমার কথাগুলো তো শোনো।
◆ লীলাবতী ক্রোধিত সিংহের মতো হাত উঁচু করে বলে :- আর কোন কথা নয়, এই মুহূর্তে চলে না গেলে কিন্তু বাবা মাকে ডাকবো। কান খুলে শুনে রাখুন, এই বাড়িতে আর কোন দিন ঢোকার ও অন্য কোথাও যোগাযোগের চেষ্টা করবেন না। বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান।
◆ বিনোদ বেত্রাঘাত প্রাপ্ত কুকুরের ন্যায় মাথা নিচু করে অধ্যাপক মহাশয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
◆ বিনোদ অধ্যাপক মহাশয়ের ও লীলাবতীর ভয়ে আতঙ্কে পরের দিন কলেজ থেকে বিদায় নিয়ে আবার নতুন কোন কলেজে ভর্তি হয়।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। বাইশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুনন্দা চৌধুরী ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্য।
স্বামী অভিষেক একজন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে মোটা অংকের টাকার চাকরি করেন।
◆ সুনন্দা প্রায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। এই আত্মীয় বাড়ির পাশে দত্ত বাড়ির এক ছেলে অজয় ওকালতি ব্যবসা করে।
◆ অজয়ের সাথে সুনন্দা এর আলাপ পরিচয় হতে হতে পরকিয়া প্রেম পরিনত হয়। দৈহিক সুখের আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। সুনন্দা যমজ সন্তানের মা হয়ে পড়ে।
◆ কয়েক বছর পর দুর্ভাগ্যবশত অভিষেকের চাকরি চলে যায়। সংসারে অভাব অনটন ভীষণ ভাবে দেখা দেয় আর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
◆ সুনন্দার পরকীয়া প্রেমের কাহিনী তার স্বামী জেনে যায়। সুনন্দা নিজেকে বাঁচানোর জন্য উকিল অজয়ের নামে শ্লীলতাহানির মামলা দায়ের করে। অজয় আদালতের বিচারকের কাছে প্রমাণ করে সুনন্দা একজন পতিতা। বিচারক মামলা খারিজ করে দেন।
◆ স্বামী অভিষেক একদিন রাতে তার স্ত্রী সুনন্দা কে কাছে ডেকে আদর করে সান্তনা দিতে দিতে বলে :- গোপনে গোপনে পরপুরুষের কাছে গিয়ে বিনামূল্যে দেহ দান করে লাভ কি?
◆ সাত বছর সংসার করে তোমার চরিত্রকে বুঝতে পারিনি, এক পুরুষে তুমি সন্তুষ্ট না। যার কারণে গোপনে প্রেম লীলা চালিয়ে গিয়েছে।
◆ যাহাতে অর্থ ঘরে আসে আবার তোমার যৌবনের কামনা সিদ্ধ হয়, চল সেই কাজ করি ।
◆ সুনন্দা বলে :- তুমি সত্যি বলছো। তাহলে ব্যবস্থা করে।
◆ কলকাতা সোনাগাছি এলাকার মধ্যে দুই খানা ঘর ভাড়া করে পতিতা ব্যবসা শুরু করে।
◆ একটি ঘরে অভিষেক তার দুই ছেলে নিয়ে থাকে আর সুনন্দা তার দেহ ব্যবসার জন্য আর একটা রুম ব্যবহার করে।
◆ অভিষেক ছেলেদের দেখাশোনা ও সংসারের রান্নাবান্না সহ যাবতীয় কাজ করতে থাকে। সুনন্দা তার ব্যবসার জায়গায় টাকার বিনিময়ে পুরুষ খরিদ্দারের আনন্দ ফুর্তি দিতে থাকে।
◆ সুনন্দা রূপের আগুনে দগ্ধ হতে কত নামিদামি কবি ও সাহিত্যিক সহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আগমন ঘটে।
◆ বিনোদ ও ধনঞ্জয় ঘুরতে ঘুরতে সুনন্দার ঘরে আসে, আর চুক্তি অনুসারে টাকা দিয়ে দুই বন্ধু মদ পান করতে থাকে।
সুনন্দা মদ পান করতে করতে বলে :- এখন ১১ টা বাজে কিন্তু রাত ১২ টার পর আর কোন খরিদ্দার ঘরে আহ্বান করি না। তোমাদের যা করার ১২ টার আগে করতে হবে।
◆ বিনোদ বলে :- কারণ জানতে পারি!
◆ সুনন্দা বলে :- ১২ টার সময় স্বামী ও ছেলে মেয়েদের কাছে যায়।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- বেশ্যার আবার স্বামী কি!
◆ বিনোদ বলে :- স্বামী আপনার কি দেয়, বরং আপনি আয় রোজগার করে তাদের দেখভাল করছেন।
◆ সুনন্দা বলে :- অগ্নি সাক্ষী করে ব্রাহ্মণ পুরোহিত নাপিত সহ গ্রামের দশ জনের অনুমতি নিয়ে আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমার বিবাহিত স্বামী কিন্তু তার সাথে আবার দেনা পাওনা কিসের!
◆ বিনোদ বলে :- স্বামী কে রেখে লাভ কি? তাড়িয়ে দেওয়া উত্তম কাজ।
◆ সুনন্দা বলে :- আমি পতিতাবৃত্তি করা সত্ত্বেও কিন্তু যখন তিনি আমাকে ত্যাগ করে নাই। স্বামী কে ত্যাগ করার কোন প্রশ্ন নেই।
◆ বিনোদ বলে :- আপনার ছেলে মেয়ে কয় জন।
◆ সুনন্দা বলে :- দুই ছেলে আর এক বছর আগে একটা মেয়ে হয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- তিনটি সন্তানের জননী হয়েও কিন্তু রূপ যৌবন অটুট রেখেছেন। ১২ টা বেজে গিয়েছে শুভ রাত্রি।
◆ সুনন্দার স্বামী দুই বছর পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সুনন্দার ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ কি?
◆ সামাজিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও কিন্তু মায়ের কাম চরিতার্থ করতে বেশ্যা বৃত্তি আর বাবা টাকার জন্য পতিতাবৃত্তি সমর্থন করার ফলে তাদের সন্তানদের বর্তমান পরিচয় জারস পতিতার সন্তান।
◆ প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীর সবকিছুই ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। সুনন্দার যৌবনের জোয়ারের ভাটা পড়েছে। আবার এইচ এম বি রোগ সহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা করতে করতে বর্তমান অর্থ কষ্ট চলছে।
তার বড় ছেলে মাকে ত্যাগ করে বিয়ে করে কলকাতার বাইরে বসবাস করছে।
◆ ছোট ছেলে অজাতশত্রু প্রতিদিন মদ আর নতুন নতুন নারীর সঙ্গ চাই। সবার ছোট মেয়ে অবন্তিকার দ্বিতীয় মাসিক ধর্ম শুরুর কয়েক দিন পর তার জীবনের দুর্ঘটনা ঘটে।
◆ গভীর রাতে অবন্তিকা চিৎকার চেঁচামেচি করে বলে :- মা; আমাকে দাদার হাত থেকে বাঁচাও।
◆ অজাতশত্রু তার বোন অবন্তিকা কে যৌন নির্যাতন করতে করতে বলে :- আরো; চিৎকার চেঁচামেচি করে কোন লাভ নেই। বেশ্যার মেয়ে দুদিন পর বেশ্যা হবে। আমাদের বেশ্যা মা কিন্তু তোকে, তার যৌন ব্যবসায় নামানোর জন্য কথাবার্তা চলছে।
◆ অবন্তিকা তার দাদার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে বলে :- মা বেশ্যা হলেও কিন্তু আমরা এককি মায়ের আপন ভাই-বোন।
◆ অজাতশত্রু তার বোন অবন্তিকার আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে :- বেশ্যালয়ে কেউ কারোর না মা-না বোন, এখানে জন্মদাতা বাপ কিন্তু তার বেশ্যা মেয়ের কাছে আসে।
◆ তোকে যে পুরুষ জন্ম দিয়েছে হয়তো ঘুরতে ঘুরতে একদিন তাকে বুকে জড়িয়ে আনন্দ দিতে হবে। এরকম কত বেশ্যা কে দেখলাম।
◆ সুনন্দা অসুস্থ শরীর নিয়ে মেয়ের ঘরে আসে, আর চিৎকার করে বলে :- অজাতশত্রু একি করলি, শেষ পর্যন্ত বোনকে ধর্ষণ।
◆ অজাতশত্রু তার বোন ছেড়ে দিয়ে টলতে টলতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে :- মা; তুমি বলে, বেশ্যার ও তার সন্তানের কি আর কোন জাত ধর্ম আছে।
◆ অবন্তিকা রাগে উত্তেজিত হয়ে গজগজ করতে করতে তার রক্তাক্ত উলঙ্গ দেহ নিয়ে মায়ের পাশ দিয়ে বাথরুমে চলে যায়।
◆ অজাতশত্রু বলে :- আমি, এক বেশ্যা মায়ের সন্তান, যিনি যৌবনের উন্মাদনায় উচ্চ বর্ণের জাত ধর্ম বিসর্জন দিয়ে স্বেচ্ছায় পতিতা হয়েছেন।
◆ সুনন্দা বলে :- কাজটা ঠিক করেনি।
◆ অজাতশত্রু বলে :- সমাজের পরিচয় হীন এক জারজ ছেলে । মা; আর কি ভালো ব্যবহার আশা করে?
◆ সুনন্দা ভাবে :- ছেলে তো ঠিক বলেছে কিন্তু----
◆ অজাতশত্রু বলে :- ছোট বেলা থেকেই বেশ্যালয়ে থেকে বড় হয়েছি। তোমার সহ বহু বেশ্যার দামি দামি খরিদ্দার ধরে দিয়েছি। আমি মায়ের দালালী করে বিনিময়ে কিছু টাকা পেয়েছি। আর আমার থেকে ছোট, বড় ও বয়স্ক নারীদের দেহ ভোগ করার সুযোগ পেয়েছি। মা; তোমার ব্যবসার সুবিধার জন্য কিন্তু আমাকে বার বার ব্যবহার করে নিয়েছো।
◆ সুনন্দা বলে :- ছাড় ছাড় মেয়েটার কি হাল করেছিস, দেখতে দে।
◆ অজাতশত্রু বলে :- মা গো, নিজের ঘরে সুন্দরী বালিকা থাকতে অন্য নারীর কাছে কেন যাবে।
◆ সুনন্দা বলে :- তাড়াতাড়ি বাজারে গিয়ে ব্যথার ওষুধ আর ড্রেসিং করার ঔষধ তুলা নিয়ে আয়।
◆ এক মাস পর অবন্তিকার মা তার মেয়েকে আদর করতে করতে বলে :- আজ রাতে একজন দামি খরিদ্দার আসবে, তাকে খুশি করতে হবে।
◆ অবন্তিকা বলে :- মা; আমি তোমার মতো বেশ্যাবৃত্তি করতে চাই না। আমি পারবো না।
◆ অজাতশত্রু ঘরে ঢুকে তার বোনের উদ্দেশ্য করে বলে :- পারতে তোকে হবেই কারণ তোকে দেখিয়ে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। যদি টাকা ফেরত দিতে হয় তাহলে আমার অমানবিক নির্যাতনে সহ্য করতে পারবি না। মা কিন্তু তোকে রক্ষা করতে পারবে না।
◆ অবন্তিকা বলে :- দাদা, তুই শেষ পর্যন্ত আমাকে -------------।
◆ অজাতশত্রু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে :- তোমার মেয়েকে ভালো করে বোঝাও, আর ভালো করে কাম চরিতার্থ করার প্রশিক্ষণ দিয়ে দাও।
মা; তুমি তো আর আয় রোজগার করতে পারবে না কিন্তু পেট তো শুনবে না। বেশ্যার দালালি করে আর কয় টাকা হয়।
◆ সুনন্দা বলে :- ঠিক আছে ঠিক আছে।
◆ অজাতশত্রু তার বোনের হাত ধরে টানতে টানতে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
◆ সুনন্দা ভাবে :- শয়তান ছেলে, এই দুপুর বেলা মেয়েটার উপর কত না অত্যাচার করবে।
◆ অজাতশত্রু তার বোনের হাত ধরে বলে :- তোর সাথে যে ব্যবহার করেছি, তা আমি অন্যায় স্বীকার করছি। বর্তমান যা পরিস্থিতি তাতে আমার কথা যদি মেনে চলিস, তাহলে আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসবে।
◆ অবন্তিকা বলে :- বশ্যা জীবন থেকে কিভাবে পরিবর্তন আসবে।
◆ অজাতশত্রু বলে :- আমার ইচ্ছা আছে তোকে ব্যবসায় নামিয়ে যে টাকা আসবে, সেই টাকা জমিয়ে জমিয়ে জমি ও বাড়ি করে সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশে যাবে।
◆ অবন্তিকা বলে :- তা কি কখনো সম্ভব হবে।
◆ অজাতশত্রু তারপর ব্যাগ থেকে তার কিছু প্রমান পত্র ও ব্যাংকের পাস বই দেখিয়ে বলে :- টাকা দিয়ে এই সব প্রমাণপত্র ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খুলেছি, এই একাউন্টে টাকা জমা করব। বোন আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারিস।
◆ অবন্তিকা বলে :- আমার কিন্তু একদম এখানে ভালো লাগেনা। ছোটবেলায় লেখাপড়া শিখতে চাইলে মা বলতো লেখাপড়া শিখে কি করবি বেশ্যার মেয়ে বেশ্যায় হবি।
◆ অজাতশত্রু বলে :- আমি তোর জন্য বই কিনে নিয়ে আসবো।
◆ অবন্তিকা তার দাদাকে জড়িয়ে ধরে বলে :- দাদা; সত্যিই আমি পড়াশোনা করতে পারব।
◆ অজাতশত্রু বলে :- সত্যি বলছি তুই লেখাপড়া শিখবি, আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জীবনকে পরিবর্তন করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
◆ অবন্তিকা বলে :- দাদা; তুই, যে ভাবে বলবি সেই ভাবে চলবো।
◆ অজাতশত্রু বলে :- বেছে বেছে ভিআইপি খরিদ্দার এনে দেবো কিন্তু তুই কোন খরিদ্দার ধরবি না।
◆ অবন্তিকা বলে :- মা যদি কোন খরিদ্দার নিয়ে আসে।
◆ অজাতশত্রু বলে :- আমার সাথে কথা বলতে বলবে।
◆ অবন্তিকা যৌন ব্যবসা শুরু করার তিন বছর পর তার মা মারা যায়।
◆ অবন্তিকা ১৩ বছর বয়সের থেকে ২০ বছর বয়সের সময় বেশ্যাবৃত্তি বন্ধ করে দেয়। সাত বছর দিন রাত কঠোর পরিশ্রম করে আয় রোজগারের টাকা দিয়ে একটা মিনি শহরের পাশে নিজেদের জন্য জমি ও বাড়ি তৈরি করে।
◆ নতুন বাড়িতে প্রবেশের আগেই ব্যবসা কেন্দ্রে থাকাকালীন একদিন রাতে অজাতশত্রু তার বোনের ঘরে আসে।
◆ অবন্তিকা বলে :- গভীর রাতে আমার ঘরে।
◆ অজাতশত্রু তার বোনের পাশে বসে বলে :- আমি ভাবছি, নতুন বাড়িতে গিয়ে তোর নতুন করে কোন সমস্যা হতে পারে, কারণ বহু পুরুষের সঙ্গ করার পর হয়তো তুই স্থির থাকতে পারবি না।
◆ অবন্তিকা বলে :- তা তোর ভাবনা কি আছে বল?
◆ অজাতশত্রু বলে :- সামাজিকভাবে আমরা যদি স্বামী-স্ত্রী রূপে বসবাস করি, তাহলে আমার মনে হয় দুজনেই ভীষণ উপকার হবে।
◆ অবন্তিকা ভাবে :- এটাও কি সম্ভব কিন্তু জোর করে হলেও অনেক বার দাদার সাথে দৈহিক মিলনে লিপ্ত হয়েছি।
◆ স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকলে হয়তো সামাজিক কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না। আমার তো এখন পূর্ণ যৌবন কিন্তু একজন পুরুষ আমার চাই।
◆ অন্য পুরুষকে বিয়ে করলে হয়তো কোনদিন আমার পুরনো ইতিহাস জানার পরে আবার বিচ্ছেদ ঘটতে পারে।
◆ অজাতশত্রু তার বোনকে ধাক্কা দিয়ে বলে :- কিছু তো বল?
◆ অবন্তিকা বলে :- তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি। কিন্তু একটা শর্ত থাকবে।
◆ অজাতশত্রু বলে :- বলে, তোমার শর্ত কি?
◆ অবন্তিকা বলে :- মায়ের মত কিন্তু বিয়ের পর টাকার জন্য অন্য পুরুষকে ঘরে আনতে পারবে না।
◆ অজাতশত্রু বলে :- তা কখনো করবে না। আমি ছোট থেকেই মায়ের আচরণ দেখে দেখে অনেক কিছুই উপলব্ধি করতে পেরেছি। এমনও হয়েছে মা আমাকে পাশে রেখেই অন্য পুরুষের পাশে শুয়েছে।
◆ অবন্তিকা বলে :- যদি এমন জঘন্য প্রস্তাব আমার কাছে যেদিন দেবে, সেদিন আমি আত্মহত্যা করে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে দেবো।
◆ কয়েক সপ্তাহ পর দুজনেই কালি ঘাটে গিয়ে বিয়ে করে। অবন্তিকা লাল বেনারসি শাড়ি সহ শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পড়ে সধবা স্ত্রী রূপে গণ্য হয়।
◆ তারপর নতুন বাড়িতে নব দম্পতি প্রবেশ করে ।
◆ স্বামী-স্ত্রী উভয় কলকাতার বিশিষ্ট ডাক্তার বাবুর কাছে গিয়ে যৌন সংক্রমণের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কিছু দিন চিকিৎসাধীন থেকে দাম্পত্য জীবন শুরু করে।
◆ অজাতশত্রু বাজারে দোকান কিনে মুদিখানা ব্যবসা শুরু করে।
◆ অবন্তিকা গৃহ কর্ম ও বাড়ির পাশে কয়েক শতক জমিতে শাক সবজি চাষ, গরু ছাগল হাঁস মুরগি পালন সহ বয়স্ক গৃহ শিক্ষকের মাধ্যমে লেখাপড়া আরম্ভ করে।
◆ সংসার শুরু করার দুই বছর পর অবন্তিকা একটি নিরোগ সুস্থ সবল হৃষ্টপুষ্ট ছেলের জন্ম দেয়।
◆ নতুন জীবন আর নতুন পরিবেশে অজাতশত্রু ও অবন্তিকা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। তেইশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ একদিন অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বিনোদ বলে :- এই ভাবে মেলামেশা করা কিন্তু আমাদের নিরাপদ মনে হচ্ছে না। উকিল বাড়ির আশ্রিতা দিদিমা হরিমতি কিন্তু আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে। কোনক্রমে যদি দিদিমার কাছে ধরা পড়ে যায়, তাহলে কিন্তু আমাদের সম্পর্কের কথা রাষ্ট্রময় জড়িয়ে যাবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তাহলে কি করা যায় বলোতো! আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তুমি; আমার কাছে একমাত্র পুরুষ, যে আমার দৈহিক যৌবনের চাহিদা পূরণ করতে পেরেছে। তুমি আমার প্রাণ তুমি আমার বাঁচার অধিকার।
◆ সুভাষিনী কে বুকে জড়িয়ে ধরে বিনোদ বলে :- হে কামিনী; কাম চরিতার্থ করতে হলে কলকাতা শহর ছেড়ে অন্য কোন স্থানে গিয়ে বসবাস করার মধ্য দিয়ে যৌবনের উদ্বোধনায় ভাসতে হবে।
সুভাষিনী বলে :- কিন্তু ---------।
বিনোদ বলে :- আর কোন কিন্তু নয়। তোমার সম্মতি থাকলে আমরা বহুদূরে পালিয়ে গিয়ে বসবাস করতে পারি। প্রতি মুহূর্ত তোমায়, আমার হৃদয়ের কাছে রাখতে পারবো।
◆ সুভাষিনী বলে :- পাথরের পাহাড় চুরমার করে, যখন নদীর জল প্রবাহিত হয়ে থাকে। এই সংসার বন্ধনের মায়া আমার কাছে ত্যাগ করা কোন ব্যাপার নয়। বাবার সংসারে থেকে শুধু টাকা পয়সা আর আভিজাত্যের ছোঁয়া কিন্তু মেয়ের প্রাপ্ত বয়স হলে কোন পুরুষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, তার কোন ব্যবস্থা নেই। চলো বাঁধন হারা হয়ে একবারে মুক্ত প্রান্তে গিয়ে বসবাস করি।
◆ সুভাষিনী বার্ষিক পরীক্ষার জন্য বাড়িতে থেকে প্রস্তুতি নিতে থাকে কিন্তু বারবার বমি হওয়ার কারণে পড়াশোনায় মন বসছে না। অজানা আকাঙ্ক্ষায় ভয়ে মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। এক বিবাহিত বান্ধবী বাসন্তীর কাছে ছুটে আসে।
◆ বাসন্তী হাসতে হাসতে বলে :- তুই তো; কুমারী মা হতে চলেছিস। বল কোথায় কার সাথে মিলিত হয়েছিল।
◆ সুভাষিনী বলে :- বিনোদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে ভালবাসা আর তার সন্তান আমার পেটে।
◆ বাসন্তী রহস্য করে বলে :- আমি জানতাম মাস্টার মহেন্দ্র কিন্তু এখন বলছিস বিনোদ। এই দেহ আর কতজনকে ব্যবহার করতে দিবি।
◆ সুভাষিনী কাঁদে কাঁদে ভাব নিয়ে বলে :- তাহলে, এখন কি করবো ? সেই উপদেশ পাওয়ার জন্য তোর কাছে আসা।
◆ বাসন্তী বলে :- বিনোদ কে বিয়ে করে ফেল, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বিনোদ যদি বিয়ে করতে না চাই।
◆ বাসন্তী বলে :- তাহলে গর্ভে ভ্রুন হত্যা করে আবার কুমারী হয়ে যাবে। তারপর আবার অন্য কোন পুরুষকে তোর কামের লালসা চরিতার্থ করার জন্য মিলিত হবেন।
◆ সুভাষিনী বলে :- বিনোদের গ্রামের বাড়িতে একটা বউ আছে কিন্তু বাবা; তো কখনোই মেনে নেবে না।
◆ বাসন্তী বলে :- বাবার মান সম্মানের কথা চিন্তা করলে তো আর এরকম অবৈধভাবে ছেলেদের সাথে মেলামেশা করতিস না।
◆ সুভাষিনী বলে :- কোন একটা বুদ্ধি তো দে!
◆ বাসন্তী হালকা মেজাজ গরম করে বলে :- যা ভালো বুঝিস তাই কর কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে আমাকে বিরক্ত করবি না, কারণ আমার ছেলে-মেয়ে, স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে সংসার করতে হয়। পরিবারের সদস্যরা জানতে পারলে কিন্তু আমার উপর চাপ সৃষ্টি করবে।
◆ সুভাষিনী রাগে উত্তেজিত হয়ে গজগজ করতে করতে বান্ধবীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে বিনোদের বাসায় উপস্থিত হয়।
◆ রবিবার ছুটির দিনে বিনোদ বিছানায় বসে কবিতা পড়ছিল। সুভাষিনী কে রৌদ্রের মধ্যে ঘেমে ভেজা ভেজা কাপড় দেখে হাসি পায় কিন্তু মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সংযত করে নিয়ে সুভাষিনী এর হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে পাখার জোর বাড়িয়ে দেয়।
◆ কিছু সময় চুপচাপ থাকার পর বিনোদ বলে :- কি হয়েছে?
◆ সুভাষিনী বলে :- হতে আর কি বাকি রেখেছো ?
তুমি তো বাবা হতে চলেছো। চার দিন ধরে মাঝে মাঝে বমি হচ্ছে। মুখ ধুয়ে ফেললেও কিন্তু থুতু উঠে শুধু।
◆ বিনোদ বলে :- আমার সন্তান বুঝতে পেরেছি কিন্তু এই মুহূর্তে কি করা যায়। বলে মাথা চুলকাতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী বলে :- কিছু তো উপায় বলে।
◆ বিনোদ বলে :- আমাকে একদিন চিন্তা করার সময় দাও। আর বেশি চিন্তা করে না, ঠিক একটা উপায় খুঁজে বের করবো। কিছু খাওয়া দাওয়া করে বাড়িতে চলে যাও আর আগামী কাল দুপুরে ফোন করে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেবো।
◆ পরের দিন কলকাতার এক নির্জন উদ্যানে পড়ন্ত বিকালে সুভাষিনী সাথে দেখা করে বিনোদ বলে :- অফিস থেকে চার মাসের ছুটি নিয়েছি। দেশের পশ্চিম ভারতের দিকে চলে যাবে কিন্তু তোমার যা অবস্থা আর বেশি দেরি করা যাবে না।
◆ সুভাষিনী বলে :- তা কবে রওনা দেবে।
◆ বিনোদ বলে :- আগামী কাল আমার বাসায় চলে আসবে ,আর আমি জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবো। মাস্টার মহেন্দ্র আমাদের পালিয়ে যাওয়ার সাহায্য করবে।
◆ সুভাষিনী ও বিনোদ কে নিয়ে প্রণয়ের রসদ নিয়ে মাস্টার মহেন্দ্র নতুন নতুন কবিতা রচনা করে "মধু মালতি" নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করে।
◆ সুভাষিনী আসামাত্রই বিনোদ একটা সুটকেস নিয়ে ট্যাক্সির মধ্যে উঠে বসে আর মাস্টার মহেন্দ্র রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে "মধু মালতি" প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সুভাষিনী এর হাতে দেয়। ট্যাক্সি হাওড়া স্টেশনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, মায়ের ছবিতে একটা প্রণাম করে আসলাম না। মানসিক উদ্বেগের কারণে প্রণাম করার কথা একদম ভুলেই গিয়েছিলাম।
◆ হাওড়া জংশন থেকে লোকাল ট্রেন ধরে দুর্গাপুর। তারপর সন্ধ্যার সময় লাহোর এক্সপ্রেস ধরে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।
◆ ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লি নেমে দুই জনের পুলিশের ভয়ে আতঙ্কে লুকিয়ে লুকিয়ে আবাসিক হোটেল থাকে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- দিল্লি এসে কত রকম সমস্যার সমাধান করতে হচ্ছে। বড় সমস্যা হচ্ছে কুমারত্ব নিয়ে। এখানে বাংলা ভাষায় কথা বলার কেউ নেই। বিনোদ বাইরে গেলে কিন্তু আমাকে একা একা ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়।
এখানকার বহু সমস্যা থেকে কিন্তু বাড়িতে ইহা অপেক্ষা ভালো ছিলাম আর নিজ স্বাধীন ছিলাম। এমন কি বিনোদের সাথে গোপন প্রণয়ের সুযোগ বেশি ছিল।
◆ দিল্লি এক সপ্তাহ থাকার পর লাহোরের উদ্দেশ্য রওনা দেয়। লাহোর কয়েক দিন থাকার পর অমৃতসর তিন দিন বেড়িয়ে শ্রী নগরে বসবাস করতে থাকে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতিশয় মনোরম দৃশ্যের মাঝে এক মাস ধরে যৌবনের উন্মাদনায় কাম চরিতার্থ করতে করতে নতুন প্রেমের বন্যা এখানে খুব উছলিয়া ওঠে। এরপর দ্বারকা হয়ে রাজ পুতনা বেড়িয়ে বোম্বে উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
◆ চিতোর গড় পদ্মিনীর জহর-ব্রত স্থানের দিকে যেতে যেতে সুভাষিনী ভাবে, নারীর অমূল্য সম্পদ তার দেহের গোপন অঙ্গ (ইজ্জত) কিন্তু আমি বিয়ের আগেই কয়েক জন পুরুষের সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছি। তারপর বিনোদের মাধ্যমে গর্ভবতী হয়ে পড়েছি। ভারতীয় সতী সাবিত্রী রমণীর মধ্যে পদ্মিনী দেবী আমার প্রণাম নাও।
◆ বিনোদ বলে :- জহর কুন্ডের ইতিহাস জানা আছে।
◆ সুভাষিনী ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এসে বলে :- না, বলে শুনবো।
একজন ব্যক্তি বিনোদের সামনে এসে বলে :- आपको एक गाइड की आवश्यकता होगी। আপনার কোন পথপ্রদর্শক লাগবে।
বিনোদ বলে :- आप बंगाली भाषा जानते हैं। আপনি বাংলা ভাষা জানেন!
উক্ত ব্যক্তি বলেন :- मैं बंगाली हिंदी अंग्रेजी समेत कुछ भाषाएं जानता हूं। আমি বাংলা, হিন্দি ও ইংলিশ সহ কয়েকটি ভাষা জানি।
◆ সুভাষিনী ও বিনোদ আর পথ প্রদর্শক সহ তিনজন হাঁটতে হাঁটতে দুর্গে প্রবেশ করে। বাদল পোল, ভৈরব পোল, হনুমান পোল, রাম পোল ও লক্ষ্মণ পোল সহ সাত-সাতটি ফটক পেরিয়ে সামনের দিকে চলতে থাকে।
◆ পথ প্রদর্শক বলেন :- এই দুর্গ পায়ে হেঁটে ঘুরতে ঘুরতে একটা দিন সময় লেগে যাবে।
◆ পথ প্রদর্শক কখনো বাংলা আবার কখনো হিন্দি ভাষায় স্থানের মাহাত্ম্য বলে চলেছেন। দুজনেই মনের আনন্দে কীর্তি স্তম্ভ, বিজয় স্তম্ভ, পদ্মিনী প্রাসাদ, গোমুখ জলাধার, রানা কুম্ভ প্রাসাদ, মীরা মন্দির, কালিকা মাতা মন্দির, জৈন মন্দির এবং ফতেহ প্রকাশ প্রাসাদ দর্শন করে।
◆ পথ প্রদর্শক বলেন :- সেই সময়ে জলের কষ্ট দূর করার জন্য এই দুর্গের মধ্যে প্রায় ৮৪৮টি কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করা হয়েছিল। এখন তার মধ্যে শুধু ২২ টি জলাশয় রয়েছে।
◆ ঘুরতে ঘুরতে এই দুর্গের মধ্যে বিজয়স্তম্ভ এর সামনে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ পথ প্রদর্শক বলেন :- এই দুর্গের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইমারতের মধ্যে একটি বিজয়স্তম্ভ।
◆ এই স্তম্ভটি ১৪৪২ সালে তৈরি করা হয়েছে। রাজপুত শাসক রানা কুম্ভ তৈরি করেছিলেন।
◆ এই স্তম্ভটি মাহমুদ শাহ প্রথম খিলজির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের স্মারক হিসেবে তৈরি করেছিলেন।
◆ চিতোরগড় দুর্গের বিভিন্ন স্থাপত্য সম্পর্কে এরকম নানা ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে ।
◆ আবার তিনজন ঘুরতে ঘুরতে জহর কুন্ডের কাছে উপস্থিত হয়।
◆ বিনোদ তার পথ প্রদর্শক কে বলে :- জহর-ব্রত ও এই জহর কুন্ড সম্পর্কে কিছু বলুন।
◆ পথ প্রদর্শক বলেন :- ইতিহাসের পাতায় রানী পদ্মিনী বা পদ্মাবতী সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
◆ আওয়াধি কবি মালিক মহম্মদ জওয়াসির লোকগাথায় প্রথম শোনা যায় পদ্মাবতীর কথা।
◆ প্রাচীনকালে অনেক রাজাই কিন্তু তাদের কীর্তি-কাহিনী লিপিবদ্ধ করে যাননি। মানুষের মুখে মুখেই তাঁদের বেঁচে থাকা। রানি পদ্মিনীর ক্ষেত্রে এরকম কিছু হতে পারে।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর দখল করার ২৫০ বছর পর আওয়াধি কবির কবিতায় ভেসে ওঠে রানি পদ্মিনীর জহর ব্রতের অসাধারণ কাহিনি।
◆ সিংহালা প্রদেশের রাজা গান্ধর্ব্য সেনা ও তার পাটরানি চম্পাবতীর একমাত্র কন্যা পদ্মিনী বা পদ্মাবতী । হীরামনি নামে তার এক কথা বলা তোতা পাখি ছিল।
◆ পদ্মিনী বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলে, তাঁর জন্য সিংহালা রাজা গান্ধর্ব্য সেনা এক দিন স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেন।
◆ সিংহালা রাজার প্রধানমন্ত্রী সকল যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- রাজা গান্ধর্ব্য কন্যা রাজ কুমারী পদ্মিনীর একটি শর্ত আরোপ করেছেন।
◆ শর্ত :- রাজকুমারীর মনোনীত যোদ্ধার তরোয়াল খেলায়, যে রাজা বা যোদ্ধা পরাজিত করতে পারবেন-বিজয় লাভকারী যোদ্ধাকে স্বয়ম্বর সভার মাঝে রাজকুমারী পদ্মিনী বরমাল্য দান করবেন।
◆ স্বয়ম্বরে উপস্থিত রাজা-রাজড়ারা যুদ্ধের ময়দানে নেবে পড়ে। স্বয়ং পদ্মিনীই যোদ্ধার ছদ্মবেশে সবার সাথে তরোয়ালের লড়াই চালিয়ে কিন্তু একে একে সবাই কে পরাজিত করতে থাকে।
◆ অবশেষে স্বয়ং পদ্মিনী যোদ্ধার বেশধারী কিন্তু চিতোর গড়ের রাজা রতন সিং এর সাথে তুমুল আকারে লড়াই চলতে থাকে।
◆ এক সময় ছদ্মবেশী যোদ্ধা পদ্মিনী পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। চিতোর গড়ের রাজা রতন সিং কে বিজয় কারী বলে ঘোষণা করা হয়।
◆ পদ্মিনীর বাবা-মা বলেন :- চিতোর গড়ের রাজা রতন সিং বিজয়ী হয়েছেন ঠিক কিন্তু আমাদের মেয়ে কে বিয়ে দেবে না।
◆ রাজা রতন সিং বলেন :- হে রাজন; আমার অপরাধ কি জানতে পারি?
◆ পদ্মিনীর বাবা-মা বলেন :- রাজা রতন সিং-এর ইতিমধ্যেই ১৪ জন রানী আছেন। এই কারণে পদ্মিনী কে বিয়ে দিতে চাই না।
◆ পদ্মিনী ভাবে, বিয়ে না করলে তো আবার রাজায় রাজায় যুদ্ধ বেধে যাবে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে।
◆ পদ্মিনী বরমাল্য সাথে করে স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হয়ে বলে :- রাজা মশাই; আর যুদ্ধ নয়, আপনার ধয্য সহ্য সত্যাই প্রশংশীন-আমি ভীষণ ভাবে খুশি হয়েছি। আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা বড় ধর্ম, আপনাকে বরমাল্য দান করবো। বলে বরমাল্য রাজা রতন সিং এর গলায় পড়িয়ে দেয়।
◆ চিতোর রাজ্যের মধ্যে অপরূপ সুন্দরী পদ্মিনী অসাধারণ বুদ্ধি ও জ্ঞানের কথাও ছড়িয়ে পড়ে।
◆ রানী পদ্মিনীর বুদ্ধি ও পরামর্শে, রাজা রতন সিং চিতোর রাজ্য পরিচালনার কাজ করতে থাকে।
◆ রাজা রতন সিং যুদ্ধবীর হওয়ার সত্ত্বেও পাশাপাশি শিল্প অনুরাগীও ছিলেন। যুদ্ধের ছবি আঁকার জন্য শিল্পী রাঘব চেতন রাজার সঙ্গে সব সময় যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন।
◆ একদিন শিল্পী রাঘব চেতনের উদ্দেশ্য করে রাজসভায় দাঁড়িয়ে রাজা রতন সিং বলেন :- আপনার কুকীর্তির কথা ফাঁস হয়ে গেছে, আপনি এরকম জঘন্যতম কাজ করতে পারলেন। আপনাকে রাজসভা থেকে বিতাড়িত করা হলো।
◆ শিল্পী রাঘব চেতন ভাবে :- চিতোর ধ্বংস করে প্রতিশোধ নিতে হবে।
◆ আলাউদ্দিন খিলজির দরবারে উপস্থিত হয়ে শিল্পী রাঘব চেতন বলে :- রাজা রতন সিং এর রানি পদ্মিনীর অসাধারণ রূপ আর রাজনীতির গুনের কথা কি বলবো! তারপর নিজের আঁকা রানি পদ্মিনীর একটি ছবি দেখিয়ে বলে, দেখুন দেখুন এমন সুন্দরী একমাত্র আপনার দরবারে মানায়।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি কিন্তু পদ্মিনীর ছবি দেখে রূপের মোহে উন্মাদ হয়ে ওঠেন, আর ভাবেন যে কোনও ভাবে পদ্মিনী কে পেতে হবেই।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি দূতের মাধ্যমে চিঠি পাঠায়।
◆ রাজা রতন সিং চিঠি খুলে পড়তে শুরু করে।
রাজা রতন সিং তোমার অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডিত দেহ কান্তি সুন্দরী পদ্মিনী কে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও । চিঠি পাওয়া মাত্র পদ্মিনী কে না পাঠিয়ে দিলে কিন্তু চিতোর রাজ্য আক্রমণ করে ধ্বংস করা হবে।
◆ রাজা রতন সিং দূতের মাধ্যমে আলাউদ্দিন খিলজি কে জানিয়ে দেয়, কোন কিছুর বিনিময়ে কিন্তু রানী পদ্মিনী কে আলাউদ্দিন খিলজির কাছে পাঠাতে পারবোনা। প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে রাজি আছি।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর রাজ্য আক্রমণ করে। দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। চিতোর রাজ্যের সেনাবাহিনী বীরের মতো লড়াই চালিয়ে গিয়েও কিন্তু কিছু সেনা বেইমানি করার কারণে রাজা রতন সিং এর সেনা দল পরাজিত হয় আর অপর পক্ষের সেনার আঘাতে রাজা রতন সিং মৃত্যুবরণ করেন।
◆ আলাউদ্দিন খিলজির সেনাবাহিনী দুর্গ আক্রমণ করে।
◆ দুর্গের মধ্যে সম্মান বাঁচাতে আরও অনেক রাজপুত তাদের রমনীকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গের ভেতর গোপন জহর অগ্নি কুণ্ডে উপস্থিত হয়।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি লোভী শত্রুর হাতে, চিতোরের রাজ পরিবারের রমণীগণ কিন্তু নিজেকে সঁপে দেননি। অসহায় রমণীগণ নিজের ধর্ম ও নারীর সম্মান বাঁচাতে আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবলিদান দেন । চিতোরের রানী পদ্মিনী প্রথম অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দেয়। মোট ১৬০০ রাজ পরিবারের রমণীগণ বিশাল জহর কুন্ডের মাঝে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবলিদান দেয়।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি যখন রানী পদ্মিনীর পাওয়ার লোভে দুর্গের ভেতর প্রবেশ করে আর ছুটতে ছুটতে বিশাল জহর অগ্নি কুণ্ডে কাছে এসে থমকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ আলাউদ্দিন খিলজি কুণ্ডের মধ্যে জ্বলন্ত রমণীগণের দগ্ধ পোড়া ভয়াবহ দৃশ্য দেখে তাড়াতাড়ি কুণ্ডমুখ গুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
◆ কয়েকশো বছর পরে এক চিতোর রাজা কুণ্ডমুখ গুলো খুলে দেন আর সেখানে পদ্মিনী ও অন্য বীর নারীদের সম্মান জানানোর ব্যবস্থা করেন।
◆ পথ প্রদর্শক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, চিতোর গড়ে, এই হলো রানি পদ্মিনীর জহর কুন্ড।
◆ মুসলিম শাসক আলাউদ্দিন খিলজি দ্বারা হিন্দু নারীদের উপর অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে রমণীদের আত্ম বলিদান এর মর্মান্তিক ঘটনা ৭২০ বছর আগের ইতিহাস কিন্তু (বর্তমান ২০২৩ সাল) আজও সাক্ষী দিয়ে চলেছে।
◆ পথ প্রদর্শক তার চুক্তি অনুসারে টাকা নিয়ে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নেয়।
◆ ঘুরতে ঘুরতে সুভাষিনী ও বিনোদের সাথে এক বয়স্ক ব্যক্তির সাথে আলাপ পরিচয় ঘটে। কলকাতা থেকে এসেছে, শুনে আপ্যায়ন করে একটি সুন্দর জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসায়।
◆ ভদ্রলোক হিন্দি ভাষী হলেও কিন্তু বাংলা ভাষা জানেন, কারণ কয়েক বছর কলকাতায় বসবাস করেছেন।
◆ শ্রীবাস্তব সিংহ যাদব মহাশয় বলেন :- গড় সম্পর্কে কিছু তথ্য বলছি।
◆ চিতোরগড় ভারতের রাজস্থান রাজ্যের চিতোরগড় জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা।
◆ উদয়পুর থেকে ১০২ কিলোমিটার দূরত্বে আরাবল্লি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত চিতোরগড়।
◆ রাজস্থান জয়পুর শহর থেকে চিতোরগড় ৩১০ কিলোমিটার দূরত্ব।
◆ দিল্লি থেকে চিতোরগড় ৬২৫ কিলোমিটার দূরত্ব।
◆ কলকাতা থেকে চিতোরগড় ১৭০৯ কিলোমিটার দূরত্ব।
◆ রাজস্থানের (Rajasthan) চিতোরগড় দুর্গ (Chittorgarh ) শুধু ভারতে নয়, এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্গ। এমন কি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত।
◆ ইতিহাসের পাতায় আরাবল্লি পাহাড়ের ওপর ৭০০ একর জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
◆ ‘পদ্মাবত’ (Padmaavat) সিনেমার দৌলতে বহু মানুষ এখন পরিচিত এই চিতোরগড় দুর্গ সম্পর্কে।
◆ শুধু আলাউদ্দিন খিলজি নয়, এরপর এই দুর্গের ওপর গুজরাতের বাহাদুর শাহ এবং মোঘল সম্রাট আকবরও হামলা করেন ।
◆ বিরোধী দল পরাজিত হলেও দুর্গের এক টুকরো ইট ক্ষয়ে যায়নি।
◆ মেওয়াড়ের রাজধানী চিতোরগড় ছিল। তবে সপ্তম শতকে মৌর্যরা এই দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। শোনা যায়, স্থানীয় মৌর্য শাসক চিত্রাঙ্গদা মোরি এই দুর্গটি গড়ে তুলেছিলেন।
◆ তারপর গুহিলা রাজবংশের বাপ্পা রাওয়াল চিতোরগড় দখল করে নেয়।
◆ রাজপুতদের এই দুর্গ নিয়ে ভীষণ ভাবে গর্ব ছিল।
◆ তারপর ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর দুর্গ দখল করে।
◆ চিতোরগড়ে নানা রাজবংশ রাজত্ব করে গেছে।
◆ ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাতের বাহাদুর শাহ চিতোরে হামলা চালায়।
◆ ১৫৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর চিতোর দখল করে।
◆ এরপর ১৬১৫ সালে, আকবরের উত্তরসূরি জাহাঙ্গির এবং মেওয়াড়ের মহারানার মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি সাক্ষর হয়। সেই সময় দুর্গ এবং দুর্গের আশেপাশের অঞ্চল দিয়ে মেওয়াড় দেওয়া হয়।
◆ এরপর দুর্গটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতে চলে যায়।
◆ ১৯০৫ সালে চিতোরগড় দুর্গের মেরামতের কাজ ব্রিটিশ রাজ করে।
◆ দুঃসাহসিক সব ঘটনার সাক্ষী এই চিতোরগড় দুর্গ। নানা ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে দুর্গ জুড়ে। কিন্তু আজ শুধুই রহস্যে মোড়া চিতোর। এখন চিতোরগড় দুর্গ একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
◆ পর্যটকদের কাছে এক জনপ্রিয় পর্যটক কেন্দ্র চিতোরগড় দুর্গ।
----------------------------------------------------------
।। ত্রয়োবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।। ----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। চুতরবিংশ অধ্যায় (২৪ অধ্যায়) ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী এর আজ মন মানসিকতা ভালো না থাকার কারণে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।
◆ ঘুমন্ত সুভাষিনী এর পাশে গিয়ে বিনোদ বসে পড়ে, তারপর জাগানোর জন্য তার দেহ ধরে নাড়াচাড়া করতে থাকে। সুভাষিনী আরমোড়া দিয়ে বিনোদ কে বুকে টেনে নেয়।
◆ সুভাষিনী কে আদর করতে করতে বিনোদ বলে :- উঠে পড়ে, চলে প্রকৃতির হাওয়ায় ঘুরতে ঘুরতে তোমার মন মানসিকতা ঠিক হয়ে যাবে।
◆ পড়ন্ত বিকেলে দুজনে মুম্বাই নগরীর অন্তর্গত মালবার শৈল পল্লীতে বায়ু সেবন ভ্রমণ করতে বেড়িয়ে পড়ে । চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সুভাষিনী এর মন কিঞ্চিৎ প্রফুল্লতা আসে।
◆ বিনোদ বলে :- সুভাষিনী; তোমার মলিন মুখ দেখার জন্য কি ঘর বাড়ি ও পরিবার আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছি?
◆ পাশাপাশি দুজনে চলতে চলতে সুভাষিনী এর বাম হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বিনোদ বলে :- ব্যাপার কি বলো দেখি?
◆ সুভাষিনী ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হয়ে বিনোদ এর বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে থাকে।
◆ বিনোদ তার ভালবাসার সুভাষিনী এর থুতনি অর্থাৎ চিবুক স্পর্শ করে স্নেহ প্রকাশ করে। তারপর সুভাষিনী এর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে ভাবতে তার চোখের জল বিনোদ রুমাল দিয়ে মুছে দিতে থাকে।
◆ নিকটবর্ত্তী একখানা বেঞ্চের উপর দুজনে পাশাপাশি বসে পড়ে।
◆ বিনোদ বলে :- সুভাষিনী; তোমার জন্য পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ করে কিন্তু তোমার সাথে অজানা অচেনা ও অনিশ্চিত পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছি।
◆ সুভাষিনী বলে :- আজ আমার কিছুই ভালো লাগছে না।
◆ সুভাষিনী কে বুকে জড়িয়ে ধরে কয়েক বার চুমু দিয়ে বিনোদ বলে :- তোমায় নিয়ে ভীষণ ভাবে বিপদের সম্মুখে ঝাঁপ দিয়েছি, কিন্তু তা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তোমায় কত ভালবাসি।
◆ বিনোদের কথার কোন উত্তর না দিয়ে কিন্তু সুভাষিনী আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে হাত দুখানি কোলের উপরে অঞ্জলি বদ্ধ করে জড়োসড়ো হয়ে বসে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে দিনের শেষের বিদায়ের হলুদ সূর্যের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
◆ সুভাষিনী এর ডান হাত তুলে বিনোদ তার কাঁধে রেখে আদর করতে থাকে। সুভাষিনী আরো কাছাকাছি হয়ে বিনোদের দুই কাঁধে হাত রেখে আদরের প্রতিউত্তর দিতে থাকে।
◆ চারিদিকে নিস্তব্ধতা আর পার্শ্ববর্তী প্রশস্ত পথ দিয়া শৈল বিহারী সৌখিন লোকের দুই একখানি মোটরগাড়ি মাঝে মাঝে মৃদু শব্দে চলেছে।
◆ বিনোদ একটা সিগারেট হাতে নিয়ে বলে :- বাড়ির কথা মনে পড়ছে বুঝি! আরে তুমি একেবারে কচি খুকি তো না।
◆ সুভাষিনী চুপচাপ থেকে বিনোদের মুখের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোয়ার গোল গোল রিং দেখতে দেখতে ভাবে।
◆ সুভাষিনী এর দেহের অনাবৃত জায়গায় নাক স্পর্শ করে ঘ্রাণ নিতে নিতে বিনোদ বলে :- আচ্ছা সুভাষিনী; বাড়িতে তোমার কি আকর্ষণ আছে বলতো দেখি?
◆ সুভাষিনী বলে :- আমার মন মানসিকতা আজ ভালো নেই কিন্তু বিরক্ত না করলে ভালো হয়।
◆ বিনোদ বলে :- আমার কথা শুনে তুমি রাগ করোনা কিন্তু একদম সত্য কথাগুলো তোমাকে বলবো।
◆ সুভাষিনী বিরক্ত হয়ে বলে :- বলে যাও, আমার কান খোলা আছে।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার মা ও ভাই বোন কেউ নেই কিন্তু তোমার পিতা দ্বিতীয় বিবাহ করে তোমার বয়সী স্ত্রীকে নিয়ে আমোদ প্রমোদ করে বেড়াচ্ছে।
তাও আবার তোমার সামনে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তাতে আমার কি ক্ষতি হয়েছে?
আমিও তো তোমার সাথে আনন্দ ফুর্তি করে চলেছি।
◆ বিনোদ বলে :- এখানে লাভ-ক্ষতির কথা বলছি না। বলছি মানবতার কথা। তোমার বাবা বউকে পেয়ে কিন্তু নিজের মেয়ের দিকে ফিরে চায় না।
◆ সুভাষিনী বলে :- তার জন্য কিন্তু অবাধ স্বাধীনতা লাভ করেছি আর আনন্দ ফুর্তি করার জন্য প্রচুর ঐশ্বর্য লাভ হয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার বাবা তাদের শোয়ার ঘর থেকে কৌশল করে কিন্তু তোমার মায়ের ছবি খানা দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সেই বাড়ির মোহ মায়ায় তোমার কি সুখ শান্তি আছে আমাকে বলতে পারো?
◆ সুভাষিনী হালকা মৃদু মৃদু হাসি দিয়ে বলে :- বিনোদ; তোমার কথাগুলো উত্তর আমি দিতে পারি কিন্তু দেবো না, এই কারণে তুমি মরুভূমির তপ্ত বালুর উপর শীতল জলধারা দিয়ে তৃষ্ণার্ত মরুভূমি কে আত্মতৃপ্তি দান করেছো আবার বিভিন্ন ভাবে আনন্দ দিয়ে চলেছে। তোমাকে, আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে রাখার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও।
◆ বিনোদ আনন্দ আত্মহারা হয়ে সুভাষিনী কে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী আলিঙ্গনবদ্ধ বলে :- তুমি আমার জন্য কি ছেড়ে এসেছে, তা দেখার আমার কোন প্রয়োজন নেই। আমার সম্মুখে তুমি যে প্রেমের নৈবেদ্যের ভালবাসার ডালি সাজিয়ে রেখেছো, আমি শুধু তাই দেখছি।
◆ বিনোদ বলে:- চলে সিনেমা দেখে আসি, তাহলে মন মানসিকতা একদম ঠিক হয়ে যাবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- চলে তবে, বলে উঠে দাঁড়িয়ে বিনোদের হাত ধরে চলতে থাকে।
◆ সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে আবাসিক হোটেলের দিকে রওনা দেয়।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- কেন! বৃথা দুশ্চিন্তা করে শরীর ও মন-মানসিকতা খারাপ করছি। যখন আমার সম্মুখে অমৃত সুধার পাত্র রয়েছে, কিন্তু সুধা পান না করে মুখ ফিরিয়ে থাকা বোকামি ছাড়া আর কি?
◆ যৌবনের উন্মাদনায় ভাসার জন্য কিন্তু ঘর বাড়ি, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন সহ বন্ধু বান্ধব ত্যাগ করা।
◆ এক সপ্তাহ পর নতুন সিম কার্ড ও মোবাইল কিনে সুভাষিনী মাস্টার মহেন্দ্র এর কাছে ফোন করে। আর মহেন্দ্র এর কাছে থেকে জানতে পারে। তার বাবা; মান সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে বিনোদ এর বিরুদ্ধে থানায় ডায়রী পর্যন্ত করেনি।
◆ বিমাতা আমার কথা মনে করে কাঁদেন। হরিমতি তাহার ভবিষ্যৎ বাক্য সফল হওয়ার কারণে খুব আনন্দিত হয়েছেন। সে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বলছে “ আমি আগেই জানতাম”।
◆ পরেশদা স্কুল ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে। বাবা তাকে দোষারোপ করেছে। পরেশদা বাবা কে বলেছে, যেভাবেই হোক সুভাষিনী কে খোঁজ করে আনবে।
◆ সুভাষিনী নিচের ক্লাসে পড়ার সময় ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলে, তারপর মাস্টার মহেন্দ্র এর ইংরেজি শিক্ষা ও বিনোদের সাথে চলাফেরা করতে করতে ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
◆ আবাসিক হোটেল বিদেশী মেম সাহেবের কায়দায় থাকতে শুরু করে। আর লোকজনের সাথে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে থাকে। বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন রকম খাওয়া দাওয়া আদব কায়দা সহ চাল চলন নিয়ে বিশেষ করে বিপদের সম্মুখীন হলেও কিন্তু শিখে নিয়েছে।
◆ সুভাষিনী ভাবে, একবার বাবা মায়ের সাথে বেড়াতে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু বিমাতার পক্ষপাতী হয়ে বাবা কিন্তু আমাকে সাথে নেয়নি।
◆ আজ বিনোদ এর মাধ্যমে সেই বেড়ানোর সাধ পূর্ণ হয়েছে। হাঁটার সময় দুজন হাত ধরাধরি করে চলতে থাকি। গাড়িতে চড়ে বিনোদ এর গলা জড়িয়ে বসি। পশ্চিম ভারতের উঁচু নিচু পাহাড়ী পথে মোটর গাড়ি চলার সময় স্প্রিং এর মৃদু দোলায় নাচিয়া নাচিয়া আমাদের পরস্পর আনন্দিত বক্ষ পুলকিত হয়ে উঠে।
◆ বিনোদ এর প্রতি শুধু প্রেমে নয় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আমার হৃদয় ভরিয়া গেছে।
◆ বিমাতা বেচারি বড় ভাল ছিলেন। তিনি আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু কখনো তা প্রকাশ করতেন না।
তিনি চতুরা নারীর মত স্বামীর মন ভুলাইতে কপটতার আশ্রয় নিতেন না। তার সরল প্রাণ স্বামীর ইচ্ছা অনুসারে চলিত। বিমাতার জন্য আজ ভীষণ ভাবে কষ্ট হচ্ছে।
◆ সুভাষিনী এর বিদেশ কথা কে কেন্দ্র করে বিনোদ বলে :- সুভাষিনী; পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে যদি পঞ্জাবে এসে মনে করে, এ কোথায় এলাম। বোম্বাইয়ের লোক যদি বাংলায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া আর চলাফেরা নিয়ে মুস্কিলে পরে, আবার মাদ্রাজী মানুষ যদি অযোধ্যায় গিয়ে ভাবে বিদেশ, তবে সমগ্র ভারতের জাতীয়তা গড়ে উঠবে কি করে?
◆ সুভাষিনী বলে :- ভারতবর্ষ এক বৃহৎ দেশের মধ্যে ভাষার, ধর্মে ধর্মে লড়াই, সামাজিকভাবে জাতপাতের লড়াই, বিচিত্র ভারতের বিচিত্র আচার আচরণ ও রীতিনীতির বৈচিত্র ও বৈষম্য সহ স্বার্থপর রাজনীতির লড়াই চলছে। ভারতবর্ষে এক জাতি এক প্রাণ গড়ে ওঠা কখনোই সম্ভব নয়।
◆ বিনোদ জোর দিয়ে বলে :- এই অসম্ভবকে কিন্তু সম্ভব করতে হবে। তবেই তো আমরা ভারতীয়।
◆ সুভাষিনী ভাবে, বিনোদ এর বিশেষ গুনাগুন হলো ভ্রমণ করতে করতে যে সকল প্রদেশে গিয়েছে, সব প্রদেশের পরিচিতি ব্যক্তিরা বিনোদ কে স্বদেশী বলে মনে করে। শুধুমাত্র চিন্তায় নয় কাজেই তা পরিণত করে।
----------------------------------------------------------
।। চুতরবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। পঞ্চবিংশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী ও বিনোদ বোম্বাই থেকে নাগপুর হয়ে
মাদ্রাজে আসে। মাদ্রাজে এক সপ্তাহ বাস করার পর বিশাখা পাটনা হয়ে জগন্নাথ পুরী এক সপ্তাহ থাকার পর কাশি ধাম আসে।
◆ কাশি ধাম উপস্থিত হয়ে মাসিক চুক্তিতে ঘর ভাড়া করে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- কাশিতে বাঙালির সংখ্যা কম নয়। ঘরের বাইরে গেলে আমার ভীষন ভাবে ভয় পায়, কারণ প্রতিদিন বাঙ্গালীদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ আলাপ পরিচয় হয় যদি আমার পরিচিত কোন ব্যক্তির সাথে দেখা হয়ে যায়। ধরা পড়ে গেলে আমার ইচ্ছা পূরণ হবে না।
◆ একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সুভাষিনী তার প্রেমিক বিনোদ কে বলে :- চলে,এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাই। চারিদিকে বাঙালি আর বাঙালি যদি পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে যায় তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাবো।
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে সুভাষিনী কে জড়িয়ে ধরে বলে :- মেয়েলি বুদ্ধি নিয়ে কি বিনোদ কাজ করে?
◆ সুভাষিনী বলে :- মেয়েদের বদনাম করে তুমি কি বলতে চেয়েছে?
◆ বিনোদ বলে :- এই কাশি ধামের মধ্যে যত বাঙালি আছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশ বাঙালি আমাদের মতো।
◆ কেউ না কেউ কারোর ঘরের বউকে নিয়ে পালিয়েছে।
◆ কেউবা বিধবা পোয়াতি খালাস করতে আসে।
◆ কেউ আপন রক্ষিতা নারীর হাওয়া বদলে যাচ্ছে।
◆ আবার এমন কেউ নিজের আত্মীয়ের দ্বারা পাপ ব্যবসায় জড়িত।
◆ বাঙালির কলঙ্ক তিনটি স্থানে নবদ্বীপ, কাশি ও বৃন্দাবন।
◆ ভয় করছো কাকে? কে কার নিন্দা করবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তুমি যেমন মন-মানসিকতার মানুষ ঠিক সেই মন নিয়ে কাশি, বৃন্দাবন ও নবদ্বীপ কে দেখেছো কিন্তু ধর্মের অন্যের দিকে তোমার চোখ পড়বে কেন! সে যাই হোক তবুও চলো এখানে থেকে অন্য কোথাও।
◆ কাশি থেকে এলাহাবাদ প্রয়াগ গঙ্গা যমুনা সঙ্গমে স্নান করে, তাজমহল, আগ্রা ফোর্ট ও সেকেন্দ্রা আকবরের সমাধি প্রভৃতি দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ পর ভাদ্র মাসের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর দিনে মথুরা পৌঁছায়।
◆ বাঙালি ঘাটের নিকটবর্তী একেবারে যমুনার ধারে অল্প ভাড়ায় একটা ভাল বাড়ির পেয়ে বসবাস শুরু করে। রান্না করার জন্য একজন বামুন ঠাকুর রেখে। আর বাজার করা, থালা বাসন ধোয়ার সহ ঘরের কাজের লোক রাখে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- বিনোদের মথুরাতে থাকার ইচ্ছা বেশি কেন তা বুঝতে পারছি না?
গচ্ছিত টাকা পয়সা তো শেষ হতে চলেছে তবুও আমার জন্য দুজন কাজের লোক রাখার প্রয়োজন ঠিক বুঝতে পারলাম না।
◆ বিনোদ বলে :- মথুরাতে বাংলার মতো থাকার অনেক সুবিধা আছে।
◆ হঠাৎ একদিন বিনোদ প্যান্ট-শাট, টুপি ও দামি জুতা পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের মতো চলতে শুরু করে।
◆ বিনোদ এর গোঁফ কামানো দেখে সুভাষিনী বলে :- তোমাকে একদম ভালো দেখাচ্ছে না।
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে বলে :- চিন্তা কি! আবার গজিয়ে যাবে।
◆ কিছু দিন পর বিনোদ বাসা বাড়িতে এক নাপিত ডেকে নিয়ে এসে নিজের মাথা মুন্ডন করে মাথার মধ্যস্থলে এক গোছা চুল রেখে বৈষ্ণবের মতো শিখা ধারণ করে। তারপর দ্বাদশ অঙ্গে তিলক ধারণ করে কাছা শূন্য কাপড় পড়ে পন্ডিত সাজে।
বৃন্দাবনে রঙ্গজীর মন্দিরে গিয়ে স্বামীজি মহারাজের সঙ্গে আলাপ করে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- কলকাতায় থাকতে বিনোদ বন্ধুদের সহিত মিশে মদ্যপানের অভ্যাস করেছে। আমি তা জানতাম। আমার সাথে বাইরে এসে হোটেলে থাকার সময় মদ্যপানের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি হতে থাকে। আমাকে একটু আধটু পান করার অনুরোধ করতো। আপত্তি করে বললাম “না, বিশেষতঃ দেহের এই অবস্থায়।”
◆ বিনোদ বলে :- তোমার বাচ্চা ডেলিভারির এখনো অনেক দেরি কিন্তু তাই বলে আনন্দ ফুর্তি করবো না। আতুর ঘরে ডাক্তার বাবু “ভাইনাম গ্যালিসিয়া” ঔষধ দেয় কিন্তু উক্ত ঔষধ "এক্স নম্বর ওয়ান।” মদ।
◆ বিনোদ এর প্রতিদিন কয়েক প্যাক মদ চাই চাই। মদের গন্ধ আগে ভীষণ ভাবে খারাপ ও বিরক্ত বোধ হতে। মাঝে মাঝে বাবু কে বোতল থেকে মদ গ্লাসে ঢেলে দিয়ে পরিবেশন করতে বিনোদ বাধ্য করায়।
◆ বিনোদ আর মোবাইল ব্যবহার করে না, সেই কারণেই অবহেলা পড়ে থাকে। বার বার কল হওয়ার পর সুভাষিনী মাস্টার মহেন্দ্র এর নাম দেখে কল ধরে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র বলে :- বিনোদ যে কোম্পানিতে চাকরি করতো, সেই অফিস থেকে টাকা চুরির অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
◆ দুই- পরেশের বাবা অর্থাৎ তোমার মামা থানায় গিয়ে বিনোদ এর নামে তোর অপহরণের মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারী পরওয়ানা জারি হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ বিনোদ কে খোঁজ করছো। সাবধানে থাকবে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- মহেন্দ্র এর ফোন পাওয়ার পর ভয়ে আতঙ্কে আমার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে কিন্তু এখন কি করব? বিনোদ ঘরে নেই।
◆ বিনোদ সারাদিন পর সন্ধ্যার কিছু সময় পর অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য চোখ লাল হয়েছে, মাতাল হয়ে টলতে টলতে ঘরে ঢুকে পড়ে।
◆ সুভাষিনী কঠোর স্বরে বলে :- বিনোদ; তুমি বলেছিলে অফিস থেকে চার মাসের ছুটি নিয়ে ছিলে কিন্তু পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে।
◆ বিনোদ জড়ানো গলায় বলে :- সেই কৈফিয়ত তোকে দিতে হবে নাকি! তুই কি আমার অফিসের মালিক?
◆ সুভাষিনী বলে :- কৈফিয়ত কিন্তু আমাকে দিতে হবে না, তবে কারণ তো বলতে পারো।
◆ বিনোদ বলে :- আরো পাঁচ মাসের ছুটির জন্য দরখাস্ত জমা দিয়েছি কিন্তু এবার সন্দেহ মিটেছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বিনোদ; তোমাকে সন্দেহ করছি না কিন্তু টাকা তো সব শেষ গেছে, জোর এক সপ্তাহ চলবে। যদি তুমি এই মুহূর্তে কলকাতায় ফিরে না যাও তবে অত্যন্ত ছুটির মাসের বেতন গুলোর জন্য আবেদন করতে পারো।
◆ বিনোদ বলে :- সে চিন্তা তোমার করতে হবে না। সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই দাও তো।
◆ সুভাষিনী সিগারেট ও দেশলাই দিয়ে বলে :- দেখছো; তো আমার দেহের অবস্থা। এই অবস্থায় কোনো ভালো শহরে যেখানে ভালো ডাক্তার বা প্রসূতি হাসপাতাল আছে, এমন জায়গায় না থাকলে আমার ভীষণভাবে ভয় হচ্ছে। আবার টাকার দরকার সে ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করো।
◆ বিনোদ টলতে টলতে খাটিয়ার উপর শুয়ে পড়ে।
◆ সিগারেট টানতে টানতে বিনোদ বলে :- টাকার জন্য তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, লাখ টাকা তো খরচ করেই ফেললাম তারপর বমি করার জন্য ওয়াক ওয়াক করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী বলে :- লাখ টাকা কিভাবে পেয়েছো! আমি তা সব জানতে পেরেছি। চুরি করে আয় রোজগারের টাকার কিন্তু এক কানাকড়িও আমি চাই না।
◆ শুধু নারীর কাছে পুরুষত্ব দেখালে চলবে না, পুরুষ হিসাবে যদি তোমার ক্ষমতা থাকে, তাহলে সৎ পথে উপার্জন করে আমাকে দেখাও। চুরি জোচ্চুরির পথে গিয়ে নিজেকে ও আমাকে সর্বনাশ করোনা।
◆ বিনোদ নেশার ঘোরে বলে :- সুভাষিনী; তোমার জন্য আমি সর্ব ত্যাগী হয়েছি আর আজ তুমি আমাকে চোর বলছো কিন্তু তোমাকে সমাজের থেকে বাঁচানোর জন্য আমি চুরি করেছি। কার জন্য সংসার ও মূল্যবান চাকরি ছেড়ে বর্তমানে জেলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে দিয়েছি। তোমার আর কি! পেট ফেলে দিয়ে সমাজে গিয়ে আবার সতী সাবিত্রী নারী হয়ে যাবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- চুপচাপ থাকো, শান্তি বজায় থাকবে।
◆ বিনোদ বলে :- এই পৃথিবীতে আমার সুখ দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণা বোঝার কেউ নেই। আরে চোর না হলে কেউ কোনদিন প্রেমিক হতে পারে না।
◆ সুভাষিনী বলে :- চোরের মায়ের আবার বড় গলা। অনুতপ্ত না হয়ে তাই নিয়ে আবার গৌরববোধ করার কি আছে?
◆ বিনোদ বলে :- বৃন্দাবনে কৃষ্ণ চোর হয়ে শ্রীমতি রাধার বড় প্রেমিক কিন্তু আমি চুরি করে তোমার মন পেলাম না। আমি চোর আমি চোর আমি চোর বলে চিৎকার করতে থাকে।
তারপর পুনরায় বলে তাহলে তুমি সাধুসর্জন হয়ে থাকো আমি এই মুহূর্তে চললাম।
◆ বিনোদ উঠে টলতে টলতে জামা গায়ে দিয়ে জুতো পায়ে পড়ে চলতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী তাড়াহুড়ো করে বিনোদ এর সামনে দাঁড়িয়ে বিনোদকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে আসে।
◆ বিনোদের পা জড়িয়ে ধরে সুভাষিনী বলে :- বিনোদ; আমাকে ছেড়ে যেও না, আমার অপরাধ হয়েছে ক্ষমা করে দাও। আমাকে অথৈ সমুদ্রের মাঝে ভাসিয়ে দিও না বলে কান্নাকাটি শুরু করে।
◆ বিনোদ নেশার ঘরে সুভাষিনী কে কয়েক বার লাথি মারে আর সুভাষিনী ছিটকে দরজায় ধাক্কা খেয়ে মা বলে চিৎকার করে উঠে।
◆ ক্রেদিত হয়ে চিৎকার করে বিনোদ বলে :- চুপ কর শয়তান মহিলা, আমি তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। আমি কি তোর বিয়ে করা স্বামী, সব দায়িত্ব নিয়ে বসে আছি।
◆ সুভাষিনী বলে :- এমন কথা আর বলো না তোমার সন্তান আমার গর্ভে।
◆ বিনোদ বলে :- আমি চরিত্রহীন মাতাল আর তুই খুব সতী সাবিত্রী। মাস্টার মহেন্দ্র এর সাথে সম্পর্কের কথা আমি কি জানিনা?
◆ সুভাষিনী বলে :- তুমি কি আমার সন্তানের উপর দোষারোপ করতে চেয়েছো কিন্তু ধর্মে সইবে না।
◆ বিনোদ বলে :- তোমার ধর্ম জ্ঞান নিয়ে তুমি থাকো কিন্তু আমাকে চিরতরে মুক্তি দাও।
◆ বিনোদ লাফালাফি করতে করতে খাটিয়ার বেঁধে ঘরের মেঝের মধ্যে পড়ে গিয়ে খিস্তি খামারি দিতে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী আঘাতের জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করে বিনোদকে টানাটানি করে বিছানায় শুয়ে দিয়ে মাথায় জল দিতে শুরু করে। আর কিছু সময় পরেই বিনোদ বমি করে বিছানা ও ঘর ভাসিয়ে দেয় আর দেশি মদের দুর্গন্ধে ঘর ভরে ওঠে।
◆ সুভাষিনী বাইরে থেকে বালতিতে জল ভরে নিয়ে এসে, ঘর পরিষ্কার করে কিন্তু কাজের লোক গুলো কোন সাহায্য করে না। তারপর বিনোদ কে তাল পাখার মাধ্যমে বাতাস করতে থাকে। রাতে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে মানসিক উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় সারা রাত ধরে বিনোদ এর সেবা যত্ন করতে থাকে।
◆ পরের দিন সকাল দশটায় সময় বিনোদ ঘুম থেকে উঠে আর সুভাষিনী স্নান করিয়ে গরম দুধ সহ খাবার খেতে দেয়।
◆ সুভাষিনী ভাবে, ভালোবাসার প্রণয়ের নির্মল আকাশে ঘন মেঘের সঞ্চার হয়েছে। আমি বিনোদকে ভীষণভাবে বিশ্বাস করতাম কিন্তু আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কাজ করেছে। চরিত্রহীন লম্পট, অফিসের টাকা চোর, মিথ্যাবাদী ও বর্তমানে চরম মাতাল।
----------------------------------------------------------
।। পঞ্চবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ষষ্ঠবিংশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী এর সাথে বিনোদ এর নানা ধরনের বিষয় নিয়ে প্রায় দিন ঝগড়া অশান্তি হতে থাকে।
হাতে টাকা যা ছিল তা একে একে সব খরচ হয়ে যায়। মাস্টার মহেন্দ্র কে দারিদ্র্যের কথা জানাতে তিনি মানি অডার করে কয়েক হাজার টাকা দেয়। উক্ত টাকার সিংহভাগ টাকা বিনোদ মদ পান করে নষ্ট করে।
◆ সুভাষিনী বিছানায় শুয়ে ভাবে :- দুর্ভাগ্য যখন আসে তখন এমনি হয়। রান্নার ঠাকুর কে বেতন না দিতে পারার কারণে তিনি চলে গেলেন। আমি রান্না করতে পারি না বা কখনো শেখার চেষ্টা করিনি। তবুও দুই বেলা এখন আমাকে রান্না করতে হয়।
◆ সুভাষিনী অসুস্থ শরীর নিয়ে কাঠের আগুনের ধোয়া ও তাপে প্রাণ যায় যায় অবস্থা দেখেও না দেখার ভান করে বিনোদ বলে :- এই সব রান্না হয়েছে, খাওয়া যাচ্ছে না। বলে অশান্তি শুরু করে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- বিনোদকে মথুরায় কোন কাজের কথা বললাম কিন্তু আমার কথা কোন গ্রাহ্য করছে না। টাকার অভাবে শীতের দামি দামি পোশাক বিক্রি করে দিলাম। দারিদ্রতার কবলে পড়ে ক্রমে ক্রমে আমার গয়না গুলো বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করে সংসার চালানো ও বিনোদের মদের টাকা জোগান দিয়েছি।
আমার জন্মদিনে বিমাতার দেওয়া সোনার হাতটি আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম, তার অপরাধে আমার উপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন শুরু করলো। চড়, থাপ্পড়, কিল ও ঘুষি বর্তমান নিত্যদিনের পাওনা হয়ে উঠেছে।
◆ একদিন বিনোদ বাড়িতে এসে সুভাষিনী কে আদর করতে করতে বলে :- বৃন্দাবনে এক বিদ্যালয় মাস্টারের চাকরি পেয়েছি কিন্তু ভালো পোশাক আশাক নেই। পোশাক ও জুতা কেনার জন্য কিছু টাকা দরকার।
◆ সুভাষিনী লুকিয়ে রাখা হারটি বের করে বিনোদের হাতে দিয়ে বলে :- বন্ধক রেখে কিছু টাকা নিয়ে নাও তারপর বেতন পেলে আবার গয়না নিয়ে আসবে।
◆ বিনোদ হার নিয়ে আনন্দে পুলকিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহ চলে যায় তবুও পোশাক ও জুতা জোড়া আসেনা আবার বিনোদ তার চাকরিতে যায় না।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- এখন বুঝতে পারছি চাকরির কথা সব মিথ্যা কারণ চাকরির নাম করে আমার শেষ সম্বল মায়ের স্মৃতি সোনার হারটি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ছলাকলা ও তালবাহানা ছিল । এক সময় রাজ পালঙ্কে শয়ন করেছি আর বর্তমানে একটি খাটিয়ায় বিনোদ ব্যবহার করে, আমি তো রাতে ঘরের মেঝের উপর শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়।
◆ একদিন বিকেল বেলা দিনোদ কে কাছে পেয়ে সুভাষিনী বলে :- আজ মথুরা ও বৃন্দাবন ঝুলন উৎসব আরম্ভ হয়েছে চলো একবার দ্বারকেশ্বর মন্দির ঘুরে আসি।
◆ বিনোদ বলে :- আমার শরীরটা ভাল নেই বরং তুমি চাকর লক্ষণ কে নিয়ে যাও।
◆ বিনোদ কে ঘরে রেখে সুভাষিনী সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতো শাড়ি পড়ে কিন্তু আগের মত সাজগোজ করার টাকা না থাকার কারণে সাধারণ ভাবেই লক্ষণের সাথে ঝুলন দেখতে রওনা দেয়।
◆ ঝুলনের সময় মথুরা মন্দিরে মন্দিরে খুব আমোদ প্রমোদ হয়। দ্বারকাধীশ মন্দির সর্বাপেক্ষা বেশি ভিড় হয়ে থাকে।। স্বর্ণ-রৌপ্য-মণ্ডিত বৃহৎ সিংহাসনে ঠাকুর বসিয়ে দোলা দেওয়া হয়। সমস্ত মন্দির আলোক, পুষ্পপত্র, পতাকায় সুসজ্জিত হইয়া এক অপূর্ব শ্রী ধারণ করে। গায়কগণ সুললিত স্বরে ভজন গানে রত থাকেন। এই সকল দর্শন করলে নানা দুঃখ ও বিপদের মধ্যে শান্তির ভাব আসে।
◆ সুভাষিনী ঘুরতে ঘুরতে বৃন্দাবনের বিশ্রাম ঘাটের আরতি সহ আরও তিনটি মন্দিরে ঝুলন দেখে রাত প্রায় ৯ টার সময় ভাড়া করা বাসা বাড়িতে ফিরে আসে।
◆ লক্ষন কে বিদায় দিয়ে সুভাষিনী হাত পা ধুয়ে ঘরে গিয়ে দেখে, আলো জ্বলছে কিন্তু বিনোদ নেই।
◆ শোবার খাটিয়ার উপর একখানা চিঠি পড়ে আছে। চিঠি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে।
◆ সুভাষিনী; তোমার সাথে আর থাকা আর সম্ভব নয়। তুমি আমায় চোর, লম্পট, মাতাল বলে ঘৃণা করতে আরম্ভ করেছ। যেখানে ঘৃণা ও সন্দেহ, সেখানে ভালবাসার স্থান নাই।
◆ আমার অফিসে লাখ টাকা জমা করে দিলেই আমার চোর অপবাদ বুঝবে, তারপর তোমার মত আরো দশটা মেয়ে বের করলেও কিন্তু আমি সমাজের বুকে বুক ফুলিয়ে বেড়াতে পারবো। তোমার কিন্তু কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে সমাজের বুকে মাথা নত করে জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। সে কলকাতায় হোক আর বৃন্দাবনে হোক।
◆ মদ পান নিয়ে আমাকে বহুবার অপমান জনক ব্যবহার করেছো কিন্তু মদ পান করাতো বড়লোকের লক্ষণ। গরিব ও ধনী সবাই মদ পান করে তাতে সমাজের কি ক্ষতি হয়েছে?
◆ মাতাল ব্যক্তিরা তো দেশের সব থেকে বড় কর সেবক। মদ কিনে প্রতিদিন রাজকোষে টাকা বৃদ্ধি করছে।
◆ সুভাষিনী তুমি নিজের ভালো বুঝলে না কিন্তু এই জীবনে তোমার আর উদ্ধার নেই। দেখব তোমার নব জাগ্রত নীতিজ্ঞান তোমাকে কতদূর রক্ষা করে।
◆ আমি তোমাকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হলাম কিন্তু আমাকে খোঁজ করে না। কারণ পুলিশ আমার পিছু নিয়েছে। তুমি অবিলম্বে এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাও, না হলে কিন্তু বিপদে পড়তে হবে।
ইতি
বিনোদ
◆ সুভাষিনী আপন মনে বলে উঠে :- আমার মাথার উপর থেকে পর্বত প্রমাণ বোঝা নেমে গেল। জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না কিন্তু এবার জলের উপর নাক তুলে শ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারব। বিনোদ এর ব্যবহার আমার কাছে একদম অসহ্য হয়ে উঠেছে। আমার এই অবস্থা সত্ত্বেও তাকে দৈহিক মিলনে সঙ্গ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।
◆ আমি স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কিন্তু সত্যি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার পথ খুলে দিলেন।
◆ ◆ সুভাষিনী তার প্রেমিক বিনোদ কে হারিয়ে একলা বিছানায় শুয়ে অতীত ও বর্তমান নিয়ে ভাবতে শুরু করে :- কাম প্রবৃত্তির উত্তেজনায় মোহাচ্ছন্ন ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গৃহ পরিত্যাগ করে ছিলাম। শরীর-ধর্মের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে যে বয়সে নারীর যৌবন চাঞ্চল্য দেখা দেয়, তখন বিবাহ সংস্কারের দ্বারা ইহাকে সংযত করার ব্যবস্থা সমাজে আছে।
◆ ◆ বালক-বালিকাদেরকে সুশিক্ষায় নিয়ত এবং সর্বদা সৎ সঙ্গে রাখলে এই যৌবন চাঞ্চল্য অল্প বয়সে কিন্তু আসতে পারে না। আমাদের সমাজে বর্তমান সময়ে সুশিক্ষা ও সৎসঙ্গের ভীষণ ভাবে অভাব। তাহার ফলে তরুণ হৃদয়ে অকালে যৌবন সম্মেলনের উদ্দাম কামনা জাগ্রত হয়ে উঠে।
◆ ◆ আমি সুশিক্ষা ও সৎসঙ্গ কিছুই পাই নাই। স্কুলে শিক্ষার ফলে কাব্য, কবিতা, গল্প ও উপন্যাস প্রভৃতির তরল সাহিত্য পড়তে শিখেছি। তাহাতে আমার হৃদয়ে কল্পনার উত্তেজনায় দুস্প্রবৃত্তিই সকলের আগে মাথা তুলে উঠেছে। সৎ গ্রন্থ কখনো পড়ি নাই, যাহাতে সংযম শিক্ষা হয়। যেহেতু ধর্ম ভাবের উদয় হয় এমন কোন পুস্তক কেহ আমার হাতে দেয় নাই।
◆ ◆ আমোদ প্রমোদ যাহা ভোগ করেছি, তাহা সমস্তই অতি নিম্ন স্তরের। থিয়েটার, নাচ গান ও সিনেমার চিত্র কখনো হৃদয়ে সদ্ভাব জাগ্রত করে নাই। অল্প বয়স্কদের পক্ষে তাহা হইতে শিক্ষা লাভের চেষ্টা বিপদজনক।
◆ ◆ দুই একটি দাঁত উঠলে যদি শিশুকে মাছ খাইতে দেওয়া যায়, তবে সে যেমন গলায় কাঁটা বিঁধিয়া মৃত্যু মুখে পতিত হয়; থিয়েটার ও সিনেমা দেখে এবং নভেল পাঠ করে কিন্তু দেশের তরুণ তরুণীদের সেই মরণ দশা ঘটে চলেছে।
◆ ◆ আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই কথাগুলো বলছি। আমার মত যারা আছে তাদের ইহার সমর্থনে সাক্ষী দেবে।
◆ ◆ প্রবাদ বাক্য বলে," অল্প বিদ্যা কিন্তু ভয়ংকর"। আমি দুই ক্লাস লেখাপড়া শিখে নিজেকে বড় পন্ডিত ভাবতাম।
◆ ◆ তরুণ সাহিত্যিকদের গল্প উপন্যাস যথেষ্ট পড়েছি। বিশেষতঃ মাস্টার মহেন্দ্র এর অনুগ্রহে সেলী, বায়রণ, সেক্সপীয়ার, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিম, দীনবন্ধু, গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতির পুস্তক ও কিছু কিছু অধ্যয়ন করে ছিলাম। সুতরাং অহংকার যে আমাকে ফুলাইয়া তুলবে তাহাতে আর আশ্চর্য কি!
◆ ◆ যাহারা কেবল কল্পনাময় রাজ্যে বিচরণ করে, সংসারের কঠোর সত্য সম্বন্ধে তাহাদের কোন জ্ঞান জন্মে না। কবি ও সাহিত্যিকদের এই রকম ধরনের লোক। তাঁহারা শুধু চিন্তা নিয়ে খেলা করে, কর্মের ধার ঘেঁষে না।
◆ ◆ মাস্টার মহেন্দ্র এর শিক্ষায় আমার এই দশা হয়েছিল। কাব্য, কবিতা, নাটক ও উপন্যাস মধ্য দিয়ে সংসারকে কল্পনার চক্ষে যেমন বর্ণনা করে দেখিয়েছেন, প্রকৃতি কর্মক্ষেত্রে আসার পর দেখলাম সে সমস্ত মিথ্যা।
◆ ◆ আমি ১৮ বছর বয়সের সময় গৃহত্যাগ করি। এই বয়সে যদি আমি আমাকে নিঃসহায় ও বুদ্ধিহীনা মনে করিতাম, যদি ভাবিতাম যে আমি তো সংসারের কিছুই জানিনা, যদি পদে পদে ভয় হত, তবে আমি কখনো এমন ভাবে বাহির হতে পারতাম না। কিন্তু একটা মিথ্যা গর্ব আমাকে দুঃসাহসী ও দূরদৃষ্টিহীন করিয়া তুলিল।
◆ ◆ আজ মনে হয়, আমি যদি উপযুক্ত অভিভাবকের অধীন থাকতাম, তবে আমার ভালো হতো। স্বাধীনতার মধ্যে যে পরাধীনতার প্রয়োজন আছে, তাহা এখন বুঝতে পারছি।
◆ ◆ ভেবে ছিলাম, ঘরের বাহির হলে বুঝি সকল বাধা দূর হয়ে যাবে আর প্রবৃত্তির ভোগ একেবারে পূর্ণমাত্রায় চালাতে পারব।
◆ ◆ বিনোদ এর মিথ্যা কথা গুলো বেদ বাক্য মনে করে বিশ্বাস করে ছিলাম। কারণ ভোগলালসা যার সৃষ্টি, সেই শয়তান সমস্ত ভুলিয়ে রাখে। সুখের স্বপ্নে বিভোর গন্ধর্ব দম্পতি অথবা কিন্নর মিথুনের মত আকাশের মধ্য দিয়ে চলছে কিন্তু মাটিতে তার পা পড়ে না।
◆ ◆ বর্তমান আধুনিক সভ্যতার আধুনিক প্রযুক্তির স্মার্ট মোবাইল কিন্তু যুব সমাজকে আরো অধঃপতনে নিয়ে গিয়েছে। আমার কাম প্রবৃত্তির একমাত্র দায়ী কাম বিষয়ক উত্তেজনা পূর্ণ নর-নারীর মিলনের ভিডিও গুলো।
----------------------------------------------------------
।। ষষ্ঠবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। সপ্তবিংশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী এর চোখে ঘুম আসছে। গভীর রাতে মনে নানা রকমের দুশ্চিন্তা করতে থাকে। এই মুহূর্তে কি করা উচিত! কোথায় যাবে?
সারারাত ঘুম আসলে না, সকালে বিছানা ছেড়ে ঘরের চারদিকে তাকিয়ে বিনোদের অভাব বোধ করে বিনোদের সাথে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে করতে মনে দুঃখ আসে।
◆ কাজের ছেলে লক্ষণ চা নিয়ে ঘরে আসে।
◆ সুভাষিনী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে :- লক্ষণ; আমি বৃন্দাবনে চলে যাবো, যাওয়ার জন্য একটি গাড়ি ঠিক করে দাও।
◆ সুভাষিনী এর হাতে দুই গাছা সোনার চুড়ি ও কানের এক জোড়া দুল অবশিষ্ট ছিল। সমস্ত গয়না বিক্রি করে কাজের ছেলে লক্ষণের বাকি থাকা তিন মাসের বেতন দিয়ে দেয়। তারপর নিজের হাতে কিছু টাকা থাকে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র এর ফোন নম্বরে সুভাষিনী কল করে জানতে পারে, উক্ত নম্বরের কোন অস্তিত্ব নেই।
◆ সুভাষিনী ভাবে, তাহলে সিম কার্ড পরিবর্তন করেছে কিন্তু আমার সাথে কোন যোগাযোগ করলে না। এই মহা বিপদের সময় সবাই পাশ থেকে সরে গেল।
◆ সুভাষিনী বিধবার বেশ ধারণ করে বৃন্দাবন গিয়ে সেবা কুঞ্জন নিকটে একখানা কম দামে ছোট ঘর ভাড়া নেয়। আশেপাশে আরো অনেক বিধবা বাঙালি বয়স্ক মহিলারা বসবাস করে।
◆ বয়স্ক মহিলাদের প্রশ্নের উত্তরে সুভাষিনী কাঁদে কাঁদে ভাব নিয়ে ছলছল চোখে বলে :- মথুরা বাস করার সময় আমার স্বামীর এক পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটেছে। পেটে সন্তান ধারণ করে অকালে বিধবা হয়ে দুঃখের সাগরে ভেসে চলেছি।
◆ সুভাষিনী এক মাস থাকার পর কেশীঘাট এর নিকট এসে ফুটপাতে ভাঙ্গা চোরা এক ঘরে বাস করতে থাকে। টাকা পয়সা যা ছিল তা সব শেষ হয়ে গেছে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- দশ দিনের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শরীর ভীষণ ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে । অনাহারে দিন কাটচ্ছে কিন্তু রাস্তায় বসে ভিক্ষা করতে পারলে কিন্তু খাবারের অভাব হয় না। আমি নিজেই হাঁটা চলা করতে পারছি না, ভিক্ষা করব কি করে?
◆ সুভাষিনী দুই দিন কিছু না খেয়ে আরো দুর্বল শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বংশীবটের রাস্তার ধারে শুয়ে পড়ে ভাবতে থাকে, এত যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না এর থেকে মৃত্যু হলে বেঁচে যায়।
◆◆ সুভাষিনী মনে মনে বলে :- হে ব্রজেশ্বরী রাধা হে করুণাময় কৃষ্ণ; তোমাদের কোন দিন ভক্তি শ্রদ্ধা করিনি কিন্তু মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছি, না হয় মৃত্যু দাও-না হয় বাঁচার পথ দেখাও প্রভু।
◆ অর্ধ মৃত্যু অবস্থায় অল্প বয়সের বিধবা সুভাষিনী দেখে একজন বাঙালি ভদ্রলোক দয়া দেখিয়ে বলেন :- মা; তোমার কোন আশ্রয় নেই।
◆ সুভাষিনী আস্ত আস্ত বলে :- বাবা ; রোগগ্রস্ত ও অকালে বিধবা হয়ে আশ্রায়হীন ভাবে অনাহারে এখানে পড়ে আছি।
◆ বাঙালি ভদ্রলোক দয়া করে সুভাষিনী কে গাড়িতে তুলে তার গুরুদেবের আশ্রমে নিয়ে আসে।
◆ মোহন্ত শ্রী অনন্ত দাস বাবাজি মহারাজ এর বিশাল বড় আশ্রম। পাকা রাস্তা থেকে শুরু করে যমুনার তীর পর্যন্ত। শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ সহ পঞ্চতত্ত্ব ( শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রী শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু, শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভু, শ্রী গদাধর ও শ্রীবাস এই নিয়ে পঞ্চতত্ত্ব ) বিগ্রহের প্রতিদিন সেবা হয়ে থাকে।
◆ বহু শিষ্য বিভিন্ন সেবা কাজ করে চলেছে। আশ্রমের মোহন্ত মহারাজ জন্মসূত্রে ভারতীয় বাঙালি ও ৭০ বছরের একজন বয়স্ক ব্যক্তি। শোনা যায় তিনি নাকি সাধনায় সিদ্ধি প্রাপ্ত ত্রিকাল দস্যি সাধু বাবা।
◆ বাঙালি ভদ্রলোক সুভাষিনী কে নিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করে মোহন্ত মহারাজের সামনে নিয়ে আসে।
◆ মোহন্ত মহারাজ এক পলক সুভাষিনী কে দেখে চিন্তিত হয়ে বাঙালি ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য করে বলেন :- একে নিয়ে এসেছ কেন? এ যে অন্তঃসত্ত্বা। কোন দুষ্ট লোকের প্ররোচনায় বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, বর্তমানে সেই লোকটি ত্যাগ চলে গেছে। এর অনেক কষ্ট ভোগ আছে। আচ্ছা, কিঞ্চিৎ ঠাকুরের প্রসাদ একে দাও। বলে চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী কিছুটা সুস্থ হলে একদিন মোহন্ত মহারাজ উপস্থিত হয়ে বলেন :- মা; এই আশ্রম প্রাঙ্গণে মহিলাদের থাকার কোন নিয়ম নেই। বিশেষ করে তুমি গর্ভবতী মহিলা কিন্তু সম্মুখে তোমার অনেক বিপদ। তুমি এখন কি করবে বল?
◆ সুভাষিনী মোহন্ত মহারাজের পা জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে :- বাবাজী; আমি মহাপাপী, আমায় উদ্ধার করুন। আপনি তো মনের কথা সবই জানেন।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- তোমার মনের কথা তুমি যা, না জানো কিন্তু আমি তা জানি। তোমার এই অনুতাপ ক্ষণস্থায়ী ও অপ্রকৃতস্থ । কামপ্রবৃত্তি একবার হৃদয়ের মধ্যে শিকড় গজে উঠে, তার আর রক্ষা নাই। দুঃখ-দারিদ্র্য, রোগ শোকে, সাময়িক বিচার-বুদ্ধিতে সেই পাপ বৃক্ষকে মাঝে মাঝে ছেদন করিয়া দেয়; কিন্তু আবার অনুকূল অবস্থায় নূতন অঙ্কুর জন্মে। একমাত্র ঈশ্বরের কৃপা ব্যতীত এই প্রলোভন কে কিন্তু স্থায়ীরূপে জয় করা যায় না। ইহার জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।
◆ সুভাষিনী চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলে :-
বাবাজী; আমার অপরাধ ক্ষমা করে আপনার পায়ে আশ্রয় দিন।
◆ মোহন্ত মহারাজ স্নেহপূর্ণ স্বরে বলেন :- মা; তুমি অন্ন বস্ত্র ও বাসস্থানের দয়া কিন্তু অনেক পাবে। ঈশ্বরের সংসারে সেই দয়ার অভাব নেই। তোমাকে বর্তমানে যে ব্যাধিতে আক্রমণ করেছে, সে দারিদ্র্য নয়-সে তোমার দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি।
◆ সেই ব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশ্রয় তো তুমি চাওনা, তোমার প্রার্থনা হচ্ছে অন্ন বস্ত্র ও বাসগৃহ। আচ্ছা, মা; তুমি ঘরে ফিরে যাবে?
◆ মোহন্ত মহারাজ তার এক শিষ্য ছেলে কে বলেন :- আশ্রমের পাশের বাগানে রামকৃষ্ণ তার স্ত্রী ও ছোট দুটি ছেলে নিয়ে আছে। তাদের সঙ্গে এই স্ত্রীলোকটি থাকবে। সব ঠিক করে দাও।
◆ সুভাষিনী তার বাবার নাম ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দেয়।
◆ মোহন্ত মহারাজ সুভাষিনী এর দিকে তাকিয়ে বলেন :- মা; তোমার পিতা তোমায় পুনরায় গ্রহণ করবেন বলে, আমার মনে হয় না। তাকে তো সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে। পাপ ও প্রলোভনের বশীভূত হওয়া একটা আধ্যাত্মিক ব্যাধি। প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা শুদ্ধ না হলে কিন্তু চিত্ত কিছুতেই ঈশ্বর অভিমুখী হতে পারেনা।
◆ রামকৃষ্ণের পরিবারের সাথে সুভাষিনী আশ্রমের বাগানে বাস করতে থাকে।
◆ রামকৃষ্ণ বাগানের তত্ত্বাবধান করে। প্রত্যহ গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা, তিনটি গাভী ও কয়েকটি বাছুরকে খৈল, ভূষি, খাওয়ানো, বাগানে জল দেওয়া, ঠাকুরের ভোগ রান্না করার বাসনাদি মাজা পরিষ্কার করা ও সাধুদের ভোজন হয়ে গেলে সেই স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- মোহন্ত মহারাজ নির্দেশ অনুসারে, নাপিত এসে আমার মাথার চুল কেটে ছোট করে দেয়। নিজের আহারের জন্য চরকা চাকি এর মধ্যে গম ফেলে লাঠি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গম পেশায় করে আটা তৈরির কাজ মোহন্ত মহারাজ দিয়েছেন। আমি প্রতিদিনের কর্তব্য কাজ মনে করে মেনে নিয়ে আনন্দে কাজ করে চলেছি। কিন্তু আমার বড় পরিশ্রম বোধ হয়।
◆ কেবলমাত্র প্রভাতে মঙ্গল আরতির সময় আমি মন্দির প্রাঙ্গণে যাবার অনুমতি পেয়েছি। মোহান্ত মহারাজ জী বাগানে আসলে প্রয়োজন মত আমার সহিত কথাবার্তা বলেন।
◆ কয়েক দিন পর রাতের দিকে মোহন্ত মহারাজ তার মোবাইল থেকে উকিল শশীকান্ত মহাশয় কে ফোন করে।
◆ উকিল শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- কে বলেছেন।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- আমি বৃন্দাবন আশ্রম থেকে অনন্ত দাস বলছি, দয়া করে আমার কথাগুলো শুনুন।
◆ উকিল শশীকান্ত মহাশয় বলেন :- বলুন, মহারাজ।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- সুভাষিনী এর বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ বলতে থাকে। কিছু সময় কথাবার্তা বলার পর ফোন কেটে দেয়।
◆ প্রভাতে মঙ্গল আরতি সহ কীর্তনাদি হয়ে যাওয়ার পর মোহন্ত মহারাজ সুভাষিনী কে বলেন :- তোমার বাবা জানিয়ে দিয়েছে, সমাজের মান সম্মান নষ্ট করা ও কুল নাশকারী মেয়ে কে গ্রহণ করতে পারবে না। এমন কন্যাকে তিনি মৃত্যুর ন্যায় জ্ঞান করেন।
◆ কয়েক মাস পর সুভাষিনী বাগানের মধ্যে রৌদ্রের বসে গোবরের ঘুঁটে দেওয়ার কাজ করছে আর রামকৃষ্ণ বাগান পরিচর্যা করছে। হঠাৎ মোহন্ত মহারাজ বাগানে পরিদর্শন করতে আসে।
◆ রামকৃষ্ণ তার গুরু মোহন্ত মহারাজের উদ্দেশ্য করে বলে :- গুরু মহারাজ; এ যে পোয়াতি মেয়ে, এত খাটুনিতে পেটের ছেলেটার কোন কিছু না হয়।
◆ মোহন্ত মহারাজ জী বলেন :- পেটের ছেলে কি আর বেঁচে আছে! এখন কোন রূপে প্রসব হয়ে গেলে ভাল। এইটুকু পরিশ্রম না করলে কিন্তু শরীর খারাপ হয়ে যাবে যে।
◆ রামকৃষ্ণ আশ্চর্য হয়ে মোহন্ত মহারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
◆ মোহন্ত মহারাজ জী বলেন :- মেয়েটার দেহে কুৎসিত ব্যাধি প্রবেশ করেছে। প্রবৃত্তির উত্তেজনায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধি ভুলে গিয়ে দেহের উপর অত্যাচার করেছে ।
◆ সুভাষিনী যথা সময়ে একটি মৃত পুত্র প্রসব করে। রামকৃষ্ণের স্ত্রী সেবা শুশ্রূষা করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- এই সরল প্রকৃতি অশিক্ষিতা কৃষক রমণী মাতৃসম স্নেহের কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে । সন্তান প্রসবের পর আমার নানা রোগ দেখা দিল। কিছু খেতে পারতাম না। সন্ধ্যার সময় অল্প জ্বর আসে। সঙ্গে সঙ্গে পেটের অসুখ। আমি একেবারেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়লাম।
◆ মোহান্ত মহারাজ জি যথাসম্ভব আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। প্রায় চার মাস ভুগিয়া আমি কিঞ্চিৎ সুস্থ হই।
◆ সুভাষিনী একদিন মঙ্গল আরতির পর মোহন্ত মহারাজ কে বলে :- আমি দীক্ষা গ্রহণ করতে চাই।
◆ মোহন্ত মহারাজ জী বলেন :- “মা, আমি বিধির বিধান দৈব কে অতিক্রম করতে পারিনা। দীক্ষা নেবার তোমার এখনও সময় হয় নাই।
◆ সুভাষিনী এক বছর ধরে মোহন্ত মহারাজের তত্ত্বাবধানে আশ্রমের বাগান বাড়িতে বসবাস করে চলেছে। প্রবাদ বাক্য বলে, সুখে থাকতে ভুতে কিলায়।
----------------------------------------------------------
।। সপ্তবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। অষ্টাবিংশ অধ্যায় ।।
।। আশ্রমের মোহন্ত এর ব্যভিচার ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী কে ত্যাগ করে বিনোদ বৃন্দাবনে নতুন মাতাল বন্ধুদের সাথে বাস করতে থাকে। দিনের বেলায় বাইরে বের হয় না, বিশেষ কাজ থাকলে রাতে বের হয়।
◆ একদিন রাতে মদ পান করতে করতে বিভিন্ন আশ্রমের মোহন্ত মহারাজের নিয়ে ভাল মন্দ আলোচনা শুরু হয়।
◆ লাল সাধুর বেশধারী বিনোদ তার মতো বন্ধুদের বলে :- শয়তান মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি মহারাজের গল্প আমি বলবো। সতী সাবিত্রী কংসাবতী কে ধর্ষণ করার পর পতিতা হতে বাধ্য হয়।
◆ বিখ্যাত তীর্থ হুগলি জেলার তারকেশ্বর ধাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে ভঞ্জিপুর গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক গোস্বামী। তার মেয়ে কংসাবতী। কার্তিক গোস্বামী এলাকার পার্শ্ববর্তী জাদুর গ্রামের মধ্যে ডাক্তার খানা ছিল। এই গ্রামে কংসাবতী এর মামা বাড়ি।
◆ সমাজ ব্যবস্থার নিয়ম অনুসারে কংসাবতী এর অল্প বয়সের সময় ত্রিবেণীর নিকট পোলবা গ্রামের রজনীকান্ত ঘোষাল নামক এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর স্বামীর সঙ্গে বেশি দিন সংসার করতে পারে না।
◆ যৌবনের প্রারম্ভে বিধবা হয়ে বাবার কাছে ফিরে আসে। কখনো মামা বাড়ি আবার কখনো বাবা মায়ের কাছে থাকে।
◆ ভঞ্জিপুর গ্রামে তারকেশ্বর এলাকার স্বনামধন্য মোহান্ত সতীশচন্দ্র গিরি। এই ভঞ্জিপুর গ্রামের সরল সোজা কেদার গাঙ্গুলি নামক এক ব্যক্তির বাড়ি ছল চাতুরী ও ষড়যন্ত্র করে দশ জন কে ডেকে নিলামে তুলে খরিদ করে নেয়, মোহান্ত সতীশচন্দ্র গিরি। তারপর বড় বড় অক্ষরে সাইনবোর্ড লিখে আশ্রম বানিয়ে দেয়।
◆ মোহান্ত সতীশচন্দ্র গিরি একজন মহিলা হরিমতী নামক রক্ষিতাকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে।
কার্তিক গোস্বামীর বাড়ি থেকে পাঁচটি বাড়ির পর মোহন্ত সতীশচন্দ্র গিরি এর আশ্রম বাড়ি।
◆ রক্ষিতা হরিমতী কে পাড়ার লোকে রাণী বলে ডাকে কারণ ৩৫ বছর বয়সে তার দেহ গঠন রূপ মাধুর্য ধরে রেখেছে আর তিনি রাজরানীর মতো সাজগোজ করে ঘুরে বেড়ায় ।
◆ আশ্রম বাড়ির রক্ষিতা হলোও কিন্তু খুব দাপটে চলছে। গ্রামের ছোট বড় সকল শ্রেণীর নারী-পুরুষ হরিমতী এর আশ্রম বাড়ির প্রাঙ্গণে আসা যাওয়া করতে থাকে।
◆ হরিমতী কে কংসাবতী পিসিমা বলে ডাকে এবং গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের মতো আশ্রম বাড়িতে কংসাবতী যাতায়াত ছিল।
◆ নবযৌবনের কংসাবতী এর অসাধারণ সুন্দর রূপ মাধুর্যের ছটায় বহু পুরুষের নজর লাগে। দৈহিক সম্পর্ক গড়ার জন্য বহু পুরুষ কত না, ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির প্রস্তাব দেয় কিন্তু সকল পুরুষের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে অকাল বিধবা কংসাবতী মনের আগুন মনে রাখে।
◆ একদিন সন্ধ্যার সময় কংসাবতী আশ্রম বাড়ির জল কলে পা ধোয়ার জন্য উপস্থিত হয়।
◆ সেই মুহূর্তে মোহন্ত সতীশ চন্দ্র উপস্থিত হয়ে কংসাবতী কে দেখে তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
◆ কংসাবতী লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি পা ধুয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে চলে আসে ।
◆ কিছু সময় পর মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি মহারাজ হরিমতি এর মাধ্যমে কংসাবতী কে তার রুমে ডেকে তার পরিচয় জানতে চাই।
◆ কংসাবতী ভয়ে ভয়ে তার নাম পিতার নাম বিস্তারিত বলে।
◆ তারপর মোহান্তজি বলে :- চলো সবাই আরতির সময় হয়ে গিয়েছে।
◆ এক সপ্তাহ পর দুপুর ২ টার সময় হরিমতি হাঁটতে হাঁটতে কংসাবতী বাড়ি আসে এবং সাথে করে আশ্রম বাড়িতে উপস্থিত হয়। হরিমতি এর ঘরে বসে দুজনে আনন্দ করে লুডু খেলতে থাকে।
◆ হঠাৎ ধুমকেতুর মতো মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি রুমে ঢুকে পড়ে। কংসাবতী উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়ায় আর সেই মুহূর্তে মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি ধর্ম জ্ঞান হারিয়ে কংসাবতী এর হাত চেপে ধরে।
◆ কংসাবতী ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে পিসি পিসি বলে ডাকতে থাকে কিন্তু হরিমতি হাসতে হাসতে ঘর থেকে বাইরে চলে যাই।
◆ মোহন্ত সতীশ কে কংসাবতী জোরে ধাক্কা দিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু দরজার কাছে এসে থমকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কারণ বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ।
◆ হরিমতি অন্য গোপন দরজা দিয়ে ঘরে এসে কংসাবতী কে চড় থাপ্পর মারতে মারতে টেনে হিঁচড়ে তার কাপড় চোপড় ছিঁড়তে থাকে।
◆ আর কংসাবতী তার দেহের লজ্জা নিবারণ ও ইজ্জত (গোপন অঙ্গ) বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
◆ কংসাবতী কে মারতে মারতে বিছানায় শুয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখে মোহন্ত সতীশ কে ধর্ষণে সাহায্য করতে থাকে। দুজনের বাহুবলের সাথে কংসাবতী পেরে না ওঠার কারণে ধর্ষিতা হয়ে যায়।
◆ মোহন্ত সতীশ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হরিমতি সান্তনার বাণী দিয়ে কংসাবতী কে বিছানায় বসিয়ে বলে :- মহন্তের অযাচিত ভালবাসা পাওয়া তোর মতো বিধবার সাত জন্মের সৌভাগ্যের কথা।
◆ কংসাবতী কে হরিমতী বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতে থাকে। সাধুর বিরুদ্ধে নালিশ করলে কিন্তু সমাজের মানুষ বিশ্বাস করবে না বরং নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা হবে। লোকে বলবে, তুই অল্প বয়সের বিধবা তোর কামের চাহিদা আছে কিন্তু সাধুবাবার কোন চাহিদা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবে বুঝতে থাকে।
◆ এরপর মাঝে মাঝে হরিমতি বাড়িতে এসে কংসাবতী কে আশ্রম বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মহন্তের যৌবনের উন্মাদনার ভোগ লাগাতে থাকে।
◆ মোহন্ত সতীশ তার কাম লালসার লিপ্ত হয়ে অনেক কিছু প্রতিশ্রুতি কংসাবতী কে দিতে থাকে কিন্তু বাস্তবে একটি শাড়ি ছাড়া আর কিছুই তার ভাগ্যে জোটেনি । কিছু বললে প্রতারণা করতে শুরু করে।
◆ এই মহন্ত সতীশ কখনোই একটি নারীকে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না তার নতুন নতুন নারী চাই।
◆ হরিমতি বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে মোহন্ত সতীশ এর দালালি করে মেয়েদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে শয্যাসায়ী করে তোলে।
◆ একদিন কংসাবতী কে বিভিন্নভাবে কলঙ্ক লাগিয়ে আশ্রম বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
◆ সমাজের প্রভাবশালী মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরির অন্যায় অত্যাচার কংসাবতী বাবা মা, আত্মীয়-স্বজন সহ প্রতিবেশীরা ভয়ে আতঙ্কে চুপ হয়ে থাকে।
◆ মোহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি সমাজের কিছু লোক কে এমন ভাবে বোঝালো, কংসাবতী তার দীর্ঘদিনের সন্ন্যাস ধর্ম নষ্ট করে দিয়েছে।
◆ কংসাবতী এই অপমানজনক ঘটনার পর একদিন রাতে নিরুদ্দেশ হয়ে পড়ে। আর জীবিকা নির্বাহের জন্য নতুন জায়গায় গিয়ে সৎভাবে থেকে আয় রোজগার করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
◆ অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক সময় বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পুরুষের সাথে দৈহিক সঙ্গ দিতে শুরু করে।
◆ বিনোদ বলে :- বন্ধু; আমি কংসাবতী এর রূপ লাবণ্য উপভোগ করেছি। আমি লম্পট চরিত্রহীন পাপী কিন্তু যেসব ব্যক্তি ধর্মের ধারক বাহক হয়ে এরকম পাপ কাজে লিপ্ত হয়ে আছে তাদের শাস্তি কবে হবে।
◆ এইসব ভন্ড সাধুরা নারীদের বলপূর্বক সর্বনাশ করার কারণে কিন্তু একজন নারী তার আত্মীয়-স্বজন বাবা-মার ভালোবাসা থেকে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। একদিন বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করে থাকে।
◆ এই নর রাক্ষস এর অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়েও মানুষ তাদের আবার তীর্থ গুরুর আসনে বসিয়ে পূজা করছে। এই ভেবে আমার আপাদমস্তক জ্বলিয়া উঠে। মনে হয় গুলি করে মেরে দেয়।
◆ মোহান্ত সতীশচন্দ্র গিরি মহারাজের নানাপ্রকার
অত্যাচারের কথা লোকমুখে প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
ধীরে ধীরে আন্দোলনের রূপ নেয়।
মোহন্ত কে আশ্রম থেকে বহিষ্কার করার জন্য হুগলি জজ কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়।
◆ কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মোহন্ত এর বিভিন্ন নারীদের ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের ভারতীয় বিচারকগণ ধর্ষণের সাজা থেকে মুক্তি দিয়ে দেয়। তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও আশ্রমের মোহন্ত পথ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
সাধু সন্ন্যাসী বলেই কি ধর্ষণের মামলা থেকে মুক্ত হয়ে গেল, না সাধুর ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভয়ে বিচারক অন্যায় কাজ কে শিকার করে নেয়।
◆ জানা যায় আইনের ফাঁকে মোহান্তজিকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন ধর্ষণ করার সময় কেউ কি দেখেছে কিন্তু ধর্ষণকারী বলবে কেউ ছিলনা। মোহন্ত সতীশ এর রক্ষিতা হরিমতি কখনোই মোহন্তের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে না।
◆ দীর্ঘদিন পর কংসাবতী প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নতুন রূপে সেজেগুজে এক রাতে মোহন্ত এর নতুন বাড়িতে আসে। প্রথমে হরিমতি কে মৃত্যুর কোলে শুয়ে দেয় তারপর ৭০ বছরের মহন্ত সতীশ চন্দ্র গিরি এর ঘরে গিয়ে তাকে নৃশংস ভাবে খুন করে।
তারপর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। জলন্ত আগুনের মধ্যে কংসাবতী ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।
◆ বিনোদের বন্ধুরা বলে :- সত্যিই মর্মান্তিক ঘটনা। বাংলার সমাজের অন্তরালে চোরা স্রোতের মতো গুরু, গোসাই, সাধু ও সন্ন্যাসী অপরাধ করে চলেছে।
◆ বিনোদ বলে :- সঠিক ভাবে ধর্মের নিয়ম মেনে সাধু সন্ন্যাসীর সংখ্যা খুব কম।
----------------------------------------------------------
।। অষ্টাবিংশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ঊনত্রিশ অধ্যায় ।।
।। বিনোদ কলকাতায় ও সত্য উদঘাটন ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদ বৃন্দাবন থেকে চুপিচুপি কলকাতায় ফিরে আসে। কলকাতায় আসার পর পুরানো কিছু বন্ধুদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে কিন্তু সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়।
◆ রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে একসময় লীলাবতীর সাথে দেখা হয়। কিন্তু লীলাবতী কোন কথা না বলে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত বেগে চলতে শুরু করে।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র কলকাতা শহরের পুরনো বাড়ি পরিবর্তন করে নতুন জায়গায় চলে গেছে, কিন্তু কেউ ঠিকানা বলতে পারে না।
◆ সুভাষিনীর বান্ধবী জয়ন্তীর ছোট ভাইয়ের কাছে থেকে বিনোদ জানতে পায়, দীর্ঘদিন ধরে জয়ন্তী নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয় কে পুরানো দিনের ছাত্রাবাসে গিয়ে ও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে করতে কয়েক দিন পর মদন মোহন নামে একজন বন্ধুর কাছে থেকে ধনঞ্জয়ের ফোন নাম্বার জানতে পায়, তারপর উক্ত বন্ধুর মোবাইল থেকে বন্ধু ধনঞ্জয়ের সাথে কথা হয়।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয় আনন্দিত হয়ে বাসার ঠিকানা দিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলে।
◆ বিনোদ পাতাল রেল থেকে নজরুল স্টেশন নেমে তারপর বাস ধরে প্রায় ত্রিশ মিনিট যাওয়ার পর নেমে পড়ে, চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে প্রধান সড়ক ছেড়ে দিয়ে বাম পাশের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটি গলি পথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। এদিকে এখনো তেমন ঘন জনবসতি গড়ে ওঠেনি।
◆ চলতে চলতে রাস্তার মাঝে বন্ধু ধনঞ্জয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতে করতে কুশল বিনিময় হয়।
◆ তারপর পর ধনঞ্জয় চলতে চলতে বলে :- বিনোদ; তুই আসা মানেই আমার শক্তি বৃদ্ধি হয়ে গেছে। দুজনে মিলে আবার মদ মাতাল চরিত্রহীন হয়ে বিভিন্ন সুন্দরীদের কাম রসে ভিজে যাবে।
◆ বিনোদ হাসতে হাসতে বলে :- বন্ধু; শরীর নামক একটি যন্ত্র কিন্তু তাকে কিছুদিন বিশ্রাম দিতে চায়, কারণ সুভাষিনী কিন্তু আমার শরীরের সব রস নিংড়ে নিয়েছে।
◆ দুই বন্ধু হাসি হাসি করে আনন্দে রংগরস করতে করতে বাসায় আসে।
◆ বিনোদ বলে :- তা, এই বন্য পরিবেশে কত দিন আসা হয়েছে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- তুই, পালিয়ে যাওয়ার দুই মাস পর শেষ সম্বল মা মারা যায় । তারপর কয়েক মাস পর এই বাড়ির সন্ধান পায়, দেশের কাকা বাবু কে বলে এই বাড়ি কিনে নেয়। কাজের জন্য একজন
বয়স্ক মাসি আছেন কিন্তু তিন কুলে তার কেউ নেই।
◆ বিনোদ বলে :- বাসা ভাড়া থেকে ভালো হয়েছে। নিজের স্বাধীন মতো চলে কিন্তু কেউ কিছু বলার নেই।
◆ মাসিমা প্লেটে করে দুজনের জন্য বিকেলের জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢোকে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- মাসি; আমার সেই বিনোদ বন্ধু।
◆ রাত আটটার সময় দুই বন্ধু মদ পান করতে করতে ধনঞ্জয় বলে :- তোর; ভারত ভ্রমণ কাহিনী বলনি না তো! আর সুভাষিনী কে কী গতি করলি?
◆ সুভাষিনী এর সাথে ভ্রমণ করে কাটানো দিনগুলোর গল্প বিনোদ বলতে শুরু করে।
◆ গল্প শোনার পর ধনঞ্জয় বলে :- অফিস থেকে লাখ টাকা চুরির ঘটনা কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি যতদূর জানি তোর অফিসের কাজের মধ্যে কিন্তু টাকা পয়সা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কোন গল্প ছিল না।
◆ বিনোদ বলে :- মাস্টার মহেন্দ্র ফোন করে সুভাষিনী কে জানাই, অফিস থেকে লাখ টাকা চুরির কল্প কাহিনী। কারণ আশালতা নামে একজন যুবতীকে মহেন্দ্র একতরফা ভালোবাসা নিবেদন করেছিল কিন্তু আশালতা প্রত্যাখ্যান করে।
◆ পরবর্তীতে আমার সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আরো আরেকটি ঘটনা হলো, সুভাষিনীর সাথে দৈহিক ভাবে মেলামেশা করতে।
◆ আমি উকিল বাড়িতে আসার পর সুভাষিনীর সাথে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়।
◆ দুটি কারণে মহেন্দ্র আমার উপর ভীষণ ভাবে রাগ করে কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলে।
◆ সুযোগ বুঝে চুরির অপবাদ দিয়ে সুভাষিনীর মনে বিষ ঢেলে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়। তাহলে দুই জনের উপর প্রতিশোধ নেওয়া হলো।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- তাহলে, বাইরে গিয়ে রাজসিক ভাবে চলাফেরা খাওয়া দাওয়া ও থাকা, কিন্তু টাকা কোথায় পেলি?
◆ বিনোদ বলে :- পিসিমা; মৃত্যু সজ্জায় থাকাকালীন তার সঞ্চিত সম্পদ এক লাখ টাকার উর্দ্দে আমাকে দিয়ে যায়। ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম উক্ত টাকা তুলে সুভাষিনী কে নিয়ে পালিয়ে যায়।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- সুভাষিনীর মামা; কি তোর নামে অপহরণ মামলা দায়ের করেছেন ?
◆ বিনোদ বলে :- না, মহেন্দ্র খলনায়ক হয়ে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে কিন্তু আমাদের বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করেছে।
◆ শশাঙ্ক নামে এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়। কথা প্রসঙ্গে বলে, থানায় চাকরি করছি।
◆ শশাঙ্ক বন্ধুর মাধ্যমে থানায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, আমার নামে কোন মামলা মোকদ্দমা হয়নি। আর অফিস থেকে কোন টাকা চুরি হয়নি, সেই কারণেই মামলা মোকদ্দমা হওয়ার কোন প্রশ্ন উঠে না।।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- অনেক রাত হয়েছে, খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়।
◆ কয়েক দিন পর বন্ধু ধনঞ্জয়ের মাধ্যমে সুভাষিনীর বাবার খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারে, মেয়ে সুভাষিনীর জন্য সমাজের বুকে মান সম্মান নষ্ট হওয়ার কারণে কিন্তু কলকাতা ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের পৈত্রিক ভিটে বাড়িতে চলে গিয়েছে।
◆ ◆ বিনোদ তার অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো স্মৃতিচারণ করতে করতে ভাবে :- মাস্টার মহেন্দ্র এর সাথে তৎপর আরও কতগুলো স্ত্রীলোক ঘটিত ব্যাপারে তার সাথে বন্ধু গুণেন্দ্রের বিশেষভাবে মতের মিল না হওয়ার কারণে ঝগড়া অশান্তি ঘটতে থাকে ।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু আমার (বিনোদ) মত চরিত্রহীন ছিল। কলেজ জীবনে বহু ছাত্রীকে লোভ ও প্রলোভন দেখিয়ে তার ভালোবাসার জালে জড়িয়ে কাম চরিতার্থ করার পর তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে দিত। একজন নারী নিয়ে কখনো সন্তুষ্ট থাকতে পারে না।
◆ এই সকল স্ত্রীলোক ঘটিত ব্যাপারে আমি বন্ধু গুণেন্দ্রের সাহায্য করতাম। আমার সাহায্য নিয়ে গুণেন্দ্র কিন্তু মাস্টার মহেন্দ্রর কয়েকটি (অর্থাৎ নারী) মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়। সেজন্য আমার ও বন্ধু গুণেন্দ্রের উপর তাহার বিশেষ ঈর্ধার কারণ ঘটেছিল।
◆ আমি প্রথম যেদিন সুভাষিনীর বাড়িতে মহেন্দ্র কে দেখলাম, সেদিন অবশ্যই তার সাথে খুব ভদ্রভাবে আলাপ করেছিলাম।
◆ সেদিন আমার মনে গুরুতর সন্দেহ হয়েছিল।
সুভাষিনীর ন্যায় প্রাপ্ত যৌবনা সুন্দরী নারীর, গৃহ শিক্ষক কলেজ জীবনের চরিত্রহীন মহেন্দ্র চন্দ্র!
◆ আমি খুব সতর্ক ও গোপনে তাদের আচার ব্যবহারের প্রতি লক্ষ রাখতে শুরু করলাম।
◆ তদন্ত করে জানতে পারলাম, সুভাষিনীর কুমারীত্ব মাস্টার মহেন্দ্র নষ্ট করে দিয়েছে।
◆ কথা প্রসঙ্গে সরল সোজা পরেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে জানতে পারলাম, সুভাষিনীর জীবনে প্রথম কাম চরিতার্থ করার জন্য পরেশ কে বহুবার ব্যবহার করেছে।
◆ উকিল বাড়ির শশীকান্ত কাকা বাবু সেই মুহূর্তে
দ্বিতীয় পক্ষের যুবতী বউয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সুভাষিনীর বাবার অন্য কোন দিকে লক্ষ্য করার অবকাশ নেই।
◆ সুভাষিনীর অসামান্য সৌন্দর্য এবং যৌবনের প্রথম উন্মেষে তাহার পরিপূর্ণতা আমাকে আকর্ষণ করে, কিন্তু সংযতভাবেই চলাফেরা করছিলাম।
◆ একরাতে সুভাষিনী আমার ঘরে আসে আর নিজে থেকে কাম চরিতার্থ করতে ভালোবাসা নিবেদন করে।
◆ তারপর আমি মনে বিচার করলাম, সুভাষিনী তো আমাকে দিয়ে তিন জনের সাথে দৈহিক সম্পর্ক লিপ্ত হয়েছে। তাহলে পতিতা হতে বাকি কি আছে?
◆ প্রায় এক মাস উকিল বাড়িতে থাকার পর অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া নেয়।
◆ তারপর দুজনের সম্পর্ক কে আরো এগিয়ে নিয়ে গভীরভাবে ভালোবাসা জমে উঠে। সুভাষিনীর কামের চাহিদা পূরণ করা কিন্তু যে সে পুরুষের কাজ নয়। প্রবাদ বাক্য বলে, "রাতে ১২ আর দিনে ১৩ তারপর যত পারো"
◆ তারপর সুভাষিনী কিন্তু বহু মিথ্যা কথা বলে।
◆ সুভাষিনী যদি একজন যোগ্যতা সম্পন্ন পুরুষকে নিয়ে থাকতো, তাহলে হয়তো এই সর্বনাশের খেলায় মেতে উঠতাম না।
◆ আমি ভাবলাম যখন দুজনের কাছে আত্ম বলিদান দিয়েছে তখন আমার কাছে সহজলভ্য হবে।
◆ সুভাষিনীর বান্ধবী জয়ন্তী প্রতি মহেন্দ্র আকর্ষিত হয়ে পড়ে আর সুভাষিনীর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। কারণ তার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মাস্টার মহেন্দ্র ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
◆ সুভাষিনীর ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় আমি যখন জয় লাভ করলাম, আর মহেন্দ্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দুঃখিত না হয়ে ও পূর্বের শত্রুতাকে ভুলে গিয়ে কিন্তু আমাকে সাহায্য করতে থাকে। পরবর্তীতে আমাদের দুজনের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করে।
◆ আমি লম্পট হলেও কিন্তু এমন পাষণ্ড ছিলাম না, একটি গর্ভবতী রমণীকে বিপদে ফেলে চলে আসার মন মানসিকতা ছিল না।
◆ মথুরায় এক সাথে থাকাকালীন একদিন মাস্টার মহেন্দ্র ফোন করে সুভাষিনী কে লাখ টাকা চুরির অপবাদ সহ আমার বিষয়ে অতীতের নোংরা ইতিহাস টেনে নিয়ে এসে উত্তপ্ত করে দেয়।
◆ নারীর মন কচু পাতার জলের মতো ক্ষণস্থায়ী,
আর ধৈর্য সহ্য বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা বহু অংশে কম।
◆ সুভাষিনী অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা; কোন কিছুই চিন্তা না করেই কিন্তু ক্রোধ ও অহংকারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, আমার দেহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কাপিয়ে তোলে।
◆ আমি প্রতিদিনের অভ্যাস মত মদ পান করে ঘরে ফিরে, ঝগড়া অশান্তি মাঝে মাতাল অবস্থায় সুভাষিনীকে চড় থাপ্পর মারধর করেছিলাম।
◆ পরের দিন সকাল বেলা সুস্থ মস্তিকে অনুতপ্ত হয়ে সুভাষিনী কাছে গিয়ে কিন্তু আমার অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলাম।
◆ সুভাষিনী বলেছিল, আমি; তোমার মত চরিত্রহীন লম্পট মাতাল চোর ইত্যাদি ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করতে থাকে।
◆ আমি বার বার হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা চাই।
◆ সুভাষিনী বলে :- আমি আর তোমার মুখ দেখতে চাই না, আমার নিজের পথ আমি নিজেই বেছে নেব কিন্তু তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই না।
◆ আমি শত অপমানিত হয়েও কিন্তু কুকুরের মতো শত আঘাত সহ্য করে লেজ নাড়তে নাড়তে সুভাষিনীকে অনেক সময় ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কিছুতেই বুঝতে চাইনি।
◆ সুভাষিনী উত্তেজিত হয়ে কিন্তু আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, তবুও বেরিয়ে গিয়ে আবার রাতে ঘরে ফিরে আসি।
◆ সুভাষিনী কথা বলে না খেতেও দেয় না আবার নিজে খাওয়া দাওয়া করে না। দিনের বেলায় বাইরে কাটিয়ে রাতে মন্দির থেকে খাওয়া দাওয়া করে বাসায় ফিরে আসতাম।
◆ একদিন দুপুরে বাসায় ফিরে আসি আর বিকেলে সুভাষিনী বলে, বৃন্দাবনে ঝুলন দেখতে যাবে।
◆ আমি বললাম, লক্ষণের সাথে করে যাও।
◆ আমি সেই রাতে একটি চিঠি লিখে সুভাষিনীকে ত্যাগ করে হাঁটতে হাঁটতে কোশি কলা এক আশ্রমে চলে যায়।
◆ সুভাষিনীর মামা আমার নামে অপহরণ মামলা দায়ের করেছে শুনে, আমি ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করতে থাকি। এই ভয়ে ভয়ে থাকার কারণে অনেক সময় পুলিশের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আবার পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয়েছে।
----------------------------------------------------------
।। ঊনত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ত্রিশ অধ্যায় ।।
।। সুভাষিনীর কলকাতা আগমন ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী এক বছর ধরে আশ্রম বাস করে চলেছে। ভালো চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন থেকে ধীরে ধীরে শরীর সুস্থ হয়ে উঠছে, বর্তমানে নিয়মিত আশ্রমের বিভিন্ন কাজ কর্ম করে চলেছে।
◆ মোহন্ত মহারাজের শিষ্যদের মধ্যে কেহ কেহ নির্দিষ্ট সময়ে বাগানে গিয়ে ঠাকুরের ভোগের জন্য ফলমূল, তরিতরকারি ও শাকসবজি নিয়ে যায়।
◆ নির্মল চরিত্রের একজন শিষ্যের সাথে কথা প্রসঙ্গে সুভাষিনী এক তরফা প্রেম নিবেদন করে কিন্তু মোহন্ত মহারাজের নজরে আসে। পরের দিন থেকে উক্ত শিষ্যের বাগানে আসা বন্ধ করে দেয়।
◆ সুভাষিনী কয়েক পাতা প্রেমপত্র লিখে নিয়ে, নির্মল চরিত্রের শিষ্য কে দেওয়ার জন্য দুপুর দুটোর সময় আশ্রমে প্রাঙ্গণ ঢুকে বড় একটা গাছের তলায় অপেক্ষা করতে থাকে।
◆ এই সময়ে মোহন্ত মহারাজ আসনে ধ্যানস্থ থাকেন কিন্তু অস্থির হয়ে দ্রুত বেগে ছুটে সুভাষিনীর সামনে দাঁড়িয়ে বলেন :- মা; এ সময়ে তুমি আশ্রমে এসেছ কেন? এখন তোমার আসবার কথা নয়!
◆ সুভাষিনী তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়, শ্যামলী গাইয়ের বাছুর এই দিকে ছুটে এসেছে।
◆ মোহন্ত মহারাজ গম্ভীর স্বরে আঙ্গুল উচ্চ করে বলেন :- বাছুর এদিকে আসেনি কিন্তু যদি আসে তবে রামকৃষ্ণের কাজ-তোমার নয়।
◆ সুভাষিনী মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকেই মানুষ কিন্তু শিক্ষা লাভ করে। তোমার ভালোভাবে বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছা নেই কিন্তু ভবিষ্যতে তোমাকে এর প্রতিদান অবশ্যই দিতে হবে। বলে বিপরীত দিকে মন্দিরের দিকে চলতে থাকে।
◆ এক সপ্তাহ পর মোহন্ত মহারাজ এক ভক্তের মাধ্যমে সুভাষিনী কে ডেকে নিয়ে আসে।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- মা; তোমাকে আজই এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কলকাতায় যেতে হবে। কলকাতায় গিয়ে তোমার সকল ব্যবস্থা করে দেবেন।
◆ মোহন্ত মহারাজ কে প্রমাণ করে সুভাষিনী বয়স্ক ব্যক্তির সাথে রওনা দেয়। মথুরা জংশন থেকে হাওড়া গামী ট্রেনে উঠে পড়ে।
◆ মোহন্ত মহারাজ সাংসারিক জীবনে একজন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁহার অনেক বন্ধু বৃন্দাবনে এসে তাহার সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও ধর্মীয় বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা করে থাকেন । বয়স্ক ব্যক্তি সঞ্জয় কিন্তু মোহন্ত মহারাজের বন্ধু।
◆ বয়স্ক ব্যক্তি সঞ্জয়ের আলাদাভাবে একটা অতিথি শালায় সুভাষিনীর থাকার জন্য এক মাসের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা হয়। চাল ডাল তরকারি দেওয়া হয় কিন্তু রান্না করে খেতে হবে।
◆ কলকাতা নগরীর মধ্যে একটা "নারী উদ্ধার আশ্রম" নামে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
এই আশ্রয় কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ও সংগঠক যিনি, তিনি একজন আইন ব্যবসায়ী ও "দেশ সেবক" বলে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
◆ এক মাস পর সুভাষিনী কে বয়স্ক ব্যক্তি সঞ্জয় মহাশয় নারী উদ্ধার আশ্রম রেখে যান।
◆ উদ্ধার আশ্রমের কর্তৃপক্ষ সুভাষিনী কে অফিসে ডেকে বলেন :- তোমার নাম ঠিকানা ও বাবার নাম বলে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানা দিয়ে কি হবে! আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করে ছিলাম কিন্তু জানিয়ে দিয়েছেন, আমাকে তাড়া কোন প্রকার গ্রহণ করবে না ।
◆ উদ্ধার আশ্রমের কর্তৃপক্ষ বলেন :- অফিসিয়াল ভাবে আমাদের কিছু কাজ করতে হয়।
◆ সুভাষিনী বলে :- যে কোন একটা ঠিকানা দিয়ে দেন।
◆ উদ্ধার আশ্রমের কর্তৃপক্ষ বলেন :- কি ঘটনার জন্য বাড়ি ছাড়া হলো?
◆ সুভাষিনী বলে :- আমি উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণের মেয়ে। কুমারী অবস্থায় প্রতারণার ফাঁদে পড়ে, যৌবনের উন্মাদনায় রমেশ নামের এক যুবকের চক্রান্তে পা দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। সে গর্ভবতী অবস্থায় আমাকে ছেড়ে পালিয়েছে। তারপর বৃন্দাবনের এক আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করে মৃত সন্তান প্রসব করার এক বছর পর এই উদ্ধার আশ্রমে আসা।
◆◆ সুভাষিনী ভাবে :- অবৈধ প্রেম উত্তেজনার বশে আবেগের প্রবনতায় জন্ম হয়। উত্তেজনা মাত্রই ক্ষণস্থায়ী ও তাহা কদাচ বিচার বুদ্ধি প্রসূত নয়। সুতরাং যে প্রেম অল্পতেই জন্মে হয় কিন্তু তা অল্পতেই বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
◆ এই প্রকার অবৈধ প্রেমে মিলিত নারী-পুরুষের বিচ্ছেদের কারণ, উভয়ের দোষ অথবা অবস্থার শিকার হয়ে পড়ে।
◆ অর্থাভাব, গর্ভসঞ্চার, রূপ-বিকৃতি, এই সব হইল অবস্থার পীড়ন। মদ্যপানের অভ্যাস, অপরের প্রতি আসক্তি এই সব হলে নারী-পুরুষের দোষ।
◆ আমাদের ব্যাপারে দুইটায় ঘটেছিল। বিনোদ এর মদ্যপান ও আমার অসময়ে সন্তান সম্ভাবনা কিন্তু বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
◆ বিনোদ যদি হিন্দু ধর্মের সামাজিক রীতি অনুসারে আমাকে বিয়ে করতে, তাহলে কিন্তু স্বামী হতো। আর স্বামী হলে কিন্তু কখনোই আমাকে পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারতো না। কারণ লোক লজ্জা সমাজের শাসন ছেড়েই দিলাম কিন্তু আইনের ভয় সব সময় থাকতো।
◆ বিয়ে মানেই নারী-পুরুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা। নারী-পুরুষের দৈহিক মিলনের অনুমতি দান।
◆ বিয়ের পর শত বার গর্ভবতী হলেও কিন্তু কোন সমস্যা নেই কিন্তু বিয়ের আগে হলে মহা মহা বিপদে পড়তে হবে। আমি যেমন বাড়ি থেকে পালালাম।
◆ অবৈধ প্রেমের যেমন মিলনের স্বাধীনতা আছে আবার বিচ্ছেদের স্বাধীনতা আছে। কেউ কারোর কাছে দায়বদ্ধ থাকে না কিন্তু নারীরা সবচেয়ে বিপদে পড়ে বেশি। বিচ্ছেদের কারণে তার জীবন যাপন নরকে পরিণত করে দেয়।
◆ যেমন বিনোদ অনায়াসে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে কিন্তু বিনোদ কে প্রশংসা করবো। কারণ তা না হলে কিন্তু জগতের সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ে কোন তথ্য জানতে পারতাম না।
◆ এত দুঃখ কষ্ট ভোগ করে কিন্তু আমার শিক্ষা হয়নি। মোহন্ত মহারাজের আশ্রমে এমন পুণ্যের বাতাসের মধ্যে থেকেও কিন্তু দুষ্প্রবৃত্তির অঙ্কুর আবার আমার হৃদয়ে দেখা দেয় । শয়তানের প্রলোভন সুখ-স্বর্গের ছবি নিয়ে আমার সম্মুখে আসে। আমি তখন তাতে মুগ্ধ হয়ে যায়।
◆ যে সব নারীরা পাপের পথ ছেড়ে দিয়ে, সৎভাবে জীবন যাপন করতে ইচ্ছুক-তাদেরকে এই উদ্ধার আশ্রমে স্থান দেওয়া হয়। কোন প্রকার শিল্প কার্যাদির দ্বারা জীবিকা অর্জনের উপায় আছে।
◆ আবার এমন নারী আছে, যাহারা নিতান্ত বিপদে পড়ে কিন্তু এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে।
◆ আমার মতো এরূপ ঘটনা চক্রে জড়িয়ে পড়ে,
সমাজ অথবা পরিবারের তাদের আর কোন জায়গায় নেই।
◆ যাদের জীবনের গতি অস্থির।
◆ উদ্ধার আশ্রমে থাকা, খাওয়া ও পোশাক পেয়ে, তাহারা বলে সুখী কিন্তু আমি তা মনে করি না।
◆ আশ্রয় কেন্দ্রের সকলেই কিশোরী বা যুবতী । এখানে বর্তমান ১৭ জন নারী আছে কিন্তু তার মধ্যে বয়স্ক বিধবা পাঁচ জন বাস করে।
◆ উদ্ধার আশ্রমে থেকে বাইরের কারোর সাথে যোগাযোগ করা বা খবর নেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। আশ্রমের কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তারা ইচ্ছা করলে যোগাযোগ করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন।
◆ আশ্রিত নারীরা আশ্রম কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিদের দেহ দান করে খুশি করলে কিন্তু সেই মুহূর্তে নিয়ম কানুন শিথিল হয়ে যায়।
◆ কয়েক দিনের মধ্যে সুভাষিনী কয়েক জন মেয়ের সাথে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। তার মধ্যে রাজবালা ও হরিদাসী দুজনের জীবনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য ।
◆ কলকাতা মহানগরীর মধ্যে এক বনেদি পরিবারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীর মেয়ে রাজবালা।
◆ কুমারী রাজবালার ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বেনদি আর্থিক অবস্থা সম্পন্ন এক ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে বিয়ে হয়।
◆ দুই বছর যেতে না যেতেই এক পথ দুর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়।
◆ শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলে :- আসতে না আসতেই আমাদের ছেলে কে খেয়েছে কিন্তু অলক্ষী বিধবার এই বাড়িতে কোন জায়গায় নেই।
◆ রাজবালার পিতা তার শ্বশুর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে, সারা জীবনের জন্য মীমাংসা করে মেয়ে কে বাড়িতে আসে।
◆ বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বছর আগে আগত এক কায়স্থ যুবক সুনীল তাদের প্রতিবেশী।
◆ বিধবা রাজবালার বাড়ির বড় বউ অর্থাৎ বড় বৌদির সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিবেশী সুনীলের সাথে বিধবা রাজবালার তিন বছর ধরে অবৈধ ভাবে গোপনে গোপনে দৈহিক মেলামেশা চলতে থাকে।
◆ রাজবালা এক সময় গর্ভবতী হয়ে পড়ে, সুনীলের সাথে দেখা করে পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়।
◆ কয়েক দিন পর সুনীল নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
◆ বিধবা রাজবালা উপায় অন্ত না পেয়ে, বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গঙ্গাস্নানের নাম করে বাড়ির কাজের মধ্যে বয়স্ক মহিলার সাথে করে বাড়ি থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায়। তারপর আর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মন মানসিকতা কোন দিন তৈরি হয়নি।
◆ নানা দুঃখ দুর্দশার মধ্যে দিয়ে বহু ঘাটের জল পান করে, ঘুরপাক খেতে খেতে একদিন এই উদ্ধার আশ্রমে উপস্থিত হয়েছে।
◆ নারী উদ্ধার আশ্রমে কি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত আছে?
----------------------------------------------------------
।। ত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। একত্রিশ অধ্যায় ।।
প্রমোদ আসরে সামাজিক অবক্ষয় কি ?
----------------------------------------------------------
ধনঞ্জয় তার বন্ধু বিনোদ কে কয়েক একটি দামি দামি পোশাক দেখিয়ে বলে :- পড়ে নে, আভিজ্যাতের সম্মান কিন্তু পোশাকের মাধ্যমে।
◆ ধনঞ্জয়ের এক আভিজাত্য সম্পন্ন বন্ধুর প্রমোদ আসরে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে বিনোদ কে সাথে করে নিজের চার চাকা গাড়ি নিয়ে রওনা দেয়।
◆ কলকাতার একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রের পরিচালকের সখের বাগান বাড়িতে প্রমোদ আসরের ব্যবস্থা, এখানে সমাজে বিশিষ্ট লোকজন নিমন্ত্রণ হয়েছে।
◆ বিনোদের বন্ধু ধনঞ্জয় চলচ্চিত্রের অভিনেতা- অভিনেত্রীর সাথে চলাফেরা করতে করতে এক গানের আসরে পরিচালকের সাথে আলাপ জমে উঠে, তারপর ধীরে ধীরে কাছের মানুষ হয়ে উঠে।
ধনঞ্জয় গানের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কয়েকটি ছবিতে গান পরিবেশন করে।
◆ প্রমোদ আসরে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য পোলাও-মাংস ও চপ-কাটলেট, কাজুবাদাম কিশমিশ ও আপেল সহ প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্যের আয়োজন করা হয়েছে ।
◆ বড় হলের মধ্যে খানে বিভিন্ন কন্ঠ শিল্পীদের গানের আসরের জন্য পর্নসের গদি তার উপর নকশা যুক্ত দামি দামি চাদর পেতে দেওয়া হয়েছে।
গানের আসরের চারপাশে শ্রোতাদের বসার জন্য মেঝেতে কার্পেটের উপর আরাম দায়ক বিছানা পাতা হয়েছে। প্রত্যেকেই পিছনে এলান দেওয়ার জন্য গদি দেওয়া আর দুই পাশে আবার কোলবালিশ রাখা।
◆ নরম নরম আরাম দায়ক গদিতে বসে সুন্দরী মহিলার সাথে মদ্যপানের সাথে সাথে সুন্দরী নারীর কন্ঠে গান শোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
◆ এছাড়াও কয়েক জন করে বসার গোল টেবিল বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে। এই হল ঘরের এক পাশে বিশ্রাম করার অনেকগুলো রুম আছে।
◆ বিনোদ ও ধনঞ্জয় সহ আরো কয়েকজন মেঝেতে থাকা বিছানার উপর বসে পড়ে।
◆ একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি দামি মদ, জল, গ্লাস ও চপ-কাটলেট সহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্য দ্রব্যের সাথে আবার আসরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে শুরু করে।
◆ একটা ট্রেতে তবক দেওয়া পানের খিলি এবং কতগুলো সিগারেটের প্যাকেট আসে।
◆ বাইশ জন সমাজের বিশিষ্ট মানুষ সহ ত্রিশ জন সুন্দরী বেশ্যা, এতদ্ব্যতীত তবলা ওয়ালা, হারমোনিয়াম, মন্দিরা বাদক সহ রান্না করা পরিবেশন করার আলাদা আলাদা লোক ছিল।
গড়ে একশত লোকের আয়োজন করা হয়েছে।
◆ বিশিষ্ট পরিচালক মহাশয় ঘুরে ঘুরে সবার সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে ধনঞ্জয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, এই ভদ্রলোক কে তো চিনতে পারলাম না।
◆ ধনঞ্জয় তার বন্ধু বিনোদ কে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে :- কলেজ জীবন থেকে আমার খুব কাছের বন্ধু। মাঝখানে কিছুদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। তারপর আরেকটি গোপন পরিচয় হলো, বাংলা সাহিত্যের একজন কবি ও সাহিত্যিক।
◆ বিশিষ্ট পরিচালক মহাশয় বলেন :- বিনোদ বাবু তো বহু প্রতিভা আছে। তাহলে বিনোদ বাবু আপনার গান দিয়েই আজকের আসর শুরু করা যাক। আর কবিতা শোনানোর মত হয়তো একজন ব্যক্তিকে পেয়ে যাবেন।
◆ বিনোদ হ্যাঁ বলে সম্মতি প্রদান করে।
◆ বিশিষ্ট পরিচালক মহাশয় একজন ভদ্রলোক কে লেখক বন্ধু, লেখক বন্ধু বলে হাত নেড়ে কাছে ডাকতে থাকে।
◆ লেখক বন্ধু কাছে আসতেই বিশিষ্ট পরিচালক মহাশয় বিনোদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
◆ বিনোদ হাত বাড়িয়ে লেখক বন্ধুর হাত ধরে বলে :- আরে মশাই; আমাদের সাথেই বসুন, আর কিছু হোক না হোক কিন্তু সাহিত্য নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাবে।
◆ লেখক বন্ধু বিনোদের পাশে বসে পড়ে। তারপর দুজনের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
◆ বিশিষ্ট পরিচালক মহাশয় আগত পতিতা সুন্দরীদের দিকে তাকিয়ে বলেন :- তাহলে; আপনারা এক জন করে প্রত্যেক পুরুষের পাশে গিয়ে বসে তাদের মনোরঞ্জন করুন। যার যেমন ইচ্ছা এখানে আনন্দ করুন, এখানে বাধা সৃষ্টি করার কেউ নেই। তাহলে আজকের আনন্দ শুরু হোক। তারপর ধীরে ধীরে একটি রুমে ঢুকে পড়ে।
ধনঞ্জয়ের পাশে থাকা একজন ভদ্রলোক বলেন :- পরিচালক মহাশয় রুমের মধ্যে তার পাঁচ জন অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সাথে আনন্দ ফুর্তির আসর করবেন।
◆ প্রত্যেক পুরুষের পাশে একজন করে সুন্দরী মদের প্যাক তৈরি করে, নিজের হাতে পরিবেশন করতে থাকে।
◆ একজন ভদ্রলোক গ্লাস হাতে নিয়ে বলেন :- কে বলে! বাঙালি জাতি নারীর সম্মান করতে জানে না।
◆ তারপর পাশে থাকা মহিলার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে :- এক চুমুক পান করে প্রসাদ করে দাও ললনা।
◆ রমণী তার ঠোঁটে স্পর্শ করে হাসতে হাসতে গ্লাস উক্ত পুরুষের মুখে ধরে আর আনন্দে পুলকিত হয়ে এক চুমুকে গ্লাস শেষ। তারপর চামচ করে খাবার মুখে তুলে দেয়।
◆ বিনোদ তার বন্ধু ধনঞ্জয়ের উদ্দেশ্য করে বলে :- পানশালায় আর বৈশ্যালয়ে কোন জাতপাতের উৎপাত নেই।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সব এক জায়গায় বসে আনন্দ ফুর্তি করে বুকে জড়িয়ে নেয়।
◆ বিনোদ বলে :- এখান থেকে বাইরে বেরোনোর পর কিন্তু সমাজের মানুষের ছোট জাত, বড় জাত, ছোঁয়াছুঁয়ি ও আচার-বিচার শুরু হয়ে যায়।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- বেশ্যালয়ে ও মদ্যপানের আসরে ছোট জাত বা মুসলিম নারীর সাথে দৈহিক সম্পর্কে কোন দোষের নয়। সেই মুহূর্তে কোন পাপ হয় না।
◆ একজন ভদ্রলোক বলেন :- দিনের বেলায় উক্ত মহিলা যদি, রাতে বুকে জড়িয়ে ধরা ভদ্রলোক কে স্পর্শ করে তাহলে কিন্তু সাতবার গঙ্গা স্নান করবে।
◆ বিনোদ বলে :- সবকিছু নিয়মকানুন কিন্তু মানুষের স্বার্থে তৈরি করে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
◆ ধনঞ্জয় বলে :- উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সবসময় নিম্ন বর্ণের মানুষদের কে কিন্তু তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে চলেছে।
◆ মদ্যপানের আসরে মদ, সিগারেট ও নারীর ভালোবাসা কিন্তু জোরকদমে চলতে থাকে।
◆ মদ পান কারীর সবার সামনে সুবেশী সুকন্ঠী গায়িকার গানের তালে তালে নাচ চলতে থাকে।
মদ পান করতে করতে হল ঘরের যে কোন জায়গা থেকে নাচ গান উপভোগ করতে পারে, এমন ভাবে প্রমোদ আসর সাজানো হয়েছে।
◆ গানের ফাঁকে ফাঁকে বর্তমান সময়ের সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
◆ বিনোদ এর গান শুনে শ্রোতাগণ বিশেষ ভাবে আনন্দিত হয়ে হাতে তালি দিতে থাকে।
◆ একজন সমাজের ভদ্রলোক হালকা মাতাল হয়ে পড়ে আর পাশে থাকা মহিলাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে থাকে।
◆ সমাজের দ্বিতীয় ভদ্রলোক বলেন :- এই বেয়াদব ; এত লোকের সামনে লজ্জাশীলতার হানি করা হচ্ছে, দাঁড়া; তোকে পুলিশে দিচ্ছি।
◆ প্রথম ভদ্রলোক জড়ানো কণ্ঠে বলেন :- ঠিক বলেছিস বাবা। লোকের সামনে করলে দোষ কিন্তু লুকিয়ে করলে কোন দোষ নেই। না হলে; আমাদের পাড়ার শালা কবিরাজের এত মাতব্বরি থাকতো না রে বাবা।
◆ তৃতীয় ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করে :- উকিল বাবু; ব্যাপার কি? কবিরাজ তো খুব ভাল মানুষ বলেই জানতাম।
◆ প্রথম ভদ্রলোক ব্যঙ্গ সুর করে বলেন :- সমাজের বুকে ভালো মানুষ তো বটে বাবা। ডুব দিয়ে জল খেলে একাদশীর বাবা জানতে পারে না।
◆ তৃতীয় ভদ্রলোক বলেন :- দাদা, হেয়ালী না করে একটু খুলে বলতো।
◆ প্রথম ভদ্রলোক বলেন :- তুমিতো; কলেজের অধ্যাপক; তোমার কাজ হচ্ছে সমাজের মানুষকে শিক্ষা দান করা কিন্তু পানশালায় এসে তুমি এখন বড় মাতাল।
◆ তৃতীয় ভদ্রলোক বলেন :- একদম ঠিক কথা, কিন্তু কবিরাজের বিষয়ে জানার জন্য মন ছটফট করছে।
◆ প্রথম ভদ্রলোক এক প্যাক পান করে খাবার মুখে দিয়ে বলেন :- কবিরাজের একমাত্র ছেলের অকাল বিধবা স্ত্রী কামিনীর সাথে কবিরাজ মহাশয় কাম উত্তেজনায় মত্ত হয়ে আছে। এসব কথা মুখে উচ্চারণ করতে নিজের লজ্জা লাগে।
◆ আসরে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ বিদ্যুতের শট খাওয়ার মত চমকিত হয়ে বলে ওঠে , বৌমার সাথে শ্বশুরের প্রণয় এটাও কি কলিযুগে ভাবা যায়।
◆ চতুর্থ ভদ্রলোক বলেন :- কবিরাজ কিন্তু মহাভারতের কাহিনী কে হার মানিয়ে দিয়েছে।
◆ একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বলেন :- তুই বলিস কি! অবাক করা কথা বললে।
◆ লেখক বন্ধু বলেন :- আমি নতুন করে "নব মহাভারত" লেখালেখি শুরু করবো আর অবশ্যই কবিরাজের নতুন কাহিনী থাকবে।
◆ ষষ্ঠ ভদ্রলোক বলেন :- আরে ভাইয়া ; তুমি তো একজন সমাজের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক কিন্তু এরকম কাহিনী তোমার ঝুলিতে নেই।
◆ লেখক বন্ধু বলেন :- এই ধরনের কাহিনী কখনো ভাবনাতেই তো আসেনি কিন্তু আজ মদ্যপানের আসরে সত্য জানতে পারলাম।
◆ একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বলেন :- জ্ঞানী ও গুণীজন বলেন :- "মদ পেটে পড়লে কিন্তু সব সত্যি কথা বেরিয়ে আসে"।
◆ ষষ্ঠ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলেন :- এই তো মজারে ভাই। চোর ধরা পড়েছে কিন্তু আমরা কয় শালা, আমরা মদ খাই সেটা বড় দোষ, আর সে শালা কি করে জানিস?
◆ সপ্তম ভদ্রলোক বলেন :- বিষয়টা কি বলো না?
◆ ষষ্ঠ ভদ্রলোক বলেন :- আমাদের পাড়ায়, নিজের বউ ছেলেমেয়ে ছেড়ে দিয়ে বড় গোসাই আবার শিষ্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে এসে গোসাইনি নামে রক্ষিতা রেখেছে। গোসাই নাকি রক্ষিতার দেহের গোপন অঙ্গে জিহ্বা লাগিয়ে সন্ত্রীবনী সুধা পান করে।
◆ সপ্তম ভদ্রলোক বলেন :- এ তো কাম শাস্ত্রে ৬৪ কলার মধ্যে আছে।
◆ ষষ্ঠ ভদ্রলোক বলেন :- গোসাই আর গোসাইয়ের রক্ষিতার মধ্যে ভাব ভালোবাসা, ভালই আছে। পাপ তাপ ধুয়ে ফেলার জন্য প্রতিদিন একসাথে গঙ্গা স্নানে যায়, পরজনমের পূণ্যের আশায়।
◆ গোসায়ের যুবতী রক্ষিতার স্বামী গুরুদেবের সুকর্মের জন্য নিজে আত্মহত্যা করে।
◆ অষ্টম ভদ্রলোক নিরিবিলি এক জায়গায় একা একা বসে নিশ্চিন্ত মনে মদ পান করে চলেছে,
তিনি এতক্ষণ কোন কথা বলেনি।
◆ মদ্যপানের আসরে, পরিবেশন কারী মহিলা গণ আবার মদ ও খাবার নিয়ে আসো।
◆ অষ্টম ভদ্রলোক বলেন :- ঠিক বলেছিস ভাই। দেশের পণ্ডিতগণ বলে, ইংরেজি পড়ে নাকি তারা বড় শিক্ষিত হয়ে গিয়েছে।
◆ আমাদের পাড়ার শালা পন্ডিত ব্যাটা জাতপাত নিয়ে বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে সমাজের মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে।
◆ কিন্তু ছোট জাতের মুচির মেয়ের সাথে পন্ডিত ঢলাঢলি করছে, তাতে নাকি শালার জাত যাচ্ছে না।
◆ ছোট জাতের হাতে ভাত খেলে জাত যায়, আর তাদের মেয়ে নিয়ে বিছানায় নিয়ে আনন্দ ফুর্তি করলে কিন্তু জাত যায় না।
◆ নবম ভদ্রলোক বলেন :- আপনি যে ব্যক্তির কথা বলছেন, তিনি বর্তমান সময়ে একজন বিখ্যাত পণ্ডিত এবং মহামহোপাধ্যায় উপাধি প্রাপ্ত । তার আবার রক্ষিতা আশ্চর্য ব্যাপার।
◆ অষ্টম ভদ্রলোক বলেন :- পন্ডিতের ছাত্রদের কিন্তু শূদ্র নারী কে "গুরুমা" বলে ডাকতে সবাইকে বাধ্য করানো হয়েছে।
◆ প্রতি বছর রক্ষিত কে নিয়ে পণ্ডিত মহাশয় নবদ্বীপ-মায়াপুর দর্শন করে পুণ্য সঞ্চয় করে আসেন।
◆ সমাজের অবক্ষয়ের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অপকর্মের আলোচনাগুলো ভালই জমে উঠেছে। সকলেই হালকা হালকা মদ পানের সাথে আনন্দ উপভোগ করে চলেছে।
◆ দশম ভদ্রলোক বললেন :- আরে জোঁকের গায়ে কখনো জোঁক লাগে, তা কখনো শুনেছেন।
◆ একাদশ ভদ্রলোক বললেন :- খুলে বলেন তো?
◆ দশম ভদ্রলোক বলেন :- এক ডাক্তারের গিন্নির সঙ্গে আর এক ডাক্তার প্রেম।
◆ সকলেই প্রশ্ন করে :- ব্যাপারটা কি?
◆ দশম ভদ্রলোক বলেন :-“ মাধব” ডাক্তারের স্ত্রীর সঙ্গে “কৃষ্ণ ,” ডাক্তার জুটে গেছে জানেন না। বেচারা মাধব কিছুই বলতে পারেন না আবার সইতেও পারছেন না।
◆ দ্বাদশ ভদ্রলোক বলেন :- কৃষ্ণ তো পেয়াদা পুরের এক অভিজাত পরিবারের গৃহিনী কে চিকিৎসক হয়েছিলেন। সেই মহিলা তো স্বাধীন ছিল ।
◆ ◆ দশম ভদ্রলোক বললেন :- একটি তে কি তার মত লোকের পোষায়! এক “কৃষ্ণ”
সহস্র গোপিনী নইলে কি করে চলে?
◆ একজন বলিল :- কৃষ্ণের মেয়েটা আবার “চন্দ্র তিলক পড়ে।”
◆ বিনোদ বলে :- আমাদের সমাজের কুৎসা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে কিন্তু তাই বলে আমাদের সমাজে এমন দুষ্ট লোক থাকতে পারবে না, তা তো হয় না ।
ধনঞ্জয় বলে :- উপস্থিত এই আসরে আমরা কিন্তু সবাই মুখোশের আড়ালে রয়েছি, কারণ আমাদের মধ্যেও সমাজের অবক্ষয় কুকর্মে লিপ্ত আছে। কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসছে না। আমরা নিজেরা কিন্তু ঠিক জানি, কত ভালো আর কত মন্দ।
◆ বিনোদ বলে :- এই আসরে যেসব নারীদের আমরা দেখছি, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষের বেইমানের করার কারণে আজ বেশ্যা হয়েছে।
◆ পাশে থাকা মহিলা বলে :- বিনোদ বাবু ঠিক বলেছেন, আমাকে জোর করে প্রতিটা বানানো হয়েছে।
◆ উত্তরে অনেকে বলেন :- দুনিয়ায় এমন জাত নেই, যে সমাজের মেয়ে দুষ্ট বা বেশ্যা নাই। তবে বেশ্যাদের রূপ মাধুর্য দেখতে ভারি মজা লাগে।
◆ আবার একটা হাসির রোল ওঠে।
◆ একজন ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলেন :- আরে মশাই; ইচ্ছা থাকলে পাশের রুমে নিয়ে চলে যান, শুধু দেখলে কি মন ভরবে?
দেওয়া নেওয়া দেওয়া নেওয়া তোমার সাথে।
সখি তোমার দেহে সুখে আমি সুখী হবে।
দেওয়া নেওয়া দেওয়া নেওয়া তোমার সাথে।
হঠাৎ গানের তালে তালে মিউজিক বেজে ওঠে আর উপস্থিত সকলের হাতে তালি দিয়ে আনন্দ করতে হয়।
◆ ক্রমে ক্রমে সকলেই নেশায় মাতাল হয়ে পড়ে। হলঘরের পাশের ছোট ছোট রুম গুলোতে, আসর ছেড়ে উঠে কেউ কেউ পছন্দের রমণী কে নিয়ে রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
◆ প্রমোদ আসরের দ্বিতীয় পর্বে রুমের মধ্যে আনাগোনা চলতে থাকে। আবার কোন রসিক বাঙালি রুমের মধ্যে ঢুকে নতুন রসের সৃষ্টি করে চলেছে।
◆ বিনোদ আসর ছেড়ে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে একজন সুন্দরীর হাত ধরে রসের আলাপ করতে করতে এক সময় ফাঁকা রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
◆ একজন সুন্দরী মহিলা লেখক বন্ধুর কাছাকাছি হয়ে বলে :- আরো মশাই; নারী সঙ্গ না করলে রসের সন্ধান পাবেন কি করে?
◆ নারীর ভালবাসা থেকে কিন্তু কাব্যের সৃষ্টি আর সেই নারী কে করছেন অবহেলা। বলে হাত ধরে রুমের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত করে।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- আপনার কথা একদম ঠিক কিন্তু আমি ; আমার সহধর্মিনী ছাড়া অন্য কোন নারীর কাছে আজ পর্যন্ত যায়নি। ক্ষমা করবেন কিন্তু আমি মাতাল তবে চরিত্রহীন নয়।
◆ উক্ত মহিলা লেখকের হাত ছেড়ে দিয়ে বলে :- আচ্ছা; অন্য নারীর রূপ লাবণ্য দেখে কি! আপনার মধ্যে কাম উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় না।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- পায় না, তা মিথ্যা বলবো না। কারণ আমি তো কোন যোগী মুনি ঋষি নয়। রক্ত মাংসে গড়া এক সাধারণ মানুষ।
◆ উক্ত মহিলা বলে :- তাহলে?
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- আমি সব সময় নিজের কাম উত্তেজনা কে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন বিপদ হয়নি।
◆ সমাজের অবক্ষয়ের জন্য সবাই যদি নারী পিপাসু হয়, তাহলে লেখক এর মর্যাদা কোথায় থাকবে?
◆ উক্ত মহিলা বলে :- পুরুষের প্রতি আমার এতদিন যে ধারণা ছিল তা কিন্তু আপনি পাল্টিয়ে দিলেন। এবার তাহলে আমার উপন্যাসে আপনার মত আদর্শবান মানুষের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- আপনি; তাহলে লেখালেখি করেন।
◆ উক্ত মহিলা বলে :- না; আমার জীবনের ঘটে যাওয়া অতীত ও বর্তমানের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছি মাত্র।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- আপনি দেহ ব্যবসা ছেড়ে অন্য কিছু তো করতে পারেন।
◆ উক্ত মহিলা বলে :- বর্তমান তা পারি কিন্তু আমার পিছনের ইতিহাস কারণে সব সময় কাঁকড়া গুলোর মত আমাকে টেনে নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে আসবে।
আর বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা কোন দিন নারীর অস্তিত্ব কে কিন্তু কখনোই মেনে নিতে চাই না।
তারা পশু পালনের মত নারীদের কে সব সময় ব্যবহার করে নিতে চায়।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- আপনার মধ্যে প্রতিবাদ আছে। সব সময় আপনার সাথে আছি।
◆ পদ্ম রঞ্জন সরকার মহাশয় এক সময় সামান্য বেতনে চাকরি করতেন কিন্তু বর্তমানে তিনি সমাজের দশ জনের মধ্যে কিন্তু একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। রাজনীতি করে বাংলার মানুষের কাছে পরিচিত লাভ করেছেন।
◆ সরকার মহাশয় মাতাল হয়ে পাশে থাকা আরেক জন মাতাল কে ধরে টানাটানি করতে থাকে।
◆ দুজনের মধ্যে মারামারি করার উদ্যোগ শুরু হয়। উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি দুজনের দুদিকে নিয়ে গিয়ে গন্ডগোলের হাত থেকে সবাইকে রক্ষা করে।
◆ চার দেওয়ালের মাঝে সমাজের বিশিষ্ট মানুষেরা মদের নেশায় আলোকিত আর বাইরের আকাশে তখন পুণ্য চাঁদের পূর্ণিমার আলোয় চারিদিকে আলোকিত করেছে।
◆ রাতের কলকাতা নগরীর এক বিচিত্র রূপে প্রকাশিত হয়ে থাকে। দিনে তার আবার অন্য রূপ ধারণ করে। বিচিত্র কলকাতা নগরী বিচিত্রভাবে প্রতিদিন তার রূপ পরিবর্তন হতে থাকে।
◆ দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং ঢং ঢং আওয়াজ করে রাত বারোটা জানিয়ে দেয়। আর সাথে সাথে খাবার পরিবেশন কারি সেবক জানায়, সকলকে খাবারের টেবিলে আসার জন্য কিন্তু মদের আসর ছেড়ে কিন্তু কেউই খাবার খেতে যেতে রাজি হয় না।
◆ আসরের মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক প্রস্তাব করলেন, বাগানের পুকুর ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। আজকের পূর্ণিমার আলোয় নৌকায় চড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা ভীষণ আনন্দ হবে।
◆ কয়েকজন মাতাল ভদ্রলোক, “বাহবা, চমৎকার” বলে উঠে পড়ে।
◆ নারীদের মধ্যে থেকে বেশি ভাগ যেতে রাজি হয় না। অনেক বলে পাঁচ জন নারী কে সাথে করে
মাতাল পুরুষেরা হল ঘরের দক্ষিণ দরজা খুলে বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর ঘাটে আসে।
◆ সবাই নৌকায় উঠতে শুরু করেছে, সেই মুহূর্তে হঠাৎ করে পদ্ম রঞ্জন সরকার মহাশয় পুকুর ঘাটে উপস্থিত হয়।
◆ সরকার মহাশয় বলেন :- শালীরা তোরা, আমাকে নৌকায় নিলি না, আমি তো পদ্মফুল, পুকুরে ফুটে থাকবো বলে ঝপাং করে লাফ দিয়ে জলে পড়ে।
◆ পুকুরে হাবুডুবু আর জল পান করতে করতে নৌকার কাছে এসে, বাঁচার জন্য নৌকার এক পাশ ধরে উঠার চেষ্টা করে।
◆ নৌকা মাঝ পুকুরে এক পাশ কাত হতে শুরু করে আর চিৎকার চেঁচামেচি করে নড়াচড়া করতেই নৌকা ডুবে যায়।
◆ বিনোদ ও ধনঞ্জয় ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল। দ্রুত দুজনে জামা প্যান্ট খুলে জাঙ্গিয়া পড়ে পুকুরের জলে ঝাঁপ দেয়। জলে নেমে অনুভব করে বেশি জল নেই। তারপর সবাইকে টানতে টানতে উপরে নিয়ে আসে। জল বেশি না থাকার কারণে কোন প্রাণহানি ঘটেনি।
◆ বেশ্যা গণ কিন্তু পদ্মবাবুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে হল ঘরের দিকে চলতে থাকে।
◆ পদ্মবাবু জড়ানো স্বরে বলেন :- গালাগালি করছে কেন চাঁদ! নেশা ছুটে গেছে তাই, চল
সব শালি কে রাতে দেখে নেবো।
◆ এরপর সবাই ভিজে কাপড়ে বাগান বাড়ির বৈঠকখানায় আসতে শুরু করে । পাখার সামনে দাঁড়িয়ে বাতাসে কাপড় শুকানোর চেষ্টা চলতে থাকে।
◆ খাবারের জন্য ডাকা হলো, সবাই টলতে টলতে
খাবারের নির্দিষ্ট জায়গায় চলে আসে।
◆ চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রেখে নাক ডাকতে শুরু করে। কেউ কেউ বাগানের কোন রাস্তায় বা গাছের তলায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে।
◆ অধিকাংশ ভদ্রলোক দুই এক বার মুখে দিয়ে থালার উপর বমি করতে শুরু করে।
◆ ক্যাটারিং এর লোকজন খাবার টেবিল থেকে সরিয়ে পাশের মেঝের উপর শুয়ে দেয়।
◆ পতিতা নারী গুলোর সবারই একই দশা তবুও কোন পুরুষের আহ্বানে টলতে টলতে রুমে বা যে কোন জায়গায় শুয়ে পড়ে।
◆ একমাত্র স্বাভাবিক অবস্থায় আছে ভাড়া করা নাচ গানের দলের লোকজন গুলো মদ পান করেছে কিন্তু স্বাভাবিক।
◆ বিনোদ ও ধনঞ্জয় নিরিবিলি পরিবেশে বসে বসে বিভিন্ন পদের রান্নার আস্বাদন নিতে থাকে।
◆ দুজনে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পায়, উপস্থিত বন্ধুগণ কার্পেটের উপর কেউ অর্ধ উলঙ্গ, কেউ সম্পূর্ণ উলঙ্গ, কেউ অজ্ঞান, কেউ বারবার কার্পেটের উপর বমি করে আবার তার পাশেই শুয়ে পড়েছে।
◆ কেউ অন্যকে জড়িয়ে ধরে আবার কেউ পতিতাদের ডাকছে।
◆ পদ্ম রঞ্জন বাবুর পাশে বিশিষ্ট একটি বাবু কে জড়িয়ে ধরে তার মুখ চুম্বন করতে করতে বলে :-
কলিকালে কি হলো বাবা! মেয়ে মানুষের দাড়ি গজিয়েছে।
◆ বিনোদ ও ধনঞ্জয় মিলে সরকার মহাশয় কে তুলে এক বেশ্যার পাশে শুয়ে দেয়।
◆ বিনোদ মাতাল হলেও কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। উদ্যানের মাঝে মাতাল নর-নারীর উলঙ্গপনা দৃশ্য দেখে চমকিত হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে বিচিত্র প্রকৃতির বিচিত্র লীলা।
◆ লেখক বন্ধু ঘুরতে ঘুরতে বিনোদের কাঁধে হাত রেখে বলে :- কি ভাবছেন?
◆ বিনোদ বলে ভাবছি :- দিনের আলোয় এসব ব্যক্তি আবার সমাজে মান্য গণ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। দিনের আলোয় কিন্তু আমাকে চিনতে পারবে না। দিনের আলোয় দেখা করতে হলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মেলে কিন্তু রাতে তার সাথে একসাথে বসে মদ পান করলাম আরো কত না কথা বলাবলি হলো।
◆ লেখক বন্ধু মহাশয় বলেন :- ভোর হতে চলেছে, চলুন বিশ্রাম করি।
----------------------------------------------------------
।। একত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। বত্রিশ অধ্যায় ।।
নারী উদ্ধার আশ্রমে ধর্ষিত।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী উদ্ধার আশ্রমের নরম নরম আরাম দায়ক বিছানায় শুয়ে ভাবে :- উদ্ধার আশ্রমের নারীদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম।
◆ বেশিরভাগ মেয়েরাই অসৎ লোকের প্রলোভনে পড়ে আবার কিছু নারীরা স্বেচ্ছায় কিন্তু ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
◆ খাওয়া-দাওয়া ও পোশাক আশাকের অভাব তাদের কিন্তু বিপদ নয়। কি খাবে! তার থেকে বেশি চিন্তা করে, নিরাপদ ভাবে কোথায় থাকবো ?
◆ কলকাতা নগরীর মহিলারা বিভিন্ন প্রকার ব্যবসা সহ চাকরি করতে পারে কিন্তু অধিকাংশ মহিলা পাশাপাশি পতিতা হয়ে দেহ বিক্রি ব্যবসা করছো।
কারণ সেই সব নারীরা বিবাহিত জীবনে কখনো সংযমের মধ্যে দিয়ে আসেনি।
◆ বৃন্দাবন থেকে কলকাতা আসার আমার খুব আগ্রহ হওয়ার কারণ, আমি আশা করে ছিলাম, আর যাহাই হোক অন্তত মাস্টার মহেন্দ্রর সাথে দেখা হলে, হয়তো কোন একটা ব্যবস্থা হবে। কিন্তু উদ্ধার আশ্রম এসে বুঝতে পারলাম কোনভাবেই সম্ভব নয়।
◆ উদ্ধার আশ্রমে আশ্রিত কালী দাসীর সাথে কথা বলে তার জীবনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটনা জানতে পারলাম।
◆ কালীদাসী এক সময় কামার সম্প্রদায়ের মেয়ে ছিল। তার অপরূপ সৌন্দর্যের রূপসী হওয়ার কারণে তার জীবনে চরম সর্বনাশ নেমে আসে।
◆ বর্ধমান জেলার কোন এক গ্রাম বাংলার পল্লী বধু ছিল। অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়ার কারণে পাড়ার ছেলে বুড়ো সবার নজর কালীদাসীর উপর।
◆ স্বামীর সাথে বাড়িতে থাকাকালীন একদিন রাতে
কিছু জানা শোনা দুর্বৃত্তরা তার স্বামীকে মারধর করতে করতে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে। আর কালীদাসী কে জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
◆ দুর্বৃত্তেরা এক বছর ধরে কালীদাসী কে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় আর লাগাতার কয়েক জন মিলে ধর্ষণ চালিয়ে যায়। তারপর কালীদাসী পালিয়ে এক বছর পর বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসে।
◆ অপহরণ কারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় কিন্তু মামলা চলাকালীন তার স্বামীর জানিয়ে দেন, কালীদাসী কে আর গ্রহণ করতে পারবে না-কারণ
কালীদাসী বহু পুরুষের মাধ্যমে ধর্ষিত নারী।
◆ কালীদাসীর উপর সামাজিক ও বাবা-মায়ের পরিবারের সদস্যদের থেকে পারিবারিক অত্যাচার শুরু হয়।
◆ বয়স্ক বাবা-মায়ের চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই তাদের করার ছিল না। ধর্ষিতা বলে সমাজের কাছে নিন্দিত হয়ে পদে পদে অপমানিত হতে থাকে।
◆ পাড়ার ছেলেরা কটাক্ষ করে দৈহিক মিলনের কথা বলতে থাকে, কিছু বলতে গেলে উল্টো কথা শোনায়। এমন ভাব দেখায় কালীদাসী নিজের ইচ্ছায় অপহরণ কারীর সাথে চলে গেছে।
◆ বাড়ির কোন মেয়ে ধর্ষিত হলে কিন্তু সেই পরিবারের সদস্যদের সমাজের বুকে মান সম্মান থাকে না।
◆ এসব বিভিন্ন কারণে ধর্ষিত মেয়ে সংসারের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায় আর পরিবারের সদস্যরা তাদের ঘাড় থেকে বোঝা কে নামানোর জন্য বিভিন্ন কৌশলে মানসিক ভাবে অত্যাচার চালিয়ে যায়।
◆ সমাজ ব্যবস্থা মানুষগুলো গঙ্গা জলে হাত ধুয়ে বলবো, যত দোষ ঐ ধর্ষিত মেয়ে ।
◆ ধর্ষিত মেয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার করার জন্য বিকল্প পথ হিসেবে বেশিরভাগ মেয়েরাই পতিতা বৃত্তি অবলম্বন করতে বাধ্য হয়।
◆ সমাজের কোন পুরুষ ধর্ষিত মেয়ে কে বিয়ে করে সংসার করতে চাই না।
◆ পতিতা হলে দৈহিক মিলনের সুখ ও জীবন ধারণ করার জন্য টাকা এসে যায়।
◆ নিকটতম এক আত্মীয় সম্পর্কে বিয়াই কিন্তু কয়েক মাস ধরে কাম চরিতার্থ করার পর তার পরামর্শ অনুসারে কালীদাসী পতিতা বৃত্তি অবলম্বন করার ইচ্ছা হয়।
◆ অপহরণ কারীর বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে বর্ধমান শহরের এক উকিল বাবুর জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন সময়ে কালীদাসী মনের ইচ্ছা ও নিরাপত্তা হীনতায় ভোগান্তি চরম পর্যায়ে তা উকিল বাবু কে জানায়।
◆ উকিল বাবু কালীদাসী কে কলকাতার নারী উদ্ধার আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। আর উদ্ধার আশ্রমের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। মামলার শুনানির তারিখ পড়লে, উকিল বাবুর মাধ্যমে বর্ধমান জেলা কোর্টে নিয়ে যায় আবার রেখে যায়।
◆ সুভাষিনী তার বান্ধবীদের বলে :- বুঝতে পারছি, নারী উদ্ধার আশ্রমটি কিন্তু আমাদের পক্ষে নিরাপদ স্থান না। এখানেও নারীদের কে ভোগ পর্ণ করে রাখা হয়েছে। আশ্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুরুষরা কিন্তু তাদের ইচ্ছামত আমাদের কে ভোগ করে চলেছে।
◆ রাজবালা বলে :- এখানে থাকা খাওয়া পোশাক আশাকের কোন অভাব নেই কিন্তু যাহারা রূপ যৌবন সম্পন্ন, তাহাদের প্রতি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাহারও কাহারও একটু বিশেষ দৃষ্টি পড়ে।
◆ সুভাষিনী বলে :- আমাকে কোন কাজকর্ম করতে দেওয়া হয় না। হঠাৎ করে আমার থাকার ঘর বিবিধ আসবাবপত্র সজ্জিত করতে শুরু করে।
◆ আমার ভাল কাপড় চোপড়, দামি জামা সেমিজ, পরিপাটি বিছানা। কিন্তু অন্য সব মেয়ের জন্য করা হয়নি। আমার উপর কর্তৃপক্ষের মানুষের নজর লেগেছে।
◆ অন্যান্য মেয়েরা হাসতে হাসতে বলে :- এবার তোর কপাল ফিরছে কিন্তু বাবুদের দৈহিক মিলনের খুশি রাখতে হবে।
◆ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত একজন ভদ্রলোক (এক) সুভাষিনী কে নিরিবিলি পরিবেশে ছাদে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন গল্প করতে করতে প্রেম নিবেদন করে ।
◆ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকের (এক) হাত ধরে সুভাষিনী বলে :- ফুটন্ত পদ্ম ফুলের পাপড়ির উপর বসে কিন্তু ভ্রমর হয়ে মধু পান করবেন, রাতে ঘরে আসুন।
◆ সুভাষিনী সহ আরো কয়েকটি মেয়ে ঘরে প্রায় রাতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকদের আসা যাওয়া চলতে থাকে।
◆ সুভাষিনীর কয়েক মাস পর অন্যান্য মেয়েদের ডেকে পরামর্শ দেয়, তাদের কাছে আসা পুরুষের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার।
◆ একদিন রাতে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সুভাষিনী তার প্রেমিক ভদ্রলোক (এক) কে আদর করে বলে :- তোমাকে বিয়ে করে সংসার করার ইচ্ছা হয়েছে।
◆ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোক (এক) বলে :- তা কিন্তু কখনো সম্ভব না। আমার বাড়িতে বউ আছে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তাহলে বাড়ির বউকে নিয়ে থাকো। আমার মতো আনন্দ, ফুর্তি ও সুখ শান্তি কিন্তু তোমার বউ দিতে পারবে না।
◆ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোক (এক) বলে :- তা; তুমি ঠিক বলেছ কিন্তু আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না।
◆ চার জন নারী এক জায়গায় বসে আলোচনা শুরু করে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বন্ধুরা; যদি রূপ যৌবন কে বিক্রি করতে হয়, তবে লুকিয়ে চোরের মত কেন! একেবারে প্রকাশ্যে পতিতা বাজারে নেমে, দর কষাকষি করে উপযুক্ত মূল্যে দেহ বিক্রি করব।'
◆ তিন বন্ধু হাতে তালি দিয়ে বলে :- সুভাষিনী; ঠিক বলেছিস।
◆ সুভাষিনী বলে :- কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকদের আজ থেকে বিনামূল্যে দেহ পরিষেবা বন্ধ হোক ।
◆ রাজবালা ,কালীদাসী, ময়না ও সুভাষিনী নিজেদের মধ্যে হওয়া সিদ্ধান্ত অনুসারে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকদের কে রাতে, কেউ তাদের ঘরে না নিয়ে কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
◆ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকরা অপমানিত বোধ করে চার জন নারীর উপর জুলুম ও অত্যাচার শুরু করে।
◆ চার জন এক সাথে সুভাষিনীর ঘরে বসে আলোচনা শুরু হয়।
◆ সুভাষিনী বলে :- দিন দিন আমাদের উপর যে অত্যাচার শুরু হয়েছে তাতে উদ্ধার আশ্রমে আর থাকা যাবে না।
◆ রাজবালা বলে :- কথাটা ঠিক বলেছিস কিন্তু আমরা নিরাশ্রয়, নিঃসহায়, কোথায় যাবে বল?
◆ কালীদাসী বলে :- স্বেচ্ছায় কিন্তু আমাদের এখান থেকে যেতে দেবে না কারণ আমাদের দেখিয়ে এরা ভারত সরকার সহ বিভিন্ন দাতাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে থাকে।
◆ ময়না বলে :- সুভাষিনী আজকের সংবাদপত্র পড়ে আমাদের শোনান।
◆ উদ্ধার আশ্রমের যত জন নারী আছে, তাদের মধ্যে একমাত্র সুভাষিনী উচ্চ শিক্ষিত মহিলা বলে সবাই সম্মান করে থাকে।
◆ সুভাষিনী বিভিন্ন ধরনের খবর পড়ে শোনাতে থাকে। তারপর শেষে বিজ্ঞাপন পড়ে শোনায়।
◆ রাজবালা বলে :- চল; সবাই নার্সের কাজ শিখি।
◆ কালীদাসী বলে :- আশ্রমের কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা না করলে তো হবে না। আমরা শুধু আশায় আশায় দিন গুনি কিন্তু আশা পূরণ হয় না।
◆ সুভাষিনী বলে :- এখানকার থেকে বৃন্দাবনে মোহন্ত মহারাজের আশ্রমে অনেক ভালো ছিলাম, কারণ নিজের স্বাধীনতা নিয়ে চলাফেরা করতে পারতাম আবার ইচ্ছামত যেখানে সেখানে ঘুরতে যেতাম ।
◆ ময়না বলে :- আমরা ভালোভাবে বাঁচতে চাইলে কি হবে! আমাদের কিন্তু সমাজের বিশিষ্ট মানুষেরা বাঁচতে দেবে না।
◆ রাজবালা বলে :- সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে পতিতা বৃত্তি অবলম্বন করা তারপর পতিতা বৃত্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য "নারী উদ্ধার আশ্রম" আসা।
◆ সুভাষিনী বলে :- আর উদ্ধারের নাম করে কিন্তু কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকেরা, মনের আনন্দে নারীদের ভোগ করে চলেছে।
◆ রাজবালা বলে :- রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, আশ্রিত নারীদের দুঃখ থাকবে চিরকাল।
◆ এক মাস পর আশ্রমের প্রধান কর্তৃপক্ষ ও সমাজ সেবক একদিন আশ্রম পরিদর্শন করতে আসেন।
◆ সুভাষিনী বলে :- আমাদের উদ্ধার কর্তা মহাশয়, আমাদের নার্সের কাজ শেখার ইচ্ছা হয়েছে।
◆ আশ্রমের প্রধান কর্তৃপক্ষ ও সমাজ সেবক বলেন :- এত ভীষণ আনন্দের খবর, তোমাদের নার্সিং ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
◆ প্রাথমিক কিছু শিক্ষা দেওয়ার নিমিত্তে একজন ডাক্তার নিযুক্ত করেন। মাঝে মাঝে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে নানাবিধ যন্ত্র ও ঔষধাদির নাম মুখস্ত করিয়ে ও খাতা কলমে লিখে নিয়ে আসা। তিন মাস পর্যন্ত ভালোভাবে সবাই নার্সের কাজের মোটামুটি ধারণা লাভ করে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- আশ্রমের দায়িত্ব থাকা পুরুষের দ্বারা আশ্রিত নারীদের উপর চরম সীমা ছাড়া অত্যাচার শুরু হয়েছে।
◆ একরাতে নলিনী নামে এক নারী অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়, আর নলিনী সহ্য করতে না পেরে উক্ত পুরুষ কে রাতের অন্ধকারে বটি দিয়ে পিছন থেকে আক্রমণ করে কলা কেটে দেয়।
◆ তারপর দোতলা থেকে ঝাঁপিয়ে পাশের বাড়ির
ছাদে পড়ে। বাড়ির মালিক নলিনী কে লোকাল থানায় নিয়ে যায়।
◆ নলিনী তার অপরাধ স্বীকার করে বলে :- নারী উদ্ধার আশ্রমের নাম করে নারীদের উপর যৌন নির্যাতন করে থাকে। আশ্রিত নারীদের কে রক্ষা করুন।
◆ নারী উদ্ধার আশ্রমে পুলিশ আসে, সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সকল নারীরা তাদের উপর যৌন নির্যাতনের কথা বলে।
◆ পুলিশ; আশ্রমের দায়িত্ব থাকা একজন বয়স্ক ব্যক্তি হারুন অর রশিদের নামে কোন অভিযোগ পায় না।
◆ পুলিশ; আশ্রিত নারীদের কাছে থেকে অভিযোগ পেয়ে, বাকি সব পুরুষদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।
◆ পুলিশ চলে যাওয়ার পর হারুন অর রশিদ সব নারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন :- বাঁচতে হলে এখান থেকে সবাই পালাও , রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে খাবে তবুও এই আশ্রমে আরামে থেকো না।
◆ নারী উদ্ধার আশ্রম অসংরক্ষিত হয়ে পড়ে, আর এই সুযোগে সুভাষিনী, রাজবালা, কালীদাসী ও ময়না আলোচনা করে আশ্রম থেকে পালিয়ে যায়।
----------------------------------------------------------
।। বত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। তেত্রিশ অধ্যায় ।।
।। বাবা কর্তৃক মেয়ে ধর্ষন ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদ ভাবে :- সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি বৈচিত্রময় আর তার বিচিত্র লীলা। সৃষ্টির প্ররাম্ভ ভাই-বোন মিলিত হয়ে জগত সংসার সৃষ্টি করে। আবার মহাভারতের একটি পর্বে দেখা যায়, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার সৃষ্টি অর্থাৎ মেয়ে সন্ধ্যার রূপ লাবণ্য দেখে কামাসক্ত হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার সাথে দৈহিক ভাবে মিলিত হওয়ার জন্য তাকে তাড়া করে।
◆ সন্ধ্যা নিজের ইজ্জত ও মান সম্মান বাঁচাতে দ্রুত বেগে আকাশ মার্গ দিয়ে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে বাঁচাও বাঁচাও বলতে থাকে। সেই মুহূর্তে হর হর মহাদেব সন্ধ্যা কে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করে।
◆ বিভিন্ন পুরাণে যদিও সরস্বতী ব্রহ্মার কন্যা এবং সরস্বতীর সাথে ব্রহ্মা অজাচারে লিপ্ত হয়েছিলেন। স্কন্দ পুরাণ ব্রহ্মখণ্ড ব্রহ্মা কে গায়ত্রী ও সরস্বতী পতি রূপে দেখা যায়।
◆ তবে স্কন্দ পুরাণে ব্রহ্মা কে তার ‘বাক’ নামক কন্যার সাথে অজাচারে লিপ্ত হতে দেখা যায়।
◆ পুরাণ বর্ণনাকারী সূত নামক ঋষির বলেন,
“ বিপ্রগণ! পূর্বে প্রজাপতি কামুক হয়ে মোহর ক্রমে বাক নামের নিজ কন্যার প্রতি আসক্ত হন। কন্যা বাক প্রজাপতির কামুক মনোভাব বুঝতে পেরে লজ্জায় মৃগী রূপ ধারণ করেন। তখন ব্রহ্মা হরিণ হয়ে তার সাথে রমণ করতে অভিলাষী হন।
◆ বাগদেবী হরিণী রূপে গমন করলে, মৃগ রুপ ব্রহ্মা তার অনুগমন করেন।“ (স্কন্দ পুরাণ/ব্রহ্মখণ্ড/সেতু মাহাত্ম্য পর্ব/ অধ্যায় ৪০)
◆ দেবতাগণ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কন্যা সঙ্গমে উদ্যত দেখে তার নিন্দা করতে থাকেন।
◆ দেবতারা বলেন, এই ব্রহ্মা কন্যা গমনে উদ্যত হয়ে বড়ই অকার্য করছেন।
◆ ব্রহ্মাকে এই ধরণের অবৈধ কাজে লিপ্ত দেখে শিব ব্যাধের রূপ ধারণ করে মৃগরূপী ব্রহ্মাকে হত্যা করেন।
◆ ব্রহ্মা নিহত হলে , ব্রহ্মার স্ত্রী গায়ত্রী এবং সরস্বতী কঠোর তপস্যা করে শিবকে সন্তুষ্ট করেন। শিব সন্তুষ্ট হলে ব্রহ্মা আবার জীবিত হয়ে ওঠেন।
◆ ব্রহ্মা জীবিত হয়ে মহেশ্বরকে বলেন, হে দেব দেবেশ! হে করুণা কর, শঙ্কর! তোমায় নমস্কার করি। হে প্রভু, করুণা সিন্ধু ! পাপাচরণ হতে আমাকে পরিত্রাণ করো। হে শম্ভু, তোমার কৃপায় আমার যাতে কখনো নিষিদ্ধাচরণে পুনরায় আর প্রবৃত্তি না হয়, তুমি আমায় এভাবে সবসময় রক্ষা কর।
◆ শিব ব্রহ্মা কে বলেন, তথাস্তু! হে বিধি! অতঃপর তুমি আর প্রমাদে পতিত হয়ো না। কুপথে চলা সমস্ত পুরুষদের আমি সর্বদা শাসন করি।
◆ ইসলাম ধর্মের কোরআন থেকে জানা যায়, নবী হযরত লুত তার দুই মেয়ের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের কাহিনী।
◆ বর্তমান সময়ের সমাজের দিকে তাকালো কিন্তু এরকম ঘটনা দেখা যায়।
◆ ◆ বিনোদ ভাবে:- ভারতবর্ষ সহ এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বিভিন্ন দেশের ও রাজ্যের বড় বড় প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী গণ নেতা, মন্ত্রী সহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা কিন্তু আইন তৈরি করে উঁচু গলায় চিৎকার করে বলেন :- বেটি "বাঁচাও আর বেটি পড়াও" স্লোগানের মাধ্যমে মুখরিত করে তোলে।
◆ বাস্তবে দেশের ঘরে ঘরে নারী নির্যাতন, ঘরে বাইরে নারী ধর্ষিতা হচ্ছে। তাহলে মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়! মেয়েদের জন্যে অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়ে আসা হয়েছে, ঠিক কিন্তু বাস্তবে আসলে কিচ্ছু হয়নি।
◆ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দোষ দিচ্ছে, মেয়েদের পোশাকের কিন্তু আসলে কি কথাটি সত্য?
◆ সংসার জীবনের মেয়েদের বিশ্বাসের জায়গা হচ্ছে, তার বাবা, ভাই, দাদা আবার গৃহবধুর বিশ্বাসের জায়গা তার স্বামী, শশুর, দেবর ও ভাসুর।
◆ এই বিশ্বাস ভঙ্গ করে যদি মেয়ে তার বাবার যৌন লালসার শিকার হয় সেই মুহূর্তে কি বলবে?
◆ ◆ দেশের দৈনিক পত্র-পত্রিকার শিরোনামে চোখ রাখলে কিন্তু দেখা যায়। পিতার দ্বারা মেয়ে কে ধর্ষণ, এমন জঘন্য ঘটনা সমাজের বুকে ঘটে চলেছে। এরা নাকি মেয়ের জন্মদাতা পিতা?
◆২০২০ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের বাড্ডা থানা এলাকায় এক বাবা কামাল হোসেন ঘর ভাড়া নিয়ে নিজের ১৩ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে।
◆ ২০১১ সালে মেয়েটির বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর সে তার দাদীর (দিদিমার) কাছে থাকতো। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কামাল হোসেন আবার লিপি বেগম নামে আরেকজনকে বিয়ে করে।
◆ ২০১৯ সালের এপ্রিলে কামাল হোসেন তার মেয়েকে নিয়ে রূপনগর আবাসিক এলাকার বস্তির বাসায় যান। আর এই মেয়ে কে নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়।
◆ ২০২০ সালের ২ মে মেয়েকে নিয়ে বাবা কামাল হোসেন বাড্ডার আব্দুল্লাহবাগে বাসা ভাড়া নেন। তিন পর অর্থাৎ ৫ মে কামাল হোসেন তার কিশোরী মেয়েকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে ধর্ষণ করে।
◆ কিশোরী মেয়ে নুরজাহান পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানিয়ে, তাদের সাহায্যে বাড্ডা থানায় উপস্থিত হয়ে তার বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করে দায়ের করে।
◆ পুলিশ কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে আর নুরজাহান কে সরকারি হোমে পাঠিয়ে দেয়।
◆কামাল হোসেন পুলিশের লাঠির ঘায়ে সবকিছু স্বীকার করে নেয়। ধর্ষণকারী কে জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের করে জেলে পাঠানো হয়। মামলা আদালতে তোলা হয়।
◆২০২২ সালে আদালতের বিচারক কামাল হোসেন কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
◆◆ বিনোদ ভাবে সেই দিন আরেকটি ঘটনা পড়লাম।
◆ কিশোরী মেয়েকে টানা ধর্ষণের অভিযোগ উঠল বাবার বিরুদ্ধে । নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হলো বাবা।
◆ পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি থানার অন্তর্গত দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় ২০২৩ সালে নক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে।
◆ ১২ বছরের অর্পিতা হঠাৎ করে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা সহ বমি করতে শুরু করে।
◆ অর্পিতার মা তার মেয়েকে রাগারাগি ও বকাবকি করে বলে :- এই বয়সে হতচ্ছারী কার সাথে কি করেছিস বল, সেই ছেলেটার নাম?
◆ অর্পিতা কান্না করতে করতে বলে :- কয়েক মাস ধরে বাবা আমাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে কি সব করে? আমার খুব কষ্ট হয় মা।
◆ আবার বাবা আমাকে বলে, যদি কাউকে বলিস তাহলে তোদের সবাইকে মেরে ফেলবো।
◆ মা আমি বাঁচতে চাই আর লেখাপড়া শিখতে চাই। আমাকে বাবার হাত থেকে বাঁচাও।
◆ অর্পিতার মা পারুল দেবী তার মেয়ে কে সাথে করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে, রিপোর্ট নিয়ে হলদিবাড়ি থানায় তার স্বামী মদনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন।
◆ পুলিশ ধর্ষণকারী বাবা কে গ্রেপ্তার করে কোর্টে চালান করে।
◆ ধর্ষণকারী বাবার পরিবারের সদস্যরা অর্পিতার মা কে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং বলে মামলা তুলে না মিলে মা-মেয়ে দুজনকেই শেষ করে দেবে।
◆ অর্পিতা কে আদালতের নির্দেশে সরকারিভাবে মেডিকেল করানো হয় মেডিকেলে প্রমাণিত হয় বাবার দ্বারা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে। মামলা আদালতে বর্তমান বিচারাধীন।
◆ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বন্দরে নিজ মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে লম্পট পিতা মুসলিম মিয়া ৫০ বছর বয়সের ব্যক্তি কে, বন্দর থানা পুলিশ দক্ষিণ লক্ষণখোলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।
◆
বন্দরের দক্ষিণ লক্ষণখোলা এলাকার কালাম মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া লম্পট মুসলিম মিয়ার স্ত্রী কোহিনূর গার্মেন্টেসে কাজে গেলে সে প্রায় সময় মেয়েকে জোর পূবর্ক ধষণ করে।
◆লোক লজ্জার ভয়ে মেয়ে কাউকে কিছু বলতো না। দীর্ঘ ১ বছর যাবত সে মেয়েকে ধর্ষণ করে আসছিল।
◆ পিতার অনৈতিক কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে অবশেষে মেয়ে ঘটনাটি তার মাকে বলতে বাধ্য হয়।
◆ পরে মা তার মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। এতে করে লম্পট মুসলিম মিয়া, মা-মেয়েকে নানা ভাবে হুমকি দিতে থাকে।
◆ অবশেষে উপায় অন্তর না পেয়ে বিষয়টি এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের জানালে, এলাকাবাসীর সহায়তায় থানায় এসে মেয়ে বাদী হয়ে পিতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
◆ পুলিশ লম্পট পিতাকে গ্রেফতার করে দুপুরে আ্দালতে পাঠায়।
◆ বন্দর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আজহারুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি ন্যাক্কারজনক। পিতা কর্তৃক কন্যা ধর্ষণ মহাপাপ। আমরা ধর্ষিতার অভিযোগের সাথে সাথে মামলা নিয়ে লম্পট পিতাকে গ্রেফতার করেছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
◆ বিনোদ ভাবে :- কী জঘন্য পর্যায়ে চলে গেছে সমাজ। কতটা পুরুষতান্ত্রিক হলে পরে এই পর্যায়ে আসা যায়! মেয়ে কাকে বিশ্বাস করবে! বাবাকে-ভাইকে ! না অন্যকে?
◆ অভিযুক্ত মান্নান মল্লিক (৪০) পশ্চিমবঙ্গের বাদুড়িয়া থানা এলাকার বাসিন্দা। পেশায় যে চাষবাস ও ব্যবসা করেন।
◆ মান্নান মল্লিকের দুই বিয়ে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর দুই মেয়ে। এক মেয়ের বয়স ১৫ বছর, অন্যের বয়স ১২ বছর।
◆ চরিত্রহীন লম্পট ধর্ষকের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে মিল হচ্ছে না। আর ঘটনার তিন বছর আগে থেকেই তার স্ত্রী বাপের বাড়িতে থাকতে শুরু করে।
◆ আর দুই মেয়ে অভিযুক্ত মান্নানের কাছে থাকত। মা মাঝে মাঝে সন্তানদের দেখতে আসে। আবার মাঝে মাঝে মেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে আসে। কিছু দিন পর আবার দুই মেয়ে তার বাবার কাছে রেখে যায়।
◆ মান্নানের স্ত্রী তার দুই মেয়েকে বাপের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসে । আর তাঁর বড় মেয়েটা খুবই ছটফটে ছিল কিন্তু হঠাত্ করে একেবারে চুপ মেরে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। মায়ের মনে কিছু সন্দেহ জাগে। খটকা লাগে যে হঠাত্ কেন এমন হলো?
◆ সচেতন মা মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতেই হতবাক। ১৫ বছরের কুমারী মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা!
◆ মান্নানের স্ত্রী তার মেয়ের কাছ থেকে সমস্ত ঘটনার কথা জানতে পারেন । ক্ষোভে ফেটে পড়েন। আর তিনি চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। বাবা হয়ে মেয়ের উপর এতবড় অন্যায় করেছে, এটা জেনে স্থির বসে থাকেননি।
◆ মান্নানের স্ত্রী তার লম্পট স্বামীর শাস্তির দাবিতে বাদুড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
◆ বাদুড়িয়া থানার পুলিশ অভিযুক্ত মান্নানকে গ্রেপ্তার করে। মান্নানের স্ত্রী তার স্বামী কে কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
----------------------------------------------------------
।। তেত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। চৌত্রিশ অধ্যায় ।।
।। ধর্ষণের পরিসংখ্যান ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদ ভাবে :- মেয়েদের নিজের বাড়িতে নিরাপদ নয়, তাহলে বাইরে নিরাপত্তা কোথায় পাবে?
◆ ◆ ধর্ষণ ; এক ধরনের যৌন নিগ্রহ। সাধারণত একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়।
◆ ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে।
◆ অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়া ধর্ষণের আওতাভুক্ত। ধর্ষণ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে কখনো কখনো 'যৌন আক্রমণ' শব্দ গুচ্ছে ব্যবহৃত হয়।
◆◆ যে কোনো লিঙ্গ, বয়স, জাতি, সংস্কৃতি বা ধর্মের ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারে। ধর্ষণকে বেশ কয়েকটি ধরনের ভাগ করা হয়,
◆ যেমন- গণধর্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, অজাচার ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, কারাগারে ধর্ষণ এবং যুদ্ধকালীন ধর্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে কোনো রকম শারীরিক ক্ষতির শিকার না হয়ে, কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারে।
◆◆ সমাজের ধারণা প্রচলিত আছে, ধর্ষিত শুধু নারীরাই হয়, তাহলে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
◆ আজকাল ধর্ষিত হয় ১০ বছরের ছেলে এমনকি ট্রান্সজেন্ডার মানুষ। মিডিয়াতে উঠে আসে শুধু নারী ধর্ষণের কথা।
◆ শিশু ধর্ষণ, এমনকি গণধর্ষণের হাত থেকে হিজড়ারাও রেহাই পায় না।
◆ অনেক সময় আইনের ফাঁক ফোকড় গলে বিভিন্ন দেশে নারী ভিন্ন অন্য কেউ ধর্ষণ হলে, সেটা কোন ধারায় পড়বে সেটা বের করতে হিমশিম খায় সে দেশের আইন রক্ষাকারী বাহিনীর।
◆◆ ২০১৩ আমেরিকার এফবিআই ধর্ষণের সংজ্ঞা পরিবর্তন এনেছে। ১৯২০ সালের পুরনো সংজ্ঞা কে ছুড়ে ফেলে নতুনভাবে ধর্ষণ কে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
◆ নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী অনুপ্রবেশ, যতটুকুই হোক না কেন, সেটা ভ্যাজাইনা অথবা পায়ুপথের সাথে দেহের যেকোনো অংশ বা কোনো বস্তুর, অথবা অন্য কারো যৌনাঙ্গের মৌখিক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, ভিকটিমের কোনো সম্মতি ছাড়াই।
◆ উপরোক্ত সংজ্ঞানুসারে ধর্ষনের সংজ্ঞার আওতায় শুধু নারীই নন, এখানে শিশু থেকে শুরু করে যে কেউ এবং সেটা যে যৌনাঙ্গের মাধ্যমে ধর্ষণ হবে সেটা নয়, কোনো বস্তুর মাধ্যমে এমনকি ওরাল সেক্স ও এর আওতায় এসেছে।
◆◆ দ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো একটি রিপোর্ট পেশ করেছেন। সেই রিপোর্ট অনুসারে পরিসংখ্যান বলছে ।
◆◆ প্রতি ১৬ মিনিটে অন্তত ভারতবর্ষে একজন মেয়ে ধর্ষিত হয়। যা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
◆◆ প্রতি ঘন্টায় ভারতবর্ষে একটি মেয়েকে পণের জন্য খুন হতে হয়। গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন এই রিপোর্ট দেশবাসীর ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও উদ্যোগ নিয়ে একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠে আসছে।
◆◆ প্রতি চার মিনিটে ভারতবর্ষে একটি মেয়ে তার শ্বশুরবাড়ির লোক অথবা স্বামীর হাতে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হন।
◆◆ প্রতি দু’দিনে ভারতবর্ষের একজন মেয়ের উপর অ্যাসিড আক্রমণ হয়।
◆◆ প্রতি ৩০ ঘন্টায় অন্তত ভারতবর্ষে একজন মেয়ে গণধর্ষণের শিকার হয়।
◆◆ প্রতি দু’ঘণ্টায় অন্তত ভারতবর্ষে একটি মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।
◆◆ প্রতি ৬ মিনিটে ভারতবর্ষে একটি মেয়েকে যৌন হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয়।
◆◆ প্রতি চার ঘন্টায় অন্তত ভারতবর্ষে একটি মেয়ে পাচার হয়ে যায়।
◆◆ উত্তরপ্রদেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় গর্জে উঠেছে গোটা দেশ। হাথ রাসের পর ধর্ষণের ঘটনা থেমে নেই। পরপর বলরামপুর, বুলন্দশহর এবং ভাদোহী এলাকায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
◆ উত্তরপ্রদেশের মূখ্যমন্ত্রীর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের নারী নির্যাতনে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে।
◆◆ গোটা দেশে নারী সুরক্ষা এখন প্রশ্নের মুখে। তার মধ্যে এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসায় দেশের ভাবমূর্তি যে উজ্জ্বল হচ্ছে না তা প্রমাণিত।
◆ বিনোদ ভাবে :- জাতিসংঘের পরিসংখ্যান দেখা যাক, নারীদের স্থান কোথায়।
◆◆ জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব ক্রাইম ট্রেন্ড রিপোর্টের ২০১৫ সালের ভার্সন থেকে জানা যায়।
◆◆ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ; প্রতিবছর সবচেয়ে বেশী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১০টি দেশের নামের তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বর আছে। আর ভারত চতুর্থ নম্বর।
◆◆ ধর্ষণ অপরাধে বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
◆ এক নম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
◆ দুই নম্বরে সাউথ আফ্রিকা ।
◆ তিন নম্বরে সুইডেন।
◆ চার নম্বরে ভারত।
◆ পাঁচ নম্বরে যুক্তরাজ্য।
◆ ছয় নম্বরে জার্মানি।
◆ সাত নম্বরে ইউরোপের ফ্রান্স।
◆ অষ্টম নম্বরে আরেক উন্নত রাষ্ট্র কানাডা।
◆ নয় নম্বরে শ্রীলংকা। এশিয়ার সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কা।
◆ দশম নম্বরে ইথিওপিয়া।
◆◆ নারীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক রাষ্ট্র ভারত। ভারতে গাড়িতে, প্রকাশ্য রাস্তায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথা যে কোনো স্থানে নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।
◆ বিনোদ ভাবে, ভারতেরই জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর এক হিসেব থেকে জানা যায়।
◆ ২০১২ সালে ২৪,৯২৩টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
◆ এর মধ্যে ২৪, ৪৭০টি ঘটনায় ধর্ষকের ভূমিকায় ছিল বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অন্যান্য পরিচিত জন।
◆ নারীদের পরিচিত জনের মাধ্যমে প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে ।
◆ সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়।
◆ ২০১০ সালের জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রথম ১০ টি বিপদজনক দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান তৃতীয় ছিল ।
◆ অন্যদিকে মানুষ হত্যার সংখ্যার বিচারে ২০১২ সালের এক হিসেবে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয় বলে জানা যায়।
◆ ২০২১ সালে ভারতে হু হু করে বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যা।
◆◆ বিনোদ ভাবে, জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো এর তরফ থেকে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে দেখা গিয়েছে,
◆ ২০২১ সালে ভারতে মোট ৩১ হাজার ৬৭৭ টি ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে।
◆ প্রতিদিন পুলিশের কাছে ভারতে ৮৬টি নতুন ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে।
◆ মহিলাদের হেনস্থার ঘটনা প্রতি ঘণ্টায় জমা পড়েছে ৪৯টি করে।
◆ ২০২০ সালে দেশে মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিল ২৮ হাজার ৪৬ টি।
◆ ২০১৯ সালে ছিল ৩২ হাজার ৩৩টি। ২০১৮ সালের তুলনায় সেই সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
◆◆ বিনোদ ভাবে, রাজ্য ভিত্তিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে,
◆ রাজস্থানে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে, শেষ বছরে সেই সংখ্যাটি ৬ হাজার ৩৩৭ টি। তালিকায় সবার উপরে রয়েছে রাজস্থান।
◆ এর পরে তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (২,৯৪৭) ◆ তারপর তালিকায় রয়েছে মহারাষ্ট্র (২,৪৯৬),
◆ উত্তরপ্রদেশ (২,৮৪৫), দিল্লিতে মোট ১,২৫০ টি ধর্ষণের ঘটনা পুলিশের কাছে জমা পড়েছে।
◆◆ লাখ পিছু মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনার তালিকাতেও সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে রাজস্থান, সেখানে গড় ১৬.৪, তারপর রয়েছে ছত্তীসগঢ় (১৩.৩), দিল্লি (১২.৯), হরিয়ানা (১২.৩), অরুণাচল প্রদেশ (১১.১)৷ দেশের ক্ষেত্রে এই গড় ৪.৮৷
◆◆ বিনোদ ভাবে, এনসিআরবির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে ভারতে নারীদের বিরুদ্ধে মোট ৩৭ লাখ ১ হাজার ৫০৩টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
◆ ২০১৯ সালে দেশটিতে এই সংখ্যা ৪ লাখ ৫ হাজার ৩২৬টি ছিল।
◆ ২০২০ সালে ভারতে স্বামী অথবা আত্মীয় স্বজনদের দ্বারা নিপীড়ণের শিকার সবচেয়ে বেশি নারী হয়েছে। এই ক্যাটেগরিতে নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে সর্বোচ্চ এক লাখ ১১ হাজার ৫৪৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ।
◆ একই সময়ে দেশটিতে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৬২ হাজার ৩০০টি।
◆ ২০২২ সালে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় শীর্ষ স্থানে ছিল মধ্যপ্রদেশ। রাজ্যটিতে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত ১৭ হাজার ৮টি মামলা দায়ের হয়েছে।
◆ ১৫ হাজার ২৭১টি মামলা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে উত্তর প্রদেশ। এরপর তালিকায় মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গ জায়গা পেয়েছে।
◆◆ বিনোদ ভাবে, "হু"র রিপোর্ট যৌন নির্যাতনের পরিণতি বর্ণিত হয় হয়েছে।
◆ গাইনি ব্যাধি
◆ প্রজনন ব্যাধি
◆ যৌন ব্যাধি
◆ বন্ধ্যাত্ব
◆ শ্রেণীর প্রদাহজনিত রোগ
◆ গর্ভাবস্থায় জটিলতা
◆ গর্ভপাত
◆ যৌন অসামঞ্জস্যতা
◆ যৌনবাহিত রোগ সংক্রমণ
◆ আঘাত থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি
◆ আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি
◆ হতাশা
◆ তীব্র ব্যাথা
◆ সোমাটিক উপসর্গের ব্যাধি
◆ অনিরাপদ অকাল গর্ভপাত
◆ অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ ।
◆ বিনোদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ভাবে , এই তো দেশের চালচিত্র ।
◆ দেশের সরকার আইন তৈরি করে কিন্তু অপরাধ কম হচ্ছে না বরং দিন দিন বেড়ে চলেছে।
◆ ধর্ষনের জন্য কিন্তু ধনঞ্জয়ের মতো বহু ধর্ষকের ফাঁসি হয়েছে, তবুতো ধর্ষনের অপরাধ কম হয়নি।
◆ নদীয়া জেলার রানাঘাট গির্জার বয়স্ক সন্ন্যাসী কিন্তু ধর্ষকের হাত থেকে নিস্তার পায়নি।
◆ এর জন্য সরকারের পুলিশ প্রশাসন অনেক অংশ দায়ী কারণ টাকার বিনিময়ে অপরাধির অপরাধ করার সুযোগ করে দেয়।
◆ বিনোদ ভাবে :- ধর্ষণ কমাতে সরকারের উচিত, পঞ্চায়েত পঞ্চায়েতে যেমন মদের দোকানের লাইসেন্স দিয়ে মদ বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে-ঠিক সেই রূপ পুরুষ ও নারী পতিতালয়ের লাইসেন্স দেওয়া উচিত।
◆ ধর্ষণ মামলায় আইনের জটিলতা কমানোর দরকার, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আইনের ফাঁকে প্রমাণের অভাবে অপরাধী সাজা হয় না।
◆ ধর্ষক কোন মেয়েকে ধর্ষণ করার সময় নিশ্চয়ই কোন সাক্ষী রাখে না।
◆ ধর্ষিতা নারীর মেডিকেল পরীক্ষা করলেই তো প্রমাণ হাতে এসে যায়।
◆ ধর্ষিতা নারীর মুখের কথার কোন মূল্য নেই।
◆ উকিল বা থানা ডায়েরি করতে গেলে কিন্তু আগেই বলবে, ধর্ষণ করার সময় কেউ কি দেখেছে? তোমার সাক্ষী কোথায়?
◆ পুরুষের পক্ষ নিয়ে নারীর বিরুদ্ধে জটিলতা তৈরি করে কিন্তু পুরুষকে আড়াল করার চেষ্টা।
◆ আদালতের উকিল গুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পুরুষ শাসিত সমাজের পুরুষকেই জেতানোর চেষ্টা করে।
◆ আইনের চোখ বাঁধা এটা একটা আইনের ফাঁক তৈরি করে রাখা। উকিল ও বিচারকের ভুল সিদ্ধান্ত এই আইনের ফাঁকে সঠিক হয়ে যায়।
◆ উকিল অপরাধী কে ভালো মানুষ বানিয়ে দেয় আর বিচারক আইনের ফাঁকে রায় দিতে বাধ্য হয়।
কারণ বিচারকের মাতারবাড়ি উকিলের কাছে চলবে না।
◆ বিনোদ ভাবে, সরকার ভদ্রভাবে জনগণের সাথে প্রতারণা করে চলেছে, কারণ সিগারেট বা বিড়ির প্যাকেটে লেখা থাকে "ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, মারাত্মক ক্যান্সারের কারণ হতে পারে" তাহলে এই কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
◆ সরকারের আমলা বলছে, মদ ও বিড়ি সিগারেট কোম্পানি বন্ধ হলে সরকারের রাজকোষে মাসে মাসে কোটি কোটি টাকা জমা হবে না। আর টাকা না আসলে কিন্তু বহু প্রকল্পের টাকাগুলো জনগণ কিভাবে পাবেন?
◆ হাজার টাকা ক্ষতি করে ৫০০ টাকা সরকারি অনুদান পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার। জনগণ আবার গৌরব করে সবাইকে বলে বেড়াবে, আমি সরকারি অনুদান পায়।
----------------------------------------------------------
।। চৌত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। পয়ত্রিশ অধ্যায় ।।
।। বিনোদের দুর্দশা ও প্রাপ্তি ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদ ভাবে :- সুভাষিনী কে মথুরা ছেড়ে দিয়ে হয়তো অন্যায় করেছি কিন্তু আমার সাথে যা ব্যবহার শুরু করে ছিল, তাতে ত্যাগ না করলে হয়তো দুজনের মধ্যে খুনোখুনি হয়ে যেত।
◆ এতে দিনে অবশ্যই সুভাষিনী মা হয়েছে। কিন্তু কুমারী মায়ের অবৈধ সন্তান সমাজের মানুষের কাছে সব সময় লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনে যেতে হবে।
◆ আমাকে তাড়িয়ে সুখে শান্তিতে থাকবে কিন্তু তোমার রূপ যৌবনের কারণে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের মানুষেরা শিয়াল কুকুরের মত টেনে টেনে দেহের রূপ লাবণ্য ছিঁড়ে খাবে।
◆ সেই মুহূর্তে সুভাষিনী তোমার রূপের অহংকার ধুলোর সাথে মিশে যাবে।
◆ কলকাতায় ফিরে আসা কয়েক মাস হয়ে গেল, নিজের চলার জন্য কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কাজ কর্ম পেলাম না।
◆ চাকরির জন্য বহু অফিসের দরজায় ঘুরলাম কিন্তু লাভ হলো না। বর্তমান তো উকিল শশীকান্ত বাবু নেই ,যে চাকরি পাইয়ে দেবে।
◆ সুভাষিনী এর সৎ মায়ের দেওয়া উপহার স্মৃতি চিহ্ন কয়েক ভরি ওজনের সোনার হার সম্বল ছিল। সুভাষিনী তোমার কাছে থেকে কৌশল অবলম্বন করে কিন্তু সোনার হার আমার কাছে চলে আসে।
◆ শুধু রাগ দেখতে পারে কিন্তু মাথায় কোন জটিল বুদ্ধি নাই। পুরুষের ভালবাসার ছলাকলা কিন্তু বোঝার ক্ষমতা নেই।
◆ তোমার রূপ লাবণ্য কাম চরিতার্থ তোমার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে ছিলাম। কিন্তু হৃদয় থেকে কখনো দুজনে ভালবাসার জন্ম হয়নি।
◆ তুমি সব সময় কাম চরিতার্থ আমাকে ব্যবহার করে নিয়েছো।
◆ আমি; তোমাকে বিয়ে করে সন্তানের পিতা হতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি সংসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাওনি। স্বাধীনতা চেয়ে ছিল কিন্তু এবার স্বাধীনতা ভোগ করে।
◆ সুভাষিনীর সেই সোনার হার বিক্রি করে চাকরির পিছনে খরচ আর মদ পানের সাথে সাথে পতিতালয়ে গমন করে কিন্তু অনেক দিন চললো।
◆ সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, আবার ভালো ভালো কাজের সন্ধান পেয়ে ছিলাম। আমার চরিত্র দোষের কারণে ভালো ভালো, জায়গা ও ব্যক্তিবর্গ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে।
◆ বন্ধু ধনঞ্জয়ের বাড়িতে নিরাপদ একটা ভালো আশ্রয় ছিল কিন্তু চরিত্র দোষের জন্য সেখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।
◆ ধনঞ্জয়ের একমাত্র কাকার মেয়ে শর্মিলা গ্রাম থেকে কলকাতা ধনঞ্জয়ের বাড়ি থেকে কলেজে পড়াশোনা করতে আসে। আমার সাথে শর্মিলার অন্তরঙ্গ সৃষ্টি হয় কিন্তু আমার অন্তরঙ্গ মানেই দৈহিক কাম চরিতার্থ করা ছাড়া আর কিছু বুঝি না।
◆ একদিন বন্ধু ধনঞ্জয়ের কাছে ধরা পড়ে যায়।
◆ ধনঞ্জয় উত্তেজিত হয়ে বলল :- তোকে ভীষণ ভাবে বিশ্বাস করতাম। আর তুই আমার বোনের সাথে সম্পর্ক করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস।
◆ বর্তমান তোর যা চরিত্র তাঁতে কিন্তু ঘরের মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করতে আর তোর বিবেকে বাঁধবে না কখনো শয়তান।
◆ তোর মত চরিত্রহীন বন্ধুর আর মুখ দেখতে চাইনা। এই মুহূর্তে আমার সামনে থেকে সরে যা।
◆ আমি মদ পান করি আবার টাকার বিনিময়ে পতিতালয়ে গিয়ে আনন্দ ফুর্তি করি কিন্তু মা-বোন জ্ঞান হারিয়ে যায় না।
◆ বিনোদ রাত দশটার সময় ধনঞ্জয়ের বাড়ি থেকে বের হয়ে গলির মধ্যে দিয়ে শহরের প্রধান সড়কের ফুটপাত রাস্তা দিয়ে অজানার পথে হাঁটতে শুরু করে।
◆ কয়েক বছর পর এক রাতে বিনোদ ভাবে, চরম দুঃখ যখন আসে, সেই মুহূর্তে চারদিক থেকে সবকিছু গ্রাস করে নেয়। কয়েক বছরের মধ্যে পরিবারের মা ও দিদির মৃত্যু ঘটলো আর আমার কাছে পৃথিবীটা শূন্য হয়ে গেল। আর বউ তো বহু বছর আগে আমাকে ত্যাগ করে বাবার বাড়ি চলে গিয়েছে। হয়তো অনেক ভালো আছে।
◆ বিনোদ মদ ও পতিতালয়ের নারীদের নিয়ে পাগলের মত ঘুরতে থাকে।
◆ বিনোদ দিনের আলোয় একটি উদ্যানের ঘাসের উপর শুয়ে ভাবে, বাবার দত্তক নেওয়া বড় ছেলে অর্থাৎ বংশের জেঠা মশাইয়ের একমাত্র সন্তান কিন্তু বাবা-মা হারানো অনাথ ছিল। বর্তমান দাদা বাড়ির প্রধান অভিভাবক। দাদা-বৌদি সব সময় আমার ভালই চেয়েছিল কিন্তু আমি কোন দিন আমার ভালো চাইনি। বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি ও মাঠের জমির যথাযথ ভাবে ভাগ পেয়েছি কিন্তু রক্ষা করতে পারলাম কোথায়?
◆ আমি টাকার অভাবে ধীরে ধীরে বিলাসবহুল মদ পান করা ছেড়ে দিলাম, বাংলা মদ পান করা শুরু করেছি। কয়েক বছরের মধ্যেই মদ পান আর পতিতালয়ে গমণ করে কিন্তু বাড়ি ও মাঠের জমি হারিয়ে পথের ভিখারী হয়ে গেছি।
◆ আমার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বাংলা মদ কেনার পয়সা নেই। অনেক দিন আগে কিন্তু সিগারেট ছেড়ে বিড়ি ধরেছি।
◆ বন্ধুরা সবাই দূরে সরে গিয়েছে। দেখা মাত্রই পাশ কাটিয়ে চলে যায়, কারণ দেখা হলে টাকা ধার চাইতে পারি। বন্ধুদের আর দোষ কোথায়! আমি কোন দিন তাদের টাকা শোধ করি নাই।
◆ বর্তমানে ফুটপাত অন্যান্য ভিখারীর মতো আমি বাস করি। লজ্জা নিবারণের জন্য ভালো পোশাক নেই। এক পোশাক পড়ে বহুদিন কাটিয়ে দিচ্ছি। পেটের খাবার সংগ্রহ করতে করতে ঘাম ছুটে যায় কিন্তু শরীরের তেল সাবান জোটে না।
◆ অনেক গুলো মাতাল বন্ধু জুটেছে, তাদের মাথার উপর কাঁঠাল ভেঙ্গে কোষ গুলো খেয়ে যাচ্ছি কিন্তু আর কতদিন।
◆ বিনোদের চার বছর পর তার এক মাতাল বন্ধুর পরামর্শে বিবেকের চৈতন্য ফিরে আসে।
◆ বিনোদ ভাবে, মাতাল বন্ধু হরিহরের পরিবারের পাশে প্লাস্টিকের ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে কোন রকম ভাবে বাস করছি। চারদিকে নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশের মধ্যে প্লাস্টিক বিছিয়ে শুয়ে পড়ি।
◆ ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা পেটের জন্য দিন মজুরির কাজ থেকে শুরু করেছি, তারপর যখন যে কাজ পায় সেই কাজ করতে থাকি।
◆ বিনোদ প্রতিদিনের অভ্যাস মতো সন্ধ্যার পর সড়কের পাশে ফুটপাতে চায়ের দোকানে বসে দুই বন্ধু মিলে চা ও বিড়ি ফুকতে ফুকতে আড্ডা দেয়।
◆ বিনোদ দৈনিক সংবাদপত্র খুলে পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে একটি বিজ্ঞাপনে চোখ আটকিয়ে যায়, বার বার পড়তে থাকে। তারপর চায়ের দোকানদার কে বলে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা নিয়ে ঝুপড়িতে ফিরে আসে।
◆ পরের দিন বিনোদ কাজে না গিয়ে বিজ্ঞাপনের অনুসারে একটি চাকরির আবেদন পত্র তৈরি করে ডাকঘরের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়।
◆ বিনোদ এক সপ্তাহ পর চিঠি হাতে পেয়ে আনন্দিত হয়ে খুলে পড়তে শুরু করে। চিঠির সারমর্ম হলো, আজ বৃহস্পতিবার কিন্তু শুক্রবার রাত আটটার সময় নিচের ঠিকানায় দেখা করতে হবে।
◆ বিনোদ যথা সময়ে কলকাতা শহরের দর্জি পাড়া লেনের এক গলির মধ্যে দিয়ে জয়বর্ধন মহাশয়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়।
◆ বিনোদ কলিং বেলে চাপ দিতেই ভিতর থেকে আওয়াজ আসে, দরজা খোলা আছে ভেতরে চলে আসুন।
◆ বিনোদ ভেতরে ঢুকে দেখে, সুসজ্জিত ঘরের মধ্যে টেবিলে পাশে দামি মদের বোতল রাখা আছে। আর বাবু একা বসে আছেন ।
◆ বিনোদ ভাবে :- চোখ মুখের চেহারা ও ভাব দেখে মনে হচ্ছে এই বাবু নেশা করেছেন।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় বলেন :- বিনোদ বাবু; আসুন।
◆ বিনোদ একটি চেয়ারে বসে বাবুর সাথে কথা বলতে বলতে বারবার আড়চোখে বিলাতি মদের দিকে তাকায়। তারপর ভাবে ,অর্থের অভাব হওয়ার কারণে বিলাতি মদ পান করা ছেড়ে দেয় কিন্তু অনেকদিন পর দেখে পান করার লোভ হচ্ছে।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় হালকা হালকা করে মদ পান করতে করতে বলেন :- তোমার জীবনের ইতিহাস বলে।
◆ বিনোদ তার জীবনের ঘটনা সংক্ষিপ্তভাবে বলতে শুরু করে।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় বিনোদ কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা ভাবে প্রশ্ন করতে থাকে। আর বিনোদ জবাব দিয়ে চলেছে।
◆ দীর্ঘ সময় ধরে কথাবার্তা বলার পর জয়বর্ধন মহাশয় বলেন :- আমার; একটা রক্ষিতা আছে। রক্ষিতা কে স্বতন্ত্র স্থানে রাখা হয়েছে। উক্ত মহিলার দেখাশোনা সহ বাজার করা, রক্ষিতার আদেশ মতো বাজার থেকে জিনিস কিনে আনা দায়িত্ব পালন করে চলতে হবে।
◆ আর গোপনে গোপনে নজর রাখতে হবে, অন্য কোন পুরুষের সাথে লটরপটর করে কি না।
◆ রান্না করার ব্রাক্ষণ ও কাজের লোক আছে।
◆ এই কাজের জন্য প্রতি মাসে বেতন পাবেন, সাথে থাকা খাওয়া চিকিৎসা সব ব্যবস্থা করা হবে।
◆ কথাবার্তা শেষ হলে জয়বর্ধন মহাশয় একটি নতুন কাঁচের গ্লাসে মদ ও জল দিয়ে বিনোদ এর সামনে দিয়ে বলেন :- ভবিষ্যতে পরস্পরের সহিত স্মৃতি রক্ষা করতে পারব, তাহার সূচনা স্বরূপ এসো একত্র পান করা যাক।
◆ বিনোদ ইতস্তত বোধ করে বলে :- না; থাক।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় হালকা হাসি দিয়ে বলেন :- আর ন্যাকামি করছ কেন বাবা?
লুকিয়ে লুকিয়ে, বোতলের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে করেছ আমার চোখে পড়ে নি, কুচ পরোয়া নেই- পান করে ফেলো তো।
◆ আমার কাছে যত দিন থাকবে, অন্ন বস্ত্রের অভাব হতে পারে কিন্তু এই মদ নামক অমৃত সুধার অভাব হবে না। বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করিয়া হাসিয়া উঠলেন।
◆ বিনোদ মদের গ্লাস হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে এক নিঃশ্বাসে পান করে নেয়।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় আবার হো হো হেসে উঠে বলেন :- তোমার চোখ মুখের ভাব দেখে কিন্তু বুঝতে পেরেছি, তুমি আমার মতো মাতাল ।
◆ বিনোদ বলে :- আপনি তো; বর্তমানে আমার আশ্রয়দাতা ।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় আবার হো হো হেসে উঠে বলেন :- মালিক আর চাকর। এসব ঝামেলা মাথা থেকে নামিয়ে দাও কিন্তু আজ থেকে আমরা দুজন পরস্পর বন্ধু। মনের আনন্দে মদ পান করে যাও। তারপর একটা দামী সিগারেট বাড়িয়ে দেয়।
----------------------------------------------------------
।। পয়ত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ছৌত্রিশ অধ্যায় ।।
সুভাষিনী পতিতাবৃত্তির ব্যবসা শুরু।
----------------------------------------------------------
◆ নারী উদ্ধার আশ্রম থেকে চারজন নারী পালিয়ে চলতি ট্যাক্সি ভাড়া করে টালি গঞ্জ আসো। টালিগঞ্জ থেকে ট্রামে চড়ে বিধান নগর সরণির উদ্দেশ্য রওনা দেয়।
◆ ট্রাম এর সিটে বসে চারজনের মধ্যে কোথায় যাওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
◆ রাজবালা বলে :- ব্রাহ্মসমাজ সকল কে গ্রহণ করে, ব্রাহ্ম ধর্ম অবলম্বন করলে বিবাহ করা সহজ হবে।
◆ বিধান নগর সরণি নেমে বাথরুমে গিয়ে চারজন ব্রাহ্ম সমাজের মহিলাদের মতো কাপড় পড়ে ও তাদের মতো সাজগোজ করে পায়ে জুতা পড়ে নেয়।
◆ বিধান নগর সরণি এই এলাকার আশেপাশের ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনালয়ের এক মন্দিরে উপস্থিত হয়।
◆ সুভাষিনী ভাবে, এই উপাসনালয় মন্দিরে বাবার সাথে কিশোরী কালের সময়ে অনেকবার এসেছি। বাবার স্মৃতি গুলো মনে পড়তেই, সুভাষিনী এর চোখে জল এসে যায়।
◆ সন্ধ্যাকালীন উপাসনা শেষ হলে একে একে সকল ভক্তরা চলে যেতে শুরু করে।
◆ চারজন ভয়ে ভয়ে ধীরে ধীরে একজন পাকা চুল, লম্বা নাক ও দীর্ঘাকৃতির বলিষ্ঠ দেহ বয়স্ক কৃষ্ণ প্রসাদ শাস্ত্রী ভট্টাচার্য মহাশয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্রাহ্ম সমাজের একজন জ্ঞানী গুণী পন্ডিত মানুষ। চারজন ব্রাহ্ম সমাজের কায়দায় প্রণাম করে।
◆ কৃষ্ণ প্রসাদ শাস্ত্রী ভট্টাচার্য মহাশয় স্নেহপূর্ণ স্বরে বলল :- মা; তোমাদের আগমনের কারণ কি ?
◆ চার জন নারী তাদের জীবনের ঘটনা জানিয়ে বলে :- নারী উদ্ধার আশ্রমের কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার ও অত্যাচারের কারণে পালিয়ে এসেছি।
◆ ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করে সমাজের মূলস্রোতে সাথে ভালো ভাবে বাঁচতে চাই। আমাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করুন।
◆ কৃষ্ণ প্রসাদ শাস্ত্রী ভট্টাচার্য মহাশয় বলেন :- মা; তোমাদের রক্ষা করার উপায় আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাকে সমাজ নিয়ে চলতে হয়। এই সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে জিজ্ঞাসা করা অবশ্যই প্রয়োজন।
◆ কৃষ্ণ প্রসাদ শাস্ত্রী ভট্টাচার্য মহাশয় একটি রুমে ঢুকে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ডেকে নিয়ে আসে। চারজন নারী তাদের ঘটনা বিস্তারিত বলে।
◆ বৃদ্ধ ভদ্রলোক ঘটনা শোনার পর ঘৃণার চোখে তাকিয়ে না না বলে আপত্তি করে বলেন :- তোমাদের; কোনরূপ ভাবেই এখানে থাকা চলবে না। তোমাদের পূর্ব জীবন নোংরা কলুষিত ভরা আছে। তোমাদেরকে গ্রহণ করলে কিন্তু ব্রহ্ম সমাজের মধ্যে পাপ প্রবেশ করবে।
◆ ময়না রাগ দেখিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে :- তাহলে; সমাজের মানুষের কাছে বড় বড় গাল-গল্প দেওয়ার কোন যুক্তি নেই। আপনার ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা -------- মহাশয়ের নীতিকে লংঘন করলেন কিন্তু তিনি সমাজের পিছিয়ে থাকা, নিরাশ্রয় মানুষের আশ্রয়দাতা ছিলেন।
কোন নারী ভালো হতে চাইলে কিন্তু আপনার মতো মিথ্যাবাদী মানুষ কিন্তু সমাজে ভালো হতে দেবে না। সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নোংরামিতে ভরে গেছে। চল চল এখানে কোন জায়গায় হবে না ।
◆ রাজবালা বলে :- আমরা বেশ্যা নয় কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে অবাঞ্ছিত ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি কিন্তু কখনো যদি আমরা পতিতা বৃত্তি অবলম্বন করি, তাহলে সেই পাপের দায়ভার আপনার থাকবেন। আর সেই দিন কি হবে একমাত্র ঈশ্বর জানেন?
কালীদাসী বলে :- ধর্মের নামে সাধু সেজে বক ধার্মিক হয়ে কোন লাভ নেই, পৃথিবী নামক সমাজের মানুষের জন্য কিছু করুন । আপনার ব্রাহ্ম সমাজের উন্নয়ন মানে দলবাজি করা কিন্তু সমগ্র মানব জাতির জন্য কাজ করতে হবে।
◆ চারজন আবার কৃষ্ণ প্রসাদ শাস্ত্রী ভট্টাচার্য মহাশয় কে প্রণাম করে আর তিনি প্রণাম গ্রহণ করেন।
◆ তারপর চোখের জল ছল ছল করতে করতে হাত জোড় করে বলেন :- মা ; আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাদের কথায় সত্যি আমরা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে থেকে দলবাজি করে চলেছি। প্রার্থনা করি, "ঈশ্বর তোমাদের কল্যান করুক"।
◆ উপাসনালয় থেকে বের হয়ে চারজন শহরের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আলোচনা করতে থাকে।
◆ সুভাষিনী বলে :- কমলা নামে এক বান্ধবীর বাসায় চল যায়, কয়েক দিন থাকতে পারবো।
◆ আবার বাস ধরে বাগবাজার নেমে হাঁটতে হাঁটতে কমলার বাড়িতে উপস্থিত হয়।
◆ কমলার বাড়ির ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক বলেন :- কমলার মা বাড়ি ভাড়া দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে কিন্তু ঠিকানা জানিয়ে যায়নি। মাসের ভাড়া ব্যাংক একাউন্টে জমা করে দেওয়া হয়।
◆ সুভাষিনী মাথায় হাত দিয়ে ভাবে, প্রিয় বান্ধবী কমলার সাথে দেখা করার ইচ্ছা আর পূরণ হলো না, কমলা কে পেলে মাস্টার মহেন্দ্র এর ঠিকানা পাওয়া যেত। আর মহেন্দ্র কে পেলে থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত।
◆ রাজবালা বলে :- আজ রাতের মতো আমি তোমাদেরকে একটা পরিচিত জায়গায় রাখতে পারি। তারপর কাল সকালে যাহা হয় করা যাবে ।
◆ কালীদাসী বলে :- রাত অনেক হয়েছে আর এই রাতে কলকাতা কিন্তু আমাদের জন্য নিরাপদ নয়।
◆ আবার ট্যাক্সি ভাড়া করে চাপাতলায় হাড়কাটা নামক জায়গায় নেমে একটা গলির রাস্তা দিয়ে কিছু সময় হাঁটার পর বহু আকাঙ্ক্ষিত ঠিকানার বাড়ি মিলে যায়।
◆ বাড়ির মালিক একজন নারী, তিনি রাজবালার সাথে আরো তিন জন নারী কে দেখে আনন্দিত হয়ে, সকল কে একটি ঘরে নিয়ে বসতে দেয়। ঘরের মধ্যে বিছানা পত্র সহ আলাদা আলাদা চৌকি আছে।
◆ তারপর রাজবালা এর উদ্দেশ্য করে বলেন :- বাথরুম দেখিয়ে দে, হাত মুখ ধুয়ে নিতে বল, খাবারের ব্যবস্থা করছি।
◆ সবাই খাবার খেতে খেতে বাড়ির মালিক নীলিমা অনেক কিছু কথা বলে।
◆ সুভাষিনী বিছানায় শুয়ে ভাবে :- বাড়ির মালিকের কথা শুনে বুঝতে পারলাম, পতিতালয়ে এসে পড়েছি।
◆ বাড়ির মালিক নলিনী অনেক গুলো রুম বেশ্যাদের কাছে ভাড়া দিয়েছে। মাসে ভালো টাকা আয় রোজগার হয়ে থাকে।
◆ পতিতা নারী সমাজে “বাড়িওয়ালি' [বা মাসি] নামে অভিহিত করা হয়। সকলে রানি-বাড়িওয়ালি বলে ডাকে।
◆ রাজবালা এর সাথে বাড়িওয়ালি মহিলার গোপনে গোপনে নানা কথাবার্তা চলছিল, কারণ কি?
◆ জীবনের এই প্রথম আমি ব্যবসাদার খাঁটি বেশ্যার ঘরে প্রবেশ করলাম। আমার কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। নীচের তলায় এক কোণে থাকার ঘর কিন্তু লোডশেডিং এর কারণে আলো নেই , ভীষণ গরম লাগছে ও জানালা দরজা থাকলেও বাতাস নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
◆ চারদিকে একটা নতুন রকমের দুর্গন্ধ। কোথাও মাতালের বমি। এই বাড়ির মধ্যে অনেক রাত পর্যন্ত কোথাও গান-বাজনা, কোথাও হৈ হৈ চিৎকার, কোথাও গালাগালি-ঝগড়া হতে থাকে। দেখে-শুনিয়া আমার মন ভালো লাগছে না। কিন্তু আপাতত একটা থাকার জায়গা তো হলো, পরে দেখা যাবে কি করা যায় ?
◆ পরদিন সকালে ময়না বলে :- বেলিয়াঘাটা, আমার এক মাসির বাড়ি আছে, আমি সেখানে চলে যাচ্ছি। বলে ব্যাগ হাতে নিয়ে চলতে শুরু করে।
◆ চার দিন আরামে কাটানোর পর বাড়ির মালিক নীলিমা আশ্রয়কারী সুভাষিনী ও কালীদাসী কে পতিতাবৃত্তির জন্য বিভিন্ন ভাবে বুঝতে থাকে।
◆ বাড়িওয়ালি নীলিমা বলেন :- বেশ্যারা; নিজের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যবসা করে, এখানে কেউ কারো কাছে দাসত্ব করতে আসেনি। তোমার ইচ্ছা হলে কোন পুরুষকে ঘরে নেবে আবার ইচ্ছা হলে ইচ্ছা না হলে কিন্তু নাও নিতে পারো। এখানে কারোর কাছে কোন দায়বদ্ধতা নেই।
◆ ভগবান; তোমাদের রূপ লাবণ্য ও অনন্ত যৌবন দান করেছেন।
◆ এক পুরুষের আবদ্ধ থাকার জন্য নয় কিন্তু।
◆ পুরুষকে ভুলানোর কৌশল অবলম্বন করে, জীবন জীবিকা নির্বাহ করার জন্য দেহের অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী করে তুলেছে।
◆ উকিল তার মক্কেলের কাছে বুদ্ধি বিক্রি করে।
◆ পণ্ডিত তার ছাত্রদের কাছে বিদ্যা বিক্রি করে।
◆ দীক্ষাগুরু ও শিক্ষাগুরু তার শিষ্যদের কাছে মন্ত্র বিক্রি করে।
◆ তাহলে রূপবতী কেন তার দেহ বিক্রয় করবে না? সব ব্যবসায়ের বিপদ ভয় থাকবে।
◆ দেশের বড় বড় লোক সহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বেশ্যাদের পায়ে বাঁধা পড়ে থাকে ।
◆ ধনী লোকের টাকা ও সম্পদ কিন্তু বেশ্যাদের ঘরে উড়িয়া আসে । তাদের কৃপা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে টাকা ও সোনার গয়নার বন্যা বইয়ে দেবে।
◆ এ পর্যন্ত যাদের কাছে দেহ দান করেছো, প্রতিদানে শুধু দুঃখ কষ্ট ছাড়া কিছুই জোটেনি।
◆◆ সুভাষিনী ভাবে :- পিতার অনাদর, কুশিক্ষা ও কুসংসর্গ আমাকে পাপের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কখনো সংযম শিখি নাই।
◆ প্রবৃত্তির অনলে কেবল ইন্ধন পেয়েছি। গল্প, উপন্যাস পাঠ করার ফলে সমাজ শৃঙ্খলা বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাব কেবল, আমার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে। উত্তেজনার বশে কার্য্যের পরিণামের দিকে দৃষ্টি যায় নাই।
◆ পতিতা নারীদের মধ্যে যাহারা এইরূপে পর-পুরুষের অবৈধ প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে কুপথে আসে, তাদের সকলের ভাগ্য এই দশা ঘটে।
◆ সেই পুরুষটি অবোধ নারীর সর্বনাশ করে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ছেড়ে যায়।
◆ এমন কোন পতিতা নারী নেই, যে মৃত্যু পর্যন্ত একটি প্রথম প্রেমিক কে নিয়ে সারাজীবন বসবাস করছে।
◆◆ সুভাষিনী সকাল সাড়ে আটটার সময় বাড়িওয়ালি নীলিমার সাথে দেখা করে বলে :- আপনার প্রস্তাবে রাজি আছি, ব্যবসা করার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করুন।
◆◆ বাড়িওয়ালি নীলিমা কয়েক দিনের মধ্যে আমহার্স্ট স্ট্রিট এলাকার আশেপাশের এক বাড়িতে দুই খানা ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেয়।
◆ বাড়িওয়ালি নীলিমা তিনজনের যৌন বিষয়ক বিভিন্ন ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। খরিদ্দার ধরার বিভিন্ন কৌশল শিখতে থাকে। খরিদ্দার কে বেশি আনন্দ ফুর্তি দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন ভাবে আলোচনা করে। তারপর তাড়াতাড়ি পুরুষের ক্ষমতা হ্রাস করার বিভিন্ন কৌশল শিখাতে থাকে।
◆ সুভাষিনী ও রাজবালা উক্ত বাড়িতে বসবাস শুরু করে। আর বাড়িওয়ালি নীলিমা তাদের দুজনের কিছু টাকা ধার সহ জিনিসপত্র ও
কাপড় চোপড় সমস্ত জোগাড় করে দেয়।
◆ নতুন বাড়ি ও নতুন পরিবেশে এসে সুভাষিনী ও রাজবালা পতিতাবৃত্তির ব্যবসা শুরু করে।
◆ কালীদাসী কিন্তু বাড়িওয়ালি নীলিমার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে থেকে পতিতা বৃত্তির ব্যবসা শুরু করে।
----------------------------------------------------------
।। ছৌত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। সাঁইত্রিশ অধ্যায় ।।
।। জয়ন্তীর ভালোবাসা বিনোদ ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদের মালিক জয়বর্ধন মহাশয় তার দামি গাড়িতে বিনোদ কে নিয়ে, নিজে চালকের আসনে বসে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলার পর একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে। তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে একটা রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় দরজায় টোকা দিয়ে রূপসী রূপসী বলে ডাকতে থাকে।
◆ রূপসী বাইরে আসতেই, জয়বর্ধন মহাশয় বলেন:- তোমার দেখা শোনার ও হুকুম পালন করবে।
◆ বিনোদ বহুদিন পর জয়ন্তী কে রক্ষিতার বেশে দেখে চমকিত হয়ে উঠে।
◆ রূপসী কিন্তু বিনোদ কে দেখে আনন্দিত হয়ে হাত জোড় করে বলে :- এরকম একটা স্মার্ট বয় আমার দরকার ছিল।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় বলেন :- বিনোদ ; আজ তুমি বিশ্রাম করে, আগামীকাল থেকে ম্যাডামের কাজে লেগে যাবে। বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
◆ বিনোদ কে নিয়ে রূপসী একটি ঘরের মধ্যে ঢুকে বলে :- বিনোদ বাবু; এই ঘরে আপনার থাকার ব্যবস্থা কিন্তু সুভাষিনী এর খবর কি?
◆ বিনোদ বলে :- সে অনেক বড় কাহিনী, সুভাষিনী কিন্তু আমাকে ত্যাগ করেছে।
◆ রক্ষিতা রূপসী কিন্তু আসলে সুভাষিনী বান্ধবী জয়ন্তী বলে :- সব কিছু তো বুঝতে পারছো, আমি এখন জয়বর্ধন মহাশয়ের রক্ষিতা। যাই বাবু কে মনোরঞ্জন করতে হবে। বলে ঝড়ের গতিতে রুম থেকে বের হয়।
◆◆ বিনোদ সোফায় বসে ভাবে :- জয়ন্তীর বয়স বেড়ে উঠার সাথে সাথে রূপ যৌবন স্রোতের জোয়ার বেড়ে চলেছে। তার রূপে, চলাফেরা, চুল ও চোখের কটাক্ষে এমন একটা আকর্ষণ শক্তি ছিল, যা অনেক পূর্ণ যুবতীর মধ্যে কিন্তু নেই।
◆ জয়ন্তীর; তিনটি কন্যার জননী কিন্তু তাহার স্বাস্থ্য,দেহ-সৌন্দর্য, চমৎকার বেশভূষা এবং
সজীবতা দেখলে কেহই সে কথা অনুমান করতে পারে না। তার সৌন্দর্য ছিল, সেই প্রকার সৌন্দর্য শ্রদ্ধার উদ্দীপক নহে, কেবল মাত্র কামোদ্দীপক।
◆ পূর্বের সব সম্পর্কের কথা ভুলে বর্তমান সময়ে জয়ন্তী মালিক আর বিনোদ কর্মচারী এই সম্বন্ধ রক্ষা করে দুজনেই চলতে থাকে।
◆ বিনোদ রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে :- জয়ন্তীর রূপ লাবণ্য আর কাম উত্তেজনা মূলক চলাফেরা, তাকানো, কথাবার্তা শুনে আমার দেহের মধ্যে কাম উত্তেজনা দ্রুত বেগে বেড়ে চলেছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে জয়ন্তী আমাকে চাই কিন্তু সাহস করে বলে যদি হিতে বিপরীত হয়ে পড়ে।
◆ এই চাকরি আমার না খেয়ে থাকার মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে কিন্তু চাকুরী হারানোর কোন ইচ্ছা নেই।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় প্রায় দিন আসে, কোন দিন সম্পূর্ণ রাত থাকে আবার কোনদিন নয়টা ও দশটার সময় ফিরে যান।
◆ জয়বর্ধন মহাশয় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে প্রায় বাইশ দিন রক্ষিতার বাড়িতে আসতে পারে না।
বিনোদ প্রতিদিন মোটরবাইক নিয়ে জয়বর্ধন মহাশয়ের খোঁজ খবর নেওয়া ও রক্ষিতার খবর দেওয়া চলতে থাকে।
◆ বিনোদ রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিজের রুমে আসে আর সেই মুহূর্তে জয়ন্তীর এক দাসী উপস্থিত হয়ে বলে :- ম্যাডাম; আপনাকে তার ঘরে ডেকেছে।
◆ বিনোদ তাড়াতাড়ি জয়ন্তীর রুমে ঢুকে দেখতে পায়, বিছানায় শুয়ে মাথা ধরে কাতরাচ্ছে।
◆ জয়ন্তী বলে :- বিনোদ বাবু; আমার মাথা বড় ধরেছে, স্থির থাকতে পারছি না, কি করি বলুন তো?
◆ বিনোদ বলে :- ঘরে ওডিকলোন আছে কি? মাথায় দিলে বেদনা কমে যাবে এখনি।
◆ জয়ন্তী আঙ্গুল দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ওডিকলোন দেখিয়ে দেয়।
◆ বিনোদ বিছানায় উঠে জয়ন্তীর দেহের সাথে স্পর্শ করে বসে, জয়ন্তীর কপালে ওডিকলোন ঔষধ লাগাতে থাকে। জয়ন্তীর বসন মুক্ত স্তনদ্বয়ের হাতের কনুই দিয়ে চাপ লাগতে থাকে।
◆ জয়ন্তী ছটফট করতে করতে তার মাথা ঘুরিয়ে বিনোদের কোলের উপর মাথা রেখে, দুই হাত দিয়ে বিনোদ এর হাত নিয়ে বুকের উপর রাখে।
◆ বিনোদ প্রতিদিনের মতো মদ পান করে ছিল। তার দেহের মধ্যে তরঙ্গ দিয়ে রক্ত কণা দ্রুত বেগে গরম হয়ে উঠে। মদের নেশায় হিতাহিত জ্ঞান ভুলে জয়ন্তী কে বুকে জড়িয়ে ধরে আর জয়ন্তী কিন্তু কাম উত্তেজনায় বিনোদ কে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে থাকে।
◆ বিনোদ বলে :- আমাকে কাছে পাওয়ার জন্য কিন্তু তোমাকে এত নাটক করার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি তোমার রূপে আগে থেকেই মুগ্ধ হয়ে আছি, শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।
◆ জয়বর্ধন মহাশয়ের অনুপস্থিতিতে বিনোদ ও জয়ন্তী গুপ্ত দারের গোপন ভালোবাসার লীলা সাবধানে চলতে থাকে।
◆◆ জয়ন্তীর জীবনের কাহিনী শুনে বিনোদ ভাবে,
ভীষণ ভাবে মর্মান্তিক দুঃখের ঘটনা, শ্বশুরের বাবা দাদা শ্বশুর জোর জবরদস্তি করে জয়ন্তীকে ধর্ষণ করে, তার কারণে স্বামী সংসার সমাজ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। আমি অপরাধী হয়ে কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের নিকট ঘৃণার পাত্র হয়ে পড়েছি।
◆ জয়ন্তী পুরুষের ভালবাসার ছলাকলা করে পাপ কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু বর্তমানে তার পায়ে রাজা, মহারাজা, রাজকুমার, উকিল ও দেশনেতা সহ প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ, আজ সমাজের শীর্ষ স্থান অধিকারী বিশিষ্ট মানুষেরা শত শত স্তাবক পরিবেষ্টিত হয়ে জয়ন্তী তাদের কাছে পূজানীয় হয়ে উঠেছে।
◆ বিনোদ ভাবে, আমার লাম্পট্যের চরিত্রের উপর কোন ঘৃণার ভাব আসেনি, বরং জয়ন্তীর মুখে বিভিন্ন ধরনের ইতিহাস শুনে মনে মনে একটু আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছি, এই ভেবে যে সকল বিখ্যাত লোক যখন এই সব কর্মে ব্রতী তখন আমার আর অপরাধ কি ?
◆ বিনোদ ভাবে কোন এক আশ্রমে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে কথোপকথনের গল্প শুনেছিলাম।
◆ আশ্রম প্রাঙ্গণে নিষ্ঠাবান ধার্মিক পন্ডিত গুরুদেব উচু আসনে বসে শিষ্যদের বিভিন্ন আলোচনা করতে করতে এক সময় এক মদ্যপ বেশ্যাস্ত এবং লম্পট শিষ্যের উদ্দেশ্য করে বলেন :- মদ্যপ ও বেশ্যাস্ত কু অভ্যাস পরিত্যাগ না করলে কিন্তু মৃত্যুর পর পরলোকে তাহার অনন্ত নরক ভোগ করতে হবে। বিভিন্ন নরকের আলোচনা করে ভয় দেখাতে থাকে।
◆ মাতাল শিষ্য অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে গুরুর বক্তৃতা শোনার পর বলে:- “ প্রভু; আমাদের পাড়ার মেজবাবু তো খুব মদ পান করে আর আমোদ প্রমোদ করে, তিনি নরকে যাবেন।
◆ গুরুদেব প্রভু বলেন :- হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবে।
◆ মাতাল শিষ্য আবার প্রশ্ন করে বলে :- বাবু পাড়ার শ্যামা, কেবলা, ফটকে ও মেধো এরাও তো মদ পান করে, তাহলে নরকে যাবে?
◆ গুরুদেব প্রভু বলেন :- নিশ্চয়ই, কোন ভুল নেই।
◆ মাতাল শিষ্য আবার প্রশ্ন করে বলে :- সুভাষিনী, কমলা, আরতি ও বাসন্তী তাহলে নরকে যাবে।
◆ গুরুদেব প্রভু বিরক্ত হয়ে বলেন :- এরা বেশ্যা, এরা নরকে যাবে-না তো কে যাবে ?
◆ মাতাল শিষ্য লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে :- তবে তো নরক অনেক ভালো। স্বর্গে তাহলে কোন
শালা যেতে চায়! আমি কিন্তু নরকে যাবো।
◆ বিনোদ মুখে উচ্চারণ করে, জয়ন্তীর মত সুন্দরী থাকতে স্বর্গে গিয়ে কোন কাজ নেই। শুনেছি, স্বর্গে নাকি মত্ত ভূমি থেকে আরো যৌনাচার ব্যভিচার বেশি। মরণের পর কোথায় যাবো, সে চিন্তা এখন করে লাভ নেই। যৌবন জোয়ার ক্ষণস্থায়ী যতদিন পারো ভোগ বিলাস করে নাও।
◆ জয়ন্তীর প্রতি বিনোদের ঘনিষ্ঠতা দিন দিন বৃদ্ধি হয়ে চলেছে আর গোপনে গোপনে গোপন অঙ্গের প্রণয়ের ভালোবাসা তো চলছেই।
◆ বিনোদের সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে জয়ন্তী বলে :- জয়বর্ধন মহাশয়ের আমার প্রতি আকর্ষণ কম হয়ে গিয়েছে কারণ বর্তমানে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা-পয়সা দিতে কৃপণতা প্রকাশ করছে।
◆ বিনোদ বলে :- এক নারীতে বহুদিন উপগত হওয়ার কারণে লম্পট-স্বভাব-সুলভ
ভোগ অবসন্নতা আসে। হয়তো, জয়বর্ধন কোন নতুন রমনীর কাছে যাচ্ছে।
◆ জয়ন্তী বলে :- ঠিকই বলেছ; বহুদিন এক পুরুষ নিয়ে থেকে আমার মনেও অবসন্নতা এসে গিয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- জয়বর্ধন; তোমাকে ও আমাকে ছেড়ে দিলে কিন্তু আমরা বিপদে পড়বো।
◆ জয়ন্তী বলে :- জয়বর্ধন; আমাকে ছেড়ে দিলেও কিন্তু বিনোদ বাবু তোমাকে ছাড়তে পারবো না।
◆ বিনোদ বলে :- কেন?
◆ জয়ন্তী বলে :- লৌকিক স্বামীর সঙ্গ কিছুদিন করেছি তারপর স্বেচ্ছায় মাস্টার মহেন্দ্র এর কাছে ধরা দিয়েছিলাম। শ্বশুরের বাবা দাদা মশাই জোর করে ধর্ষণ করে তারপর স্বেচ্ছায় আবার জয়বর্ধন মহাশয়ের কাছে স্বার্থের বিনিময়ে আছি।
◆ এত কিছু ঘটনার পরও বলছি, "আমি তোমাকে ভালোবাসি" এমন ভালো কাউকে বাসিনি কিন্তু তুমি আমাকে ছাড়তে পারবে না। যেখানেই থাকি না কেন! তুমি আমার সাথেই থাকবে। সত্যি কথা বলতে কি জানো! স্থায়ীভাবে একজন পুরুষের অবলম্বন আমার দরকার। সবাই তো টাকার বিনিময়ে মধু পান করে পাত্র ফেলে চলে যায়।
◆ বিনোদ ভাবে :- জয়ন্তী তোমাকে ছাড়ার কোন ইচ্ছা নেই, তোমার কাঁধে ভর করে কিন্তু আমার সুখের দিন গুলো ভালোভাবে কাটছে।
◆ মাসিক বেতন ছাড়াও যখন যাহা চাই, তৎক্ষণাৎ পেয়ে যায়। জয়ন্তী তোমাকে প্রতিপালন করার সামর্থ্য আমার নেই।
◆ বিনোদের গায়ে ধাক্কা দিয়ে জয়ন্তী বলে :- একদম চুপচাপ হয়ে গেল, কিছু তো বলো।
◆ বিনোদ বলে :- আমি সব সময় তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করবো। আমি তোমাকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসি।
◆ জয়ন্তী বলে :- জয়বর্ধন কে ত্যাগ করে কিন্তু নতুন কোন পুরুষকে ধরতে হবে।
◆ দুজনে বিভিন্ন জল্পনা কল্পনা করে স্থির হয় কুমার অনঙ্গদেব এর সাথে সম্পর্ক করতে হবে। আর বিনোদ সব সময় সহযোগী হয়ে জয়ন্তীর পাশে থাকবে।
◆ জয়ন্তী একটা প্রেমপত্র লিখে বিনোদ এর হাতে দিয়ে বলে :- কুমার অনঙ্গদেব এর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
◆ বিনোদ এর হাতে চিঠি পেয়ে কুমার অনঙ্গদেব রাতে গোপনে জয়ন্তীর সাথে দেখা করে। এক সপ্তাহ ধরে বিনোদ সময় মতো কুমার অনঙ্গদেব কে জয়ন্তীর ঘরে নিয়ে আসে আবার সময় বুঝে পৌঁছে দিয়ে আসে।
◆ জয়ন্তীর একদিন কুমার অনঙ্গদেব কে আদর করতে করতে অভিনয় করে ছলছল চোখে কাঁদে কাঁদে ভাবে বলে :- আমার আশ্রয়দাতা জয়বর্ধন বাবু কিন্তু আপনার আগমনের বার্তা ও সঙ্গ দেওয়ার কথা জানতে পেরেছেন। কয়েক দিন ধরে আমাকে প্রচন্ড মারধর করেছে আর বিনোদ আপনার ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিনোদের সহযোগিতা ছাড়া আমার পথ চলা মুস্কিল। আপনি কোন একটা উপায় বলুন।
◆ কুমার অনঙ্গদেব গাড়িতে যাওয়ার সময় বিনোদ কে জয়বর্ধন বাবুর অত্যাচারের বিষয়ে জানতে চাই।
◆ বিনোদ কিন্তু জয়ন্তীর বলা কথা বলে আরো কুমার অনঙ্গদেব কে ঘটনার আরো রং মাখিয়ে বলতে থাকে।
◆ কুমার অনঙ্গদেব একদিনের মধ্যে বাড়ি খোঁজ করে চুক্তিপত্র করে নেয়।
◆ বিনোদ কে কয়েক হাজার টাকার বান্ডিল হাতে দিয়ে বলেন :- নানা প্রকার আসবাব দ্বারা এই ঘর বাড়ি সাজাতে হবে, প্রয়োজন হলে আরো টাকা দেবো তোমাকে।
◆ আজ থেকে তুমি জয়ন্তীকে দেখাশোনা করবে, তার বিনিময়ে মাসিক বেতন পাবে।
◆ বিনোদ আনন্দে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রাতের মধ্যে নানা প্রকার আসবাব কিনে নিয়ে এসে ঘর সাজাতে শুরু করে।
◆ পরদিন সকালে জয়ন্তী নামক পাখি জয়বর্ধন বাবুর পিঞ্জর হতে উড়িয়া গিয়া কুমার অনঙ্গদেব এর নতুন কুঞ্জে প্রবেশ করে,পাখির পরিচালক হিসেবে বিনোদ প্রবেশ করে।
----------------------------------------------------------
।। সাঁইত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। আটত্রিশ অধ্যায় ।।
।। সুভাষিনীর পতিতাবৃত্তির ব্যবসা ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী ভাবে, কুসঙ্গে পড়ে আমার অধঃপতন হয়েছে। আমার স্কুলে পড়া বিদ্যা কিন্তু চর্চার অভাবে সমস্ত ভুলতে চলেছি।
◆ মাস্টার মহেন্দ্র কাছে সাহিত্য, ইতিহাস ও ভূগোল ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলাম তা পতিতা জীবনে এসে অন্ধকারে চাপা পড়ে গিয়েছে।
◆ সুভাষিনী যাদের সাথে থাকে তারা কেউ পড়ালেখার চর্চা করে না। কেবল কার কয়টা লোক হয়েছে, কার খদ্দেরের সাথে কি আলাপ হয়েছে? তার সব অশ্লীল ব্যাপার নিয়ে আলোচনার বিষয় থাকে। তারপর নিজেদের রান্না ও ঘরের কাজ সমস্ত করতে হয়। সুভাষিনী লজ্জায় বাজারে যেতে পারে না কিন্তু অন্য কাহাকেও দিয়ে বাজার করে আনে ।
◆ প্রেমিক পুরুষ কে পতিতা সমাজে “বাবু” বলা হয়।
◆ কোনো পতিতার প্রেমিক অন্য নারীর ঘরে ঢুকে পড়লে কিন্তু পতিতাদের মধ্যে তা নিয়ে তুমুল ঝগড়া বেধে যায়। শিক্ষিত সুভাষিনী ঝগড়া শিখে গেছে, সেও কাউকে ছেড়ে কথা বলে না।
◆ সুভাষিনী ভাবে:- পতিতাদের মধ্যে কত রকমের অশ্লীল ও অশ্রাব্য কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমার সহ্য হয়ে গেছে। এখন আর বিরক্ত বোধ হয় না।
◆ প্রবাদ বাক্য বলে, "অল্প বিদ্যা ভয়ংকর"
অল্প বিদ্যার অহংকার বাড়ার কারণে আমার জীবনের সর্বনাশ কিন্তু নিজে ডেকে এনেছি। আমার যৌবনের ভয়ংকর উদ্মাদনার ভোগ বিলাস কিন্তু আমাকে পাপের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারেনি ।
◆ সুভাষিনী তার পতিতাবৃত্তির সাথী রাজবালা কে উদ্দেশ্য করে বলে :- আমার বাইরে যেতে ভীষণ ভাবে ভয় করে। যদি বাপের বাড়ির কাহারও
সঙ্গে দেখা হয়। যদি নন্দদাদা, সেই হরিমতি-ঝি, অথবা বাবার মোটর-ড্রাইভার, এমন কি
বাবা নিজেই যদি দেখে ফেলে।
◆ রাজবালা সাহস দিয়ে সুভাষিনী কে বলে :- তোমাদের বাড়ি কিন্তু এই পাড়ায় নয়, সে তো এখান থেকে অনেক দূরে ; কলকাতার মত শহরে কে কার খবর নেয়। এ পাড়ার লোক অন্য কোন পাড়ায় যায় না।'
◆ সুভাষিনী হ্যাঁ বলে মাথা কাত করে। তারপর ঘরের বাইরে বের হলে সাবধানে রাজবালা কে সাথে করে যায়।
◆ সুভাষিনীর এক প্রশ্নের উত্তরে পতিতাদের রানী মাসি নীলিমা বলেন :- সুভাষিনী; তোমার উকিল বাবা মনে করে, তুমি জীবিত থাকতে মৃত্যু ঘটেছে। ◆ সমাজের মান সম্মানের ভয়ে কিন্তু তোমাকে তাদের ঘরে জায়গা দেয়নি।
◆ তুমি কিন্তু বাবার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তোমার বিপর্যয়ের কথা জানিয়ে ছিল।
◆ তোমার বাবা তোমার প্রস্তাব কে প্রত্যাখ্যান করে কিন্তু তোমাকে পতিতাবৃত্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
◆ সেই পিতার জন্য চিন্তা করে ও ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবা; যদি দেখে, তার মেয়ে তার সামনে পতিতা বৃত্তির ব্যবসা করছে, তার মনে কিন্তু দুঃখ হবে।
◆ রানী মাসি নীলিমা বলেন :- তোমার বাবা কিন্তু তোমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেই ভয় ও মান সম্মান রক্ষা করতে পারতেন।
◆ মা; পতিতাবৃত্তির পথে যখন পা বাড়িয়ে দিয়েছো, অনেক নতুন নতুন চিত্র ও ঘটনা চোখে দেখতে পাবে। হয়তো, সত্যি বাবার সম্মুখে মেয়ে বেশ্যাবৃত্তি করে চলেছে।
◆ দেখতে পাবে, গর্ভধারিণী মা কিন্তু তার মেয়ে কে প্রতিদিন সাজিয়ে গুছিয়ে বেশ্যাবৃত্তির জন্য কোন পুরুষের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
◆ আরো দেখতে পাবে, ভাই বোন সহ আত্মীয় স্বজন কিন্তু বেশ্যাবৃত্তির রোজগারের টাকায় আত্ম পোষণ করে চলেছে।
◆ পতিতা শুধু আমরা নই কিন্তু প্রায় সমস্ত সমাজই অধঃপতিত হয়েছে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি,অন্য সকল নারীরা আমোদ প্রমোদে মত্ত থেকে নিঃসংকোচে চলাফেরা করতে করতে গঙ্গাস্নান ও কালীঘাট সহ যেখানে-সেখানে নির্ভয়ে চলে যায়।
◆ সুভাষিনীর একজন সমবয়সী পতিতা বলে :-
এখন আর ভয় করিস কাকে!
◆ সরকারের কাছে যখন একবার স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছে, যে আমি স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তির ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছি। তখন আর কে কি বলবে তোকে?
◆ আমরা কিন্তু ভারত সরকারের রেজিস্টার পতিতা।
◆ আসরে নাচতে নেমে কিন্তু লজ্জা করলে চলবে না।
◆ রাজবালা কোন কথা না বলে চুপচাপ সবার আলোচনা শুনে চলেছে।
◆ রানী মাসি নীলিমা বলেন :- কোন দিন হয়তো দেখবে, তোমার পরশ দাদা তোমার ঘরে উপস্থিত
হয়েছে। তোমার মাস্টার মহেন্দ্র আসতে পারে।
◆ সুভাষিনী বলে :- তা কি সম্ভব হবে?
◆ রানী মাসি নীলিমা হাসতে হাসতে বলেন :- মনে কিছু করো না মা, কোনো দিন হয়তো আমার ঘরে তোমার বাবার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার
নয়।
◆ সুভাষিনী লজ্জা পেয়ে জিভ কাটে আর রাজবালা মাথা নিচু করে।
◆ রানী মাসি নীলিমা বলেন :- আর কি বলব মা! সেদিন যে একটা মহিলা রামবাগান থেকে আমার বাড়িতে এসেছিল, তাকে তো তোমরা দেখেছ। তার ইতিহাস শুনবে?
◆ তার বাবা একজন উচ্চ ব্রাক্ষণ পরিবারের সন্তান, কলকাতার কোনো কলেজের খুব বড় অধ্যাপকের চাকরি করতেন।
◆ চাকরি ছেড়ে দিয়ে, বর্তমানে অধ্যাপক রাম বাগান এলাকায় আপন রক্ষিতার গর্ভজাত মেয়ে, কামিনীর সাথে অবৈধ প্রণয়ে আসক্ত হয়ে শেষকালে কাটাচ্ছেন, এই তো অবস্থা।
◆ আমি অনেক দেখেছি, অনেক শুনেছি ;
তোমরা দেখবে ।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- ধীরে ধীরে ভয় ভীতি দূর হয়ে যায়।
◆ বাড়িওয়ালি নীলিমা মাসি; আমাদের পুরুষ শিকার ধরার বিভিন্ন কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন। কালী ঘাটের কালী মন্দিরের চত্বরের মধ্যে বরশি ফেলে দাঁড়িয়ে থাকি, কিছু সময়ের মধ্যে কিন্তু পুরুষ কে মোহিত করে ঘরে নিয়ে আসি।
◆ সুভাষিনী ও রাজবালা দুজনে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে রুমে আসার সময় এক ভদ্রলোক মাথায় পাগড়ি বেঁধে মুখ ডেকে তাদের পিছনে পিছনে বাড়ির মধ্যে আসে, তারপর রাজবালার ঘরে ঢুকে পড়ে।
◆ পরের দিন সকালে রাজবালা খুশি খুশি ভাব নিয়ে সুভাষিনীর রুমে ঢুকে বলে :- কাল রাতে আমার ঘরে যে ভদ্রলোক এসেছিল, তিনি বৈঠকখানা বাজারের সন্নিকটে একটি কলেজের বড় প্রফেসর । নাম শ্রী যুক্ত --------- । আরো তিন বার রাতে আমার ঘরে এসে ছিলেন।
◆ সুভাষিনী অবাক হয়ে ভাবে :- মাস্টার মহেন্দ্রর কাছে কিন্তু এই প্রফেসরের নাম শুনেছি, তিনি ছাত্র-ছাত্রীকে ভীষণ ভালো ভাবে পড়াশোনা করান।
◆ একদিন রাতে সুভাষিনী এর আহ্বানে বয়স্ক প্রফেসর মহাশয় সুভাষিনী এর রুমে আসে।
◆ সুভাষিনী ঝুলনের সময় বৃন্দাবনে বেড়াতে যায়। সেখানে পূর্বের আশ্রয়দাতা মোহন্ত মহারাজের সাথে দেখা করে।
◆ বৃন্দাবন বাসি মোহন্ত মহারাজের এক প্রশ্নের জবাবে সুভাষিনী বলে :- “বাবাজী, আমি মহাপাপী, সমাজে আমার স্থান নাই। এমন কি কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান জায়গায় দেওয়া হয় না। বাবা আমাকে ত্যাগ করেছেন।
◆ আমার মত পাপরতা, পতিতা নারীর পদতলে যে সকল পুরুষ তাদের মান, মর্যাদা, অর্থ সম্পত্তি, দেহমন বিক্রি করেছে কিন্তু তাদের সমাজ মাথায় তুলে রেখেছে।
◆ তারা কবি ও সাহিত্যিক বলে প্রশংসিত।
◆ রাজনৈতিক ও দেশ সেবক বলে বিখ্যাত।
◆ ধনী ও প্রতিপত্তিশালী, বলে সম্মানিত।
◆ অনেক ঋষি-মোহন্ত কিন্তু গুরুগিরি জাহির করে সমাজের উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত আছেন, তাহা সমাজ জেনেশুনে নীরব ভূমিকা পালন করে।
◆ কোর্টে, কাউন্সিল, করপোরেশনে, গুরুগিরি করতে কোথাও তাদের কোন বাধা নাই।
◆ আর আমি কবে বালিকা-বয়সের নির্বুদ্ধিতার জন্য এক ভুল করেছিলাম, তার ফলে এই দীর্ঘ বৎসর ধরে কিন্তু জ্বলে পুড়ে মরছি।
◆ এই তো ধর্মীয় সমাজের বিচার!
◆ আমার পতিতাবৃত্তির পথের জন্য আপনি দায়ী।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- মা; তুমি কি বলছো?
◆ সুভাষিনী বলে :- "বাবাজী ; আপনাকে গুরুদেব মেনে ছিলাম কিন্তু আপনি আমার অপকর্মের কথা শুনে শিষ্য বলে মেনে নিতে পারেনি।
◆ আমি সৎ ভাবে জীবন যাপন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি শাসন না করে, আপনি ত্রিকালদর্শী সাধু বাবা হয়ে-আমাকে কলকাতায় নারী উদ্ধার আশ্রমে পাঠালেন কেন! পতিতাবৃত্তি করার জন্য কি?
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- নারী উদ্ধার আশ্রমে কি কিছু হয়েছিল।
◆ সুভাষিনী বলে :- রক্ষক হয়ে নারীদের নিরাপত্তা না দিয়ে কিন্তু দায়িত্ব প্রাপ্ত ভদ্রলোকেরা নারীদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
◆ আপনি যদি আমাকে ত্যাগ না করে, ধর্মীয় অনুশাসন রেখে অন্যায়ের শাস্তি দিতেন-তাহলে হয়তো আপনাকে আজ পতিতা রূপে আমাকে দেখতে হতেনা।
◆ পতিতা নারী কে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রহণ করতে চাই না, আপনি; আর আমাকে, আপনার চরণে আশ্রয় দেবেন না, তা কিন্তু আমি জানি। আপনার সমাজের ভয় আছে।
◆ শিষ্যের টাকায় বড় বড় অট্টালিকা, মন্দির, নাট মন্দির, থাকার আধুনিক প্রযুক্তির বিলাস বহুল আরামদায়ক ঘরবাড়ি, জমিজমা, রাজসিক খাওয়া দাওয়া আর ব্যাংকে কোটি টাকার পাহাড়।
◆ আমার মতো পতিতা কে আশ্রমে রেখে বদনাম আর শিষ্য হারাতে চান না।
◆ মোহন্ত মহারাজ বলেন :- মা; আর বলে না, তোমাকে আশ্রয় দেবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- বাবাজী; বর্তমান জীবন থেকে ফিরে আসা ভিষন ভাবে কঠিন।
----------------------------------------------------------
।। আটত্রিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। ঊনচল্লিশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ জয়ন্তী কয়েক মাস কুমার অনঙ্গদেব এর সাথে কাটানোর পর একদিন কুমার অনঙ্গদেব ছেড়ে চলে যায়।
◆ জয়ন্তীর উপর যার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তিনি হলেন, বাংলার একজন রাজনীতি ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ।
◆ রাজনীতি প্রতিপত্তিশালী বিকাশ চন্দ্র ধরের রক্ষিতা হয়ে তার টাকায় জয়ন্তীর নতুন জায়গায় কয়েক একটি রুম সহ বাড়ি ভাড়া নেয়। ঘরের মধ্যে আসবাব ও সাজসজ্জা ইত্যাদি সকল আসতে শুরু করে। আগের তুলনায় অনেক কিছু বৃদ্ধি হতে থাকে।
◆ বিনোদ কে উক্ত বাড়ির কাজের কর্মচারী হিসেবে বিকাশ বাবু রাখেন। জয়ন্তীর সাথে বিনোদ এর গোপন ভালোবাসার প্রণয় চলতে থাকে।
◆ জয়ন্তীর আশ্রয়দাতা বিকাশ বাবু কিন্তু জয়ন্তী কে মনে প্রাণে প্রকৃত ভালোবাসে তার জন্য, প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত আছে।
◆ বিকাশ বাবুর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জয়ন্তী বিভিন্ন কলা কৌশল অবলম্বন করে কিন্তু তার মেয়েদের কে আশ্রয়দাতা বিকাশ এর সান্নিধ্যে নিয়ে আসে।
◆ জয়ন্তী কে নিয়ে বিকাশ ব্যতিব্যস্ত না থেকে কিন্তু জয়ন্তীর তিন মেয়ে কে বাবার ভালবাসার মতো মমতা দিয়ে লালন-পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
◆ বিকাশ বাবু নিজের খরচে তিন মেয়ে কে স্কুলে ভর্তি করে দেয় এবং মহিলা ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে।
◆ জয়ন্তী সাধারণত অন্য পতিতাদের মতো থাকে না। আধুনিক শিক্ষিতা প্রগতি প্রাপ্তা মহিলা হিসেবে চলাফেরা করে।
◆ জয়ন্তী যেখানে যেখানে নতুন বাড়ি ভাড়া করে কিন্তু তার নামে বাড়ি ভাড়া নেয়, কারণ পরবর্তীতে প্রেমিক ছেড়ে চলে গেলেও-আমানতের মোটা অংকের টাকা তার হাতে চলে আসে।
◆ প্রতি রবিবার ছুটিতে মেয়েরা তার মায়ের কাছে আসে। বিকাশ বাবুর সাথে কোন বন্ধু আসলে কিন্তু মেয়ে গুলো তাদের সাথে গল্প গুজব করতে থাকে।
◆ বিকাশ বাবুর এক রাজনৈতিক বন্ধু ভবতোষ বাবু জয়ন্তীর বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে।
◆ ভবতোষ বাবুর সাথে জয়ন্তীর বড় মেয়ে সবিতার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। জয়ন্তী তার মেয়ে কে নিরিবিলি পরিবেশে নির্জনে মেলামেশার সুযোগ করে দিতে থাকে।
◆ বিনোদ ভাবে :- জয়ন্তী টাকার জন্য তার মেয়ে কে ভবতোষ বাবুর কাছে থেকে ত্রিশ হাজার টাকার বিনিময়ে তার মেয়ের রূপ যৌবনের সতীচ্ছদ ছিন্ন করার জন্য বিক্রি করেছে।
◆ ভবতোষ বাবু কিছুদিন সবিতা কে ভোগ করার পর ছেড়ে দেয়।
◆ জয়ন্তী আবার তার মেয়ে কে আরেক জন খরিদ্দার সংগ্রহ করার চেষ্টা করে চলেছে।
◆ একদিন রাতে জয়ন্তী কে কাছে পেয়ে বিনোদ বলে :- মেয়ে সবিতার সতীত্বের বিনিময়ে মায়ের টাকা আয় করা কে আমি একদম ঘৃণা করি এবং এই জঘন্য কাজের জন্য প্রতিবাদ করছি।
◆ আমি চরিত্রহীন লম্পট মাতাল হয়েও কিন্তু তোমার এই পাপ কাজের সমর্থন করতে পাচ্ছি না।
◆ জয়ন্তী হাসতে হাসতে বলে :- পতিতার মেয়ে হয়ে কি জজ ব্যারিস্টার হবে! সমাজের বুকে এদের কি মূল্য আছে?
◆ বিনোদ বলে :- পতিতা বৃত্তি অবলম্বন করে বহু পতিতার ছেলে মেয়ে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করে দিব্যি সংসার করছে। বর্তমান সময়ে তাদের মাকে তাদের কাছে রেখে সেবা শুশ্রূষা করে চলেছে। আসলে পরিবর্তন করার মন মানসিকতা চাই।
◆ জয়ন্তী বলে :- কিছু দিন ধরে অনুভব করছি, তুমি বার বার নীতি কথা আমাকে শোনাও। একটা কথা মনে রেখে, আমার ভালো ভালো খরিদ্দার আছে বলেই কিন্তু তোমার মোটা অংকের টাকার চাকরি আছে।
◆ জয়ন্তীর কথার কোন উত্তর না দিয়ে বিনোদ চুপচাপ হয়ে ভাবে :- জয়ন্তীর বড্ড অহংকার বেড়েছে, কথায় কথায় অপমান জনক শব্দ বলে।
◆ জয়ন্তীর আচার ব্যবহার কথাবার্তা ও চাল চলনের কারণে তার প্রতি আকর্ষণ দিন দিন কম হয়ে আসছে।
◆ বর্তমানে তার উদ্ভট সিদ্ধান্তের জন্য ও মেয়ে কে দিয়ে পতিতা বৃত্তির ব্যবসা করার কারণে মন থেকে মুছে যাচ্ছে।
◆ জয়ন্তী আগের মতো বিনোদ এর সাথে খোলামেলা মেলামেশা ও কথাবার্তা বলতে চাই না। ধীরে ধীরে অনেক টায় দুজনার মাঝে দূরত্ব বেড়েই চলেছে।
◆ বিনোদ ভাবে :- দুটি মুসলমান নেতা লোক, যখন বিকাশ বাবু এই বাড়িতে উপস্থিত না থাকে-সেই মুহূর্তে জয়ন্তীর সাথে দেখা করতে আসে।
◆ জয়ন্তী তাদের সাথে গোপনে গোপনে কি কথাবার্তা বলছে? কিন্তু জয়ন্তী সব কথা আমার কাছে গোপন করে চলেছে।
◆ বিকাশ বাবুর সাথে এই দুইটি মুসলমান নেতার সাথে কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে হঠাৎ গুরুতর মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। দৈনিক সংবাদপত্রের মাধ্যমে পড়ে ছিলাম।
◆ তাহলে কি আশ্রয়দাতা বিকাশ বাবু কে নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র হচ্ছে না তো ?
◆ পাঁচ দিন পর উক্ত দুই মুসলমান নেতার সাথে আরেক জন মুসলমান ব্যক্তি জয়ন্তীর ঘরে ঢুকে পড়ে। পরে জানলাম, উক্ত মুসলমানের নাম মৌলভী আবু হোসেন খাঁ পেটেন্ট ওষুধের ব্যবসা করে। জয়ন্তী কে গর্ভ নিবারক ঔষধ সহ অন্যান্য অনেক প্রকার ঔষধ দিতে এসেছে।
◆ জয়ন্তী হঠাৎ করে কিন্তু বিনোদ কে কিছু না বলে বাড়ির গাড়ি না নিয়ে ভাড়াটে ট্যাক্সি করে বেরিয়ে যায়।
◆ জয়ন্তী চারদিন পর বাড়িতে ফিরে আসার পর বিনোদ এর প্রশ্নের উত্তরে জয়ন্তী হাসতে হাসতে বলে :- সময় হলে কিন্তু সব জানতে পারবেন। যাতে আর কোন পুরুষ খরিদ্দারের উপর নির্ভর করে, আমাদের আর না চলতে হয়-স্বাধীনভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করছি।
◆ ১৫ দিন পর এক রবিবার দুপুরবেলা বিকাশ বাবু জয়ন্তীর শোয়ার ঘরে ঢুকে বসে আছে। হঠাৎ উপরের রুমে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়।
◆ বিনোদ গোলমালের আওয়াজ শুনে দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে জয়ন্তীর ঘরে ঢুকে পড়ে।
◆ ঘরের মধ্যে বিছানার উপর এক পাশে বিকাশ চিন্তিত হয়ে বসে আছে আর জয়ন্তী মাথা নিচু করে আছে। মৌলভী সহ কয়েকজন মুসলিম লোকজন দাঁড়িয়ে আছে।
বিকাশের রাজনীতির বিরুদ্ধে দলের একজন মুসলিম নেতা ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে বিকাশ বাবু কে বলে :- আমার বিবাহিত স্ত্রীর সাথে অবৈধ ভাবে সহবাস করার জন্য কিন্তু আপনার নামে আদালতে মামলা দায়ের করবো।
◆ বিনোদ শুনে আকাশ থেকে পড়ার মতো হতভম্ব হয়ে ভাবে :- জয়ন্তী এই মুসলিমের বউ কবে থেকে হলো। বিকাশ বাবুর মতো একজন ভদ্রলোক কে জালে জড়িয়ে টাকা আদায়ের ধান্দা।
উপস্থিত দুইজন মুসলিমদের মধ্যে একজন বলে :- আপনার বিবাহিতা স্ত্রী তাহার প্রমাণ কি?
◆ মুসলিম নেতা বিয়ের দলিল বের করে দেখাতে দেখাতে বলে :- দেখুন ; জয়ন্তী আমার বিয়ে করা বউ।
◆ মুসলিম গণ একে একে ঘরের বাইরে চলে যায়।
◆ বিকাশ বাবু জয়ন্তীর উদ্দেশ্য করে বলেন :- পতিতা নারী কখনো ভালো ভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। তোমার সহ তিনটি মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে ছিলাম, অভাব কি জিনিস কোন দিন বুঝতে দেয়নি। টাকার দরকার তা আমাকে জানাতে পারতে কিন্তু আমার শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে বিবাহিত সাজার নাটক করে প্রতারণা করার দরকার ছিল না। বলে দ্রুত বেগে হাঁটতে থাকে।
◆ বিকাশ বাবু উচ্চ পদ-মর্যাদা, দেশব্যাপী খ্যাতি এবং বংশ গৌরব রক্ষা করার জন্য তিনি
বাধ্য হয়ে দুই লাখ টাকা দিয়ে মীমাংসা করে নেয়।
বিপক্ষের মানুষের দাবি ছিল দশ লাখ টাকার।
◆ বিনোদ ভাবে :- গোপন সুত্রে জানতে পারলাম, দুই লাখ টাকা চার জনের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে। জয়ন্তী যে আশা নিয়ে বিকাশ বাবু কে ষড়যন্ত্রের শিকার করে কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। হনুমানের মত রুটি ভাগ করতে গিয়ে সামান্য টাকা ভাগ পেয়েছে। জয়ন্তীর নিজের ধর্ম ও জাত গেল কিন্তু পেট পড়লে না।
◆ জয়ন্তী ভাবে :- পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়ে যে আশা করে বিকাশ বাবু কে প্রতারণা করলাম কিন্তু আশানুরূপ টাকা পেলাম না। আমার সহযোগী মানুষগুলো কিন্তু চুক্তি অনুসারে টাকা না দিয়ে আমার সাথে বেইমানি করল। এর থেকে বিকাশের কাছে থেকে মাসে মাসে বেশি টাকা আসতো কিন্তু আবার আশ্রয় হারালাম।
◆ কয়েক দিন পর মুসলিম নেতা তালাক নামায় সই করার জন্য জয়ন্তীর ঘরে আসে কিন্তু জয়ন্তী বলে :- আরো দশ হাজার টাকা না দিলে সই করবো না।
◆ মুসলিম নেতা কিছু সময় ধরে বুঝতে থাকে কিন্তু জয়ন্তী কোন কথা বুঝতে চাই না। আবার আদালতের ভয় দেখায়।
◆ মুসলিম নেতা উত্তেজিত হয়ে বলে :- আরো বেশ্যা মাগী; আদালতে তোর এই দেহ পৌঁছাতে পারবে তো! তার আগে মৃত্যুর কোলে শুয়ে দেবো। বলে চুলের মুঠি ধরে জোর করে তালাক নামায় সই করে নেয়। তারপর বিছানার উপর ফেলে দিয়ে ধর্ষণ করে ধীরে ধীরে চলতে থাকে।
◆ বিনোদ সব কিছু দেখা সত্ত্বেও কিন্তু না দেখার ভান করে নিচের রুমের দিকে যেতে যেতে ভাবে, যেমন কর্ম তেমন ফল লাভ। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
----------------------------------------------------------
।। ঊনচল্লিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। চল্লিশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ সুভাষিনী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে থেকে
রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা করা সত্বেও দিন দিন অবনতির কারণে শরীর ও মন মানসিকতা ভেঙ্গে পড়েছে। কাজকর্ম বাদ দিয়ে শুয়ে শুয়ে দিন রাত যাপন করে। রানী মাসি নীলিমার ঘাড়ে চেপে বসেছে।
◆ সুভাষিনী বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে :- আমার রোগগ্রস্ত হওয়ার কারণ, রানী মাসি নীলিমার পরামর্শে গর্ভপাত ঘটানোর জন্য ঔষধ খেয়ে ছিলাম। তারপর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।
◆ এরপর থেকে নানা রোগ দেখা দেয়। রাজবালা সেই ওষুধ খেয়েছে কিন্তু তার কোনো অসুখ হল না।
আমি অতিশয় ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছি, আর সমস্ত শরীরে ব্যথা। হাত পায়ের তলায় বিশ্রী দাগ, মুখে ফুসকুড়ি মত হয়ে ক্ষত উৎপন্ন হয়েছে ।
◆ রানী মাসি নীলিমা দেখে বলেন :- হাসপাতালে না নিয়ে গেলে আর রক্ষা নাই।
◆ সুভাষিনী রোগগ্রস্ত হয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিছানায় শুয়ে দিবারাত্র অবিরত কেঁদে কেঁদে
চোখের জলের মাধ্যমে বালিশ ও বিছানা ভেজানো ছাড়া কোন উপায় নেই ।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- মরণাপন্ন মারাত্মক রোগ যন্তনা ভোগ করা থেকে কিন্তু মরণ হলে সুখ আছে। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু কেহ পাশে নেই।
◆ বাবা মায়ের মান সম্মান নষ্ট করে যৌবনের উন্মাদনায় পাগলের মতো হয়ে বিনোদ এর সাথে বেরিয়ে পড়া চরম ভুল হয়েছে।
◆ দুমুঠো ভাত খাওয়ার জন্য দেহ বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করতে হয়। আমাদের বাড়িতে দুই-চার জনের খাবার প্রতিদিন কুকুর ও বিড়ালে খায়। আমি বর্তমানে কুকুর-বিড়াল থেকেও অধম হয়ে পড়েছি।
◆ এই পতিতা বাড়ির অন্য নারীরা সকলেই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে। সন্ধ্যার পর সকল কে কিন্তু ব্যবসার খাতিরে খরিদ্দার ধরার জন্য দরজায় দাঁড়ানো, তারপর সারারাত অনিদ্রায় আর মদ্যপান চলতে থাকে।
◆ তারপর রাতের নানাপ্রকার উত্তেজনায় খরিদ্দারের কাছে কাটিয়ে ভোরে ঘুমিয়ে পড়া, আবার বেলা নয়টার সময় ঘুম থেকে উঠতে হয়।
◆ আমাকে দেখাশোনা ও সেবা শুশ্রূষা করার কেউ নেই বলে চলে, একলা রানী মাসি নীলিমা আর কত দিকে সামলাবে।
◆ রানী মাসি নীলিমার নিজের ও মেয়েদের ব্যবসা হয়েছে। তারপর সভ্য সমাজের ভদ্রলোক বেশধারী দাদা, গুন্ডা ও পুলিশ ঝামেলা তো লেগেই আছে।
◆ পুলিশ চুক্তি অনুসারে মাসে মাসে টাকা নেয়, আবার ব্যবসা ক্ষেত্রে আসলে কিন্তু জামাই আদর করতে হবে। তাদের পছন্দের মতো মেয়ে দিতে হবে, আবার বিদায়ের সময় জামাইয়ের টাকা ও উপঢৌকন দিতে হবে।
◆ সুভাষিনী খাওয়া দাওয়া ছেড়ে বিছানা সজ্জা হয়ে পড়ে।
◆ ঘাটের মরা সুভাষিনী কে অবহেলায় হোক আর স্বার্থের ভালোবাসায় হোক রানী মাসি নীলিমা ও রাজবালা দুজনে মিলে সুভাষিনী কে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করে।
◆ রানী মাসি নীলিমা প্রায় পাঁচ মাস ধরে বহু টাকা খরচের মাধ্যমে চিকিৎসা করে সুভাষিনী কে সুস্থ করে তোলে। সুভাষিনী কে হাসপাতাল থেকে সোজা তার কাছে নিয়ে আসে।
◆ রানী মাসি নীলিমা তার বাড়ির দোতলার একটা ঘরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত করে আর পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো ঘরে ঢোকার ব্যবস্থা করে। খোলামেলা পরিবেশে ও মুক্ত বায়ুতে সুভাষিনী কে বাস করতে দেয়।
◆◆ সুভাষিনী সোফায় বসে ভাবে :- বৃন্দাবনের মোহন্ত মহারাজের কথাগুলো আজ বারবার মনে পড়ছে।
◆ তিনি আমাকে বলেছিলেন, “অন্নবস্ত্রের দয়া তুমি অনেক পাবে।"
◆ তাহার কথাটি যে সত্য; তার প্রমাণ আমার জীবনে বার বার উপলব্ধি করেছি কিন্তু এই দয়ার পিছনে সবার স্বার্থ জড়িত ছিল আবার ভবিষ্যতে থাকবে।
◆ সেই স্বার্থ হলো; আমার রূপ লাবণ্য আর যৌবন বয়স। অসুস্থ অবস্থায় থাকাকালীন কিন্তু কোন পুরুষ দয়া দাক্ষিণ্য তো দূরের কথা, খোঁজখবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি।
◆ সুস্থ সবল থাকাকালীন বহু পুরুষের ভালোবাসা ও পাগল হয়েছিল। কত পুরুষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত কিন্তু কাউকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
◆ একমাত্র রানী মাসি নীলিমার স্বার্থ থাকলেও কিন্তু আমার জীবন রক্ষা করেছেন। রাজবালা তার সাধ্য মতো দেখাশোনা করেছে।
◆ দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন বিষয় নয় কিন্তু মনের প্রবৃত্তির আক্রমণ থেকে কেহ বাঁচাতে পারবে না।
◆ জীবন দর্শায় বাস্তবে খারাপ কাজের দিকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য ঠেলে দেওয়ার লোক কিন্তু পৃথিবীতে বহু নর-নারী আছে।
◆ রানী মাসি নীলিমার বাড়ির কাজের মহিলা সুভাষিনীর ঘরে ঢুকে বলে :- দুপুরের রান্না হয়ে গেছে কিন্তু নিচের ঘরে চলে।
◆ কাজের মহিলা বিধবা অশোকা; রানী মাসি নীলিমার পতিতা পরিবারের কয়েকজন সদস্যের রান্নার কাজ করে মাসিক বেতনের মাধ্যমে আর রাত আটটা থেকে বারোটা পর্যন্ত খরিদ্দার ঘরে আনে।
◆ সুভাষিনী পড়ন্ত বিকেলে খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবে, আমি একজন পড়াশোনা জানা মেয়ে কিন্তু পতিতা না হয়ে-চেষ্টার মাধ্যমে সৎভাবে জীবন যাপন করতে পারতাম।
◆ যৌবন থাকলেই কিন্তু পুরুষরা লালিত হবেই কিন্তু সব দোষ তো পুরুষের নয়। আমি পরেশ, মহেন্দ্র ও বিনোদ এর কাছে ধরা দিয়েছি বলেই কিন্তু চরম বিপদে পড়ে তারপর পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছি।
◆ অনেক মেয়েরা কিন্তু পুরুষের দ্বারা বিপদগ্রস্ত হওয়ার পরও আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সমাজে বাস করছে ।
◆ নারী উদ্ধার আশ্রমে আমাদের সাথে থাকা ময়না কিন্তু রানী মাসি নীলিমার হাবভাব বুঝতে পেরে এখান থেকে চলে গিয়ে সুস্থ সবল ভাবে জীবন যাপন করে চলেছে।
◆ কোন এক জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ব্যক্তিগত মাস্টার হয়ে পড়াশোনা করাতে পারতাম। বিভিন্ন অফিসে চাকরি করার শিক্ষা যোগ্যতা ছিল। নার্সিং প্রশিক্ষণ ছিল নার্সের কাজ করতে পারতাম। নিজে ভালো গান জানি তার মাধ্যমে রোজগার করতে পারতাম।
◆ সৎ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য আজ পর্যন্ত কেউ সাহায্য সহযোগিতা করেনি, বরং সবাই আমার জীবন যৌবন নিয়ে খেলা করেছে।
◆ রানী মাসি নীলিমা আবার নতুন করে পতিতাবৃত্তি ব্যবসা শুরু করার জন্য কিন্তু আমাকে বিভিন্ন ভাবে বোঝাতে শুরু করেছে। আমি তাকে এই দেহ বিক্রি ব্যবসা করবে না বলেছিলাম।
◆ রানী মাসি নীলিমা ধীরে সুস্থে সুভাষিনীর পাশে বসে আদর করতে করতে বলেন :- নিজের ভবিষ্যতের জন্য তো আয়-রোজগার করতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে টাকা না থাকলে তোকে দেখবে কে?
◆ সুভাষিনী বলে :- মাসি; আমার দেহকাস্তি মলিন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষীণ ও শুকনা হয়ে গিয়েছে। মাথার চুল ঝরতে ঝরতে আর পূর্বের মত চুলের শোভা নেই। আমার দ্বারা এই পথে আর উপার্জন হবে না।
◆ রানী মাসি নীলিমা কিন্তু সুভাষিনী কে অনেক সময় ধরে বোঝানোর পর বলেন :- পতিতা নারীর রূপ কিন্তু প্রধান সম্পত্তি নয়। লম্পটেরা রূপ দেখে
মোহিত হয় না। দেখবে অতি কুরূপা বেশ্যা কিন্তু সুন্দরীদের অপেক্ষা অধিক অর্থ উপার্জন করে চলেছে।
◆ এই জন্যই প্রবাদ বাক্য বলে, “যার সাথে যার মজে মন। জাত পাতের নেই কোন বালাই।"
◆ পুরুষগুলো সন্ধেবেলা বেশ্যাপল্লীতে ঘুরে বেড়ায়, আর তখন কামদেব ভগবান তাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেন। কামদেবের কৃপায় সকল পুরুষেরা কামে উত্তেজিত হয়ে কিন্তু সামনে যাকে পায়,তাকে নিয়ে রুমে চলে যায়।
◆ রানী মাসি নীলিমা কতগুলো কৌশল সুভাষিনী কে শেখাতে থাকে, যেমন কাপড় পরার ফ্যাশন, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, কথা বলার কায়দা, চলাফেরার রীতি, প্রেমিক পুরুষ মদের পানাসক্ত হলে মন রক্ষার জন্য মদের গ্লাস ঠোঁটের কাছে ধরে কিন্তু মদ্যপানের ভান করতে হয় সহ ইত্যাদি ইত্যাদি পুরুষকে আকৃষ্ট করার কৌশল গুলো অভিনয় করে দেখাতে থাকে।
◆ রানী মাসি নীলিমা উপদেশ দিয়ে সুভাষিনী কে বলেন :- মনে দারুণ দুঃখ ও অপ্রীতিকর কারণ থাকলেও কিন্তু আগন্তুক পুরুষের সাথে
হেসে হেসে কথা বলতে হবে।
◆ এমন ভালোবাসা দেখাবে, কপট ভালোবাসা খরিদ্দার ধরতে না পারে। লম্পট পুরুষের মধ্যে যে ব্যক্তি যে প্রকার আমোদ চায় তাহা কে কিন্তু তাহাই দিতে হয়।
◆◆ সুভাষিনী ভাবে, এই প্রকার প্রতারণার শিক্ষা লাভ করতে করতে আমার মনে বোধ হলো, যেন আমার হৃদয়ের মধ্যে একটা নতুন করে পতিতা সুভাষিনী এর জন্ম হয়েছে।
◆ রানী মাসি নীলিমার চিকিৎসার অর্থ ও মাতৃ ঋণ শোধ করার জন্য কিন্তু আবার নতুন করে আমি পতিতাবৃত্তি শুরু করলাম।
◆ সৎ ভাবে জীবন যাপন করার জন্য কিন্তু কোন সৎ ব্যক্তির সন্ধান পেলাম না।
◆ প্রবাদ বাক্যে বলে, "সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে নরক বাস।"
◆ আমার পাপ কাজের চঞ্চল মন-মানসিকতা কারণে আমার জীবনে পাপের পথই অসৎ সঙ্গ লাভ হয়েছে।
◆ সৎসঙ্গ, সৎ ব্যক্তি ও সৎ সাধু-সন্ত-মহাত্মা গণের সান্নিধ্য লাভ করার পরও কিন্তু অসৎ মন পাপের পথে ধাবিত হয়েছে। ধর্মের দাহিকা শক্তি কিন্তু আমার পাপ দেহে স্পর্শ করতে পারেনি।
◆◆ কয়েক এক সপ্তাহ পর রানী মাসি নীলিমা দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে সুভাষিনী ঘরে ঢুকে তার পাশে বসে বলেন :- আরো তুই তো গান বাজনা জানিস, তা প্রতিভা কে কাজে লাগা। পতিতালয়ে রবীন্দ্র সংগীত চলবে না।
◆ সুভাষিনী বলে :- আধুনিক যুগের বিভিন্ন বাংলা ও হিন্দি ভাষার গান গুলো শিখতে হলে একজন ভালো ওস্তাদের দরকার।
◆ রানী মাসি নীলিমা বলেন :- একজন ওস্তাদ কে কিন্তু আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছি, সে একসময় আমার কাছে খুব ঘন ঘন আসতো।
◆ রানী মাসি নীলিমা কয়েকদিনের মধ্যেই গান বাজনা করার হারমোনিয়াম, ডুগি ও তবলা সহ ইত্যাদি ইত্যাদি সরঞ্জাম ক্রয় করে কিন্তু সুভাষিনী এর ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
◆ তারপর রানী মাসি নীলিমা একজন গানের ওস্তাদ রেখে সুভাষিনী কে আধুনিক গান শেখাতে থাকে। লপেটা, হিন্দি, গজল, অথবা উচ্চ-অঙ্গের খেয়াল-ঠুংরি, এসব হল বেশ্যামহলের রেওয়াজ।
◆ পাঁচ মাসের মধ্যে সুভাষিনী গান শিখে নেয় আর গান প্রেমিক খরিদ্দারদের জলসা করে ও ব্যক্তিগত ভাবে মনোরঞ্জন করতে শুরু করে। আগের তুলনায় কিন্তু সুভাষিনী এর আয় রোজগার অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
◆ সুভাষিনী কে রানী মাসি নীলিমা খদ্দেরের সাথে ছলনা শিক্ষা সহ লোক চেনার বিভিন্ন বিদ্যা শিক্ষা দিতে থাকে।
◆ রানী মাসি নীলিমা বলেন :- খরিদ্দার সেজে কেউ চুরির মতলব আসে, কেউ কুৎসিত রোগাক্রান্ত, কেউ দুষ্ট প্রকৃতির লোক, কেউ ভাল মানুষ ও সরল চিত্তে সকল কে কিন্তু মুখ দেখে ধরতে হয়।
◆ অনেক সময় অসাবধানতাবশত কিন্তু বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। একদল লোক খরিদ্দার সেজে পতিতালয়ে এসে কিন্তু নারীদের সব কিছু ডাকাতি করে নিয়ে যায়। আবার কখনো কখনো বেশ্যাদের কে হত্যা করে।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- পতিতা নারীকে তার জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পতিতা বৃত্তির ব্যবসা করতে হয়।
দেহের সোনার গয়না গুলোর জন্য খরিদ্দারের ছুরি আঘাতে কিন্তু অনেক নারী কে মরতে দেখেছি। পতিতা নারীদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাহলে এই ভাবে হয়।
----------------------------------------------------------
।। চল্লিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। একচল্লিশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ বিনোদ ভাবে :- কলকাতায় পতিতাবৃত্তি বিভিন্ন রূপে উপস্থিত রয়েছে। কলকাতার যৌন শিল্প এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম জায়গা করে নিয়েছে। পতিতাবৃত্তি পতিতালয়-ভিত্তিক বা অ-পতিতালয় ভিত্তিক হতে পারে যেমন কল গার্লদের ক্ষেত্রে হয়।
◆ ভারতকে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক যৌন ব্যবসার একটি ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
◆ কলকাতার অনেক নিষিদ্ধ পল্লী রয়েছে, যার মধ্যে সোনাগাছি এশিয়ার বৃহত্তম নিষিদ্ধ পল্লী নামে খ্যাত। যেখানে ৫০,০০০ এরও বেশি বাণিজ্যিক যৌনকর্মী রয়েছে।
◆ জয়ন্তীর পুরুষ ধরার ব্যবসা করতে গিয়ে কলকাতার বিখ্যাত ঘোড়ার রেসের ময়দানে নেমে পড়ে। লাখ লাখ টাকা পাওয়ার আশায় রেসের ময়দানে বাজি ধরতে ধরতে একদিন সর্বনাশের চরম সীমায় পৌঁছে যায়।
◆ জয়ন্তী কে রক্ষিতা হিসাবে যে সব ধন সম্পদশালী পুরুষ ব্যবহার করে চলছিল কিন্তু জয়ন্তীর অস্বাভাবিক খরচের যোগান দিতে অপারগ হয়ে পড়ে।
◆ জয়ন্তী আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আভিজাত্য সম্পন্ন পুরুষের সবকিছু লুট করে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। উক্ত পুরুষ কিছুদিন পর জয়ন্তীকে বিদায় দিতে বাধ্য হয়।
◆ এভাবে বিভিন্ন পুরুষের হাত ঘুরতে ঘুরতে এক সময় রক্ষিতা রাখার কোন পুরুষ না পেয়ে কিন্তু নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে।
◆ জয়ন্তী কলকাতার বিভিন্ন উদ্যানে ও রেল স্টেশন সহ ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গায় ঘুরে ঘুরে পুরুষের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে, তাদের সাথে ভালোবাসার কথাবার্তা বলে তার অর্থনৈতিক বিষয় জানার চেষ্টা করে।
◆ যে সব ব্যক্তির টাকা পয়সা ভালো আছে, এমন সব নতুন নতুন ব্যক্তি কে রাতে জয়ন্তীর ঘরে আহ্বান জানায়। তাদের মনোরঞ্জন করে টাকা উপার্জন করতে শুরু করে।
◆ একদিন জয়ন্তীর বাড়িতে হঠাৎ করে বিনা নেমন্তন্নে সন্ধ্যার পর রাজ্যের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রঞ্জন সরকারের আবির্ভাব হয়।
◆ হঠাৎ করে রঞ্জন সরকার কে দেখে জয়ন্তী ও বিনোদ বিস্ময়াপন্ন হয়ে পড়ে। কারণ দুজনের কাছেই পূর্ব থেকে পরিচয় ছিল।
◆ রঞ্জন সরকারের দুর্ভাগ্য হল জয়ন্তী তাকে সম্মান না দেখিয়ে কিন্তু অপমানজনক কথাবার্তা বলে ঘর থেকে বের করে দেয়।
◆ রঞ্জন সরকার ক্রেদিত হয়ে কয়েকটি কথা বলে রাস্তা রাখা গাড়িতে উঠে বসে।
◆ বিনোদ ধীরে ধীরে জয়ন্তীর কাছে এসে বলে :- রঞ্জন বাবু কে কেন তাড়িয়ে দিলে?
◆ জয়ন্তী উত্তেজিত হয়ে বলে :- আজকে রাতের আনন্দ ফুর্তি দেওয়ার মেজাজটাই খারাপ করে দিল। আমি কিন্তু বাজারের ১০ জনের মতো বেশ্যাগিরি করি না, আমার খরিদ্দার সব আভিজাত্য সম্পন্ন ধনী ব্যক্তিগণ। এইসব বাজে লোককে কেন ঢুকতে দাও?
◆ জয়ন্তীর আভিজাত্যের গৌরব কথা শুনে বিনোদ হো হো করে হেসে উঠে বলে :- তুমিতো বাজারের সাধারণ বেশ্যা নয়, আভিজাত্য সম্পন্ন ধনী ব্যক্তির রক্ষিতা বলে কথা। তারপর উচ্চ কূল ব্রাহ্মণ বংশের কুলের মর্যাদা নষ্টকারী নারী।
◆ জয়ন্তী বলে :- তুমি কিন্তু অনেক বড় বড় কথা বলছো কিন্তু কখনোই তোমার সীমালংঘন করার চেষ্টা করে না।
◆ জয়ন্তীর কয়েক মাসের চেষ্টায় আবার নতুন শিকার পেয়ে যায়।
◆ কলকাতার ইটালী অঞ্চলের একজন প্রসিদ্ধ কয়লা ব্যবসায়ী বসন্ত ঘোষের কাছে জয়ন্তী তার রক্ষিতা হয়।
◆ বসন্ত বাবুর একটি স্বতন্ত্র বাগান বাড়িতে দারোয়ান, রান্নার, কাজের মহিলা ও বিনোদ কে চাকরি দেওয়া সহ প্রভৃতি সুযোগ সুবিধা প্রদান করে খুব জাঁকজমক করে জয়ন্তী কে রাখে।
◆ কয়েক মাস আনন্দে দিন অতিবাহিত হওয়ার পর জয়ন্তী প্রাক্তন মালিক অঙ্গটি বাবু জয়ন্তী মোহমায়া ত্যাগ করতে না পেরে কিন্তু হঠাৎ করে একদিন কয়েকজন বন্ধু এবং অন্যান্য লোক সাথে করে বসন্ত ঘোষের বাগান বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
◆ বসন্ত ঘোষ তার কয়েকজন বন্ধু সহ সেই মুহূর্তে বাগান বাড়িতে অবস্থান করছিল।
জয়ন্তীকে নিয়ে অঙ্গটি বাবুর সাথে বসন্ত বাবু মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু যায়। চরম পর্যায়ে তর্কবিতর্ক হতে হতে হাতাহাতি মারামারি শুরু হয়ে যায়।
◆ সম্মানিত ষাঁড়ের সাথে আরেক সম্মানিত ষাঁড়ের লড়াইয়ে জেতার জন্য উভয়পক্ষ সাক্ষী প্রমাণ নিয়ে থানায় ডায়েরি করে। কলকাতার বিশিষ্ট লোকজনের নাম জড়িয়ে পড়ে। জয়ন্তীতে আসক্ত একজন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ মহাশয়ের মধ্যস্তে উভয় পক্ষের মীমাংসা হয়ে যায়।
◆ বসন্ত ঘোষের বাগানবাড়ি থেকে জয়ন্তী বিতারিত হয়ে আবার নতুন করে কয়েকটি রুম বিশিষ্ট বাড়ি ভাড়া নেয়।
◆ জয়ন্তী তার প্রাপ্ত বয়সের তিনটি মেয়েকে তার কাছে নিয়ে আসে, আর বড় মেয়েকে দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। মেয়ের দেহ বিক্রির টাকায় জয়ন্তী নিজের বিলাসিতার জন্য খরচ করতে থাকে।
◆ জয়ন্তীর বড় মেয়ে সবিতাকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন অর্থ সম্পদের সমৃদ্ধ বয়স্ক ভদ্রলোক সঙ্গে কলা কৌশল খাটিয়ে তার মেয়েকে বিয়ে দেয়।
◆ জয়ন্তীর মনের ইচ্ছা ছিল, বৃদ্ধ জামাই তার তরুণ বউ পেয়ে খুশি থাকবে এবং শাশুড়ি হিসাবে বয়স্ক জামাইয়ের সিন্দুকের সব দায়িত্ব তার হাতে এসে যাবে। তাহলে সে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে।
◆ বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই জয়ন্তীর ভুল সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয়ে পড়ে। জামাই কিন্তু টাকা ও সম্পত্তির বিষয়ে শাশুড়িকে একদম পাত্তা দেয় না।
◆ জয়ন্তী টাকা গন্ধ পেয়েও কিন্তু হাতে না পাওয়ার যন্ত্রণা ভোলার জন্য জামাই এর উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। আর তার মেয়েকে কুপরামর্শ দিয়ে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে জামাইয়ের অবর্তমানে মেয়ে কে তার কাছে নিয়ে আসে।
◆ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জয়ন্তী নতুন খরিদ্দার কর্পোরেশন স্ট্রিট এলাকার মধ্যে অখিল মাড়ওয়ারি এর বাগান বাড়িতে কিন্তু মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তার মেয়েকে রক্ষিতা হিসেবে বাস করতে পাঠিয়ে দেয়।
◆ জামাই সবকিছু জানা সত্ত্বেও তার স্ত্রীকে কোন কিছুর বিনিময়ে ছাড়তে রাজি হয় না। তার শাশুড়ি জয়ন্তীর সাথে বারবার আলোচনা করে কোন কাজ হয় না।
◆ জামাই উপায় অন্ত না পেয়ে কিন্তু শাশুড়ির নামে আদালতে মামলা দায়ের করে। আদালতে মামলার বিচারের রায় অনুসারে জয়ন্তী হেরে যায়।
◆ জয়ন্তীর মেয়ে আবার তার স্বামীর ঘরে ফিরে আসে। কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার জয়ন্তী তার মেয়েকে এক প্রকার চুরি করে তার কাছে নিয়ে আসে।
◆ জামাই আবার তার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন কে সাথে করে শাশুড়ির বাড়ি থেকে জোর করে তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়।
◆ জয়ন্তী টাকার লোভে কিন্তু তার মেয়ে জামাইকে কোনদিন শান্তিতে থাকতে দেয় না।
◆ জামাই বাধ্য হয়ে কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে দেয়। একদিন রাতে গোপনে গোপনে পৈতৃক ভিটে বিহার রাজ্যের মধুপুর গ্রামে চলে যায়।
◆ তার স্ত্রীকে কড়া নজরদারির মধ্যে দিয়ে বাড়ি বন্দী করে রাখে অর্থাৎ বাড়ির চারপাশে প্রাচীর এর বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ ও সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। জয়ন্তীর মেয়ের স্বামীর কড়া শাসনের মধ্যে দিয়ে কিন্তু স্বামী-স্ত্রী শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
◆ বিনোদ ভাবে :- পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ৬৩,২২৯ টি গ্রাম আর ৭৮,৭৯৯ টি বুথ বা পাড়া হয়েছে।
◆ ২০১১ সালে অনলাইনে এক সমীক্ষায় জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের ৭৮,৭৯৯ টি বুথ বা
পাড়ায় সামাজিক বধু পতিতার সংখ্যা আনুমানিক ২,৩৬,৩৯০ জন সামাজিক পতিতা বসবাস করে। গড় হিসাবে প্রতিটি পাড়া বা বুথ এলাকায় ৩ জন করে সামাজিক বধু পতিতা আছে।
◆ সামাজিক বধু পতিতা বলতে, ছেলে-মেয়ে ও স্বামীর সংসার বজায় রেখে কিন্তু কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরের কাজের বা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির অজুহাত দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে স্বেচ্ছায় গোপনে গোপনে পতিতা বৃত্তির ব্যবসা করে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার সরাসরি পতিতালয় ও বড় বড় হোটেলের সাথে যুক্ত আছে। নিজের এলাকায় একজন সতী সাবিত্রী পতিব্রতা সাংসারিক নারী।
◆ সামাজিক বধু পতিতা হওয়ার কয়েকটি কারণ,
শারীরিক ভাবে স্বামীর অক্ষমতায়, রোগগ্রস্ত ও দারিদ্র্যের কারণে পরিবারের সদস্যদের দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পতিতাবৃত্তি।
আরেক একটি কারণ, অত্যধিক রিপুর তাড়নায় এক পুরুষে সন্তুষ্ট নয় যে নারী।
◆ যার যেমন কর্ম দক্ষতা অনুসারে কিন্তু পুরুষ খরিদ্দার লাভ করে। কেউ একদম সাধারণ পুরুষের সঙ্গ করে আবার কেউ আভিজাত্য সম্পন্ন পুরুষের সান্নিধ্য লাভ করে লাখ লাখ টাকা আয় করে চলেছে।
◆ কলকাতা এক আজব নগরী। দিনের এক রূপ আবার রাতে অন্য রূপ লাবণ্য প্রকাশ করে।
রাতের কলকাতায় হাজার হাজার নর-নারী আয় রোজগার করে সংসার নির্বাহ করে চলেছে।
◆ পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ২০১১ আদমশুমারি অনুসারে মোট জনসংখ্যা ৯,১২,৭৬,১১৫ জন।
পুরুষের সংখ্যা :- ৪,৬৮,০৯,০২৭ জন।
মহিলাদের সংখ্যা :- ৪,৪৪,৬৭,০৮৮ জন।
◆ পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ২০২৩, (আনুমানিক)
মোট জনসংখ্যা :- ১০ কোটি ৪ লাখ।
পুরুষের সংখ্যা :- ৫.১ কোটি।
মহিলাদের সংখ্যা :- ৪.৯ কোটি।
◆ ২০২৩ সালে মহিলাদের জনসংখ্যা ভিত্তিক হিসাব অনুসারে গড়ে ১% অর্থাৎ ৪ লাখ ৯ হাজার জন সামাজিক বধু পতিতা হয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে চলেছে। সমাজের অন্তরালে চোরা স্রোতের ন্যায় সামাজিক বধু পতিতা বসবাস করছে।
◆ ২০১১ থেকে ২০২৩ সাল অর্থাৎ ১২ বছরে ২,৬৪,৬১০ জন পতিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
◆ ২০০৭ সালে, নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে ৩০ লাখের বেশি মহিলা যৌনকর্মী বিদ্যমান, যাদের ৩৫.৪৭ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হবার আগেই এই ব্যবসায় নিয়োজিত হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ভারতে পতিতাদের সংখ্যা ৫০% বৃদ্ধি পায়।
◆ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরের পতিতালয়ের পতিতা নারীর সংখ্যা হলো, ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে মূল মহিলা জনসংখ্যার ০.২৫% অর্থাৎ ১,২৫,২৫০ ( ১ লাখ ২৫ হাজার ২ শত ৫০) জন পতিতা নারী পতিতালয়ের মাধ্যমে পতিতাবৃত্তি করে।
◆ তাহলে সামাজিক বধু পতিতা ১% ও পতিতালয়ের পতিতা ০.২৫% = মূল মহিলা জনসংখ্যার (৪.৯ কোটি) ১.২৫% অর্থাৎ ৬,১,২৫০ ( ৬ লাখ ১ হাজার ২ শত ৫০) জন পতিতা নারী পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় আছে।
◆ কল গার্লরা স্বাধীনভাবে এবং যৌনকারবারি বা এসকর্ট এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করে।
শহরের অনেক বিউটি পার্লার ও ম্যাসাজ পার্লার থেকে পতিতাবৃত্তি পরিচালিত হয়।
◆ যৌন কারবারি (সাধারণত এজেন্ট বলা হয়) নাইট ক্লাব, পাব, তারকা হোটেল এবং ফ্লোর বয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করে সাধারণত কলগার্লদের ছবি সহ ক্যাটালগ রাখে। মেয়েরা ফ্ল্যাট, হোটেল ইত্যাদি জায়গায় যায়।
◆ সাধারণত কল গার্লরা তারকা হোটেলের রুমে যায়। যাইহোক, যখন গ্রাহক সুবিধার জায়গা প্রদান করতে পারে না, তখন এজেন্ট এটি প্রদান করে এবং স্থানটি সাধারণত আগে নির্ধারণ করা হয়।
◆ কলকাতা কল গার্ল মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসতে পারে। তারা নির্বাহী, গৃহিণী, কলেজ ছাত্রী ও অভিনেত্রী হতে পারে।
◆ কলকাতা পুলিশের অনেক কল গার্লের সাথে যোগাযোগ রয়েছে, যা তাদের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করে। অনেক অপরাধী মেয়েদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করে। তাই সন্দেহভাজন অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য পেতে পুলিশ কিছু কল গার্ল ব্যবহার করে।
◆ দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি (ডিএমএসসি), যেটি সোনাগাছি প্রকল্প এবং পশ্চিমবঙ্গে অনুরূপ কয়েকটি প্রকল্প পরিচালনা করে।
◆ যৌনকর্মীদের অধিকারের স্বীকৃতি এবং সম্পূর্ণ বৈধকরণের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
◆ ডিএমএসসি ১৪ নভেম্বর ১৯৯৭-এ কলকাতায় 'যৌন কর্মই আসল কাজ: আমরা শ্রমিকদের অধিকারের দাবি করি' শিরোনামে ভারতের প্রথম যৌনকর্মীদের জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করেছিল।
◆ জয়ন্তী হাঁটতে হাঁটতে নিচের তলার বিনোদ এর ঘরে ঢুকে তার পাশে বসে বলে :- তোমার শরীর ঠিক আছে তো! চলে রান্না ঘরে অনেক রাত হয়েছে।
◆ বিনোদ বলে :- বাবু চলে গেছে।
◆ জয়ন্তী বলে :- চলে গেছে কিন্তু শালা খুব কিপটে। আমার নাম জয়ন্তী কিন্তু খরিদ্দারের মন জয় করে টাকা আদায় করার সব কৌশল জানি।
----------------------------------------------------------
।। একচল্লিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। বিয়াল্লিশ অধ্যায় ।।
----------------------------------------------------------
◆ পতিতা সুভাষিনীর ঘরে কলকাতার একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ভদ্রলোক আসা যাওয়া করতে থাকে।
◆ একদিন রাতে সুভাষিনীর জন্য কিছু ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকে পাশে বসে চিকিৎসক ভদ্রলোক বলেন :- এই ঔষধ গুলো ঠিক মতো খাবে, তাহলে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে। আর কোন কিছুর প্রয়োজন হলে কিন্তু সংকোচ না করে আমাকে বলবে।
◆ সুভাষিনী বলে :- আমার মত একজন নষ্টা নারীর জন্য কিন্তু আপনি অনেক কিছু ভাবেন, আপনার উপকারের প্রতিদান দিতে পারবো না। আপনি একজন বড় মাপের চিকিৎসক তা আমি মানুষের মুখে শুনেছি।
◆ সুবাসিনী কে চুপ করিয়ে আফসোস করে চিকিৎসক ভদ্রলোক বলেন :- আমার তো আর সংসার ধর্ম নেই। অসুস্থ মানুষকে ভালোবেসে ও ঔষধ দিয়ে যদি কিছু উপকার করতে পারি।
◆ সুভাষিনী বলে :- ডাক্তার বাবু; আপনার অন্তরে অনেক দুঃখ জমা হয়ে আছে। যদি বন্ধু মনে করেন তাহলে বলে নিজেকে মনকে হালকা করতে পারেন।
◆ চিকিৎসক ভদ্রলোক বলেন :- একঘেয়েমি একই জিনিস প্রতিদিন ভালো লাগেনা, চলো আজ ইডেন গার্ডেন ঘুরে আসি।
◆ সুভাষিনী বলে :- চলুন।
◆ সুভাষিনী খরিদ্দার ডাক্তার বাবুর সাথে কথা বলতে বলতে ভাবে, আমার বেশি পুরুষ ঘরে আনার কোন চাহিদা নেই। ডাক্তারবাবু মাসে মাসে যে টাকা দেয় তা দিয়ে আমার সংসার চলে যায়। ঘুরতে আসলে অতিরিক্ত বকশিশ হিসেবে টাকা পাওয়া যায়।
◆ চিকিৎসক ভদ্রলোক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন :- আমার দশ বছরের বিবাহিত জীবন বড় দুঃখের। জনগণের চিকিৎসা করতে গিয়ে স্ত্রীকে ঠিক সময় মতো তার চাহিদা পূরণ ও সঙ্গ না দেওয়ার কারণে একদিন বাড়ির গাড়ি চালকের সাথে পালিয়ে যায়। তারপর ছয় বছরের ছেলে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা যায়।
◆ সবার স্মৃতি ভোলার জন্য কিন্তু তোমার কাছে আসা আর মদ পান করা।
◆ হাত পর সুভাষিনীর হাত ধরে বলে, তুমি কিন্তু নতুন করে দুঃখ কষ্ট দিয়ে না। আমার ভালো না লাগলে কিন্তু সরাসরি বলে দেবে, আর তোমার কাছে আসবে না। জানি, আমার জন্য তোমার ব্যবসার অনেক ক্ষতি হচ্ছে কিন্তু কি করবো বলো?
তোমার সাথে থাকলে কথাবার্তায় মনে শান্তি লাভ করি।
◆ সুভাষিনী বলে :- প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু না কিছু দুঃখের ঘটনা আছে। আমার কিন্তু পতিতাবৃত্তি ব্যবসা করতে একদম ভালো লাগেনা কিন্তু উপায় নেই।
◆ আমারও তো একজন পুরুষকে নিয়ে সংসার করার ইচ্ছা হয় কিন্তু সামাজিক মর্যাদা কে দেবে?
◆ চিকিৎসক ভদ্রলোক বলেন :- সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। চলে; অনেক রাত হয়েছে, তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
◆ সুভাষিনী তার ঘরে অন্য খরিদ্দার না ঢুকানোর জন্য কিন্তু রানী মাসি নীলিমা বিরক্ত হয়ে একদিন দুপুরে সুবাসিনী ঘরে ঢুকে কিছু সময় ধরে কথাবার্তা বলার পর বলেন :- “মা,আয় রোজগার যা পারো, যৌবন ও শরীরের শক্তি থাকতে থাকতে করে নাও। শেষ বয়সের কথা মনে রেখো । এই বয়স থেকে কিছু টাকা জমাতে না পারলে কিন্তু ভবিষ্যৎ জীবনে ভীষণ ভাবে কষ্ট পাবে।
◆ দেখছো তো, এই পথে বন্ধু বান্ধব কেহই নেই। একমাত্র শরীরের বিনিময়ে টাকায় কিন্তু সব।
◆ চিকিৎসক বাবু চিরকাল তোমার কাছে থাকবে না আর তোমার অবাস্তব স্বপ্ন কিন্তু কোন দিন সফল হবে না। ব্যবসায় মন দিয়ে খরিদ্দার কে মনোরঞ্জন করে যাও।
◆ যৌবন জোয়ার কিন্তু সমুদ্রের জোয়ার ভাটার মতো। ক্ষণস্থায়ী যৌবন কে কাজে লাগিয়ে যত পারো ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে টাকা জমা করতে থাকে ।
◆ আশ্বিন মাসে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজার কয়েক দিন আগে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির কারণে দুই বাংলার অসংখ্য জেলাগুলো বন্যায় ভেসে যায়। চারিদিকে মানুষের হাহাকার আর খাদ্য সংকট শুরু হয়েছে।
◆ চিকিৎসক ভদ্রলোক একদিন সুবাসিনী ঘরে এসে বলে :- বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য যদি পারো কিছু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও।
◆ সুভাষিনী সাধ্য অনুসারে কয়েক হাজার টাকা ত্রাণ তহবিলে দান করে । চিকিৎসক ভদ্রলোকের সাথে নিজের ব্যবসা বন্ধ করে প্রায় দুই মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে টাকা সংগ্রহ করে ত্রাণ তহবিলে জমা করতে থাকে।
◆ এক ত্রাণ শিবিরে অবস্থান করে সুভাষিনী ভাবে :- দৈনিক সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়। এই ভয়ংকর বন্যা পশ্চিমবঙ্গের "২০০০ সালের বন্যা" নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
◆ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ও বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো ঘটে যাওয়া এক ভয়ঙ্কর বন্যা। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই বন্যায় মানুষ বসত বাড়ি ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।
◆১৯ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে বিহার মালভূমিতে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে বিহার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়।
◆ চব্বিশ ঘণ্টায় বীরভূমের বৃষ্টি হয় ২৭৭ মিমি. পুরুলিয়ায় ১১৯ মিমি.ও বাঁকুড়ায় ১৫৮ মিমি.।
◆ অবিরাম প্রবল বর্ষণে বীরভূম, বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মেদিনীপুর জেলার কিছু অঞ্চলসহ হাওড়া, হুগলি, নদীয়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলের তলে নিমজ্জিত হয়েছে।
◆ বর্ষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নেমে আসে তিলপাড়া, ম্যাসাঞ্জোর জলাধার থেকে ছাড়া উত্তাল জলধারা। দ্বারকা, ময়ূরাক্ষী, জয় ,ব্রাহ্মণী, ভাগীরথী অস্বাভাবিক জলস্ফীতি ঘটেছে।
◆ নদী -বাঁধ ভেঙে কিংবা নদী -বাঁধ উপচে প্লাবন অসংখ্য গ্রাম,গঞ্জে ও শহর গ্রাস করেছে। দামোদরের বাঁধ গুলি থেকেও জল ছাড়ার ফলে প্লাবন সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। কলকাতা মহানগরীর নিম্নাঞ্চল অতিবর্ষণে ও হুগলি নদীর জোয়ারের জলে প্লাবিত হয়েছে।
◆ ২০০০ সালের বর্ষার মৌসুমে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঘটে। এর ফলে গঙ্গার উপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের অতিরিক্ত জল জমা হয়। এর ফলে আগস্ট মাসের শেষের দিকে বাঁধ কর্তৃপক্ষ বাঁধের লকগেট খুলে দিতে বাধ্য হয়।
◆ জমা রাখা জল মুক্ত হয়ে দ্রুত বেগে পদ্মা নদী দিয়ে ছুটে আসে। পদ্মার শাখা নদী জলঙ্গী নদীতে সেই জল ঢুকে পড়ে। এই কারণে জল জলঙ্গী দিয়ে বাহিত হয়ে নদীয়া জেলায় পৌঁছায়। এর পর নদীয়ায় জলঙ্গীর বাঁধ ভেঙ্গে ইছামতি নদী হয়ে জলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা প্লাবিত করে ভয়ঙ্কর বন্যার সৃষ্টি করেছে।
◆ এছাড়া পদ্মা থেকে জল কপোতাক্ষ নদী হয়ে খুলনা বিভাগের বহু জেলা ও বরিশাল বিভাগের দুটি জেলায় বন্যার সৃষ্টি করেছে। এই এলাকার ইছামতি নদী, কপোতাক্ষ নদী, ভৈরব নদী , রূপসা নদী, চৈতা নদী ও যমুনা নদী (পশ্চিমবঙ্গ) গুলিতে পলি জমে অগভীর হয়ে যাওয়ায় বন্যার আকার আরও ভয়ঙ্কর হয়েছে।
◆ পশ্চিমবঙ্গের ইছামতি নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহরে উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ ও নদীয়া জেলার দত্তপুলিয়া সম্পূর্ণ ভাবে বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।
◆ দুঃখ-কষ্ট -দুর্গতি, ব্যাধির প্রকোপ ও প্রাণহানি
এই মহাপ্লাবনের সহস্রাধিক মানুষের জীবনহানি ঘটেছে। শত শত মানুষ জল স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে।
◆ এক কোটি আশি লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । কত যে গবাদি পশু মারা যায় তার হিসেব নেই। বন্যা দুর্গত মানুষের দুঃখ কষ্টের অবধি ছিল না। মাঠের ফসল বিনষ্ট হয়েছে। মানুষ থাকার আশ্রয় হারায়। সঞ্চিত খাদ্য সামগ্রী ভেসে গিয়েছে। খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে অনেকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। নলকূপ ও নদীর জল দূষিত হয়েছে। ফলে পানীয় জলের অভাব ঘটেছে।
◆ উদ্ধার ও ত্রাণ এর কাজ যথাসময়ে যথাযথ ভাবে না হওয়ার কারণে মানুষের দুঃখ কষ্ট আরো বেড়ে উঠে। সর্প দংশনে বেশ কিছু লোক মারা যায়। আন্ত্রিক মহামারির আকার ধারণ করতে মৃত্যুর হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
◆ যাতায়াতের সড়কপথ ও রেলপথ গুলি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। বহু সেতু বন্যার জলে স্রোতে ভেঙ্গে গিয়েছে। খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
◆ এই বন্যা প্রায় এক মাস ধরে স্থায়ীভাবে চলেছে।
চিকিৎসক ভদ্রলোকের সহযোগিতায় সুভাষিনী বন্যায় আক্রান্ত মানুষের পাশে গিয়ে যথাসাধ্য সাহায্য ও সেবা শুশ্রূষা করে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার রানী মাসি নীলিমার বাড়িতে ফিরে আসে।
◆ রানী মাসি নীলিমা ঘরে ঢুকে বলেন :- মা সুভাষিনী; বন্যা পরিস্থিতি তো স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে কিন্তু এখন ব্যবসায় মন দে।
◆ বাংলার জনগণের দুরবস্থার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার আছে, কিন্তু পতিতা নারীদের জন্য কেউ নেই। জনগণ কিন্তু সরকার থেকে বিনামূল্যে রেশনের চাল ডাল তেল সাবান ইত্যাদি পাচ্ছে।
◆ আমাদের দুরবস্থার সময় কেউ সাহায্য করে না। অনেক দিন ধরে সমাজের সেবা শুশ্রূষা করেছিস কিন্তু আর নয়।
◆ রাতের বেলা একজন ভদ্রলোক তোর ঘরে আসবে, কিন্তু তৈরি হয়ে থাকিস।
◆ সুভাষিনী ভাবে :- রানী মাসি নীলিমার কথা গুলো অতীব সত্য কারণ পতিতার টাকা নিতে দোষ নেই কিন্তু পতিতা কে সম্মান , সহযোগিতা, সমর্থন ও স্বীক্ষার করতে বিরাট দোষের ব্যাপার।
◆ ত্রাণ তহবিলের টাকা সংগ্রহ নিয়ে ধন সম্পদ শালি ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি গণের রাজনীতি দলবাজি ও আত্মসাৎ করার কত না চক্রান্ত।
◆ সমাজের মানুষের সাথে না মিশলে কিন্তু সমাজের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভাল মন্দ ঘটনা জানা যায় না। সমাজের মধ্যে কিছু মুখোশধারী মানুষ কে চিনতে পেরেছি।
------------------------------------
----------------------------------------------------------
।। বিয়াল্লিশ অধ্যায় সমাপ্ত ।।
----------------------------------------------------------
ধারাবাহিক ভাবে চলবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন