লেখক :- শংকর হালদার শৈলবালা।
------------------------------------------------
।। প্রথম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
উঁচু পাহাড়ের দেহের মাঝে সাদা বরফ ঢাকা তার মাঝে বিন্দু বিন্দু জল পড়তে থাকে। দূর থেকে সকল নর নারীকে আকর্ষণ করে। খন্ড খন্ড সাদা বরফের টুকরো গুলো নারীর অপরূপ সৌন্দর্যের মতো অতি সুন্দর মনোরম। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে যদি কোন নারীর আবির্ভাব ঘটে, তাহলে আরো প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ভরা যৌবন পরিপূর্ণ হয়ে উঠে।
সূর্য উদিত হয়ে বরফকে ধীরে ধীরে করে ভালোবাসার আলিঙ্গন। সূর্যের আলো তাপের স্পর্শে সুখের ভালোবাসা পেয়ে, বরফের দেহ মনো প্রাণ অপরূপ সুন্দর মাধুর্যময় হয়ে ওঠে। আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে সূর্যকে করতে চাই শীতল।
কুড়ি বছরের যুবতী রিতা সাজগোজ
করে নীল রঙের শাড়ি ব্লাউজ পড়ে বিকেলের জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে বলে :- আমার উপর রাগ করেছে, তার জন্য দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
অষ্টাদশ যুবক তপেশ হাসতে হাসতে বলে :- না না রাগ অভিমান কার উপর করবো।
রিতার এক হাতে খাবারের থালা আর অন্য হাতে জলের বোতল নিয়ে তপেশ এর দিকে মাথা নিচু করে সামনের দিকে হালকা ভাবে ঝুঁকে দাঁড়ায়। আর বুকের কাপড় সরে যায়।
তপেশ এক দৃষ্টিতে রিতার অর্ধ অনাবৃত কুচ যুগলের উপর তাকিয়ে ভাবে :- হালকা শাড়ির মাঝে দেখা যায় তার দেহ পল্লবীর অপরূপ সৌন্দর্য। দেহের মধ্য অংশ অর্থাৎ পেটি তার খোলা। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি তার মাঝে কিন্তু পুরুষের মন করে চঞ্চল।
রিতা খাবার গুলো তপেশ এর সামনে নামিয়ে রেখে বলে :- এভাবে দেখার কি আছে? ভালো করে দেখুন। আমি কিন্তু ভিন্ন গ্রহের কোন নারী নয়। বাংলার মেয়ে আসামের ভ্রমণকারী আবার তোমার বন্ধু হতে চাই।
তপেশ চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে :- নারীর অপূর্ব সৌন্দর্যময় রূপ মাধুর্য কোনদিন কাছাকাছি থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
রিতা বিছানার উপর বসে বলে :- বাবার মুখে কিন্তু তোমার পরিচয় পেয়েছি। আর একমাত্র তোমার ভরসায় কিন্তু আসাম রাজ্যের এই জঙ্গলময় শহরের বনবাসে আসা।
রাতে পুরুষ বিহীন বাড়িতে কিন্তু কয়েক দিন ধরে ভীষণ ভাবে ভয় করছে। রাতে বিভিন্ন ধরনের বন্য পশুদের আওয়াজ শুনতে পায়। বোন তো ভয় পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে বলে, দেশের বাড়িতে চলে যাবে।
তপেশ খাবার খেতে খেতে বলে :- ঠিক আছে। আজ রাত থেকে তোমার পাশাপাশি থাকবো কিন্তু দূরে সরিয়ে দেবে না তো!
রিতা মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলে :- না, সম্ভব হলে বুকে জড়িয়ে রাখবো। তা রাতে মাংস খাবে তো।
তপেশ হাসতে হাসতে বলে :- কাঁচা না পাকা।
রিতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে :- কাঁচা মাংস খাওয়ার ইচ্ছা, তখন চেষ্টা করে দেখো-কোন চঞ্চল হরিনী কে বধ করতে পারে কিনা।
তপেশ বলে :- এই শোনো।
রিতা বলে :- এখন শোনার সময় নেই, রান্না করতে হবে, চললাম বন্ধু।
সপ্তাহ দুয়েক পর এক সন্ধ্যার পর তপেশ তার ঘরের মধ্যে দরজার দিকে পিছন দিয়ে বিছানার উপর বসে মাথা নিচু করে এক মনে বই পড়তে ব্যস্ত।
রিতা খোলা দরজা দিয়ে চুপচুপ তপেশের পিছনে এগিয়ে আসে। তপেশের পিছন থেকে বাজপাখির মতো ছো মেরে বই তুলে নিয়ে বিছানার এক কোণে বসে পড়ে।
তপেশ বই ফেরত পাওয়ার জন্য ঘুরে রিতার হাত থেকে গল্পের বই কেড়ে নিতে চায়। দুজনের মধ্যে কাড়াকাড়ি করতে করতে এক সময় রিতা চিৎ হয়ে বিছানার উপর শুয়ে পড়ে আর হাত লম্বা করে বই ধরে রাখে।
তপেশ হাতের দিকে যেতে গিয়ে টেবিলের কোনো বেঁধে গিয়ে রিতার বুকের উপর পড়ে যায়। আর মুহুর্তের মধ্যে দুজনের শরীরের ভেতরে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি অনুভব করে।
রিতার বুকের উপর থেকে কিন্তু তপেশ হাত বাড়িয়ে বই নেওয়ার চেষ্টা করে।
রিতা তার দুই হাত তপেশের পিঠের উপর দিয়ে এক সাথে করে হালকা চাপ দেয়। তারপর হাতের বইটি তার বুকের ব্লাউজ মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
তপেশের বুকের নিচেই পড়ে রিতা চোখে চোখ রেখে বলে :- তোমার বই নাও কিন্তু এটা কি হলো! ছাড়ো ছাড়ো বোন পাশের ঘরে আছে। তুমি না ভীষণ ভাবে দুষ্টু।
তপেশ তাড়াহুড়ো করে রিতার বুক থেকে গড়িয়ে পাশে নেমে বিছানার উপর উঠে বসে, আর তার বই নিতে গিয়ে কিন্তু ইচ্ছা করে রিতার অর্ধ অনাবৃত কুচ যুগলে হাত লাগিয়ে দেয়।
রিতার শরীরের মধ্যে অজানা শিহরণ পুলকিত হয়ে উঠে আর তাড়াতাড়ি করে বিছানায় উঠে বসে।
রিতা মাথা ঝাঁকিয়ে লম্বা লম্বা চুল গুলো সামনের দিকে নিয়ে এসে তার বাম কুচের বুকের উপর রেখে আনন্দের হাসি দিয়ে বলে :- তুমি ক্লাসের বই না পড়ে কিন্তু এই অশ্লীল ছবিগুলো দেখে চলছে আর কাম উত্তেজনা মূলক প্রেমের বই পড়ো। নাইন থেকে এই অবস্থা তাহলে কলেজে গিয়ে কি করবো?
তপেশ মৃদু মৃদু হাসি দিয়ে রিতার হাতে ধরে টান দিয়ে বিছানার বসিয়ে হাতে হাত রেখে হালকা চাপ দিতে দিতে বলে :- কি করবো বলো! নব যৌবনের সময়ে বাথরুমের ভালবাসা কিন্তু সবার থেকে আপন জন। বউ ও প্রেমিকা কখনো কখনো বেইমানি করে কিন্তু বাথরুম কখনো বেইমানী করে না।
রিতা মনে মনে ভীষণ আনন্দ লাভ করে মৃদু মৃদু হাসতে থাকে। নিজের উত্তেজিত ভাব কে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে তপেশ এর হাতের মুঠোয় থাকা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তপেশ এর বুকে দুই হাত দিয়ে হালকা ভাবে ঠেলে দিতেই তপেশ বিছানার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে।
রিতা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর তার দেহের শাড়ি কাপড় ঠিক করতে করতে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে :- ঘরের মানুষকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা করলেই কিন্তু আর ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হবে না। বাথরুম তাহলে তোমার শোয়ার ঘরের বিছানায় চলে আসবে।
আরো কয়েক সপ্তাহ পর এক দিন রিতার বোন পাশের বাড়ির সমবয়সী মেয়েদের সাথে খেলা করছে। আর তপেশ দুপুর বেলা ঘুমানোর অভিনয় করে শুয়ে আছে।
রিতা দুপুরের রান্না শেষ করার পর ভাবে স্নান করে এসে তারপর বোন ও তপেশ কে খেতে দিলে হবে আর বাবা তো সেই রাতে আসবে।
তপেশ এর ঘরের দরজার সামনে এসে রিতা বলে :- অসময়ে শুয়ে আছে। উঠে কুয়ার জলে স্নান করে মন ও শরীর শীতল করে নাও তারপর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করবে। আমি স্নান করতে বাথরুমে যাচ্ছি।
রিতা বাথরুমে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পর তপেশ ঘুম ঘুম চোখে বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিতেই কিন্তু খুলে যায়। আর তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়ে কিন্তু বাথরুমের মধ্যে অপরূপ দৃশ্য দেখে তপেশের চক্ষু চড়ক গাছ। রিতার সম্পূর্ণ অনাবৃত দেহ দেখা মাত্রই কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তপেশের দেহ মন কামের উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে ওঠে।
রিতা তাড়াহুড়ো লজ্জা নিবারণের জন্য হাত উঁচু করে দড়ি থেকে কাপড় নিতে যাবে, আর সেই মুহূর্তে তপেশ দুই হাত দিয়ে রিতা কে বুকে জড়িয়ে ধরে তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গের হাত বুলিয়ে আদর করে উত্তেজিত করতে থাকে।
রিতা হাসিমুখে বলে :- ছাড়ো ছাড়ো কি করছো! সুযোগে সৎব্যবহার করতে চাও।
তপেশ আনন্দিত হয়ে বলে :- এটা বাথরুমের ভালোবাসা। উভয়ের অঙ্গে অঙ্গে মিলিত হয়ে কিন্তু দুপুরের ভজন-ভোজন ও দেহ দানের ভালবাসার অন্তরালে দৈহিক মিলন। আমি তোমাকে ভালোবাসি গো ;আজ তোমাকে ভালবাসায় ভালবাসায় তোমার মন প্রাণ ভরিয়ে দেবে।
তপেশ কে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে চাপ দিতে দিতে রিতা বলে :- আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার দেহ মন প্রাণ সব কিছু তোমার কাছে আত্ম সমাপন করলাম।
বয়স্ক লোকেরা বলেছেন, মোম আর আগুন এক জায়গায় থাকলে কিন্তু মোম যত শক্তিশালী হোক না কেন! আগুনের তাপে গলতে শুরু করবে।
রিতা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে তার মাথা তপেশ এর ঘাড়ের উপর হেলিয়ে দিয়ে গরম নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে করতে আরো জোরে চেপে ধরে।
তপেশ বলে :- নারী দেহের মাঝে কিন্তু স্বর্গ সুখ আছে। বাথরুমের মেঝে কে কিন্তু ফুলশয্যার বিছানা মনে করে দুজনে বাসর রাতের বাসর ঘরে শুয়ে পড়ি।
রিতা অন্তরে আনন্দ অনুভব করে বলে :- নারী-পুরুষের মিলনে কিন্তু উভয়ের সর্ব স্বর্গ সুখ লাভ হয়। আজ তোমাকে কাছে পেয়ে কিন্তু আমার নারী জনম সার্থক হলো। আমি ভীষণভাবে আনন্দিত হয়েছি। দীর্ঘ সময় ধরে মিলনের মাধ্যমে কিন্তু সারা জীবন আত্মতৃপ্তি লাভ করে যেতে চাই।
------------------------------------------------
।। দ্বিতীয় অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
ভারতবর্ষের মানচিত্রের আসাম রাজ্যের
নওগাঁ জেলার লামডিং থানার অধীনে লামডিং শহর এলাকায় রেলওয়ে নিউ কলোনি পাড়ার সরকারি আবাসনে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পিতা মহেন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতা ঊষা রানী চক্রবর্তীর দ্বিতীয় সন্তান রূপে তপেশ চক্রবর্তী জন্ম গ্রহণ করে।
তার বাবা কে ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ
সরকারের কর্মচারী নদীয়া জেলার রানাঘাট থেকে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে মহেন্দ্র চক্রবর্তী কে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে রেলওয়ে চাকরি দেয়। চাকরির সুবাদে ঘুরতে ঘুরতে আসাম রেল কলোনির সরকারি আবাসনে কয়েক দশক ধরে বসবাস করতে করতে স্থায়ী হয়ে ওঠে। বাড়ি করার জন্য জমি কিনে রেখেছে।
তপেশ চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষের আদি নিবাস
বাংলাদেশের বৃহত্তম যশোর জেলার ঝিনাইদহ (বর্তমান জেলা) মহকুমা এলাকায় কোন এক গ্রামে বসবাস করতেন।
তপেশ চক্রবর্তীর বাবা মহেন্দ্র চক্রবর্তীর
নয় বছর বয়সের সময় পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হালিশহর এলাকায় গঙ্গার পাড়ে তার মৃত সুরুচি চৌধুরী দিদির কাছে থেকে পড়াশোনা শুরু করে।
লামডিং শহরের চারদিকে বালি মাটির সাথে কাঁকর সহ ছোট ছোট নুড়ি পাথরের অশক্ত পাহাড়ের পাদদেশে থেকে শুরু করে একদম উপর পর্যন্ত বন জঙ্গল। আবার তার মাঝে বেশিরভাগ বাংলাদেশের বাঙালি ও স্থানীয় ভূমিপুত্র অসমীয়া মানুষের বসবাসের ঘর বাড়ি তৈরি হয়েছে।
রাতের অন্ধকারে দূর থেকে দেখলে কিন্তু আলো-আঁধারির মাঝে ঘর বাড়ির এক অপূর্ব দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
চারিদিকে শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ভরপুর। সেগুন (বারমাটিক) গাছ সহ বিভিন্ন ধরনের গাছ, ফুল ও ফলের মাধ্যমে পাহাড়ের শোভা বর্ধন করে চলেছে। বন জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ি বিভিন্ন ধরনের ফুলের গন্ধে মন মেতে ওঠে। আবার দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে অস্বস্তি বোধের বিভিন্ন জায়গায় আছে।
এছাড়াও পাহাড়ে বিশেষ করে প্রকৃতির দান কাঁঠাল, আনারস, বনের আতা ফল ও কলা সহ বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যায়।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নষ্ট করে বন জঙ্গল কেটে ফেলে কিন্তু সমতল ও অসমতল জায়গা নিয়ে আধুনিক সভ্য সমাজের মানুষের বসবাসের বিভিন্ন নগর, পাড়া, গ্রাম ও শহর গড়ে উঠেছে।
------------------------------------
রাবার গাছের বাগান সহ এক পাহাড়ের
থেকে অন্য পাহাড়ে ১৫ বছরের কিশোর তপেশ চক্রবর্তী তার বন্ধুদের সাথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
তপেশ পড়াশোনা করার প্রতি তেমন মনোযোগ নেই কিন্তু সমবয়সী বন্ধুদের সাথে মারামারি হুড়াহুড়ি সহ স্কুলের মধ্যে দাদাগিরি করে কিন্তু দিনগুলো অতিবাহিত হয়।
তপেশ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাড়ার শেষ দিকের এক পাহাড়ের উপর বসে ভাবতে থাকে। তারপর কিছু সময়ের মধ্যে তার আরো দুজন বন্ধু এসে পাশে বসে।
তপেশ তার বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলে :- আজ শুক্রবার সিনেমা হলে কিন্তু ফাটাফাটি হিন্দি সিনেমা দিয়েছে। আমার কাছে কিন্তু কোন টাকা পয়সা নেই।
বন্ধুরা বলে :- নারে; আমাদের কাছে আজ কিছু নেই। তাহলে সিনেমা দেখা কিভাবে হবে! তপেশ একটা বুদ্ধি বের কর।
তপেশ একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে টানতে ভাবতে থাকে, কি ভাবে টাকা পাওয়া যাবে! মাসের শেষের দিকে কিন্তু বাবার পকেট তো ফাঁকা দেখলাম।
বিড়ির সুখ টান দিয়ে বলে :- আমার সাথে সহযোগিতা করলে কিন্তু একশো টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
বন্ধুরা বলে :- বল কি ভাবে?
তপেশ বলে :- ছলেবলে কৌশল অবলম্বন করে একটি কুকুর ধরতে হবে। আর পাশের রাজ্য নাগাল্যান্ড থেকে জিনিসপত্র কেনার জন্য পাহাড়ি মানুষেরা লামডিং শহরে আসে। তাদের কাছে কিন্তু কুকুর বিক্রি করে টাকা উপার্জন করা সম্ভব।
বন্ধুরা একসাথে হইচই করে ওঠে বলে :- তোর মাথায় সত্যিই হঠাৎ করে বুদ্ধি আসে। আমরা সহযোগিতা অবশ্যই করবো।
এক বন্ধু বলে :- তাহলে; বাড়ি থেকে মুড়ি ভাজা বড় শারাশি (বেড়ী) তাড়াতাড়ি নিয়ে আসছি।
তপেশ বলে :- তাড়াতাড়ি যা আর আমি কুকুরকে খাবার দিয়ে বন্ধুত্ব গড়ার কাজ শুরু করি। আর একজন বাজারে গিয়ে নাগা মানুষের খোঁজ করতে থাক। যদি পাওয়া যায় তবে এখানে নিয়ে আসবে।
কিছু সময় পরিশ্রম করার পর একটা কুকুর কে বেড়ী দিয়ে গলা চেপে ধরে আটক করে। তারপর দড়ি দিয়ে চার পা বেঁধে বস্তার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে মুখ বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকে। উক্ত তৃতীয় বন্ধু কিছু সময় পর নাগা খরিদ্দার নিয়ে উপস্থিত হয়।
কুকুরের দাম নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দামাদামি চলতে থাকে। ৭০ দশকের তৃতীয় বর্ষের জুন মাসের বিকালে কুকুর ১২৫ টাকা বিক্রি হয়।
তপেশ এর এক বন্ধু নাগা কে প্রশ্ন করে কুকুর দিয়ে কি করবেন?
নাগা মানুষ টি তার আঞ্চলিক ভাষায় হিন্দি মিশিয়ে বলেন :- কুকুরের মাংস পুড়িয়ে ও রান্না করে খাওয়া দাওয়া করা হবে। আমাদের নাগা সমাজের মানুষের কাছে এখনো বিশেষ ভাবে কুকুরের মাংস খাওয়ার রীতিনীতি প্রচলিত আছে।
এই কুকুরকে প্রথমে বাড়ি নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হবে। তারপর ভালো-মন্দ আয়োজন করে তাকে ভরপেট খাওয়ানো হবে। এরপর কুকুরের মুখ বেঁধে দেওয়া হবে।
সবাই মিলে ৫১ বার পুকুরের লেজ ধরে ঘোরানো হবে। তারপর কুকুরের মাথা ঘুরে উঠে আর সামনে রাখা কলার পাতার উপর বমি করতে থাকে। সেই আনন্দ উৎসব না দেখলে অনুভব করা যায়।
কেউ কুকুরের মাথা ধরে বমি করার সহযোগিতা করে আবার কেউ চিল্লাচিল্লি শুরু করে। এই উৎসবের সাথে সাথে নারী-পুরুষ মিলিত হয়ে বংশ পরম্পরায় আদিম নাচ গান করতে থাকে। বিশেষ ভাবে কিশোর কিশোরী ও যুবক যুবতীদের নাচ গানের অগ্র অধিকার দেওয়া হয়।
সেই বমির দ্রব্য গুলো নাগারা বিশেষভাবে কিছু দ্রব্য মিশিয়ে আনন্দ উল্লাস মাধ্যমে খাওয়া দাওয়া করে। বলতে পারো এটা একটা নাগাল্যান্ড রাজ্যের নাগা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে আদিম উৎসব।
আধুনিক সভ্য সমাজের একবিংশ শতাব্দীর সময়ে কিন্তু সভ্য নাগা ও বনাঞ্চল থাকা নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ ভাবে প্রচলিত আছে।
তপেশ বলে :- শুনেছি, নাগা মানুষেরা নাকি বয়স্ক বাবা-মা কে কেটে রান্না খাওয়া দাওয়া করে।
নাগা বলে :- কথা সত্য কিন্তু বর্তমানে নাগাল্যান্ডের নাগা সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক সচেতন ও সভ্য হয়েছে। বহু ছেলে মেয়েরা শিক্ষিত হয়েছে। চাকরি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ পদে আসীন হয়েছে। বাবা মাকে হত্যা করা আদিম প্রথা বলে মনে করে। আধুনিক নাগারা কুসংস্কার মনে অনেকেই বাবা মায়ের হত্যা করা থেকে বিরত হয়েছে। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
একদম পাহাড়ের বন জঙ্গলে থাকা মানুষ গুলো বর্তমানে কিন্তু পুরনো নীতি রীতি মেনে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে।
বাবা-মায়ের বয়স ৬০ বছরের উর্ধে হলে
তাকে সবাই মিলে জোর করে ধরে আনন্দ উল্লাস করতে করতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।
হত্যা করার বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে যেমন গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নিয়ে ফেলে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবে।
তারপর ছেলে মেয়ে সহ বংশের অন্য সদস্যরা মিলিত হয়ে তার দেহ কে কেটে কেটে ভাগ করে।
সন্তানদের মধ্যে কেউ বলে বাবার কলিজা খাবো কিন্তু তাই নিয়ে আবার অনেক সময় লড়াই ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। বিচিত্র এই খেয়াল খুশির মতো আনন্দ উৎসব চলতে থাকে।
ভাগে পাওয়া মাংস রান্না করে বা পুড়িয়ে খায়। আর বাবা-মায়ের হাড়গোড় গুলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে কবর দেওয়া হয়। আবার কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলন আছে, হাড়গোড় গুলো গুড়ো করে রেখে দেয়। খাওয়ার জিনিসের সাথে মিশিয়ে পেটের মধ্যে রাখা। তাদের কথায় বলে, বাবা-মাকে পেটের মধ্যে রেখে দেওয়া এবং পূর্বপুরুষের সম্মান জানানো। বাঙালি ভাই আজ এই পর্যন্ত থাক কিন্তু আবার কোনদিন দেখা হবে। চললাম এক ঘন্টা বাসে যেতে হবে তারপর আরো ঘন্টাখানেক পাহাড়ি পথে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে পৌঁছাতে হবে।
তপেশ হাতে টাকা নিয়ে তিন ভাগ করে বলে :- আবার কয়েক দিন আনন্দ ফুর্তি করে চলবে। কুকুর ধরা বিনা পুঁজির ব্যবসা শুরু করতে হবে।
আরো এক মাস পর কয়েক জন বন্ধুর সাথে বিকাল বেলা রাস্তার পাশে বসে আড্ডা দিতে দিতে এক বন্ধু বলে :- তপেশ; তুই নাকি খুব সাহসী। রাস্তার ঐ সুন্দরী মহিলার কুচ যুগলে হাত দিয়ে চাপ দিতে পারলে কিন্তু দুইশো টাকা দেওয়া হবে।
তপেশ বলে :- কোন ব্যাপার নয়।
বন্ধুরা বলে :- না, পারলে কিন্তু চারশো টাকা দিতে হবে।
তপেশ বলে :- বন্ধু ; তোদের প্রস্তাবে রাজি কিন্তু টাকা আমার হাতে দিতে হবে। তোরা কিন্তু উক্ত মহিলার সামনের দিকে থাকবে।
তপেশ টাকা নিয়ে একজন মহিলার পিছনে পিছনে যেতে যেতে হঠাৎ পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে কুচ যুগলে হাত রেখে চাপ দিতে থাকে।
উক্ত মহিলা চিৎকার করে উঠে আর তপেশ দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায়।
------------------------------------------------
।। তৃতীয় অধ্যায় ।।
------------------------------------------------ মহেন্দ্র চক্রবর্তী চাকরির সূত্র ধরে
শচীনন্দন বিশ্বাসের সাথে আলাপ হয়। দুজনের লামডিং শহরের রেল কলোনি পাড়া সরকারি আবাসনে বসবাস করার সুবাদে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।
শচীন বিশ্বাসের পৈতৃক বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ থানার এলাকার মধ্যে চন্দননগর চৌগাছা গ্রামে পরিবারের পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রীকে থাকে।
রেল কর্মচারীদের বিভিন্ন মালামাল সরবরাহের গুদম ঘরের দায়িত্ব পালনের চাকরির সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে আসাম রাজ্যের লামডিং শহরের রেল কলোনির মধ্যে সরকারি আবাসনে কয়েকটি ঘর দখল করে একাই বসবাস করেন।
শচীন বিশ্বাস একদিন রাতে তার কাজ শেষ করে বন্ধু মহেন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা চলতে থাকে।
শচীন বলে :- আমি তো একটি ঘরে থাকি আরো তিনটি ঘর খালি পড়ে আছে। বন্ধু তোমার মেজো ছেলে যদি আমার বাড়ি গিয়ে পড়াশুনা করে আর রাতে থাকলে কিন্তু আমার বিশেষ সুবিধা হয়।
দুইজনে কথাবার্তার মাধ্যমে থাকতে পারবো। তপেশ সকালে আবার এই বাড়িতে চলে আসবে। বেশি দূরে তো নয় মাত্র দশ মিনিটের রাস্তা।
মহেন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী ঊষা রানী বলেন :- না, আমার ছেলে এই বাড়িতে থাকবে। এমন তো নয় যে মাথা গোজার কোন জায়গা নেই।
বন্ধু শচীন বিশ্বাসের বিশেষভাবে অনুরোধ করার কারণে মানবতা দেখিয়ে তার স্ত্রীর কথা অমান্য করে মহেন্দ্র চক্রবর্তী হাঁ বলে দেয়।
১৭ বছরের নব যৌবনের উত্তাল ঢেউ নিয়ে নবম শ্রেণীতে পাঠরত তপেশ স্বাধীনভাবে বাবার বন্ধু শচীন বিশ্বাসের বাড়িতে বসবাস শুরু করে।
সপ্তাহ দুয়েক পর থেকে বন্ধুদের আড্ডা দিন দিন বাড়তে শুরু করে কিন্তু শচীন বিশ্বাস না দেখার ভান করে এড়িয়ে চলতে থাকে। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে মদ পান করতে থাকে।
মাস পাঁচেক বসবাস করার পর একদিন সকালে শচীন বিশ্বাস কাজে যাওয়ার আগে তপেশ এর ঘরে ঢুকে বলেন :- বাবা তপেশ; তোমাকে আমি ভীষন ভাবে সন্তানের মতো স্নেহ করি।
আমি কাজে যাচ্ছি কিন্তু আসতে কয়েক দিন দেরি হতে পারে। কারণ গুদামের কিছু মালপত্র আনার জন্য শহরে যেতে হবে। আমি না আসা পর্যন্ত তুমি কিন্তু বাড়িতে থেকো।
তপেশ বলে :- ঠিক আছে কাকাবাবু, কোন চিন্তা করবেন না। দিনে ও রাতে সবসময় থাকবো।
শচীন বিশ্বাস তার পকেট থেকে একশত টাকা বের করে তপেশ এর হাতে দিয়ে বলেন :- রেখে দাও ইচ্ছা মত খরচ করে। আর যদি কোন জিনিসের দরকার হয় তবে কিন্তু মুদিখানার দোকান থেকে নিয়ে আসবে।
তৎকালীন সময়ে শচীন বিশ্বাস এর মাসিক বেতন ৪৪০ টাকা থাকলেও কিন্তু মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা আয় রোজগার করতেন। বিভিন্নভাবে কায়দা করে গুদমের মাল বাজারে চলে যায়। আবার জিনিসপত্র কেনার সময় দুধে জল মেশানোর কায়দায় কিন্তু ইচ্ছা মত জল মিশিয়ে দিত। তার জন্য উপর মহলের অফিসার কে টাকার বিনিময়ে সাথে রাখতে হয়।
শচীন বিশ্বাস প্রায় এক মাস ঘরে না আসার কারণে তার অফিসে গিয়ে তপেশ খোঁজ করে জানতে পারে, ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে।
সপ্তাহ দুয়েক পর রাত দুইটার দিকে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনে তপেশ হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বলে :- এই গভীর রাতে কে?
শচীন বিশ্বাস বলেন :- আমি বাবা ; মেয়ে কে নিয়ে আসার জন্য দেশের বাড়িতে গিয়ে ছিলাম। দরজা খুলে রুমের চাবি দাও।
তপেশ আলো জ্বালিয়ে দরজা খুলতেই কিন্তু একজন যুবতী ঘরে ঢুকে পড়ে। তার কাঁধের ব্যাগ টেবিলের উপর রেখে বিছানার উপর বসে পড়ে। তপেশ দরজার সামনে থেকে টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে যুবতী কে দেখতে থাকে।
তপেশ এর চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসি দিয়ে লম্বা হাই তুলে রীতা বলে :- তাহলে তুমি বাবার বন্ধুর ছেলে তপেশ বাবু। আমি রীতা বিশ্বাস আর সাথে বোন সুপ্রিয়া।
শচীন বিশ্বাস ঘরে ঢুকে তপেশ এর হাত ধরে বলে :- দুঃখিত; না বলে দেশে চলে যাওয়ার জন্য কিন্তু খাওয়া দাওয়ার কষ্টের কারণে দেশের বাড়ি থেকে দুই মেয়ে কে নিয়ে আসলাম। যাই জিনিসপত্র গুলো ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। বলে ঘরের চাবি নিয়ে বাইরে চলে যায়।
শচীন বিশ্বাসের সাত বছরের ছোট সুপ্রিয়া তার দিদির কাছে গিয়ে বলে :- দিদি; খিদে লেগেছে।
রিতা তার দেহ দুলিয়ে কুচ যুগলে নাচিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর তপেশ এর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে মাথার চুল গুলো বাঁধতে থাকে।
রিতার দেহের ওড়না বিহীন বুকের কেদারনাথ পাহাড়ের গম্বুজের মত খাড়া কুচ যুগলের দিকে তাকিয়ে তপেশ ভাবে :- পাগল করা তার রূপ যৌবনের অঙ্গভঙ্গিতে মন চঞ্চল হয়ে উঠছে।
রিতা তার বুকের উপর ওড়না ঠিক করতে করতে তপেশ এর উদ্দেশ্য করে বলে :- রান্নাঘর কোন দিকে দেখিয়ে দাও, কিছু রান্নার আয়োজন করতে হবে।
তপেশ বলে :- চলুন কিন্তু রান্না করার মতো কোন চাল ডাল তেল তরকারি কিছুই নেই। বলে রিতার রূপ মাধুর্য মনের মাঝে কল্পনার মাধ্যমে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে।
রিতা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হেলে দুলে হাত নাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে :- মশাই; বাথরুম ও জলের কল কোন দিকে।
তপেশ এগিয়ে গিয়ে আঙ্গুল উঁচু করে বাম দিক দেখিয়ে বলে :- এই পাশে চলে যান।
তপেশ এর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রিতা বলে :- এখানে অপেক্ষা করে, নতুন জায়গা তারপর অন্ধকার রাত। আচ্ছা ভূত পেত্নী নেই তো।
তপেশ মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলে :- এখানে, কোন একজন পেত্নী কে ধরার জন্য কিন্তু অনেক দিন ধরে একটা পুরুষ ভূত বসবাস করে চলেছে।
রিতা হাসতে হাসতে তপেশ এর হাতে মৃদু মৃদু চাপ দিয়ে বলে :- চেষ্টা করে দেখতে দোষ কোথায় কিন্তু পেত্নী কে ধরতে পারে কিনা।
রিতা রান্নাঘরে ঢুকে চারিদিকে তাকিয়ে তপেশ এর উদ্দেশ্য করে বলে :- সংসারে মেয়ে মানুষ না থাকলে কিন্তু এই দুর্দশা হয়। রান্নাঘরের মধ্যে কি অবস্থা করে রেখেছে! আর বাথরুম তো ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলেছে।
ভূতের বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। বাড়ির উঠানে অনেক দিন ঝাড়ু পড়ে না। আর উঠানের আশপাশ জঙ্গল হয়ে গেছে।
ভাগ্যিস গ্রামের বাড়ি থেকে জমির চাল ডাল সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। না হলে রাতে না খেয়ে থাকতে হতো। বলে মসুরের ডাল, চাল,লবণ, হলুদ, জিরে ও পাঁচ লিটার সরিষার তেল সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বড় ব্যাগ থেকে বের করতে থাকে। তারপর পর আর একটি ব্যাগ থেকে কাঁচা সবজি বের করে বটি দিয়ে কাটতে শুরু করে।
তপেশ বলে :- কাকাবাবু; হোটেলে খায় আর আমি বাড়ি থেকে খাওয়া দাওয়া করে এখানে আসি। দেশের বাড়ি থেকে সংসার তুলে নিয়ে এসেছে।
রিতা হাসতে হাসতে বলে :- মেয়েদের সংসার নিয়ে কারবার, তাই যেখানে যাবে সংসার সাথে যাবে। আরো মশাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার মুখ দেখলে হবে। রান্না করার জন্য জল নিয়ে আসো।
তৃষ্ণার জল কিন্তু তোমাকে পান করাতে হবে।
তপেশ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে গভীর রাতে বিরক্ত বোধ করে বালতিতে করে কুয়ো থেকে জল নিয়ে আসে।
কাঠের উনুনে রাতে পেঁয়াজ মিশ্রিত মসুরের ডাল আর ডিমের তরকারি ভাত রান্না করে। তারপর আর দেরি না করে চার জনে এক সাথে বসে গরম গরম ভাত খাওয়া দাওয়া করতে থাকে।
রিতা খেতে খেতে বাঁ হাত দিয়ে তপেশের পাতে কয়েক এক চামচ ভাত ও ডিম আলুর ঝোল দেয়।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে তপেশের থাকার ঘরের পাশের রুমে রিতা তার বোন কে নিয়ে শোয়ার জন্য ঢুকে পড়ে। আর রিতার বাবা পান চিবাতে চিবাতে তার রুমে চলে যায়।
আর সেই মুহূর্তে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে পাড়ার মোরগ গুলো ভোরের বার্তা জানিয়ে আওয়াজ করে উঠে।
পরের দিন থেকে শচীন বিশ্বাসের বাড়িতে তপেশ আসা যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পাঁচ দিন পর শচীন বিশ্বাস একদিন সকাল বেলা তার বন্ধু মহেন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়িতে দেখা করে।
দুই বন্ধুর মধ্যে কুশল বিনিময়ের পর শচীন চায়ে চুমুক দিয়ে বলে :- মেয়ে দুটো দেশের বাড়ির আপন মানুষ জন ছেড়ে অজানা অচেনা মানুষের মধ্যে এসে কিন্তু অস্বস্তি বোধ করছে। তাদের সাথে একজন কথাবার্তা বলার কেউ নেই। আমি আর কতটুকু সময় দিতে পারি।
মেয়ে বাড়িতে আসার পর থেকে তপেশ তো আসা যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমার এখন রাতে কাজে যোগদান করতে হচ্ছে। সারারাত মেয়ে দুটো ভয়ে ভয়ে থাকে।
তপেশ রাতে থাকলে অবশ্যই সাহস পাবে। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা না হয় আমাদের এখানে হয়ে যাবে। বন্ধু দয়া করে ছেলে পাঠালে বিশেষভাবে উপকৃত হবে।
বন্ধু; তুমি ছাড়া এই বন জঙ্গল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কিন্তু আমার আর কে আপন আত্মীয় আছে ।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী ভাবে :- বাড়িতে থাকার যখন ঘরের সমস্যা হচ্ছে তখন কিছুদিনের জন্য থাক না।
তপেশ কে ডেকে তার বাবা বলে :- তোর কাকার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা কর। স্বাধীনতা পেয়ে কিন্তু লেখাপড়া অমনোযোগী না হয়ে পড়িস।
শচীন বিশ্বাস বলে :- তপেশ যদি মনে করে লেখাপড়া বিষয়ে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে রিতার কাছে থেকে জেনে নিতে পারবে। মেয়ে তো উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে তারপর এখানে এসেছে।
তপেশ মনের আনন্দে নাচতে নাচতে শচীন কাকার বাড়িতে বই খাতা নিয়ে বিকালে চলে আসে। তার থাকার ঘরে ঢুকে সাজানো গোছানো বিছানা টেবিল ও আলনা দেখে আনন্দিত মনে স্বপ্নের দেশে চলে গিয়ে অনেক কিছু ভাবতে থাকে।
------------------------------------------------
।। চতুর্থ অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
রিতা সাজগোজ শেষ করার পর তার
শরীরে দামি পারফিউম ব্যবহার করে। তারপর আরাম কেদারায় আরামে বসে পা নাচাতে নাচাতে ভাবে :- তপেশ এর সাথে সেই প্রথম দিন যৌন মিলনের রঙিন ছবির এলবাম ও প্রেমের বই কাড়াকাড়ি করতে করতে জীবনের প্রথম দেহের সংস্পর্শে লাভ হয়।
সেদিন আমার বুকের উপর পড়ে গিয়ে আলিঙ্গন করেছে। আমার বুকে হাত রাখতেই সেই প্রথম কোন পুরুষের স্পর্শ আমাকে শিহরিত করে তুলেছিল। আমি কাম কামনা ভীষণ ভাবে উত্তেজিত হয়ে স্বপ্নের রাজ্যে ভেসে চলেছিলাম।
তারপর বাথরুমের মধ্যে দেহের সাথে দেহের প্রথম দৈহিক মিলনের মাধ্যমে তপেশ কিন্তু আমাকে চরম আনন্দ দান করে। এই স্মৃতি কখনোই ভোলার নয়।
তপেশ ফুলশয্যার বিছানার মনে করে আমাকে জড়িয়ে ধরে বাথরুমের মেঝেতেই শুয়ে বিভিন্ন কায়দায় আদর করতে থাকে। আর আমিও তাকে সাহায্য করতে করতে চরম আনন্দ লাভ করি।
নারী পুরুষের মিলনের সুখের স্বপ্ন বহুদিন ধরে দেখেছি কিন্তু বাস্তবে কোনদিন সুখ অনুভব করতে পারেনি। পুরুষ ব্যতীত সেই চরম আনন্দ অনুভব করা কখনোই সম্ভব নয়। বর্তমান আধুনিক সভ্য সমাজের মানুষের তৈরি কৃত্রিম ভাবে যৌন মিলনের আনন্দ কিন্তু তার মধ্যে কোন সার্থকতা কিছু নেই।
তাই ভাবি মনে আমার জীবনে কেন অনেক আগেই কোন পুরুষ আসেনি। সেই স্মৃতিময় ঘটনাগুলো কিন্তু মিলনের অনুভূতি, অনুভব ও আনন্দ মুখে প্রকাশ করা কখনোই সম্ভব না।
তপেশ আবাসনের সামনে উপস্থিত হয়ে গাড়ির হর্ন বাজাতে বাজাতে বলে :- রিতা; চলে এসো।
তপেশ তার মোটরসাইকেলে রিতা কে চড়িয়ে নিয়ে গ্রাম, গঞ্জ ও শহর পেরিয়ে চলতে থাকে। দুপুরে দুজনে হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে আবার নির্জন পাহাড়ের পথ ধরে পঞ্চাশ কিলো মিটার দূরে পাহাড়ের ঢালে ঢালে চা বাগানে বিকেল বেলা উপস্থিত হয়।
এসব অঞ্চলে বিকেলের দিকে বেশি ভাগ সময় মহিলা শ্রমিক থাকে না। কয়েক জন পুরুষ ও নিরাপত্তা রক্ষী আনাগোনা দেখা যায়।
এক জায়গায় কয়েকটি ঘর দেখে মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে দেয়।
তপেশ একজন বয়স্ক মহিলাকে দেখে বলে :- আমরা দুজন বহুদূর লামডিং শহর থেকে চা বাগান দেখতে এসেছি।
উক্ত বয়স্ক মহিলা তার সাথে করে দুজন কে তার বাড়ির উঠানে নিয়ে এসে বসার জন্য অনুরোধ করে। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে কিছু সময় পর হালকা গরম চায়ের জগ ও গ্লাস নিয়ে দুজনের সামনে আসে।
বয়স্ক মহিলা গ্লাসে চা ঢেলে হাত দিয়ে বলেন :- একদম সতেজ কাঁচা পাতা সিদ্ধ করে চা বানানো হয়েছে। পান করার পর পথের শ্রম কষ্ট ও ক্লান্তি বোধ দূর করে মন মানসিকতা সতেজ করে তুলবে।
চায়ের সাথে দুধ মেশালে কিন্তু চায়ের কার্যকারী ক্ষমতা বেশি ভাগ হারিয়ে ফেলে। আমরা সব সময় গুড় দিয়ে লিকার চা পান করে থাকি কিন্তু চিনি একদম ব্যবহার করি না।
চা পান করা শেষ হলে উক্ত বয়স্ক মহিলার সাথে করে দুজন চা বাগানের মধ্যে ঘুরতে থাকে।
রিতা বলে :- আচ্ছা দিদিমা ; চা বাগানের মধ্যে চায়ের পাতা তোলার জন্য শুধু নারীদের ব্যবহার করা হয় কেন?
বয়স্ক মহিলা আরতি বলেন :-
প্রধান কারণ হলো, পুরুষের চা বাগানের
মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলে কিন্তু পুরুষের শারীরিক যৌন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
কাঁচা পাতা বা চা বাগানের গাছের মধ্যে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা পুরুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। তার ফলে পুরুষের কাম উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
এই কারণে নারীরা তাদের স্বামী কে চায়ের পাতা তোলার কাজ করতে দেয় না। পুরুষেরা চায়ের পাতা তোলা বাদ দিয়ে আর অন্য সব কাজগুলো করে থাকে।
দ্বিতীয় কারণ হলো, পুরুষের তুলনায় কিন্তু
কম মূল্যের নারী শ্রমিক পাওয়া যায়। আর নারীরা সব সময় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে থাকে।
তৃতীয় কারণ হলো, প্রথম চা বাগান সৃষ্টির
সময়ে চা বাগানে কাজ করার জন্য বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যাদের কে নিম্ন বর্ণের মানুষ বলা হয়।
সেই আদিবাসী সম্প্রদায়, যাযাবর সম্প্রদায়, বেদে সম্প্রদায় সহ এরকম বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের কে তুলে নিয়ে আসা হয়।
সেই সব সম্প্রদায়ের মধ্যে বংশ পরম্পরায় কিন্তু মাতৃতান্ত্রিক প্রথা চালু ছিল অর্থাৎ মেয়েরাই আয় রোজগার করে সংসার পরিচালনা করবে।
পুরুষরা বাড়িতে ছেলে মেয়ের দেখাশোনা করবে। আর সারাদিন ভাত পচানো মাদক খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকতো।
বর্তমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও কিন্তু মেয়েদের চা বাগানে আধিপত্য থেকে গিয়েছে। মেয়েরাই সংসার পরিচালনার দায়িত্ব কাধে নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।
তপেশ বলে :- ক্লাসের পাঠ্যপুস্তক থেকে জানা যায়। চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সহ বিভিন্ন উপাদান শরীর সতেজ ও মন ভাল রাখে।
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। চায়ের মধ্যে নানা ধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে । শুধু সবুজ চায় নয় বরং লাল চায়ের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। আর অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট শরীর ও ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।
সকালে খালি পেটে একদম হালকা গরম এক কাপ লিকার চা পান করা স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উপকারী। পাকস্থলীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধান হয়।
রিতা তার প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে বলে :- পাহাড়ি পথ ধরে বাড়ি যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে কিন্তু তাড়াতাড়ি চলো।
তপেশ মোটরসাইকেলে চড়ে বলে :- গাড়ি কিন্ত ঝড়ের গতিতে চলবে, আমাকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকবে।
রিতা তার উড়না দিয়ে দুজন কে পেঁচিয়ে নিয়ে তারপর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলে :- ঠিক আছে। বাড়িতে চলে তারপর সারারাত ধরে তোমার গতিবেগ কমানোর ব্যবস্থা করব। চলো দেখি রুমে কত ঝড় উঠাতে পারো।
------------------------------------------------
।। পঞ্চম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
তপেশ এর বাবা রেলের টিকিট পরীক্ষক হয়ে কিন্তু প্রতিদিন বাড়তি কাঁচা টাকা বাড়িতে আসতে থাকে। তার মেজ ছেলে তপেশ আর তার প্রেমিকা রিতা কে নিয়ে দুই হাত দিয়ে টাকা উড়তে থাকে। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে মদ পান করা নিত্যদিনের সাথী হয়ে উঠেছে।
রিতার সাথে তপেশের প্রায় এক বছর ধরে রাতে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক চলতে থাকে। রিতার বাবা শচীন বিশ্বাস দেখেও কিন্তু না দেখার ভান করে থাকে।
জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন না করার কারণে রিতা কয়েক মাসের গর্ভবতী হয়ে পড়ে।
এক রাতে দৈহিক মিলনের চরম অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সময় রিতা বলে :- আমাকে কবে বিয়ে করে সামাজিক ভাবে বউ করবে।
তপেশ আনন্দ জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে বলে :- তাড়াহুড়ো কি আছে! বিয়ে তো তোমাকে করবো কিন্তু চিন্তার কোন কারণ নেই। আরো কয়েক বছর ধরে আনন্দ উল্লাস করে যাও।
সামাজিক নিয়ম অনুসারে বিয়ে মানেই কিন্তু উভয়ের পরাধীনতা স্বীকার করা আর সংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া।
সংসারের নিয়ম কানুনের গন্ডি পেরিয়ে কিন্তু অন্য কিছু করা যাবে না। বিয়ে না করে কিন্তু এই ভাবে আমরা দুজনেই ভাল আছি।
তপেশ কে আরো জোরে চেপে ধরে রিতা বলে ;- আমি তো বিয়ে না করে কিন্তু ভালো থাকতে পারছিনা আর সমাজের মানুষেরা ভালো থাকতে দেবে না।
তপেশ বলে :- কেন! ঠিক বুঝতে পারলাম না।
রিতা শান্ত হয়ে বলে :- আমি তো কুমারী থাকা অবস্থায় মা হতে চলেছি।
তপেশ বলে :- তার মানে বড়ি গুলো ঠিক মতো খাওয়া হয়নি।
রিতা বলে :- তুমি; আমাকে বিয়ে করে সামাজিক ভাবে ভালবাসার মর্যাদা দাও।
রিতা কে ছেড়ে দিয়ে গড়িয়ে পাশে শুয়ে তপেশ বলে :- এই মুহূর্তে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
রিতা কাত হয়ে মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে :- কেন! সম্ভব নয়। তাহলে কি আমি অবৈধ সন্তানের জন্ম দেবে?
তপেশ বলে :- তা কেন! তোমার গর্ভের সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই কিন্তু যমালয়ে পাঠিয়ে দাও।
রিতা বলে :- আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্ন কোনভাবেই আমি হারাতে চাই না।
তপেশ উত্তেজিত হয়ে বলে :- সবে মাত্র দশম শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছি কিন্তু পড়াশোনা শেষ করতে হবে তো। তারপর কাজ কর্ম শুরু করতে হবে। তারপর তো বিয়ের পিঁড়িতে বসার ভাবনা।
তুমি কিন্তু গর্ভবতী হয়ে চরম ভুল করেছে। কারণ আমি এখনও বাবা মায়ের বেকার ছেলে।
বেকার অবস্থায় বউকে খাওয়ানো আবার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ তারপর লালন-পালন করা। আমার পক্ষে কিন্তু কখনোই সম্ভব হয়ে উঠবে না।
রিতা উত্তেজিত হয়ে বলে :- বিয়ে কিন্তু তোমাকে করতেই হবে। পুরুষ মানুষের আয় রোজগার করে আনতেই হবে। মেলামেশা করার সময় চিন্তা করো নি কেন?
তপেশ বলে :- তাহলে তুমি ইচ্ছা করে গর্ভবতী হয়ে কিন্তু আমার সাথে প্রতারনার আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছ। আমার এখনো বিয়ে করার বয়স হয়নি। তারপর আমার থেকে তুমি কয়েক বছরের বড় কিন্তু সামাজিকভাবে কেউই মেনে নেবে না।
রিতা উত্তেজিত হয়ে বলে :- মনে হচ্ছে তুমি এখনো কচি খোকা আছো। তোমার পুরুষত্বর মাধ্যমে আমাকে জয় করে বাবা হতে চলেছ। বউ বয়স্ক হলে কিন্তু স্বামীর বিভিন্ন সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
তপেশ বলে:- হঠাৎ এমন অঘটন ঘটিয়ে আমায় সমস্যায় ফেলে দিলে। কেন, দুই চার বছর অপেক্ষা করা গেল না। মনে হচ্ছে তুমি দিদিমা বুড়ি হয়ে গেছো।
রিতা বলে :- তোমাকে প্রতারণা করার কোন ইচ্ছা কিন্তু আমার মনে নেই। তবে আমার সন্তান ও স্বামীর ন্যায্য অধিকার থেকে কখনোই এক পা পিছিয়ে আসবো না। তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তপেশ বলে :- বিয়ে মনে হচ্ছে শিশু কালের পুতুল খেলা। ভাল না লাগলে আর সাথে থাকবে না।
রিতা ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেয় তারপর দুজনে বিছানার উপর উঠে সামনাসামনি বসে।
তপেশ ভাবে :- আনন্দ ফুর্তি করতে গিয়ে কি বিপদে পড়লাম! পরিত্রাণ পাওয়ার কোন পথ কি আর খোলা নেই?
রিতা বলে :- আমি কোন কিছু বুঝতে চায় না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে বিয়ে করার ব্যবস্থা করে। তা না হলে কিন্তু আত্মহত্যা করে জীবন বিসর্জন দিয়ে দেবে।
তপেশ বলে :- ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। তুমি মরে গেলে আমার কোন ক্ষতি হবে না। কিছুদিন দুঃখ কষ্ট হবে তারপর ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আর দেশের আইন আদালত এই বন অঞ্চলের মানুষের কাছে ভয় পায়।
তপেশ কে রিতা জড়িয়ে ধরে বলে :- এমন চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দিলে ঘুম আসছে না।
তপেশ বলে :- তা আমি কি করবো! শুয়ে পড়ে।
তপেশ এর বুকের সাথে বুক লাগিয়ে শুয়ে রিতা বলে :- চিন্তা ভাবনা করে কিন্তু লাভ নেই। প্রকৃতির নিয়মের বাইরে কিন্তু আমরা কেউ যেতে পারবে না।
গর্ভপাত করা কিন্তু সব ধর্মের মানুষের কাছে নিন্দনীয় ও মহা অপরাধের কাজ। আর রাষ্ট্রের আইন অনুসারে নিষিদ্ধ কিন্তু প্রমাণ করতে পারলে আইনের আওতায় দন্ড ব্যবস্থা আছে।
তপেশ বলে :- তবে কি করবো! তাহলে দুজনে একসাথে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি।
রিতা বলে :- আগে বিয়ের সমস্যা মিটাও তারপর টাকা পয়সার ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।
তপেশ বলে :- বিয়ে করলে কিন্তু আমার বাবা মা কোন দিন আমাদের কে বাড়িতে উঠতে দেবে না।
আর মেনে নেওয়া তো অনেক দূরের পথ।
রিতা হাসতে হাসতে বলে :- আমি জানি, তোমার বাবা-মা ছোট জাতের মেয়েকে কোনদিন তার ছেলের বউ হিসেবে মেনে নেবে না।
ব্রাহ্মণের সন্তান হয়ে ছোট জাতের মেয়েকে দৈহিক মিলনের মাধ্যমে ভোগ করতে দোষ নেই কিন্তু বিয়ে করতে যত আপত্তি।
তপেশ বলে :- তাহলে শ্বশুর বাবা আমাদের জন্য কি করবেন?
রিতা বলে :- আমার বাবা বড় জাতের ব্রাহ্মণ জামাই পেয়ে কিন্তু নিশ্চয়ই পূর্ণ লাভের আশায় তার জামাইয়ের সেবা যত্ন করবেন।
তপেশ বলে :- তাহলে চাল কলার অভাব হবে না।
তাহলে তোমার দেহ পল্লবের পূজা করলে কিন্তু দক্ষিণা সহ চাল কলা আলু মিলে যাবে।
ওম নমো রিতার দেহ পল্লব নমঃ। তুলসী বেলপাতা তরুণীর চরণে দিলাম শরীরে কামের উত্তেজনা কম থাকে।
তপেশ কে জড়িয়ে ধরে রিতা বলে :- কম তাকাচ্ছি। আমার বুদ্ধি মত চললে তোমার সব সমস্যা সমাধান করে দেবো কিন্তু আমার দৈহিক চাহিদা তোমাকে সবসময় পূরণ করে খুশি রাখতে হবে।
তপেশ বলে :- দিন রাত তো ইচ্ছা পূরণ করে চলেছে। বয়স্ক লোকেরা বলে, নতুন নর-নারীর মিলন চক্র হলে "রাতে ১২ বার আর দিনে ১৩ বার তারপর যত বার পারো।"
রিতা বলে :- প্রতিবার মিলন চক্রের মাধ্যমে তোমাকে স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছি, এভাবে সারা জীবন তোমার সাথে থেকে স্বর্গের সুখ লাভ করতে চাই।
তপেশ হাসতে হাসতে বলে :- স্বর্গ সুখের পরে কিন্তু নরকের দুঃখ আছে। নরক যন্তনা ভোগ করার জন্য সবসময় তৈরি হয়ে থাকতে হবে।
রিতা বলে :- যখন যা হবে তা পরে ভেবে দেখা যাবে। এখন চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো।
------------------------------------------------
।। ষষ্ঠ অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
দেখতে দেখতে আরো এক মাস কেটে যায়। রিতা তার প্রেমিক তপেশ কে প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। তপেশ বন্ধুদের সাথে গোপনে গোপনে কয়েকটা কুকুর ধরে বিক্রি করে কিছু টাকা যোগাড় করে।
১৯৭৬ সালের ১৪ এপ্রিল ( পহেলা বৈশাখ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ ) বুধবার সকাল বেলা শহরে যাওয়ার নাম করে কিন্তু দুজনে পালিয়ে জেলার সদর শহর নওগাঁ আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে থাকা একজন বয়স্ক উকিলের কাছে গিয়ে উভয়ের জন্ম সার্টিফিকেট দেখিয়ে তপেশ বলে :- আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সাক্ষী প্রমাণের জন্য কিন্তু আমাদের সাথে আর কোন লোকজন নেই। বিয়ে হওয়া কিন্তু বিশেষভাবে জরুরি।
বয়স্ক উকিল রিতার দিকে তাকিয়ে বলেন :- নাতি বৌ তাহলে গর্ভবতী নিশ্চয়।
তপেশ বলে :- ঠিক ধরেছেন।
বয়স্ক উকিল বলেন :- সব ব্যবস্থা করে দেবে কিন্তু একশো টাকা লাগবে।
তপেশ ত্রিশ টাকা উকিল বাবুর হাতে ধরি দিয়ে অনুনয় বিনয় বলে :- আর টাকা পয়সা নেই কিন্তু যা ভাল মনে করেন তা করুন। আমাদের বিয়ে হওয়া দরকার।
রিতা বয়স্ক উকিলের প্রণাম করে বলে :- আমি তিন মাসের গর্ভবতী কিন্তু বিয়ে না হলে আত্মহত্যা করতে হবে।
তপেশ বলে :- অভিভাবকেরা কিন্তু আমাদের বিয়ে মেনে নেবে না। সেই কারণেই বিয়ে রেজিস্ট্রি করা বিশেষ প্রয়োজন।
বয়স্ক উকিল বলেন :- ভারতের বিবাহ আইন অনুসারে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবে কিন্তু সত্তর টাকা পরে দিয়ে যাবে।
তপেশ বলে :- ঠিক আছে। কথা দিলাম টাকা পেয়ে যাবেন।
আদালতে বিচারকের সামনে দুজন দাঁড়িয়ে বিয়ের সম্মতি জানিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করে। দুজনে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিবাহ সনদ পত্র (বিবাহ সার্টিফিকেট ) লাভ করে।
দুজনে আদালত থেকে বেরিয়ে শহরের এক বহু প্রাচীনকালের কালি মন্দিরে উপস্থিত হয়। ব্রাক্ষণ পুরোহিতের মাধ্যমে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করার মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি অনুসারে রিতা শাঁখা পলা লোহা পড়ে তপেশ এর সাথে বিয়ে হয়। তপেশ মালাবদল সহ রিতার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়।
নব দম্পতি রাতের অন্ধকারে রিতার বাবা শচীন বিশ্বাস এর কর্মস্থল অফিস উপস্থিত হয়।
রিতার বাবা প্রথমে দু'জন কে দেখে বকাবকি করতে থাকে।
রিতা কান্নাকাটি করে চোখের জল ঝরাতে ঝরাতে বলে :- যৌবনের আবেগে তপেশ এর সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে আমি তিন মাসের গর্ভবতী হয়ে পড়েছি।
তপেশ তো আমাকে বিয়ে করে তার সন্তানের স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের প্রতি দয়া করে কোথাও থাকার ব্যবস্থা করুন।
বাবা তোমাকে না জানিয়ে আমি অন্যায় করেছি কিন্তু আমাকে ক্ষমা করে দিও।
শচীন বিশ্বাস বলে :- বিয়ে যখন করেছে, তাহলে তপেশ এর বাবার বাড়িতে চলে যা।
তপেশ বলে :- আমার বাবা ব্রাহ্মণ্যবাদ ধর্মের গোড়া অন্ধ বিশ্বাসী কিন্তু আমাদের দেখলে দুজন কে কেটে ফেলবে।
আপনার জাত পাতের উর্ধে মন-মানসিকতা আছে। আপনি একমাত্র আমাদের জীবনের চলার পথের ভরসা।
শচীন বিশ্বাস তার মেয়ে কে আড়ালে ডেকে নিয়ে কিছু সময় ধরে কথাবার্তা বলে যুক্তি পরামর্শ করে দুজনেই তপেশ এর কাছে ফিরে আসে।
শচীন বিশ্বাস দুঃখ প্রকাশ তপেশের উদ্দেশ্য করে বলে :- উঠতি বয়সের ছেলেকে বাড়িতে রেখেই ভুল করেছি।
ছি ছি দিদি বলে ডেকে তার সাথে এমন ব্যবহার, তোমার বাবার সাথে আমার আন্তরিকতা নষ্ট হয়ে গেল। বন্ধু মহেন্দ্রের কাছে আমি কি জবাব দেবো?
আমার কত আশা ছিল মেজ মেয়েকে ধুমধাম করে দিয়ে দেবে কিন্তু তুমি তা হতে দিলে না।
যা হবার হয়ে গিয়েছে কিন্তু আমাকে তো এখন সব দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তা বাবা তপেশ তুমি রিতা কে বিয়ে করেছে কিন্তু তার আদালতে প্রমাণ পত্র দেখাও।
তপেশ তাদের বিয়ের সার্টিফিকেট হাতে দিয়ে বলে :- বাবা; আমাদের থাকার জায়গা ব্যবস্থা করুন।আমার বাবা তো কোন দিন মেনে নেবেন না।
রিতার কথা অনুসারে আপনি আমাদের একমাত্র ভরসা। আমার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইছি।
শচীন বিশ্বাস বিয়ের প্রমাণ পত্র হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলে :- এই প্রমাণপত্র আমার কাছে রেখে দিলাম আর থাকার ব্যবস্থা করছি।
শচীন বিশ্বাস তার রাতের কাজের দায়িত্ব অন্য কে দিয়ে সেই রাতে গাড়ি ভাড়া করে তার মেয়ে জামাইকে নিয়ে রওনা দেয়।
আসাম রাজ্যের লামডিং শহর থেকে প্রায় ৬২ কিলোমিটার দূরে পাশের নাগাল্যান্ড রাজ্যের কোহিমা জেলার অন্তর্গত ডিমাপুর শহরে এক পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে আসে।
শচীন বিশ্বাস বাড়ির মালিক কে মেয়ের সম্পর্ক বিস্তারিত জানিয়ে, একটি ঘর ভাড়া দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে।
উক্ত ব্যক্তির সাথে শচীন বিশ্বাসের মাসিক চারশত টাকা ঘর ভাড়া চুক্তি হয়।
মেয়ে জামাইকে কাছে ডেকে নিয়ে হাজার খানেক টাকা রিতার হাতে দিয়ে তপেশ এর উদ্দেশ্য করে শচীন বিশ্বাস বলেন :- প্রতি মাসে আমার কাছে চলে আসবে, সংসার খরচের টাকা দিয়ে দেবে।
তারপর তপেশ এর শ্বশুর শচীন বিশ্বাস লামডিং নিউ কলোনী তার সরকারি আবাসনে ছোট মেয়ের কাছে ফিরে আসে।
রাতের অন্ধকার দূর করে ভোরের আলোয় আলোকিত হওয়ার কিছু সময় পর শচীন বিশ্বাস তার বন্ধু মহেন্দ্র চক্রবর্তীর সরকারি আবাসনে উপস্থিত হয়।
শচীন রুমের ভিতরে ঢুকে উত্তেজিত হয়ে তার বন্ধু কে বলেন :- তোর ছেলে কিন্তু আমার মেজ মেয়ে রিতা কে নিয়ে পালিয়েছে। প্রমাণ হিসাবে চিঠি ও আদালতের বিয়ের সার্টিফিকেট সামনে রাখে।
তোর ছেলে রিতা কে বিয়ে করার জন্য চিঠির মাধ্যমে আমাকে হুমকি দিয়েছিল। তপেশ কে বিশ্বাস করে পুত্র স্নেহে বাড়িতে থাকতে দিলাম কিন্তু বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলো না। শেষে কিনা আমার মেয়েকে সর্বনাশ করলো।
ঘুম ঘুম চোখে বিরক্ত বোধ করে মহেন্দ্র চক্রবর্তী রাগে উত্তেজিত হয়ে বলেন :- রাতের টিকিট পরীক্ষকের কাজ শেষ করে দুই ঘন্টা আগে বাড়িতে এসেছি এর মধ্যে ঝামেলা শুরু করে দিলি।
তপেশের মা ছুটে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলেন :- হে ঈশ্বর একি সর্বনাশ করলে। ব্রাহ্মণের ঘরে কায়স্থের মেয়ের বউ কখনোই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই সব ভালোবাসার বিয়ে কখনোই সমাজের মঙ্গল করে না। কয়েক দিন ধরে চারিদিকে অমঙ্গলের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- তা আমি কি করবো! আমাকে বলে পালিয়েছে। তোর মেয়েকে আমার ছেলের পিছনে লেলিয়ে দেওয়ার সময় কি আমাকে জানিয়ে ছিলি! এখন জানিয়ে কোন লাভ নেই।
তোর বাড়ি থেকে আমার ছেলে নিরুদ্দেশ হয়েছে কিন্তু তোর বিরুদ্ধে আইনের ব্যবস্থা নেবে।
শচীন বলে :- যা পারিস করে দেখা। আমার মেয়েকে ফেরত না পেলে কিন্তু আমি দেখে নেবো।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- ছোট জাত কায়েতি চাল মারতে এসেছিস। তোর লজ্জা করে না। নেমকহারাম তোর জন্য কত কিছুই ত্যাগ করেছি। শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের জাত মারলি।
শচীন বলে :- ব্রাক্ষণ বলে কিন্তু জাত পাত তুলে গালিগালাজ করবে না। জানি জানি ব্রাক্ষণেরা কত ভালো মানুষ।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- যে ছেলে বাবা মায়ের ও ব্রাক্ষণ বংশের মর্যাদা রাখতে পারে না, সেই অপদার্থ ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম। আজ থেকে তপেশ আমার কাছে মৃত।
এক কথায় দুই কথায় সকাল বেলা তুমুল আকারে ঝগড়া বেধে যায়। পাড়া প্রতিবেশী মানুষ গুলো ছুটে আসে। প্রতিবেশীরা আলোচনার মাধ্যমে মিমাংসা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পড়ে।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- লোকে ঠিক বলে, মহেশ্য জাত অমাবস্যার অন্ধকার রাত। তপেশের জীবনে কিন্তু চরম অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। না হলে কেউ ছোট জাতের মেয়েকে বিয়ে করে।
প্রতিবেশী এক ভট্টাচার্য ব্রাক্ষণ ব্যঙ্গ করে বলেন :- ছোট জাতের স্বভাব হচ্ছে কাকের ক আর শকুনের শ আর শিয়ালের য় আবার তাল বাঁধানোর ত এর মিশ্রণে হয়েছে। শকুন যত উপরে উঠুক না কেন নজর থাকে কিন্তু ভাগারের মরার দিকে।
আর তপেশ উচ্চ ব্রাক্ষণ কুলের ছেলে হয়ে শেষে কি না ছোট জাতের মেয়ে পছন্দ হলো। আমার তো মনে হয় শিয়াল পন্ডিতের মত ধৃত শচীন কোন অভিসন্ধি করে জোর করে তপেশের তার মেয়ে কে বিয়ে দিয়ে দূরে কোথাও সরিয়ে দিয়েছে।
শচীন উত্তেজিত হয়ে বলে :- ভট্টাচার্য মশাই; কথা সংযত হয়ে বলবেন। ব্রাহ্মণ হয়ে বড় অহংকার হয়েছে।
ভট্টাচার্য ব্রাক্ষণ বলেন :- শচীন বাবু; আপনি যদি না জানেন তাহলে গতকাল বিয়ে হয়েছে আর সকালে আপনার হাতে বিয়ের প্রমাণ পত্র আসে কিভাবে! নিশ্চয়ই সব কিছু জেনে নাটক করতে এসেছেন।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- যা সর্বনাশ করার তা করেছিস তা আর কি ক্ষতি করবে। আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা।
শচীন বলে :- আমার মেয়ে কে নিয়ে যাবে। কোথায় আমার মেয়ে।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন :- তোকে চিনতে আমার আর বাকি নেই। তোর চরিত্রের ও অপকর্মের ইতিহাস সব জানি । বেশি ঘাটাঘাটি করিস না তাহলে নিজের বিপদ নিজে ডেকে নিয়ে আসবি।
শচীন লম্পঝম্প দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে :- ঠিক আছে আমি দেখছি এই এলাকায় কেমন করে বাস করিস।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী জোরে জোরে চিৎকার করতে করতে বলেন :- সারা জীবন তো মানুষের শুধু বাঁশ দিয়েই গেলি কিন্তু এবার নিজে অঝোড়া বাঁশ নেওয়ার জন্য তৈরি থাকিস।
------------------------------------------------
।। সপ্তম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
শ্বশুরের টাকায় নতুন সংসার পেতে তপেশ আর রীতা দুজন আনন্দ উল্লাস করে কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত করে।
তপেশ কাজের সন্ধান করতে করতে ডিমাপুর শহরের এক মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী বইয়ের দোকানে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা বেতনে কাজ পায় আর দুপুরে খাবার দেবে।
মাস তিনেক পর হঠাৎ করে একদিন বিকালে রিতার বাবা কিছু বাজার নিয়ে মেয়ে জামাইয়ের ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হয়।
রাতে খাওয়া দাওয়ার করার সময় শ্বশুর শচীন বলেন :- আর এক বছর পর চাকরি থেকে অবসর নেবে। ভেবেছি তারপর জামাইয়ের সাথে কোন অংশীদারি ব্যবসা শুরু করবো।
বর্তমান তিনটে সংসার আমাকে চালাতে হচ্ছে, তাই বলছিলাম তোমরা যদি সরকারি আবাসনে বসবাস করো তাহলে একটা খরচ বেঁচে যাবে।
নাবালিকা সুপ্রিয়া কে দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। রিতা থাকলে অবশ্যই আমি দুটো রান্না ভাত খেয়ে চিন্তা মুক্ত থাকতে পারবো। টাকা পয়সা যদি কিছু সঞ্চয় করতে পারি তা কিন্তু ভবিষ্যতে তোমাদের কাজে লাগবে।
রিতা বলে :- বাবা; তুমি ঠিক বলেছেন, আমরা কিন্তু তোমার সাথেই থাকবো।
তপেশ বলে :- বাবা ; আপনার মেয়ে কে নিয়ে যান আর আমি কয়েক মাস পর দেখা করছি।
কারণ বইয়ের ব্যবসায়ী মাড়োয়ারি মালিক আমাকে এই মুহূর্তে ছেড়ে দেবে না। প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সকল ছাত্র-ছাত্রীরা এই সময়ে নতুন বই কিনে থাকে। মালিকের বাৎসরিক এই কয় মাস ভালো বেচাকেনার বাজার চলছে।
পরের দিন তপেশ এর অনুপস্থিতিতে বাবা
ও মেয়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হয়।
ভবিষ্যতে তার স্বামীর থেকে বাবার উপর বেশি নির্ভর ও ভরসা করতে হবে। সেই বিষয়ে বিভিন্নভাবে যুক্তির মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়। তার বাবার কথা গুলো রিতার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
রিতা নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করার কারণে তার বাবা চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কয়েক দিন ধরে ক্রমাগত বাবার বলা
কথাগুলো শোনার পর কিন্তু রিতার মাথার মধ্যে মর্যাগত করে নেয়। রিতা তার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য ভালবাসার মানুষ তপেশ কে ডিমাপুর ভাড়া বাড়িতে রেখে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পরের দিন সকালে তার স্বামীকে বিদায়
জানিয়ে তার বাবার সাথে লামডিং শহরের সরকারি আবাসনে উপস্থিত হয়।
রিতা তার স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখতে থাকে কিন্তু চিঠির ভাষায় বোঝায় রিতা তার স্বামীর থেকে বাবার উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কথায় কথায় বলে বাবা না থাকলে কিন্তু এটা হতে না ওটা হতে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
তপেশ কাজের ব্যস্ততায় আসছি আসছি বলে আর রিতার কাছে যাওয়া হয় না। রিতার মনে ধীরে ধীরে ঘুণ পোকার মতো ঘুণ ধরতে শুরু করে।
রিতার কড়া ভাষার চিঠি পেয়ে তপেশ তার মেয়ের জন্মের ১৫ দিন আগে তার রিতার সাথে দেখা করে। রিতা রাগ ও অভিমান করে স্বামীর সাথে কয়েকদিন কথা বলে না।
প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে রিতার গর্ভ দশ মাস দশ দিন পূর্ণ হয় আর আবাসনের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বয়স্ক মহিলাদের প্রচেষ্টায় একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয়।
মেয়ে তনুশ্রীর জন্মের দশ দিন পর তপেশ
কর্মস্থল ডিমাপুর চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রিতা ও তার বাবা বাঁধা সৃষ্টি করে বিভিন্ন ভাবে তপেশ কে বুঝাতে শুরু করে। তপেশ শেষে চাপে পড়ে কিন্তু শ্বশুরের সরকারি আবাসনে বউ ও মেয়ের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
তপেশ একই এলাকায় বসবাস করেও কিন্তু তার বাবা-মা ও ভাই-বোনের সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে পারে না। তার কারণ তার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। তার বাবা ছেলের সাথে দেখা হলেও কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে যায়।
তপেশ কর্ম বিহীন হয়ে শ্বশুর বাড়িতে শশুরের টাকায় আনন্দে দিন কাটতে থাকে।
তপেশ এর মেয়ে তনুশ্রীর জন্মের এক মাস পর এক রাতে তার শ্বশুর মশাই গভীর ভাব নিয়ে দুঃখ করে বলেন :- আমার মেয়েকে আমি খেতে পড়তে দিচ্ছি কিন্তু তোমার মেয়ের দুধ খাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুর দায়িত্ব বাবা হিসেবে তোমাকেই নিতে হবে।
রিতা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে তার বাবার কথার সমর্থন করে বলে :- বাবা ; তো ঠিকই বলেছেন, তোমার মেয়ের দায়িত্ব আমার বাবা কেন নিতে যাবে। বিয়ের পর থেকে তার যত টুক কর্তব্য করার তিনি যথেষ্ট করেছেন।
রিতা রাতে স্বামী কে কাছে পেয়ে বলে :- তুমি কাজকর্ম শুরু করে আর কতদিন শশুরের ঘাড়ে বসে বসে খাবে। মা ও মেয়ের সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব তো তোমাকে বহন করতে হবে।
তপেশ বলে :- কাজ করতে ডিমাপুর করছিলাম কিন্তু যেতে দিলে না। বললে তোমার বাবা নাকি সব দায়িত্ব নেবে।
রিতা বলে :- দেখো ঝগড়া করে না। বোঝার চেষ্টা করে খাওয়া খরচ লাগছে না ঠিক কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাজ কর্ম করে টাকা সঞ্চয় করে রাখতে হবে। বাবা আর কতদিন চালাবেন।
তপেশ উপায় অন্ত না পেয়ে আবার
লামডিং শহরের একটি বইয়ের দোকানে প্রতি মাসে ২৬০ টাকা বেতনের কর্মচারী হিসেবে কাজে যোগদান করে।
------------------------------------------------
।। অষ্টম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------ তপেশ মাঝে মধ্যে লুকিয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করে। আর তপেশের মা তার ছোট মেয়ে ছবি (মণি) এর মারফত তার নাতনি তনুশ্রীর জন্য বাড়ির পোষা গরুর দুধ লুকিয়ে লুকিয়ে পাঠাতে থাকে।
তপেশ এর মা ঊষা রানী দুঃখ করে বলেন :- তোর বড়দা ছোট বেলা থেকেই পাগল। তোর বাবা কিন্তু তোর উপর অনেক আশা ভরসা করতে কিন্তু এমন কাজ করে সমাজের বুকে মান সম্মান নষ্ট করেছিস।
তপেশ বলে :- মা; ভালোবাসা করা কোন অন্যায় কাজ নয় তো। আর ভালবাসার মধ্যে জাত পাত টেনে নিয়ে আসছো কেন! বর্তমান যুগে সবাই কিন্তু আমরা এক জাতি এক প্রাণ মানুষ।
তপেশ এর মা উত্তেজিত বলেন :- মুসলমানের মেয়ে বিয়ে করে ঘরে আনলে কিন্তু বংশের মুখ আরো উজ্জ্বল হতো।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব কিন্তু আদিম যুগের মত স্বেচ্ছাচারিতা কখনোই মেনে নেবে না।
সমাজ ব্যবস্থায় জাত পাতের ও বংশের বিচার হয়। বিয়ে মানেই ছেলে খেলা নয়, সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসাথে বসবাস করতে হয়।
তপেশ বলে :- আমি তো রিতাকে বিয়ে করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সামাজিক মর্যাদা দান করেছি।
তপেশ এর মা রাগ দেখিয়ে বলেন :- ব্রাহ্মণ সমাজ ব্যবস্থা তোদের বিয়েকে কোনদিন মেনে নেবে না, তাহলে সমাজে বাস না করে রাষ্ট্রের কাছে গিয়ে বসবাস কর।
রিতার পালায় পড়ে কিন্তু অকালে বিয়ে করলি। লেখাপড়া বন্ধ করে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নষ্ট করলি।
আমাদের কথা শুনলে কিন্তু আজ তোকে কঠোর পরিশ্রম করে দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হতো না।
আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আর কত দিন সাহায্য করতে পারি কিন্তু একদিন তোর বাবার কাছে ধরা পড়তে হবেই।
সেই দিন কি পরিস্থিতি তৈরি হবে একমাত্র ভগবান নারায়ণ জানে!তোর বাবা যেমন ভালো মানুষ আবার অন্যায় বা তার কথার বিরুদ্ধে আচরণ করলে কিন্তু ভীষণ ভাবে খারাপ মানুষ হয়ে উঠে।
তপেশ চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলে :- মা; আবেগের বশবর্তী হয়ে লোভ সংবরণ না করতে পেরে কিন্তু রিতার সাথে ভালবাসায় জড়িয়ে পড়ে ছিলাম।
তপেশ এর মা বলেন :- রিতা ও তার বাপ মিলে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে কিন্তু তোর উপর জাদু টোনা করেছে।
তপেশ বলে :- মা; আমাকে ক্ষমা করে দিও।
তপেশ এর মা বলেন :- ওদের বংশের খারাপ ইতিহাস জানার কারণে মেয়ে কে বাংলায় বিয়ে দিতে পারছিল না, তাই এখানে নিয়ে এসে তোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে।
আর তুই গাধার মতো না বুঝে শুনে তাদের সাথে মেলামেশা শুরু করে দিলি। জেনে রাখিস একটি প্রবাদ বাক্য "দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় কখনো ভুলিতে নাই।"
তপেশ বলে :- মা; আর ফিরে আসার কোন পথ নেই, আমি এখন সন্তানের বাবা হয়েছি।
তপেশ এর মা বলেন :- আমি কিন্তু ওই বাড়িতে থাকার বিষয়ে প্রথম দিন থেকেই বিরোধিতা করেছিলাম কিন্তু বাড়ির মেয়ে মানুষ বলে কথার কোন মূল্যায়ন হলো না।
তপেশ এর মা তাড়াতাড়ি করে উঠে ঘরের মধ্যে গিয়ে কিছু জিনিসপত্র ব্যাগের মধ্যে ভরে আবার ফিরে এসে তার ছেলের হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দেয়।
তপেশ বলে :- মা ।
তপেশ এর মা বলেন :- তোর বাবা কিন্তু মনে ভীষণ ভাবে দুঃখ পেয়ে বলেছেন তার 'মৃত দেহ যেন তুই কখনোই স্পর্শ না করিস।'
তোর বাবার আসার সময় হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি রাতের অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এখান থেকে চলে যা। যত জ্বালা হল মায়ের, ছেলেমেয়েরা অন্যায় করবে আর দোষ চাপাবে তার মায়ের উপর।
------------------------------------------------
।। নবম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------ তপেশ এর মেয়ে এক বছর বয়সের
সময় রিতার বাবার রেল চাকরির নিয়ম অনুসারে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার কারণে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে।
রিতার বাবা অবসর গ্রহণের দুই মাস পর একদিন সন্ধ্যার পর তার জামাই ও মেয়ে কে ডেকে বলেন :- বর্তমান আমার চাকরি নেই আর টাকা আয় করার কোনো উৎস খুঁজে পাচ্ছি না।
তপেশ মাসে যে ২৬০ টাকা আয় করে তা দিয়ে কিন্তু সংসার চলছে না এবং ভবিষ্যতে চলবে না।
ভাবছি, বাংলায় জন্মভূমিতে ফিরে গিয়ে সবাই এক সংসারে বসবাস করবো। পেনশনের টাকা পেতে পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ততদিন এখানে থাকলে সবাই না খেয়ে মরে যেতে হবে। জমানো টাকায় আর কতদিন চলতে পারে।
পৈতৃক ভিটেতে ফিরে গিয়ে কিন্তু নিজের দশ বিঘা জমিতে চাষবাস করে ঠিক সংসার চালাতে পারব।
আবার কয়েক এক বিঘা জমির উপর পুকুর আছে। মাছ চাষ করলে কিন্তু বাড়তি টাকা আসবে।
তপেশ বলে :- আমি এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবো না আর রিতা আমার সাথে থাকবে। আপনার ইচ্ছা হলে বাংলায় ফিরে যেতে পারেন।
রিতার বাবা ভাবে মনে :- রিতার মায়ের সাথে আমার দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ ঘটেছে। আমার সংস্রবে আসতে চাই না। আমার কোন কিছু বা টাকা পয়সা নেয় না।
রিতা আমার সাথে না গেলে সংসারের ও ছোট ছোট তিন মেয়ের দায়িত্ব কে নেবে। যেভাবেই হোক রিতা কে রাজি করাতে হবে। জামাই যদি যেতে না চাই তাহলে এখানেই থাকবে। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসবে।
কয়েক দিন পর রাতে রিতা তার স্বামীর পাশে শুয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে। পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া কে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে যায়।
তপেশ রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে :- স্বামী যখন তোমার কাছে আপন নয়, তাহলে বিয়ের আগে সন্তান পেটে ধারণ করে কিন্তু আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। জোর করে প্রতারণার মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে ও লোভ দেখিয়ে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেওয়ার নাটক করার কোন দরকার ছিল না।
তোমার যৌবন জ্বালার খিদে মেটানোর জন্য আমার মত বহু পুরুষ পাওয়া যেত কিন্তু কি দরকার ছিল বিয়ে করার?
স্বামীর কথার কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থেকে কিছু সময় পর ঘুরে শুয়ে রিতা ভাবে :- স্বামী যা আয় করে তাতে কিন্তু সংসার চালিয়ে তারপর ছেলে মেয়ে লালন পালন সম্ভব নয়।
স্বামী মাসে ৩৬০ টাকা আয় করে কিন্তু প্রতি মাসে ঘর ভাড়া দিতে হবে কমপক্ষে ৩০০ টাকা। ব্যবসা করবো করবো বলে কিন্তু প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হয়ে গেল।
আসলে স্বামীর ব্যবসা করার কোন মন মানসিকতা নেই। শশুরের টাকায় যদি আনন্দ ফুর্তি করে সংসার চলে যায়, তাহলে কে আর কষ্ট ভোগ করতে চায়।
বাবা চলে যাওয়ার পর ঘর ভাড়া সহ খাওয়া দাওয়া আরো কত খরচ আছে। শ্বশুর বাড়িতে তো কোনদিন উঠতে বা বসবাস করার সুযোগ পাবে না। জাত পাতের কারণে সে রাস্তা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
শাশুড়ি মা ভালো মানুষ কিন্তু তিনি তো আমাকে রক্ষা করতে পারবেন না। আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু শ্বশুর মশাইয়ের সাথে শাশুড়ি মায়ের কথা কাটাকাটি, ঝগড়া ও অশান্তি অনেকবার সৃষ্টি হয়েছে।
নিম্ন বর্ণের জাতের বৌমার প্রতি কিন্তু ব্রাহ্মণ শ্বশুরের কঠিন হৃদয় কখনোই বিগলিত হয়নি।
মেয়ে তনুশ্রী কে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুর মশাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। প্রণাম করতে গেলে দূরে সরে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নেয়।
বাবার অনুপস্থিতিতে তাকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক কথা বার্তা বলতে থাকে।
আমাকে ও তার ছেলেকে বিভিন্নভাবে বকাবকি করতে শুরু করে। শাশুড়ি মা ইশারা করে চলে যেতে বলে।
আমিতো শশুর-শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর, ননদ, স্বামী ও সন্তান নিয়ে এক পরিবারে বাস করতে চেয়েছিলাম। জাত পাতের কারণে ব্রাহ্মণ স্বামীর পরিবারে বাড়ির বধু হিসাবে আমার জায়গা হলো না। আমি নাকি এই পরিবারের অমঙ্গল কারি নারী।
স্বামীর দায়িত্বহীনতা জ্ঞান দেখে বাবা দুঃখ পেয়ে কিন্তু আমার ছেলে মেয়ের দায়িত্ব নিতে চেয়েছে।
বাবার বাড়িতে থাকলে কিন্তু এখনকার মতো মানুষের জাত পাত নিয়ে বাজে বাজে কথা ও মন্তব্য শুনতে হবে না। আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের হনুমানের মত দাঁত খিচুনি দেখতে বা শুনতে হবে।
বাবার বাড়িতে থাকলে কিন্তু ব্রাক্ষণ্যবাদ চলবে না। ছেলে মেয়ের টানে নিশ্চয় স্বামী আমার কাছে একদিন অবশ্যই চলে আসবে।
তপেশ-রিতার মধ্যে কোন সমঝোতা না হওয়ার কারণে আরো কয়েক মাস ধরে দাম্পত্য কলহ চলতে থাকে।
রিতা তার স্বামীকে রেখে শিশু কন্যাকে কোলে ও পেটে কয়েক মাসের সন্তানকে নিয়ে তার বাবার সাথে পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।
শশুরের সরকারি আবাসন ছেড়ে যাওয়ার আগে জামাই কে থাকার অনুমতি দিয়ে যায়। অবসর গ্রহণের পর যতদিন খুশি আবাসনে বাস করার নিয়ম আছে।
তপেশ কয়েক মাস থাকার পর আবাসন এলাকার মধ্যে তার বাড়ির হওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আবাসনের ঘরে তালা ঝুলিয়ে অন্য জায়গায় কম দামে ঘর ভাড়া নেয়।
তপেশ-রিতার মধ্যে ১৫ মাস ধরে ভারতীয় ডাক বিভাগের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়।
------------------------------------------------
।। দশম অধ্যায় ।।
------------------------------------------------ তপেশ এর বড় ছেলে কাজলের জন্ম
গ্রহণ করার সাত মাস পর রিতা স্বামীর উদ্দেশ্য বাবার সাথে করে ট্রেনে চড়ে লামডিং শহরের রওনা দেয়।
১৫ মাস স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি থাকার পর হঠাৎ করে রিতা তার স্বামীর ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হয়।
রিতা ঘরে ঢুকে ভাবে :- এই জোরা জীর্ণ ঘরের মধ্যে বাস করে কি করে ! টিনের চাল আর মুলি বাঁশের বেড়া দেওয়া আবার ঘরের মেঝে মাটির কম দামে এই ঘর ভাড়া পেয়েছে। শোয়ার জন্য একটা চৌকি আছে কিন্তু বহুদিনের পুরনো হয়তো দুজনে শুয়ে নাড়াচাড়া দিতে দিতে ভেঙে পড়তে পারে।
শ্বশুর শচীন বিশ্বাস জামাইয়ের বাড়ি ঘরের পরিস্থিতি দেখে কিন্তু থাকার জন্য রেল কলোনি পাড়ায় এক বন্ধুর বাড়িতে চলে যায়।
রিতা তার স্বামীকে একান্ত পেয়ে জড়িয়ে ধরে বলে :- দুজন দুই জায়গায় থাকার কারণে কিন্তু দুজনেই কষ্ট ভোগ করে চলেছি। তুমি আমার সাথে বাংলায় চলো। তোমাকে ব্যবসা করার জন্য টাকা পয়সা দেবে, বাবার সাথে কথা হয়েছে।
তপেশ বলে :- আমি তোমার বাবা কে বিশ্বাস করি না। এর আগেও অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিন্তু পালন করেননি। আমি আর তোমাদের বাবা ও মেয়ের চক্রান্তে জড়াতে চাই না। এখানে একা একা অনেক ভালো আছি।
রিতা বলে :- আমার উপর তোমার রাগ হয়েছে কিন্তু তার জন্য ছেলের মুখ পর্যন্ত দেখতে গেলে না। তুমি না যাওয়ার কারণে কিন্তু লোকের কাছে আমাকে কম কথা শুনতে হয়নি।
তপেশ বলে :- হিন্দু শাস্ত্রে মতে, যেমন কর্ম তেমন ফল ভোগ করতে হবে।
রিতা বলে :- আমি তোমার প্রতি অন্যায় করেছি কিন্তু ছেলে মেয়ে তো কোন অন্যায় করেনি।
তপেশ বলে :- আমার ছেলে মেয়ের দায়িত্ব আমি অবশ্যই নেবে কিন্তু যদি তুমি আমার সাথে থাকো।
রিতা রাগ দেখিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে :- তাহলে তোমার ছেলে মেয়ে নিয়ে তুমি থাকো।
তপেশ বলে :- উত্তেজিত হয়ে কোন কথা বলবে না কন্ঠস্বর নিচু করে কথা বল।
রিতা বলে :- কেন! বিয়ের পর আমাকে কোনদিন শান্তিতে থাকতে দিয়েছো! দুটো ছেলে-মেয়ের জন্ম হলো কিন্তু বাপের বাড়িতে বাপের টাকায়। তুমি বাবা হয়ে কোন কর্তব্য পালন করেছো, জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না।
তপেশ বলে :- আমি যতবার কর্মের চেষ্টা করেছি, ততবারই তুমি ও তোমার বাবা বাধা সৃষ্টি করেছে। তোমার বাবা নাকি সব দায়িত্ব নিয়েছে।
রিতা বলে :- আমি যমের বাড়ি চলে যাচ্ছি। সংসার তো নয় যেনো নরকে বাস করা। আমি তোমাকে সত্যিকারের ভালবাসি বলে বহুদুর থেকে কুকুরের মতো তোমার কাছে ছুটে এসেছি। তুমি তো আমাকে একদিনের জন্যও দেখতে গেলে না।
তপেশ ভাবে মনে :- সত্যি যদি ছেলে মেয়ে রেখে যমের বাড়ি চলে যায়, তাহলে আবার নতুন করে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
রিতা তার স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে বলে :- কিছু তো বলছ না।
তপেশ বিরক্ত বলে :- কি আর বলবো! বাবা ও মেয়ে যেভাবে আমার পিছনে লেগেছে, তাতে তোমাকে বিধবা হতে হবে।
রিতা বলে :- বাজে কথা রেখে আমার সাথে চলে। ছেলে মেয়ে তো মানুষ করতে হবে। মেয়ে সব সময় বাবা বাবা করে বিরক্ত করতে থাকে। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
রিতা তার স্বামীকে বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে আলিঙ্গন করতে করতে দৈহিক মিলনে আহ্বান জানায়।
তপেশ তার স্ত্রীকে আদর করতে করতে আড্ডা করে বলে :- তোমার দেহে অতিরিক্ত কামশক্তি আছে তা আমি ভালোভাবে জানি।
রিতা তার স্বামীকে চুম্বন করে বলে :- তা কি হয়েছে! তুমি তো আমাকে পরিপূর্ণ তৃপ্তি দিয়ে থাকো।
তপেশ তার স্ত্রীকে বুকের মাঝে জোরে চেপে ধরে বলে :- আমার কাছে থাকলে তোমার দিনে রাতে চৌদ্দ বার দেহ সুখ দিতে হয়। কিন্তু আমাকে ছেড়ে ১৫ মাস থাকলে কিভাবে! তাহলে বাংলার গ্রামে তোমার কোন বিয়াই বন্ধু আছে নাকি।
রিতা আড্ডা করে হাসতে হাসতে বলে :- কেন! বিয়াই বন্ধু থাকলে, তোমার কোন ক্ষতি আছে।
পুরুষরা বাড়িতে বউ থাকতে যদি অন্য কোন নারীর কাছে যেতে পারে, তাহলে কোন বউ যদি অন্য পুরুষের কাছে যায় তাহলে দোষ কোথায়! আরো নারীর শরীর ও জায়গা তো সে সাথে করে নিয়ে যাবে না।
তপেশ হাসতে হাসতে বলে :- তাহলে দ্রৌপদীর মত পঞ্চ স্বামীর সেবা করো। আমাকে তোমার চরণতলে আশ্রয় দিও।
রিতা বলে :- উল্টোপাল্টা বাজে কথা বলবে না কিন্তু স্ত্রীকে খুশি করা তোমার একান্ত কর্তব্য।
গীতায় বলেছেন "কর্ম করে যাও ফলের আশা করোনা" তাও তো দুইটি ছেলে-মেয়ে জন্ম দিয়ে ফল দান করেছি।
রিতা ও তপেশ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পরাজিত সৈনিকের মত কুরুক্ষেত্রের ময়দানের ধুলো বালির মধ্যে চিৎ হয়ে শুয়ে বিশ্রাম করতে থাকে।
রিতা বলে :- তাহলে, আমার সাথে তুমি বাংলায় কিন্তু যাবে আর কোন তাল বাহানা করলে শুনবো না।
রিতা তার স্বামীকে কয়েক দিন ধরে বিভিন্নভাবে বুঝাতে থাকে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে জাল বুনতে থাকে। রিতার প্রচেষ্টা একসময় সফল হয়।
তপেশ তার স্ত্রী রিতা কে নিয়ে শ্বশুরের পৈতৃক বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ থানার অধীনে চন্দননগর চৌগাছা গ্রামে চলে আসে।
১৫ দিন জামাই আদর চলার পর একদিন রিতা তার স্বামীকে একান্ত ভাবে বলে :- শ্বশুরবাড়িতে আছো ঠিক আছে কিন্তু তোমার ছেলে মেয়ে বউ ভবিষ্যতের জন্য কোন কাজকর্ম অবশ্যই করতে হবে।
এক মাস যেতে না যেতেই শ্বশুর শচীন বিশ্বাস তার জামাই তপেশ কে একান্ত ডেকে বলে :- তুমি জামাই হলেও কিন্তু ছেলের মতো আর এই সংসারের সব দায়িত্ব ভার তুমি না চাইলেও কিন্তু সরাসরি চলে আসবে।
কাজকর্মের অবসরে মাঠের জমিজমা দেখাশোনা করলে কিন্তু সবাই বিশেষভাবে উপকৃত হবে। আর কাজকর্মের মধ্যে থাকলে তোমার মন মানসিকতা ভালো থাকবে।
রিতার কথামত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কখনো শ্বশুরের জমিতে আবার কখনো অন্যের জমিতে জন মজুরি করা সহ বিভিন্ন কাজ করতে থাকে।
কাজের বিনিময়ে পরিশ্রমের টাকা কিন্তু রিতার হাতে তুলে দেয় আবার প্রয়োজন মতো কিছু টাকা চেয়ে নেয়।
বাড়ির একমাত্র জামাই হবার কারণে বাইরে কাজ শেষ করে আসার পর কিন্তু বাড়ির গরু দেখা, ঘাস কাটা, খাওয়ানো ও স্নান করানো সহ বাড়ির জ্বালানি কাঠ কুড়াল দিয়ে চিকন করতে হয়।
তপেশ এর আর কোন উপায় নেই কারণ বাড়িতে যুবক ছেলে বলতে একমাত্র জামাই তপেশ। বউ সহ তিনজন শালিকাকে নিয়ে সুখ দুঃখের মধ্যে দিয়ে তপেশ এগিয়ে চলেছে।
ধীরে ধীরে তপেশ এর ব্রাক্ষণের আভিজাত্য ও সম্মান নষ্ট হতে শুরু করে। লোকে বিভিন্ন ভাবে ব্যঙ্গ করতে শুরু করে।
কেউ বলে পৈত্য দিয়ে আর কি হবে! খুলে ফেল। ব্রাক্ষণ সমাজের মানুষের কাছে থেকে ধিক্কার ও অপমানিত হতে হয়।
------------------------------------------------
।। একাদশ অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
তপেশ ঘর জামাই থেকে শ্বশুরের
দেওয়া প্রতিশ্রুতির আশায় আশায় তিন বছর পার করে দেয়। সংসারের মাঝে দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে আবার তার ছোট ছেলে সজলের জন্ম হয়।
রিতার তৃতীয় বোন ১৬ বছর বয়সের কিশোরীর সাথে তার জামাইবাবুর ভালোবাসার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে।
রিতার বাবা শচীন বিশ্বাস ভাবে :- জামাইয়ের আবার তৃতীয় মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে। একটি মেয়েকে নিয়ে জ্বালায় জ্বলছি আবার তৃতীয় মেয়েকে একই জ্বালায় ভোগাতে চাই তপেশ।
রিতা তার তৃতীয় বোন সাথে স্বামীর সম্পর্কের বিষয় জানতে পেরে মনে মনে ক্রোধিত হয় কিন্তু স্বামীকে কিছুই না বলে অন্যভাবে উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যায়।
রিতা তার স্বামীকে সব সময় চোখে চোখে ও কাছে রাখার সকল প্রচেষ্টা করেও কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ওঠে। আর সেই ব্যর্থতার ফলে তাদের দাম্পত্য জীবনে তার তৃতীয় বোন কারণে চাঁদের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার মতো তিথি পরিবর্তনের উত্থান পতন শুরু হয়।
কয়েক মাসের মধ্যে রিতা তার স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতে হতে বেশিরভাগ দিনগুলি অমাবস্যার অন্ধকার রাতের মতো কাটতে থাকে।
তপেশ এর কিছু খামখেয়ালি আচরণ,
উদাসীনতা ভাব, শালির সাথে অবৈধভাবে প্রেম, তার উগ্রতা ও খারাপ ব্যবহারের কারণে কিন্তু রিতা-শ্বশুর-শালির রোষানলে পড়ে।
তুষের আগুন এর মত মনে মনে সবাই জ্বলতে শুরু করে। যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ছোট ছেলে সজলের আট মাস ২১ দিন বয়সের সময় শশুর, জামাই ও তার স্ত্রী রিতার মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাগ অভিমান দুঃখ কষ্টের এক ভয়ানক কালবৈশাখী ঝড় তুফান শুরু হয়।
তপেশ এর আজ অন্য কোথাও দিনমজুরের কাজ না থাকার কারণে সকাল বেলা পাটের বস্তা পেতে উঠানের এক পাশে আম গাছের ছায়ায় বসে।
সকালের জলখাবার মুড়ি আর লাল বাতাসা খেতে খেতে তপেশ এফএম রেডিওর আধুনিক গান শুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
শ্বশুর শচীন বিশ্বাস ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার জামাইয়ের উদ্দেশ্য করে বলেন :- আজ যখন কাজ নেই, তখন কুড়াল দিয়ে মোটা কাঠ গুলো জ্বালানির উপযুক্ত করার জন্য চিকন করতে থাকো।
সেই চৈত্র মাসের প্রচণ্ড গরমের দুপুরে
উঠানের উপর একটা আম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তপেশ ভাবে :- হায়রে ঘর জামাই থাকার কি জ্বালা! সময় নেই অসময় নেই কিন্তু বউ, শশুর ও ছোট ছোট শালীদের হুকুম তামিল করতে হয়।
এই পরিবারের একমাত্র শাশুড়ি মা বাদ দিয়ে অন্যান্য সদস্যদের ব্যবহার ও আচরণ দেখে মনে হয়, আমি তাদের আদিম যুগের মতো কেনা দাস হয়ে পড়েছি। যে যেমন ভাবে পারো ব্যবহার করে নাও কিন্তু কোন প্রতিবাদ করা চলবে না।
তৃতীয় শালী কে নিয়ে রিতা আমাকে দোষারোপ করছে কিন্তু আমাকে তো তার সাথে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমি বাড়ির একজন জামাই নামক চাকর সবার চাহিদা পূরণ করা নাকি আমার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
আমি মানসিকভাবে বিপর্যয়ের কারণে প্রতিদিন মদ পান করে কিন্তু সব দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকতে চায়। আর মদ পান করলে রাতে ভালো ঘুম হয়।
আমি রোদের মধ্যে কুড়াল দিয়ে কাঠ চিরাই করতে করতে ঘেমে স্নান করে উঠেছি কিন্তু তার দিকে কারোরই নজর নেই। বার বার জল চেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। বাবার জন্মে কোনদিন এই সব কাজ করিনি তাও রিতার পালায় পড়ে করতে হচ্ছে। আমাবস্যার অন্ধকার রাত কাটিয়ে আর পূর্ণিমার আলো ছোঁয়া হয়তো এ জীবনে পাবো না।
শালি সুপ্রিয়া এক বোতল পানীয় জল নিয়ে জামাইবাবুর পাশে রেখে বলে :- চিৎকার চেঁচামেচি না করে কিন্তু নিজেই তো এক বোতল জল ভরে আনতে পারতে। সবাই এখন কাজে ব্যস্ত আছে।
পাড়ার কিছু বয়স্ক পুরুষেরা অন্য পাশে আরেকটি গাছের ছায়ায় বাঁশের মাচার উপর কেউ শুয়ে আবার কেউ বসে আছে।
কেউ বিড়ির ধোঁয়া পান করে আর কেউ পান চিবাতে থাকে আবার কেউ হুঁকো সাজিয়ে তার জল পান করতে ব্যস্ত আছেন।
এর মাঝে আবার রাজনীতি থেকে শুরু করে ধর্ম , পাড়ার ভাল মন্দ, কার বাড়ি কি হচ্ছে! ও কার বউ কেমন এমন সব বিভিন্ন ধরনের উদ্ভট বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। এর মাঝে আবার দুই দলে বিভক্ত হয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে।
হঠাৎ কাল বৈশাখী ঝড়ের গতিতে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে তপেশ এর শ্বশুর শচীন বিশ্বাস বাড়ির উঠানে উপস্থিত হয়। চিৎকার শুনে বাড়ির অন্য সদস্যরা সহ পাড়ার লোকজন আসতে শুরু করে।
রৌদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে।
তপেশ এর দিকে আঙ্গুল তুলে শচীন বিশ্বাস উত্তেজিত ভাবে বলেন :- তুই আমাদের কে! তোর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা। নির্লজ্জের মতো এই বাড়িতে থাকতে লজ্জা করে না। এই বাড়িতে তোর কেউ নেই।
তারপর জামাইয়ের বাবা মা সহ চৌদ্দ গোষ্ঠীকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে থাকে।
গরমের মধ্যে আবার গরম ও আপত্তি জনক অশ্লীল ভাষায় গালাগালি কথা শুনে তপেশ মাথা গরম করে উত্তেজিত হয়ে বলে :- আপনার মেয়ের ভাতার কে চিনতে পারছেন না।
শচীন বিশ্বাস বলে :- কথাবার্তা ভালো করে বল। আমার মেয়ের সাথে তোর কোন সম্পর্ক নেই।
তপেশ বলে :- আপনার মেয়ে রিতার সাথে কিসের সম্পর্ক! স্বামীকে বাদ দিয়ে বাবার বাড়িতে পড়ে থাকতে চায়। অনেক দিন ধরে তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। মনে করেন আমি কিছুই বুঝতে পারি না।
তেলের উপর কৈ মাছ কড়াইতে দিলে যেমন লাফিয়ে উঠে ঠিক সেই ভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে তপেশ এর কাছে গিয়ে চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি মারতে মারতে শচীন বিশ্বাস বলেন :- রিতার জীবন কে সর্বনাশ করে তোমার আত্মতৃপ্তি হয়নি। এবার পুরো পরিবারকে গ্রাস করতে চাও।
তপেশ দ্রুতবেগে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পাশের থেকে জ্বালানি কাঠ নিয়ে সপাসপ শ্বশুরের পিঠে মেরে দেয়।
আর শ্বশুর চিৎকার করে উঠে লাফিয়ে দূরে সরে গিয়ে জামাইয়ের উপর খিস্তি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের
সমালোচনা করতে থাকে।
তারপর কুড়াল হাতে নিয়ে বলে :- শ্বশুর নামক অসুরকে আজ বধ করে জেল হাজত খাটবো।
আমাকে বহুবার বিভিন্ন ভাবে জ্বালা যন্ত্রণা দিয়েছে। এই শয়তান পশুর কারণে আমাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এই শশুরের বুদ্ধিতে কিন্তু রিতার সাথে কোনদিন শান্তিতে সংসার করতে পারলাম না। বিয়ের পর থেকেই শশুরের কারণে আমাদের জীবনে সব সময় পূর্ণিমা ও অমাবস্যা লেগেই আছে।
শচীন বিশ্বাস বলেন :- আমি যা করেছি তা রিতার ভালোর জন্য করেছি কিন্তু দায়িত্ব জ্ঞানহীন মানুষ দেখেছি।
তপেশ বলে :- আপনার বউয়ের সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে কিন্তু মেয়ে রিতা কে নিয়ে টানাটানি করছেন কেন! মেয়েকে তাহলে বাড়ির কাজের মেয়ে বানিয়েছ। আর তার মেয়ে বাবা বলতে অজ্ঞান কেন বুঝতে পারি না।
শচীন বিশ্বাস বলেন :- তুই আমার মেয়ের স্বামী নয়। আমি তোকে জামাই বলে শিকার করি না।
তপেশ এর রক্ত টগবগ করে ওঠে আর উত্তেজিত হয়ে আঙ্গুল উঁচু করে বলে :- শয়তান শ্বশুর এখন বলছেন, রিতা ও তার পরিবারের আমি নাকি কেউ না।
তাহলে শয়তান বাবা এই তিনটি বাচ্চা কি তুই বানিয়েছিস। তা যদি না হবে, তবে মেয়ে সহ তার ছেলে মেয়েকে বাড়ি থেকে বিদায় করছেন না কেন! নিশ্চয়ই বাবা মেয়ের মধ্যে কোন স্বার্থের ব্যাপার আছে। বলার সাথে সাথে কুড়াল হাতে নিয়ে দ্রুতবেগে তার শশুরের দিকে ধেয়ে আসে।
রিতার মা তরুবালা দেবী ছুটে এসে জামাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পথ অবরোধ করে বলেন :- আমাকে মেরে লাশের উপর দিয়ে হেঁটে তারপর তোমার শ্বশুর কে মারবে।
তপেশ হাত নিচের দিকে নামিয়ে বলে :- মা;
পথ ছেড়ে দিন। আমি এই সংসারে ভূতের মত কাজকর্ম করেও কিন্তু রিতা ও তার বাবার মন পায়নি।
মা তরুবালা দেবী জামাইয়ের হাত থেকে কুড়াল কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে দিয়ে বলেন :- জামাই বাবা; রিতার বাবা কে মাফ করে দাও। সারা জীবন অপরের ক্ষতি করেই আসলে কিন্তু এবার নিজের ক্ষতি চোখে দেখুন।
জানি বাবা; তোমার উপর এই পরিবারের সদস্যরা অনেক অত্যাচার ও নির্যাতন করেছে। আমার সাথে সম্পর্ক না থাকলেও কিন্তু চোখে তো সবকিছু দেখতে ও কানে শুনতে পায়।
তপেশ বলে :- মা; আপনি বলুন, আমার অন্যায় কোথায়।
মা তরুবালা দেবী বলেন :- আমার মেয়েটা এক নম্বরে শয়তান। স্বামী থাকতে বাবার বাড়িতে থাকে কেন! বাপের প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে গেছে।
বিয়ের পরে মেয়েদের স্বামীর সংসার, বাড়ি ও সন্তানাদি সবার থেকে আপন। স্বামী যে অবস্থায় থাক না কেন! স্ত্রীর কর্তব্য তার সাথে থাকা আর তার ভালো মন্দ দেখাশোনা করা আবার প্রয়োজন অনুসারে সাহায্য করা।
রিতা দূর থেকে তার স্বামীর উদ্দেশ্য করে বলে :- তুমি; আমাকে যত পারো বলো কিন্তু বাবার সম্পর্কে কোন বাজে কথা বলবে না।
তপেশ তার স্ত্রীর উদ্দেশ্য করে বলে :- স্বামীর উপর দরদ নেই কিন্তু বাপের উপর এত টান কেন! সব নাটক আজ বন্ধ করে দেবে। মা আমাকে ছেড়ে দিন। আপনার মেয়ের অহংকার আজ শেষ করে দেবে।
মা তরুবালা দেবী তার জামাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন :- বাবা তপেশ; মাথা ঠান্ডা করে। সংসার জীবনের সুখ শান্তি দুঃখ কষ্ট বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আসবে কিন্তু ভেঙ্গে পড়লে হবে না। তোমার মেরুদন্ডকে আরো সোজা করতে হবে। সংসারে কঠিন লড়াইয়ে কিন্তু তোমাকে বিজয়ী হতে হবে।
রিতা উত্তেজিত হয়ে তার স্বামীর উদ্দেশ্য করে বলে :- তুমি পাগলের ন্যায় আচরণ বন্ধ করে। আমার বাপের টাকায় তোমার ছেলে মেয়ে বউ খায়। যে কয় টাকা আয় করো তাতে জল গরম হয় না। ঘন ঘন চা পান করতে মাসে কত টাকা খরচ হয় তার হিসাব রাখ কোন দিন।
তপেশ তার স্ত্রীর উদ্দেশ্য করে বলে :- তোর বাপ কত রকম প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে এখানে নিয়ে এলো, আমাকে রাজার হালে রাখবে।
ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্য টাকা দেবে কিন্তু ভিখারির বাচ্চা কিছু করলে না। এখন আমাকে দিয়ে দিনমজুরি সহ বাড়ির চাকরের সব কাজ করাচ্ছে।
রিতা; একমাত্র তোর জন্য রেলের ডি গ্রুপের হওয়া চাকরি ছেড়ে দিয়ে কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে চলে এলাম। আর তার বাবা হারামির বাচ্চা বলে কিনা আমি নাকি তোমাদের কেউ না।
আমার খাওয়ার থালায় ডাল ভাত আর পান্তা ভাত আর নিজেরা ভালো মন্দ খাও। স্বামীর উপর কত দরদ তা আমার বোঝা হয়ে গিয়েছে। রিতা লোক দেখানো স্বামী-স্ত্রীর নাটক বন্ধ কর।
রিতা তার স্বামীর উদ্দেশ্য করে বলে :- তোমার ব্যবহারের জন্য কিন্তু বিরক্ত হয়ে বাবা কথাগুলো বলেছে।
তপেশ তার স্ত্রীর উদ্দেশ্য করে বলে :- আসামে আমার কাছে থাকতে তোমার জ্বালা বাদে আর বাংলায় থাকতে খুব মজা লাগে। এখানে কি তোর কোন নাগর আছে! এলাকায় পেয়ে আমার উপর বহু অত্যাচার করেছিস তোরা। তোমাদের পরিবারের সদস্যরা কিন্তু আমার ব্যবহার ও চরিত্র খারাপ করেছে।
তাহলে সংসারের মাঝে চোরাস্রোতের গোপন রহস্যের আসল সত্য ঘটনা সবার সামনে বলে দেয়।
মা তরুবালা দেবী বলেন :- বাবা; এইসব প্রসঙ্গ বাদ দাও কারণ কেঁচো খুঁড়তে বড় বড় সাপ উঠে পড়বে। তখন তুমি ও এই পরিবারের সদস্যরা বিষাক্ত সাপের কামড়ের বিষাক্ত বিষ কিন্তু কেউ হজম করতে পারবে না।
তপেশ তার স্ত্রীর উদ্দেশ্য করে বলে :- আমার শাশুড়ি মায়ের মত একজন ভালো মানুষের মেয়ে হয়ে কিন্তু কেন যে তুমি অমানুষ হয়ে পড়েছ! বুঝতে পারছি না।
শাশুড়ি মা তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন :- বাপের ধারা আর পাপে পরিপূর্ণ হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া।
রিতা বলে :- মা; তোমার জামাইয়ের পক্ষ নিয়ে তো খুব বড় বড় কথা বলছো। তুমিতো বাবার সাথে কোন সম্পর্ক রাখোনি।
মা তরুবালা দেবী তার মেয়ে রিতার উদ্দেশ্য করে বলেন :- তোর বাবার চরিত্র আমার থেকে আর কেউ বেশি জানে না।
আমার ২২ বছরের ছেলের নামে কিন্তু তোর বাবা বয়স্ক মহিলার সাথে অবৈধ প্রেমের মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দেয়।
একমাত্র ছেলের উপর বহুদিন ধরে মানসিক ভাবে অন্যায় অত্যাচারে জর্জরিত করে তুলেছিল। আমার ছেলে উপায় অন্ত না পেয়ে শেষে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।
তোর বাবা একজন ছেলের খুনি আবার জামাই ও মেয়ের বিচ্ছেদকারী।
তপেশ বলে :- মা; বাবা এমন জঘন্য কাজ করেছে। হিটলারি বুদ্ধি চালিয়ে এবার কিন্তু শ্বশুরমশাই ধরা পড়ে গিয়েছে।
মা তরুবালা দেবী তার মেয়ে রিতার উদ্দেশ্য করে বলেন :- ছেলের মৃত্যুর পর থেকে তোর বাপের সাথে আমার চিরদিনের বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে কিন্তু বহু বছর ধরে তার মুখ পর্যন্ত দেখি না। তার টাকা পয়সা নেওয়া তো দূরের কথা।
সেই অপদার্থ বাপের কথা শুনে স্বামীকে অবহেলা করে ঠিক কাজ করিসনি। একদিন আমার মতই তোকে অবশ্যই ভুগতে হবে।
শচীন বিশ্বাস ছুটে এসে তার স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর শাশুড়ি মা তরুবালা দেবী আচল টেনে মুখ ঢেকে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়।
শচীন বিশ্বাস চিৎকার করে বলে :- জামাইয়ের জন্য দরদ উঠলে উঠছে। আমি ওকে জামাই বলে স্বীকার করি না। মেয়ের দুর্ঘটনার কারণে ওকে আশ্রয় দিয়েছিলাম কিন্তু নেমকহারাম কে আর বিশ্বাস করি না।
দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, রিতা আর তার বাবা এক দলে আবার শাশুড়ি মা আর তার জামাই এক দলে ঝগড়া চলতে থাকে। ঝগড়া অশান্তি তর্ক-বিতর্ক করতে করতে এক সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পাড়া-প্রতিবেশী নারী ও পুরুষেরা গন্ডগোল কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিন্তু দুই দলের ব্যক্তিদেরকে জোর করে ধরে দুই দিকে দুই দল কে নিয়ে যায়।
তপেশ এর এক কাকা শ্বশুর বলে :- বাবা; মাথা ঠাণ্ডা রাখ, আজ বিচার সভা ডেকে অন্যায়ের বিচার হবে।
আর সেই মুহূর্তে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান প্রয়াত তরুণ বিশ্বাস তার কয়েক জন মেম্বার কে নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল।
তপেশ দৌড়াতে দৌড়াতে প্রধানের সামনে গিয়ে বলে :- কাকাবাবু; আমাকে বাঁচান। শশুরের পরিবারের সদস্যরা আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে।
তপেশ, প্রধানের হাত ধরে টানতে টানতে শ্বশুর বাড়ির উঠানে নিয়ে আসে। কয়েক জন ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে কয়েকটি চেয়ার নিয়ে আসে।
প্রধান তরুণ বিশ্বাস চেয়ারে বসে দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর তপেশ কে বলে :- জামাই , তোমার শ্বশুর অন্যায় কথা বলেছেন কিন্তু তুমি বয়স্ক শ্বশুরের নামে অপবাদ দিয়ে অন্যায় করেছো। তোমাকে অবশ্যই শশুরের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর তুমি কি এই পরিবারের সাথে থাকতে চাও?
তপেশ হাত জোড় করে বলে :- এই ঘটনার পর এই বাড়িতে থাকার আর কোন প্রশ্নই ওঠে না।
শশুর মশাই ও তার মেয়ে রিতা, আমার সাথে বিভিন্ন ভাবে প্রতারণা করেছে।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার ছেলে মেয়ে সহ বউকে নিয়ে আসামে ফিরে যেতে চাই।
রিতা বারান্দা থেকে চিৎকার করে বলে :- আমি তোমার সাথে যাবে না আর ছেলে মেয়ে কে দেবে না। যেতে হয় তুমি একা যাও।
যে আমার বাবাকে মারতে পারে আবার বাবা-মেয়ের সম্পর্কের কলঙ্ক লাগাতে পারে তার সাথে সংসার করার কোন প্রশ্নই ওঠে না।
তপেশ বলে :- প্রধান কাকা সহ উপস্থিত লোকজন আপনাদের কাছে একটাই নিবেদন, আমি যখন আমার পরিবারকে নিয়ে সংসার করার মন-মানসিকতা তৈরি করেছি এবং আয় রোজগার শুরু করি।
আর সেই মুহূর্তে আমার শ্বশুর তার মেয়ের বুঝিয়ে সুজিয়ে মগজ ধোলাই করে সব সময় আমার থেকে বিচ্ছেদ করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে কিন্তু কেন! আর তার মেয়ে রিতা স্বামীকে ছেড়ে কেন সারা বছর বাপের বাড়িতে থাকবে।
এখানে থাকাকালীন রিতাকে এই পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোথাও বসবাস করার কথা বহুবার বলেছি। তিনি বাপের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারবেন না।
আর আমাকে ঘর জামাই বানিয়ে জেলখানার বন্দী করে রাখার মত অবস্থায় পরিণত করেছে। একজন ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে সবার মন জুগিয়ে চলতে হয়। কোন ভুল ত্রুটি হলে কিন্তু এই পরিবারের সদস্যরা একজন চাকরের থেকেও বেশি খারাপ ব্যবহার করে।
প্রধান তরুণ বিশ্বাস বলেন :- তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারটা কি হবে?
শচীন বিশ্বাস বলে :- আপনি লিখিত করে বিবাহ বিচ্ছেদ করে দেন।
রিতা বলে :- না, এই মুহূর্তে বিবাহ বিচ্ছেদ করা যাবে না। ওর যখন থাকার ইচ্ছা নেই, তাহলে এখান থেকে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমি ওর সাথে কোনদিন সংসার করবো না।
পঞ্চায়েত প্রধান রীতাকে কাছে ডেকে নিয়ে কিছু সময় ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যায়।
পঞ্চায়েত প্রধান তপেশের উদ্দেশ্য করে বলেন :- জামাই; তুমি এখান থেকে চলে যাও। তারপর সঙ্গী সাথীদের নিয়ে হাঁটতে শুরু করে।
তপেশ বলে :- যা কিছু আয় করেছি, সবই তো পরিবারের অভিভাবক রিতার হাতে তুলে দিয়েছি। তাহলে আমার আসামে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
রিতার এক কাকা শিতু বিশ্বাসের হাত দিয়ে তপেশ এর শ্বাশুড়ি মা তরুবালা দেবী টাকা পাঠিয়ে দেয়।
কাকা শ্বশুর শিতু বিশ্বাস ২০০ টাকা হাতে দিয়ে তপেশ এর উদ্দেশ্য করে বলে :- বাঁচতে হলে এখান থেকে চলে যাও কিন্তু আর কোন দিন ফিরে আসবে না।
তপেশ তাড়াহুড়ো করে ভরা দুপুর বেলা ঘরে ঢুকে জামা প্যান্ট পরে দ্রুত বেগে ছুটতে ছুটতে উঠানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে আবার চলতে শুরু করে। রিতা সহ পরিবারের কোন সদস্যই বাধা সৃষ্টি করে না।
------------------------------------------------
।। দ্বাদশ অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
তপেশ এর বাবা মহেন্দ্র চক্রবর্তী সকাল
বেলা কাজে যোগদান করার জন্য পোশাক পড়ে তৈরি হয়ে বারান্দায় আসতে ভীষণ ভাবে অসুস্থ বোধ করে।
বাড়ির লোকজন সহ কয়েকজন প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি করে।
বাবার দুর্ঘটনার সংবাদ শোনা মাত্র তপেশ হাসপাতালে উপস্থিত হয়। তপেশ এর বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে তার মেজ ছেলে তপেশের দেওয়া জল পান করে। হার্ট অ্যাটাক অর্থাৎ হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার কারণে তিন মৃত্যুর সাথে লড়াই চালিয়ে সবাই বিদায় জানিয়ে পরপারে গমন করেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
বাবার আত্মার শান্তির জন্য শ্মশান ক্রিয়া সমাপ্ত করে। কিন্তু মেজো ছেলে হওয়ার কারণে হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি অনুসারে বাবার মুখাগ্নি করতে পারে না। একমাত্র অধিকারী হলো বড় ছেলে ও ছোট ছেলে। আবার বড় ছেলে পাগল সেই কারণেই ছোট ছেলে তার বাবার মুখাগ্নি করে এবং শ্রাদ্ধ শান্তির মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। আর অন্য ছেলেরা সব কাজ কর্ম করতে পারে। যেমন ধরা কাঁচা নেওয়া, মালসা পোড়া, বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি করতে পারে।
শ্মশান থেকে ফিরে এসে আর বাদ বাকি বাবার ক্রিয়াকর্মের করার জন্য তার মা ঊষা রানী চক্রবর্তী তার ছেলে তপেশ কে বাড়িতে থাকার অনুমতি প্রদান করে।
হিন্দু ধর্মের বৈদিক নিয়ম অনুসারে তপেশ এর বাবার আত্মার শান্তির জন্য ব্রাহ্মণ বাড়িতে নিয়ে এসে পরলৌকিক ক্রিয়া শ্রাদ্ধ শান্তির আয়োজন শুরু হয়। পরের দিন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে নেমন্তন্ন করে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন চলতে থাকে। চলতি ভাষায় আঁশ মুক্তি বলা হয়। এই দিনে অন্যান্য খাদ্যের সাথে কিন্তু মাছের ব্যবস্থা থাকবেই। অর্থাৎ ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাস ধর্ম ত্যাগ করে আবার সংসার জীবনের ফিরে এসে চলতি সমাজের মানুষের সাথে মিলিত হওয়া।
তপেশ এর বাবা রেলের কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হওয়ার কারণে তার বংশের তপেশ এর চাকরির সব রকম যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু বাড়ির সদস্যরা চাকরি থেকে বঞ্চিত করে।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের কাছে তপেশ এর প্রথম অপরাধ হলো, ব্রাক্ষণ ছাড়া অন্য জাতের মেয়েকে বিয়ে করা প্রধান কারণ।
আর দুই অপরাধ হলো, তপেশ এর পরিবারের সদস্যরা সহ তপেশ নিজে আসাম রাজ্যের নাগরিক ও লামডিং শহরের বাসিন্দা নয়।
পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক হিসেবে ধরা হয়েছে।
তারপর তপেশ এর দাম্পত্য জীবনের পারিবারিক বিভিন্ন ঝামেলা রয়েছে। এছাড়াও মায়ের কাছে তপেশ বিশ্বাসযোগ্যতা বহু বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছে।
মহেন্দ্র চক্রবর্তী পরিবারের বড় ছেলে পাগল আর বর্তমানে দুই ছেলের চাকরির সব রকম যোগ্যতা না থাকার কারণে চক্রবর্তী পরিবারের স্বার্থ রক্ষার্থে তার মায়ের নির্দেশে কিন্তু তার মেয়ে রুবি চক্রবর্তী বাবার পদে রেলের টিকিট পরীক্ষকের চাকরি লাভ করে।
তপেশ তার মায়ের বাড়িতে বসবাসের মধ্যে দিয়ে
নতুন করে কাজের সন্ধান করতে করতে এক ঠিকাদারের অধীনে প্রায় এক বছর কাজ করে। তারপর আরো বেশি বেতন পেয়ে গোহাটি শহরের আদালতের উকিল সংগঠনের একটি কাজ পেয়ে যায়। কাজ হলো, খাতা পত্র এগিয়ে দেওয়া , মামলার চিঠি পত্র আদান প্রদান করা সহ ইত্যাদি ইত্যাদি।
রিতার কাছে থেকে মাঝে মাঝে ডাকঘরের মাধ্যমে বিরহের চিঠি আসে কিন্তু তপেশ তার কোন উত্তর দেয় না।
তপেশ অন্তরে অন্তরে এক দিকে বউয়ের বিরহ জ্বালা অন্য দিকে মায়ের পরিবার থেকে চাকরি না পাওয়ার দুঃখ কষ্ট নিয়ে চলতে থাকে।
তপেশ রাতে একলা ঘরে বিছানায় শুয়ে ভাবে :- অন্য জাতের মেয়ে হয়ে যদি আমার সাথে সংসার করতো তবুও মনে শান্তি পেতাম। বর্তমান ছোট বড় সবার কাছে থেকে কথা শুনতে হয়।
------------------------------------------------
।। ত্রয়োদশ অধ্যায় ।।
------------------------------------------------
এক বছর দুই বছর করতে করতে প্রায়
১১ বছর পর হয়ে যায়। রিতা কিন্তু ডাক বিভাগের চিঠি ছাড়া কোন দিন তার স্বামীর কাছে ছুটে আসে না। আবার তপেশ তার অপমানের কথা স্মরণ করে রিতার কাছে ছুটে যায় না। ছেলে মেয়ে সহ লালন-পালনের দায় দায়িত্ব কিন্তু বাপের বাড়ি থেকে রিতার উপর পড়ে।
রিতা স্বামীকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর নিজের উদ্যোগে কাজ কর্ম শুরু করে টাকা উপার্জনের মাধ্যম সংসার পরিচালনা করতে থাকে।
দারিদ্রের কষাঘাতে রিতার নয় বছরের ছেলে কাজল কে কাজের জন্য অন্যের দোকানে কাজে যেতে বাধ্য হয়। তার জন্য বেশি লেখাপড়া শেখা সম্ভব হয়নি।
১১ বছর পর হঠাৎ করে একদিন তপেশ এর মেয়ে তনুশ্রী তার মেসোমশাই অশোক মন্ডলের সাথে করে সকালবেলা লামডিং শহরের সরকারি আবাসনে তপেশ এর মায়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়।
তপেশ এর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের সাথে মানবতাবোধ দেখাতে হয়। তপেশ এর মায়ের মনে মনে রাগ অভিমান হলেও কিন্তু নাতনি তনুশ্রীর আশ্রয় দেয় কিন্তু তপেশ এর অন্য দুই ভাই মেনে নিতে পারে না। চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
তপেশ তার মেয়েকে বলে :- বহু বছর পর এখানে
আসার উদ্দেশ্য কি?
১৭ বছরের কুমারী তনুশ্রী তার বাবাকে বলে :- বাবা; আমি ঠাকুমার কাছে ও এই বাড়িতে থেকে কিন্তু কলেজে ভর্তি হতে চাই। পড়াশোনা শুরু করে কিন্তু উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে চাই। মা আমাকে আর পড়াশোনা করাতে চাই না।
মা; চার জনের সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে আবার আমার পড়ার খরচ কি করে জোগাড় করবে। বাবা তো পালিয়ে এসে কিন্তু আর আমাদের কোনদিন খোঁজ খবর পর্যন্ত নিল না।
তনুশ্রীর মেসোমশাই অশোক মন্ডল তনুশ্রীর কোথায় সমর্থন করে বলে :- ঠিকই তো; বিয়ে করে সংসার করেছো কিন্তু ছেলে মেয়ে ও বউয়ের দায়িত্ব নেবে না তা কখনো হয়।
তপেশ বলে :- তনুশ্রী, তোমার মায়ের সাথে আমার ১১ বছর আগে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। তোমার মা আমার বিরুদ্ধে তার বাবার সাথে মিলিত হয়ে কিন্তু আমাকে তাড়ানোর ষড়যন্ত্র করেছিল।
সেই ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তোমার মায়ের সাথে কিন্তু আমার গন্ডগোলের সৃষ্টি হয়। একদিন দুপুরবেলা বহু লোক জনের মাঝে আমাকে ভীষণভাবে অপমান করে কিন্তু তার বাবার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। লিখিত ভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ।
সেই দিনের ঘটনা এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আর সেই অপমানের কথাগুলো ১১ বছর ভুলতে পারিনি।
জানি তোমার মা আমার বিরুদ্ধে তোমাকে অনেক কথায় জানিয়েছে কিন্তু সত্য তার মধ্যে কতটুকু আছে। কেন! ছেলে মেয়ের সাথে যোগাযোগ রাখি না।
আমার নিজের কোন দায়িত্ববোধ জ্ঞান নেই। তোমার দায়িত্ব নিতে পারবে না। তোমার মায়ের কাছে আবার ফিরে যাও। অর্ধ মৃত বাবার কাছে কোন কিছু আশা করে না। বলে চোখের জল ফেলতে থাকে।
তনুশ্রী রুমাল দিয়ে বাবার চোখে জল মুছে দিতে দিতে বলে :- বাবা; বুঝতে পারছি মায়ের কারণে মনে ভীষণ কষ্ট ভোগ করে চলেছে। তোমার আর মায়ের মধ্যে সমস্যা হয়েছে কিন্তু আমি সন্তান হিসেবে কোন অপরাধ তো করিনি।
তোমাদের দুজনের মধ্যে দাম্পত্য কলহের সমস্যার কারণে তাদের সন্তান বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে কিন্তু বহু বছর ধরে দুঃখ কষ্ট সহ্য করে চলেছে। হয়তো দুজনের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়ে আছে। সন্তানের স্বার্থে তোমাদের একত্রিত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
তনুশ্রী আসার সংবাদ প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর বিভিন্ন ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের ভাল দিক ও মন্দ দিক নিয়ে এমন মন্তব্য ও আলোচনা করতে থাকে।
একজন পাশের বাড়ির বয়স্ক প্রতিবেশী প্রিয়নাথ সরকার (ডিও) মহাশয় এক দিন অবসর সময়ে পাশে থাকা তপেশ এর বাড়িতে আসে।
চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের সামনে প্রিয়নাথ সরকার বলেন :- তপেশ ; তোমার মেয়ের দায়িত্ব পালন করা কিন্তু অবশ্য কর্তব্য এর মধ্যে পড়ে। তুমি সন্তানের মাকে অবহেলা করতে পারে কিন্তু সন্তানকে কখনো অবহেলা করতে পারে না।
আর তনুশ্রী কে নিশ্চয়ই তুমি অস্বীকার করতে পারো না। তার মায়ের চরিত্র ,আচার ব্যবহার ভালো কি মন্দ সেই বিচারে আমি যেতে চাই না।
তনুশ্রী যখন তার মায়ের কাছে থেকে তোমার কাছে এসেছে, তখন অবশ্যই তার দায়িত্ব নিয়ে লালন পালন করা সামাজিক ভাবে অবশ্যই কর্তব্য।
তারপর দশ জনের চাপে পড়ে কিন্তু তপেশ তার মেয়ে তনুশ্রী কে ১১ ক্লাসে ভর্তি করে দেয়।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তনুশ্রী তার বাবাকে বলে :- আমি কলকাতায় থেকে নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চাকরি করতে চাই।
মেয়ের অনুরোধ কে উপেক্ষা করতে না পেরে কিন্তু তপেশ লামডিং শহর থেকে আবার তার মেয়ে কে সাথে করে ১৩ বছর পর শ্বশুর বাড়িতে থাকা স্ত্রী রিতার সাথে দেখা করে। রিতা কথা তো বলেই না বরং তার স্বামীর প্রতি কোন প্রকার মানবতা বোধ পর্যন্ত দেখায় না।
তপেশ কানে তুলো দিয়ে কালা হয়ে আর অন্ধের ন্যায় এক মাস মনে দুঃখ কষ্ট নিয়ে স্ত্রী রিতার সংসারে বসবাস করে। মনের দুঃখ কষ্ট সহ্য করে চলেছে।
পরিস্থিতি অনুভব করে মেয়ে তনুশ্রী তার বাবা কে বলে :- বাবা ; তোমার প্রতি মায়ের ব্যবহারে আমি ভীষণ ভাবে অসন্তুষ্ট। আমাকে নার্সের চাকরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দাও। পাস করে চাকরি পেলে অবশ্যই তোমাকে দেখাশোনা করব।
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তপেশ তার মেয়েকে নিয়ে কলকাতার আগরপাড়া তার বিধবা মাসি মঞ্জু ভট্টাচার্যের বাড়িতে সন্ধ্যার সময় উপস্থিত হয়।
মাসির প্রশ্নের উত্তরে তপেশ বলে :- মাসি ; আমাদের থাকার জন্য একটি ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করে দাও। আমি কাজ কর্ম করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে নার্স করতে চাই।
এক সপ্তাহ পর মাসির মাধ্যমে একটি ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। বাবা ও মেয়ের নতুন সংসার শুরু হয়। আর মেয়ে কে কলকাতার এক নামি দামি নার্সের চাকরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ব্যবস্থা করে। তপেশ এর একমাত্র বোন তার ভাইজি তনুশ্রীর জন্য মাঝে মাঝে টাকা পাঠান।
তপেশ টাকা আয় রোজগারের পথ হিসেবে আগরপাড়া শহরের এক ফার্নিচারের দোকানে ম্যানেজার পদে কাজে যোগদান করে।
মেয়ে তনুশ্রী তিন বছর ধরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পর নার্সিং প্রশিক্ষণ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হয়। তারপর প্রায় এক বছরের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চাকরি লাভ হয়।
তপেশ তার কর্তব্য অনুসারে মেয়ে কে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার মাসি কে জানাই। কয়েক মাসের মধ্যে তার মাসির মাধ্যমে একটি কাপড়ের ব্যবসাদার ছেলের সন্ধান পায়।
ছেলে দেখে তপেশ এর পছন্দ হয় এবং বিয়ের পাকা কথা বার্তা বলে নির্দিষ্ট বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়। মেয়ে চাকরি পাওয়ার তিন বছর পর তপেশ ভাড়া বাড়িতে থেকে জামাই মিলন ধরের সহিত তার মেয়ে শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়।
বিয়ের কেনাকাটা, সোনার গয়না ও বরের দক্ষিণা তনুশ্রীর কর্মস্থল থেকে লোন করে মেটায়। আর বিয়ের খাওয়া দাওয়া ও প্যান্ডেল সহ অন্যান্য খরচ তপেশ এর বোন লামডিং শহর, আসাম রাজ্যের বসবাসকারী রুবি চক্রবর্তী টাকা দেয়।
মেয়ে তনুশ্রীর মা সহ শ্বশুর বংশের অনেক আত্মীয় স্বজন নেমন্তন্ন করে। বিয়েতে কিন্তু তপেশ এর মাসি মঞ্জু ভট্টাচার্য ছাড়া আর কোন আত্মীয় স্বজন আসে না। তবুও জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খাওয়া দাওয়া ও বিয়ে হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে মেয়ে জামাই সহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সবার অনুরোধে আবার স্ত্রী রীতার সংসারের মাঝে চলে আসে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের তেমন কোন উন্নতি হয় না। এক ছাদের নিচে থাকলেও কিন্তু দুজন দুই প্রান্তের নাগরিক হয়ে পড়ে। প্রয়োজন ছাড়া ব্যতীত কেউ কারো সাথে কথা বলে না।
-----------------------------------------------
।। চতুর্দশ অধ্যায় ।।
-----------------------------------------------
রিতার সংসারে তপেশ এর মতো পুরুষের কোন মূল্য নেই আর ভালোবাসা তো অনেক দূরের পথ। সেই অন্ধকার ময় অমাবস্যার রাতের মতো সম্পর্ক থাকে। তবুও তপেশ সবকিছু মেনে নিয়ে কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে ক্ষণিকের সুখের জন্য বসবাস করতে থাকে।
দুই ছেলে এক বৌমা ও এক নাতনি নিয়ে রিতার সংসারে ধীরে ধীরে দুই ছেলে ও তাদের মায়ের কাছে তপেশ বোঝা হয়ে উঠতে থাকে।
মাসি সুপ্রিয়া মন্ডলের কুমন্ত্রণায় সব গন্ডগোল করার কারণে তনুশ্রী বিয়ের পর তার বাবার সাথে কোন রকম সম্পর্ক রাখে না কিন্তু তার মা ও মাসির সাথে যোগাযোগ রাখে।
তপেশ বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে গিয়ে যজমান কাজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ হয়ে পুরোহিতের পূজা-পার্বণ ও শ্রাদ্ধাদি কাজ করতে থাকে।
২০২০ সালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত যখন পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ কিন্তু ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা বাদ যায়নি।
করোনা ভাইরাসের ব্যাধি কিন্তু মানসিক ভাবে রিতার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঢুকে যায়।
রিতার পরিবারের মাতাল ছোট ছেলে সজল মানবতাবোধ হারিয়ে কিন্তু অমানবিক ব্যাধি আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
সজল চক্রবর্তী ২০২০ সালের ভাদ্র মাসের এক সন্ধ্যার সময় মদ পান করে মাতাল হয়ে, তার বাবা তপেশ চক্রবর্তীর উপর অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে চপের ঠোঙা হাতে নিয়ে টলতে টলতে বাড়িতে আসে।
সজলের বাবা বাড়ির উঠানের উপর চেয়ারের পাশে একটা লাঠি রেখে বসে ছিল।
সজল কাছে এসে তার বাবাকে কিল ঘুষি মারতে মারতে চেয়ার থেকে তুলে উঠানে ফেলে দেয়। তার বাবার রাখা লাঠি দিয়েই তপেশ কে মারতে শুরু করে।
সজল বলে :- বসে বসে খাওয়াতে পারবে না। আমাদের জন্য কি কর্তব্য পালন করেছো! সারা জীবন তো এদিক-ওদিক বেরিয়ে বেরিয়ে বেড়িয়েছো। বুড়ো কালে আর দরদ দেখিয়ে নাটক করতে হবে না। জন্ম দিয়েই তো পালিয়েছে কিন্তু আমাদের খোঁজখবর কোনদিন নিয়েছো। ইত্যাদি ইত্যাদি বলে খিস্তি খামারি দিতে থাকে।
রিতা ঘর থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ছেলে সজলের কাছে এসে তার হাতের লাঠি কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়। তারপর সরে গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
তপেশ আশা করেছিল রিতা কিন্তু অবশ্যই তাকে বাঁচাতে আসবে। রিতার নীরবতা পালন দেখে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তপেশ নিজেকে বাঁচার জন্য আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে। বনের পশু সিংহের মতো হুঙ্কার দিতে দিতে শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ছেলে সজলকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
সজল মা মা বলে চিৎকার করে উঠে কিন্তু উঠানের মাঝে উপুড় হয়ে পড়ে যায়। বাবা তার ছেলের পিঠের উপর চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি মারতে থাকে।
সন্ধ্যার সময় বাড়ির উঠানে মারামারি ফাটাফাটি হয়ে রক্তারক্তি হচ্ছে কিন্তু পরিবারের কোনো সদস্যরা এগিয়ে এসে গন্ডগোল নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে না। তপেশ এর বউ রিতা এবং বৌমা সবিতা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
রিতা তার ছোট ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। রিতা বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করতে করতে তার স্বামী কে পিছনের দিক থেকে জাপটে ধরে টানাহেঁচড়া করতে থাকে।
তপেশ কয়েক বার ঝাঁকি দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। আরো কয়েক বার চেষ্টা করতেই কিন্তু রিতা ছিটকে দূরে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে যায়।
রিতা চিৎকার করে উঠে বাবা গো মরে গেলাম রে বলে উঠানে শুয়ে বিলাপ করতে করতে মরা কান্না শুরু করে। আর সজল মায়ের আর্তনাদ চিৎকার শুনে তার বাবাকে আবার আক্রমণ করে।
তপেশ উত্তেজিত অবস্থায় যুবক কালের সময়ে ফুটবল খেলার অভ্যাস মত ভাঙ্গা পা দিয়ে ছেলেকে লাথি মারে। আর সাথে সাথেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে উঠানের মাঝে পড়ে গিয়ে মাজার আঘাতে চিৎকার করতে থাকে। আর সজল চিৎকার করে বলে মাগো মরে গেলাম বলে উঠানে শুয়ে পড়ে।
বাড়ির মহিলা ও কয়েকজন প্রতিবেশী মহিলা মিলে রিতা ও সজল কে বারান্দায় তুলে নিয়ে গিয়ে সুস্থতা করার চেষ্টা করে।
তপেশ রাগে উত্তেজিত হয়ে দ্রুত উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। তারপর প্রায় ঘন্টা খানেক উঠানের মাটির উপর শুয়ে থাকে। ভয়ে কেউ কাছে যায় না কিন্তু দুর থেকে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করতে থাকে।
তারপর আবার চেষ্টা করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে কিন্তু চারিদিকে তাকিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করে। তারপর দ্রুত বেগে উঠানের উপর দিয়ে চলতে থাকে। বাড়ির উঠানের এক পাশে বেগুন ক্ষেতের মধ্যে বেগুন গাছের উপর থেকে তার বাঁশের লাঠি উদ্ধার করে।
এক সময় লাঠি খেলায় কিন্তু তপেশ সুনাম অর্জন করে কিন্তু পা ভেঙ্গে যাওয়ার পর বন্ধ।
আরো কিছু সময় উঠানের উপর দিয়ে পায়চারির সাথে সাথে চিন্তা করতে করতে পরবর্তী ধাপের পরিকল্পনা করে।
তপেশ লাঠি হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে পাকা ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলে :- শ্বশুরের জমিতে এই পাকা ঘর কিন্তু আমি টাকা খরচ করে বানিয়েছি। আমি বাড়িতে থাকলে তোমাদের জ্বালা উঠে যায়।
তারপর তপেশ ঘরে ঢুকে তার স্ত্রী রিতাকে ঘর থেকে জোর করে বের করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আর রিতা অসহায়ের মতো উঠানে গিয়ে বসে পড়ে ভাবতে থাকে।
কিছু সময় পর তপেশ ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে, লাঠি হাতে নিয়ে উঠানে এসে চিৎকার করে বলে :- রিতার বুদ্ধিতে কিন্তু তার মাতাল ছেলে আমার উপর আক্রমণ করে বাজে বাজে মন্তব্য করল। তার মায়ের প্রশ্রয় না থাকলে বাবার উপর আক্রমণ করার সুযোগ পায় কি করে!
এই সংসারে আমি এক টাকাও দিই না। পূজা পাঠ করে চাল ডাল টাকা পয়সা কাপড় চোপড় অন্য সংসারে দিয়ে আসি। আয় এবার আমার সামনে কে আসবে ,সবাইকে মেরে মেরে লাশ বানিয়ে দেবে।
রিতা ভাবে :- ওর হাতে লাঠি থাকা অবস্থায় কাছে যাওয়া যাবে না। চন্ডালের মত রাগ সামনে গেলেই মেরে ধরে খুন করে ফেলতে পারে। কিন্তু একটা বিধি ব্যবস্থা করতে হবে আর কতদিন এভাবে অশান্তি ভোগ করে চলবে। যৌবনের সময়ে স্বামী সুখ শান্তি পেলাম না আর বৃদ্ধ বয়সে আর প্রয়োজন নেই।
রাত ৯ টা ৩০ মিনিটের সময় রিতা তার পাঁচ জন বোনের মধ্যে একজন পাশের গ্রাম বিত্তিপাড়া বসবাসকারী তার চতুর্থ বোন সুপ্রিয়ার কাছে মুঠোফোনের মাধ্যমে কান্নাকাটি করে মারামারির ঘটনা বলে। আর সব দোষ তপেশ এর উপর চাপিয়ে দেয়।
রাত দশটার সময় সুপ্রিয়া মন্ডল ও তার স্বামী অশোক মন্ডল উপস্থিত হয়। সুপ্রিয়া ও অশোক উত্তেজিত অবস্থায় তার জামাইবাবুর ঘরে ঢুকে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী মিলিত হয়ে তপেশ কে বিছানার উপর ফেলে লাঠি দিয়ে মারতে মারতে রক্ত ঝরিয়ে দেয়।
তপেশ এর আত্মনাত চিৎকার চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকে। সেই রাতে পরিবার সহ কোন প্রতিবেশী সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে নাই।
তারপর ছোট ছেলে ও তার মাসি মিলে তপেশ কে টানাহেঁচড়া করে বাড়ির উঠানে নিয়ে এসে ফেলে দেয়।
শালি সুপ্রিয়া তার জামাইবাবুর মুখে থুথু দিতে দিতে বলে :- এই বাড়িতে তোর মতো অকর্মার ঢেঁকি পুরুষের কোন অধিকার নেই।
এই মুহূর্তে পালিয়ে যাবে, না হলে কিন্তু তোকে খুন করে দিদি কে বিধবা করবো। শালা চরিত্রহীন বদমাশ বুড়ো কালে জ্বালাতন করতে এসেছে।
আমার বাপের বাড়িতে থেকে আবার দিদি কে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার সাহস হলো কি করে! হাড়গোড় ভেঙ্গে রাস্তায় বসিয়ে দেবে কিন্তু ভিক্ষা করে খেতে হবে।
এই সব ঘটনা তপেশ এর বউ রিতার সামনে হলো কিন্তু স্বামী কে বাঁচানোর কোন লক্ষণ দেখা যায় না। চুপচাপ নিরবতা পালন করে দেখে চলছে।
বড় ছেলে কাজল ও বৌমা সবিতা কোন ভূমিকা না নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে।
সেই রাতে তপেশ শরীরে জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করে ভাঙা পা নিয়ে খোড়াতে খোড়াতে হাটতে শুরু করে। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে একসময় মাথা ঘুরে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। কিছু সময় বিশ্রাম করে আবার পাশের বেড়া থেকে ডাল ভেঙ্গে লাঠি বানিয়ে নিয়ে চলতে থাকে।
তপেশ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে চলতে চলতে ভাবে মনে মনে :- আমি একটা সুন্দর সংসার করতে চেয়েছিলাম কিন্তু বিধি হল বাম। সব সময় স্ত্রী রিতার কথা শুনে চলার চেষ্টা করলাম কিন্তু পরিনামে তার কাছ থেকে কিছুই পেলাম না।
শেষ সম্বল মেয়ে তনুশ্রী কে আমার সাধ্যমত সব কিছুর ব্যবস্থা করেছিলাম। বিয়ের ছয় মাস পর থেকে আমার সাথে আর কোন যোগাযোগ রাখে না। যেমন মা তেমনি তো তার মেয়ে হবে।
রিতা সহ ছেলে মেয়ে সবাই তাদের স্বার্থে আমাকে ব্যবহার করে নিয়েছে কিন্তু দূর সময়ে কেউ পাশে থাকে না।
রিতা কে অন্তরের গভীরে ভালোবাসা রেখেছিলাম।
এখন বুঝতে পারছি ওর কথা শুনে জীবনে চরম ভুল করেছি। শুধু স্বার্থের জন্য ওর ভালোবাসা।
আমার এখন যৌবন জোয়ার নেই আবার ধন সম্পত্তি টাকা পয়সা কিছুই নেই। যা টাকা সঞ্চয় করেছিলাম মেয়ে তনুশ্রীর পড়াশোনা ও শশুর বাড়িতে পাকা ঘর করতে সব শেষ হয়ে যায়। বর্তমান রিতার কাছে মূল্যহীন ময়লা কাগজের মতো হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো।
বউয়ের কথা শুনে তার বাপের বাড়িতে ঘর জামাই থাকার মতো বোকামি আর জগতে দ্বিতীয় হয় না।
বর্তমান যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, না আছে পিতার কুল আর না আছে শশুরের কুল। উভয় কুলে কিন্তু আমার আর কোন জায়গা নেই।
পথে ঘাটে পড়ে থেকে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বৃদ্ধকালে মানুষের লাথি ঝাটা খেতে খেতে শ্মশানে যেতে হবে।
রিতার বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে রায় পাড়া গ্রামে ঘর ভাড়া নিয়ে তপেশ বসবাস শুরু করে। আর যোজমানের বাড়িতে পূজা পাঠ করে আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে।
আশ্রমের সেবক কুমারেশ বিশ্বাসের মাধ্যমে
শ্রী শ্রী মা সেবাশ্রমের মোহন্ত মহারাজ ও কর্ণধর শ্রী দেবানন্দ গোস্বামী বাবাজীর সাথে দেখা করে। মহারাজ শ্রী শ্রী দূর্গা পূজার ব্রাহ্মণ পুরোহিত কাজ করার জন্য আশ্রমে নিয়ে আসে।
তপেশ চক্রবর্তী অক্টোবর ২০২২ সাল থেকে শ্রী শ্রী মা সেবাশ্রম। খাটুরা,দোলনঘাটা,মাঝদিয়া, নদীয়া পশ্চিমবঙ্গ। আশ্রমের আরো পাঁচ ব্যক্তির সাথে আশ্রমবাসি হয়ে পড়ে।
তপেশ চক্রবর্তী আশ্রমের রুমের বিছানার উপর বসে বলে :- সংসার চক্রের মাঝে ভালোবাসার অন্তরালের দুঃখের কাহিনী এখানেই শেষ করলাম।
------------------------------------------------
রচনাকাল :- ২৩ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ।
স্থান :- শ্রী শ্রী মা সেবাশ্রম। খাটুরা, দোলন ঘাটা, মাঝদিয়া, নদীয়া পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
------------------------------------------------
--------------- সমাপ্ত --------------
------------------------------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন